দি ইনডিসক্রিট জুয়েলস (The Indiscreet Jewels) - Denis Diderot
দি ইনডিসক্রিট জুয়েলস - দ্যনি দিদরো
অনুবাদকের ভূমিকা
দেনি দিদরোর The Indiscreet Jewels (১৭৪৮) অষ্টাদশ শতকের ফরাসি সাহিত্যের এক ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। উপন্যাসটির
আড়ালে রয়েছে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, দার্শনিক রূপক, এবং মানব কামনা ও ক্ষমতার সম্পর্কের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। প্রথম পাঠে এটি
মনে হতে পারে কেবল এক রম্য বা রতিসাহিত্যের গল্প; কিন্তু
দিদরো এতে কেবল ইন্দ্রিয়ের খেলা নয়, বরং সমাজ, নীতি, ধর্ম ও রাজদরবারের ভণ্ডামিকে এক প্রকার
নগ্ন রসিকতার মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন।
এই অনুবাদ কোনও অফিসিয়াল সংস্করণ নয়—এটি
কেবল বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য, যাতে তারা দিদরোর
ব্যঙ্গ ও রসবোধের আস্বাদ নিজ ভাষায় নিতে পারেন। মূল পাঠের শৈলী ও ভাব বজায় রাখার
চেষ্টা করেছি, তবে ভাষা এমন রেখেছি যেন আধুনিক পাঠকের
কাছেও এটি বোধগম্য হয়।
আমি এই অনুবাদে নেমেছি একান্ত পাঠকপ্রেম থেকে—দিদরোর
চিন্তাকে আমাদের ভাষায় ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে থেকে। এখানে কোনও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নেই; এটি কেবল এক সাহিত্যানুরাগীর প্রচেষ্টা, এক
ক্লাসিক ইউরোপীয় কণ্ঠকে বাংলায় অনুরণিত করার প্রয়াস।
অপু চৌধুরী
উৎসর্গ:
জিমার উদ্দেশ্যে
জিমা, এই মাহেন্দ্রক্ষণটি হেলায় হারিও না। আগা নারকিস এখন তোমার জননীর
মনোরঞ্জনে ব্যস্ত, আর তোমার ওই কড়া মেজাজের শিক্ষয়িত্রী
বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমার পিতার প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। এই
নাও, পড়ো; শঙ্কিত হইও না। অবশ্য,
তোমার প্রসাধন-টেবিলের আড়ালে যদি বিজু ইনডিসক্রে
(গোপন রত্নরাজি) গ্রন্থটি আবিষ্কৃত হয়, তবে কি তা খুব বিস্ময়ের কারণ হবে? না,
জিমা, না; এ
কথা তো সর্বজনবিদিত যে দ্য সোফা, তানজাই,
এবং দ্য কনফেশনস তোমার উপাধানের নিচেই লুকায়িত ছিল।
তবুও কি দ্বিধা করছো?
তবে শোনো, স্বয়ং আগ্লায়ে এই কার্যে
হস্তক্ষেপ করেছেন—যে কাজটি গ্রহণ করতে তুমি লজ্জায় সংকুচিত হচ্ছো।
“আগ্লায়ে?” তুমি বিস্ময়ে
প্রশ্ন করবে, “সেই
গাম্ভীর্যপূর্ণ আগ্লায়ে?”
হ্যাঁ, সেই একই রমণী। যখন তুমি হয়তো তরুণ বঞ্জা আলেলুইয়ার সঙ্গে ভ্রমণে মত্ত
ছিলে, কিংবা তাকে বিদায় করার ছল খুঁজছিলে; আগ্লায়ে তখন নির্দোষ আনন্দে আমাকে জাইদ, আলফানা,
ফ্যানিয়ার প্রভৃতি কাহিনি শুনিয়ে কালযাপন করছিলেন। তিনি আমাকে
এমন কিছু চিত্তাকর্ষক রূপরেখা প্রদান করেছিলেন, যা আমি
সুলতান মাঙ্গোগুলের এই ইতিহাসে সন্নিবেশিত করেছি। তিনি আমার পাণ্ডুলিপি খুঁটিয়ে
দেখেছেন এবং তা সংশোধনের পথও বাতলে দিয়েছেন। কেননা, আগ্লায়ে
যদি কঙ্গোর অন্যতম সচ্চরিত্রা ও স্বল্প-শিক্ষাদায়ী নারী হন, তবুও তিনি বুদ্ধিমত্তায় অদ্বিতীয়া এবং নির্লোভ।
এখনো কি ভাবছো জিমা,
তোমার পক্ষে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া শোভা পায়? পুনর্বার বলছি, জিমা—এই
গ্রন্থটি গ্রহণ করো, পাঠ করো, এবং সম্পূর্ণই পাঠ করো; এমনকি সেই ‘চঞ্চল
খেলনা’র
(The Rambling Toy) ইতিবৃত্তটিও বাদ দিও না।
এই অংশটি তোমার চরিত্রের কোনো হানি না ঘটিয়েই কেউ তোমার নিকট ব্যাখ্যা করতে সক্ষম—অবশ্য,
যতক্ষণ না সেই ব্যাখ্যাকারী তোমার কোনো আত্মিক উপদেষ্টা কিংবা
গোপন প্রেমিক হন।
প্রথম
অধ্যায়: মাঙ্গোগুলের জন্মবৃত্তান্ত
হিয়াউফ জেলেস তানজাই
বহুদিন ধরে চেচিয়ানিয়ার মহান সাম্রাজ্য শাসন করে আসছিলেন, আর এই ভোগবিলাসী রাজপুত্র
তখনও প্রজাদের চোখের মণি হয়ে ছিলেন। এদিকে মিনুশিয়ার রাজা আকাজু বাবার
ভবিষ্যদ্বাণী মেনে নিয়ে নিজের ভাগ্য বরণ করেছেন; জুলমিস
আর ইহলোজে নেই; কাউন্ট দ্য (---) এখনো বেঁচে আছেন;
কিন্তু স্প্লেনডিডাস, অ্যাঙ্গোলা,
মিসাপুফ এবং এশিয়া ও ইন্ডিজের আরও কয়েকজন সম্রাট হঠাৎ মারা
গেছেন। দুর্বল শাসকদের শাসনে ক্লান্ত প্রজারা অবশেষে ছিঁড়ে ফেলেছে আনুগত্যের শিকল;
আর সেইসব হতভাগ্য রাজবংশের বংশধরেরা আজ নিজেদের সাম্রাজ্যেরই
কোনো এক কোণে অচেনা বা নগণ্য হয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেবল একজনই নিজের সিংহাসন টিকিয়ে
রাখতে পেরেছেন—প্রখ্যাত সেহেরাজাদের নাতি ‘শাহ বাহাম’, যিনি
তখন হিন্দুস্তানে রাজত্ব করছিলেন। ঠিক সেই সময়েই কঙ্গোতে জন্ম নিলেন মাঙ্গোগুল।
তাই বলা চলে, বহু সম্রাটের মৃত্যুই মাঙ্গোগুলের জন্মের এক
বিষাদমাখা পটভূমি তৈরি করেছিল।
বাবা এর্গেবজেদ ছেলের
দোলনার চারপাশে পরীদের ডাকেননি; কারণ তিনি দেখেছিলেন, তাঁর সময়ের যেসব
রাজপুত্র এই নারী-আত্মাদের হাতে মানুষ হয়েছেন, শেষমেশ
তাঁরা নির্বোধ ছাড়া আর কিছুই হননি। তিনি কেবল একটা কাজই করলেন—ছেলের কোষ্ঠী
বা জন্মছক তৈরি করার জন্য ডেকে পাঠালেন কোদিন্দো নামের এক ব্যক্তিকে। এই কোদিন্দোকে
সামনাসামনি দেখার চেয়ে ছবিতে দেখলেই বেশি পণ্ডিত মনে হয়।
কোদিন্দো ছিলেন প্রাচীন
রাজধানী বানজার জাদুকর বা দৈবজ্ঞদের কলেজের প্রিন্সিপাল। এর্গেবজেদ তাঁকে মোটা
অঙ্কের মাসোহারা দিতেন এবং তাঁর এক নামকরা পূর্বপুরুষ—যিনি চমৎকার রাঁধুনি ছিলেন—তাঁর গুণের
কদর করে কোদিন্দো ও তাঁর বংশধরদের কঙ্গোর সীমান্তে একটা বিশাল দুর্গও দান করেছিলেন।
কোদিন্দোর কাজ ছিল পাখির ওড়াউড়ি আর আকাশের অবস্থা দেখে সেটা রাজসভায় জানানো—যা তিনি জঘন্যভাবে
করতেন। যদি লোকে বলে যে, বানজায় আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ নাটকগুলো মঞ্চস্থ হতো সবচেয়ে বাজে থিয়েটারে—তাহলে তার উল্টোটাও
বলা যায়, সেখানে
ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর কলেজ, আর সেখানে চর্চা হতো
সবচেয়ে বাজে ভবিষ্যদ্বাণী।
রাজপুত্রের ভবিষ্যৎ বলার
জন্য যখন এর্গেবজেদের প্রাসাদে ডাক পড়ল,
কোদিন্দো বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন; কারণ,
আপনি বা আমি যেমন পড়তে জানি না, তিনিও
ঠিক তেমনই—অক্ষরজ্ঞানহীন।
রাজদরবারে তখন অধীর
অপেক্ষা। মন্ত্রী-আমলারা সব জড়ো হয়েছেন সুলতানার ঘরে। মহিলারা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক
পরে বাচ্চার দোলনার চারপাশে দাঁড়িয়ে। সবাই এর্গেবজেদকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত—বাবার মনে হচ্ছিল
ছেলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি দারুণ কিছু শুনতে পাবেন। তিনি বাবা, তাই বাচ্চার কচি মুখের দিকে
তাকিয়েই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিলেন।
অবশেষে কোদিন্দো এসে
পৌঁছালেন।
“এগিয়ে এসো,”
গম্ভীর গলায় আদেশ দিলেন এর্গেবজেদ, “যেই মুহূর্তে স্বর্গ আমাকে এই ছেলে
উপহার দিয়েছে, আমি
তার জন্মের সঠিক সময় লিখে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলাম, সেটা
নিশ্চয়ই তোমাকে জানানো হয়েছে। এবার সত্যি করে বলো, সাহস
করে বলো—বিধাতা আমার ছেলের কপালে কী লিখে রেখেছেন?”
“জাহাপনা,”
হাতজোড় করে বললেন কোদিন্দো, “এমন মহান ও সুখী বাবা-মায়ের ছেলে যে মহান আর
ভাগ্যবান হবেন, তাতে
কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি যদি এমন কোনো বিদ্যার ভান করি যা আমার জানা নেই,
তবে সেটা হবে আপনার সঙ্গে প্রতারণা। নক্ষত্রগুলো সবার মতো আমার
জন্যও ওঠে আর ডোবে, কিন্তু ভবিষ্যতের ব্যাপারে তারা আমাকে
আপনার রাজ্যের সবচেয়ে মূর্খ প্রজাটির চেয়ে বেশি কিছুই জানায় না।”
“সে কি!” অবাক হয়ে বললেন
সুলতান, “তুমি কি তবে জ্যোতিষী নও?”
“মহারাজ,”
কোদিন্দো উত্তর দিলেন, “সে সম্মান আমার নেই।”
“তাহলে তুমি কোন জাতের
শয়তান!”—বুড়ো অথচ রাগী এর্গেবজেদ ধমক দিয়ে উঠলেন—“একজন আরুসপেক্স! (পশুবলির মাধ্যমে ভাগ্যগণনাকারী!)
খোদার কসম, আমি
স্বপ্নেও ভাবিনি তুমি এমন অকেজো! শোনো কোদিন্দো, তুমি বরং
তোমার হাঁস-মুরগি নিয়েই সুখে থাকো—আর আমার ছেলের ভাগ্য বলে দাও, ঠিক যেমন কিছুদিন আগে আমার
স্ত্রীর তোতাপাখির সর্দিজ্বর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে।”
কোদিন্দো সঙ্গে সঙ্গে পকেট
থেকে চশমা বের করলেন, বাচ্চার বাঁ কানটা ধরে চোখে চশমা এঁটে ভালো করে দেখলেন, তারপর ডান কানটাও ওভাবেই দেখলেন। শেষে গম্ভীর মুখে ঘোষণা করলেন:
“এই রাজপুত্রের রাজত্বকাল
পরম সুখের হবে, যদি
সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।”
“বুঝলাম,”
এর্গেবজেদ বললেন, “আমার ছেলে পৃথিবীর সেরা কাজগুলো করবে—যদি সে বেঁচে
থাকে। কিন্তু বজ্রপাত হোক! আমি যেটা জানতে চাই সেটা হলো—সে আদৌ বাঁচবে তো? ও মরে যাওয়ার পর তার গৌরব
দিয়ে আমি কী করব? আমি তোমাকে ডেকেছিলাম ছেলের কোষ্ঠী তৈরি
করার জন্য, আর তুমি কিনা ওর শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়তে বসলে!”
কোদিন্দো কাঁচুমাচু হয়ে
জানালেন, তিনি
নিজেও চান আরও বিদ্বান হতে। তবু সুলতানের কাছে বিনীত অনুরোধ করলেন—তিনি যেন বোঝেন, নক্ষত্রবিদ্যার পথে তাঁর
যাত্রা সবে শুরু হয়েছে; এই অবস্থায় যতটুকু জ্ঞান তিনি
পেয়েছেন, সেটুকুই তাঁর সম্বল। কারণ, সত্যি বলতে কী, এই ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্ত
পর্যন্ত কোদিন্দো ছিলেন—আর কিছু নন, নিতান্তই এক শিক্ষানবিশ।
দ্বিতীয়
অধ্যায়: মাঙ্গোগুলের শিক্ষা ও দীক্ষা
মাঙ্গোগুলের শৈশব নিয়ে আমি
খুব বেশি কথা খরচ করব না। রাজপুত্রদের শৈশব সাধারণ আর দশটা বাচ্চার মতোই, তফাত শুধু একটাই—রাজপুত্ররা
নাকি মুখে বুলি ফোঁটার আগেই হাজারো মণিমুক্তো ছড়িয়ে ফেলার অদ্ভুত এক "ক্ষমতা"
নিয়ে জন্মায়। যেমন, এর্গেবজেদের পুত্রের বয়স চার পেরোতে না পেরোতেই তার কীর্তিকলাপ নিয়ে
আস্ত একখানা ‘মাঙ্গোগুলানা’ লেখা হয়ে গিয়েছিল।
বাবা এর্গেবজেদ বেশ
বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। নিজের শিক্ষার বহর যা-ই হোক, ছেলের পড়াশোনায় তিনি কোনো খামতি রাখতে চাননি।
তাই তিনি কঙ্গোর বাঘা বাঘা সব গুণী মানুষকে একজায়গায় করলেন—চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, কবি, গায়ক, স্থপতি,
নাচিয়ে, গণিতবিদ, ইতিহাসবিদ, তলোয়ারবাজ—কাউকে বাদ রাখলেন
না। কপাল ভালো, মাঙ্গোগুলের
সহজাত মেধা আর শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে পনেরো বছরের মধ্যেই একজন তরুণ
রাজপুত্রের যা যা শেখা উচিত, তার কিছুই তিনি বাকি রাখলেন
না। আর বিশ বছর বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তিনি খাওয়া, দাওয়া
আর ঘুম—এই তিনটি মহৎ বিদ্যায় সমসাময়িক যেকোনো রাজাকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন
করলেন।
এদিকে বয়সের ভারে নুব্জ
এর্গেবজেদ; একদিকে
রাজপাটের ক্লান্তি, অন্যদিকে বিদ্রোহের ভয়, তৃতীয়ত পুত্র মাঙ্গোগুলের অসাধারণ যোগ্যতায় অগাধ বিশ্বাস, এবং সর্বোপরি শেষ বয়সে হঠাত করে ভক্তিভাব জেগে ওঠা—যা কি না রাজপুরুষদের
ক্ষেত্রে প্রায়শই মৃত্যু বা মতিভ্রমের লক্ষণ—সব মিলিয়ে তিনি সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে
ক্ষমতা বুঝিয়ে দিলেন। এই মহৎ রাজা মনে করলেন,
সারা জীবন তিনি যে ন্যায়পরায়ণ শাসন চালিয়েছেন, তার অদৃশ্য পাপ মোচনের জন্য এখন নির্জনবাসই শ্রেয়।
এইভাবে, পৃথিবীর বয়স যখন ১৫,০০০,০০০,০৩২,০০০,০২১ বছর আর কঙ্গো সাম্রাজ্যের বয়স ৩৯০,০০০,০৭০,০০৩ বছর—শুরু হলো মাঙ্গোগুলের
শাসনকাল। তিনি ছিলেন তাঁর রাজবংশের ১২,৩৪,৫০০তম উত্তরাধিকারী।
মন্ত্রিসভার সঙ্গে ঘন ঘন
বৈঠক, যুদ্ধ
পরিচালনা আর রাজকার্য সামলানো—বইয়ের পাতার বাইরে জীবনের আসল শিক্ষাটা
তিনি অল্প দিনেই শিখে নিলেন। তবুও,
মাত্র দশ বছরের মধ্যেই মাঙ্গোগুল ‘মহান পুরুষ’ হিসেবে নাম
কিনে ফেললেন। তিনি যুদ্ধ জয় করলেন,
শহর দখল করলেন, সাম্রাজ্যের সীমানা
বাড়ালেন, প্রদেশগুলোকে শান্ত করলেন, অর্থনীতির চাকা সচল করলেন, শিল্প-সাহিত্যের
জোয়ার আনলেন, অসাধারণ সব ইমারত গড়লেন, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজেকে অমর করে তুললেন, আইনসভাকে আরও শক্তিশালী করলেন, এমনকি
অ্যাকাডেমিও প্রতিষ্ঠা করলেন—আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ল্যাটিন ভাষার একটা শব্দ না
জেনেই তিনি এত সব মহৎ কাজ করে ফেললেন; যেটা তাঁর দেশের
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।
মাঙ্গোগুল সিংহাসনে যেমন
মহান ছিলেন, অন্দরমহলে
বা হারেমেও ছিলেন তেমনই উদার। দেশের সেকেলে হাস্যকর রীতিনীতি তিনি থোড়াই কেয়ার
করতেন। তিনি তাঁর নারীদের প্রাসাদের দরজা ভেঙে ফেললেন; তাদের
তথাকথিত ‘সতীত্ব’ রক্ষাকারী পাহারাদারদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে
বিদায় করলেন; এবং
মেয়েদের সততার ভার মেয়েদের ওপরই ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। ফ্ল্যান্ডার্সের
গির্জাসংশ্লিষ্ট নারীদের (Canons) বাড়ির দরজা যেমন
পুরুষদের জন্য খোলা থাকে, তাঁর হারেমের দরজাও তেমনই
উন্মুক্ত করে দিলেন। আর বলাই বাহুল্য, তাঁদের আচরণও ছিল
তেমনই শালীন।
আহা! কী চমৎকার সুলতান
ছিলেন তিনি! তাঁর মতো আর কেউ জন্মায়নি—এমন চরিত্রের দেখা শুধু কিছু ফরাসি উপন্যাসের
পাতাতেই মেলে। তিনি ছিলেন কোমল, ভদ্র, হাসিখুশি, রোমান্টিক,
সুপুরুষ ও আমুদে—যেন আনন্দের জন্যই তাঁর সৃষ্টি। আর তাঁর
মগজে যে পরিমাণ ঘিলু ছিল, তা তাঁর পূর্বপুরুষদের সবারটা একত্র করলেও সমান হতো না।
এতসব গুণ যার, তাকে পাওয়ার জন্য যে অসংখ্য
নারী লালায়িত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাদের মধ্যে কেউ কেউ
সফল হয়েছিল। আর যারা মাঙ্গোগুলের হৃদয় জিততে পারল না, তারা
অগত্যা রাজসভার অমাত্যদের সঙ্গেই নিজেদের সান্ত্বনা খুঁজে নিল।
ভাগ্যবতী তরুণী মির্জোজাও
সেই দলেরই একজন—যিনি সুলতানের মন জয় করতে পেরেছিলেন।
আমি এই ইতিহাসে মির্জোজার
রূপগুণের ফিরিস্তি দিতে বসব না; ও কাজ করলে এই লেখার আর কোনো শেষ থাকবে না। অথচ আমি প্রতিজ্ঞা করেছি—এই ইতিহাসের
একটা ইতি আমি টানবই।
তৃতীয়
অধ্যায়: যা এই ইতিহাসের প্রকৃত সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে
মির্জোজা ইতিপূর্বেই বেশ
কয়েক বছর ধরে মাঙ্গোগুলকে নিজের আঁচলে বেঁধে রেখেছিলেন। এই প্রেমিকযুগল একে অপরকে
যা যা বলা সম্ভব—এবং আবেগের আতিশয্যে যা বলা সম্ভব নয়—তার সবই বারবার
আউড়ে ফেলেছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পরস্পরের কাছে জীবনের অতি
তুচ্ছ কোনো ঘটনা গোপন করাকেও তাঁরা অপরাধ জ্ঞান করতেন।
তাঁরা সেই সব সনাতন
প্রেমিক-সুলভ জিজ্ঞাসাবাদের স্তরও পার করে এসেছিলেন—যেমন, “উঁচু
সিংহাসনে না বসিয়ে বিধাতা যদি আমাকে কোনো সাধারণ পরিবারে পাঠাতেন, তবুও কি তুমি আমাকে গ্রহণ
করতে?” কিংবা
“মির্জোজা যদি তার সামান্য রূপটুকুও হারিয়ে ফেলে, মাঙ্গোগুল কি তখনও তাকে
ভালোবাসবেন?”—এইসব
কাল্পনিক প্রশ্ন, যা বুদ্ধিদীপ্ত প্রেমিকদের উর্বর মস্তিষ্কে জন্ম নেয়, যা নিয়ে কোমল হৃদয়ের প্রেমিকরা অকারণে ঝগড়া বাধায়, আর যা প্রায়শই সত্যবাদী প্রেমিককেও মিথ্যা বলতে বাধ্য করে—আমাদের এই জুটির
কাছে সেসব এখন একেবারেই বাসি হয়ে গেছে।
গল্প বলায় মির্জোজার ছিল
বিরল ও সহজাত প্রতিভা, কিন্তু বানজা শহরের যাবতীয় কেলেঙ্কারির ভাণ্ডার তিনি ইতিমধ্যেই উজাড়
করে ফেলেছিলেন। তাছাড়া শরীরটা খুব জুতসই না থাকায় তিনি সবসময় সুলতানের সোহাগ
গ্রহণে প্রস্তুত থাকতেন না; আবার সুলতানেরও সবসময় মেজাজ
মর্জি থাকত না। সোজা কথায়, এমন কিছু দিন আসত, যখন মাঙ্গোগুল ও মির্জোজার একে অপরকে বলার মতো কোনো কথা থাকত না,
করার মতো কোনো কাজও থাকত না। ভালোবাসার বিন্দুমাত্র ঘাটতি না
থাকলেও, তাঁরা তখন বেশ নিস্পৃহভাবে সময় কাটাতেন। যদিও এমন
দিন খুব কমই আসত, তবুও আসত—আর আজকের দিনটা
ছিল তেমনই এক দিন।
সুলতান সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে
ছিলেন, আর উল্টো
দিকে বসে মির্জোজা নীরবে গিঁট বুনছিলেন। আবহাওয়া সুবিধের ছিল না, তাই হাঁটাহাঁটিরও উপায় নেই। মাঙ্গোগুল পিকেট খেলার প্রস্তাব দেওয়ার
সাহস পেলেন না। প্রায় পনেরো মিনিট এভাবেই কাটল। হঠাত সুলতান পরপর কয়েকবার হাই তুলে
নীরবতা ভাঙলেন, “স্বীকার
করতেই হবে, গেলিওটা
(Géliote) একেবারে দেবদূতের মতো গান গাইত।”
“আর মহামান্য সুলতান যে
বিরক্তিতে মারা যাচ্ছেন, সেটাও স্বীকার করুন,”
জবাব দিলেন মির্জোজা।
“না, প্রিয়তমা,” মাঙ্গোগুল হাই চাপার আপ্রাণ
চেষ্টা করতে করতে বললেন, “তোমাকে দেখার মুহূর্ত কি কখনো একঘেয়ে হতে পারে?”
“এটা যদি নিছক সৌজন্যমূলক
প্রশংসা না হয়, তবে
দোষটা পুরোপুরি আপনার,” উত্তর দিলেন মির্জোজা। “আপনি ভাবনায় ডুবে আছেন, মন নেই, সমানে হাই তুলছেন। রাজপুত্র, আপনার হয়েছেটা কী?”
“জানি না,”
বললেন সুলতান।
“তবে আমি আন্দাজ করতে পারি,”
মির্জোজা বলে চললেন। “আমি যখন আপনার মন জয়ের সৌভাগ্য অর্জন
করি, তখন আমার
বয়স ছিল আঠারো। আপনার ভালোবাসা পাচ্ছি চার বছর হলো। আঠারো আর চার—মানে এখন আমার
বয়স বত্রিশ। সুতরাং আমি এখন বেজায় বুড়ি।”
মির্জোজার এই অদ্ভুত গণিত
দেখে মাঙ্গোগুল হেসে ফেললেন।
“তবে যদি আমি আর আনন্দদানের
উপযুক্ত না-ও হই,” মির্জোজা যোগ করলেন, “অন্তত পরামর্শদাতা হিসেবে যোগ্যতা
প্রমাণ করব। আপনার চারপাশে বিনোদনের অভাব নেই, তবু সেগুলো আপনাকে বিতৃষ্ণা থেকে বাঁচাতে পারছে
না। আপনি একঘেয়েমিতে ভুগছেন, রাজপুত্র, এটাই আপনার রোগ।”
“তুমি ঠিক ধরেছ—এটা আমি পুরোপুরি
স্বীকার করছি না,” বললেন মাঙ্গোগুল। “তবে তর্কের
খাতিরে যদি ধরেই নিই তুমি ঠিক বলেছ,
তাহলে এর কোনো দাওয়াই কি তোমার জানা আছে?”
একটু থেমে মির্জোজা উত্তর
দিলেন, সুলতান
তাঁর মুখ থেকে নগরের নানা প্রেমকাহিনি শুনে এত আনন্দ পেতেন যে, এখন আর তাঁর ঝুলিতে বলার মতো নতুন গল্প না থাকায় তিনি দুঃখিত। তিনি যদি
দরবারের নারীদের গোপন প্রেমলীলার খবর বেশি জানতেন, তাহলে
আরও কিছু বলতে পারতেন। নতুন কোনো বুদ্ধি না আসা পর্যন্ত তিনি এই পথটাই বাতলে
দিলেন।
“তোমার প্রস্তাবটি মন্দ নয়,”
বললেন মাঙ্গোগুল। “কিন্তু এদের সবার হাঁড়ির খবর কে রাখে
বলো? আর ধরো কেউ
জানেও, তাহলে কে আর তোমার মতো করে গুছিয়ে বলতে পারবে?”
“তবুও, জানা যাক না,” উত্তর দিলেন মির্জোজা। “যেই বলুক না
কেন, আমি নিশ্চিত,
কাহিনির রসদ থেকে মহামান্য যে আনন্দ পাবেন, তা বর্ণনার গুণে খুব একটা ম্লান হবে না।”
“তুমি চাইলে আমিও বাজি ধরতে
পারি যে, দরবারের
নারীদের কাহিনিগুলো বেশ মুখরোচক,”
বললেন মাঙ্গোগুল। “তবে সেগুলো যদি শতগুণ মজারও হয়, কী লাভ, যদি জানাই না যায়?”
“জানা কঠিন হতে পারে,”
উত্তর দিলেন মির্জোজা, “তবে আমার মতে, অসম্ভব নয়। আপনার আত্মীয় এবং বন্ধু, সেই জিনিয়াস (Genie) কুকুফা এর চেয়েও বড় বড়
কাজ হাসিল করেছেন। আপনি কেন তাঁর পরামর্শ নিচ্ছেন না?”
“আহ, হৃদয়ের আনন্দ আমার!” সুলতান চেঁচিয়ে
উঠলেন, “তোমার তুলনাই হয় না। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ
নেই, সেই জিনিয়াস
তার সমস্ত জাদুবল আমার উপকারে লাগাবে। এই মুহূর্তেই আমি আমার খাস কামরায় ঢুকে তাকে
আহ্বান করব।”
এই বলে মাঙ্গোগুল উঠে
দাঁড়ালেন, কঙ্গোর
রীতি অনুযায়ী প্রিয়তমার বাম চোখে আলতো চুমু খেলেন, এবং
সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন।
চতুর্থ
অধ্যায়: জিনিয়াস কুকুফাকে আহ্বান
জিনিয়াস কুকুফা ছিলেন এক
বয়স্ক এবং বাতিকগ্রস্ত আত্মা, যিনি জগত-সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব আর অন্যান্য আত্মাদের সঙ্গ ত্যাগ
করে ‘শূন্যলোকে’ আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি মনে করেন ওসব তাঁর মোক্ষলাভের
পথে অন্তরায়। সেখানে তিনি মহান প্যাগোডার অনন্ত মহিমা ধ্যানে মগ্ন থাকেন, আর নিজের শরীর চিমটি কেটে,
খামচে, খোঁচা মেরে ক্ষতবিক্ষত করেন—এভাবেই তিনি
নিজেকে ক্রমশ উন্মাদ করে তোলেন এবং অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন।
তিনি একটা খড়ের চাটাইয়ে পড়ে
থাকেন, গায়ে চটের
বস্তা, কোমরে দড়ি বাঁধা, হাত
দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি রাখা, আর মাথাটা ডোবানো থাকে এক
ধরনের ঢিলে টুপি বা ঘোমটার ভেতর—যার বাইরে শুধু দাড়ির ডগাটা বেরিয়ে থাকে।
তিনি ঘুমান, কিন্তু
তাঁকে দেখে মনে হয় যেন গভীর ধ্যানে মগ্ন। তাঁর সঙ্গী বলতে—পায়ের কাছে
মাথা ঝুলিয়ে বসে থাকা একটা প্যাঁচা,
চাটাই কুরে খাওয়া কিছু ইঁদুর, আর মাথার
চারপাশে চক্কর খাওয়া একঝাঁক বাদুড়।
তাঁকে ডাকার নিয়মটি বেশ
বিচিত্র—ঘণ্টাধনির তালে তালে ব্রাহ্মণদের সান্ধ্যকালীন স্তোত্রের প্রথম শ্লোকটি
আবৃত্তি করতে হয়। ওমনি তিনি মুখের ঘোমটা সরান, চোখ ডলেন, পায়ে চটি
গলান এবং রওনা দেন। দৃশ্যটা কল্পনা করুন—একজন বয়স্ক কামালডোলীয় সন্ন্যাসী, যাঁকে দুটো বিশাল শিংওয়ালা
প্যাঁচা শূন্যে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, আর তিনি তাদের পা আঁকড়ে
ঝুলে আছেন।
এই কিম্ভূতকিমাকার ভঙ্গিতেই
কুকুফা সুলতানের সামনে এসে হাজির হলেন।
“এই প্রাসাদে ব্রহ্মার
আশীর্বাদ বর্ষিত হোক,” বলে তিনি মাথা নোয়ালেন।
“আমীন,”
রাজপুত্র উত্তর দিলেন।
“কী চাও, বাছা আমার?”
“খুবই তুচ্ছ একটা ব্যাপার,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “দরবারের নারীদের খরচে আমি একটু আমোদ-প্রমোদ চাই।”
“হায় খোদা! বাছা আমার!” কুকুফা আক্ষেপ
করে বললেন, “তোমার রুচি তো দেখছি আস্ত একটা
ব্রাহ্মণ মঠের সমান। এই উন্মাদিনীদের দল দিয়ে তুমি কী করতে চাও?”
“আমি শুধু তাদের নিজেদের
মুখে তাদের অতীত আর বর্তমান প্রেমের গল্প শুনতে চাই। ব্যাস, এটুকুই।”
“সে তো অসম্ভব,”
জিনিয়াস বললেন। “মেয়েরা নিজ মুখে তাদের প্রেমের কথা স্বীকার
করেছে—এমন
তো আজতক হয়নি, হবেও
না।”
“তবুও, সেটাই হতে হবে,” সুলতান জোর দিয়ে বললেন।
এই কথায় জিনিয়াস কানে হাত
দিলেন, দাড়ি
চুলকালেন এবং গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। অবশ্য তাঁর ধ্যান বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
“বাছা,”
তিনি মাঙ্গোগুলকে বললেন, “আমি তোমাকে স্নেহ করি, তাই তোমাকে আমি তুষ্ট করব।”
ওমনি তিনি তাঁর বাম বগলের
নিচে আলখাল্লার ভেতরে থাকা এক গভীর পকেটে ডান হাত ঢোকালেন। কী নেই সেখানে! কতগুলো
ছবি, মাদুলি,
সিসার তৈরি ছোট প্যাগোডা, আর পচা-বাসি
মিঠাইয়ের স্তূপের ভেতর থেকে তিনি একটা রুপোর আংটি বের করলেন। মাঙ্গোগুল প্রথমে
ভাবলেন এটা হয়তো সেন্ট হ্যুবার্টের কোনো তাবিজ।
“এই আংটিটা দেখো,”
তিনি সুলতানকে বললেন, “বাছা,
এটা আঙুলে পরো। এরপর যখনই কোনো নারীর দিকে এই আংটির পাথরটা তাক
করবে, সে তার সমস্ত গোপন সম্পর্কের ইতিবৃত্ত পরিষ্কার
গলায় গড়গড় করে বলে দেবে। তবে ভেবো না যে, সে তার মুখ
দিয়ে কথা বলবে।”
“তাহলে কী দিয়ে বলবে?”
মাঙ্গোগুল অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।
“তাদের শরীরের সেই সবচাইতে
অকপট অংশটি দিয়ে, যেটি এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো খবর রাখে—অর্থাৎ তাদের ‘গোপন রত্ন’ (Jewels) দিয়ে।”
“তাদের রত্ন!” মাঙ্গোগুল
বিস্ময়ে হেসে উঠলেন, “এ তো রীতিমতো আজব কাণ্ড! গহনা কথা
বলবে! এমন কথা তো বাপের জন্মেও শুনিনি।”
“বাছা আমার,”
জিনিয়াস বললেন, “তোমার দাদার জন্য আমি এর চেয়েও বড় ভেলকি
দেখিয়েছি—তাই আমার কথায় ভরসা রাখো। যাও,
ব্রহ্মার আশীর্বাদ থাকুক তোমার ওপর। এই গোপন ক্ষমতার সদ্ব্যবহার
করো এবং মনে রেখো, কৌতূহল যদি ভুল জায়গায় প্রয়োগ করো,
তবে বিপদ অনিবার্য।”
এই বলে, বৃদ্ধ ভণ্ড মাথা নাড়লেন,
ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকলেন, প্যাঁচাগুলোর পা
ধরলেন আর হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।
পঞ্চম
অধ্যায়: মাঙ্গোগুলের বিপজ্জনক প্রলোভন
কুকুফার সেই রহস্যময় আংটি
হস্তগত হওয়া মাত্রই মাঙ্গোগুল তাঁর প্রিয়তমার ওপর এর প্রথম পরীক্ষাটি চালানোর
প্রলোভন সংবরণ করতে পারলেন না।
এখানে পাঠকদের উদ্দেশ্যে
একটি জরুরি তথ্য জানিয়ে রাখা প্রয়োজন—যা আমি আগে উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম।
এই আংটির আরও একটি বিশেষ গুণ ছিল। হাতের কড়ে আঙুলে আংটিটি পরিধান করলেই এর অধিকারী
অদৃশ্য হয়ে যান। এই জাদুবলে মাঙ্গোগুল চোখের পলকে এমন সব জায়গায় পৌঁছে যেতেন, যেখানে কাকপক্ষীও তাঁর
উপস্থিতি টের পেত না; এবং তিনি নিজ চোখে এমন অনেক
কাণ্ডকারখানা দেখার সুযোগ পেতেন, যা সাধারণত সাক্ষীর
অভাবেই ঘটে থাকে। তিনি কেবল আংটিটি আঙুলে গলাতেন আর মনে মনে বলতেন, “আমি অমুক জায়গায় থাকতে চাই,”
আর তৎক্ষণাৎ তিনি সেখানে পৌঁছে যেতেন।
মুহূর্তের মধ্যে তিনি
মির্জোজার শয়নকক্ষে আবির্ভূত হলেন।
মির্জোজা ততক্ষণে সুলতানের
আগমনের আশা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছেন। মাঙ্গোগুল ধীর পায়ে তাঁর শিয়রের
কাছে এগিয়ে গেলেন, এবং রাতের স্নিগ্ধ আলোয় দেখলেন, প্রিয়তমা গভীর
ঘুমে আচ্ছন্ন।
“চমৎকার!” তিনি ভাবলেন, “সে ঘুমাচ্ছে। এই তো সুযোগ! চট করে আংটিটা অন্য আঙুলে ঘুরিয়ে
স্বাভাবিক মূর্তিতে ফিরে আসি, তারপর এই ঘুমন্ত সুন্দরীর দিকে পাথরটা তাক করি—ওর ‘গোপন রত্ন’টাকে একটু জাগিয়ে
দিই।... কিন্তু একি! আমি থামলাম কেন?
আমার হাত কাঁপছে কেন? মির্জোজা—সে কি তবে...? না, না, এ হতেই পারে না, মির্জোজা
তো আমার প্রতি বিশ্বস্ত। দূর হ, পাপিষ্ঠ সন্দেহ! আমি তোকে
পাত্তাই দেব না।”
এ কথা বলে আঙুল বাড়িয়ে
আংটিটা ঘোরাতে গিয়েও তিনি এমনভাবে হাত সরিয়ে নিলেন যেন জ্বলন্ত আগুনের শিখা ছুঁয়ে
ফেলেছেন। তিনি মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলেন:
“হায় কপাল! আমি এ কী করতে
যাচ্ছিলাম! কুকুফার উপদেশ আমি এমনভাবে অমান্য করছিলাম? এই সামান্য কৌতূহল মেটাতে
গিয়ে আমি তো আমার প্রেমিকা আর নিজের জীবন—দুটোই খোয়াতে বসেছিলাম। যদি অবিবেচকের
মতো ওর ‘রত্ন’ আজেবাজে কিছু বলে ফেলে, তাহলে আমি হয়তো তাকে আর
কোনোদিন মুখ দেখাতে পারব না—আর মনের দুঃখে মরে যাব। তাছাড়া কে জানে, একটা ‘গোপন রত্ন’-এর পেটে কী
কী গোপন কথা জমা থাকতে পারে!”
মাঙ্গোগুল নিজের মনে বিবাদ
করতে করতে উত্তেজনার বশে শেষ বাক্যটি বেশ জোরেই বলে ফেললেন, আর তাতেই মির্জোজার ঘুম ভেঙে
গেল।
“আহ, প্রিয় রাজপুত্র,” তিনি বললেন, বিস্ময়ের চেয়েও বেশি মুগ্ধতা নিয়ে, “আপনি এখানে? আসার আগে একটা খবরও কি দেওয়া যেত না? আমার ঘুম ভাঙা পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হলো?”
মাঙ্গোগুল মুচকি হেসে
কুকুফার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আংটির রহস্য সবিস্তারে বর্ণনা করলেন; কিছুই গোপন রাখলেন না।
“সর্বনাশ! কী ভয়ানক এক
উপহার আপনাকে গছিয়ে দেওয়া হয়েছে!” আঁতকে উঠলেন মির্জোজা। “কিন্তু সত্যি
করে বলুন তো, প্রিয়
রাজপুত্র, আপনি কি আদৌ এর ব্যবহার করতে চান?”
“কী?”
সুলতান বললেন, “আমি ব্যবহার করতে চাই কি না? শোনো, তুমি যদি বেশি তর্ক করো, তবে তোমার ওপর দিয়েই
এর শুভ মহরত করব।”
এই ভীতিকর কথা শুনে
মির্জোজার মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল, ভয়ে তিনি কাঁপতে লাগলেন, কিন্তু দ্রুত নিজেকে
সামলে নিলেন। তিনি ব্রহ্মা এবং ভারত ও কঙ্গোর তাবৎ প্যাগোডার দোহাই দিয়ে মিনতি
জানালেন, যেন সুলতান তাঁর ওপর এই গোপন ক্ষমতার পরীক্ষা না
করেন—কারণ এতে তাঁর সততার ওপর অবিশ্বাস প্রকাশ পায়।
“যদি আমি সত্যিই সতী হই,”
তিনি বললেন, “তবে আমার ‘রত্ন’ নিশ্চুপ থাকবে—কিন্তু আমার
সততা নিয়ে আপনি যে সন্দেহ প্রকাশ করলেন,
সেই অবিচার আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। আর যদি সে কিছু বলেই ফেলে,
তাহলে আপনি আমাকে ঘৃণা করবেন, হারাবেন,
আর নিজে উন্মাদ হয়ে যাবেন। এখন পর্যন্ত, আমার বিশ্বাস, আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আপনি সুখী।
তাহলে কেন এই সুখের সংসার ভাঙার ঝুঁকি নেবেন? প্রিয়
রাজপুত্র, আমার কথা শুনুন। জিনিয়াস কুকুফার উপদেশ মেনে
চলুন। ওঁর বয়স হয়েছে, অভিজ্ঞতাও অনেক, আর জিনিয়াসদের উপদেশ সবসময়ই ফেলনা নয়।”
“তুমি যখন ঘুমাচ্ছিলে, ঠিক এই কথাগুলোই আমি নিজেকে
বোঝাচ্ছিলাম,” উত্তর দিলেন মাঙ্গোগুল। “তবুও, তুমি যদি আর দু’মিনিট মড়ার মতো ঘুমাতে, তবে কী যে হয়ে যেত, আমি জানি না।”
“তাহলে যা হতো,”
মির্জোজা বললেন, “তা হলো,
আমার ‘রত্ন’ মুখে কুলুপ এঁটে থাকত, আর আপনি আমাকে চিরতরে
হারাতেন।”
“হয়তো তাই,”
মাঙ্গোগুল মেনে নিলেন, “কিন্তু এখন যখন আমি বিপদের গভীরতা আঁচ করতে
পেরেছি, আমি
তোমার কাছে কসম করছি—এই আংটি আমি কখনোই তোমার ওপর প্রয়োগ করব না।”
এই কথায় মির্জোজার মুখে
হাসি ফুটল। ভয় কেটে যাওয়ায় তিনি হাসতে হাসতে ভবিষ্যতের ওইসব ‘রত্ন’ নিয়ে ঠাট্টা
শুরু করলেন, যাদের
সুলতান জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।
“সিডালিসার ‘রত্ন’-এর পেটে নিশ্চয়ই
অনেক গল্প আছে... আর সেটা যদি তার মালকিনের মতোই বাচাল হয়, তবে বেশি খুঁচিয়ে কথা বের
করতে হবে না। হারিয়ার ‘রত্ন’ তো সেকেলে হয়ে গেছে—তার কাছ থেকে
মহামান্য যে গল্প পাবেন, তা হয়তো আমার দাদির আমলের। আর গ্লাউসের ‘রত্ন’? সেটাকে
বেশ কাজের মনে হয়—মেয়েটা তো সুন্দরি আর বেশ ঢং জানে।”
“ঠিক সেই কারণেই,”
সুলতান বললেন, “তার রত্নটি চুপ থাকবে।”
“তাহলে ফেদিমার কাছে যান,”
মির্জোজা বললেন, “সে দেখতে কুৎসিত, কিন্তু রোমান্স খুব পছন্দ করে।”
“হ্যাঁ,”
সুলতান বললেন, “আর এতটাই কুৎসিত যে, তুমি ছাড়া কেউই তার রোমান্সে
বিশ্বাস করবে না। ফেদিমা সৎ—এটা আমি জোর দিয়েই বলতে পারি, কারণ আমি জানি।”
“আপনার জানা ফেদিমা যতই সৎ
হোক, তার চোখে
একটা ধূসর ছায়া আছে, যা অন্য কথা বলে।”
“তার চোখ ভুল বলছে,”
সুলতান ধমক দিলেন, “ফেদিমার নিন্দা করে তুমি আমার ধৈর্যচ্যুতি
ঘটাচ্ছ। যেন তাকে ছাড়া আর কোনো রত্ন নেই কথা বলার মতো!”
“তাহলে যদি অনুমতি দেন,”
মির্জোজা বললেন, “জানতে পারি কি—আপনি প্রথমে কাকে বেছে নেবেন?”
“যাই হোক, চলো দেখা যাক,” মাঙ্গোগুল বললেন, “মানিমনবান্দার সভায়—মানে, মহান সুলতানার দরবারে আজ
থেকে অভিযান শুরু হবে। সেখানে কাজের অভাব হবে না। আর যদি একসময় আমার দরবারের
রত্নগুলো একঘেয়ে হয়ে যায়, তখন নাহয় বানজা শহরের দিকে একটা
সফর দেওয়া যাবে। আমার ধারণা, ডাচেসদের চেয়ে শহরের সাধারণ
মেয়েদের রত্নগুলো অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত কথা বলবে।”
“রাজপুত্র,”
মির্জোজা বললেন, “তাদের কয়েকজনকে আমি চিনি, বলতে পারি—তারা শুধু একটু
বেশি সতর্ক, এই
যা।”
“খুব শীঘ্রই তাদের মুখ
থেকেও সব শুনব,” মাঙ্গোগুল বললেন, “কিন্তু আমি হাসি চাপতে পারছি না, যখন ভাবছি—এই নারীরা কী
ভীষণ অপ্রস্তুত হবে, যখন তাদের ‘গোপন রত্ন’ সবার সামনে মুখ খুলবে! হা হা হা!
মনে রেখো, আমার
হৃদয়ের আনন্দ, আমি মানিমনবান্দার দরবারে তোমার জন্য
অপেক্ষা করব, এবং তুমি না আসা পর্যন্ত আমি আংটি ব্যবহার
করব না।”
“রাজপুত্র,”
মির্জোজা বললেন, “আপনার দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আমি ভরসা রাখলাম।”
মির্জোজার উদ্বেগ দেখে
মাঙ্গোগুল হাসলেন, তাঁর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেন, একটি
দীর্ঘ চুম্বনে তা সিলমোহর করলেন এবং বিদায় নিলেন।
ষষ্ঠ
অধ্যায়: আংটির প্রথম ব্যবহার—আলসিনা
মির্জোজার আগেই মাঙ্গোগুল
মহান সুলতানা মানিমনবান্দার দরবারে পৌঁছে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, মহিলারা তাস খেলায় মগ্ন।
তিনি উপস্থিত রমণীদের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন—যাঁদের সুনাম ও দুর্নাম দুটোই সুপ্রতিষ্ঠিত—এবং মনস্থির
করলেন যে আজ তাঁদের কাউকেই আংটির প্রথম শিকার বানাবেন। সমস্যা একটাই—শুভ সূচনাটা
কাকে দিয়ে করবেন?
ঠিক তখনই জানালার ধারে
মানিমনবান্দার গৃহের এক তরুণীকে তাঁর চোখে পড়ল। মেয়েটি তার স্বামীর সঙ্গে বেশ গদগদ
হয়ে আলাপ করছিল। দৃশ্যটি সুলতানের কাছে যারপরনাই আশ্চর্যজনক মনে হলো; কারণ, এই দম্পতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে আজ আট দিন হলো। এর মধ্যেই তারা
একসঙ্গে অপেরার একই বক্সে বসেছে, একই গাড়িতে চড়ে বোলোনিয়া
অরণ্যে হাওয়া খেতে গিয়েছে এবং যাবতীয় সামাজিকতা শেষ করেছে। সেই সময়ের প্রথা
অনুযায়ী, এতদিনে একে অপরকে ভালোবাসা তো দূরের কথা—মুখ দেখাদেখি
বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।
“যদি এই ‘গোপন রত্ন’টিও তার মালকিনের
মতোই বোকা হয়,” মাঙ্গোগুল বিড়বিড় করলেন,
“তবে আজ দারুণ এক
প্রলাপ শোনা যাবে।”
ঠিক এই সময়ে মির্জোজা এসে
হাজির।
“স্বাগতম,”
ফিসফিস করে বললেন সুলতান, “তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতেই আমি শিকার ঠিক
করে ফেলেছি।”
“কার দিকে আপনার নজর?”
জানতে চাইলেন মির্জোজা।
“ওই যে জানালার ধারে
নবদম্পতি খুনসুটিতে ব্যস্ত, তাদের দিকে,” চট করে চোখ টিপে ইশারা করলেন সুলতান।
“চমৎকার শুরু,”
হেসে উত্তর দিলেন প্রিয়তমা।
তরুণীটির নাম আলসিনা—স্বভাবে চনমনে
আর দেখতেও ভারি মিষ্টি। সুলতানের দরবারে তার চেয়ে মনোমুগ্ধকর নারী খুব কমই ছিল, আর হাস্যরসের দিক থেকে তো
একটিও নয়। এক আমির তাঁর মস্তিষ্কে আলসিনার ছবি গেঁথে ফেলেছিলেন। আলসিনার চরিত্র
নিয়ে বাজারে যেসব গুঞ্জন চালু ছিল, সেসব ওই আমিরের কানেও
তোলা হয়েছিল। শুনে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, তবে
ভদ্রতার খাতিরে সোজাসুজি আলসিনাকেই জিজ্ঞেস করে বসেন।
আলসিনা দিব্যি কেটে বলেছিল, ওসব নিছকই অপবাদ। ওইসব
উঁচু-নাকওয়ালা ভদ্রলোকরা যদি সত্যিই কিছু জানত, তবে কি আর
চুপ করে থাকত? তবে লোকে যা খুশি বলুক, তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না; আমির চাইলে
বিশ্বাস করতেই পারেন, নাও পারেন।
এই আত্মবিশ্বাসপূর্ণ
উত্তরের জোরে সেই প্রেমিক আমির প্রেয়সীর নিষ্কলুষ চরিত্রের ব্যাপারে পুরোপুরি
নিশ্চিত হলেন। তিনিও সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আলসিনার ‘স্বামী’র অলিখিত পদটি দখল করলেন—দাম্পত্যের
সকল সুযোগ-সুবিধাসমেত।
সুলতান এবার আংটিটি তার
দিকে তাক করলেন।
স্বামীর কোনো এক রসিকতায়
আলসিনা সশব্দে হেসে উঠেছিল, কিন্তু আংটির জাদুবলে সেই হাসি হঠাত করেই থেমে গেল। আর ঠিক তখনই তার
পেটিকোটের নিচ থেকে একটা গুনগুন শব্দ ভেসে এলো।
“যাক বাবা, অবশেষে স্বীকৃতি মিলল! সত্যি
বলতে বেশ খুশিই লাগছে। একটা পোক্ত পদমর্যাদা থাকলে মন্দ লাগে না। অবশ্য আমি প্রথমে
যেসব পরামর্শ দিয়েছিলাম, সেগুলো কেউ কানে তুললে আজ আমিরের
চেয়েও ভালো কিছু জুটত—তবুও একেবারে খালি হাতে থাকার চেয়ে একটা আমির
জুটিয়ে নেওয়া ঢের ভালো।”
এই কথা কানে আসামাত্রই সব
মহিলা হাতের তাস ফেলে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন—কোত্থেকে এই কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে! মুহূর্তের
মধ্যে হলঘরে হুলস্থুল পড়ে গেল।
“চুপ!” ধমক দিলেন
মাঙ্গোগুল, “এটা মন দিয়ে শোনার মতো বিষয়।”
সবাই শান্ত হলো, আর সেই ‘গোপন রত্ন’ বলতে থাকল:
“স্বামীর জন্য যেভাবে
নিজেকে প্রস্তুত করা হয়, তাতে মনে হয় তিনি বুঝি ভিনদেশি কোনো রাজদূত! উফ, কী তার আয়োজন! কী ধূপধুনোর গন্ধ! আর এক সপ্তাহ এমন চললে আমার অস্তিত্বই
লোপ পেত। আমি হয়তো উবে যেতাম, আর তখন আমিরকে বাধ্য হয়ে
অন্য কোথাও আশ্রয় খুঁজতে হতো, কিংবা আমাকে পাঠিয়ে দিত সেই
জঁকুইলের দ্বীপে।”
আমার সূত্র অনুযায়ী, এই কথা শুনে উপস্থিত সব নারী
ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল
আর গভীর নীরবতায় ডুবে গেল—কারণ সবার মনেই ভয়ঁ ঢুকল, এই কথোপকথন যদি আরও উত্তপ্ত
হয়ে ওঠে, তবে তা ‘মহামারী’র মতো সবার ওপর ছড়িয়ে পড়তে পারে।
“তবুও,”
রত্নটি বলে চলল, “আমার মতে আমিরের জন্য এত আয়োজনের কোনো দরকার ছিল
না। তবে আমার প্রভুর বিচক্ষণতা আমি মানি—সে সবসময় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য
প্রস্তুত ছিল। একদিকে রাজপুরুষের মতো নিজের যত্ন নিয়েছে, আবার ছোটখাটো পাত্রকেও কখনো
অবহেলা করেনি।”
রত্নটি হয়তো আরও অনেক গোপন
কথা ফাঁস করে দিত, কিন্তু মাঙ্গোগুল লক্ষ্য করলেন, এই দৃশ্য মহান
সুলতানা মানিমনবান্দার রুচিতে বাধছে। তাই তিনি আংটির ক্ষমতা বন্ধ করলেন।
আর সেই হতভাগা আমির? রত্নটির মুখের প্রথম বাক্যটি
শোনামাত্রই তিনি দৌড়ে পালিয়েছেন।
আলসিনা কিন্তু বিন্দুমাত্র
অপ্রস্তুত না হয়ে নির্লিপ্তভাবে ঘুমের ভান করে পড়ে রইলেন।
এদিকে অন্য মহিলারা নিজেদের
মধ্যে ফিসফিস করে বলাবলি করতে লাগল যে,
বেচারির নিশ্চয়ই ‘ভ্যাপার্স’ (Vapors বা মূর্ছা রোগ) হয়েছে।
“ঠিক তাই,”
ফোড়ন কাটলেন এক কেতাদুরস্ত শৌখিন বাবু (Petit-maître), “একেবারে ভ্যাপার্স... ওই যে ডাক্তার
চি——
যাকে বলেন ‘হিস্টেরিক্স’, অর্থাৎ কিনা শরীরের নিম্নদেশ
থেকে উঠে আসা একপ্রকার বাষ্পীয় গোলযোগ। এর জন্য তাঁর কাছে এক ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত
আরক’
বা এলিক্সার আছে—যেটা নাকি একাধারে ‘প্রিন্সিপল, প্রিন্সিপিয়েটিং এবং
প্রিন্সিপিয়েটেড’—যা নিমেষেই পুনরুজ্জীবিত করে... যা...”
“আমি বরং ভদ্রমহিলাকে ওটাই
নেওয়ার পরামর্শ দেব,” পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলেন।
ডাক্তারি বিদ্যার এই
জগাখিচুড়ি ব্যাখ্যা শুনে সবাই হেসে উঠল। সেই শৌখিন বাবুটি তখন আবার গলা চড়িয়ে
বললেন—
“ভদ্রমহিলাগণ, আমি একদম খাঁটি সত্য বলছি।
আমি নিজেও এই ওষুধ একবার ব্যবহার করেছিলাম, যখন আমার ‘দৈহিক ক্ষয়’ দেখা দিয়েছিল।”
“‘দৈহিক ক্ষয়’ মানে কী, মার্কুইস?” এক তরুণী সরল মনে প্রশ্ন করে
বসল।
“ম্যাডাম,”
মার্কুইস উত্তর দিলেন, “ওটা এমন এক ধরনের আকস্মিক দুর্ঘটনা, যা... থাক গে, ওটা কী জিনিস তা সবাই জানে।”
ততক্ষণে আলসিনার ঘুমের ভান
শেষ হলো। তিনি তাস খেলায় ফিরে এলেন এমন অসীম সাহসিকতার সঙ্গে, যেন তাঁর ‘গোপন রত্ন’টি টুঁ শব্দটিও
করেনি, অথবা যা
বলেছে তা বুঝি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ ছিল। বস্তুত, গোটা
আসরে একমাত্র তিনিই পূর্ণ মনোযোগ ধরে রেখে খেলতে লাগলেন। এবং বলাই বাহুল্য,
সেই দানে তাঁর প্রচুর লাভ হলো।
অন্যদিকে বাকি মহিলারা যেন
খেই হারিয়ে ফেললেন। তাঁরা কার্ডের ফোঁটা গুনতে ভুল করলেন, হিসাব গুলিয়ে ফেললেন,
হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেললেন, ভুল করে তাস
বিলি করলেন এবং আরও শত রকম ভুল করলেন—যার প্রতিটি সুযোগ আলসিনা লুফে
নিলেন।
অবশেষে একসময় খেলা সাঙ্গ
হলো এবং সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।
এই ঘটনা শুধু রাজদরবার বা
শহরেই নয়—সমগ্র কঙ্গো জুড়ে তোলপাড় ফেলে দিল। এ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচিত হলো, গান বাঁধা হলো। আলসিনার সেই ‘গোপন রত্ন’-এর বক্তৃতা
ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হলো; শুধু তাই নয়, দরবারের রসিকজনেরা তা সম্পাদনা ও
পরিবর্ধন করে বিচার-বিশ্লেষণসহ প্রচার করতে লাগলেন। বেচারা আমিরের কপাল পুড়ল,
তাঁকে নিয়ে হাসাহাসির অন্ত রইল না; কিন্তু
তাঁর স্ত্রী রাতারাতি অমর হয়ে গেলেন।
থিয়েটারে গেলেই লোকে তাঁর
দিকে আঙুল তুলে দেখাত, রাস্তায় বেরোলে তাঁকে অনুসরণ করা হতো। লোকে ভিড় করে বলাবলি করত,
“হ্যাঁ, ওই তো সেই মেয়ে—যার ‘রত্ন’ দু’ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা
দিয়েছিল!”
আলসিনা তাঁর এই নতুন
কুখ্যাতি অসাধারণ ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করলেন। তিনি এসব কথা, এবং এর চেয়েও জঘন্য অনেক কথা
এমন শান্তভাবে হজম করলেন, যা অন্য কোনো নারীর পক্ষে সম্ভব
ছিল না। কারণ অন্য নারীরা তো প্রতি মুহূর্তে ভয়ে সিঁটিয়ে ছিলেন—এই বুঝি তাঁদের
‘রত্ন’-এর মুখ ফসকে
কিছু বেরিয়ে যায়!
তবে ঠিক পরবর্তী অধ্যায়ের
ঘটনাই তাঁদের সেই ভয়কে বাস্তবে রূপ দিল।
দরবার ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই, মাঙ্গোগুল মির্জোজার হাত ধরে
তাঁকে তাঁর কক্ষে পৌঁছে দিলেন। কিন্তু প্রিয়তমার সেই চিরচেনা উচ্ছলতা যেন কোথায়
হারিয়ে গেছে। তাস খেলার সময় তিনি বেশ কিছু টাকা হেরেছেন, আর
তার ওপর সেই ভয়ংকর আংটির প্রতিক্রিয়া তাঁকে এমন এক দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে,
যা থেকে তিনি এখনও বেরোতে পারছেন না।
তিনি সুলতানের কৌতূহল
সম্পর্কে ভালোভাবেই জানতেন। আর যে পুরুষ প্রেমিকের চেয়ে শাসক হিসেবে বেশি দাপুটে, তাঁর প্রতিশ্রুতির ওপর খুব
একটা আস্থা রাখা কঠিন—তাই মির্জোজার উদ্বেগ আর কাটছিল না।
“কী হলো, আমার প্রাণের প্রিয়া?” মাঙ্গোগুল জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমাকে বড় চিন্তিত
দেখাচ্ছে।”
“আজ খেলায় ভাগ্য একদম সহায়
ছিল না,” উত্তর দিলেন মির্জোজা। “যতটা হারা সম্ভব, সব হেরেছি। বারো বার তাস
সাজালাম, অথচ তিনবারও দান জিততে পারিনি।”
“বড়ই দুঃখজনক,”
বললেন মাঙ্গোগুল। “কিন্তু আমার এই গোপন রহস্যটা নিয়ে তোমার
কী মত?”
“রাজপুত্র,”
বললেন প্রিয়তমা, “আমি এখনও ওটাকে পৈশাচিক বলেই মনে করি।
নিঃসন্দেহে এটা আপনাকে আনন্দ দেবে,
কিন্তু সেই আনন্দের শেষটা হবে ভয়ংকর। আপনি ঘরে ঘরে বিবাদের বীজ
বুনবেন, স্বামীদের ভুল ভাঙাবেন, প্রেমিকদের
হতাশায় ডোবাবেন, স্ত্রীদের সর্বনাশ করবেন, কন্যাদের অসম্মান করবেন এবং আরও হাজারটা ঝামেলা পাকাবেন। আহ! রাজপুত্র,
আমি মিনতি করছি…”
“আহা, তুমি তো দেখছি সেই নিকোলের
মতো নীতিবাক্য ঝাড়তে শুরু করলে!” হেসে উড়িয়ে দিলেন মাঙ্গোগুল। “জানতে পারি
কি, প্রতিবেশীদের
ওপর তোমার এত দরদ হঠাৎ উথলে উঠল কেন? না না, প্রিয়তমা; আংটি আমি রাখছিই। আর স্বামীদের
স্বপ্নভঙ্গ, প্রেমিকদের হতাশা, স্ত্রীদের
অপমান, কন্যাদের দুর্দশা—এসব নিয়ে আমার কী? আমি তো সুলতান! সুলতান হয়েছি
কি শুধু নামেই, নাকি একটু আধটু মজা করার অধিকারও আমার আছে?”
মির্জোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বললেন, “শুভরাত্রি,
রাজপুত্র। আশা করি, ভবিষ্যতের দৃশ্যগুলো
আরও বেশি হাস্যকর হবে, এবং আপনি সেগুলোতে ধীরে ধীরে আনন্দ
খুঁজে পাবেন।”
“আমি তা বিশ্বাস করি না,”
বললেন মাঙ্গোগুল। “তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তুমি অচিরেই এমন সব ‘রত্ন’ খুঁজে পাবে, যাদের গল্প শুনতে তুমি বাধ্য
হবে। যদি তুমি চাও, তবে তাদের বক্তৃতা না শুনিয়ে আমি
নিজেই তোমাকে সব বলব। কিন্তু তাদের গল্প—তা তুমি শুনবেই—সে তাদের মুখ
থেকে হোক, কিংবা
আমার মুখ থেকে। এটা আমার স্থির সিদ্ধান্ত, এর নড়চড় হবে
না। তাই প্রস্তুত থেকো, এই নতুন বক্তাদের সঙ্গে পরিচিত
হওয়ার জন্য।”
এই বলে তিনি মির্জোজাকে
আলিঙ্গন করলেন, আর
কুকুফার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাতে জানাতে নিজের কক্ষে চলে গেলেন—মনে মনে তখন
তিনি প্রথম পরীক্ষার সাফল্যের আনন্দে মশগুল।
সপ্তম
অধ্যায়: আংটির দ্বিতীয় প্রয়োগ—বেদি বা উপাসনার স্থল
পরদিন সন্ধ্যায় মির্জোজার
খাস কামরায় এক নৈশভোজের আয়োজন করা হলো। আমন্ত্রিতরা সময়ের আগেই এসে হাজির। কিন্তু
আগের দিনের সেই অদ্ভুত ঘটনার পর থেকে সবার মনে যে আতঙ্ক ঢুকেছে, তাতে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের
বদলে সবার চোখেমুখে ছিল শুধুই লৌকিক ভদ্রতা।
মহিলাদের মুখে যেন অদৃশ্য
কুলুপ আঁটা, তারা
এককথায় উত্তর দিচ্ছিল আর দৃষ্টি ছিল উদাস। তারা সারাক্ষণ তটস্থ, এই বুঝি তাদের ‘গোপন রত্ন’ আলাপে যোগ দিয়ে বসে! আলসিনার সেই কেলেঙ্কারির
কথা পাড়তে সবার জিব নিশপিশ করছিল, কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? কেউ
সাহস করে প্রসঙ্গটা তুলতেই পারছিল না।
এই অস্বস্তির কারণ অবশ্য
আলসিনার উপস্থিতি ছিল না—তিনি আমন্ত্রিতদের তালিকায় থাকলেও আসেননি; রটেছে যে তাঁর নাকি ভীষণ
মাথা ঘুরছে।
তবে সারাদিন তারা শুধু
মানুষের মুখ থেকেই কথা শুনেছে, নিচের অঙ্গ থেকে কোনো আওয়াজ আসেনি—এই ভরসায় ভয় কিছুটা কেটেছিল। কিংবা হয়তো
তারা সাহসী সাজার ভান করছিল বলেই আস্তে আস্তে আলাপ জমতে শুরু করল। যাদের নিয়ে সন্দেহ
সবচেয়ে বেশি, তারাই
মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য এনে মির্জোজার দরবারি জেগ্রিসকে জিজ্ঞেস করলেন, “জেগ্রিস, নতুন কোনো মুখরোচক খবর আছে
নাকি?”
“ম্যাডাম,”
জেগ্রিস বললেন, “আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন আগা চাজুর আর ওই কচি
মেয়ে সিবেরিনার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার খবর?
ওটা ভেঙেছে এক অদ্ভুত কারণে।”
“কেন?”
তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন করলেন মির্জোজা।
“একটি আজব কণ্ঠস্বরের কারণে,”
জেগ্রিস জানালেন, “যেটা চাজুর শুনেছে তার রাজকন্যার সাজঘরে। গতকাল
থেকে সুলতানের দরবারে অনেকে কান খাড়া করে ঘোরাফেরা করছে, এই আশায়—যদি এমন কিছু
শোনা যায়, যা মুখ
দিয়ে বলা বারণ কিন্তু অন্য পথ দিয়ে ঠিকই বেরিয়ে আসে।”
“খুবই বোকামি,”
জবাব দিলেন মির্জোজা। “আলসিনার দুর্ভাগ্য, যদি তা সত্যিও হয়, এখনো প্রমাণিত নয়। আমরা পুরো বিষয়টা জানিই না—”
“ম্যাডাম,”
মাঝপথে বাধা দিলেন জেলমাইডা, “আমি নিজে খুব স্পষ্ট শুনেছি। সে মুখ না খুলেই
কথা বলেছিল। কথাগুলো পরিষ্কার, আর এই অদ্ভুত আওয়াজ কোথা থেকে এসেছে তা আন্দাজ করা খুব একটা কঠিন ছিল
না। আমি নিশ্চিত, আমি তার জায়গায় থাকলে লজ্জায় মরেই
যেতাম।”
“মরে যেতেন!” টিপ্পনী কাটলেন
জেগ্রিস। “মানুষ এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু সহ্য করে দিব্যি বেঁচে থাকে।”
“কীভাবে?”
চেঁচিয়ে উঠলেন জেলমাইডা। “এর চেয়ে ভয়ানক কিছু আর হয়? ‘গোপন রত্নে’র এমন বিশ্বাসঘাতকতা! এখন আর মাঝখানের কোনো পথ খোলা
নেই। হয় রোমান্স ত্যাগ করতে হবে, নতুবা স্বীকার করতে হবে—আমি শুধুই ভোগের নারী।”
“সত্যিই,”
বললেন মির্জোজা, “বেছে নেওয়ার দুটো পথই খুব কঠিন।”
“না না, ম্যাডাম,” আরেকজন মহিলা ফোড়ন কাটলেন,
“আপনারা দেখবেন নারীরা
ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে। তারা তাদের রত্নদের যত খুশি বকবক করতে দেবে, আর নিজেরা যা ইচ্ছে তাই করবে;
সমাজ কী ভাবল, তা নিয়ে মাথা ঘামাবে না।
আর শেষমেশ, রত্ন যদি মুখ ফসকে কিছু বলে, বা প্রেমিক যদি গালগল্প ছড়ায়—তাতে ফারাকটাই বা কী? হাঁড়ির খবর তো দুইভাবেই ফাঁস
হয়।”
“গভীরভাবে ভাবলে,”
আরেকজন দার্শনিক ভঙ্গিতে বললেন, “যদি নারীর প্রেমকাহিনি ফাঁস হতেই হয়, তবে প্রেমিকের মুখে না হয়ে—রত্নের মুখে
হওয়াই ভালো।”
“আজব ভাবনা তো!” বললেন মির্জোজা।
“তবে তা সত্য,”
উত্তর দিলেন সেই মহিলা, “কারণ একজন প্রেমিক যখন মুখ খোলে, তখন সে হয় প্রেমে হতাশ,
নয়তো প্রতিহিংসাপরায়ণ—তাই সে বাড়িয়ে বলে। কিন্তু রত্ন তো আবেগহীন, সে শুধুই সত্য বলে।”
“আমি একমত নই,”
প্রতিবাদ করলেন জেলমাইডা। “এই ক্ষেত্রে অপরাধটা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, প্রমাণটা তার চেয়েও বেশি
শক্তিশালী। প্রেমিক যদি তার ‘উপাসনার বেদি’কে অপমান করে, তবে সে অবিশ্বাসী বা নাস্তিক,
তার কথায় কেউ কান দেয় না। কিন্তু যদি স্বয়ং সেই ‘বেদি’ই কথা বলে ওঠে—তাহলে তার উত্তরে
আর কী বলার থাকে?”
“তাহলে বলব, বেদি জানেই না সে কী বলছে,” মন্তব্য করলেন দ্বিতীয় মহিলা।
এতক্ষণ চুপ করে থাকা মনিমা
এবার ধীর, অলস
সুরে বললেন: “আহ!
আমার বেদি—যদি একে বেদি বলতেই হয়—সে কথা বলুক বা না বলুক, তার মুখ খোলা নিয়ে আমি
বিন্দুমাত্র ভয় পাই না।”
ঠিক তখনই মাঙ্গোগুল কক্ষে
প্রবেশ করলেন, এবং
মনিমার শেষ কথাটি তাঁর কান এড়ালো না। তিনি চট করে তাঁর আংটি মনিমার দিকে তাক করলেন,
আর ওমনি মনিমার ‘গোপন রত্ন’ চিৎকার করে উঠল— “ওর কথা বিশ্বাস কোরো না, ও ডাহা মিথ্যা বলছে!”
সঙ্গে সঙ্গে পাশের সব মহিলা
একে অপরের মুখের দিকে তাকাল—কার রত্ন এই কথা বলল?
“আমার না,”
বললেন জেলমাইডা। “আমারও না,” বললেন আরেকজন। “আমারও না,”
বললেন মনিমা (যদিও তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে)। “আমার তো নয়ই,”
বললেন সুলতান।
সবাই, এমনকি মির্জোজাও, এই অস্বীকারের সুরে সুর মেলালেন। এই ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে সুলতান বললেন:
“তাহলে, আপনাদের সবারই কি এমন ‘বেদি’ আছে? বলুন তো শুনি, কীভাবে সেখানে পূজা হয়?”
এই বলেই, তিনি বিদ্যুৎগতিতে তাঁর আংটি
একে একে উপস্থিত সকল মহিলার দিকে ঘোরালেন—শুধু মির্জোজা বাদ রইলেন। তখন প্রত্যেকের
‘গোপন
রত্ন’
তাদের নিজ নিজ কণ্ঠে সমস্বরে বলতে লাগল:
“আমি নিত্য
সেবিতা,” “আমি জরাজীর্ণ,”
“আমি পরিত্যক্ত,”
“আমি সুবাসিত,”
“আমি পরিশ্রান্ত,”
“আমি অবহেলিত,”
“আমার গা ঘিনঘিন
করছে”...
সবাই একবার করে বলল, তবে এত দ্রুত এবং একসাথে যে,
কার রত্ন কী বলছে তা আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ল। এই তীব্র কোলাহল—কখনো গুনগুনানি, কখনো কুকুরের মতো ঘেউঘেউ—আর তার সঙ্গে
মাঙ্গোগুল ও তাঁর সভাসদদের অট্টহাসি মিলেমিশে এক অদ্ভুত শব্দব্রহ্ম তৈরি হলো।
সব মহিলাই গম্ভীর মুখে একমত
হলেন—ব্যাপারটা
সত্যিই বড়ই বিনোদনমূলক।
“কী কাণ্ড!” হাসতে হাসতে
বললেন সুলতান, “সত্যিই আমরা সৌভাগ্যবান যে, এইসব ‘গোপন রত্ন’ আমাদের ভাষা
শিখেছে এবং আমাদের কথোপকথনের অর্ধেক বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সামাজিক জীবনে
কথা বলার অঙ্গ দ্বিগুণ হওয়া মানেই তো লাভ! হতে পারে একদিন আমরা পুরুষরাও মুখ ছাড়াও
অন্য কিছু দিয়ে কথা বলব। কে জানে? যেটা রত্নদের সঙ্গে এত সুন্দরভাবে খাপ খায়, হয়তো
সেটিই একদিন আমাদের প্রশ্নোত্তরের যন্ত্র হয়ে উঠবে! তবে, আমার
অ্যানাটমি বা শরীরবিদ্যার ডাক্তার কিন্তু এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন।”
অষ্টম
অধ্যায়: আংটির তৃতীয় প্রয়োগ—গোপন নৈশভোজ
নৈশভোজ পরিবেশন করা হলো, সবাই গোল হয়ে টেবিলে বসল।
প্রথমেই তারা মনিমাকে নিয়ে একটু ঠাট্টা-তামাশা শুরু করল। সব মহিলাই একজোট হয়ে রায়
দিল যে, তার ‘গোপন রত্ন’ই সবার আগে মুখ খুলেছিল। সবার এমন
সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বেচারি হয়তো ভেঙে পড়ত,
যদি না স্বয়ং সুলতান তাঁর পক্ষ নিতেন।
“আমি এটা দাবি করছি না,”
সুলতান বললেন, “যে মনিমা জেলমাইডার চেয়ে কম রোমান্টিক; কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তার ‘রত্ন’টা একটু বেশিই
বিচক্ষণ। আর যদি কোনো মহিলার মুখ আর তাঁর ‘গোপন রত্ন’ একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলে, তবে আমরা বিশ্বাস করব কাকে?”
“হুজুর,”
এক দরবারি সবিনয়ে বলল, “ভবিষ্যতে এই রত্নরা কী বলবে তা আমি জানি না; তবে এখন পর্যন্ত তারা কেবল
সেসব বিষয়েই কথা বলেছে, যা তাদের নাড়ি-নক্ষত্র জানা।
যতক্ষণ তারা শুধু তাদের পরিচিত গণ্ডির কথা বলবে, ততক্ষণ
আমি তাদের কথাকে অভ্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী বলেই মেনে নেব।”
“তবু,”
মির্জোজা বললেন, “এর চেয়েও নির্ভরযোগ্য উৎস তো আছে।”
“ম্যাডাম,”
উত্তর দিলেন মাঙ্গোগুল, “ওরা সত্য লুকোবে কেন? একমাত্র তথাকথিত ‘সম্মান’ নামক এক কাল্পনিক
জুজু ছাড়া আর কিছুই তো তাদের সত্য বলায় বাধা দিতে পারে না। কিন্তু রত্নরা তো কোনো
ভণ্ডামিতে বিশ্বাস করে না। ওরা সাবলীল,
ওরা আদিম, ওরা প্রাকৃতিক।”
“সম্মান কি শুধুই কল্পনা?”
মির্জোজা প্রতিবাদ করলেন, “শুধুই সংস্কার? যদি আপনি আমাদের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়তেন,
তবে বুঝতেন—যা আমাদের চারিত্রিক পবিত্রতাকে
স্পর্শ করে, তা
মোটেও ‘জুজু’ নয়।”
মির্জোজার এই সাহসী উত্তরে
উপস্থিত সব মহিলা বল পেলেন। তাঁরা একবাক্যে জানিয়ে দিলেন যে, তাঁদের এভাবে ‘পরীক্ষা’ করাটা একেবারেই
অপ্রয়োজনীয় এবং অপমানজনক। উত্তরে মাঙ্গোগুল শুধু বললেন—সত্যের প্রমাণ সাধারণত একটু বিপজ্জনকই
হয়।
এই তর্কাতর্কির মধ্যেই
শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হলো। গ্লাস দ্রুত হাতে ঘুরতে লাগল, আর সেই মদের উত্তাপে গোপন
রত্নরাও যেন ভেতরে ভেতরে তেতে উঠতে লাগল।
ঠিক তখনই মাঙ্গোগুল তাঁর
সেই দুরন্ত খেলা আবার শুরু করলেন। তিনি তাঁর হাতের আংটিটি তাক করলেন এক উচ্ছল
তরুণীর দিকে, যিনি
সুলতানের একেবারে কাছেই বসেছিলেন; আর ঠিক তাঁর উল্টো দিকে
বসেছিল তাঁর স্বামী।
মুহূর্তের মধ্যে টেবিলের
নিচ থেকে এক চাপা আর্তনাদ ভেসে এল—এক দুর্বল, পরিশ্রান্ত কণ্ঠ বলে উঠল: “উফ্, আমি আর নিতে পারছি না! আমি
মরেই যাচ্ছি!”
“হায় খোদা! প্যাগোডা পঙ্গো
সাবিয়াম!” চিৎকার করে উঠল হাসসেইম (তরুণীর স্বামী), “এ তো আমার স্ত্রীর রত্ন! ও এসব কী বলছে!”
“শান্ত হও, কান পেতে শোনো,” বললেন সুলতান।
“রাজপুত্র,”
হাসসেইম করজোড়ে বলল, “আপনার অনুমতি নিয়ে বলছি, আমি আর শুনতে চাই না। যদি
কোনো লজ্জাজনক কথা বেরিয়ে আসে... আপনি তখন আমাকে কী ভাববেন?”
“আমি ভাবব, তুমি একটা আস্ত গাধা,” ধমক দিলেন মাঙ্গোগুল, “একটা রত্নের কথায় এত ভয় পাও কেন? ও যা বলবে, তার কিছুটা তো আমরা আগেই জানি, আর বাকিটা
আন্দাজ করে নেওয়া যায়! চুপ করে বসো আর উপভোগ করো।”
হাসসেইম অগত্যা চুপ করে বসে
রইল, আর তখন সেই
রত্নটি পাখির মতো কিচিরমিচির শুরু করল—
“এই
ফ্ল্যান্ড্রিয়ান ভ্যালান্টোটাকে (ফ্ল্যান্ডার্সের চাকর) আর কতকাল সহ্য করব? আমি জীবনে এমন অনেককে দেখেছি
যাদের কাজের শেষ আছে; কিন্তু এই লোকটার তো কোনো বিরামই
নেই... সে তো থামতেই জানে না!”
এই কথা কানে যাওয়া মাত্রই
হাসসেইম ক্ষিপ্ত হয়ে ছুরি হাতে টেবিলের ওপর দিয়ে স্ত্রীর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল।
যদি আশপাশের লোকেরা তাকে জাপটে না ধরত,
তবে সে হয়তো স্ত্রীকে এফোঁড়-ওফোঁড় করেই ফেলত।
“হাসসেইম,”
বললেন সুলতান, “তুমি বড় বেশি বাড়াবাড়ি করছ। তোমার চেঁচামেচিতে
অন্যরা কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। এই মহিলারা কী ভাববেন, যদি তাঁদের স্বামীদের মেজাজও
তোমার মতো এমন উগ্র হয়? কী আশ্চর্য! এক ভ্যালান্টো,
যে কখনো থামতে জানে না, তার জন্য তুমি
এমন পাগল হয়ে যাচ্ছ? নিজের আসনে ফিরে যাও, ভদ্রলোকের মতো আচরণ করো, নিজেকে সংযত রাখো—এবং সাবধান, সুলতানের সামনে দ্বিতীয়বার
এমন বেয়াদবি কোরো না।”
হাসসেইম ধপ করে চেয়ারে বসে
পড়ল, কপালে হাত
দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল। এই ফাঁকে সুলতান আবার আংটি তাক করলেন।
রত্নটি আবার বলতে শুরু করল— “ভ্যালান্টোর পরে তার ওই কচি
ছোকরাটাকে (Page boy) আমার বেশ মনে ধরেছিল; কিন্তু জানি না সে কবে
শুরু করবে। একজন শুরুই করে না, আরেকজন শেষই করে না—ততক্ষণ
আমি ধৈর্য ধরে ওই ব্রাহ্মণ এগোনকেই মেনে নিচ্ছি। হ্যাঁ, লোকটা দেখতে ভয়ঙ্কর, কিন্তু তার একটাই গুণ—সে শেষ করে আবার নতুন করে শুরু করতে পারে!
আহ! কী মহাপুরুষ এই ব্রাহ্মণ!”
এই পর্যন্ত শুনতেই হাসসেইম
লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে বুঝে গেল, এই নারী তার মর্যাদার অযোগ্য। রাগের বদলে সে এবার হেসে ফেলল, বাকিরাও হাসিতে যোগ দিল—তবে মনে মনে সে স্ত্রীকে উচিত শিক্ষা
দেওয়ার ফন্দি আঁটল।
নৈশভোজ শেষ হতেই সবাই যার
যার বাড়ি চলে গেল। শুধু হাসসেইম তার স্ত্রীর হাত ধরে সোজা এক ‘পর্দানশীন
কুমারী আশ্রমে’ (কনভেন্ট) নিয়ে গিয়ে তাকে সেখানে বন্দী করে রাখল।
মাঙ্গোগুল যখন এই খবর পেলেন, তিনি তৎক্ষণাৎ সেখানে গিয়ে
হাজির হলেন। গিয়ে দেখলেন, পুরো আশ্রমের সন্ন্যাসিনীরা
একদিকে ওই মহিলাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, আরেকদিকে তার
নির্বাসনের কারণ জানার চেষ্টা করছে।
“আহ, ও কিছু না,” মহিলাটি বলল, “গতকাল রাতে সুলতানের সঙ্গে ভোজে
ছিলাম, শ্যাম্পেন
উড়ছিল, ওয়াইন গড়াচ্ছিল, কার
হুঁশ কোথায় ছিল কে জানে! তখন হঠাত আমার ‘গোপন রত্ন’ কথা বলতে শুরু করে দিল। কী বলেছিল ছাই
আমার মনে নেই, কিন্তু
আমার স্বামী রেগে আগুন।”
“আহ! ম্যাডাম, তাতে ওঁর অত রাগ করাটা
একেবারেই ঠিক হয়নি,” সন্ন্যাসিনীরা বলল, “একটা রত্ন কথা বলেছে—তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হলো? বলুন তো, ও এখনো কথা বলে নাকি? শুনতে পারলে তো কী মজাই
না হতো! নিশ্চয়ই দারুণ রসবোধ আর মার্জিত ভাষায় কথা বলবে।”
তাদের এই অদ্ভুত শখ সুলতান
পূরণ করলেন—আংটি তাক করলেন মহিলার দিকে। রত্নটি বলে উঠল— “আপনাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু সত্যি বলি, আপনাদের সঙ্গ যত ভালোই লাগুক, সেই ব্রাহ্মণের
সঙ্গ পেলে আমার ঢের বেশি আনন্দ হতো।”
এই সুযোগে সুলতান এই পবিত্র
আশ্রমের ভেতরের খবর জানার কৌতূহল বোধ করলেন। তিনি আংটিটি তাক করলেন ক্লিন্থিস
নামের এক কিশোরী সন্ন্যাসিনীর দিকে।
তার রত্নটি অকপটে স্বীকার
করল—সে
দুজন মালি, এক
ব্রাহ্মণ এবং তিনজন অশ্বারোহীকে ‘চেনে’—আর কীভাবে একবার বিশেষ ওষুধ খেয়ে ও দুবার
রক্তপাত ঘটিয়ে সে গর্ভধারণের গুজব থেকে বাঁচতে পেরেছিল, তাও গড়গড় করে বলে দিল।
জেফিরিনা নামে অন্য এক
কুমারী জানাল—তার রত্ন জানিয়ে দিয়েছে যে,
সে আশ্রমের কাজের ছেলেটির দয়ায় ইতিমধ্যেই ‘মাতৃত্বের মর্যাদা’ লাভ করেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার
হলো—যে
ভাষায় এসব রত্ন কথা বলছিল, তা ছিল অত্যন্ত অশালীন; কিন্তু সেই তথাকথিত
কুমারীরা তাতে এতটুকুও লজ্জা পেল না, বরং শান্তভাবে সব
শুনে গেল। মাঙ্গোগুল মনে মনে ভাবলেন—এরা বাস্তবতা থেকে দূরে থাকলেও, চিন্তা-ভাবনায় কিন্তু বেশ
উদার!
বিষয়টি আরও তলিয়ে দেখার
জন্য তিনি আংটি তাক করলেন ১৫–১৬ বছর বয়সী এক নবাগত সন্ন্যাসিনীর দিকে। তার রত্নটি
বলে উঠল: “ফ্লোরা
ওই গ্রিলের ওপাশে দাঁড়ানো এক তরুণ অফিসারের দিকে বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে। আমি
নিশ্চিত ওর মনে কিছু একটা চলছে। ওর কড়ে আঙুলই আমাকে গোপনে এই খবরটা দিয়েছে।”
এই কথায় ফ্লোরা লজ্জায় লাল
হয়ে থমকে গেল। আশ্রমের প্রবীণ সন্ন্যাসিনীরা তার শাস্তি নির্ধারণ করল—আগামী দুই মাস
তাকে একেবারে চুপচাপ থাকতে হবে, এবং পুরো আশ্রমের রত্নদের নীরবতার জন্য বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করা
হলো।
নবম
অধ্যায়: বানজার বিজ্ঞান-সমিতির হালচাল
সুলতান মাঙ্গোগুল সেই
সন্ন্যাসিনীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পরপরই—যাঁদের আমি আগের অধ্যায়ে রেখে এসেছি—বানজা নগরী
জুড়ে এক অদ্ভুত গুজব ছড়িয়ে পড়ল। শোনা গেল,
‘ব্রহ্মার ককসিক্স’ মঠের কুমারীরা
নাকি মুখ নয়, নিজেদের
‘গোপন রত্ন’ দিয়েই কথা বলছে!
বেচারা হাসসেইম তার স্ত্রীর
ওপর যে চড়াও হয়েছিল, সেই ঘটনার জেরে গুজবটি খুব দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পেল। ফলে নগরীর পণ্ডিত
মহলে প্রবল কৌতূহল জেগে উঠল। ঘটনাটি ভালো করে ধুয়ে-মুছে, উল্টে-পাল্টে
পরীক্ষা করা হলো এবং শেষমেশ একে ‘সত্য’ বলে মেনে নেওয়া হলো। এরপর থেকেই শহরের
যতসব মুক্তচিন্তাবিদ, যারা প্রথমে বিষয়টাকে গাঁজাখুরি গল্প বলে উড়িয়ে দিয়েছিল, তারাই এখন বস্তুজগতের কার্যকারণ ঘেঁটে এই বিস্ময়কর ঘটনার বৈজ্ঞানিক
ব্যাখ্যা খুঁজতে আদাজল খেয়ে লাগল।
এই ‘বাচাল রত্ন’দের বকবকানিকে
কেন্দ্র করে রাতারাতি প্রচুর ভারী ভারী গবেষণা-গ্রন্থ লেখা হয়ে গেল। আর সেইসব পাণ্ডুলিপির
ভারে বানজার বিজ্ঞান-সমিতির গ্রন্থাগার ফুলে-ফেঁপে উঠল—যাকে কিনা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির সর্বোচ্চ
অপচয়... থুড়ি, সাধনার
নিদর্শন বলেই ধরা হয়।
বানজার এই একাডেমিকে
বাঁচিয়ে রাখা এবং এর জৌলুস বাড়ানোর জন্য কঙ্গো, মনোয়েমুগি, বেলেগুয়ানজা
এবং আশপাশের রাজ্যগুলো থেকে বাছা বাছা মেধাবী লোকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল,
এবং এখনো হয়। প্রাকৃতিক ইতিহাস, দর্শন,
গণিতসহ নানা বিষয়ে যাঁরা নাম করেছেন, কিংবা
ভবিষ্যতে যাঁদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার আশা আছে—তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এখানে যুক্ত।
এই ‘পরিশ্রমী
মৌমাছি’র
দল সারাক্ষণ তথাকথিত সত্যের সন্ধানে ভনভন করতে থাকে, আর প্রতি বছরই তাঁদের গবেষণার ফলাফল জনসাধারণের
মঙ্গলে প্রকাশ করা হয়—একেকটি খণ্ড যেন নতুন নতুন আবিষ্কারের খনি।
সে সময় একাডেমিটি দুটি
প্রবল বিরোধী শিবিরে বিভক্ত ছিল—একদল ‘ভর্টিসিস্ট’ (Vorticist) আর অন্যদল ‘অ্যাট্রাকশনিস্ট’ (Attractionist)।
ভর্টিসিস্ট দলের
প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওলিব্রিও—যিনি একাধারে দক্ষ জ্যামিতিবিদ ও প্রকৃতিবিদ। আর
অ্যাট্রাকশনিস্টদের আদিগুরু ছিলেন সারসিনো—যিনি প্রকৃতিবিদ তো ছিলেনই, সঙ্গে ছিলেন প্রগাঢ়
জ্যামিতিবিদ। দুজনেই প্রকৃতির রহস্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দুই ভিন্ন পথে।
ওলিব্রিও-র তত্ত্ব প্রথমে
শুনতে খুব সহজ মনে হয়, কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই তা নিজের সঙ্গেই মারামারি বাধিয়ে দেয়।
অন্যদিকে সারসিনো-র তত্ত্ব শুরুতে কিছুটা আজগুবি মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে তা গভীর যুক্তি আর আলোর দিকে এগিয়ে যায়। ওলিব্রিও-র
পথ শুরুতে যেমন আলোকিত, শেষে গিয়ে ততই অন্ধকার; সারসিনো-র পথ শুরুতে অন্ধকার হলেও, যত এগোবেন
ততই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ওলিব্রিও-র দর্শন বুঝতে
পড়াশোনা কম লাগে, মুখস্থ বিদ্যা আর কল্পনাশক্তি বেশি লাগে; কিন্তু
সারসিনো-র শিষ্য হতে গেলে হাড়ভাঙ্গা পড়াশোনা আর ক্ষুরধার মেধা—দুটোই চাই।
ওলিব্রিও-র পাঠশালায় ঢোকার দরজা সবার জন্য হাট করে খোলা; কিন্তু সারসিনো-র দরজা খোলে
শুধু শ্রেষ্ঠ জ্যামিতিবিদদের জন্য। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই, একশো জন ভর্টিসিস্টের বিপরীতে একজন অ্যাট্রাকশনিস্ট খুঁজে পাওয়া যায়—অবশ্য সেই একজনের
ওজন ওই একশো জনের সমান।
এমনই এক পরিস্থিতিতে বানজার
বিজ্ঞান-সমিতি এই ‘বাচাল রত্ন’-এর বিষয়টি হাতে নিল।
কিন্তু সমস্যা হলো, ঘটনাটি ছিল বড্ড
ধোঁয়াশাপূর্ণ; আকর্ষণতত্ত্বের (Attraction) নিয়মে একে কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছিল না, আবার
সূক্ষ্ম পদার্থবিজ্ঞানের ফর্মায়েশেও এর নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না। সভার সভাপতি
বারবার সবাইকে অনুরোধ করলেন, কিন্তু যাঁদের পেটে
একটু-আধটু বিদ্যা আছে, তাঁরা কেউ মুখ খুললেন না—ফলে সভায় এক
গভীর নীরবতা নেমে এল।
অবশেষে ভর্টিসিস্ট পণ্ডিত
পারসিফলো উঠে দাঁড়ালেন—যিনি এমন বহু বিষয়ে মোটা মোটা বই লিখেছেন, যেগুলো তিনি নিজেই বোঝেন না।
তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “মহাশয়গণ, এই ঘটনাটি জগতের স্বাভাবিক নিয়ম-শৃঙ্খলার সঙ্গেই পুরোপুরি
সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমার জোর সন্দেহ, এটি সম্ভবত জোয়ার-ভাটার
মতোই এক প্রকার প্রাকৃতিক ক্রিয়া। লক্ষ্য করে দেখুন, আজ
কিন্তু বিষুবের পূর্ণিমা! তবে আমার ধারণা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হলে আগামী মাসে
রত্নরা কী বলে, তা শোনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”
সবাই কাঁধ ঝাঁকালেন। মুখে
কিছু না বললেও, তাঁরা
মনে মনে ভাবলেন—পারসিফলো নিজেই আসলে এক ‘বাচাল রত্ন’-এর মতো আবোলতাবোল
বকছেন। আর বুদ্ধিমান পারসিফলোও ভাবভঙ্গিতে সেটা ঠিকই টের পেলেন।
এরপর অ্যাট্রাকশনিস্ট
রেসিপ্রোকো উঠে বললেন— “মহাশয়গণ, রাজ্যের প্রতিটি বন্দরে জোয়ারের উচ্চতা মাপার জন্য আমি যে তত্ত্বের
ভিত্তিতে টেবিল তৈরি করেছি, তা হয়তো বাস্তবে কিছু
ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণের সঙ্গে হুবহু মেলে না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি এই রত্নদের কথাবার্তা জোয়ার-ভাটার নিয়মের সঙ্গে মিলে যায়, তবে আমার টেবিলের ওই সামান্য ত্রুটিটুকু আপনারা নিশ্চয়ই ক্ষমাঘেন্না
করে দেবেন।”
এরপর তৃতীয় একজন উঠে
দাঁড়িয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে খসখস করে কিছু অঙ্ক কষতে শুরু করলেন— “ধরা যাক, একটি রত্ন হলো A B, এবং—”
(এখানে অনুবাদকদের
অজ্ঞতা বা উইপোকার বদান্যতার কারণে আমরা আফ্রিকান মূল পাণ্ডুলিপির একটি
মহামূল্যবান অংশ হারিয়েছি—প্রায় দুই পৃষ্ঠা জুড়ে শুধুই শূন্যস্থান।
এরপর যা পাওয়া যায় তা হলো:)
...রেসিপ্রোকো-র
যুক্তি উপস্থিত সবাইকে সন্তুষ্ট করেছিল, এবং সবাই একমত
হয়ে বললেন—যেহেতু তিনি এর আগে যুক্তিবিদ্যার ওপর বেশ কিছু
প্রবন্ধ লিখেছেন, তাই একদিন হয়তো তিনিই এই তত্ত্ব প্রমাণ করবেন যে, “নারীরা যেহেতু যুগে যুগে কান দিয়ে
শুনে এসেছে, তাই
আজ তাদের পক্ষে নিজেদের ‘রত্ন’ দিয়ে কথা বলাটাও বিচিত্র কিছু নয়।”
সবার শেষে উঠে দাঁড়ালেন
ডক্টর অরকোটোমাস, অ্যানাটমিস্ট বা শরীরতত্ত্ববিদদের দলের প্রতিনিধি। তিনি চশমা ঠিক করে
বললেন— “মহাশয়গণ, আমার মতে ভিত্তিহীন কল্পনার
ফানুস ওড়ানোর চেয়ে কোনো অজানা ঘটনাকে অমীমাংসিত রাখাই ভালো। তবু আমি চুপ থাকতাম,
যদি না আমার ঝুলিতে কিছু নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ থাকত। আমি এই
রত্নদের চরম উত্তেজনার মুহূর্তে খুব কাছ থেকে দেখেছি, এবং
বহু গবেষণা ও হাতে-কলমে পরীক্ষার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে—যাকে গ্রিকরা
‘ডেলফিস’ (Delphys) বলে, তার প্রকৃতি অনেকটাই আমাদের স্বরযন্ত্রের (Larynx) মতো।”
“কিছু কিছু নারী এমনও আছেন, যাঁরা মুখ দিয়ে যেমন কথা
বলেন, তেমনি এই রত্ন দিয়েও বলতে পারেন।”
“হ্যাঁ মহাশয়গণ, ডেলফিস আসলে একাধারে একধরনের
তার-বাদ্য (String instrument) ও বায়ু-বাদ্য (Wind
instrument)—তবে বায়ুর
চেয়ে তার-এর ভূমিকাই এখানে বেশি। বাইরের বাতাস এর ওপর আঘাত করে, ঠিক যেন বেহালার ছড় তারের
ওপর ঘষা খাচ্ছে, ফলে সেখান থেকে নানান ধ্বনি উৎপন্ন হয়—যেগুলো নারী
নিজের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে,
এমনকি চাইলে গানও গাইতে পারে!”
“আপনারা হয়তো প্রশ্ন তুলবেন—যেহেতু এই বাদ্যযন্ত্রে
মাত্র দুটি তার (ঠোঁট) আছে এবং দুটিই সমান দৈর্ঘ্যের, তবে এত বিচিত্র ধ্বনি কীভাবে
সম্ভব? এর উত্তর হলো—এই তারগুলো ইচ্ছেমতো প্রসারিত ও
সংকুচিত হতে পারে, আর এই পরিবর্তনই নানান চড়া ও খাদ সুর তৈরি করে।”
“এই প্রসারণ ও সংকোচনের
ক্ষমতা আপনাদের মতো বিদ্বান সমাজে নতুন করে প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই; কিন্তু আমি
পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়ে দেব যে, ডেলফিস-এর এই
বিশেষ গুণের কারণেই এটি মানুষের কণ্ঠের মতোই নানা সুর তুলতে সক্ষম। আমি এমনকি এই
সভার সামনেই প্রমাণ করে দেখাতে পারব—একটি ডেলফিস ও একটি ‘রত্ন’ শুধু নিজেদের
মধ্যে যুক্তি-পরামর্শই করতে পারে না,
কথা বলতে পারে, আর মুড ভালো থাকলে গানও
গাইতে পারে!”
এভাবেই জ্বালাময়ী বক্তৃতা
দিলেন ডক্টর অরকোটোমাস—নিজেকে এতটাই নিশ্চিত ধরে নিলেন যে, তিনি শীঘ্রই প্রমাণ করে
ছাড়বেন—তাঁর গবেষণাগারের রত্নরা কোনো অংশেই মানুষের গলার চেয়ে কম যায় না।
দশম
অধ্যায়: আগেরটির চেয়ে কম পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও কম একঘেয়ে — অ্যাকাডেমির অধিবেশনের জের
ডাক্তার অর্কোটোমাস যখন
তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো হাতে-কলমে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে যেসব
মোক্ষম আপত্তি তোলা হলো, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল—ভদ্রলোকের যুক্তির
চেয়ে কল্পনার দৌড় ঢের বেশি। অনেকেই প্রশ্ন তুললেন:
“যদি ‘গোপন রত্ন’দের কথা বলার
ক্ষমতাটা স্বাভাবিকই হবে, তবে এতদিন তারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করেনি কেন? আর
নারীদের বকবক করার অদম্য নেশা দেখে ব্রহ্মা যদি দয়া করে তাঁদের কথা বলার অঙ্গ
দ্বিগুণ করেই দিয়ে থাকেন, তবে এমন মহামূল্যবান উপহারটি
এতদিন ধরে কেন অজানা বা অবহেলিত হয়ে পড়ে রইল—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? একই রত্ন কেন বারবার কথা
বলছে না? কেন তারা ঘুরেফিরে শুধু ওই এক বিষয়ের (প্রেম ও
কাম) কথাই বলছে? আর এমন কী অদ্ভুত ব্যবস্থা যে, যখন এক মুখ কথা বলে, তখন অন্য মুখটি
বাধ্যতামূলকভাবে বন্ধ থাকে? সর্বোপরি, আমরা যদি সেই পরিস্থিতিগুলো বিবেচনা করি যখন রত্নরা কথা বলেছে, এবং তারা যা বলেছে তা বিচার করি, তবে এটাকে
তাদের স্বতঃস্ফূর্ত বা অনিয়ন্ত্রিত প্রলাপ মনে করাই যুক্তিসঙ্গত। কারণ, যদি মালকিনদের সাধ্য থাকত, তবে তারা নির্ঘাত
এদের মুখে কুলুপ এঁটে দিত।”
অর্কোটোমাস দাঁড়িয়ে এসব
আপত্তির জবাব দিতে লাগলেন। তিনি দাবি করলেন,
রত্নরা সব যুগেই কথা বলেছে—কিন্তু এত নিচু স্বরে যে, তাদের মালকিনরা ছাড়া আর কেউই
তা শুনতে পেত না। তিনি বললেন:
“আজকাল যে তারা গলা চড়িয়ে
কথা বলছে, তাতে
আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ, আজকালকার দিনে কথাবার্তায়
বাধানিষেধ বা লজ্জাশরম প্রায় উঠেই গেছে; লোকে এখন
প্রকাশ্যে এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, যা আগে কেউ মুখেই
আনত না। আর এখন পর্যন্ত তারা যদি একবারই জোরে কথা বলে থাকে, তার মানে এই নয় যে তারা আর বলবে না। কথা না বলা আর বোবা হয়ে থাকা এক
জিনিস নয়।”
“তারা কেন শুধু এক ধরণের
বিষয় নিয়েই কথা বলছে? এর উত্তর সহজ—সম্ভবত তারা শুধু ওই এক বিষয়েরই খোঁজখবর রাখে।
আর যেসব রত্ন এখনো মুখ খোলেনি, তারা হয়তো ভবিষ্যতে বলবে। আর যারা একেবারেই চুপচাপ আছে, হতে পারে তাদের বলার মতো কিছু নেই, অথবা তাদের
গঠনতন্ত্রে খুঁত আছে, কিংবা তারা শব্দ আর চিন্তার দৈন্যে
ভুগছে।”
“সোজা কথায়,”
তিনি আরও যোগ করলেন, “এই বাড়তি অঙ্গটি যদি নারীদের কথা বলার খায়েশ
মেটানোর জন্য ব্রহ্মার দয়ার দান হয়ে থাকে,
তবে এর ফলে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সেই
ব্যবস্থাও তাঁর অসীম প্রজ্ঞায় করা আছে—আর সে কারণেই যখন এক মুখ কথা বলে, তখন অন্যটি চুপ থাকে।
মহিলারা এমনিতেই প্রতি মুহূর্তে নিজেদের মত পাল্টান; এখন
ভাবুন তো, যদি তাঁদের একসঙ্গে দুটো মুখ দিয়ে দুটো
সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী মত প্রকাশের ক্ষমতা দেওয়া হতো, তবে
কী কেলেঙ্কারিটাই না হতো! তাছাড়া, ভাষার উদ্দেশ্য তো মনের
ভাব বোঝানো। এক মুখ দিয়ে তাঁরা যা বলেন, তাই একে অপরের
বুঝতে পারে না—সেখানে দুটো মুখ একসঙ্গে চালু থাকলে তাঁরা কী
করতেন?”
অর্কোটোমাস এসব বলে ভাবলেন, তিনি বুঝি সব প্রশ্নের
দাঁতভাঙা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ভুল ভেবেছিলেন।
নতুন নতুন সন্দেহ মাথাচাড়া
দিয়ে উঠল। তিনি প্রায়ই তর্কে কোণঠাসা হয়ে পড়ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মী চিমোনাজেস এগিয়ে এসে তাঁকে
উদ্ধার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তর্কবিতর্ক এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে গেল যে, পণ্ডিতরা মূল বিষয় থেকেই ছিটকে গেলেন। তাঁরা একবার পথ হারান, আবার ফিরে আসেন, আবার হারান, রেগে যান, ঝগড়া করেন—এবং শেষমেশ
সেই ঝগড়া গিয়ে ঠেকল ব্যক্তিগত গালিগালাজ আর কাদা ছোড়াছুড়িতে।
অবশেষে একরাশ হট্টগোল আর
অপমানের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান-সমিতির সেই ঐতিহাসিক অধিবেশন সমাপ্ত হলো।
একাদশ
অধ্যায়: আংটির চতুর্থ প্রয়োগ — প্রতিধ্বনি
যখন বিজ্ঞান-সমিতিতে ‘গোপন রত্ন’দের এই কিচিরমিচির
নিয়ে হুলস্থুল চলছিল, তখন বাইরের সমাজেও ওটাই হয়ে উঠেছিল একমাত্র আলোচ্য বিষয়। আজকের আলোচনা
কালকের, এমনকি পরের কয়েক মাসের খোরাক হয়ে দাঁড়াল। বিষয়টি
যেন এক অফুরন্ত ঝরনাধারা। সত্যের সঙ্গে রংচং মাখিয়ে মিথ্যা পরিবেশন করা হচ্ছিল;
আর এই অলৌকিক ঘটনায় মানুষের অবিশ্বাসের বাঁধ এমনভাবে ভেঙে গেল যে,
সবাই সব কিছু বিশ্বাস করতে শুরু করল। পুরো ছয় মাস ধরে সমাজে এই
একটি বিষয় নিয়েই জল্পনা-কল্পনা চলল।
যদিও সুলতান এপর্যন্ত মাত্র
তিনবার তাঁর আংটির প্রয়োগ করেছিলেন,
তবুও মানিমনবান্দার বৈঠকখানায় মহিলারা একে একে—কখনো এক প্রেসিডেন্ট-পত্নীর
রত্ন, কখনো এক
মার্কুইসের স্ত্রী, আবার কখনো এক ধর্মপ্রাণ মহিলার রত্নের
গোপন জবানবন্দি—এমনকি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না এমন নারীদের গল্পও
শুনিয়ে দিচ্ছিলেন। ঈশ্বরই জানেন, রত্নদের মুখে কত শত বানোয়াট কাহিনি আর উর্বর কল্পনা জুড়ে দেওয়া হয়েছিল!
বলাই বাহুল্য, সেই সব গল্পে অশ্লীলতার কোনো কমতি ছিল না।
ঘটনা থেকে আলোচনা এবার
দুশ্চিন্তার দিকে মোড় নিল।
“আমি স্বীকার করছি,”
এক মহিলা বললেন, “এই জাদুবিদ্যা—কারণ এটা স্পষ্টভাবে রত্নদের ওপর জাদুবলে
প্রভাব ফেলেছে—আমাদের বড়ই দুশ্চিন্তায় রেখেছে। ভাবুন তো, সারাক্ষণ এমন এক আতঙ্কে বাস
করতে হচ্ছে যে, নিজের শরীর থেকেই হুট করে এক বিব্রতকর
কণ্ঠস্বর বেরিয়ে পড়তে পারে!”
“কিন্তু ম্যাডাম,”
অন্য এক মহিলা বললেন, “আপনার যদি লুকোনোর মতো লজ্জাজনক কিছু না থাকে, তবে ভয় কিসের? একটা রত্ন যদি হাস্যকর কিছু না বলে, সে কথা
বলুক বা না বলুক, তাতে কী আসে যায়?”
“অনেক কিছু আসে যায়,”
প্রথমজন জবাব দিলেন, “আমি আমার গয়নাগাঁটির অর্ধেক দিয়ে দিতে রাজি, যদি নিশ্চিত হওয়া যেত যে
আমার ‘রত্ন’ কখনো মুখ খুলবে না।”
“ওমা! তাহলে নিশ্চয়ই আপনার
কিছু লুকোনোর আছে,” অন্যজন বাঁকা হেসে বললেন।
“আমার অন্যদের চেয়ে আলাদা
কোনো কারণ নেই,” সেফিসা বললেন, “তবু আমি বলছি—বিশ হাজার ক্রাউন
দিয়ে হলেও আমি মানসিক শান্তি কিনতে প্রস্তুত। কারণ আমি আমার রত্নের ওপর আমার নিজের
জিভের চেয়েও বেশি আস্থা রাখতে পারি না। জীবনে কত বাজে কথা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে! এখন
দেখি প্রতিদিন এমন সব অকল্পনীয় ঘটনা রত্নদের মুখে উঠে আসছে—তাতে যদি তিন-চতুর্থাংশ
বাদও দিই, তবু
বাকি অংশই কাউকে সমাজচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট। আমার রত্ন যদি তাদের অর্ধেকও
মিথ্যেবাদী হয়, তবু আমার মান-সম্মান বলে কিছু থাকবে না।
আগে আমাদের আচরণ নির্ভর করত রত্নদের ওপর, আর এখন দেখছি
রেপুটেশনটাও ওটার ওপরেই ঝুলে আছে!”
“আমার কথা যদি বলি,”
ইসমিনে স্পষ্ট গলায় বললেন, “আমি সব কিছু ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। আমার
ব্রাহ্মণ বলেছেন, স্বয়ং ব্রহ্মা এই কথা বলার ক্ষমতা রত্নদের দিয়েছেন—সুতরাং তিনি
নিশ্চয়ই তাদের মিথ্যে বলার অনুমতি দেবেন না। এটা বিশ্বাস না করা হবে ঈশ্বরনিন্দার
শামিল। অতএব, আমার
রত্ন যত খুশি, যতবার খুশি বকবক করুক। কিন্তু সে বলবেটা কী?”
ঠিক তখনই যেন মাটির নিচ
থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—ঠিক যেন এক প্রতিধ্বনি— “অনেক কিছু।”
ইসমিনে বুঝতে পারলেন না
কণ্ঠটা কোথা থেকে এল। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে পাশের মহিলাদের ওপর চড়াও হলেন, আর ওদিকে গোটা ঘর হাসিতে
ফেটে পড়ল।
সুলতান তাঁর এই বিভ্রান্তি
দেখে মুগ্ধ হলেন। তিনি তখনই মন্ত্রীর সঙ্গে কথা থামিয়ে ইসমিনের কাছে এগিয়ে এসে
বললেন: “ম্যাডাম, আমার ভয় হচ্ছে, আপনি হয়তো অতীতে কাউকে একটু বেশিই বিশ্বাস করেছিলেন—আর আপনার ‘রত্ন’ হয়তো সেইসব
কথা মনে রেখেছে, যা
আপনার নিজের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে।”
এরপর তিনি কৌশলে আংটিটি
নাড়ালেন, আর শুরু
হলো ইসমিনে ও তাঁর রত্নের মধ্যে এক অদ্ভুত সংলাপ।
ইসমিনে বললেন, তিনি কখনোই কাউকে গোপন কিছু
বলেননি, নিজের বিষয় নিজেই সামলেছেন—তাই কোনো রত্ন, এমনকি সে মিথ্যেবাদী হলেও,
তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবে না।
“হয়তো,”
সেই অজানা কণ্ঠ আবার বলে উঠল।
“কী বলছ ‘হয়তো’? ভয়
পাওয়ার কিছু নেই,” ইসমিনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। “সব কিছুই বলতে পারি, যদি তারা জানত আমি যা জানি।”
“তুমি জানো কী?”
“অনেক কিছু।”
“‘অনেক কিছু’—মানে তো
কিছুই না। তুমি কি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারো?” “অবশ্যই।”
“কী রকম ব্যাপার? আমি কি কখনো প্রেমে পড়েছি?” “না।”
“তাহলে কি আমি কারো সঙ্গে
প্রেম-লীলা (Galantry) করেছি?” “ঠিক তাই।”
“কার সঙ্গে? ওই পাতলা ছিপছিপে তরুণ,
সৈনিক, নাকি সিনেটর?” “না।”
“অভিনেতা?”
“না।”
“তাহলে কি আমার চাকর, আমার পেয়াদা বা গির্জার
পাদ্রি?” “না।”
“হুম, মিথ্যেবাদী! আর কিছু বলার
নেই তোমার?” “সবই আছে।”
“তা হলে বলো, আমি তো চ্যালেঞ্জ করছি
তোমায়!” “তুমি
আমাকে কোন স্তরে নামিয়ে আনছ, ইসমিনে,” রত্নটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। “দোহাই লাগে, আমার বিনয়টুকু বজায় রাখতে
দাও।”
“ন্যাকামি রাখো, দয়া করে বলো তবে। তুমি তো
আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তোমার কোনো কথায় আমি ভয় পাই না।”
“তবে শোনো, সতীসাধ্বী ইসমিনে: তুমি কি
পুরোপুরি ভুলে গেছ তরুণ ওসমিনকে? সেই সঙ্গীতজ্ঞ জেগ্রিস,
তোমার নাচের শিক্ষক আলাজিয়েল, আর গানের
ওস্তাদ আলমোউরাকে?”
“আহ! কী জঘন্য অপবাদ!” চিৎকার করে
উঠলেন ইসমিনে। “আমার মা আমাকে এত কড়া শাসনে রাখতেন যে, এমন কিছু হতেই পারত না। আর
আমার স্বামী, যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তিনিও প্রমাণ দিতেন যে আমি একদম ঠিকঠাক কুমারী ছিলাম।”
“তা তো ঠিকই,”
রত্নটি ফোড়ন কাটল, “আলসিনার দেওয়া সেই গোপন টোটকাগুলোর জন্য
ধন্যবাদ।”
“এত বাজে, এমন অশ্লীল মিথ্যে কোনো
জবাবেরই যোগ্য নয়,” ইসমিনে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন। “আমি বলতে পারি না, কোন মহিলার বেহায়া রত্ন এমন
দাবি করছে। কিন্তু আমার নিজের রত্ন তো এসব জানে না!”
“ম্যাডাম,”
সেফিসা বললেন, “আমি নিশ্চিত, আমার রত্ন শুধু শুনেছে—বলেনি।” বাকিরাও তাই
বলে সায় দিল।
এরপর তাঁরা আবার তাস খেলায়
বসে গেলেন—এই ভয়ংকর সংলাপে কার রত্ন জড়িত ছিল, সেটি না জানার ভান করেই।
দ্বাদশ
অধ্যায়: আংটির পঞ্চম পরীক্ষা — জুয়ার নেশা
মানিমনবান্দার জলসায় যেসব
ভদ্রমহিলারা আসর জমাতেন, তাঁরা খেলায় অংশ নিতেন প্রবল উৎসাহে; এবং সেটা
বোঝার জন্য মাঙ্গোগুলের মতো অতটা সূক্ষ্ম দৃষ্টিরও প্রয়োজন ছিল না। জুয়া এমন এক
সর্বনাশা আবেগ, যা নিজের মুখোশ খুব কমই পরে থাকে। জিতুক
বা হারুক, খেলোয়াড়ের আসল রূপটা ঠিকই বেরিয়ে আসে।
“কিন্তু এই উন্মত্ততা কোথা
থেকে আসে?” সুলতান মনে মনে ভাবলেন। “মহিলারা কেমন
করে সারা রাত একটা ‘ফারাও’ (Faro - তাসের জুয়া) টেবিলের পাশে বসে কাটাতে পারে?
একটার পর একটা টেক্কা বা সাতের অপেক্ষায় তাঁরা ঠকঠক করে কাঁপতে
থাকেন! এই পাগলামি তাঁদের স্বাস্থ্য আর সৌন্দর্য—যাঁদের তা আছে—উভয়কেই নষ্ট
করে দিচ্ছে; আর
তার সঙ্গে এমন সব বিপদে ফেলে দেয়, যা আমি নিশ্চিত জানি।
আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে,” তিনি মির্জোজার কানে ফিসফিস করে বললেন, “এখানেই একটা ভাবনা কাজে লাগাই, যা এইমাত্র আমার মাথায় এল।”
“এ কী চমৎকার ভাবনা, বলো দেখি?” প্রিয়তমা জিজ্ঞেস করলেন।
“ভাবনাটা হলো,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “ওদের মধ্যে সবচেয়ে লাগামছাড়া জুয়াড়ি ওই
ব্রেলান্দিয়ারার দিকে আংটিটা ঘুরিয়ে তার ‘গোপন রত্ন’কে জিজ্ঞাসাবাদ করা। আর সেই অঙ্গটির মাধ্যমে
তাদের সব দুর্বলচেতা স্বামীদের কানে একটা ভালো উপদেশ পৌঁছে দেওয়া—যারা তাদের
স্ত্রীদের সম্মান ও সম্পত্তি এভাবে তাস বা পাশার দানায় বাজি রাখতে দেয়।”
“ভাবনাটা আমার খুব ভালো
লেগেছে,” মির্জোজা বললেন, “কিন্তু জানো প্রিন্স, মানিমনবান্দা একটু আগেই তার
দেবমূর্তির নামে দিব্যি কেটেছে—যদি আর কখনো সে সেই ‘বাচাল রত্ন’দের (Speaking Jewels) ধৃষ্টতার
মুখে পড়ে, তবে আর কোনোদিন ড্রয়িংরুমে খেলার আসর বসাবে না।”
“তুমি কী বললে, আমার প্রাণের আনন্দ?” সুলতান অবাক হয়ে বললেন।
“আমি,”
প্রিয়তমা উত্তর দিলেন, “সেই নামটাই ব্যবহার করেছি, যা শালীন মানিমনবান্দা তাদের
দেয়, যাদের রত্ন কথা বলতে পারে।”
“ওটা তার সেই গোঁয়ার
ব্রাহ্মণের উদ্ভাবন,” সুলতান তাচ্ছিল্যের সুরে
বললেন, “যে
গ্রীক জানে বলে গর্ব করে, অথচ নিজের মাতৃভাষা কঙ্গো ঠিকমতো জানে না। যাই হোক, মানিমনবান্দা ও তার পুরোহিতের অনুমতি নিয়ে আমি ওই মানিলার রত্নকে
প্রশ্ন করতে চাই। আর এখানে সবার সামনে সেই জিজ্ঞাসাবাদ করলে পাশের লোকেরাও কিছু
শিক্ষা পাবে।”
“প্রিন্স,”
মির্জোজা বললেন, “আমার কথা রাখলে মানিমনবান্দাকে এই ঝামেলা থেকে
রেহাই দিতে পারো, অথচ তোমার কৌতূহল বা আমারটাও মেটানো যাবে। তুমি কেন মানিলার বাড়িতেই
যাচ্ছো না?”
“তোমার পরামর্শে যাবই,”
মাঙ্গোগুল বললেন। “কিন্তু কখন?”
“মধ্যরাতে,”
সুলতান নিজেই প্রস্তাব দিলেন।
“মধ্যরাতে তো সে খেলায় মগ্ন
থাকে,” প্রিয়তমা মনে করিয়ে দিলেন। “তাহলে আমি রাত দুটোর সময় যাব,”
মাঙ্গোগুল বললেন।
“প্রিন্স, তুমি ভুলে যাচ্ছ,” প্রিয়তমা হাসলেন, “মহিলা জুয়াড়িদের জন্য ওটাই দিনের
সবচেয়ে আনন্দময় সময়। আমার কথা রাখলে,
তুমি ওকে প্রথম ঘুমে ধরতে পারবে—সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে।”
মাঙ্গোগুল প্রিয়তমার
পরামর্শ মেনে সকাল সাতটার দিকে মানিলার বাড়িতে গেলেন। দাসীরা তখন তাকে শুইয়ে
দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার মুখের গভীর বিষণ্ণতা দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল, আজকের খেলা তার পক্ষে মোটেই
ভালো যায়নি। সে ঘরের এদিক-ওদিক পায়চারি করছিল, কখনো থেমে
আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল, রাগে পা ঠুকছিল, হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলছিল আর বিড়বিড় করে কীসব বলছিল—যা সুলতানের
বোধগম্য হলো না। দাসীরা তাকে পোশাক খুলতে সাহায্য করছিল ভয়ে ভয়ে; অবশেষে তাকে বিছানায় শোয়ানো
গেল বটে, কিন্তু তার বিনিময়ে তাদের জুটল শুধুই গালিগালাজ
আর ধমক।
অবশেষে মানিলা বিছানায় গেল, তার রাতের প্রার্থনা বলতে
ছিল শুধু কিছু অভিশাপ—একটা অভিশপ্ত টেক্কার উদ্দেশে, যা টানা সাতবার তাকে
হারিয়েছে। চোখ বন্ধ করতেই মাঙ্গোগুল আংটিটা তার দিকে তাক করলেন। সঙ্গে সঙ্গেই
রত্নটি বিষণ্ণ স্বরে বলে উঠল, “হায়! আবার আমি ‘রিপিক’ আর ‘ক্যাপটেড’ (তাসের খেলায় শোচনীয় হার) হলাম!”
সুলতান হেসে ফেললেন—মানিলার শরীরের
প্রতিটি অংশই যেন জুয়া খেলছে!
“না,”
রত্নটি বলল, “আমি আর ওই আবিদুলের সঙ্গে খেলব না—ওর জানা শুধু ফাঁকি আর কারচুপি। দারেসের
কথাও তুলো না—ওর সঙ্গে খেললে সর্বনাশ নিশ্চিত। ইসমাল বেশ ভালো খেলোয়াড়, কিন্তু তার নাগাল তো সবাই
পায় না। মাজুলিম ছিল এক খাঁটি রত্ন, যতদিন না সে ওই ডাইনি
ক্রিসার পাল্লায় পড়ে। জুলমিসের মতো এমন খামখেয়ালি খেলোয়াড় আর দুটি নেই। রিকা একটু
কম যায়, কিন্তু বেচারা এখন একেবারে নিঃস্ব। লাজুলির সঙ্গে
কী করা যায়? বানজার সবচেয়ে সুন্দরী নারীও তাকে দিয়ে বড়
দান খেলাতে পারবে না। আর মলিউস! আহ, কী জঘন্য খেলোয়াড়!
সত্যি, জুয়াড়িদের মধ্যে এক মহাধ্বংস নেমে এসেছে—শিগগিরই বুঝবই
না কার সঙ্গে খেলা জমানো যায়।”
এই দীর্ঘ বিলাপের পর রত্নটি
কিছু অদ্ভুত খেলার কাহিনি শোনাতে শুরু করল,
যার সাক্ষী সে নিজে ছিল; আর তার
মালকিনের এই দুর্ভাগ্যের মধ্যেও তার স্থিরতা ও বুদ্ধিমত্তার আকাশচুম্বী প্রশংসা
করল।
“আমি না থাকলে,”
সে বলল, “মানিলা এতদিনে বিশবার নিজেকে সর্বস্বান্ত করে ফেলত। সুলতানের
রাজকোষের সব ধন দিয়েও তার খেলার ঋণ শোধ হতো না। একবার ব্রেলান (Brelan) খেলায় সে এক রাজস্ব
সংগ্রাহক আর এক ‘আব্ব’র (Abbé - যাজক) কাছে দশ হাজার ডুকাটের বেশি হেরেছিল।
তার হাতে আর কিছুই ছিল না, শুধু গায়ের গয়না—যেগুলো তার
স্বামী অল্পদিন আগেই অনেক কষ্টে বন্ধক থেকে ছাড়িয়েছিল, তাই সে ওগুলো আবার বাজি ধরার
সাহস পেল না। কিন্তু খেলা তো খেলতেই হবে—সে কার্ড তুলে নিল। ভাগ্য তখন এমনই সুড়সুড়ি
দেয়, যেমনটা দেয়
গলা কাটার আগে। সবাই তাকে বাজি ধরতে উসকে দিচ্ছিল। মানিলা কার্ড দেখল, পার্সে হাত দিল—খালি, আবার কার্ড দেখল—অস্থির হয়ে উঠল।”
“‘ম্যাডাম, তাহলে কি দাঁড়াচ্ছেন?’ সেই কৃষক (রাজস্ব সংগ্রাহক)
জিজ্ঞেস করল। ‘হ্যাঁ, আমি বাজি রাখছি,’ সে বলল, ‘আমি—আমি আমার ‘গোপন রত্ন’-কে বাজি রাখছি।’”
“‘তার দাম কত?’
তুরকারেস জানতে চাইল। ‘একশো ডুকাট,’ মানিলা বলল।”
“আব্ব সরে পড়ল—রত্নটির দাম
তার কাছে অতিরিক্ত মনে হলো। কিন্তু তুরকারেস বাজি ধরল—মানিলা হারল, আর বাজি শোধও করল।”
“একটা ‘উপাধিসম্পন্ন
রত্ন’
(Titled Jewel) ভোগ
করার অহংকার তুরকারেসের মাথা ঘুরিয়ে দিল। সে প্রস্তাব দিল—সে ম্যাডামকে
খেলাধুলার সব টাকাপয়সা জোগাবে, যদি আমি তার ভোগের একচেটিয়া উপকরণ হই। চুক্তি মুহূর্তেই পাকাপাকি হলো।
কিন্তু মানিলা তো বড় দানের খেলোয়াড়, আর ওই কৃষকের ধনের
ভাণ্ডারও অসীম নয়—তাই খুব শিগগিরই তার টাকাকড়ি ফুরিয়ে গেল।”
“মানিলা এক বিশাল ফারাও
আসরের আয়োজন করেছিল—শহরের সব পরিচিত মুখকে নিমন্ত্রণ, শর্ত ছিল এক ডুকাটের নিচে
কেউ পন্ট করবে না। আমরা তুরকারেসের টাকার ওপরই ভরসা করে ছিলাম। কিন্তু সেই
মাহেন্দ্রক্ষণের সকালেই সে চিঠি পাঠাল—‘হাতে কানাকড়িও নেই।’ আমরা তো একেবারে
অথৈ সাগরে পড়লাম। কিছু না কিছু করতেই হবে,
হাতে একদম সময় নেই। অগত্যা এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণকে বেছে নেওয়া হলো,
যাকে বহুদিন ধরে কিছু ‘অনুগ্রহ’ বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল—এই সামান্য
বসার দাম পড়ল তার ধর্মীয় পদমর্যাদার দ্বিগুণ আয়ের সমান।”
“তবুও কয়েক দিন পর তুরকারেস
ফিরে এল। সে বলল, সে ভীষণ দুঃখিত যে ম্যাডামকে এমন অবস্থায় ফেলেছিল; এবং এখনও সে ম্যাডামের দয়ার আশায় আছে। ‘বড় ভুল করছ, প্রিয়,’ মানিলা ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,
‘এখন তোমাকে গ্রহণ
করাটা মোটেই শোভন নয়। যখন তোমার পকেটে টাকা ছিল, তখন সবাই জানত কেন আমি তোমাকে আসতে দিতাম;
এখন তুমি অকেজো, আর আমার সম্মানটাও নষ্ট
করতে চাও?’”
“এই কথায় তুরকারেস খুব আহত
হলো—আমিও।
কারণ ছেলেটা বানজার মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষদের একজন ছিল। সে আর ভদ্রতার ধার ধারল না, মানিলাকে সোজাসুজি শুনিয়ে
দিল—‘তুমি আমাকে তিনজন অপেরা-মেয়ের চেয়েও বেশি খরচ করিয়েছ, অথচ তারা আমাকে এর চেয়ে ঢের
ভালো বিনোদন দিতে পারত। আহা! কেন যে আমার সেই ছোট মিলিনারের সঙ্গেই থাকলাম না! ও
আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসত। আমি তাকে একটা সাধারণ সিল্কের গাউন দিয়েই সুখী করে
তুলেছিলাম।’”
“মানিলা তুলনা পছন্দ করত না; সে এমন বিকট গলায় চিৎকার করে
উঠল যে, যে কেউ ভয়ে কেঁপে উঠত—‘তুমি এখনই
আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও!’ তুরকারেস তাকে হাড়ে হাড়ে চিনত, তাই জানালার বদলে সিঁড়ি বেয়ে
ভদ্রভাবে নেমে যাওয়াই শ্রেয় মনে করল।”
“এরপর মানিলা আবার ঋণ নিল
এক ব্রাহ্মণের কাছ থেকে, যে নাকি তার দুঃখে সান্ত্বনা দিতে এসেছিল। সেই পবিত্র লোকটি রাজস্ব
সংগ্রাহকের জায়গা দখল করল, আর আমরা তার সান্ত্বনা ফিরিয়ে
দিলাম একই মুদ্রায়। মানিলা আমাকে বহুবার জুয়ায় হেরেছে, কিন্তু
সবাই জানে—অভিজাত সমাজে একমাত্র জুয়ার ঋণই সময়মতো ‘শোধ’ হয়।”
“যখন মানিলার ভাগ্য ভালো
চলে, তখন সে
কঙ্গোর সবচেয়ে সুশৃঙ্খল নারী। খেলার টেবিল বাদ দিলে, তার
আচরণ নিখুঁত—একটা গালিও মুখে আসে না, অতিথিদের ভালোভাবে আপ্যায়ন
করে, ব্যবসায়ীদের পাওনা শোধ করে, চাকরদের উদারহস্তে দান করে, মাঝে মাঝে নিজের
ছোটখাটো জিনিসপত্র বন্ধক থেকে ছাড়ায়, স্বামী আর পোষা
কুকুর দুজনকেই সমান আদর করে। কিন্তু মাসে তিরিশবার সে এই সুন্দর অভ্যাস আর সব অর্থ—সবকিছু বাজি
রাখে একটা ‘স্পেড-এর টেক্কা’র (Ace
of Spades) ওপর। এভাবেই সে বাঁচে, আর
এভাবেই বাঁচবে; আর ঈশ্বরই জানেন, আমাকে আর কতবার বন্ধক রাখতে হবে।”
এই পর্যন্ত বলে রত্নটি
থামল। মাঙ্গোগুল বিশ্রাম নিতে গেলেন। বিকেল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে তিনি অপেরায়
গেলেন—প্রিয়তমাকে
দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য।
ত্রয়োদশ
অধ্যায়: বানজার অপেরা—আংটির ষষ্ঠ পরীক্ষা
বানজার জনসাধারণের বিনোদনের
যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তার মধ্যে কেবল অপেরাই কোনোরকমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল।
সেখানে দুই বিখ্যাত সুরকার—‘উটমিউটসল’ এবং ‘উটরেমিফাসোলাসিউটুট’ যাঁদের
একজন বার্ধক্যে পৌঁছেছেন আর অন্যজন সদ্য উদীয়মান, পালাক্রমে সঙ্গীতমঞ্চ দখল করে রাখতেন। এই দুই
মৌলিক স্রষ্টার প্রত্যেকেরই নিজস্ব গোঁড়া সমর্থক ছিল। অজ্ঞ এবং ধূসর দাড়িওয়ালা
বুড়োরা উটমিউটসলের পক্ষ নিয়ে লড়ত; আর চতুর যুবক ও
ওস্তাদরা উটরেমিফাসোলাসিউটুটের গুণগানে মত্ত থাকত। তবে যাঁরা সত্যিকারের রুচিশীল
মানুষ—তাঁরা তরুণ হোন বা বৃদ্ধ—উভয়কেই উচ্চ মর্যাদায় রাখতেন।
পরবর্তীরা বলতেন, “উটরেমিফাসোলাসিউটুট যখন জ্বলে ওঠেন, তখন তিনি অসাধারণ, তবে
মাঝে মাঝে তিনি ঝিমিয়ে পড়েন; আর বলুন তো, কার সঙ্গেই বা এমনটা হয় না? অন্যদিকে
উটমিউটসল স্থিতিশীল এবং ধারাবাহিক। তিনি সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ, তবে এমন কোনো সৌন্দর্য নেই যার উদাহরণ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কাজেও
পাওয়া যাবে না; আবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর কাজেও আছে এমন
কিছু অনন্য ছোঁয়া, যা কেবল তারই সৃষ্টি।”
বৃদ্ধ উটমিউটসল ছিলেন সরল, স্বাভাবিক ও মসৃণ—কখনও কখনও অতিরিক্ত
মসৃণ; আর এটিই
ছিল তাঁর ত্রুটি। যুবক উটরেমিফাসোলাসিউটুট ছিলেন অনন্য, উজ্জ্বল,
সংযত ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ—কখনও কখনও অতিরিক্ত পাণ্ডিত্যই তাঁর
কাল হতো; কিন্তু
হয়তো এটি শ্রোতাদেরই ভুল। একজনের শুধু এক ধরনের সূচনা বা ভূমিকা ছিল, যা সত্যিই সুন্দর, তবে তাঁর সমস্ত রচনায় এর
পুনরাবৃত্তি ঘটত। অন্যজনের প্রতিটি অংশের জন্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন সূচনা, যার সবকটিই মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য হতো। প্রকৃতি উটমিউটসলকে সঙ্গীতের
পথ দেখিয়েছিল; আর গভীর অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতা
উটরেমিফাসোলাসিউটুটকে সুরের উৎস আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছিল।
“কে জানত কীভাবে সংলাপ
উপস্থাপন করতে হয়? কে একজন বৃদ্ধের চরিত্রকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারত? আর কে-ই বা যুবকের মতো হালকা কাব্য, কামনাময়
সুর এবং চরিত্রানুগ সিম্ফনি রচনা করতে পারত?” উটমিউটসলই ছিলেন একমাত্র
ব্যক্তি, যিনি সংলাপের মর্ম বুঝতেন। কিন্তু
উটরেমিফাসোলাসিউটুটের আগে কেউ আবেগের সেই সূক্ষ্ম ছোঁয়াগুলো চিহ্নিত করতে পারত না—যা কোমলতাকে
কামনাময় থেকে, কামনাময়কে
আবেগপূর্ণ থেকে এবং আবেগপূর্ণকে স্থূল লালসা থেকে আলাদা করে।
কিছু অন্ধ সমর্থক দাবি
করতেন, উটমিউটসলের
সংলাপ যদি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ভালো হয়, তবে এটি
শুধুমাত্র প্রতিভার পার্থক্যের কারণে নয়, বরং ব্যবহৃত
কবি বা গীতিকারদের ভিন্নতার কারণে। “পড়ো, পড়ো,” তারা চিৎকার করে বলত, “সেই ‘ডার্ডানাস’-এর দৃশ্যটি পড়ে দেখো, তবেই তুমি নিশ্চিত হবে যে—যদি আমরা উটরেমিফাসোলাসিউটুটকে
সুন্দর শব্দ বা লিব্রেটো দিতাম, তবে উটমিউটসলের ওই তথাকথিত মনোমুগ্ধকর দৃশ্যগুলোই নতুন করে
পুনরুজ্জীবিত হতো।”
যাই হোক, আমার সময়ে পুরো শহর যুবকের
ট্র্যাজেডি দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত, আবার বুড়োর
ইন্টারলিউড বা বিরতির গানের সময়ও মানুষ একে অপরের গায়ে ঠেলাঠেলি করত।
সেদিন বানজায়
উটরেমিফাসোলাসিউটুটের একটি অসাধারণ গীতিনাট্য প্রদর্শিত হচ্ছিল, যা সাধারণত রাতের বেলাতেই
মঞ্চস্থ হতো—অবশ্য যদি আমাদের প্রিয় সুলতানা কৌতূহলী না
হতেন। তাছাড়া, ‘গোপন রত্ন’দের মধ্যে একধরনের স্বাভাবিক অস্থিরতা
বাদ্যযন্ত্রের প্রতি ঈর্ষাকে উসকে দিচ্ছিল এবং প্রধান অভিনেত্রীকে বিব্রত করছিল। যার
জায়গায় যিনি এসেছিলেন, তিনি কণ্ঠে অতটা ভালো না হলেও, অভিনয়ের
মাধ্যমে সেই অভাব পূরণ করছিলেন। সুলতান ও তাঁর প্রিয়তমা উপস্থিত থেকে সেই
রচনাটিকে সম্মানিত করলেন।
মির্জোজা আগেই এসেছিলেন, মাঙ্গোগুলও এসে উপস্থিত
হলেন। পর্দা উঠল, অভিনয় শুরু হলো।
সবকিছু চমৎকারভাবেই
এগোচ্ছিল। মিস শেভালিয়ার মিস লে মোরের স্মৃতি ম্লান করে দিয়েছিলেন। নাটক তখন
চতুর্থ অঙ্কে। একটি দীর্ঘ কোরাস বা সমবেত সঙ্গীতের মাঝখানে সুলতানের মনে হলো
দৃশ্যটি বড্ড দীর্ঘায়িত হচ্ছে—যা ইতিমধ্যেই প্রিয়তমাকে দুবার হাই তুলতে বাধ্য
করেছে। তিনি ভাবলেন, এই একঘেয়েমি কাটাতে সব গায়িকাদের দিকে আংটি তাক করলে কেমন হয়?
মঞ্চে এমন অদ্ভুত এবং
হাস্যকর দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি।
হঠাৎ করেই ত্রিশজন নারীর
মুখ বন্ধ হয়ে গেল। তাঁরা হাঁ করে রইলেন,
আগের নাট্যভঙ্গিও বজায় রাখলেন, কিন্তু
গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। ঠিক একই সময়ে, তাঁদের
ত্রিশটি ‘গোপন রত্ন’ একসঙ্গে সমস্বরে গান গাইতে শুরু করল!
কারও রত্ন গাইল ‘পঁচানিউফ’, কেউ বা সস্তা ভদ্যভিল গান,
কেউ বা অত্যন্ত অশ্লীল প্যারোডি ধরল—এবং সবই ছিল
তাদের চরিত্রের সঙ্গে মানানসই অতিরঞ্জিত সুরে।
একদিক থেকে ভেসে এল, “ওহ ভ্রাভমান, মা কমেরে, উই;” অন্যদিক থেকে, “কোয়া দ্বাদশ বার?”
এখানে শোনা গেল, “কে আমাকে চুম্বন করছে, ব্লেইস কি?” ওখানে, “কিছুই নয়, পেরি সিপ্রিয়ান, তোমাকে কেউ আটকাচ্ছে না।” অবশেষে, তারা সবাই মিলে এমন এক
উচ্চগ্রামের, কঠিন এবং উন্মাদ সুরে আবদ্ধ হলো, যা ইতিহাসের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং রঙ্গময় কোরাস বা ঐকতান সৃষ্টি করল—যা আগে বা
পরে আর কখনোই শোনা যায়নি...
(এখানে
পাণ্ডুলিপির বাকি অংশ বইপোকার দংশনে নষ্ট হয়ে গেছে—না—দ—ওন—)
ততক্ষণে অর্কেস্ট্রাও বেজে
চলেছে, আর তার
সঙ্গে দর্শকাসনের অট্টহাসি, বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ এবং
রত্নগুলোর গান মিলেমিশে এক ভয়ংকর কাকোফনি বা বেসুরো হট্টগোল তৈরি করল।
কিছু অভিনেত্রী ভয়ে মঞ্চের
পেছনে দৌড়ে পালালেন—পাছে তাঁদের রত্ন গান গাইতে গাইতে ক্লান্ত হয়ে মনের
ভুলেও কোনো গোপন কথা ফাঁস করে দেয়! তবে তাঁরা কেবল ভয় পেয়েই রক্ষা পেলেন। মাঙ্গোগুল
নিশ্চিত হলেন যে, জনসাধারণ এই হট্টগোল থেকে নতুন কিছু শিখবে না। তিনি আংটি ঘুরিয়ে
নিলেন। চোখের পলকে সব রত্ন চুপ করে গেল, হাসির ঝড় থামল,
দর্শক শান্ত হলো। নাটক আবার শুরু হলো এবং শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ
হলো। পর্দা নামল, সুলতানা ও সুলতান প্রস্থান করলেন,
এবং আমাদের অভিনেত্রীদের রত্নগুলো যার যার ব্যক্তিগত কাজে মন
দিল।
এই ঘটনা শহরে প্রচণ্ড হইচই
ফেলে দিল। পুরুষরা হাসল, নারীরা লজ্জায় চমকে উঠল, বানজার সাধারণ মানুষ
বিস্মিত হলো, আর একাডেমিকরা তাদের মস্তিষ্ক খাটাতে বসল।
কিন্তু ডক্টর অরকোটোমাস কী
বললেন? অরকোটোমাস
বিজয়ীর হাসি হাসলেন। তিনি তাঁর স্মারক নোটে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, রত্নরা অনিবার্যভাবেই গান গাইবে; তারা
গেয়েছে। এবং এই ঘটনা, যা তাঁর সহকর্মীদের হতবাক করেছিল,
তাঁর কাছে তা নতুন আলো এবং তাঁর তত্ত্বের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা
প্রদান করল।
চতুর্দশ
অধ্যায়: অর্কোটোমাসের পরীক্ষা ও তার ফলাফল
সেটা ছিল মাসের পনেরো তারিখ, যখন অর্কোটোমাস একাডেমিতে
তাঁর সেই বিখ্যাত স্মারকলিপি পাঠ করেছিলেন এবং ‘গোপন রত্ন’দের বাচালতা সম্পর্কে তাঁর বৈজ্ঞানিক
চিন্তাভাবনা সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। যেহেতু তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিখুঁত
পরীক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—যা তিনি নাকি ব্যক্তিগতভাবে বহুবার সফলভাবে
যাচাই করেছেন—তাই অধিকাংশ মানুষ তাঁর মতবাদে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল। বেশ কিছুদিন সাধারণ
জনগণ তাঁর পক্ষে ছিল; এবং পুরো ছয় সপ্তাহ ধরে অর্কোটোমাসকে এক যুগান্তকারী আবিষ্কারক হিসেবে
গণ্য করা হচ্ছিল।
তাঁর বিজয়রথ সম্পূর্ণ হতে
আর কিছুই বাকি ছিল না, শুধু একাডেমির ভরা মজলিসে সেই জাদুকরী পরীক্ষাগুলো করে দেখানো, যার কথা তিনি এত ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেছিলেন। এই উপলক্ষে আয়োজিত
সমাবেশটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। রাষ্ট্রের বাঘা বাঘা মন্ত্রীরা বৈঠকে উপস্থিত
হয়ে সভার শোভা বর্ধন করছিলেন; স্বয়ং সুলতানও সেখানে
উপস্থিত ছিলেন, তবে ছদ্মবেশে বা অদৃশ্যভাবে।
যেহেতু মাঙ্গোগুল মনে মনে
কথা বলতে বা স্বগতোক্তি করতে পছন্দ করতেন—এবং তাঁর সময়ের অসার কথোপকথন তাঁকে এই
অভ্যাসে আরও পোক্ত করে তুলেছিল—তাই তিনি বিড়বিড় করে বললেন: “হয় এই অর্কোটোমাস একজন চরম ভণ্ড, নতুবা আমার রক্ষক জিনিয়াস (Genie)
একটা আস্ত গাধা। যদি এই তথাকথিত শিক্ষাবিদ—যিনি নিশ্চিতভাবেই
কোনো জাদুকর নন—শুধুমাত্র বিজ্ঞানের জোরে ‘মৃত রত্ন’দের মুখে বুলি
ফোটাতে পারেন; তবে
যে জিনিয়াস আমাকে সাহায্য করছে, সে নিশ্চয়ই শয়তানের কাছে
নিজের আত্মা বিক্রি করে মস্ত ভুল করেছে—কারণ সে এই একই কাজ ‘জীবন্ত রত্ন’দের ওপর করতে
গিয়ে এত কাঠখড় পুড়িয়েছে।”
মাঙ্গোগুল এসব সাতপাঁচ
ভাবছিলেন, এমন
সময় তিনি নিজেকে একাডেমির মাঝখানে আবিষ্কার করলেন। ওর্কোটোমাসের দর্শক হিসেবে
বানজার সেই সব গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা
রত্ন-তত্ত্ব সম্পর্কে কমবেশি জ্ঞান রাখেন। অর্কোটোমাস তাঁদের সন্তুষ্ট করতে চাইলেন
বটে, কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল হলো অত্যন্ত শোচনীয়।
ওর্কোটোমাস একটি ‘মৃত রত্ন’ হাতে নিলেন
(যা তিনি গবেষণার জন্য সঙ্গে এনেছিলেন),
তারপর নিজের মুখ দিয়ে সেটির ভেতরে ফুঁ দিতে শুরু করলেন। ফুঁ দিতে
দিতে তিনি প্রায় দমবন্ধ হওয়ার জোগাড় করলেন, একটু জিরিয়ে
নিলেন, আবার চেষ্টা করলেন। তিনি সঙ্গে করে বিভিন্ন বয়স,
আকার, অবস্থা এবং রঙের রত্ন নিয়ে
এসেছিলেন। কিন্তু হাজারো কসরত করেও, প্রাণপণ ফুঁ দিয়েও
সেগুলোর ভেতর থেকে কোনো কথা বের হলো না; বের হলো শুধু
কিছু অস্পষ্ট শোঁ শোঁ শব্দ—যা তাঁর প্রতিশ্রুত বক্তৃতার ধারেকাছেও
ছিল না।
দর্শকদের মধ্যে হঠাৎ এক
চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল, যা তাঁকে মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত করল; কিন্তু
তিনি নিজেকে সামলে নিলেন এবং খোঁড়া যুক্তি দিলেন যে, এত
বিপুল সংখ্যক মানুষের সামনে এমন সূক্ষ্ম পরীক্ষা করা সহজ নয়—এবং তাঁর এই
যুক্তিটি আংশিক সত্যও ছিল।
মাঙ্গোগুল রাগে গজগজ করতে
করতে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে প্রিয় সুলতানার কক্ষে উপস্থিত
হলেন।
“কী খবর, প্রিন্স,” তাঁকে দেখেই মির্জোজা জিজ্ঞেস
করলেন, “আজ কে
জিতল? আপনি,
নাকি ওর্কোটোমাস? তাঁর রত্নগুলো নিশ্চয়ই
আশ্চর্য সব ভেলকি দেখিয়েছে?”
সুলতান কোনো কথা না বলে
চুপচাপ ঘরের চারপাশে পায়চারি করতে লাগলেন।
“কিন্তু,”
প্রিয়তমা আবার বললেন, “মহামান্যকে দেখে তো বেশ অসন্তুষ্ট মনে হচ্ছে।”
“ওহ! ম্যাডাম, ওর্কোটোমাসের নির্লজ্জতার
কোনো তুলনা হয় না। দয়া করে, এই মুহূর্ত থেকে আমার সামনে
ওর নামটিও উচ্চারণ করবে না—ও একটা আস্ত ধোঁকাবাজ! ভবিষ্যতের প্রজন্ম
কী বলবে, যখন
তারা জানতে পারবে যে মহান মাঙ্গোগুল এমন এক অপদার্থ মানুষকে বছরে এক লাখ ক্রাউন
পেনশন দিচ্ছে; অথচ সেই সব সাহসী অফিসাররা, যাঁরা নিজেদের রক্ত দিয়ে সুলতানের বিজয়মাল্য গেঁথেছেন, তাঁরা বছরে পাচ্ছেন মাত্র বিশ পাউন্ড?—জুভের (Jupiter/Jove)
দিব্যি, এই ভাবনা আমাকে পাগল করে
দিচ্ছে: এই পুরো মাস আমি ভয়ানক মেজাজে থাকব।”
মাঙ্গোগুল এখানে থামলেন এবং
আবার ঘরের চারপাশে হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। তিনি মাথা ঝোঁকালেন, দু-পা এগোলেন, আবার থামলেন, মাঝে মাঝে রাগে মেঝেতে পা ঠুকতে
লাগলেন। এক মুহূর্তের জন্য বসলেন, আবার ধড়ফড় করে উঠে
দাঁড়ালেন। রাগের চোটে তিনি মির্জোজাকে বিদায় জানাতে, এমনকি
চুমু খেতেও ভুলে গেলেন এবং নিজের খাস কামরায় চলে গেলেন।
আফ্রিকান লেখক, যিনি এর্গেবজেদ এবং
মাঙ্গোগুলের মহান ও বিস্ময়কর কর্মের ইতিহাস লিখে অমর হয়ে আছেন, তিনি লিখেছেন: মাঙ্গোগুলের সেই মেজাজ দেখে মনে হয়েছিল, তিনি বুঝি তাঁর রাজ্য থেকে সমস্ত পণ্ডিতকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে
দেবেন। কিন্তু তা হলো না; পরের দিন তিনি বেশ ফুরফুরে
মেজাজে ঘুম থেকে উঠলেন, সকালে রাইডিং হাউসে ব্যায়াম করলেন,
সন্ধ্যায় মির্জোজা ও কিছু প্রিয়পাত্রীর সঙ্গে পার্টি করলেন,
এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুভার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত মনে
করলেন।
কঙ্গোর কিছু অসন্তুষ্ট ও
বিদ্রোহী প্রজা এবং বানজার চায়ের দোকানের সমালোচকরা সুলতানের এই আচরণের খবর ছড়িয়ে
দিল। তারা বলাবলি করতে লাগল: “এই
কি রাজ্য পরিচালনা? দিন কাটছে তীর-ধনুক খেলে, আর রাত কাটছে মদের
টেবিলে।”
“ঠিক আছে, আমি যদি সুলতান হতাম,” চিৎকার করে বললেন এক ছোটখাটো
সিনেটর—যিনি জুয়ায় সর্বস্বান্ত,
স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে এবং সন্তানদের মানুষ করতে ব্যর্থ
হয়েছেন—“তবে আমি কঙ্গোকে এক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য বানাতাম। শত্রুদের
বুকে কাঁপন ধরাতাম, প্রজাদের নয়নের মণি হতাম। ছয় মাসের মধ্যে পুলিশ, আইন, সেনা ও নৌবাহিনীকে সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে
তুলতাম। সাগরে ভাসত আমার শত শত যুদ্ধজাহাজ। মাঠঘাট পরিষ্কার হতো, বড় বড় রাস্তা সংস্কার হতো। আমি কর প্রথা বন্ধ করে দিতাম, বা অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনতাম। আর পেনশন? ওইসব
তথাকথিত মেধাবী বাবুরা শুধু চেটেপুটে দেখত, পেত না। ভালো
অফিসাররা, পঙ্গো সাবিয়াম! পুরনো সৈন্যরা, আর সেই সব বিচারক যারা রাতদিন এক করে মানুষের বিচার করেন—এরাই হলো
সেই মানুষ, যাদের
আমি দুহাতে দান করতাম।”
একজন বৃদ্ধ, দন্তহীন রাজনীতিবিদ—যার চুলে তেল
চপচপ করছে, কোটের
কনুই ছেঁড়া এবং জামার হাতা ঝুলে পড়েছে—তিনি বললেন, “তোমরা কি আমাদের মহান সম্রাট আবদেলমালেকের কথা ভুলে গেছ? সেই আইবিসিনিয়ান বংশের রাজা,
যিনি ২৩৮৫ বছর আগে শাসন করেছিলেন? তোমরা
কি ভুলে গেছ, তিনি দুজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে শূলে
চড়িয়েছিলেন শুধুমাত্র গণনায় সামান্য ভুলের জন্য? আর তাঁর
প্রধান চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসককে জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন, অসময়ে জোলাপের ডোজ দেওয়ার অপরাধে? আহা! সে ছিল
এক স্বর্ণযুগ!”
আরেকজন বললেন, “আমি জিজ্ঞেস করছি, সেই অলস ব্রাহ্মণদের (পুরোহিতদের) কী কাজে লাগে, যারা আমাদের রক্ত চুষে খেয়ে ভুঁড়ি বাড়াচ্ছে? তাদের
ওই বিপুল সম্পদ কি আমাদের মতো সৎ মানুষের পকেটেই বেশি মানানসই হতো না?”
অন্য এক জটলা থেকে ভেসে এল, “চল্লিশ বছর আগেও কি লোরেনের এই নতুন কায়দার রান্না বা মদ্যপানের চল
ছিল? আমাদের
শাসকরা বিলাসিতায় ডুবে গেছেন, যা সাম্রাজ্যের ধ্বংস ডেকে
আনছে। এটা প্যাগোডার (ধর্মের) অবমাননা আর নৈতিক অবক্ষয়ের ফল। যখন মানুষ কেবল
সাধারণ মাংস খেত, আর ‘কানাগ্লু’র টেবিলে কেবল শরবত পান করত; তখন ওইসব শৌখিন কাগজের সাজ,
মার্টিনের বার্নিশ, আর রামো-র (Rameau)
সঙ্গীতের কোনো কদর ছিল? অপেরা-মেয়েরাও
তখন এত নিষ্ঠুর ছিল না, এবং অনেক সস্তায় পাওয়া যেত।
প্রিন্স, আপনি অনেক ভালো জিনিস নষ্ট করছেন। কিন্তু আমি
যদি সুলতান হতাম——”
“তুই যদি সুলতান হতিস,”
রাগে গর্জে উঠলেন এক বৃদ্ধ অফিসার, যিনি
ফোঁনতেনয় যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছেন এবং লাউফেল্টের যুদ্ধে প্রিন্সের জন্য নিজের এক
হাত হারিয়েছেন, “তবে
তুই এখন যে নির্লজ্জতা দেখাচ্ছিস, তার চেয়েও বড় ভুল করতিস। ওরে বাছা, তুই নিজের
জিভটাই সামলাতে পারিস না, আর এসেছিস রাজ্য শাসনের স্বপ্ন
দেখতে! পৃথিবীর ক্ষমতাকে সম্মান করতে শেখ, এবং দেবতাদের
ধন্যবাদ দে যে তোর জন্ম হয়েছে এমন এক সাম্রাজ্যে, এমন এক
প্রিন্সের শাসনকালে—যিনি তাঁর মন্ত্রীদের শিক্ষিত করেন, যাঁর সৈন্যরা তাঁর সাহসের
প্রশংসা করে; যিনি শত্রুদের চোখে ভয় দেখেছেন, আর প্রজাদের ভালোবেসেছেন; এবং যাঁর একমাত্র
ত্রুটি হলো তোর মতো অকৃতজ্ঞ বাচালদের প্রতি দয়ালু আচরণ করা।”
পঞ্চদশ
অধ্যায়: ব্রাহ্মণদের আবির্ভাব
পণ্ডিতরা যখন ‘গোপন রত্ন’ নিয়ে মাথা
ঘামাতে ঘামাতে হয়রান হয়ে পড়ল, তখন ব্রাহ্মণরা (পুরোহিতরা) সেই ফাঁকা ময়দান দখল করে নিল। ধর্ম এই
বাচালতাকে নিজের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় বলে ঘোষণা করল; আর তার
মন্ত্রীরা (পুরোহিতরা) দাবি করল যে, এই ঘটনার পেছনে স্বয়ং
ব্রহ্মার হাত রয়েছে।
ধর্মগুরু বা পন্টিফদের একটি
সাধারণ সভা ডাকা হলো। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যে, দেশের সেরা লেখকদের দিয়ে
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণ করানো হবে—বিষয়টি পুরোপুরি অতিপ্রাকৃত। এবং
যতদিন না তাঁদের সেই মহান রচনা প্রকাশিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত স্কুল-কলেজে, ব্যক্তিগত আড্ডায়, বিবেকের শাসনে এবং জনসমক্ষে
থিসিস আকারে এই মতবাদই প্রচার ও রক্ষা করা হবে।
এখন, যদিও তাঁরা সবাই একবাক্যে
মেনে নিয়েছিলেন যে ঘটনাটি অলৌকিক; তবুও এর কারণ নিয়ে
কঙ্গোর পুরোহিত সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল—এক ধরনের ‘ম্যানিচেইজম’ (Manichaeism - শুভ ও অশুভ শক্তির দ্বন্দ্ব)
মতবাদের মতো।
১. ঘরকুনো ব্রাহ্মণ:
যারা খুব কমই নিজেদের ঘর থেকে বের হয় এবং ধর্মগ্রন্থ ছাড়া আর কোনো বই উল্টে দেখে
না, তারা এই
অলৌকিক ঘটনার জন্য সোজাসুজি ব্রহ্মাকেই দায়ী করল। “ব্রহ্মা ছাড়া আর কার সাধ্য আছে,”
তারা বলল, “যে প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথকে এভাবে বদলে দিতে পারে? সময় হলে দেখা যাবে যে,
এই সবকিছুর পেছনে তাঁর কোনো গভীর উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে।”
২. রসিক ব্রাহ্মণ: যারা
এর উল্টো, অর্থাৎ
যারা প্রার্থনাকক্ষের চেয়ে বরং নারীদের শোবার ঘরেই বেশি সময় কাটায় এবং যাদের
পায়খানার চেয়ে বিছানাতেই বেশি অলৌকিক ঘটনা ঘটে—তারা পড়ল মহাবিপদে। তারা ভয় পেল, পাছে কোনো অবিবেচক ‘রত্ন’ মুখ ফসকে তাদের
নিজেদের ভণ্ডামিই ফাঁস করে দেয়! তাই তারা এই বাচালতার দায় চাপিয়ে দিল ‘কদাব্রা’র ওপর—একজন
দুষ্টু দেবতা, যিনি
ব্রহ্মা ও তাঁর সেবকদের চরম শত্রু। এই দ্বিতীয় মতবাদটি অবশ্য অনেক কঠিন আপত্তির
মুখে পড়ল, কারণ এটি মানুষকে নীতি-নৈতিকতার পথে ফেরানোর
চেয়ে ভয় দেখাতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। এমনকি এর প্রবক্তারাও খুব একটা জোর দিয়ে এটি
প্রচার করতে পারছিল না। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য তো নিজেদের চামড়া বাঁচানো; আর সেটা করার জন্য ধর্মের এমন একজন মন্ত্রীও ছিল না, যে প্রয়োজনে প্যাগোডা আর তার বেদিগুলোকে শতবার বলি দিতে প্রস্তুত নয়।
মাঙ্গোগুল এবং মির্জোজা
নিয়মিত ব্রহ্মার ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন,
আর পুরো সাম্রাজ্য খবরের কাগজের মাধ্যমে সে কথা জানতে পারত। মহান
মসজিদে একটি বিশেষ উৎসব পালনের দিন ধার্য করা হলো, এবং
তাঁরা সেখানে উপস্থিত হলেন।
যে ব্রাহ্মণের ওপর সেদিন
ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যা করার ভার পড়েছিল,
তিনি মঞ্চে আরোহণ করলেন। সুলতান এবং তাঁর প্রিয়তমার ওপর একগাদা
চাটুকারিতা আর প্রশংসার বন্যা বইয়ে দেওয়ার পর, তিনি
ধর্মীয় সভায় বসার নিয়মকানুন নিয়ে এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুরু করলেন। তিনি ইতিমধ্যেই
বহু ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করে ফেলেছিলেন যে—কেন এমন নিয়ম
মানা জরুরি; ঠিক
তখনই হঠাত এক পবিত্র উন্মাদনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি এমন এক ঘোষণা দিলেন, যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত হওয়ায় এর প্রভাব হলো মারাত্মক।
“আমি এসব কী শুনছি? চারদিকে এ কিসের
বিভ্রান্তিকর গুঞ্জন? এক অশ্রুত শব্দ আমার কানে এসে আঘাত
করছে। সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে! বাণীর যে পবিত্র ক্ষমতা ব্রহ্মার দয়ায় এতদিন কেবল
জিহ্বার জন্যই নির্দিষ্ট ছিল, আজ তাঁর অভিশাপে তা অন্য
অঙ্গে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর কোন অঙ্গে? তা আপনারা ভালো
করেই জানেন, ভদ্রমহোদয়গণ! হে অকৃতজ্ঞ জাতি! তোমাদের
কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙানোর জন্য কি নতুন কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রয়োজন ছিল? তোমাদের পাপের সাক্ষী কি যথেষ্ট ছিল না যে, আজ
পাপের প্রধান যন্ত্রগুলোকেই মুখ ফুটে কথা বলতে হচ্ছে? নিঃসন্দেহে
পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে; তাই স্বর্গের ক্রোধ এখন নতুন
শাস্তির পথ খুঁজছে।”
“বৃথাই তোমরা নিজেদের
অন্ধকারে লুকিয়ে রেখেছিলে, বৃথাই তোমরা পাপের নীরব সঙ্গী বেছে নিয়েছিলে: এখন কি তোমরা তাদের কথা
শুনতে পাচ্ছ না? তারা চারদিক থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দিচ্ছে, আর মহাবিশ্বের কাছে তোমাদের নীচতাকে
উলঙ্গ করে দিচ্ছে। হে ব্রহ্মা! তুমি, যিনি প্রজ্ঞা দিয়ে
জগত শাসন করো! তোমার বিচার বড়ই কঠোর, কিন্তু ন্যায্য।”
“তোমার আইন চুরি, মিথ্যা দিব্যি, মিথ্যাচার এবং ব্যভিচারকে ঘৃণা করে। এটি অপবাদের অন্ধকার, উচ্চাকাঙ্ক্ষার ষড়যন্ত্র, ঘৃণার উন্মত্ততা এবং
কপটতার কৌশলকে নিষিদ্ধ করে। তোমার বিশ্বস্ত মন্ত্রীরা (আমরা) তোমার সন্তানদের কাছে
এই সত্যগুলো ঘোষণা করতে কখনো পিছপা হয়নি, এবং সেই শাস্তির
ভয় দেখিয়েছে যা তুমি অবাধ্যদের জন্য জমা করে রেখেছ। কিন্তু সব বৃথা! মূর্খরা তাদের
কামনার স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছে, তারা আমাদের
উপদেশকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে, আমাদের হুমকিকে উপহাস করেছে,
আমাদের অভিশাপকে ফাঁকা আওয়াজ বলে মনে করেছে। তাদের পাপ জমে জমে
পাহাড় হয়েছে; তাদের অধর্মের কোলাহল তোমার সিংহাসন পর্যন্ত
পৌঁছেছে, আর আমরা সেই ভয়ঙ্কর আঘাতকে ঠেকাতে পারিনি,
যা দিয়ে তুমি আজ তাদের শাসন করছ। তোমার দয়ার জন্য দীর্ঘকাল
প্রার্থনা করার পর, এখন আমরা তোমার ন্যায়বিচারকেই
মহিমান্বিত করি। তোমার এই আঘাতে জর্জরিত হয়ে, নিঃসন্দেহে
তারা তোমার কাছে ফিরে আসবে এবং সেই হাতটিকে চিনতে পারবে যা তাদের ওপর ভারী হয়ে
নেমেছে।”
“কিন্তু হায়! কী পাষাণ হৃদয়
এদের! কী অন্ধত্ব! তারা তোমার এই অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশকেও প্রকৃতির অন্ধ
যান্ত্রিকতার ফল বলে মনে করছে। তারা মনে মনে বলছে—ব্রহ্মা বলে কেউ নেই। পদার্থের সব
গুণাগুণ আমাদের জানা নেই, আর নতুন কোনো ঘটনার অস্তিত্ব কেবল আমাদের অজ্ঞতাই প্রমাণ করে—ঈশ্বরের অস্তিত্ব
নয়। এই ভ্রান্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তারা নতুন নতুন থিওরি বানাচ্ছে, অনুমান করছে, পরীক্ষা চালাচ্ছে: কিন্তু অনন্ত ধাম থেকে ব্রহ্মা তাদের এই ছেলেমানুষি
দেখে হাসছেন। তিনি তাদের অহংকারী বিদ্যাকে বিভ্রান্ত করেছেন, আর কাঁচের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছেন সেই সব যুক্তিকে—যা দিয়ে তারা
‘রত্ন’দের বাচালতাকে
ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিল।”
“অতএব, সেই অহংকারী কীটরা তাদের
যুক্তির অসারতা এবং তাদের প্রচেষ্টার ব্যর্থতা স্বীকার করুক। তারা ব্রহ্মার
অস্তিত্ব অস্বীকার করা বন্ধ করুক, কিংবা তাঁর ক্ষমতার
সীমা নির্ধারণ করার ধৃষ্টতা না দেখাক। ব্রহ্মা আছেন, তিনি
সর্বশক্তিমান; এবং তাঁর দয়ার চেয়ে তাঁর এই ভয়ঙ্কর আঘাতেই
আমরা তাঁকে বেশি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি।”
“কিন্তু কে এই অভিশাপ এই
হতভাগ্য দেশের ওপর ডেকে এনেছে? এটা কি তোমার অবিচার নয়, ওহে লোভী অবিশ্বাসী
মানুষ? তোমার নোংরা প্রেমলীলা আর সস্তা আবেগ, ওহে পার্থিব নির্লজ্জ নারী! তোমার বাড়াবাড়ি আর জঘন্য মদ্যপান, ওহে কুখ্যাত ভোগী পুরুষ! আমাদের মঠগুলোর প্রতি তোমার পাথরের মতো কঠিন
হৃদয়, ওহে কৃপণ ধনী! তোমার অবিচার, ওহে দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারক! তোমার সুদের কারবার, ওহে অতৃপ্ত মহাজন! তোমার মেরুদণ্ডহীন চাটুকারিতা, ওহে ধর্মহীন সভাসদ!”
“এবং তোমরা, যাদের ওপর এই অভিশাপ
বিশেষভাবে বর্ষিত হয়েছে—ওহে উচ্ছৃঙ্খল নারী ও কুমারীগণ! যদিও আমরা, আমাদের পেশার খাতিরে,
তোমাদের উশৃঙ্খল আচরণের বিষয়ে গভীর নীরবতা পালন করি; কিন্তু তোমরা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি বিরক্তিকর এক কণ্ঠস্বর বহন করে
চলেছ। এটি তোমাদের ছায়ার মতো অনুসরণ করে, এবং সব জায়গায়
তোমাদের তথাকথিত বিশুদ্ধ আকাঙ্ক্ষা, সন্দেহজনক সম্পর্ক,
অপরাধমূলক কথোপকথন, পুরুষকে খুশি করার
অতিরিক্ত যত্ন, আকর্ষণ করার সস্তা কৌশল, ধরে রাখার দক্ষতা, এবং তোমাদের আবেগের
উন্মত্ততা ও ঈর্ষার ক্রোধের জন্য তিরস্কার করতে থাকে। তাহলে কেন তোমরা কদাব্রার
জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে ব্রহ্মার স্নিগ্ধ ছায়ায় ফিরে আসতে দেরি করছ? কিন্তু যাক, আমরা আমাদের মূল বিষয়ে ফিরে আসি।
তাহলে আমি বলছিলাম যে, দুনিয়াদাররা ধর্মবিরুদ্ধভাবে বসে,
এবং এর নয়টি কারণ আছে; প্রথমটি হলো...”
এই বক্তৃতা মানুষের মনে
বিচিত্র সব প্রভাব ফেলল। মাঙ্গোগুল এবং সুলতানা, যাঁরা আংটির আসল রহস্য জানতেন, তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে—ব্রাহ্মণ ধর্মের দোহাই দিয়ে ‘রত্ন’দের কথা বলার
বিষয়টিকে ঠিক ততটাই সফলভাবে (মানে ভুলভাবে) ব্যাখ্যা করেছেন, যতটা অর্কোটোমাস যুক্তির
আলোতে করার চেষ্টা করেছিলেন।
দরবারের মহিলারা এবং শৌখিন
বাবুরা (Petits-maîtres) এই ধর্মোপদেশকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ এবং প্রচারককে
‘পাগল
স্বপ্নদর্শী’ বলে ঘোষণা করলেন। কিন্তু বাকি শ্রোতারা তাঁকে ‘নবী’ বা পয়গম্বর
বলে গণ্য করলেন; তাঁরা
চোখের জল ফেললেন, প্রার্থনা করলেন, এমনকি আবেগে আত্ম-প্রহারও করলেন—কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না, কেউ তাদের পাপী জীবনযাত্রার
ধারা এতটুকুও পরিবর্তন করল না।
এই ধর্মোপদেশের খবর কফি
হাউস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি কফির কাপে চুমুক দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে
ঘোষণা করলেন যে, ব্রাহ্মণ
বিষয়টি খুব ভাসাভাসাভাবে আলোচনা করেছেন এবং তাঁর বক্তৃতা ছিল কেবল একটি “ঠান্ডা ও স্বাদহীন
ঘোষণা”।
কিন্তু ধর্মপ্রাণ মহিলা এবং তথাকথিত জ্ঞানীদের মতে, এটি ছিল গত একশ বছরে মন্দিরগুলোতে দেওয়া “সবচেয়ে শক্তিশালী
ও অগ্নিঝরা ভাষণ”।
এবং আমার বিনীত মতে, বুদ্ধিমান ব্যক্তি এবং
ধর্মপ্রাণ মহিলা—উভয়ই যার যার জায়গায় সঠিক ছিলেন।
ষোড়শ
অধ্যায়: মুখবন্ধ বা রত্ন-টুপি (The Muzzles)
ব্রাহ্মণরা যখন ব্রহ্মার
নাম জপছিলেন, ধুমধাম
করে শোভাযাত্রা বের করে তাঁদের প্যাগোডাগুলোতে হাওয়া খাওয়াচ্ছিলেন এবং সাধারণ
মানুষকে পাপস্বীকারের জন্য উৎসাহিত করছিলেন; তখন অন্য
একদল মানুষ ভাবছিল—কীভাবে এই ‘গোপন রত্ন’দের বাচালতাকে কাজে লাগিয়ে দুপয়সা কামানো
যায়।
বড় বড় শহরগুলো সাধারণত
এমন সব লোকে গিজগিজ করে, যাদের অভাব ও দারিদ্র্য দারুণ পরিশ্রমী করে তোলে। তারা ঠিক ছিঁচকে চোর
বা পকেটমার নয়; কিন্তু পকেটমাররা জুয়াড়িদের কাছে যা,
এরাও পকেটমারদের কাছে ঠিক তাই (মানে এক কাঠি সরেস)। এরা সব জানে,
সব করে। তারা সব জায়গায় বিরাজমান, সব
দলেই তাদের অবারিত দ্বার। রাজদরবার, শহর, আদালত, গির্জা, নাট্যশালা,
মহিলাদের প্রসাধন কক্ষ, কফি হাউস,
বলরুম, অপেরা কিংবা একাডেমি—কোথায় নেই
তারা!
আপনি তাদের কাছে যা চাইবেন, তারা তাই হয়ে যাবে। আপনি কি
পেনশন চাইছেন? মন্ত্রীর কানে তাদের বিশেষ প্রবেশাধিকার
আছে। আপনার কি কোনো মামলা চলছে? তারা আপনার হয়ে তদ্বির
করবে। আপনি কি জুয়া খেলতে ভালোবাসেন? তারা আপনার জন্য
আসর বসিয়ে দেবে; ভালো খাবার চান? তাদের নিজস্ব বাবুর্চি আছে। নারীসঙ্গ চান? তারা
আপনাকে আমিনা বা আকারিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। এখন এই দুটির মধ্যে কোনটি
থেকে আপনি রোগ বাঁধাতে চান আর কোনটি থেকে রোগ সারাতে চান—সেটা আপনার
পছন্দ; তারা
আপনার চিকিৎসার দায়িত্বও নেবে।
তাদের প্রধান কাজ হলো
ব্যক্তিগত মানুষের গোপন কেলেঙ্কারি খুঁজে বের করা এবং জনসাধারণের বোকামিকে পুঁজি
করে নিজেদের আখের গোছানো। এদের মাধ্যমেই রাস্তায়, মন্দিরের গেটে, নাট্যশালার
দরজায় এবং অন্যান্য জনসমাগমস্থলে হাতে হাতে লিফলেট বা বিজ্ঞাপন বিলি করা হয়। যার
মাধ্যমে আপনাকে বিনামূল্যে জানানো হয় যে—লুভরে, সেন্ট জনস, টেম্পল বা
অ্যাবেতে, অমুক সাইনবোর্ডের নিচে বসবাসকারী অমুক মহান
ব্যক্তি সকাল নয়টা থেকে দুপুর পর্যন্ত বাড়িতে বসে মানুষকে ঠকান এবং দিনের বাকি
সময়টা বাইরে গিয়ে ঠকান।
রত্নগুলো কথা বলতে শুরু
করার সঙ্গে সঙ্গেই, এই ধরনের এক ধূর্ত ফন্দিবাজ বানজার ঘরে ঘরে নিচের বয়ান ও ফরম্যাটে
ছাপানো এক বিজ্ঞপ্তি বিলি করে দিল:
“ভদ্রমহিলাদের
জন্য সুখবর!” (নিচে ছোট অক্ষরে লেখা): মহান সেনেশালের বিশেষ অনুমতি এবং রয়্যাল
একাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর ভদ্রমহোদয়গণের অনুমোদনক্রমে।
বানজার রয়্যাল একাডেমির
মাননীয় সদস্য সিয়র ইওলিওপিলা (Sieur
Aeoliopile); যিনি একাধারে মোনোএমুগির রয়্যাল সোসাইটি, বিয়াফারার
ইম্পেরিয়াল একাডেমি, লোয়াংগোর কৌতূহলী সংঘ, মোনমোটাপার কামুর সোসাইটি, ইরিকো ইনস্টিটিউট
এবং বেলেগুয়ানজা ও অ্যাঙ্গোলার রয়্যাল একাডেমির সম্মানিত সদস্য; এবং যিনি বহু বছর ধরে রাজদরবার, শহর ও
প্রদেশের গুণীজনদের প্রশংসায় ‘রত্ন-বিদ্যা’র ওপর কোর্স পরিচালনা করে আসছেন;
তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে
জানাচ্ছে যে, তিনি
সুন্দরী নারীদের সুবিধার্থে একধরনের ‘মুখবন্ধ’ বা ‘পোর্টেবল গ্যাগ’ (Portable Gag) আবিষ্কার করেছেন। এটি রত্নদের প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক কাজকর্ম (যেমন:
প্রেমলীলা) ব্যাহত না করেই তাদের কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। এটি দেখতে যেমন
পরিপাটি, ব্যবহারেও তেমনই সুবিধাজনক।
তাঁর কাছে সব আকারের, সব দামের এবং সব বয়সের
নারীদের উপযোগী মুখবন্ধ মজুদ আছে। তিনি সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তিদের
সেবা করার গৌরব অর্জন করেছেন।
কাজটি যতই হাস্যকর হোক না
কেন, তা অভাবনীয়
সাফল্য পেল। এভাবেই ইওলিওপিলার আবিষ্কার রাতারাতি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠল। লোকেরা
তাঁর বাড়িতে মৌমাছির মতো ভিড় জমাতে লাগল। উচ্ছল অভিজাত মহিলারা নিজেদের
বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে সেখানে যেতেন; বিচক্ষণ ও
গোপনীয়তা-প্রিয় মহিলারা যেতেন ভাড়া করা গাড়িতে; ধর্মপ্রাণরা
পাঠাতেন তাদের স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী যাজক বা বিশ্বস্ত ভৃত্যদের; আর সন্ন্যাসিনীরা পাঠাতেন তাদের আশ্রমের দ্বাররক্ষকদের। প্রত্যেকেরই
একটি করে মুখবন্ধ বা ‘গ্যাগ’ দরকার ছিল—ডাচেস থেকে শুরু করে মুচির বউ পর্যন্ত
কেউই এই ফ্যাশন বা প্রয়োজনের বাইরে থাকতে চাইল না।
ব্রাহ্মণরা, যাঁরা রত্নদের এই বাচালতাকে ‘ঈশ্বরের শাস্তি’ বলে ঘোষণা
করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে সমাজের নৈতিক সংস্কার ও নিজেদের প্রতিপত্তি বাড়ার স্বপ্ন
দেখছিলেন—তাঁরা এমন একটি যন্ত্র বাজারে আসতে দেখে আতঙ্কিত না হয়ে পারলেন না।
কারণ, এই
যন্ত্রটি স্বর্গের প্রতিশোধ এবং তাঁদের যাবতীয় পরিকল্পনাকে এক তুড়িতে নস্যাৎ করে
দিচ্ছিল।
তাঁরা সবেমাত্র ধর্মসভা শেষ
করে মিম্বর থেকে নেমেছিলেন, কিন্তু খবর পেয়ে আবার হন্তদন্ত হয়ে সেখানে উঠে পড়লেন। তাঁরা
বজ্রকণ্ঠে গর্জন করলেন, অভিশাপ দিলেন, ভবিষ্যৎবাণীর দোহাই পাড়লেন এবং ঘোষণা করলেন যে—এই ‘মুখবন্ধ’ আসলে এক নরকীয়
যন্ত্র, এবং যারা
এটি ব্যবহার করবে তাদের কোনো মুক্তি নেই।
“হে কামুক নারীগণ, তোমাদের ওই শয়তানি মুখবন্ধ
ত্যাগ করো! ব্রহ্মার ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করো,” তাঁরা চিৎকার করে বললেন,
“তোমাদের রত্নদের
কণ্ঠস্বরকে তোমাদের বিবেকের কণ্ঠস্বর জাগিয়ে তুলতে দাও। যেসব অপরাধ করতে তোমরা
লজ্জা পাওনি, আজ
সেগুলো স্বীকার করতে কেন লজ্জা পাচ্ছ?”
কিন্তু তাঁদের এই চিৎকারে
বিশেষ কোনো কাজ হলো না। মুখবন্ধের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই একই পরিণতি হলো, যা কিছুদিন আগে ‘হাতাকাটা গাউন’-এর ক্ষেত্রে
হয়েছিল (ধর্মগুরুরা বারণ করা সত্ত্বেও যা নারীরা দেদারসে পরেছিল)। প্রচারকরা মন্দিরের
বেদিতে বসে চেঁচাতে চেঁচাতে গলা শুকিয়ে ফেললেন, কিন্তু কেউ ফিরেও তাকাল না। সমস্ত মহিলাই ওই ‘গ্যাগ’ কিনে নিলেন
এবং ততদিন পর্যন্ত তা ব্যবহার করলেন,
যতদিন না তাঁরা সেগুলোকে অকেজো মনে করলেন কিংবা সেগুলোর প্রতি
আগ্রহ হারিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
সপ্তদশ
অধ্যায়: দুই ধর্মপ্রাণ মহিলা
কিছুদিন ধরে সুলতান ‘গোপন রত্ন’দের শান্তিতে
থাকতে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তিনি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, তাঁর জাদুকরী আংটির প্রয়োগ
সাময়িকভাবে স্থগিত ছিল। ঠিক এই অবসরে বানজা শহরের দুই মহিলা পুরো শহরের জন্য চরম
বিনোদনের খোরাক হয়ে উঠলেন।
তাঁরা ছিলেন পেশাদার ‘ধর্মপ্রাণ’ মহিলা। নিজেদের
গোপন কুকর্মগুলো তাঁরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলে চলতেন এবং এমন এক নির্মল খ্যাতির
অধিকারী ছিলেন যে, তাঁদের নিজেদের শ্রেণীর অন্য মহিলারাও ঈর্ষা করার বদলে তাঁদের সম্মান
করত। মসজিদগুলোতে তাঁদের গুণগান ছাড়া আর কোনো আলোচনাই হতো না। মায়েরা তাঁদের
কন্যাদের কাছে এবং স্বামীরা তাঁদের স্ত্রীদের কাছে এই দুজনকে আদর্শ সতীসাধ্বী নারী
হিসেবে উদাহরণ দিতেন।
তাঁদের দুজনেরই মূলমন্ত্র
ছিল—‘কলঙ্কই
হলো সবচেয়ে বড় পাপ’। এই বিষয়ে তাঁদের মতের মিল ছিল; আর তাছাড়া, সহজ খরচে একজন তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন ও ধূর্ত প্রতিবেশীকে শিক্ষিত করার
সুবিধা তাঁদের মেজাজের পার্থক্যকে ছাপিয়ে গিয়েছিল—তাই তাঁরা ছিলেন হরিহর আত্মা বা প্রাণের
বান্ধবী।
জেলিদা সোফিয়ার ব্রাহ্মণ বা
ধর্মগুরুকে নিজের গুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন; এবং সোফিয়ার বাড়িতে বসেই জেলিদা তাঁর গুরুর
সঙ্গে পরামর্শ করতেন। সামান্য আত্ম-বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়, একজন অন্যজনের ‘গোপন রত্ন’ সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ থাকার কথা নয়।
কিন্তু ইদানীং রত্নদের এই অদ্ভুত বাচালতা তাঁদের দুজনকেই কঠিন দুশ্চিন্তায় ফেলে
দিয়েছিল। তাঁরা মনে করছিলেন, তাঁরা এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন—যেকোনো মুহূর্তে তাঁদের মুখোশ খুলে যেতে
পারে এবং পনেরো বছরের অমানসিক ভান ও অভিনয়ে অর্জিত ‘সতীত্বের’ ফানুস ফুটো হয়ে যেতে পারে। এই চিন্তা
তাঁদের যারপরনাই বিব্রত করছিল।
মাঝে মাঝে তাঁরা এতটাই হতাশ
হয়ে পড়তেন যে, পরিচিত
অন্য নারীদের মতো কলঙ্কিত হওয়ার চেয়ে আত্মহত্যা করাকেই শ্রেয় মনে করতেন—বিশেষ করে জেলিদা।
“পৃথিবী কী বলবে? আমার স্বামী কী করবেন?” জেলিদা আবেগের চোটে চিৎকার
করে উঠলেন, “কী!
সেই মহিলা—যিনি এত সংযত, এত বিনয়ী, এত গুণবতী—সেই জেলিদাও
কিনা অন্যদের মতোই, কেবল... হায়! এই চিন্তা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে! হ্যাঁ, আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যদি কোনো খ্যাতিই
না পেতাম, তবেই ভালো হতো।”
তিনি তখন তাঁর বান্ধবী
সোফিয়ার সঙ্গে ছিলেন, যিনি মনে মনে একই কথা ভাবছিলেন, কিন্তু
জেলিদার মতো অতটা নাটকীয় আবেগ দেখাচ্ছিলেন না। জেলিদার শেষ কথাগুলো শুনে তিনি হেসে
ফেললেন।
“হাসুন, ম্যাডাম, কোনো বাধা ছাড়াই হাসুন। একেবারে ফেটে পড়ুন,” জেলিদা আহত হয়ে বললেন,
“নিশ্চয়ই আপনার হাসার
খুব ভালো কারণ আছে।”
“আমি আসন্ন বিপদ সম্পর্কে
আপনার মতোই সচেতন,” সোফিয়া উদাসীনভাবে উত্তর
দিলেন, “কিন্তু
সেটা এড়ানোর উপায় কী? কারণ আপনি নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, আপনার
ওই ইচ্ছা পূরণ হওয়ার (খ্যাতি না পাওয়ার) কোনো সম্ভাবনা নেই।”
“তাহলে একটা উপায় বের করুন,”
জেলিদা বললেন।
“ওহ!” সোফিয়া বললেন, “আমি আমার মগজ ধোলাই করতে করতে ক্লান্ত, কিন্তু কিছুই খুঁজে পাচ্ছি
না। একটা উপায় হলো—গ্রামের কোনো বাড়িতে নিজেকে কবর দেওয়া; কিন্তু বানজার আনন্দ ত্যাগ
করা আর জীবন ত্যাগ করা আমার কাছে একই কথা, ওটা আমি কখনোই
করব না। আর আমি এটাও বুঝতে পারছি যে আমার ‘রত্ন’ কখনোই এই সন্ন্যাস-জীবন অনুমোদন
করবে না।”
“তাহলে কী করণীয়?”
“কী আর? সব কিছু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে
দিন, আর আমার মতো করে হাসুন—দুনিয়া কী ভাবল, তা নিয়ে আমি থোড়াই কেয়ার
করি। আমি খ্যাতি আর আনন্দ—দুটোকেই একসঙ্গে ভোগ করার সবরকম চেষ্টা
করেছি; কিন্তু
যেহেতু এখন খ্যাতি ত্যাগ করতেই হবে, তাই অন্তত আনন্দটুকু
তো রক্ষা করি। আমরা অনন্য ছিলাম, কিন্তু এখন, প্রিয় জেলিদা, আমরা লক্ষ লক্ষ সাধারণ নারীর
কাতারেই নামব; এটাকে কি আপনি খুব কঠিন ভাগ্য বলে মনে করেন?”
“হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে,” জেলিদা উত্তর দিলেন, “আমার কাছে এটা খুবই কঠিন মনে হয়—যাদের প্রতি
আমি চরম ঘৃণা পোষণ করতাম, আজ তাদেরই মতো হয়ে যাওয়া। এই অপমান এড়ানোর জন্য আমার মনে হয় আমি
পৃথিবীর শেষ প্রান্তে পালিয়ে যাব।”
“বেরিয়ে পড়ুন, প্রিয়,” সোফিয়া বলে চললেন, “আমার কথা যদি বলেন, আমি এখানেই থাকছি—তবে, আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি
যে আপনার রত্নটিকে রাস্তায় বাচালতা করা থেকে বিরত রাখতে কিছু ‘গোপনীয়তা’ সঙ্গে নিয়ে
যান।”
“সত্যিই,”
জেলিদা উত্তর দিলেন, “এখন এমন ঠাট্টা খুব খারাপ লাগছে, আর আপনার এই নির্লজ্জতা—”
“আপনি ভুল করছেন, জেলিদা, আমার আচরণে এক বিন্দুও নির্লজ্জতা নেই। যখন আমরা কোনো কিছু থামাতে পারি
না, তখন তাকে নিজের পথে চলতে দেওয়াটাই হলো আত্মসমর্পণ।
আমি দেখছি যে আমি অপমানিত হতে চলেছি: ঠিক আছে, তাহলে
অপমানের বদলা হিসেবে আমি যতটা সম্ভব অস্বস্তি থেকে নিজেকে বাঁচাব।”
“অপমানিত!” জেলিদা কান্নায়
ভেঙে পড়লেন, “অপমানিত! কী আঘাত! আমি এটা সহ্য করতে
পারছি না। ওহ! অভিশপ্ত বানজা, তুই-ই আমাকে ধ্বংস করেছিস। আমি আমার স্বামীকে ভালোবাসতাম, আমি গুণবতী হয়ে জন্মেছিলাম; যদি তুই তোর
মন্ত্রিত্ব আর আমার বিশ্বাসের অপব্যবহার না করতি, তবে আমি
তাঁকে এখনো ভালোবাসতাম। অপমানিত, প্রিয় সোফিয়া!—”
তিনি শেষ করতে পারলেন না।
কান্নার দমকে তাঁর কথা আটকে গেল, এবং তিনি হতাশ হয়ে কার্পেটে লুটিয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই
জেলিদা করুণ সুরে বিলাপ করতে লাগলেন: “হায়! আমার প্রিয় সোফিয়া, আমি মরে যাব—আমাকে মরতেই
হবে। না, এই
কলঙ্কিত খ্যাতি নিয়ে আমি বাঁচতে পারব না।”
“কিন্তু জেলিদা, আমার প্রিয় জেলিদা, মরতে এত তাড়াহুড়ো করো না: হয়তো...” সোফিয়া বললেন।
“কোনো ‘হয়তো’ আমাকে থামাতে
পারবে না, আমাকে
মরতেই হবে।”
“কিন্তু হয়তো কেউ পারে...”
“কেউ কিছুই করতে পারে না, আমি তোমাকে বলছি।”
“কিন্তু বলো, প্রিয়, কী করা যেতে পারে?”
“হয়তো কেউ একটা ‘রত্ন’কে কথা বলা
থেকে আটকাতে পারে।”
“আহ! সোফিয়া, তুমি আমাকে মিথ্যা আশা দিয়ে
সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছ, তুমি আমাকে প্রতারণা করছ।”
“না, না, আমি তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছি না; পাগলের মতো ছটফট
না করে শুধু আমার কথা শোনো। আমি ফ্রেনিকল, ইওলিওপিলা,
গ্যাগ এবং মুখবন্ধের কথা শুনেছি।”
“দয়া করে বলুন, ফ্রেনিকল, ইওলিওপিলা, মুখবন্ধ এবং আমাদের আসন্ন বিপদের
মধ্যে সম্পর্কটা কী? আমার ‘টয়ওয়ালা’ (Toyman/Goldsmith) এখানে কী
করছে, আর মুখবন্ধই বা কী জিনিস?”
“ব্যাপারটা এই, প্রিয়। একটি মুখবন্ধ হলো
ফ্রেনিকল দ্বারা আবিষ্কৃত একটি যন্ত্র, যা একাডেমি দ্বারা
অনুমোদিত এবং ইওলিওপিলা দ্বারা উন্নত (যদিও সে নিজেই এর আবিষ্কারক বলে দাবি করে)।”
“কিন্তু দয়া করে বলুন, ফ্রেনিকলের আবিষ্কার,
একাডেমির অনুমোদন আর সেই বোকা ইওলিওপিলার উন্নতি—এই যন্ত্র দিয়ে
কী হবে?”
“ওহ! আপনার অধৈর্য তো দেখছি
কল্পনার বাইরে। ঠিক আছে, শুনুন তবে—এই যন্ত্রটি একটি ‘রত্ন’-এর ওপর প্রয়োগ করা হলে, সেটি দাঁত থাকতেও কামড়াতে
পারে না... মানে, কথা বলতে পারে না, একেবারে বিচক্ষণ হয়ে যায়।”
“এটা কি সত্যি হতে পারে, প্রিয়?”
“লোকে তো তাই বলে।”
“আমাদের জানতে হবে,”
জেলিদা উত্তর দিলেন, “এবং এক্ষুনি।”
তিনি ঘণ্টা বাজালেন, তাঁর একজন পরিচারিকা হাজির
হলো, এবং তিনি ফ্রেনিকলকে ডেকে পাঠালেন।
“ইওলিওপিলাকে কেন নয়?”
সোফিয়া জানতে চাইলেন। “ফ্রেনিকল কম পরিচিত,”
জেলিদা উত্তর দিলেন।
টয়ওয়ালা বার্তাবাহকের সঙ্গে
চলে এলেন।
“আহ! ফ্রেনিকল, আপনি এসে গেছেন,” জেলিদা বললেন, “আপনাকে স্বাগতম। তাড়াতাড়ি করুন, বন্ধু আমার, এই দুই মহিলাকে কঠিন দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিন।”
“কী ব্যাপার, ম্যাডাম? আপনারা কি কোনো দুর্লভ রত্ন বা গয়না খুঁজছেন?”
“না, আমাদের ইতিমধ্যেই দুটি আছে,
এবং আমরা সানন্দে...”
“সেগুলো বিক্রি করতে বা
বদলে নিতে চান, তাই
তো? দয়া করে, ম্যাডাম, আমাকে সেগুলো দেখতে দিন, আমি সেগুলো নেব,
অথবা আমরা বিনিময় করব।”
“আপনি ভুল করছেন, মিস্টার ফ্রেনিকল, আমাদের কাছে বিনিময় করার মতো কিছুই নেই।”
“ঠিক আছে, আমি বুঝতে পেরেছি; আপনাদের কাছে হয়তো এমন কিছু কানের দুল আছে, যা
আপনারা ‘হারিয়ে’ ফেলতে চান, যাতে আপনাদের স্বামীরা আমার
দোকানে এসে সেগুলো আবার ‘খুঁজে’ পেতে পারেন।”
“সেটাও নয়; দয়া করে, সোফিয়া, আপনিই তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন।”
“ফ্রেনিকল,”
সোফিয়া শুরু করলেন, “আমরা দুটি চাই—কী, আপনি বুঝতে পারছেন না?”
“না, ম্যাডাম: আপনি কীভাবে আশা
করেন যে আমি বুঝব, যখন আপনি কিছুই বলছেন না?”
“আসলে,”
সোফিয়া বললেন, “যখন একজন নারী বিনয়ী হন, তখন নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে
স্পষ্ট করে কথা বলতে তাঁর খুব সংকোচ হয়।”
“কিন্তু তবুও,”
ফ্রেনিকল উত্তর দিলেন, “তাঁকে স্পষ্ট করে বলতেই হবে। আমি একজন সাধারণ
স্বর্ণকার বা রত্ন-ব্যবসায়ী, কোনো জাদুকর নই।”
“আপনাকে অনুমান করতে হবে।”
“বিশ্বাস করুন, ম্যাডাম, আমি আপনাদের যত দেখছি, ততই গুলিয়ে ফেলছি। যখন
একজন নারী আপনাদের মতো তরুণী, ধনী এবং সুন্দরী হন,
তখন তাঁকে এমন ছলনার আশ্রয় নিতে হয় না: তাছাড়া, আমি আন্তরিকভাবে জানাচ্ছি যে আমি আর ‘ওসব’ বিক্রি করি না। আমি সেই বিশেষ ‘খেলনা’গুলোর (Dildos) ব্যবসা এখন তরুণ
ব্যবসায়ীদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি।”
আমাদের ধর্মপ্রাণ মহিলারা
টয়ওয়ালার এই ভুল ধারণাটিকে এতটাই হাস্যকর মনে করলেন যে, তাঁরা দুজনেই হাসিতে ফেটে
পড়লেন। এতে বেচারা ফ্রেনিকল আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন।
“আমাকে অনুমতি দিন, মহিলারা, আমার প্রণাম গ্রহণ করুন এবং আমাকে যেতে দিন। আপনারা আমাকে তিন মাইল দূর
থেকে ডেকে এনে আমার খরচে নিজেদের মনোরঞ্জন করার কষ্টটুকু বাঁচাতে পারতেন।”
“থামুন, থামুন, বন্ধু,” জেলিদা বললেন, তখনও হাসতে হাসতে। “আমাদের উদ্দেশ্য
মোটেও তা ছিল না। কিন্তু আমাদের কথা শুনে আপনার মাথায় যে অদ্ভুত ও হাস্যকর ধারণা
এসেছে, তা-ই
আমাদের হাসাচ্ছে।”
“এটা আপনাদের হাতেই আছে, ম্যাডাম, আমাকে সঠিক ধারণা দেওয়া। আসল ব্যাপারটা কী?”
“ওহ! মিস্টার ফ্রেনিকল, আমাকে উত্তর দেওয়ার আগে একটু
প্রাণ খুলে হাসতে দিন।”
জেলিদা দম ফুরিয়ে যাওয়া
পর্যন্ত হাসলেন। টয়ওয়ালা মনে মনে ভাবলেন যে ভদ্রমহিলার হয়তো হিস্টিরিয়া হয়েছে, অথবা তিনি জ্ঞান হারিয়েছেন;
তাই তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলেন। অবশেষে জেলিদা থামলেন।
“ঠিক আছে,”
তিনি বললেন, “বিষয়টি আমাদের ‘রত্ন’, আমাদের নিজেদের ‘গোপন রত্ন’ সম্পর্কিত—আপনি কি আমাকে
বুঝতে পারছেন, মিস্টার
ফ্রেনিকল? নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয় যে, কিছুদিন ধরে বেশ কয়েকটি ‘রত্ন’ ম্যাগপাই পাখির মতো বকবক শুরু করেছে:
এখন আমরা খুব খুশি হব যদি আমাদেরগুলো এই খারাপ উদাহরণ অনুসরণ না করে।”
“আহ! এখন আমি বুঝতে পেরেছি, তার মানে,” ফ্রেনিকল উত্তর দিলেন,
“আপনারা প্রত্যেকে একটি
করে ‘মুখবন্ধ’ (Muzzle) চান।”
“একেবারে ঠিক, আপনি সত্যিই সঠিক অনুমান
করেছেন। আমাকে বলা হয়েছিল যে মিস্টার ফ্রেনিকল মোটেই বোকা নন।”
“ম্যাডাম, আপনার দয়া খুব বেশি। আপনি যা
চান, আমার কাছে সব ধরনের কালেকশন আছে; আমি এই মুহূর্তেই আপনাদের জন্য কিছু স্যাম্পল নিয়ে আসছি।”
ফ্রেনিকল সেই অনুযায়ী চলে
গেলেন: এদিকে জেলিদা তাঁর বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরলেন এবং এই উপায় বাতলে দেওয়ার জন্য
তাঁকে ধন্যবাদ জানালেন। আর আমি, আফ্রিকান লেখক বলছেন, তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায়
একটু গড়িয়ে নিতে বা ঘুমিয়ে নিতে গেলাম।
অষ্টাদশ
অধ্যায়: রত্ন-ব্যবসায়ীর প্রত্যাবর্তন
টয়ওয়ালা বা রত্ন-ব্যবসায়ী
ফিরে এসে মহিলাদের সামনে সেরা মানের দুটি ‘মুখবন্ধ’ বের করলেন।
“দোহাই আপনার!” জেলিদা চিৎকার
করে উঠলেন, “এগুলো কী বিশাল সাইজের মুখবন্ধ! এসব
কাদের জন্য বানিয়েছেন? কোন হতভাগা নারীদের কপালে জুটবে এগুলো? এ তো
দেখছি লম্বায় এক গজ হবে! সত্যি বলছি বন্ধু, আপনি নিশ্চয়ই
সুলতানের ঘোড়ার মাপ নিয়ে এগুলো বানিয়েছেন।”
“হ্যাঁ,”
সোফিয়া আঙুল দিয়ে মাপার ভঙ্গি করে উদাসীনভাবে বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছেন; সুলতানের ঘোড়া আর ওই বুড়ি
রিমোসা ছাড়া আর কারও ওখানেই এটা ফিট হবে না।”
“আমি দিব্যি করে বলছি
ম্যাডাম, এগুলো
একেবারে সাধারণ সাইজ,” ফ্রেনিকল বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “জেলমাইডা,
জাইরফি, আমিয়ানা এবং আরও শত শত মহিলা
এই একই সাইজের জিনিস নিয়েছেন।”
“এটা অসম্ভব,”
জেলিদা জোর দিয়ে বললেন।
“কিন্তু ওটাই সত্যি,”
ফ্রেনিকল উত্তর দিলেন, “আসলে তাঁরাও প্রথমে আপনাদের মতোই কথা বলেছিলেন; এবং তাঁদের মতো আপনারাও
একবার ট্রায়াল দিয়ে নিজেদের ভুল ভাঙাতে পারেন।”
“মিস্টার ফ্রেনিকল যা খুশি
বলতে পারেন; কিন্তু
তিনি আমাকে কখনোই বোঝাতে পারবেন না যে এটা আমার জন্য উপযুক্ত হবে,” জেলিদা বললেন।
“এবং এটা আমার জন্যও নয়,”
সোফিয়া যোগ করলেন। “যদি ওঁর কাছে আরও কালেকশন থাকে, তবে তিনি আমাদের সেগুলো
দেখান।”
ফ্রেনিকল, যাঁর এ বিষয়ে বিস্তর
অভিজ্ঞতা ছিল এবং যিনি জানতেন যে মহিলাদের এই গোঁয়ার্তুমি সহজে বদলানো যায় না,
তিনি অগত্যা তাঁদের সামনে তেরো বছরের কিশোরীদের মাপের মুখবন্ধ
বের করলেন।
“এই তো!” দুজনেই সমস্বরে
চিৎকার করে উঠলেন, “এগুলোই তো আমরা চাইছিলাম!”
“আশা করি এগুলোই আপনাদের
লাগবে,” ফ্রেনিকল বিড়বিড় করে বললেন
(যদিও মনে মনে হাসলেন)।
“এগুলোর দাম কত?”
জেলিদা জানতে চাইলেন।
“প্রতি পিস মাত্র দশ ডুকাট, ম্যাডাম।”
“দশ ডুকাট! আপনি তো নিজেকে
ভুলে যাচ্ছেন, ফ্রেনিকল।”
“ম্যাডাম, এটাই ন্যায্য মূল্য।”
“নতুন জিনিস বাজারে এসেছে
দেখে আপনি দাম হাঁকাচ্ছেন।”
“আমি কসম খেয়ে বলছি ম্যাডাম, এতে আমার নামমাত্র লাভ
থাকছে।”
“স্বীকার করছি যে এগুলো
সুন্দরভাবে তৈরি, কিন্তু দশ ডুকাট অনেক টাকা।”
“আমি এক পয়সাও কম নিতে পারব
না।”
“তাহলে আমরা ইওলিওপিলার
কাছেই যাব।”
“যেতে পারেন ম্যাডাম; কিন্তু কারিগরে-কারিগরে আর
মালে-মালে অনেক তফাত থাকে।”
ফ্রেনিকল তাঁর দামে অনড়
রইলেন, এবং
অগত্যা জেলিদা মেনে নিলেন। তিনি দুটি মুখবন্ধের দাম মিটিয়ে দিলেন। রত্ন-ব্যবসায়ী
ফিরে গেলেন, মনে মনে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যে—সেগুলো তাঁদের
জন্য বড্ড ছোট হবে এবং শীঘ্রই সেগুলো তাঁর কাছে ফেরত আসবে; আর তখন তিনি বিক্রির
এক-চতুর্থাংশ দামেই সেগুলো ফেরত নেবেন।
কিন্তু তিনি ভুল ভেবেছিলেন।
মাঙ্গোগুল সেই দুই মহিলার
ওপর তাঁর আংটি ঘোরানোর সুযোগ পাননি,
আর তাঁদের রত্নগুলোও তখন স্বাভাবিকের চেয়ে জোরে কথা বলার মেজাজে
ছিল না; এবং এটা তাঁদের জন্য সৌভাগ্যই বলতে হবে। কারণ
জেলিদা তাঁর মুখবন্ধটি ট্রায়াল দিতে গিয়ে দেখলেন যে, ওটা
তাঁর রত্নের অর্ধেকও ঢাকতে পারছে না। তবুও, তিনি ওটা
পাল্টালেন না। তিনি ভাবলেন, ওটা বদলাতে যাওয়া যতটা
অপমানজনক, ওটা ব্যবহার না করাও প্রায় ততটাই অসুবিধাজনক।
তাই তিনি জোর করে ওটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন।
তবে শেষ রক্ষা হলো না। এই
ঘটনার কথা তাঁর এক দাসীর মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেল। সেই দাসী তার প্রেমিককে গোপনে
কথাটা বলেছিল, প্রেমিক
আবার অন্যদের কানে তুলে দিল, আর সেখান থেকে খবরটা ‘গোপনীয়তার সিলমোহর’ সহকারে
সারা বানজা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। ফ্রেনিকলও চুপ করে বসে থাকার পাত্র নন; তিনিও মুখ খুললেন। ফলে এই
ধর্মপ্রাণ মহিলাদের ভণ্ডামি জনসমক্ষে চলে এল এবং বেশ কিছুদিন ধরে কঙ্গোর
নিন্দুকদের গালগল্পের খোরাক জোগাল।
জেলিদা এতে মানসিক
সান্ত্বনা হারিয়ে ফেললেন। এই মহিলা—যিনি নিন্দার চেয়ে করুণারই বেশি
যোগ্য—হঠাৎ
করেই তাঁর ব্রাহ্মণের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করতে শুরু করলেন। তিনি তাঁর স্বামীকে ত্যাগ
করলেন এবং নিজেকে একটি মঠে বা কনভেন্টে বন্দী করে ফেললেন।
অন্যদিকে সোফিয়া একেবারে
উল্টো পথ বাছলেন। তিনি ভদ্রতার মুখোশ ছুড়ে ফেললেন, নিন্দুকদের থোড়াই কেয়ার করলেন, চড়া মেকআপ নিলেন, জনসমাগমে যাতায়াত শুরু করলেন
এবং একের পর এক রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটিয়ে বেড়াতে লাগলেন।
ঊনবিংশ
অধ্যায়: আংটির সপ্তম পরীক্ষা—শ্বাসরুদ্ধ রত্ন
যদিও বানজার সাধারণ নাগরিক
মহিলারা সন্দিহান ছিলেন যে তাঁদের পদমর্যাদার ‘রত্ন’রা আদৌ কথা বলার সম্মান পাবে কি না; তবুও তাঁরা সবাই আগাম
সতর্কতা হিসেবে ‘মুখবন্ধ’ দিয়ে নিজেদের সজ্জিত করেছিলেন। বানজাতে
মুখবন্ধগুলো এতটাই সাধারণ হয়ে গিয়েছিল,
যেমনটা এ দেশে শোকের সময় পরা কালো পোশাক।
এখানে আফ্রিকান লেখক
বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছেন যে, দামের সস্তা ভাব বা মুখবন্ধের সহজলভ্যতা—কোনোটিই অভিজাত
মহলে বা ‘সেরাগ্লিও’তে এদের কদর কমাতে পারেনি। “এই একবার,”
তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয়তা কুসংস্কারের ওপর জয়লাভ করেছিল।” এমন একটি মামুলি পর্যবেক্ষণের
পুনরাবৃত্তি করার হয়তো কোনো প্রয়োজন ছিল না: কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যেন কঙ্গোর
সমস্ত প্রাচীন লেখকের একটা বদভ্যাস ছিল পুনরাবৃত্তি করা; তাঁরা হয়তো এর মাধ্যমে
তাঁদের রচনাগুলোতে সত্যতা এবং সরলতার একটি ভাব আনতে চাইতেন; অথবা তাঁদের ভক্তরা তাঁদের যতটা উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন বলে মনে করেন,
আদতে তাঁদের ততটা ছিল না।
যাই হোক না কেন, একদিন মাঙ্গোগুল তাঁর
সভাসদদের নিয়ে বাগানে হাঁটছিলেন। হঠাত তাঁর ইচ্ছে হলো জেলাইসের দিকে আংটি ঘোরানোর।
মেয়েটি বেশ সুন্দরী ছিল, এবং একাধিক রোমাঞ্চকর ঘটনার
নায়িকা হিসেবে তার ওপর সন্দেহ ছিল। তবুও তার ‘রত্ন’টি কেবল তোতলামি করতে লাগল এবং এমন কিছু
অস্পষ্ট ও বিকৃত শব্দ উচ্চারণ করল,
যার কোনো মাথামুণ্ডু ছিল না। আর এদিকে নিন্দুকেরা নিজেদের
ইচ্ছামতো সেগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছিল।
“ধুর ছাই!” সুলতান বিরক্ত
হয়ে বললেন, “এখানে তো দেখছি রত্নটির কথা বলতে
বিশাল কোনো বাধা হচ্ছে। নিশ্চয়ই কোনো কিছু ওর শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।”
অতএব তিনি আংটিটি আরও
কড়াভাবে তাক করলেন। রত্নটি কথা বলার দ্বিতীয় চেষ্টা করল; এবং তার মুখ আটকে রাখা সেই
বাধাটি কোনোমতে অতিক্রম করে এই শব্দগুলো খুব স্পষ্টভাবে শোনা গেল: “হায়! হায়!—আমি—আমি—আমি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আমি আর পারছি
না... হায়! হায়! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
মুহূর্তের মধ্যে জেলাইসের
অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ল: সে ফ্যাকাশে হয়ে গেল,
তার ঘাড়ের শিরা ফুলে উঠল, এবং সে আধবোজা
চোখ আর হাঁ করা মুখ নিয়ে ধপ করে তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের বাহুর ওপর ঢলে
পড়ল।
জেলাইসকে অন্য যেকোনো
জায়গায় সহজেই সুস্থ করা যেত। তাকে শুধু তার মুখবন্ধনী থেকে মুক্ত করা এবং তার ‘রত্ন’কে একটু শ্বাস
নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়াই যথেষ্ট ছিল: কিন্তু মাঙ্গোগুলের উপস্থিতিতে কে গায়ে হাত দেওয়ার
সাহস পাবে?
“তাড়াতাড়ি, ডাক্তার ডাকো,” সুলতান চিৎকার করে বললেন,
“জেলাইস তো মারা
যাচ্ছে।”
কিছু পেয়াদা প্রাসাদে দৌড়
দিল এবং ফিরে এল; তাদের পেছনে চিকিৎসকেরা গম্ভীর মুখে হেঁটে আসছিলেন। অরকোটোমাস ছিলেন
তাঁদের দলনেতা। কেউ কেউ রক্তমোক্ষণের (Bloodletting) পক্ষে
মত দিলেন, অন্যরা কার্মেস মিনারেল খাওয়ানোর কথা বললেন;
কিন্তু তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন অরকোটোমাস জেলাইসকে পাশের একটি
কামরায় নিয়ে যেতে বললেন। তিনি তাকে পরীক্ষা করলেন এবং তার মুখবন্ধের বাঁধন কেটে
দিলেন। এই মুখবন্ধ-পরা রত্নটি ছিল সেগুলোর মধ্যে একটি, যা
তিনি উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় দেখেছিলেন বলে বড়াই করতেন।
তবে, জায়গাটা মারাত্মক ফুলে ছিল
এবং জেলাইস কষ্ট পেতেই থাকত, যদি না সুলতান তার অবস্থার
প্রতি দয়া করতেন। তিনি আংটি ঘুরিয়ে নিলেন, শরীরের সব রস
আবার ভারসাম্য ফিরে পেল। জেলাইস সুস্থ হয়ে উঠল, আর ধূর্ত
অরকোটোমাস এই অলৌকিক নিরাময়ের পুরো কৃতিত্ব নিজের পকেটে পুরলেন।
জেলাইসের এই দুর্ঘটনা এবং
চিকিৎসকের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা মুখবন্ধের প্রতি মানুষের বিশ্বাস অনেক কমিয়ে দিল।
অরকোটোমাস, বন্ধু
ইওলিওপিলার ব্যবসার বারোটা বাজিয়ে, অন্যের সর্বনাশের ওপর
নিজের ভাগ্য গড়ার ফন্দি আঁটলেন। তিনি নিজেকে ‘ঠান্ডা লাগা রত্নদের’ পেটেন্ট চিকিৎসক
হিসেবে বিজ্ঞাপন দিলেন: এবং তাঁর কিছু লিফলেট আজও শহরের অলিগলিতে দেখা যায়।
তিনি দুহাতে টাকা কামাতে
শুরু করলেন ঠিকই, কিন্তু শেষমেশ হাসির পাত্র হয়েই বিদায় নিলেন। সুলতান এই ভণ্ড চিকিৎসকের
অহংকার চূর্ণ করার আনন্দ নিলেন। অরকোটোমাস কি এমন একটি রত্নকে চুপ করানোর গর্ব
করতেন যা কখনো একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি? মাঙ্গোগুল
নিষ্ঠুরভাবে তাকে কথা বলতে বাধ্য করলেন। লোকে ঠাট্টা করে বলতে শুরু করল যে,
যেকোনো রত্ন যদি নীরবতায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তবে তাকে শুধু অরকোটোমাসের কাছে দুই-তিনবার পাঠালেই হবে (সে কথা বলা
শুরু করবে)। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইওলিওপিলার সাথে সেই ভণ্ডদের কাতারে স্থান
পেলেন; এবং ব্রহ্মা তাঁদের সেখান থেকে উদ্ধার না করা
পর্যন্ত তাঁরা দুজনেই সেখানেই পচবেন।
শেষমেশ, লজ্জাকে ‘অ্যাপোপ্লেক্সি’ (মস্তিষ্কে
রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক)-এর চেয়ে বেশি পছন্দ করা হলো। “একটি মেরে ফেলে,” নারীরা বলল, “অন্যটি
অন্তত প্রাণে মারে না।” তাই তারা তাদের মুখবন্ধ ছুড়ে ফেলল; তাদের রত্নগুলোকে মন খুলে
কথা বলতে দিল; এবং এর ফলে কেউ মারা গেল না।
বিংশ
অধ্যায়: আংটির অষ্টম পরীক্ষা — ভ্যাপার্স বা মূর্ছাবায়ু
আমরা আগেই দেখেছি, একটা সময় ছিল যখন নারীরা
তাদের ‘গোপন রত্ন’-এর বকবকানি শুনে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত, দম আটকে মরে যাওয়ার জোগাড়
হতো; কিন্তু তারপরে এমন একটা সময় এল, যখন তারা এই ভয় কাটিয়ে উঠল, মুখের ঠুলি
(মুখবন্ধ) ছুড়ে ফেলল, আর তখন পুরো ব্যাপারটা গিয়ে ঠেকল
কেবল ‘ভ্যাপার্স’ বা ‘মূর্ছাবায়ু’তে।
মিরজোজার সখীদের মধ্যে
ক্যালিরোহ নামে এক অদ্ভুত বাউণ্ডুলে স্বভাবের যুবতী ছিল। তার মেজাজ ছিল যেমন
মনোমুগ্ধকর, তেমনই
অস্থির। দিনে দশবার তার মুড বদলাত; কিন্তু সে যে রূপই
ধরুক না কেন, সবেতেই তাকে মানাত। তার বিষাদ আর উচ্ছ্বাস—দুটোই ছিল অনন্য।
যখন সে সবচেয়ে বেশি পাগলামি করত, তখনো তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসত সূক্ষ্ম আবেগের কথা; আবার গভীর দুঃখের সময়ও সে এমন সব অদ্ভুত মজার কথা বলত যে হাসি পেত।
মিরজোজা ক্যালিরোহের (সেই
পাগলাটে মেয়েটি) সঙ্গ এমনই অভ্যেস করে ফেলেছিলেন যে, তাকে ছাড়া তাঁর চলত না।
একবার সুলতান যখন অভিমান করে বললেন যে মিরজোজা ইদানীং তাঁর প্রতি একটু উদাসীন ও
শীতল হয়ে পড়েছেন; তখন মিরজোজা সেই অনুযোগ শুনে লজ্জিত
হয়ে বললেন, “রাজপুত্র, আমার তিনটি প্রাণী—আমার গানের
পাখি (বুলবুলি), কোলের
পোষা কুকুর আর ক্যালিরোহ—এদের ছাড়া আমি অচল; আর আপনি তো দেখছেনই, এদের শেষের জন এখন আমার কাছে নেই।”
“সে নেই কেন?”
মাঙ্গোগুল জানতে চাইলেন।
“বলতে পারছি না,”
মিরজোজা উত্তর দিলেন; “তবে মনে পড়ছে, কয়েক মাস আগে সে আমাকে বলেছিল যে, মাজুল যদি যুদ্ধযাত্রায় যায়, তবে সে কিছুতেই
‘ভ্যাপার্স’ এড়াতে পারবে না; আর মাজুল গতকালই রওনা হয়েছে।”
“আমি তাকে সহজেই ক্ষমা
করলাম,” সুলতান বললেন, “কারণ তার এই মূর্ছরোগের কারণটা বেশ
জোরালো বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু অন্য শত শত নারী কেন মিছিমিছি ভ্যাপার্সে আক্রান্ত
হওয়ার ভান করে, যাদের
স্বামীরাও দিব্যি জোয়ান, আবার তারা প্রেমিক দিয়েও বেশ
ভালোভাবেই ‘সুসজ্জিত’ থাকে?”
“রাজপুত্র,”
এক সভাসদ উত্তর দিলেন, “এটা এখন একটা ফ্যাশনেবল রোগ। একজন নারীর
ভ্যাপার্স হওয়াটা এখন আভিজাত্যের লক্ষণ। প্রেমিক আর ভ্যাপার্স—এই দুটো ছাড়া
একজন নারী দুনিয়াদারি কিছুই বোঝে না;
আর বানজার এমন কোনো নাগরিকের স্ত্রী নেই, যাকে এই রোগে ধরে না।”
মাঙ্গোগুল মুচকি হাসলেন এবং
ঠিক করলেন, এই
ভ্যাপার্সে আক্রান্ত কয়েকজন রোগিণীকে তিনি নিজেই দেখে আসবেন। তিনি সোজা স্যালিকার
বাড়িতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন,
ঘাড়ের কাপড় অগোছালো, চোখ জ্বলজ্বল
করছে আর চুল উশকোখুশকো। বিছানার পাশে বসে তোতলা কুঁজো ডাক্তার ফারফাদি তাঁকে গল্প
শোনাচ্ছে।
স্যালিকা একবার এপাশ-ওপাশ
করছেন, হাত-পা
ছড়াচ্ছেন, হাই তুলছেন, দীর্ঘশ্বাস
ফেলছেন, মাথায় হাত দিয়ে করুণ স্বরে চিৎকার করছেন: “হায়! আমি আর সহ্য করতে পারছি না—জানালা খুলে
দাও—একটু
বাতাস দাও—আমি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি,
আমি মরেই গেলাম!——”
ভীত পরিচারিকারা যখন
ডাক্তার ফারফাদিকে বিছানার চাদর ঠিক করতে সাহায্য করছিল, মাঙ্গোগুল সেই সুযোগে চট করে
আংটিটি ঘোরালেন। তৎক্ষণাৎ এই কথাগুলো শোনা গেল: “উফ! এই ন্যাকামি আর কতক্ষণ সহ্য করব!
দেখুন কাণ্ড, ম্যাডাম এখন ভ্যাপার্স হওয়ার শখ মাথায় চাপিয়েছেন। এই প্রহসন অন্তত
আট দিন চলবে, আর আমি যদি এর কারণ বুঝতে পারি তো মরেই যাব।
কারণ ফারফাদির মতো ডাক্তার যখন এই ‘রোগ’ সারানোর এত কসরত করছে, তখন আমার মনে হয় নাটকটা
চালিয়ে যাওয়া ভুল হচ্ছে না।”
“বুঝেছি,”
সুলতান আংটি ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “আমি ধরতে পেরেছি। এই ভদ্রমহিলা আসলে
তাঁর ডাক্তারের বিরহেই ভ্যাপার্সে আক্রান্ত হয়েছেন। চলুন, অন্য কোথাও চেষ্টা করা যাক।”
স্যালিকার বাড়ি থেকে তিনি
গেলেন আর্সিনোর বাড়িতে, যেটা খুব বেশি দূরে ছিল না। দরজার বাইরে থেকেই তিনি উচ্চস্বরে হাসির
শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি ভাবলেন ভেতরে নিশ্চয়ই অনেক লোকজন আছে; কিন্তু ঢুকে দেখলেন আর্সিনো একা। এতে মাঙ্গোগুল খুব একটা অবাক হলেন না।
“যে নারী নিজেকে ‘ভ্যাপার্স’ উপহার দেয়,”
তিনি মনে মনে বললেন, “সে নিজের সুবিধামতো কখনো বিষাদ, কখনো বা উল্লাস বেছে নেয়।”
তিনি আংটি ঘোরালেন, আর ওমনি আর্সিনোর ‘গোপন রত্ন’ পাগলের মতো
খিলখিল করে হেসে উঠল। কিন্তু সেই অদম্য হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই হঠাত সুর বদলে গেল
হাস্যকর বিলাপে। নার্সেসের অনুপস্থিতিতে সে বন্ধু হিসেবে তাকে দ্রুত ফিরে আসার
পরামর্শ দিল; আর
তারপর কাঁদতে, বিলাপ করতে, গোঙাতে,
দীর্ঘশ্বাস ফেলতে এবং হাহাকার করতে শুরু করল—যেন সে তার
চৌদ্দগোষ্ঠীকে কবর দিয়ে এসেছে।
সুলতান এমন অদ্ভুত
বিড়ম্বনা দেখে হাসি চাপতে পারছিলেন না। তিনি কোনোমতে নিজেকে সামলে আংটি ঘুরিয়ে
সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন; আর্সিনো এবং তাঁর রত্নকে তাদের অবসর সময়ে বিলাপ করার জন্য একা ছেড়ে
দিলেন, আর সেই পুরোনো প্রবাদটি যে মিথ্যা, তার প্রমাণ পেলেন।
একবিংশ
অধ্যায়: আংটির নবম পরীক্ষা—হারানো ও প্রাপ্ত বস্তুর
ইতিবৃত্ত
(প্যানসিরোলাস এবং
ইনস্ক্রিপশন একাডেমির গবেষণাপত্রের পরিপূরক হিসেবে পরিবেশিত)
মাঙ্গোগুল প্রাসাদে ফিরে
এসে নারীদের হাস্যকর সব আচরণ নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে—তা অন্যমনস্কতার
কারণেই হোক কিংবা আংটির কোনো ভুলের কারণেই হোক—তিনি নিজেকে থেলিসের জমকালো
প্রাসাদের বারান্দার নিচে আবিষ্কার করলেন। থেলিস তাঁর প্রেমিকদের কাছ থেকে লুট করা
বিপুল ঐশ্বর্য দিয়ে এই ভবনটি সাজিয়েছিলেন। সুযোগ যখন এসেই গেল, সুলতান ভাবলেন থেলিসের ‘গোপন রত্ন’কে একটু জিজ্ঞাসাবাদ
করা যাক।
থেলিস ছিলেন আমির সাম্বুকোর
স্ত্রী, যাঁর
পূর্বপুরুষরা একসময় গিনিতে রাজত্ব করতেন। সাম্বুকো কঙ্গোতে বিপুল খ্যাতি অর্জন
করেছিলেন; এর্গেবজেদের শত্রুদের বিরুদ্ধে পাঁচ-ছয়টি
উল্লেখযোগ্য বিজয়ের তিনি নায়ক। তিনি যেমন একজন মহান সেনাপতি ছিলেন, তেমনি একজন দক্ষ কূটনীতিকও ছিলেন; তাই তাঁকে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তাঁর সেই
দায়িত্বও নিপুণভাবে পালন করেছিলেন। লোয়াঙ্গো থেকে ফিরে আসার পর তাঁর নজর পড়ে
থেলিসের ওপর। সাম্বুকোর বয়স তখন পঞ্চাশের কোঠায়, আর থেলিস
পঁচিশের তরুণী। থেলিস ঠিক সুন্দরী ছিলেন না, বরং ছিলেন
মোহময়ী; মহিলারা বলত তিনি ‘চলনসই’, কিন্তু
পুরুষরা তাঁকে ‘মনোমুগ্ধকর’ মনে করত। অনেক ধনী ও যোগ্য পাত্র তাঁকে
পাওয়ার আশায় লাইন দিয়েছিল; কিন্তু থেলিসের মনের আশা হয়তো অনেক বড় ছিল, কিংবা
তাঁর নিজের এবং প্রশংসাকারীদের ভাগ্যের পাল্লায় খুব বেশি তফাত ছিল—তাই তিনি তাঁদের
সবাইকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অবশেষে সাম্বুকো তাঁকে দেখলেন, এবং তাঁর পায়ের কাছে বিশাল
সম্পদ, এক মহান পারিবারিক নাম, বিজয়ের
গৌরব এবং রাজকীয় উপাধি নিবেদন করে তাঁকে জয় করলেন।
বিয়ের পর প্রথম ছয় সপ্তাহ
পর্যন্ত থেলিসকে দেখে মনে হয়েছিল তিনি সত্যিই একজন গুণবতী স্ত্রী। কিন্তু একটি
কামুক ‘রত্ন’ খুব কমই নিজেকে
দীর্ঘকাল সংযত রাখতে পারে; আর একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব স্বামী—তিনি অন্যক্ষেত্রে যতই মহান বীর হোন না
কেন—যদি
মনে করেন যে তিনি এমন একজন ‘শত্রু’কে (তরুণী স্ত্রীকে) পুরোপুরি জয় করতে
পেরেছেন, তবে
তিনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন।
যদিও থেলিস তাঁর আচরণে বেশ
বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তবুও তাঁর প্রথম দিকের কিছু অভিযান বা কেলেঙ্কারির কথা চাপা থাকেনি। আর
সেই সূত্র ধরে এটা অনুমান করা খুব একটা কঠিন ছিল না যে, তাঁর
আরও অনেক গোপন অভিযান লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে। মাঙ্গোগুল পুরোপুরি তথ্য জানার
আশায় বারান্দা থেকে দ্রুত থেলিসের কক্ষের দিকে পা বাড়ালেন।
তখন ছিল গ্রীষ্মের
মাঝামাঝি। প্রচণ্ড গরম। দুপুরের খাবার খাওয়ার পর থেলিস আয়না ও চিত্রকর্ম দিয়ে
সাজানো একটি ঘরে পালঙ্কের ওপর শুয়ে ছিলেন। তাঁর হাতে পারস্যের গল্পের একটি বই ধরা
ছিল, যা পড়তে
পড়তেই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
মাঙ্গোগুল কিছুক্ষণ মুগ্ধ
হয়ে তাঁকে দেখলেন, স্বীকার করলেন যে এই নারীর মধ্যে সত্যিই একধরনের আকর্ষণ আছে। এরপর তিনি
আংটিটি তাঁর দিকে তাক করলেন।
সঙ্গে সঙ্গেই থেলিসের ‘গোপন রত্ন’ বলে উঠল: “আমার সব মনে আছে, যেন গতকালের ঘটনা: চার
ঘণ্টায় ভালোবাসার নয়টি প্রমাণ! আহ! কী মুহূর্ত ছিল সেগুলো! জারমুনজাইদ (Germeuil)
একজন ঐশ্বরিক পুরুষ! সে ওই বুড়ো, বরফ-শীতল
সাম্বুকো নয়।—প্রিয় জারমুনজাইদ, আমি সত্যিকারের আনন্দ বা আসল
সুখ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম: তুমি একাই আমাকে সেই স্বর্গের সন্ধান দিয়েছ।”
মাঙ্গোগুল কেবল এই উচ্ছ্বাস
শুনে সন্তুষ্ট হলেন না; তিনি জারমুনজাইদের সঙ্গে থেলিসের সম্পর্কের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে
চাইলেন—যা রত্নটি এতক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিল। রত্নরা সাধারণত যে ভাষায় বা সংকেতে
সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়, তা মাথায় রেখে মাঙ্গোগুল তাঁর আংটির পাথরটি নিজের কোটের সঙ্গে ঘষে আরও
চকচকে করে নিলেন এবং তীব্র আলো ফেলে সেটি থেলিসের দিকে তাক করলেন। এর প্রভাব
শীঘ্রই রত্নটির ওপর পড়ল; সে বুঝতে পারল সুলতান ঠিক কী
চাইছেন। তাই সে এবার আরও ঐতিহাসিক বা বর্ণনামূলক সুরে তার বক্তৃতা শুরু করল:
“সাম্বুকো মনোইমুগিয়ান
সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন, এবং আমিও তাঁর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলাম। জারমুনজাইদ তাঁর অধীনে
একজন কর্নেল হিসেবে কাজ করছিলেন। জেনারেল সাম্বুকো তাঁকে বিশ্বাস করতেন এবং সেই
সম্মানের খাতিরে আমাদের পাহারার দায়িত্ব তাঁর ওপরই দিয়েছিলেন। উৎসাহী জারমুনজাইদ
তাঁর ‘পোস্ট’ বা দায়িত্ব এক মুহূর্তের জন্যও ত্যাগ করেননি:
তিনি এই দায়িত্ব পালন করাটা এতটাই আনন্দদায়ক মনে করতেন যে, পুরো যুদ্ধাভিযানে তাঁর
একমাত্র ভয় ছিল—পাছে এই ‘পোস্ট’ হারাতে হয়!”
“যখন আমরা শীতকালীন আবাসে
ছিলাম, আমি
কয়েকজন নতুন অতিথিকে আপ্যায়ন করেছিলাম; ক্যাসিল, জেকিয়া, আলমামুন, জাসুব,
সেলিম, মানজোরা, নেরেসকিম—এরা সবাই সামরিক পুরুষ এবং জারমুনজাইদ তাঁদের প্রশংসা
করতেন, যদিও
তাঁরা তাঁর চেয়ে অনেক নিচু মানের ছিলেন। বিশ্বাসী সাম্বুকো তাঁর স্ত্রীর সতীত্বের
ব্যাপারে নিজের ওপর এবং জারমুনজাইদের পাহারার ওপর অগাধ আস্থা রেখেছিলেন। যুদ্ধের
বিশাল সব পরিকল্পনা এবং কঙ্গোর গৌরবের জন্য তিনি যেসব মহান অভিযানের ছক কষছিলেন,
তাতে তিনি এতটাই ডুবে ছিলেন যে, জারমুনজাইদের
বিশ্বাসঘাতকতা বা থেলিসের অবিশ্বস্ততা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ তাঁর মনে
জাগেনি।”
“যুদ্ধ চলতে থাকল; সেনাবাহিনী মাঠে নামল,
এবং আমরা আমাদের পালকি নিয়ে তাঁদের অনুসরণ করলাম। যেহেতু পালকি
খুব ধীর গতিতে চলছিল, তাই সেনাবাহিনীর মূল অংশ আমাদের
থেকে অনেক এগিয়ে গেল এবং আমরা পেছনে পড়ে গেলাম—ঠিক যেমনটা জারমুনজাইদ আগে থেকেই ব্যবস্থা
করে রেখেছিলেন। এই সাহসী যুবক, যাকে বড় বড় বিপদও কখনো গৌরবের পথ থেকে এক পা টলাতে পারেনি, সে-ও শেষমেশ আনন্দের প্রলোভন সামলাতে পারল না। সে একজন অধস্তন
কর্মকর্তাকে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দিল (যারা আমাদের জ্বালাতন
করছিল), এবং নিজে আমাদের পালকিতে উঠে এল।”
“কিন্তু সে পালকিতে ঢোকার
সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বাইরে অস্ত্রের ঝনঝনানি আর মানুষের চিৎকার শুনতে পেলাম।
জারমুনজাইদ তাঁর ‘কাজ’ অর্ধেক রেখেই লাফিয়ে পালকি থেকে নামার
চেষ্টা করলেন: কিন্তু তাড়াহুড়োয় তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন, এবং আমরা শত্রুপক্ষের হাতে
বন্দি হলাম।”
“এভাবেই আমি এক অফিসারের
সম্মান আর ক্যারিয়ার চিবিয়ে খেয়ে আমার যাত্রা শুরু করেছিলাম—যিনি তাঁর বীরত্ব
আর যোগ্যতার বলে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে উঠতে পারতেন, যদি না তিনি তাঁর জেনারেলের
স্ত্রীর পাল্লায় পড়তেন। এই যুদ্ধে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল;
আর এভাবেই এত চমৎকার এক প্রজার সেবা থেকে আমরা জাতিকে বঞ্চিত
করলাম।”
কারও পক্ষে যদি সম্ভব হয়, তবে এই বক্তৃতা শুনে
মাঙ্গোগুলের বিস্ময় কল্পনা করে দেখুন। তিনি নিজে জারমুনজাইদের শেষকৃত্যের সেই
জমকালো শোক-বক্তৃতা শুনেছিলেন, কিন্তু এই বর্ণনার সঙ্গে
তার কোনো মিলই খুঁজে পেলেন না। তাঁর বাবা এর্গেবজেদ এই অফিসারের মৃত্যুতে গভীর শোক
প্রকাশ করেছিলেন। সে সময়কার সংবাদপত্রগুলো তাঁর ‘কৌশলগত পশ্চাদপসরণ’-এর (পলায়ন)
ওপর অকুন্ঠ প্রশংসা বর্ষণ করার পর,
তাঁর পরাজয় ও মৃত্যুকে শত্রুর বিশাল সংখ্যার ওপর চাপিয়ে
দিয়েছিল—বলা হয়েছিল শত্রুরা নাকি অনুপাতে ছয় গুণ বেশি ছিল।
পুরো কঙ্গো এমন একজন মানুষের জন্য শোক পালন করেছিল, যিনি নাকি তাঁর কর্তব্য পালন করতে গিয়ে শহীদ
হয়েছেন। তাঁর স্ত্রীকে মোটা অঙ্কের পেনশন দেওয়া হয়েছিল; তাঁর বড় ছেলেকে বাবার রেজিমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং ছোট
ছেলেকে চার্চের বড় কোনো পদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
“কী ভয়াবহ!” মাঙ্গোগুল
ফিসফিস করে চিৎকার করে উঠলেন। “একজন স্বামী অসম্মানিত হলো, রাষ্ট্রের সঙ্গে
বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো, প্রজাদের বলির পাঁঠা বানানো হলো,
আর অপরাধগুলো কেবল গোপনই থাকল না—বরং মহৎ গুণ হিসেবে পুরস্কৃতও হলো! আর
এই সব কাণ্ড ঘটল কিনা সামান্য একটা ‘গোপন রত্ন’-এর জন্য!”
থেলিসের রত্নটি একটু দম
নেওয়ার জন্য থেমেছিল, আবার বলতে শুরু করল: “এভাবে আমি শত্রুর দয়ার ওপর ন্যস্ত হলাম। একদল
অশ্বারোহী সৈন্য (Dragoons) আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি ছিল। থেলিসকে দেখে মনে হলো সে বেশ
ভয় পেয়েছে, কিন্তু মনে মনে সে এর চেয়ে বেশি আর কিছুই
কামনা করছিল না। কিন্তু এই ‘শিকার’ বা গনিমতের মাল নিয়ে লুটেরাদের মধ্যে
কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গেল। তলোয়ার কোষমুক্ত হলো, আর চোখের পলকে ত্রিশ-চল্লিশ জন পুরুষ একে অপরকে
হত্যা করল। এই হট্টগোলের শব্দ শত্রুপক্ষের জেনারেলের কানে পৌঁছাল। তিনি সেখানে
ছুটে এলেন, ক্ষুব্ধ সৈন্যদের শান্ত করলেন এবং আমাদের একটি
তাঁবুর নিচে আলাদা করে রাখলেন; যেখানে আমরা ধাতস্থ হওয়ার
সময়টুকুও পেলাম না, তার আগেই তিনি এসে তাঁর ‘ভাল পরিষেবা’র মূল্য দাবি
করলেন।”
“‘পরাজিতদের জন্য শুধুই
দুঃখ,’ থেলিস চিৎকার করে বলল,
এবং বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আর সেই পুরো রাত তার এই ‘দুর্ভাগ্য’ অনুভব করতেই
কেটে গেল।”
“পরের দিন আমরা নিজেদের
নাইজার নদীর তীরে আবিষ্কার করলাম। একটি পালতোলা নৌকা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, এবং আমার মালকিন ও আমি
বেনিনের সম্রাটের কাছে পেশ হওয়ার জন্য রওনা দিলাম। এই চব্বিশ ঘণ্টার যাত্রাপথে
জাহাজের ক্যাপ্টেন থেলিসের কাছে নিজেকে প্রস্তাব করলেন, এবং
তাঁকে গ্রহণও করা হলো। আর আমি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝলাম যে—সমুদ্রের পরিষেবা
স্থলভাগের পরিষেবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতির।”
“আমরা বেনিনের সম্রাটকে
দেখলাম। তিনি ছিলেন যুবক, উৎসাহী এবং কামুক। থেলিস তাঁকে সহজেই জয় করে নিল। কিন্তু তার স্বামীর
(সাম্বুকো) বিজয়ের খ্যাতি সম্রাটকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। তাই তিনি শান্তিচুক্তি
দাবি করলেন; এবং যে চড়া মূল্যে তিনি সেই শান্তি
কিনেছিলেন, তা ছিল—সাম্রাজ্যের তিনটি প্রদেশ এবং আমার মুক্তিপণ।”
“ভিন্ন সময়, ভিন্ন ক্লান্তি। সাম্বুকো
কোনোভাবে জানতে পারলেন—কীভাবে তা আমি বলতে পারব না—যে গত যুদ্ধের
দুর্ভাগ্যের আসল কারণ কী ছিল। তাই এবার তিনি আমাকে তাঁর এক বন্ধুর কাছে, এক প্রধান ব্রাহ্মণের
জিম্মায় সীমান্তে পাঠিয়ে দিলেন। সেই পবিত্র ব্যক্তিটি খুব দুর্বল প্রতিরোধ
গড়েছিলেন; থেলিসের চাতুরীর ফাঁদে তিনি সহজেই ধরা দিলেন।
এবং ছয় মাসেরও কম সময়ে থেলিস তাঁর বিশাল আয়, তিনটি
হ্রদ এবং দুটি আস্ত বন গিলে খেল।”
“দোহাই খোদার!” মাঙ্গোগুল
আঁতকে উঠলেন, “তিনটি হ্রদ আর দুটি বন! একটা রত্নের
পেটে কী রাক্ষুসে খিদে!”
“ও তো নিতান্তই তুচ্ছ
ব্যাপার,” রত্নটি আবার শুরু করল। “শান্তি স্থাপন
হলো, এবং থেলিস
তাঁর স্বামীর সঙ্গে মোনোমোটাপায় দূতাবাসে গেলেন। সেখানে তিনি জুয়া ধরলেন,
এবং একদিনেই খুব ন্যায্যভাবে এক লক্ষ সিকুইন হারলেন—যা আমি মাত্র
এক ঘণ্টার মধ্যে আবার জিতে ফিরিয়ে আনলাম। এক মন্ত্রী—যাঁর প্রভুর কাজ বা রাজকার্য করার পরেও
হাতে অঢেল সময় থাকত—তিনি আমার খপ্পরে পড়লেন। তিন বা চার মাসের মধ্যে
আমি তাঁকে, তাঁর
সুন্দর জমিদারি, সুসজ্জিত দুর্গ, একটি বিশাল পার্ক এবং ছোট চিত্রবিচিত্র ঘোড়াসমেত আস্ত আস্তাবল—সব চিবিয়ে
খেলাম। মাত্র চার মিনিটের ‘অনুগ্রহ’ দান—তবে তা বেশ ভালোভাবেই প্রসারিত ছিল—আমাদের জন্য
ভোজ, উপহার আর
গয়নার বন্যা বয়ে আনল। আর অন্ধ বা অতি-কৌশলী সাম্বুকো আমাদের বিন্দুমাত্র বিরক্ত
করলেন না।”
“আমি আর সেই হিসাবের খাতা
খুলব না,” রত্নটি যোগ করল, “যে কত মার্কুইসাত, কাউন্টি, উপাধি, আর পারিবারিক আভিজাত্যের প্রতীক (Coat
of arms) আমার গহ্বরে তলিয়ে গেছে। আমার সেক্রেটারির কাছে খোঁজ
নিন, তিনি আপনাকে বলবেন ওগুলোর কী দশা হয়েছে। আমি
বিয়াফারার আধিপত্যের ডালপালা বেশ ভালোভাবেই ছাঁটাই করেছি, এবং বেলেগুয়ানজার একটি পুরো প্রদেশ এখন আমার দখলে। এমনকি এর্গেবজেদ
তাঁর মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন...”
বাবার নাম শোনামাত্রই
মাঙ্গোগুল তাঁর আংটি ঘুরিয়ে দিলেন এবং এই বাচাল গহ্বরটিকে স্তব্ধ করে দিলেন। তিনি
তাঁর বাবার স্মৃতিকে শ্রদ্ধা করতেন এবং এমন কোনো কথা শুনতে চাননি যা সেই মহান
সম্রাটের চরিত্রের ঔজ্জ্বল্যে সামান্যতম কালির ছিটে লাগাতে পারে।
সেরাগ্লিওতে ফিরে এসে তিনি
প্রিয়তমাকে সেই ‘ভ্যাপার্স’ বা মূর্ছায় আক্রান্ত মহিলাদের এবং থেলিসের
ওপর তাঁর আংটির পরীক্ষার কথা খুলে বললেন।
“আপনি এই মহিলাকে আপনার
পরিচিত মহলে স্থান দিয়েছেন,” তিনি বললেন, “কিন্তু সম্ভবত আপনি তাঁকে আমার মতো
অতটা ভালো চেনেন না।”
“আমি বুঝতে পারছি, হুজুর,” সুলতানা উত্তর দিলেন। “তার রত্নটি
হয়তো জেনারেল মিকোকফ, আমির ফারিদুর, সিনেটর মার্সুফা এবং মহান
ব্রাহ্মণ রামানাদনুতিওয়ের সঙ্গে তার অভিযানের ফিরিস্তি দেওয়ার মতো বোকামি করে
ফেলেছে। কিন্তু দয়া করে বলুন, কে না জানে যে সে যুবক
আলামিরকে নিজের কাছে রাখে? আর ওই বৃদ্ধ সাম্বুকো—যে মুখে কুলুপ
এঁটে থাকে—সে-ও আপনার মতোই এসব খবর রাখে।”
“তোমার তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট
হয়েছে,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন। “আমি তার রত্নকে
বাধ্য করেছি পেটের সব কথা উগরে দিতে।”
“তা সে আপনার কোনো কিছু
গিলে ফেলেছিল কি?” মির্জোজা জানতে চাইলেন।
“না,”
সুলতান বললেন, “কিন্তু আমার প্রজাদের, আমার সাম্রাজ্যের গণ্যমান্য
ব্যক্তিদের এবং প্রতিবেশী রাজাদের অনেক কিছুই সে গিলেছে; যেমন—সম্পত্তি, প্রদেশ, দুর্গ, হ্রদ, বন,
হীরা-জহরত, আসবাবপত্র, এমনকি ছোট চিত্রবিচিত্র ঘোড়াও বাদ যায়নি।”
“তাদের খ্যাতি আর গুণাবলীর
কথা নাহয় বাদই দিলাম, হুজুর,” মির্জোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন। “আমি বলতে পারব না আপনার এই আংটি থেকে
আপনি শেষমেশ কী উপকার পাবেন; কিন্তু আপনি যত বেশি এটি পরীক্ষা করবেন, আমার
নিজের নারীজাতির ওপর আমার ততই ঘৃণা ধরে যাচ্ছে। এমনকি যাঁদের আমি ন্যায্যভাবে কিছু
সম্মান করতাম বলে মনে করতাম, তাঁদের ওপরও আর ভরসা রাখা
যাচ্ছে না। এসব ঘটনা আমাকে এমন এক মেজাজে ফেলে দিয়েছে যে, আমি মহামান্য সুলতানের কাছে কিছুক্ষণের জন্য একা থাকার অনুমতি চাইছি।”
মাঙ্গোগুল জানতেন যে তাঁর
প্রিয়তমা যেকোনো ধরনের বাঁধাধরা নিয়মের শত্রু ছিলেন। তাই তিনি মির্জোজার ডান
কানে আলতো করে তিনবার চুমু খেলেন এবং সেখান থেকে বিদায় নিলেন।
বাইশতম
অধ্যায়: মাঙ্গোগুলের নৈতিক দর্শনের রূপরেখা
মাঙ্গোগুল তাঁর প্রিয়তমাকে
আবার দেখার জন্য অধীর হয়ে ছিলেন। রাতে তাঁর ঘুম কম হয়েছিল, তাই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক
আগেই তিনি বিছানা ছাড়লেন এবং সূর্য ওঠার আগেই প্রিয়তমার কামরায় হাজির হলেন।
মিরজোজা ইতিমধ্যেই ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন: একজন পরিচারক সবেমাত্র পর্দা সরিয়েছিল,
এবং তাঁর সখীরা তাঁকে পোশাক পরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
সুলতান ঘরের চারপাশে
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাকালেন এবং কোনো কুকুর দেখতে না পেয়ে একটু অবাক হলেন। তিনি
প্রিয়তমাকে এই অদ্ভুত অনুপস্থিতির কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।
“আমি দেখছি,”
মিরজোজা উত্তর দিলেন, “আপনি আমাকে এ ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে আলাদা
ভাবছেন, কিন্তু
এতে অবাক হওয়ার মতো কিছুই নেই।”
“আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি,”
সুলতান বললেন, “আমি আমার দরবারের অন্য সব মহিলার চারপাশে কুকুর
ঘুরঘুর করতে দেখি, আর তাই আপনাকে জানাতেই হবে—কেন তাদের কুকুর আছে, অথবা কেন আপনার নেই। তাদের
বেশির ভাগের কাছেই তো একাধিক কুকুর থাকে, এবং তাদের মধ্যে
এমন একজনও নেই যে তার ওই জানোয়ারটার ওপর এমন সব আদর-সোহাগ বর্ষণ না করে, যা সে তার প্রেমিকের ওপরও খুব একটা কষ্ট না করে বর্ষণ করে বলে মনে হয়
না। এই প্রাণীগুলো কীভাবে এমন বিশেষ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হলো? এদের কাজটা কী?”
মিরজোজা এই প্রশ্ন শুনে
একটু হতভম্ব হলেন: তবে সামলে নিয়ে উত্তর দিলেন, “অবশ্যই, মানুষ শখ করে যেমন টিয়া বা
ক্যানারি পাখি পোষে, কুকুরও তেমনই। এই প্রাণীগুলোর পেছনে
সময় নষ্ট করাটা হাস্যকর হতে পারে; কিন্তু তাদের থাকাটা
বিস্ময়কর কিছু নয়: তারা কখনো কখনো বিনোদন দেয়, আর কখনো
ক্ষতি করে না। যদি তাদের আদর করা হয়, তবে সেই আদরের কোনো
অশুভ পরিণতি নেই। তাছাড়া, আপনি কি বিশ্বাস করেন রাজপুত্র,
যে একটা সাদামাটা চুমুতেই একজন প্রেমিক ততটা সন্তুষ্ট হয়,
যতটা একটা পাগ-কুকুর হয় যখন তার মালকিন তাকে আদর করে?”
“নিঃসন্দেহে, আমি এটা বিশ্বাস করি,” সুলতান বললেন। “জুপিটারের দিব্যি, সেই মানুষটিকে খুব খুঁতখুঁতে
হতে হবে, যে এতে সন্তুষ্ট হবে না।”
মিরজোজার একজন সখী—যিনি তাঁর মেজাজের
মাধুর্য, বুদ্ধিমত্তা
এবং উৎসাহ দিয়ে সুলতান ও তাঁর প্রিয়তমার মন জয় করেছিলেন—তিনি বলে উঠলেন:
“এই প্রাণীগুলো আসলে
ভীষণ বিরক্তিকর আর নোংরা: এরা জামাকাপড় নষ্ট করে, আসবাবপত্র নোংরা করে, ফিতা
ছিঁড়ে ফেলে এবং পনেরো মিনিটের মধ্যে এত বেশি ক্ষতি করে, যা
একজন সবচেয়ে বিশ্বস্ত দাসীকেও অপদস্থ করার জন্য যথেষ্ট: এবং তবুও এদের রাখা হয়।”
“যদিও, ম্যাডামের মতে, এরা এসব ছাড়া আর কোনো কাজেরই নয়,” সুলতান টিপ্পনী কাটলেন।
“রাজপুত্র,”
মিরজোজা বললেন, “আমরা আমাদের কল্পনার জগতে বাস করি, এবং কুকুর পোষাটাও অবশ্যই
একটা কল্পনা—অন্য অনেকের মতো। যদি আমরা এদের পোষার পেছনে কোনো
যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারতাম, তবে আর সেটা কল্পনা থাকত না। একসময় বানরদের রাজত্ব ছিল, টিয়ারা এখনো কোনোমতে টিকে আছে। কুকুরদের কদর কমে গিয়েছিল, এখন আবার বাড়ছে। কাঠবিড়ালি পোষারও একটা চল এসেছিল: এবং এটা শুধু
প্রাণীদের বেলাতেই নয়; ইতালীয় ভাষা, ইংরেজি আদবকায়দা, জ্যামিতি, ফারথিংগেলস (পোশাকের ঘের) এবং ফারবেলাস (কুঁচি)-এর ক্ষেত্রেও একই কথা
খাটে—সবই সময়ের হুজুগ।”
“মিরজোজা,”
সুলতান মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন, “এই বিষয়ে যে সমস্ত জ্ঞান অর্জন করা
সম্ভব, তা তোমার
নেই; এবং রত্নরা...”
“মহামান্য কি কল্পনা করতে
যাচ্ছেন না,” প্রিয়তমা বললেন, “যে আপনি হারিয়ার ‘গোপন রত্ন’ দ্বারা জানতে
পারবেন—কেন
সেই মহিলা, যিনি
নিজের ছেলে, মেয়ে এবং স্বামীকে চোখের জল না ফেলেই মরতে
দেখেছিলেন, তিনি কিনা তাঁর কোলের পোষা কুকুরটি হারানোর
শোকে পুরো পনেরো দিন ধরে কেঁদে ভাসিয়েছিলেন?”
“কেন নয়?”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন।
“সত্যিই,”
মিরজোজা বললেন, “যদি আমাদের রত্নগুলো আমাদের সব খেয়ালখুশি
ব্যাখ্যা করতে পারত, তবে তারা আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি জ্ঞানী হতো।”
“দয়া করে বলো, কে তোমার সঙ্গে এ নিয়ে তর্ক
করছে?” সুলতান
উত্তর দিলেন। “আমার তো মনে হয়, রত্ন একজন নারীকে দিয়ে নিজের অজান্তেই শত শত
কাজ করিয়ে নেয়: এবং আমি একাধিকবার লক্ষ্য করেছি যে একজন নারী, যিনি ভাবছিলেন যে তিনি তাঁর নিজের বুদ্ধিতে চলছেন, আসলে তিনি তাঁর রত্নের কথাই শুনছিলেন। একজন মহান দার্শনিক (দেকার্ত)
মানুষের আত্মাকে ‘পিনিয়াল গ্ল্যান্ড’-এ স্থাপন করেছিলেন। যদি আমি ধরেও
নিই যে নারীদের একটা আত্মা আছে, তবে আমি খুব ভালো করেই জানতাম সেটাকে কোথায় স্থাপন করতে হবে (মানে ওই
রত্নেই)।”
“আমি আপনার এই কটাক্ষ ক্ষমা
করলাম,” মিরজোজা চটজলদি উত্তর দিলেন।
“কিন্তু তুমি আমাকে অন্তত
এটুকু অনুমতি দেবে,” মাঙ্গোগুল বললেন, “তোমাকে আমার কিছু তত্ত্ব জানাতে—যা আমার আংটি
আমাকে নারীদের সম্পর্কে শিখিয়েছে;
অবশ্য এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে যে তাদের সত্যিই একটা আত্মা
আছে। আমার আংটি দিয়ে আমি যেসব পরীক্ষা করেছি, তা আমাকে
একজন মহান নীতিবিদ বা দার্শনিক বানিয়ে দিয়েছে। আমার লা ব্রুইয়েরের মতো বুদ্ধি
নেই, পোর্ট রয়্যালের মতো যুক্তি নেই, মন্তেইনের মতো কল্পনা নেই, ক্যারনের মতো জ্ঞান
নেই: কিন্তু আমি এমন সব তথ্য সংগ্রহ করেছি, যা হয়তো
তাঁদের কাছেও অজানা ছিল।”
“বলুন, রাজপুত্র,” মিরজোজা বিদ্রূপাত্মকভাবে
বললেন, “আমি কান
পেতে আছি। আপনার বয়সের একজন সুলতানের মুখে নৈতিকতার ভাষণ নিশ্চয়ই খুব
কৌতূহলউদ্দীপক হবে।”
“অর্কোটোমাসের পদ্ধতি উদ্ভট, তাঁর সহকর্মী শিক্ষাবিদ
হিরাগুর অনুমতি নিয়েই বলছি: তবুও তাঁর বিরুদ্ধে তোলা আপত্তিগুলোর উত্তরে আমি কিছু
সারবত্তা খুঁজে পাই। যদি আমি নারীদের একটি আত্মা থাকার কথা মেনে নিই, তবে আমি তাঁর সঙ্গে আনন্দের সঙ্গেই একমত হতাম যে—রত্নরা সৃষ্টির
শুরু থেকেই কথা বলে আসছে, কিন্তু খুব নিচু স্বরে: এবং জিনিয়াস কুকুফার আংটির কাজ হলো কেবল তাদের
কণ্ঠস্বরকে একটু চড়ানো। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে পুরো নারীজাতিকে সংজ্ঞায়িত করা
বা চেনা এর চেয়ে সহজ আর কিছুই হতে পারে না।”
“উদাহরণস্বরূপ:
·
সংযত
বা সতী নারী: সে-ই, যার রত্ন নীরব, অথবা যার কথার প্রতি কেউ কান দেয় না।
·
ভণ্ড
নারী: সে, যে তার রত্নের কথা শোনার ভান
করে না (কিন্তু গোপনে শোনে)।
·
ষড়যন্ত্রকারী
বা প্রণয়িনী (Gallant): সে, যার
রত্ন অনেক কিছু চায়, এবং যে তাকে খুব বেশি প্রশ্রয়
দেয়।
·
কামুক
নারী: সে, যে তার রত্নের কথা অত্যন্ত
মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং মেনে চলে।
·
পতিতা
বা লম্পট: সে, যার ওপর তার রত্ন প্রতি
মুহূর্তে দাবি জানায়, এবং যে তাকে কিছুই অস্বীকার করে
না।
·
ছলনাময়ী
(Coquette): সে, যার
রত্ন নীরব, অথবা যার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় না; কিন্তু যে তার কাছাকাছি আসা সমস্ত পুরুষকে এই মিথ্যা আশা দেয় যে—তার রত্নটি
হয়তো একদিন কথা বলবে, এবং এমনও হতে পারে যে সে তখন বধির হয়ে থাকবে না।”
“কী বলো, আমার আত্মার আনন্দ, আমার এই সংজ্ঞাগুলো সম্পর্কে তুমি কী ভাবছ?”
“আমি মনে করি,”
প্রিয়তমা বললেন, “মহামান্য ‘কোমল’ বা ‘প্রেমময়ী’ (Tender) নারীকে ভুলে গেছেন।”
“যদি আমি তার উল্লেখ না করে
থাকি,” সুলতান উত্তর দিলেন, “তবে এর কারণ হলো আমি এই শব্দটির
অর্থই জানি না; এবং
কিছু সক্ষম পুরুষ দাবি করেন যে—রত্নের সঙ্গে সমস্ত সংযোগ বাদ দিলে ‘কোমল’ শব্দটির আসলে
কোনো অর্থই থাকে না।”
“কী! অর্থহীন?”
মিরজোজা চিৎকার করে বললেন। “কী বলছেন! তাহলে কি কোনো মধ্যপথ নেই? এবং একজন নারীকে কি অবশ্যই
হয় ভণ্ড, নয় ষড়যন্ত্রকারী, নয়
ছলনাময়ী, নয় কামুক, অথবা একজন
স্বেচ্ছাচারী হতেই হবে?”
“আমার আত্মার আনন্দ,”
সুলতান বললেন, “আমি আমার গণনার ভুল স্বীকার করতে রাজি আছি, এবং আগের চরিত্রগুলোর সঙ্গে ‘কোমল নারী’কে যোগ করব; তবে এই শর্তে যে—তুমি আমাকে
তার এমন একটি সংজ্ঞা দেবে, যা আমার বলা কোনোটির সঙ্গেই মিলবে না।”
“খুব সানন্দে,”
মিরজোজা বললেন। “আমি আপনার এই সিস্টেম বা তত্ত্বের বাইরে
না গিয়েই তা করার আশা রাখি।”
“দেখা যাক,”
মাঙ্গোগুল যোগ করলেন।
“বেশ তাহলে,”
প্রিয়তমা উত্তর দিলেন—“একজন কোমল নারী হলো সে——”
“বলো, সাহস করো মিরজোজা,” মাঙ্গোগুল উসকে দিলেন।
“ওহ! আমি অনুরোধ করছি আমাকে
কথার মাঝখানে থামাবেন না। কোমল নারী হলো সে——যে তার রত্ন দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ
না করেই ভালোবাসে; অথবা——যার রত্ন কখনোই কথা বলেনি, শুধুমাত্র সেই একক পুরুষটির
পক্ষ ছাড়া যাকে সে ভালোবাসে।”
সুলতানের পক্ষে প্রিয়তমাকে
কায়দা করে আটকানো এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করা যে—তিনি ‘ভালোবাসা’ বলতে ঠিক কী বোঝেন—তা অশালীন হতো:
তাই তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেন। মিরজোজা সুলতানের নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন
এবং এগিয়ে গেলেন; একটি কঠিন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরে তিনি বেশ গর্বিত বোধ
করলেন।
“আপনারা পুরুষরা বিশ্বাস
করেন—যেহেতু
আমরা আপনাদের মতো করে আনুষ্ঠানিকভাবে তর্ক করি না, তাই আমরা যুক্তি বুঝি না। কিন্তু জেনে রাখুন,
আমরা চাইলে আপনাদের প্যারাডক্স বা কূটাভাসগুলোর অসারতা ঠিকই ধরতে
পারি, যেমন আপনারা আমাদের যুক্তির ভুল ধরেন—অবশ্য যদি
আমরা কষ্ট করে মাথা ঘামাতে চাইতাম। যদি মহামান্য তাঁর ‘কোল-বালিশ কুকুর’ (Lap-dogs) সম্পর্কে কৌতূহল
মেটাতে কম তাড়াহুড়ো করতেন, তবে আমি আমার পালাক্রমে
আপনাকে আমার দর্শনের কিছু নমুনা দেখাতাম। কিন্তু চিন্তা নেই, আমি তা সেই দিনগুলোর জন্য তুলে রাখব, যখন
আপনার হাতে আমার জন্য আরও বেশি সময় থাকবে।”
মাঙ্গোগুল তাঁকে আশ্বাস
দিলেন যে, তাঁর
দার্শনিক ধারণাগুলো থেকে জ্ঞানলাভ করার চেয়ে ভালো কাজ তাঁর আর নেই; এবং বাইশ বছর বয়সী একজন সুলতানার অধিবিদ্যা (Metaphysics) তাঁর সমবয়সী একজন সুলতানের নৈতিকতার চেয়ে কম অনন্য হওয়া উচিত নয়।
কিন্তু মিরজোজা আশঙ্কা
করছিলেন যে এটি হয়তো মাঙ্গোগুলের নিছক সৌজন্য; তাই তিনি প্রস্তুত হওয়ার জন্য কিছু সময় চাইলেন,
এবং এভাবেই সুলতানকে তাঁর অধৈর্য মন যেখানে উড়ে যেতে চাইছে,
সেখানে যাওয়ার একটি অজুহাত বা সুযোগ করে দিলেন।
তেইশতম
অধ্যায়: আংটির দশম পরীক্ষা—কুকুরগুলো
মাঙ্গোগুল তৎক্ষণাৎ
হারিয়ার বাড়ির দিকে রওনা হলেন। যেহেতু তিনি মনে মনে কথা বলতে বা স্বগতোক্তি করতে
ভালোবাসতেন, তাই
তিনি বিড়বিড় করে বললেন: “এই ভদ্রমহিলা তাঁর চারটি কুকুর ছাড়া কখনো ঘুমাতে যান না। এখন হয়
তাঁর ‘গোপন
রত্ন’
ওই প্রাণীগুলো সম্পর্কে কিছুই জানে না,
অথবা তাঁর কুকুরগুলোই আমাকে তাদের মালকিনের গোপন কথা বলে দেবে;
কারণ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এটা সবারই জানা যে তিনি তাঁর কুকুরগুলোকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি
ভালোবাসেন।”
এই স্বগতোক্তি শেষ হতে না
হতেই তিনি নিজেকে হারিয়ার শোবার ঘরের অ্যান্টি-চেম্বারে আবিষ্কার করলেন। ঘরের
পরিচিত গন্ধে তিনি বুঝে নিলেন যে ম্যাডাম তাঁর প্রিয় সঙ্গীদের নিয়ে বিছানায়
আছেন। এই দলে ছিল একটি লোমশ কুকুর (Poodle),
একটি স্প্যানিয়েল এবং দুটি পাগ-কুকুর। সুলতান পকেটের নস্যির
কৌটো বের করলেন, আত্মরক্ষার জন্য দুই চিমটি কড়া
স্প্যানিশ নস্যি নিলেন এবং হারিয়ার দিকে পা টিপে টিপে এগোলেন। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন,
কিন্তু পাহারায় থাকা কুকুর-বাহিনী কোনো শব্দ শুনে ঘেউ ঘেউ করে
উঠল এবং তাঁকে জাগিয়ে দিল।
“শান্ত হও, আমার বাচ্চারা,” হারিয়া বললেন, কিন্তু এত আদরমাখা স্বরে যে কেউ ভাবতেই পারবে না তিনি কোনো মানুষের
সঙ্গে কথা বলছেন না। “ঘুমাও,
আমার সোনাপাখিরা, ঘুমাও; আমার বা তোমাদের বিশ্রাম নষ্ট কোরো না।”
হারিয়া একসময় তরুণী ও
সুন্দরী ছিলেন। তাঁর নিজের মাপের অনেক প্রেমিকও ছিল, কিন্তু তারা সবাই তাঁর যৌবনের আকর্ষণ ফুরিয়ে
যাওয়ার আগেই উবে গিয়েছিল। এই একাকিত্ব ভুলতে তিনি এক অদ্ভুত ধরনের বিলাসিতায়
মজেছিলেন। তাঁর ভৃত্যরা ছিল বানজা শহরের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। বয়স বাড়ার সঙ্গে
সঙ্গে তিনি মিতব্যয়ী হয়ে উঠলেন: নিজেকে চারটি কুকুর এবং দুজন ব্রাহ্মণ পর্যন্ত
সীমাবদ্ধ রাখলেন, এবং নিজেকে ধার্মিকতার মূর্ত প্রতীক
হিসেবে গড়ে তুললেন। এমনকি সবচেয়ে বিষাক্ত নিন্দুকও তাঁর এই নতুন জীবনযাত্রায়
কোনো খুঁত খুঁজে পেত না; এবং দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে
হারিয়া নিজের ‘সদ্গুণ’ এবং সেই প্রাণীগুলোর সান্নিধ্য বেশ
শান্তিতেই উপভোগ করছিলেন। পাগ-কুকুরগুলোর প্রতি তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ এতটাই বিখ্যাত
ছিল যে, ব্রাহ্মণদেরও
আর তাঁর বিছানার অংশীদার হওয়ার সন্দেহ করা হতো না।
হারিয়া সেই পশুদের কাছে
তাঁর অনুরোধ জানালেন, এবং তারা তা মেনে নিয়ে চুপ করল। তখন মাঙ্গোগুল তাঁর আংটি প্রয়োগ
করলেন, এবং হারিয়ার অতি-প্রাচীন রত্নটি তার শেষ
রোমাঞ্চকর অভিযানের বর্ণনা দিতে শুরু করল।
প্রথম দিকের ঘটনাগুলো এত
দিন আগের যে, রত্নটি
তার স্মৃতি প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। “সর তো পম্পেই,”
রত্নটি কর্কশ স্বরে বলল, “তুই আমাকে বিরক্ত করছিস। আমি ডিডোকে
(অন্য কুকুর) বেশি পছন্দ করি;
ওকে আমার বেশি ভদ্র মনে হয়।”
পম্পেই, যে রত্নটির কণ্ঠস্বর বা
অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল, সে তার মতোই কাজ
চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হারিয়া জেগে উঠে আদর করে বললেন, “সর তো, আমার দুষ্টু সোনা, তুই
আমাকে একটুও বিশ্রাম নিতে দিচ্ছিস না। এটা মাঝে মাঝে ভালোই লাগে, কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি ভালো না।” পম্পেই সরে গেল। ডিডো তার জায়গা
নিল, এবং হারিয়া
আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।
মাঙ্গোগুল, যিনি তাঁর আংটির ক্ষমতা
সাময়িক স্থগিত রেখেছিলেন, সেটি আবার চালু করলেন। প্রাচীন
রত্নটি এবার গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করতে শুরু করল: “হায়! আমার সেই বড় গ্রে-হাউন্ড (Greyhound) কুকুরটার মৃত্যুতে
আমি যে কত দুঃখ পেয়েছি! সে ছিল সেরা ছোট ‘স্ত্রী’ (সম্ভবত পুরুষ কুকুর, কিন্তু আদর করে স্ত্রী বলা
হয়েছে বা উল্টো), সবচেয়ে আদুরে প্রাণী: সে কখনো আমাকে
আনন্দ দেওয়া বন্ধ করত না। সে এত সংবেদনশীল, এত ভদ্র ছিল!
তোমরা ওর তুলনায় শুধুই জানোয়ার। আমার সেই পাষণ্ড স্বামী তাকে মেরে ফেলেছে।——বেচারা জিনজোলিনা!
আমি তাকে ছাড়া এখন আর আমার বাগানে জল দিতেও যাই না। আমি ভেবেছিলাম ওটার শোকেই আমার
মালকিন মারা যাবে। সে দুদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল, প্রায় জ্ঞান হারানোর
উপক্রম। তার শোকের বহর দেখুন: তার ধর্মীয় গুরু, তার
বন্ধুরা, এমনকি তার পাগ-কুকুরগুলোকেও আমার কাছ থেকে দূরে
রাখা হয়েছিল। তার পরিচারিকাদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন আমার স্বামীকে
কোনোভাবেই তার কামরায় ঢুকতে না দেওয়া হয়—ঢুকতে দিলেই চাকরি শেষ।——‘ওই দানব আমার
প্রিয় জিনজোলিনাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে,’ সে চিৎকার করে বলত; ‘ওকে আমার সামনে আসতে দিও না,
আমি ঠিক করেছি ওর মুখ আর কোনোদিন দেখব না।’”
মাঙ্গোগুল জিনজোলিনার
মৃত্যুর আসল রহস্য জানতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তিনি তাঁর আংটির পাথরটি কোটের সঙ্গে
ঘষে আরও শক্তিশালী করে নিলেন, হারিয়ার দিকে তাক করলেন এবং রত্নটি আবার বলতে শুরু করল:
“হারিয়া, রামাদেকের বিধবা স্ত্রী,
সিনডোর নামের এক যুবককে বিয়ে করে নতুন জীবন সাজিয়েছিলেন। এই
যুবকটি ভালো বংশের ছিল, তার অন্য কোনো সম্পদ ছিল না,
তবে একটি নির্দিষ্ট যোগ্যতা ছিল যা নারীজাতিকে খুশি করতে পারে;
এবং কুকুরদের পরে এটাই ছিল হারিয়ার প্রধান দুর্বলতা। সিনডোরের
দারিদ্র্য হারিয়ার বয়স এবং কুকুরদের প্রতি তার বিতৃষ্ণাকে জয় করেছিল। বছরে বিশ
হাজার ক্রাউনের লোভ সিনডোরকে তার মালকিনের মুখের বলিরেখা এবং পাগ-কুকুরগুলোর উৎপাত
সহ্য করার শক্তি জুগিয়েছিল; এবং সে তাঁকে বিয়ে করেছিল।”
“সিনডোর আশা করেছিল যে সে
তার প্রতিভা এবং বিনয়ী আচরণ দিয়ে আমাদের পশুদের ওপর জয়লাভ করবে এবং বিয়ের পর
তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে;
কিন্তু সে ভুল ভেবেছিল। বিয়ের কয়েক মাস পর, যখন সে ভাবল যে তার ‘সেবা’ দিয়ে সে যথেষ্ট অধিকার অর্জন করেছে, তখন সে ম্যাডামকে বোঝানোর
চেষ্টা করল যে—তাঁর কুকুরগুলো বিছানায় তার চেয়ে ভালো সঙ্গী হতে
পারে না; তিন-তিনটে
কুকুর বিছানায় রাখাটা হাস্যকর; এবং একবারে একাধিক
কুকুরকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে বাসরঘরকে কুকুরের আস্তানা বানানো।”
“‘আমি আপনাকে সাবধান করছি,’
হারিয়া রাগান্বিত স্বরে বললেন, ‘এমন কথা বলে আমাকে আক্রমণ করবেন না।
সত্যি, গ্যাসকনির
এক ভিখারি ছোকরা, যাকে আমি চিলেকোঠা থেকে তুলে এনেছি—যে ঘর আমার
কুকুরদের থাকারও যোগ্য ছিল না—তার মুখে এত বড় বড় কথা মানায় না!
নিশ্চিতভাবেই, আপনার
বিছানার চাদরগুলো খুব সুগন্ধি ছিল, তাই না আমার ছোট
জমিদারবাবু, যখন আপনি ওই ভাড়াটে খুপরিতে থাকতেন? জেনে রাখুন, আমার কুকুরগুলো আপনার অনেক আগে
থেকেই আমার বিছানা দখল করে আছে; এবং আপনি হয় নিজে এই
বিছানা ছেড়ে যেতে পারেন, অথবা তাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে
সন্তুষ্ট থাকতে পারেন।’”
“ঘোষণাটি ছিল চূড়ান্ত, এবং আমাদের কুকুরগুলো তাদের
অবস্থানে অটল রইল। কিন্তু এক রাতে, যখন আমরা সবাই
ঘুমাচ্ছিলাম, সিনডোর পাশ ফিরতে গিয়ে ভুল করে জিনজোলিনাকে
লাথি মারল। কুকুরটি এমন আচরণে অভ্যস্ত ছিল না, তাই সে
ক্যাঁক করে সিনডোরের পায়ের গোছায় কামড় বসিয়ে দিল। সিনডোরের আর্তনাদে ম্যাডাম
তৎক্ষণাৎ জেগে উঠলেন। ‘আপনার
কী হয়েছে স্যার, এমন চেঁচাচ্ছেন যেন কেউ আপনার গলা কাটছে: আপনি কি কোনো দুঃস্বপ্ন
দেখছেন?’ ‘এটা আপনার ওই শয়তান কুকুরগুলো, ম্যাডাম, যারা আমাকে চিবিয়ে খাচ্ছে, আর আপনার
গ্রে-হাউন্ডটি আমার পায়ের এক খাবলা মাংস ছিঁড়ে নিয়েছে।’ ‘এটুকুই?’
হারিয়া বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে শুতে শুতে বললেন। ‘আপনি অকারণে
বড্ড বেশি গোলমাল করেন।’”
“সিনডোর এই কথায় অপমানিত
হয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠল। সে দিব্যি কাটল যে, যতক্ষণ না এই জানোয়ারের পালকে বিছানা থেকে
নির্বাসিত করা হচ্ছে, সে আর এমুখো হবে না। সে কুকুরদের
তাড়ানোর জন্য বন্ধুদের দিয়ে সুপারিশ করাল, কিন্তু কোনো
লাভ হলো না। হারিয়া সাফ জানিয়ে দিলেন যে, সিনডোর হলো এক
রাস্তার ভিখারি, যাকে তিনি ইঁদুর-ভরা কুঁড়েঘর থেকে তুলে
এনেছেন; তার এত দেমাক মানায় না। তিনি সারা রাত শান্তিতে
ঘুমাতে চান; তিনি তাঁর কুকুরগুলোকে ভালোবাসেন; তারা তাঁকে বিনোদন দেয়; ছোটবেলা থেকেই তিনি
এদের আদরে অভ্যস্ত; এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিজেকে এদের
সঙ্গ থেকে বঞ্চিত করবেন না। ‘ওকে আরও বলে দেবেন,’
তিনি মধ্যস্থতাকারীদের বললেন, ‘যদি সে আমার ইচ্ছার কাছে বিনীতভাবে আত্মসমর্পণ
না করে, তবে তাকে
সারা জীবন পস্তাতে হবে। আমি তাকে যে মাসোহারা দিয়েছি তা বন্ধ করে দেব, এবং আমার উইলে আমি আমার প্রিয় সন্তানদের (কুকুরদের) ভরণপোষণের জন্য যে
অর্থ রেখেছি, তার সঙ্গে সিনডোরের ভাগটাও যোগ করে দেব।’”
“আপনার আর আমার মধ্যে কথাটা
থাকুক,” রত্নটি ফিসফিস করে যোগ করল,
“সিনডোরকে একটা আস্ত
গাধা হতে হবে, যদি
সে আশা করে যে তার জন্য হারিয়া এমন কিছু করবেন, যা বিশজন
প্রেমিক, একজন পরিচালক, একজন
স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী এবং একদল ব্রাহ্মণ—যাঁরা সবাই এ বিষয়ে তাঁদের ল্যাটিন
বিদ্যা খরচ করে ফেলেছেন—তাঁরাও যা করতে পারেননি। এদিকে, সিনডোর যতবার আমাদের
প্রাণীগুলোর দেখা পেত, রাগে তার গা জ্বলত। একদিন কপাল
খারাপ, জিনজোলিনা তার সামনে পড়ে গেল। সে রাগের মাথায়
কুকুরটাকে ধরে জানালা দিয়ে নিচে ছুড়ে ফেলে দিল। বেচারা প্রাণীটি পড়ে গিয়ে মরে
গেল। তখন, এক তুলকালাম কাণ্ড শুরু হলো। হারিয়া, রাগে অগ্নিশর্মা এবং চোখে জল নিয়ে...”
রত্নটি যা আগে বলেছিল তা
আবার পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছিল; কারণ রত্নরা সাধারণত একই কথা বারবার বলতে পছন্দ করে। কিন্তু মাঙ্গোগুল
তাকে থামিয়ে দিলেন। তবে বেশিক্ষণ থামিয়ে রাখলেন না; যখন
তিনি বুঝলেন যে বুড়ো রত্নটি মূল গল্প থেকে সরে গেছে, তখন
তিনি তাকে আবার কথা বলার সুযোগ দিলেন। বাচাল রত্নটি খিকখিক করে হেসে পুরোনো স্মৃতি
রোমন্থন করে আবার শুরু করল: “কিন্তু যাই হোক, আমি আপনাকে বলতে ভুলে গেছি হারিয়ার বিয়ের রাতে কী ঘটেছিল। আমি আমার
জীবনে অনেক হাস্যকর জিনিস দেখেছি, কিন্তু এর মতো কিছু
দেখিনি। এক এলাহি নৈশভোজের পর, বর ও কনেকে তাদের বাসরঘরে
নিয়ে যাওয়া হলো। ম্যাডামের পরিচারিকারা ছাড়া সবাই চলে গেল। তাঁকে পোশাক পরানো
হলো, বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হলো, এবং সিনডোর তাঁর সঙ্গে একা রইল। কিন্তু সে দেখল যে, একটি লোমশ কুকুর, দুটি পাগ এবং সেই
গ্রে-হাউন্ড—তার চেয়েও বেশি সতর্ক পাহারায় কনেকে ঘিরে রেখেছে।”
“‘ম্যাডাম, অনুমতি দিন,’ সে বলল, ‘এই চারপেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটু
সরিয়ে দিই।’ ‘প্রিয়, আপনি যা পারেন করুন,’ হারিয়া উত্তর দিলেন, ‘আমার পক্ষে ওদের তাড়িয়ে দেওয়ার
সাধ্য নেই; এই
ছোট প্রাণীগুলো আমার সঙ্গে এত বেশি জড়িয়ে আছে; আর আমি
এত দীর্ঘ সময় ধরে অন্য কোনো সঙ্গী ছাড়াই ছিলাম...’ ‘হয়তো,’ সিনডোর উত্তর দিল, ‘তারা আজ রাতে আমাকে সেই দুর্গটি সমর্পণ করার সৌজন্য দেখাবে, যা আমাকে দখল করতে হবে।’ ‘চেষ্টা করে দেখুন, স্যার,’ হারিয়া বললেন।”
“প্রথমে সিনডোর নরম সুরেই
চেষ্টা করল, এবং
জিনজোলিনাকে এক কোণে সরে যেতে অনুরোধ করল। কিন্তু অবাধ্য প্রাণীটি গোঁ গোঁ করতে
শুরু করল। বাকি সৈন্যদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল; এবং
পাগ-কুকুরগুলো আর লোমশ কুকুরটি এমনভাবে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল যেন তাদের মালকিনের গলা
কাটা হচ্ছে। এই হট্টগোলে সিনডোর ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে একটি পগকে ধরে ছুড়ে ফেলল,
অন্যটিকে লাথি মারল, এবং পম্পেইকে থাবা
দিয়ে ধরল। পম্পেই, সেই বিশ্বস্ত পম্পেই, তার মিত্রদের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েও, নিজের
অবস্থানের সুবিধা নিয়ে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করল। তার মালকিনের উরুর ওপর শক্ত
হয়ে বসে, রাগান্বিত চোখ, খাড়া
লোম এবং খোলা মুখ নিয়ে, সে দাঁত কিড়মিড় করল এবং
শত্রুকে তার দুই পাটি ধারালো দাঁত দেখাল। সিনডোর তার ওপর বেশ কয়েকবার আক্রমণ
চালাল, এবং পম্পেই ততবারই কামড়ানো আঙুল এবং ছেঁড়া জামার
হাতা দিয়ে তাকে প্রতিহত করল। এই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পনেরো মিনিটেরও বেশি সময় ধরে
চলল, যা হারিয়া ছাড়া আর কাউকেই আনন্দ দিল না। অবশেষে
সিনডোর এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে কৌশল অবলম্বন করল, যাকে সে
গায়ের জোরে হারাতে পারছিল না। সে ডান হাত দিয়ে পম্পেইকে উস্কে দিল। পম্পেই যখন
সেই হাতের দিকে নজর দিল, তখন সে সিনডোরের বাম হাতের
ঝটকাটা খেয়াল করল না, এবং ঘাড়ে ধরা পড়ল। সে নিজেকে
মুক্ত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো।
তাকে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে এবং হারিয়াকে সমর্পণ করতে বাধ্য করা হলো। সিনডোর
তাকে দখল করল, তবে রক্তপাত ছাড়াই নয়: সম্ভবত হারিয়া
আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে তাঁর বিয়ের রাতটি রক্তক্ষয়ী হবে; তাঁর প্রাণীগুলো ভালোই প্রতিরোধ গড়েছিল এবং তাঁর প্রত্যাশা পূরণ
করেছিল।”
“এই তো,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “এমন একটি রত্ন, যা আমার ব্যক্তিগত সেক্রেটারির চেয়েও ভালো
রিপোর্ট লিখতে পারে।” এবং ল্যাপ-ডগ বা কোলের কুকুর সম্পর্কে কী ধারণা
পোষণ করা উচিত তা ভালোভাবে জেনে, তিনি প্রিয়তমার কাছে ফিরে গেলেন।
“নিজেকে প্রস্তুত করুন,”
তিনি মিরজোজা দেখামাত্র বললেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে উদ্ভট কাহিনি শোনার জন্য। এটা
পালাব্রিয়ার সেই বেবুনগুলোর গল্পের চেয়েও মারাত্মক। তুমি কি বিশ্বাস করবে যে, হারিয়ার চারটি কুকুর ছিল
তার স্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বী, এবং পছন্দের প্রতিদ্বন্দ্বী?
এবং একটি গ্রে-হাউন্ডের মৃত্যু সেই দম্পতির মধ্যে এমন এক ফাটল
ধরিয়েছে যা আর কখনো জোড়া লাগবে না।”
“আপনি কী বলছেন,”
প্রিয়তমা উত্তর দিলেন, “প্রতিদ্বন্দ্বী এবং কুকুর! আমি কিছুই বুঝতে
পারছি না। আমি জানি হারিয়া তার কুকুরগুলোকে অন্ধের মতো ভালোবাসে; কিন্তু আমি এও জানি যে
সিনডোর একজন রাগী মানুষ। সে হয়তো নারীদের সঙ্গে সেই ভদ্রতা বজায় রাখেনি, যার কাছে একজন পুরুষ তার ভাগ্য ঋণী। কিন্তু তার আচরণ যাই হোক না কেন,
আমি কল্পনাও করতে পারি না যে এটা তার সামনে কোনো ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এনেছে। হারিয়া
এত শ্রদ্ধেয় মহিলা যে, আমি চাই মহামান্য দয়া করে নিজেকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করবেন।”
“শোনো তবে,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “এবং মেনে নাও যে নারীদের রুচি অত্যন্ত অদ্ভুত—খারাপ কিছু
না বললেও চলে।” তখন তিনি হারিয়ার গল্পটি হুবহু বর্ণনা করলেন, ঠিক যেমনটি রত্নটি বলেছিল।
মিরজোজা প্রথম রাতের যুদ্ধের কাহিনি শুনে হাসি থামাতে পারলেন না। কিন্তু হাসির রেশ
কাটতেই তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন: “আমি বলে বোঝাতে পারব না,”
তিনি মাঙ্গোগুলকে বললেন, “কী প্রচণ্ড ঘৃণা আমাকে গ্রাস করছে। আমি এই
প্রাণীগুলো এবং যারা তাদের রাখে—সবার প্রতিই বিতৃষ্ণা অনুভব করছি। আমি আমার সখীদের
ঘোষণা করে দেব যে, আমি তাকেই সবার আগে তাড়িয়ে দেব, যাকে এমনকি
একটা ছোট কুকুর ছানা রাখার সন্দেহেও পাওয়া যাবে।”
“দয়া করে থামো,”
সুলতান উত্তর দিলেন, “কেন তুমি তোমার ঘৃণাকে এতদূর টেনে নিয়ে যাবে? তোমরা মহিলারা সবসময়ই
চরমপন্থী। এই প্রাণীগুলো শিকারের জন্য ভালো, গ্রামের
বাড়িতে পাহারার জন্য প্রয়োজনীয়, এবং আরও অনেক কাজে
লাগে—অবশ্য হারিয়া তাদের যে কাজে লাগায় তা বাদ দিয়ে।”
“সত্যি,”
মিরজোজা বললেন, “আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, মহামান্যের জন্য একজন প্রকৃত
সতীসাধ্বী নারী খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন কাজ হবে।”
“আমি তো তোমায় আগেই
বলেছিলাম,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন;
“কিন্তু আমরা এখনই কোনো
সিদ্ধান্তে পৌঁছাব না: তুমি হয়তো একদিন আমার ধৈর্যের অভাবের জন্য আমাকে তিরস্কার
করবে—কিন্তু
আমি দাবি করব যে আমি যা জেনেছি, তা আমার আংটির পরীক্ষার ফল। আমার মাথায় এমন কিছু আছে, যা তোমাকে সত্যিই অবাক করে দেবে। সব গোপনীয়তা এখনো উন্মোচিত হয়নি;
এবং আমি সেই রত্নগুলো থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের আশা করছি,
যেগুলো এখনো জেরা করা বাকি আছে।”
মিরজোজা নিজের জন্য
সারাক্ষণ এক অজানা আশঙ্কায় ছিলেন। মাঙ্গোগুলের কথাগুলো তাঁকে এমন এক অস্বস্তিতে
ফেলেছিল যা তিনি লুকাতে পারছিলেন না। কিন্তু সুলতান, যিনি শপথ দ্বারা আবদ্ধ ছিলেন এবং যাঁর মনে
ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল, তিনি প্রিয়তমার মন শান্ত করার
জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। তিনি তাঁকে কিছু খুব কোমল চুম্বন দিলেন এবং
রাজদরবারের উদ্দেশে রওনা হলেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সব
কাজ তাঁর অপেক্ষায় ছিল।
চব্বিশতম
অধ্যায়: আংটির একাদশ পরীক্ষা—পেনশন বণ্টন
কানাগলু এবং এর্গেবজেডের
রাজত্বকালে কঙ্গো সাম্রাজ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আঘাতে জর্জরিত হয়েছিল; এবং সেই দুই রাজা তাঁদের
প্রতিবেশীদের ওপর যে বিজয় অর্জন করেছিলেন, তা দিয়ে
নিজেদের ইতিহাসে অমর করে রেখেছিলেন। কিন্তু অ্যাবেক্স এবং অ্যাঙ্গোলার সম্রাটরা
মাঙ্গোগুলের যৌবনকাল এবং তাঁর রাজত্বের শুরুর সময়টাকে তাঁদের হারানো প্রদেশগুলো
পুনরুদ্ধারের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখলেন। তাই তাঁরা কঙ্গোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা
করলেন এবং সব দিক থেকে আক্রমণ শানালেন।
অবশ্য মাঙ্গোগুলের
মন্ত্রীসভা ছিল আফ্রিকার সেরা। বৃদ্ধ সাম্বুকো এবং আমির মিরজালা, যাঁরা আগের যুদ্ধগুলোতে পোড়
খাওয়া মানুষ ছিলেন, তাঁদেরই সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে
নিয়োগ দেওয়া হলো। তাঁরা একের পর এক বিজয় অর্জন করলেন এবং তাঁদের উত্তরাধিকারী
হওয়ার মতো যোগ্য জেনারেল তৈরি করলেন; যা তাঁদের
তাৎক্ষণিক সাফল্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাপ্তি ছিল।
মন্ত্রীসভার তৎপরতা এবং
জেনারেলদের সুনিপুণ পরিচালনার ফলে,
শত্রুরা—যারা ভেবেছিল সহজেই সাম্রাজ্য জয় করে
নেবে—তারা
কঙ্গোর সীমান্তের ধারেরকাছেও ঘেঁষতে পারল না। উল্টো নিজেদের দুর্বল প্রতিরোধ গড়তে
হলো এবং নিজেদের সুরক্ষিত শহর ও প্রদেশগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখল।
কিন্তু, এত অবিচ্ছিন্ন এবং গৌরবময়
সাফল্য সত্ত্বেও, কঙ্গো নিজেকে বড় করতে গিয়ে ভেতর থেকে
দুর্বল হয়ে পড়ছিল: ঘন ঘন সৈন্য সংগ্রহ করার ফলে শহর এবং গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে
যাচ্ছিল; আর যুদ্ধের খরচে রাজকোষাগার একেবারে তলানিতে
ঠেকেছিল। অবরোধ এবং যুদ্ধগুলোতে প্রচুর মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। অভিযোগ উঠল যে,
গ্র্যান্ড উজির বা প্রধানমন্ত্রী সৈন্যদের রক্তের ব্যাপারে বড্ড
বেশি উদার ছিলেন—তিনি এমন সব যুদ্ধে ঝুঁকি নিয়েছিলেন যা আদতে কোনো
ফল দেয়নি।
প্রতিটি পরিবার শোকে
মুহ্যমান ছিল: দেশে এমন কোনো পরিবার ছিল না,
যারা তাদের বাবা, ভাই বা বন্ধুকে
হারায়নি। নিহত কর্মকর্তাদের সংখ্যা ছিল বিশাল; আর তাদের
বিধবা স্ত্রীদের সংখ্যার সঙ্গে একমাত্র পেনশনের আবেদনের সংখ্যারই তুলনা করা চলে।
মন্ত্রীদের দপ্তরগুলো তাদের ভিড়ে অবরুদ্ধ হয়ে ছিল। তারা সুলতানকেও আবেদনপত্র
দিয়ে নাজেহাল করে তুলছিল, যেখানে মৃত স্বামীদের যোগ্যতা
ও সেবা, তাদের বিধবাদের অসহনীয় দুঃখ, এতিম সন্তানদের করুণ অবস্থা এবং অন্যান্য মর্মস্পর্শী কারণগুলো ফলাও
করে লেখা হতো।
তাদের অনুরোধগুলোকে খুবই
ন্যায্য মনে হয়েছিল: কিন্তু লাখ লাখ টাকার এই পেনশন কোন তহবিলের ওপর ভিত্তি করে
দেওয়া হবে? রাজকোষে
তো ফুটো কড়িও নেই!
মন্ত্রীরা লম্বা লম্বা
বক্তৃতা দিয়ে, এবং
শেষমেশ বিরক্তি ও কটু কথা বলে ক্লান্ত হয়ে, বিষয়টি
কীভাবে চিরতরে নিষ্পত্তি করা যায় তা নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য হলেন। কিন্তু
তাঁদের কাছে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার একটি মোক্ষম কারণ ছিল: পকেটে কানাকড়িও
অবশিষ্ট ছিল না।
মাঙ্গোগুল তাঁর মন্ত্রীদের
ভুয়া যুক্তি আর বিধবাদের বিলাপ শুনে ক্লান্ত হয়ে এমন একটি উপায় বের করলেন, যা তাঁর মন্ত্রীসভা এত দিন
ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছিল। “ভদ্রমহোদয়গণ,” তিনি তাঁর সভাসদদের বললেন,
“আমার মতে, কোনো পেনশন মঞ্জুর করার আগে,
সেগুলো আদৌ আইনত প্রাপ্য কি না, তা
যাচাই করে দেখা উচিত।”
“এই পরীক্ষা তো অনন্তকাল
ধরে চলবে,” মহান সেনেশাল (প্রধান
বিচারপতি বা রাজকর্মকর্তা) উত্তর দিলেন, “এবং এটা নিয়ে বিশাল হট্টগোল হবে। তাছাড়া এই
মহিলাদের চিৎকার আর অত্যাচারকে আমরা কীভাবে সামলাব, যাঁদের জ্বালায় আপনি নিজেও বিশেষ বিরক্ত?”
“এটা আপনার কল্পনার চেয়ে
অনেক সহজ কাজ হবে, মিস্টার সেনেশাল,”
সুলতান উত্তর দিলেন; “এবং আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে আগামীকাল দুপুরের
মধ্যেই, কঠোরতম
ন্যায়বিচারের আইন মেনে পুরো বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। আপনি শুধু তাঁদের
আগামীকাল সকাল নটায় আমার দরবারকক্ষে (Audience Chamber) হাজির
করান।”
সভা শেষ হলো। সেনেশাল তাঁর
দপ্তরে গেলেন, গভীরভাবে
চিন্তা করলেন এবং নিচের ঘোষণাটি তৈরি করলেন; যা তিন
ঘণ্টার মধ্যে ছাপা হলো, তূরী বাজিয়ে প্রচার করা হলো এবং
বানজা শহরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাঁটিয়ে দেওয়া হলো:
মহামান্য সুলতান এবং
আমার প্রভু গ্র্যান্ড সেনেশালের আদেশে:
আমরা, গ্যান্ডার-বিক, কঙ্গোর গ্র্যান্ড সেনেশাল, প্রথম শ্রেণির উজির,
মহান মানিমনবান্দার রাজপোশাকের বাহক, দেওয়ান-ই-খাস
এর ঝাড়ুদারদের প্রধান এবং তত্ত্বাবধায়ক, এতদ্বারা ঘোষণা
করছি যে— আগামীকাল সকাল নটায়, মহামান্য সুলতান তাঁর সেবায়
নিহত কর্মকর্তাদের বিধবা স্ত্রীদের দরবারকক্ষে সাক্ষাৎ দেবেন। তিনি তাঁদের
দাবিগুলো যাচাই করে তাঁর বিবেচনায় যা উপযুক্ত মনে হবে, সেই
সিদ্ধান্ত নেবেন।
রেজেব মাসের দ্বাদশ দিনে, ১৪৭২০০০০০০৯ খ্রিস্টাব্দে
আমাদের দপ্তর থেকে জারি করা হলো।
কঙ্গোর সমস্ত দুর্দশাগ্রস্ত
মহিলা—এবং
তাদের সংখ্যা ছিল প্রচুর—এই ঘোষণাটি পড়তে বা ভৃত্যদের দিয়ে পড়াতে ভুলল
না; এবং
নির্ধারিত সময়ে দরবারকক্ষের লবিতে ভিড় জমাতে আরও কম ভুলল না।
“ভিড় এড়াতে, একবারে ছয়জনের বেশি মহিলা
প্রবেশ করবেন না,” সুলতান আদেশ দিলেন, “আমরা যখন তাঁদের কথা শুনব,
তখন তাঁদের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেবেন, যা সোজা বাইরের উঠোনে চলে গেছে। আপনারা, ভদ্রমহোদয়গণ,
মনোযোগ দিন এবং তাঁদের দাবিগুলো সম্পর্কে রায় দিন।”
এ কথা বলার পর, তিনি দরবারকক্ষের প্রধান
দ্বাররক্ষক বা ‘উশার’কে একটি সংকেত দিলেন; এবং দরজার সবচেয়ে কাছে থাকা
প্রথম ছয়জনকে ভেতরে প্রবেশ করানো হলো। তাঁরা লম্বা কালো শোকের পোশাক পরে প্রবেশ
করলেন এবং সুলতানকে গভীর অভিবাদন জানালেন।
মাঙ্গোগুল তাঁদের মধ্যে
সবচেয়ে কম বয়সী এবং সুন্দরীটির দিকে তাকালেন, যার নাম ছিল ইফেচ। “ম্যাডাম,”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার স্বামী মারা গেছেন কত দিন হলো?”
“তিন মাস, হুজুর,” ইফেচ কাঁদতে কাঁদতে উত্তর
দিলেন। “তিনি মহামান্যের সেবায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল ছিলেন।
তিনি শেষ যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, এবং আমাকে এই ছয়টি এতিম সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে ভাসিয়ে রেখে গেছেন...”
“তিনি আপনাকে
রেখে গেছেন?” একটি কণ্ঠস্বর মাঝপথে বাধা
দিল। কথাটি ইফেচের কাছ থেকে এলেও, তা ইফেচের গলার স্বরের
সঙ্গে ঠিক মিলল না। “ম্যাডাম যা বলছেন,
তার চেয়ে তিনি ভালো জানেন। এই ছয়টি বাচ্চার শুরু এবং শেষ—দুটোই
হয়েছে এক তরুণ ব্রাহ্মণের হাতে,
যিনি আমার মালকিনকে প্রতিদিন সান্ত্বনা দিতে আসতেন, যখন তাঁর স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রে থাকতেন।”
অনুমান করা সহজ, এই উত্তরটি উচ্চারণকারী সেই
অবিবেচক কণ্ঠস্বরটি কোথা থেকে এসেছিল। বেচারা ইফেচ বিব্রত হয়ে ফ্যাকাশে হয়ে
গেলেন, থরথর করে কাঁপতে লাগলেন এবং শেষমেশ অজ্ঞান হয়ে
পড়ে গেলেন।
“ম্যাডাম ‘ভ্যাপার্স’ বা মূর্ছায়
আক্রান্ত হয়েছেন,” মাঙ্গোগুল শান্তভাবে বললেন,
“তাঁকে অন্দরমহলের (Seraglio) একটি কক্ষে নিয়ে
যাওয়া হোক এবং তাঁর সেবাযত্ন করা হোক।”
এরপর তিনি তৎক্ষণাৎ ফেনিসের
দিকে নজর দিলেন। “ম্যাডাম,”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার স্বামী কি একজন পাশা ছিলেন না?”
“হ্যাঁ, স্যার,” ফেনিস কাঁপানো গলায় উত্তর
দিলেন।
“এবং আপনি তাঁকে কীভাবে
হারালেন?”
“স্যার, তিনি তাঁর বিছানায় মারা
গেছেন। শেষ যুদ্ধের ধকল সইতে না পেরে তিনি পুরোপুরি নিঃশেষ (Exhausted) হয়ে পড়েছিলেন...”
“শেষ যুদ্ধের
ধকলে!” ফেনিসের ‘গোপন রত্ন’ টিপ্পনী কাটল। “চুপ করুন ম্যাডাম! আপনার স্বামী
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে একেবারে ষাঁড়ের মতো সুস্বাস্থ্য নিয়ে ফিরেছিলেন; এবং তিনি আজও দিব্যি
বেঁচেবর্তে থাকতেন, যদি না দুই বা তিনজন ষণ্ডামার্কা
খেলোয়াড়... আপনি বুঝতেই পারছেন, তাঁর ‘যত্ন’ নিত।”
“লিখে রাখুন,”
সুলতান বললেন, “যে ফেনিস রাষ্ট্র এবং তাঁর স্বামীকে যে ‘ভালো সেবা’ দিয়েছেন, তার জন্য পেনশন দাবি করছেন।”
তৃতীয় একজনকে তাঁর স্বামীর
নাম ও বয়স সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। শোনা গিয়েছিল তিনি নাকি সেনাবাহিনীতে
থাকার সময় গুটিবসন্তে মারা গেছেন।
“গুটিবসন্তে!” রত্নটি
বলে উঠল, “চমৎকার গল্প বটে! সত্যি করে বলুন তো
ম্যাডাম, ওই
দুটি মারাত্মক তলোয়ারের আঘাতের কথা, যা তিনি সাঙ্গিয়াক
কাভালিয়োর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন? কারণ কাভালিয়ো
এটা মেনে নিতে পারেননি যে, আপনার বড় ছেলেটি দেখতে হুবহু
তাঁর (কাভালিয়োর) মতো—ঠিক যেন একটি ডিমের সঙ্গে আরেকটির মিল।
এবং ম্যাডাম, আপনি আমার মতোই ভালো জানেন,” রত্নটি যোগ করল, “যে এই সাদৃশ্য বা চেহারার মিলের
ভিত্তিটা মোটেও নড়বড়ে ছিল না।”
চতুর্থ জন তো সুলতানের জিজ্ঞাসাবাদের
অপেক্ষাই করলেন না, নিজে থেকেই কথা
বলতে যাচ্ছিলেন; ঠিক তখনই তাঁর শরীরের নিচু অঞ্চল থেকে
চিৎকার ভেসে এল। রত্নটি জানিয়ে দিল যে, গত দশ বছর ধরে
যুদ্ধ চলাকালীন সে তার সময়টা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে। দুজন খাস-পরিচারক (Page)
আর এক বিশাল বখাটে ভৃত্য তার স্বামীর অভাব বেশ ভালোভাবেই পূরণ
করেছে। আর সে এখন যে পেনশনের জন্য আবদার করছে, তা আসলে এক
কমেডি অপেরার অভিনেতাকে পুষবে বলেই ফন্দি এঁটেছে।
পঞ্চম জন বুক ফুলিয়ে নির্ভীকভাবে
এগিয়ে এলেন এবং অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর প্রয়াত স্বামীর সেবার পুরস্কার
দাবি করলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন জেনিসারি বাহিনীর আগা,
যিনি মাতাত্রাসের দেয়ালের নিচে প্রাণ হারিয়েছিলেন। সুলতান তাঁর
ওপর আংটি ঘোরালেন, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। তাঁর রত্নটি
একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে রইল।
আফ্রিকান লেখক,
যিনি তাঁকে সামনাসামনি দেখেছিলেন, তিনি
টিপ্পনী কেটেছেন: “ভদ্রমহিলা এতটাই কুৎসিত ছিলেন যে,
তাঁর রত্ন কথা বললে দর্শকরা বরং সেটাই বেশি অবাক হতো।”
সুলতান এবার ষষ্ঠ জনের কাছে পৌঁছালেন,
এবং এখানেই আগের রহস্য ফাঁস হলো। এই রত্নটি স্পষ্ট গলায় বলে
উঠল:
“সত্যিই,
ওই ম্যাডামের মুখে এসব শোভা পায়—যার
রত্নটি একটু আগে জেদ করে চুপ করে ছিল! উনি এসেছেন পেনশন দাবি করতে?
অথচ উনি তো কচি খোকাদের (মুরগি) পকেট কেটেই দিব্যি দিন চালান।
উনি একটা ‘ব্রেলান’ (জুয়ার) টেবিল চালান, যা থেকে বছরে তিন হাজার সিকুইন আয় হয়; জুয়াড়িদের
খরচে নিজের ব্যক্তিগত ডিনারের আয়োজন করেন; এবং সেই
বিশ্বাসঘাতক উসমানের কাছ থেকে ছ’শো সিকুইন খেয়েছিলেন
আমাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওই ডিনারগুলোর একটিতে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য...”
“আপনাদের
আবেদনগুলো যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে, মহিলারা,”
সুলতান মুচকি হেসে বললেন, “আপাতত আপনারা আসতে পারেন।”
তাঁরা বেরিয়ে যেতেই তিনি তাঁর
উপদেষ্টাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ব্রাহ্মণ আর অন্যদের জারজ সন্তানদের পালার জন্য, কিংবা যেসব নারী সাহসী বীরদের অসম্মান করেছে তাদের পেনশন দেওয়াটা কি
তাঁদের কাছে হাস্যকর মনে হয় না? যাঁরা সুলতানের সেবায়
গৌরব অর্জনের সন্ধানে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের
বিধবাদের এই দশা!
সেনেশাল উঠে দাঁড়ালেন,
উত্তর দিলেন, বক্তৃতা দিলেন, আবার শুরু করলেন এবং যথারীতি অত্যন্ত অস্পষ্টভাবে তাঁর মতামত দিলেন।
তিনি যখন বকবক করছিলেন,
ওদিকে ইফেচ (সেই প্রথম মহিলা) তার মূর্ছা ভাব কাটিয়ে সুস্থ হয়ে
উঠল। পুরো ঘটনায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল; এবং যেহেতু সে
বুঝতে পেরেছিল তার নিজের পেনশন পাওয়ার কোনো আশা নেই, আর
অন্য কেউ যদি পায় তবে তার গা জ্বলবে—তাই সে সোজা অ্যান্টি-চেম্বারে
বা লবিতে গেল। সেখানে সে তার দুই-তিনজন বান্ধবীকে ফিসফিস করে বলল:
“ওরে
বোকার দল, এখানে তোদের ডাকা
হয়েছে শুধু তোদের ‘গোপন রত্ন’গুলোর কেচ্ছা শোনার জন্য! আমি নিজে একটু আগে শ্রোতাকক্ষে এক ভয়ানক
কথা বলতে শুনেছি; আমি মরে গেলেও তার
নাম মুখে আনব না। কিন্তু তোরা যদি একই বিপদের মুখে মাথা পেতে দিস, তবে তোদের মতো বোকা আর কেউ নেই।”
এই উপদেশ বা সতর্কবাণী হাতে হাতে (বা
কানে কানে) ছড়িয়ে পড়ল, আর নিমেষের মধ্যে
বিধবাদের ভিড় উধাও হয়ে গেল। যখন প্রধান দ্বাররক্ষক (Usher) দ্বিতীয় দলটিকে ডাকার জন্য দরজা খুললেন, দেখলেন
সেখানে কাকপক্ষীও নেই।
“কী
সেনেশাল, এবার কি আমার ওপর
ভরসা হলো?” লবি ফাঁকা হওয়ার খবর পেয়ে সুলতান ভালোমানুষ সেনেশালের কাঁধে চাপড়
মেরে বললেন। “আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম এই ঘ্যানঘ্যানে মহিলাদের হাত থেকে আপনাকে
মুক্তি দেব, আর আমি তা করেছি।
অথচ পঁচাত্তর বছর বয়স হওয়া সত্ত্বেও আপনি এদের প্রতি বেশ দুর্বল ছিলেন। যাই হোক,
ওরা চলে যাওয়ায় আপনি আমার কাছে ঋণী, কারণ
ওরা আপনাকে সুখের চেয়ে অসুবিধাই বেশি দিত।”
আফ্রিকান লেখক আমাদের জানান যে,
এই পরীক্ষার স্মৃতি কঙ্গোতে আজও অমলিন হয়ে আছে; আর ঠিক এই কারণেই সেখানকার সরকার পেনশন মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে এত
হাড়কিপ্টে। কিন্তু কুকুফার আংটির একমাত্র ভালো প্রভাব এটাই ছিল না, যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে দেখতে পাব।
পঁচিশতম
অধ্যায়: আংটির দ্বাদশ পরীক্ষা—একটি আইনি মামলা
কঙ্গোতে ধর্ষণ ছিল কঠোরভাবে
শাস্তিযোগ্য অপরাধ: এবং মাঙ্গোগুলের রাজত্বকালে একটি অত্যন্ত কুখ্যাত ঘটনা ঘটেছিল।
এই রাজপুত্র সিংহাসনে আরোহণের সময় তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই শপথ করেছিলেন যে—তিনি সেই অপরাধের
জন্য কাউকে ক্ষমা করবেন না। কিন্তু আইন যত কঠোরই হোক না কেন, কামনার তাড়নায় যারা অন্ধ,
তাদের তা খুব কমই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে
অপরাধীকে শরীরের সেই বিশেষ অঙ্গটি কেটে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হতো, যার দ্বারা সে পাপ করেছিল।
এটি ছিল একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর অপারেশন, যার ফলে অপরাধী
সাধারণত মারাই যেত; কারণ যে ব্যক্তি এটি সম্পাদন করত
(জল্লাদ), সে খুব একটা সতর্কতা বা দয়ামায়া দেখাত না।
কেরফায়েল, একটি ভালো পরিবারের এক যুবক,
গত ছয় মাস ধরে একটি অন্ধকার কারাগারে ধুঁকছিল এবং মৃত্যুদণ্ডের
দিনের প্রহর গুনছিল। ফাতমে, এক সুন্দরী তরুণী, তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে নিজেকে ‘লুক্রেশিয়া’ (রোমান পুরাণের
এক সতীসাধ্বী নারী, যে ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছিল) হিসেবে দাবি করেছিল। সবাই জানত যে
তাদের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল: ফাতমের উদার স্বামী এতে কোনো আপত্তি করেননি;
তাই জনসাধারণের পক্ষে তাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোটা অশালীন
হতো।
দুই বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন
সম্পর্কের পর—সেটা অস্থিরতা বা একঘেয়েমি,
যা-ই হোক না কেন—কেরফায়েল বানজার অপেরার এক নর্তকীর প্রতি
আকৃষ্ট হলেন এবং ফাতমের প্রতি শীতল হয়ে গেলেন। তবে তিনি কোনো প্রকাশ্য ঝগড়া বা
বিচ্ছেদ চাননি; বরং
তিনি একটি ভদ্রস্থ দূরত্বের সিদ্ধান্ত নিলেন—যার ফলে তাঁকে বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে ফাতমের
বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য যেতে হতো। ফাতমে এভাবে পরিত্যক্ত হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে
প্রতিশোধের পরিকল্পনা করল, এবং তার অবিশ্বস্ত প্রেমিকের এই অবশিষ্ট আনুগত্য বা সৌজন্যবোধকেই তাকে
ধ্বংস করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ছক কষল।
একদিন, যখন তার সুবিধাবাদী স্বামী
তাদের একান্তে কথা বলার সুযোগ দিয়ে বাইরে গিয়েছিলেন, তখন
কেরফায়েল তাঁর তলোয়ার খুলে পাশে রেখেছিলেন। তিনি ফাতমের সন্দেহ দূর করার জন্য
নানা দিব্যি-প্রতিবাদ করছিলেন—যা প্রেমিকদের জন্য খুব সস্তা হলেও ঈর্ষান্বিত
নারীর সন্দেহ দূর করতে কখনোই যথেষ্ট হয় না। ঠিক তখনই ফাতমে একটি ভীতু ভাব ধরল এবং
নিজের পোশাক পাঁচ-ছয় টানে ছিঁড়ে ফেলল। সে ভয়ানকভাবে চিৎকার করে উঠল এবং তার
স্বামী ও ভৃত্যদের সাহায্যের জন্য ডাকল। তারা তৎক্ষণাৎ ছুটে এল এবং দেখল ফাতমের
পোশাক ছেঁড়া। ফাতমে কেরফায়েলের খোলা তলোয়ার দেখিয়ে যোগ করল: “এই কুখ্যাত
শয়তানটা আমাকে তার নোংরা ইচ্ছার কাছে মাথা নত করানোর জন্য দশবার আমার মাথার ওপর
তলোয়ার তুলেছিল।”
যুবকটি অভিযোগের এই জঘন্য
মিথ্যায় এতটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে,
তার উত্তর দেওয়ার বা পালানোর কোনো শক্তিই ছিল না। তাকে ধরা হলো,
টেনেহিঁচড়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো এবং বিচারক বা
কাদিলেস্করদের (Cadileskers) হাতে বিচারের জন্য তুলে
দেওয়া হলো।
আইন অনুযায়ী ফাতমেকে
শারীরিক পরীক্ষার জন্য দেখা উচিত ছিল। সেই অনুযায়ী তাকে ধাত্রীদের (Midwives) কাছে পাঠানো হলো;
এবং তাদের প্রতিবেদন অভিযুক্তের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল প্রমাণিত
হলো। তাদের কাছে একটি মৌলিক মানদণ্ড বা ‘সূত্র’ ছিল, যার দ্বারা তারা ধর্ষিত মহিলার অবস্থা নির্ধারণ
করতে পারত; এবং প্রতিটি পরিস্থিতি কেরফায়েলের বিরুদ্ধে
গেল। বিচারকরা তাকে জেরা করলেন, ফাতমেকে তার মুখোমুখি করা
হলো এবং সাক্ষ্য শোনা হলো। কেরফায়েল নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেন, ঘটনা অস্বীকার করলেন এবং দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিযোগকারীর সঙ্গে
তাঁর প্রেমের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে—ফাতমে এমন নারী
নন যাকে ধর্ষণ করার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু খোলা তলোয়ারের ঘটনা, ঘরের নির্জনতা, এবং স্বামী ও বাড়ির লোকদের দেখে কেরফায়েলের তাৎক্ষণিক বিভ্রান্তি—সবকিছু মিলিয়ে
বিচারকদের মনে তাঁর বিরুদ্ধে প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি করল। ফাতমে নিজের দিক থেকে
তাঁকে সামান্যতম অনুগ্রহ বা প্রশ্রয় দেওয়ার কথা স্বীকার করা তো দূরের কথা, এমনকি তাঁকে আশার
বিন্দুমাত্র ইশারা দেওয়ার কথাও অস্বীকার করলেন। তিনি দাবি করলেন যে, স্বামীর প্রতি তাঁর অবিচল আনুগত্য—যা থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি—নিঃসন্দেহে
কেরফায়েলকে উৎসাহিত করেছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা অর্জন করতে, যা সে ছলচাতুরীর মাধ্যমে
পেতে ব্যর্থ হয়েছিল।
তদন্তকারী কমিশনারদের তৈরি
করা মৌখিক প্রতিবেদনটি ছিল আরেকটি ভয়ঙ্কর দলিল। এটি একবার পড়ে দেখা এবং ফৌজদারি
দণ্ডবিধির অনুচ্ছেদগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই যথেষ্ট ছিল—তাতেই হতভাগ্য
কেরফায়েলের কপালে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয়ে গেল। নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন বা পরিবারের
প্রভাব খাটিয়ে জীবন বাঁচানোর সব আশা সে হারিয়ে ফেলেছিল; ম্যাজিস্ট্রেটরা ‘রেবেগের’ তেরো তারিখে
চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন: এবং প্রথা অনুযায়ী তূর্যধ্বনির
মাধ্যমে তা শহরবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এই বিষয়টি শহরের একমাত্র
আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল এবং লোকেরা দীর্ঘকাল ধরে এটি নিয়ে দুই দলে বিভক্ত ছিল।
কিছু বৃদ্ধা—যাঁরা ধর্ষণের
আশঙ্কা থেকে সব সময়ই নিরাপদ দূরত্বে ছিলেন—তাঁরা চিৎকার করে বলছিলেন: “কেরফায়েলের
এই হামলা ছিল জঘন্য; যদি তার বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্ত স্থাপন না করা হয়, তবে নির্দোষ নারীদের নিরাপত্তা আর থাকবে না; এবং
একজন সতী নারীকে এমনকি বেদীর সামনে দাঁড়িয়েও অপমানিত হতে হবে।” তারপর
তাঁরা ছোট ছোট ‘দুষ্টু কুকুরছানাদের’ উদাহরণ দিলেন যারা বেশ কিছু সম্মানিত
মহিলার সতীত্বে হানা দিয়েছিল: এবং তাঁদের কথা বলার ধরণ দেখে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ
ছিল না যে—তাঁরা যেসব ‘সম্মানিত মহিলা’র কথা বলছিলেন, তাঁরা আসলে তাঁরা নিজেরাই।
এবং এই সমস্ত বক্তৃতা কেরফায়েলের চেয়ে অনেক বেশি নির্দোষ ব্রাহ্মণদের কাছে এবং
ফাতমের মতো ‘পবিত্র ভক্তদের’ দ্বারা শিক্ষামূলক আলোচনা হিসেবে পেশ
করা হচ্ছিল।
এর বিপরীতে, শৌখিন বাবুরা (Petits-maîtres)
এবং এমনকি কিছু শৌখিন নারীরা দাবি করল যে, ধর্ষণ একটি অলীক কল্পনা মাত্র; একজন নারী কখনো
আত্মসমর্পণ করে না, যতক্ষণ না সে মনে মনে আত্মসমর্পণ করতে
চায়; এবং যদি কোনো দুর্গ সামান্যতমও প্রতিরোধ গড়ে তোলে,
তবে তা ঝড়ের গতিতে দখল করা একেবারেই অসম্ভব। এই যুক্তির সমর্থনে
তাঁরা অনেক উদাহরণ দিলেন: মহিলারা কিছু জানত; শৌখিন
বাবুরা কিছু নতুন তথ্য আবিষ্কার করল; এবং এমন মহিলাদের
উদাহরণ দেওয়ার কোনো শেষ ছিল না, যাদের কখনো ধর্ষণ করা
হয়নি।
“বেচারা কেরফায়েল,”
তারা বলাবলি করল, “তার মাথায় কী ভূত চেপেছিল? সে কেন ওই ছোট ‘বিমব্রেলোকা’কে (নর্তকীর
নাম) বেছে নিল? সে
কেন ফাতমের সঙ্গেই লেগে থাকল না? তাদের সম্পর্ক তো বেশ
ভালোই ছিল এবং স্বামীও তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কী কপাল!—সেই ডাইনি ধাত্রীরা
নিশ্চয়ই অকারণে তাদের চশমা পরেছিল,
কারণ তারা আসলে কিছুই দেখেনি। আর সত্যিই তো, ওইসব জায়গায় কে আর পরিষ্কার দেখতে পায়? তাছাড়া,
সিনেটররা একটা খোলা দরজা ভাঙার অপরাধে তাকে তার জীবনের সব আনন্দ
থেকে বঞ্চিত করতে চলেছে। বেচারা ছেলেটা মারা যাবে, এতে
কোনো সন্দেহ নেই। তারপর দয়া করে ভাবুন তো, অসন্তুষ্ট
মহিলারা তখন কী কী করার লাইসেন্স পেয়ে যাবে!”
“যদি এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
হয়,” অন্য একজন বাধা দিয়ে বলল,
“তবে আমি নিজেকে একজন ‘ফ্রিম্যাসন’ বানিয়ে নেব
(মানে সমাজ ত্যাগ করব)।”
মির্জোজা স্বভাবতই
সহানুভূতিশীল ছিলেন। মাঙ্গোগুল যখন কেরফায়েলের ঘটনা নিয়ে ঠাট্টা করছিলেন, তখন তিনি তাঁকে বোঝালেন যে—যদি আইন কেরফায়েলের
বিরুদ্ধে কথা বলে, তবে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান ফাতমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। “তাছাড়া,”
তিনি যোগ করলেন, “কখনো শোনা যায়নি যে, একটি সুবিচারক সরকারে আইনের
অক্ষর এত অন্ধভাবে মেনে চলা উচিত যে—একজন মহিলা অভিযোগকারীর মুখের কথায় একজন
প্রজার জীবন বিপন্ন হবে। ধর্ষণের বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করা যায় না; এবং আপনি স্বীকার করবেন,
হুজুর, যে এই ঘটনাটি আপনার আংটির
এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে—আপনার সিনেটরদের চেয়ে কম নয়। এটা খুবই অদ্ভুত
হবে যদি ধাত্রীরা এই বিষয়ে ‘গোপন রত্ন’দের চেয়ে বেশি জ্ঞানী হয়। এখন পর্যন্ত
মহামান্যের আংটি কেবল আপনার কৌতূহল মেটানো ছাড়া আর কিছুই করেনি। যে জিনিয়াসের
কাছ থেকে আপনি এটি পেয়েছিলেন, সে কি আরও মহৎ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এটি দেয়নি? যদি আপনি সত্য উদঘাটন এবং আপনার প্রজাদের সুখের জন্য এটি ব্যবহার করেন,
তবে কি আপনি মনে করেন জিনিয়াস রুষ্ট হবে? চেষ্টা করে দেখুন না। ফাতমের কাছ থেকে তার অপরাধের স্বীকারোক্তি বা তার
নির্দোষতার প্রমাণ বের করার একটি অব্যর্থ অস্ত্র তো আপনার হাতেই আছে।”
“তুমি একদম ঠিক বলেছ,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “এবং তুমি সন্তুষ্ট হবে।”
সুলতান অবিলম্বে রওনা হলেন,
এবং প্রকৃতপক্ষে সময় নষ্ট করার মতো ছিল না; কারণ রাতটি ছিল রেবেগ মাসের বারো তারিখ, আর
পরদিন অর্থাৎ তেরো তারিখে সিনেটের রায় ঘোষণা করার কথা ছিল। ফাতেমে সবেমাত্র
বিছানায় শুয়েছিল, জানালার পর্দা পুরোপুরি টানা ছিল না।
একটি রাতের মোমবাতি তার মুখের ওপর এক ম্লান আলো ফেলছিল। প্রবল আবেগের ঝড়ে মুখটা
বিকৃত দেখালেও সুলতানের কাছে তাকে সুন্দরীই মনে হলো। সহানুভূতি ও ঘৃণা, দুঃখ ও প্রতিশোধ, দুঃসাহস ও লজ্জা—সবকিছু
তার চোখে পালাক্রমে ফুটে উঠছিল, যেমনটা
তার হৃদয়ে একের পর এক আছড়ে পড়ছিল। সে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল, অঝোরে কাঁদল, চোখের জল মুছল, আবার কাঁদল; কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইল,
তারপর হঠাৎ মুখ তুলে আকাশের দিকে এক হিংস্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
মাঙ্গোগুল এতক্ষণ কী করছিলেন?
তিনি মনে মনে নিজেকেই বলছিলেন: “এগুলো হতাশার লক্ষণ।
কেরফায়েলের প্রতি তার পুরোনো কোমল ভালোবাসা হয়তো আবার ফিরে এসেছে। সে হয়তো
নিজের করা অপরাধ ভুলে গেছে এবং তার প্রেমিকের আসন্ন শাস্তির কথা ভেবে শিউরে উঠছে।”
এই কথাগুলো শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই
তিনি ফাতেমের ওপর সেই মারাত্মক আংটি ঘোরালেন, এবং তার রত্নটি বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল:
“আর
মাত্র বারো ঘণ্টা, তারপরই আমরা
প্রতিশোধ নেব। সেই বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ লোকটা ধ্বংস হবে,
এবং তার রক্ত ঝরবে।”
ফাতেমে নিজের শরীরের ভেতরে এই
অস্বাভাবিক নড়াচড়ায় আতঙ্কিত হয়ে এবং রত্নটির গুঞ্জন শুনে হতবাক হয়ে গেল। সে
দুহাতে চেপে ধরে তার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু শক্তিশালী আংটি তার কাজ
চালিয়ে গেল, এবং অদম্য রত্নটি
সমস্ত বাধা ভেঙে বলতে লাগল:
“হ্যাঁ,
আমরা প্রতিশোধ নেব। ওহ! হতভাগা কেরফায়েল, তুই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিস, এবার
মর! আর তুই, যাকে সে আমার চেয়ে বেশি পছন্দ করেছে—ওহ
বিমব্রেলোকা, তুই এবার হতাশায়
ডুববি!—আরও বারো ঘণ্টা! হায়! এই সময়টা আমার কাছে কত দীর্ঘ মনে হচ্ছে!
জলদি আয়, সেই মিষ্টি
মুহূর্ত, যখন আমি ওই বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞ কেরফায়েলকে জল্লাদের ছুরির নিচে দেখব, তার রক্ত ঝরছে—আহ! হতভাগী আমি, একি বললাম? আমি কি আমার ভালোবাসার সবচেয়ে
প্রিয় মানুষটিকে ধ্বংস হতে দেখতে পারব? আমি কি সেই
মারাত্মক অস্ত্রটি তার দিকে উঠতে দেখতে পারব?—আহ! এই
নিষ্ঠুর চিন্তা আমার থেকে দূর হোক। সে আমাকে ঘৃণা করে,
এটা সত্যি; সে আমাকে বিমব্রেলোকার জন্য
ছেড়ে দিয়েছে; কিন্তু হয়তো কোনো না কোনো সময়—আমি
কেন বলছি ‘হয়তো’?
ভালোবাসা অবশ্যই তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে। সেই ছোট
বিমব্রেলোকা একটা ক্ষণস্থায়ী মোহ মাত্র, যা উড়ে যাবে;
আজ হোক বা কাল, সে তার পছন্দের ভুল এবং
তার নতুন ভালোবাসার হাস্যকর দিকটা বুঝতে পারবেই। নিজেকে সান্ত্বনা দে ফাতেমে,
তুই তোর কেরফায়েলকে আবার পাবি। হ্যাঁ, তুই
তাকে আবার পাবি। জলদি ওঠ, দৌড়া, উড়ে যা—তার মাথার ওপর ঝুলে থাকা এই ভয়াবহ বিপদ দূর কর। তুই কি খুব দেরি
হয়ে যাওয়ার ভয়ে কাঁপছিস না?”
“কিন্তু
আমি কোথায় দৌড়াব, আমি যে দুর্বল
হতভাগী! কেরফায়েলের অবজ্ঞা কি আমাকে বলে দেয় না যে, সে
আমাকে চিরতরে পরিত্যাগ করেছে? বিমব্রেলোকা তাকে ভোগ করছে,
আর আমি কিনা তাকে বাঁচাতে যাচ্ছিলাম! আহ! বরং সে হাজার বার মরুক!
যদি সে আমার জন্য আর বেঁচে না থাকে, তবে তার মৃত্যুতে
আমার কী আসে যায়?—হ্যাঁ, আমি
এখন নিশ্চিত যে আমার ক্রোধ ন্যায্য। অকৃতজ্ঞ কেরফায়েল আমার সমস্ত ঘৃণা পাওয়ার
যোগ্য। আমার আর কোনো অনুশোচনা নেই। আমি তাকে ধরে রাখার জন্য সব করেছিলাম, এখন তাকে ধ্বংস করার জন্য সব করব। আর একটা দিন পরে হলে আমার প্রতিশোধ
ব্যর্থ হতো। কিন্তু তার পোড়া কপাল তাকে আমার হাতে তুলে দিল, ঠিক সেই মুহূর্তে যখন সে আমাকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। সে আমার পাতা
ফাঁদে পা দিয়েছে। আমি তাকে শক্ত করে ধরেছি।”
“যে
নির্জন সাক্ষাতের ব্যবস্থা আমি করেছিলাম, তা ছিল তোমার জন্য আমার শেষ সুযোগ; কিন্তু
তুমি তা এত তাড়াতাড়ি ভুলবে না।—তুমি তাকে তোমার
হাতের মুঠোয় আনতে কী চাতুরীই না করেছিলে! ফাতেমে,
তোমার ওই বিশৃঙ্খলা কত নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল! তোমার চিৎকার,
তোমার দুঃখের ভান, তোমার চোখের জল,
তোমার বিভ্রান্তি, সবকিছু—এমনকি
তোমার নীরবতাও—কেরফায়েলকে ধ্বংস করেছে। কিছুই তাকে তার আসন্ন ভাগ্য থেকে বাঁচাতে
পারবে না। কেরফায়েল মৃত—তুই কাঁদছিস, হতভাগী নারী? সে অন্য কাউকে ভালোবাসত, তার জীবন বা মৃত্যুতে তোর কী এসে যায়!”
মাঙ্গোগুল এই ভয়ঙ্কর স্বীকারোক্তি
শুনে ভয়ে শিউরে উঠলেন। তিনি আংটি ঘুরিয়ে নিলেন; এবং ফাতেমে যখন তার শক্তি ফিরে পাচ্ছিল, সুলতান
দ্রুত সুলতানার (মির্জোজা) কাছে উড়ে গেলেন।
“কী
খবর, রাজকুমার,” মির্জোজা জানতে
চাইলেন, “আপনি
কী শুনলেন? কেরফায়েল কি এখনো
দোষী, আর সেই পবিত্র ফাতেমে...”
“দয়া
করে আমাকে ক্ষমা করো,”
সুলতান উত্তর দিলেন, “আমি যেসব জঘন্য কথা শুনেছি তা পুনরাবৃত্তি করতে পারব না। একজন
ক্রুদ্ধ নারীকে কতটা ভয় পেতে হয়! কে বিশ্বাস করতে পারত যে,
এমন লাবণ্যময় শরীরের ভেতরে এমন হিংস্র এক হৃদয় লুকিয়ে আছে?
কিন্তু আগামীকাল সূর্য ডোবার আগেই আমার রাজ্যকে এমন এক দানব থেকে
পবিত্র করা হবে, যা আমার মরুভূমিতে জন্মানো যেকোনো বন্য
পশুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।”
সুলতান অবিলম্বে সেনেচালকে (পুলিশ
প্রধান বা বিচারক) ডেকে পাঠালেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন ফাতেমেকে গ্রেপ্তার করতে,
কেরফায়েলকে কারাগার থেকে সেরাগ্লিওর (রাজপ্রাসাদের) একটি নিরাপদ
কক্ষে সরিয়ে নিতে এবং সিনেটকে জানাতে যে—তিনি এই মামলার বিচার নিজের
হাতে তুলে নিয়েছেন। তাঁর আদেশ সেই রাতেই কার্যকর করা হলো।
পরের দিন ভোরে,
সুলতান সেনেচাল এবং একজন এফেন্দির (সচিব) সঙ্গে মির্জোজার কক্ষে
গেলেন এবং ফাতেমেকে সেখানে হাজির করা হলো। এই হতভাগ্য নারী মাঙ্গোগুলের পায়ে
লুটিয়ে পড়ল, তার অপরাধের সমস্ত বিবরণসহ সব স্বীকার করল
এবং মির্জোজার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইল।
ইতোমধ্যে কেরফায়েলকে ভেতরে আনা হলো।
সে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই আশা করছিল না: তবে সে সেই শান্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে
উপস্থিত হলো, যা কেবল নির্দোষ
মানুষেরই থাকে। (কিছু দুষ্টু রসিক অবশ্য বলেছিল যে, যদি
সে তার সেই বিশেষ অঙ্গটি হারানোর উপক্রম হতো—যা হারানোর হুমকি তাকে দেওয়া
হয়েছিল—তবে
সে আরও বেশি ঘাবড়ে যেত।) মহিলারা ফলাফলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
কেরফায়েল সুলতানের সামনে শ্রদ্ধার
সঙ্গে মাথা নত করল। মাঙ্গোগুল তাকে ওঠার ইঙ্গিত দিলেন এবং তার হাত ধরে বললেন: “তুমি নির্দোষ। তুমি
মুক্ত। তোমার সুরক্ষার জন্য ব্রহ্মার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাও। তুমি বিনা দোষে যে কষ্ট
ভোগ করেছ তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে, আমি
তোমাকে আমার রাজকোষ থেকে দুই হাজার সিকুইনের পেনশন এবং ‘কুমির
বাহিনী’র
(Order of the Crocodile) প্রথম কমান্ডারি
(সেনাপদ) মঞ্জুর করলাম।”
কেরফায়েলের ওপর যত বেশি অনুগ্রহ
বর্ষিত হচ্ছিল, ফাতেমে তত বেশি
শাস্তির ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। মহান সেনেচাল আইনের দোহাই দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে
মত দিলেন (Si foemina ff. de vi C. calumniatrix)। সুলতান
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পক্ষে ছিলেন।
কিন্তু মির্জোজা এই দুই বিচারের
একটিতে খুব বেশি কঠোরতা এবং অন্যটিতে খুব বেশি উদারতা দেখে নিজেই একটি শাস্তির
বিধান দিলেন। তিনি ফাতেমের ‘গোপন রত্ন’কে তালাবদ্ধ করার নির্দেশ দিলেন।
ফাতেমেকে জনসমক্ষে সেই একই মঞ্চে তোলা
হলো, যা কেরফায়েলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য
তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে তাকে ‘ফ্লোরেনটাইন যন্ত্র’ (এক ধরনের লোহার
তৈরি সতীত্ব-বন্ধনী বা Chastity Belt) পরানো হলো। এরপর
তাকে একটি সংশোধনাগারে (House of Correction) পাঠিয়ে
দেওয়া হলো—সেই সব ধাত্রীদের সঙ্গে, যারা তাদের ‘অগাধ জ্ঞান’ দিয়ে কেরফায়েলের বিরুদ্ধে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছিল।
ছাব্বিশতম
অধ্যায়: মির্জোজার অধিবিদ্যা — আত্মাতত্ত্ব
মাঙ্গোগুল যখন হারিয়া, পেনশন-লোভী বিধবা এবং
ফাতেমের ‘গোপন রত্ন’গুলোকে জেরা করতে ব্যস্ত ছিলেন, তখন মির্জোজা তাঁর দার্শনিক
বক্তৃতা প্রস্তুত করার জন্য বেশ খানিকটা সময় পেয়ে গিয়েছিলেন।
এক সন্ধ্যায়, যখন মহান মানিমনবান্দা তাঁর
পূজার্চনায় ব্যস্ত ছিলেন এবং রাজদরবারে কোনো জুয়ার আসর বা সান্ধ্যকালীন আড্ডা
ছিল না—অর্থাৎ সুলতানের সঙ্গে একান্তে দেখা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল—তখন মির্জোজা
এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন। তিনি দুটি কালো পেটিকোট নিলেন; একটি স্বাভাবিকভাবে পরলেন
এবং অন্যটি তাঁর কাঁধের ওপর দিয়ে এমনভাবে ঝোলালেন, যার
দুটি ফাটলের মধ্য দিয়ে হাত বের করা যায়। মাথায় চাপালেন মাঙ্গোগুলের সেনেশালের
এক বিশাল পরচুলা এবং তাঁর চ্যাপলিনের (পুরোহিতের) চারকোনা টুপি। আয়নায় নিজেকে
দেখে তিনি ভাবলেন তাঁকে বেশ ভারিক্কি দার্শনিক মনে হচ্ছে, যদিও বাস্তবে তাঁকে দেখাচ্ছিল ঠিক একটি বিশাল বাদুড়ের মতো।
এই বিদঘুটে ছদ্মবেশে তিনি
তাঁর কামরায় পায়চারি করতে লাগলেন,
ঠিক যেন রাজকীয় কলেজের কোনো গম্ভীর অধ্যাপক তাঁর ছাত্রদের জন্য
অপেক্ষা করছেন। তিনি এমনকি একজন ধ্যানমগ্ন পণ্ডিতের মতো বিষণ্ণ ও চিন্তাশীল
মুখভঙ্গিও ফুটিয়ে তুললেন। অবশ্য মির্জোজা এই জোর করে আনা গাম্ভীর্য বেশিক্ষণ ধরে
রাখতে পারলেন না। সুলতান তাঁর কিছু সভাসদ নিয়ে প্রবেশ করলেন এবং এই ‘নতুন দার্শনিক’কে দেখে নিচু
হয়ে কৌতুকপূর্ণ প্রণাম জানালেন। সুলতানের এই কাণ্ডে মির্জোজার গাম্ভীর্য উবে গেল, তিনি নিজেই হেসে ফেললেন,
আর সেই হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল বাকি সবার মধ্যেও।
“ম্যাডাম,”
মাঙ্গোগুল হাসতে হাসতে বললেন, “আপনার যা রূপ আর বুদ্ধি, তা-ই কি আপনার কথার ওজন
বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না? এর জন্য আবার এই সং
(পোশাক)-এর সাহায্য নেওয়ার কী দরকার ছিল?”
“আমার মনে হয়, স্যার,” মির্জোজা উত্তর দিলেন,
“আপনি এই পোশাককে
যথেষ্ট সম্মান দিচ্ছেন না। একজন শিষ্যের উচিত তাঁর শিক্ষকের যোগ্যতার অন্তত অর্ধেক
মনোযোগ তাঁর পোশাকের প্রতিও দেওয়া।”
“আমি বুঝতে পারছি,”
সুলতান উত্তর দিলেন, “আপনি ইতিমধ্যেই আপনার নতুন চরিত্রের আত্মা এবং
ভাবভঙ্গি পুরোপুরি আয়ত্ত করে ফেলেছেন। এখন আমার আর কোনো সন্দেহ নেই যে আপনার
ক্ষমতা আপনার পোশাকের মর্যাদার সঙ্গেই পাল্লা দেবে; এবং আমি অধীর আগ্রহে এর প্রমাণ দেখার অপেক্ষা
করছি।”
“আপনি এই মুহূর্তেই
সন্তুষ্ট হবেন,” মির্জোজা মেঝের ওপর পাতা একটি
বড় কার্পেটের মাঝখানে জাঁকিয়ে বসতে বসতে বললেন। সুলতান এবং সভাসদরা তাঁকে ঘিরে
বসলেন, এবং তিনি শুরু করলেন।
“মহামান্য সুলতান, আপনার শিক্ষার দায়িত্বে
থাকা দার্শনিকরা কি কখনো আপনার সঙ্গে ‘আত্মার প্রকৃতি’ (Nature of the Soul) নিয়ে
আলোচনা করেছেন?”
“ওহ! বহুবার,”
মাঙ্গোগুল বললেন; “কিন্তু তাঁদের সমস্ত থিওরি বা সিস্টেমের
উদ্দেশ্য আমাকে জ্ঞান দেওয়া ছিল না,
বরং আমার মনে এ বিষয়ে একরাশ অনিশ্চিত ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া ছিল।
সত্যি বলতে, যদি আমার নিজের ভেতর থেকে একটা অনুভূতি বা ‘ইনার ফিলিংস’ না আসত—যে আত্মা শরীর
বা পদার্থ থেকে আলাদা কিছু—তবে আমি হয় এর অস্তিত্বই অস্বীকার করতাম, অথবা এটাকে শরীরের সঙ্গেই
গুলিয়ে ফেলতাম। আপনি কি এই জগাখিচুড়ি পরিষ্কার করার দায়িত্ব নেবেন?”
“বিষয়টা এমন নয়,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, “যে আমি ওই বিষয়ে আপনার শিক্ষকদের চেয়ে খুব
বেশি এগিয়ে আছি। তাঁদের এবং আমার মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হলো—আমি অনুমান
করি যে পদার্থ থেকে ভিন্ন একটি ‘পদার্থ’ বা সত্তার অস্তিত্ব আছে, আর তাঁরা মনে করেন এটা
প্রমাণিত সত্য। কিন্তু এই সত্তা, যদি এর অস্তিত্ব থাকেই,
তবে শরীরের কোথাও না কোথাও তো একে থাকতে হবে। তাঁরা কি আপনাকে এ
বিষয়ে অনেক আজগুবি কথা শোনাননি?”
“না,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “তাঁরা সবাই মোটামুটি একমত ছিলেন যে আত্মা থাকে ‘মাথায়’; এবং
এই মতটি আমার কাছে বেশ যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হয়েছিল। কারণ এই মাথাটাই তো চিন্তা
করে, কল্পনা করে, বিচার করে,
সিদ্ধান্ত নেয় এবং আদেশ দেয়। আমরা তো কথায় কথায় বলি—লোকটার ‘মাথা’ নেই, বা সে ‘চিন্তা’ করে না।”
“তাহলে,”
সুলতানা উত্তর দিলেন, “আপনার দীর্ঘ পড়াশোনা এবং আপনার সমস্ত দর্শনের
দৌড় হলো—একটি বিষয়কে অনুমান করা এবং সেটাকে কিছু সস্তা জনপ্রিয় বুলির ওপর
দাঁড় করানো! রাজকুমার, আপনি আপনার প্রধান ভূগোলবিদ সম্পর্কে কী বলতেন, যদি তিনি আপনার সামনে আপনার রাজ্যের এমন একটি মানচিত্র পেশ করতেন,
যেখানে তিনি পূর্বকে পশ্চিমে এবং উত্তরকে দক্ষিণে বসিয়ে রেখেছেন?”
“এটা এত বড় ভুল,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “যে কোনো ভূগোলবিদ, সে যত আনাড়িই হোক, এমনটা
করবে না।”
“তা হতে পারে,”
প্রিয়তমা চালিয়ে গেলেন, “কিন্তু আমাদের সামনে থাকা এই ক্ষেত্রে, আপনার দার্শনিকরা সবচেয়ে
আনাড়ি ভূগোলবিদের চেয়েও বড় গাধা। তাঁদের কোনো বিশাল সাম্রাজ্য জরিপ করতে হয়নি,
বা বিশ্বের চারদিকের সীমানা মাপতে হয়নি; তাঁদের যা করার ছিল, তা হলো—নিজেদের ভেতরে
প্রবেশ করা এবং সেখানে তাঁদের আত্মার আসল আসন বা ঠিকানাটি চিহ্নিত করা। অথচ তাঁরা পূর্বকে
পশ্চিমে এবং দক্ষিণকে উত্তরে স্থাপন করেছেন। তাঁরা ঘোষণা করেছেন যে আত্মা মাথায় থাকে—অথচ অধিকাংশ
মানুষ এই ‘অ্যাপার্টমেন্টে’ (মাথায়) আত্মাকে এক মুহূর্তের জন্য স্থান না দিয়েই
মারা যায়! আত্মার আসল এবং প্রথম বাসস্থান হলো—পায়ে।”
“পায়ে!” সুলতান বাধা
দিয়ে বললেন। “এ তো আমার শোনা এযাবৎকালের সবচেয়ে আজব ও ফালতু ধারণা!”
“হ্যাঁ, পায়েই,” মির্জোজা অবিচল কণ্ঠে উত্তর
দিলেন, “এবং এই
মতবাদ, যা আপনার
কাছে এখন বোকামি মনে হচ্ছে, একটু তলিয়ে দেখলেই তা
যুক্তিসঙ্গত হয়ে উঠবে। মহামান্য সুলতান, আপনি এইমাত্র
আমার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন যে, আমাদের আত্মার অস্তিত্ব
কেবল সেই অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে, যা
আমরা অনুভব করি। এখন আমি প্রমাণ করব যে, সমস্ত সম্ভাব্য
সংবেদনশীল প্রমাণ আত্মাকে ঠিক সেখানেই স্থাপন করতে চায়, যেখানে
আমি তাকে বসিয়েছি।”
“আমরা সেই প্রমাণের
অপেক্ষায় আছি,” মাঙ্গোগুল বললেন।
“আমি কোনো বাড়তি সুবিধা
চাই না,” তিনি চালিয়ে গেলেন, “এবং আমি আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ
জানাচ্ছি আমার যুক্তিতে ভুল ধরার জন্য। তাহলে শুনুন, আমি বলছিলাম যে আত্মা তার প্রথম বাসস্থান হিসেবে
পা-কেই বেছে নেয়; সেখানে সে অস্তিত্ব লাভ করে, এবং পা থেকেই সে ধীরে ধীরে শরীরে প্রবেশ করে। এই তথ্যের সত্যতা
প্রমাণের জন্য আমি ‘অভিজ্ঞতা’র আশ্রয় নিচ্ছি; এবং হয়তো আমি আজ ‘পরীক্ষামূলক
অধিবিদ্যা’র (Experimental
Metaphysics) প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে যাচ্ছি।”
“আমরা সবাই আমাদের শৈশবে
অনুভব করেছি যে, মাতৃগর্ভে
অসাড় আত্মা পুরো নয় মাস ধরে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। সেই সময় চোখ থাকলেও তা দেখে
না, মুখ থাকলেও কথা বলে না, এবং
কান থাকলেও শোনে না। তখন আত্মা অন্য কোথাও নিজেকে প্রসারিত করতে এবং জাগ্রত হতে
চেষ্টা করে; এটি শরীরের অন্য অঙ্গগুলোতে তার প্রথম
কাজগুলো অনুশীলন করে। একটি শিশু তার অস্তিত্বের জানান দেয়—পায়ের মাধ্যমে।
মায়ের গর্ভে তার শরীর, মাথা এবং হাত স্থির থাকে; কিন্তু তার পাগুলো
উন্মুক্ত হয়, প্রসারিত হয় এবং লাথি মেরে তার অস্তিত্বের—এবং হয়তো তার
চাহিদার—প্রমাণ দেয়। যখন সে জন্মের দ্বারপ্রান্তে থাকে, তখন তার মাথা, শরীর এবং হাতের কী ভূমিকা থাকে? পায়ের
সাহায্য না পেলে তারা কখনো তাদের সেই অন্ধকার কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে পারত না:
এখানে পাগুলোই প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং শরীরের বাকি অংশকে সামনের দিকে ঠেলে
দেয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম; এবং যখনই অন্য কোনো অঙ্গ
(যেমন মাথা) নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে; যখন মাথা,
উদাহরণস্বরূপ, পায়ের জায়গা নিতে চায়—তখনই সবকিছু
ভুল হয়ে যায়, এবং
ঈশ্বর জানেন কখনো কখনো মা এবং শিশু উভয়েরই কী করুণ পরিণতি হয় (অর্থাৎ জন্মের
সময় জটিলতা দেখা দেয়)।”
একদম ঠিক বলেছেন! উপন্যাসের প্রবাহে
ওভাবে ব্র্যাকেটে ইংরেজি শব্দ থাকলে পড়ার মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়। ওটা আমারই ভুল ছিল,
আমি ব্যাখ্যার জন্য ওগুলো রেখেছিলাম।
আপনার নির্দেশমতো ছাব্বিশতম
অধ্যায়ের শেষ অংশটি ইংরেজি শব্দ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই একদম ঝরঝরে ও সাবলীল
বাংলায় সাজিয়ে দিচ্ছি।
ছাব্বিশতম
অধ্যায়ের শেষাংশ: মির্জোজার দর্শনের উপসংহার ও প্রেম
“শিশু
কি জন্ম নিয়েছে? তখনও তার পায়ের
মধ্যেই প্রধান গতিবিধিগুলো সম্পন্ন হয়। তাকে হাঁটাচলা থেকে বিরত রাখতে আমাদের
বাধ্য হয়ে তার পাগুলো বেঁধে রাখতে হয়; এবং এটা করতে
গেলে শিশু প্রবল অনিচ্ছা ও বিরক্তি দেখায়। মাথা হলো একটা জড়পিণ্ড বা ব্লকের মতো,
যাকে আমরা যেভাবে খুশি সেভাবেই নাড়াই; কিন্তু
পাগুলো সংবেদনশীল, এরা পরাধীনতার জোয়াল ঝেড়ে ফেলতে চায়
এবং হারানো স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহ করে।”
“শিশু
কি একা দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে? তখন
তার পাগুলো নড়াচড়া করার জন্য হাজারো চেষ্টা করে; তারা
সবকিছুকে কাজে লাগায়: তারা শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলোকে আদেশ দেয়, এবং বাধ্য হাতগুলো দেয়ালের গায়ে ঠেস দেয়, যাতে
পড়ে যাওয়া আটকানো যায় বা পায়ের কাজটা সহজ হয়।”
“একটি
শিশুর সমস্ত চিন্তা কোথায় থাকে, তার
আনন্দ কীসে, যখন সে তার পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে শেখে?
তখন তার একমাত্র কাজ হলো পাগুলো অনুশীলন করা, এদিক-ওদিক যাওয়া, দৌড়ানো, লাফানো এবং ধুপধাপ করা। এই অস্থিরতা আমাদের আনন্দ দেয়, আমরা এটাকে বুদ্ধির লক্ষণ বলে মনে করি; এবং
যখন আমরা কোনো শিশুকে অলস এবং বিষণ্ণ দেখি, তখন আমরা সেই
শিশুর ভবিষ্যতের বোকামির ভবিষ্যদ্বাণী করি। আপনি কি চার বছর বয়সী একটি শিশুকে
বিরক্ত করতে চান? তাকে পনেরো মিনিটের জন্য বসিয়ে রাখুন,
অথবা চারটি চেয়ারের মধ্যে তাকে বন্দী করুন: সে বিরক্ত এবং
বদমেজাজি হয়ে উঠবে: কারণ আপনি কেবল তার পাগুলোকে ব্যায়াম থেকে বঞ্চিত করছেন না,
আপনি তার আত্মাকেও বন্দিদশায় রাখছেন।”
“আত্মা
দুই বা তিন বছর বয়স পর্যন্ত পায়েই থাকে; চার বছর বয়সে এটি পায়ের পাতায় বাস করে; পনেরো
বছর বয়সে এটি হাঁটু এবং উরুতে উঠে আসে। তখন আমরা নাচ, ফেন্সিং,
ঘোড়দৌড় এবং অন্যান্য কঠোর শারীরিক ব্যায়াম পছন্দ করি। এটাই
সমস্ত যুবকদের প্রধান নেশা এবং কারও কারও পাগলামি। কী! আত্মা কি সেই জায়গাগুলোতেই
বাস করে না, যেখানে এটি নিজেকে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ করে
এবং যেখানে এটি সবচেয়ে আনন্দদায়ক অনুভূতি পায়? কিন্তু
যদি শৈশবে এবং যৌবনে এর বাসস্থান পরিবর্তিত হয়, তবে
জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে কেন এটি পরিবর্তিত হবে না?”
মির্জোজা এই বক্তৃতা এত দ্রুততার
সঙ্গে দিলেন যে তিনি হাঁপাচ্ছিলেন। সেলিম, সুলতানের একজন প্রিয়পাত্র, তিনি যখন শ্বাস
নিচ্ছিলেন সেই মুহূর্তটি কাজে লাগিয়ে তাঁকে বললেন: “ম্যাডাম,
আপনি আমাদের যে স্বাধীনতা দিয়েছেন, আপনার
বক্তব্যের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার জন্য আমি তা ব্যবহার করব। আপনার সিস্টেমটি সত্যিই
উদ্ভাবনী, এবং আপনি এটি অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও মাধুর্যের
সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন: কিন্তু আমি এতে এতটাই মুগ্ধ নই যে এটাকে প্রমাণিত সত্য বলে
মেনে নেব। আমার মনে হয় কেউ বলতেই পারেন যে, এমনকি শৈশবেও
মাথা পাগুলোকে আদেশ করে; এবং সেখান থেকেই আত্মা প্রবাহিত
হয়, যা স্নায়ুর মাধ্যমে সমস্ত অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং
পিনিয়াল গ্রন্থিতে বসে থাকা আত্মার ইচ্ছায় সেগুলোকে থামায় বা নড়াচড়া করায়:
ঠিক যেমন আমরা দেখি মহামান্য সুলতানের আদেশ রাজদরবার থেকে বের হয় এবং তাঁর সমস্ত
প্রজাকে কাজে লাগায়।”
“নিঃসন্দেহে,” মির্জোজা উত্তর
দিলেন, “কিন্তু
কেউ যদি আমাকে এমন একটি অস্পষ্ট যুক্তি দেখায়, তবে আমি কেবল একটি অভিজ্ঞতালব্ধ ঘটনা দিয়েই তার জবাব দেব। শৈশবে
আমাদের কোনো নিশ্চয়তা নেই যে মাথা চিন্তা করে; এবং এমনকি
আপনিও, আমার প্রভু, যার এত ভালো
একটি মাথা আছে এবং যিনি ছোটবেলায় যুক্তির বিস্ময় হিসেবে পরিচিত ছিলেন—আপনার
কি মনে আছে যে আপনি সেই সময় ‘চিন্তা’ করেছিলেন? কিন্তু
আপনি হয়তো ভালোভাবেই দাবি করতে পারেন যে, যখন আপনি একটি
ছোট দানবের মতো লাফালাফি করতেন এবং আপনার গভর্নেসদের পাগল করে তুলতেন, তখন আপনার পা আপনার মাথাকে শাসন করত।”
“ওটা
কোনো প্রমাণ হলো না,”
সুলতান বললেন। “সেলিম চঞ্চল ছিল, এবং আরও হাজারো শিশুও তাই। তারা গভীর চিন্তা করে না, কিন্তু তারা ‘চিন্তা’ করে: সময় চলে যায়, স্মৃতি মুছে যায়, এবং তারা মনে রাখে না যে
তারা চিন্তা করেছিল।”
“কিন্তু
তারা কোন অংশ দিয়ে চিন্তা করেছিল,” মির্জোজা উত্তর
দিলেন, “কারণ
সেটাই তো আসল বিতর্কের বিষয়?”
“মাথা
দিয়ে,” সেলিম উত্তর দিলেন।
“কী!
সেই একই মাথা, যার ভেতরে কেউ
কখনো উঁকি দিতে পারে না!” সুলতানা উত্তর দিলেন। “দয়া করে আপনার ওই রহস্যময়
লণ্ঠন ফেলে দিন, যেখানে আপনি কেবল
একটি আলো আছে বলে অনুমান করছেন—যা বাহক ছাড়া আর কেউ দেখে না। আমার পরীক্ষা শুনুন,
এবং আমার হাইপোথিসিসের সত্যতা স্বীকার করুন। এটা এতটাই ধ্রুব
সত্য যে, আত্মা শরীর বেয়ে তার যাত্রা শুরু করে পা থেকে;
এবং এমন কিছু পুরুষ ও মহিলা আছে, যাদের
মধ্যে আত্মা কখনো এর ওপরে উঠেইনি।”
“আমার
প্রভু, আপনি নিনির ক্ষিপ্রতা এবং সালিগোর
কর্মতৎপরতার প্রশংসা হাজার বার করেছেন: তাহলে আমাকে বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনি কি মনে করেন যে এই প্রাণীগুলোর আত্মা তাদের পা ছাড়া অন্য কোথাও
আছে? এবং আপনি কি লক্ষ্য করেননি যে ভলুসার এবং
জেলিন্দোরের মাথা পায়ের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে? একজন
নর্তকীর চিরন্তন প্রলোভন হলো তার নিজের পাগুলো পর্যবেক্ষণ করা। প্রতিটি পদক্ষেপে
তার মনোযোগী চোখ তার পায়ের গতিবিধি অনুসরণ করে, এবং তার
মাথা শ্রদ্ধার সঙ্গে তার পায়ের সামনে নত হয়—ঠিক যেমন মহামান্যের অদম্য
পাশারা তাঁর সামনে নত হয়।”
“আমি
আপনার পর্যবেক্ষণটি স্বীকার করছি,” সেলিম বললেন,
“কিন্তু
আমি এটা মানতে রাজি নই যে এটি সবার ক্ষেত্রেই খাটে।”
“আমিও
দাবি করি না,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, “যে আত্মা সব সময় পায়েই স্থির থাকে: সে এগিয়ে যায়,
সে ভ্রমণ করে, সে একটি অংশ ছেড়ে দেয়,
সেখানে আবার ফিরে আসে এবং আবার ছেড়ে যায়; কিন্তু আমি দাবি করি যে অন্যান্য অঙ্গগুলো সেই অঙ্গের অধীনস্থ থাকে
যেখানে আত্মা বর্তমানে বাস করছে। এই সবকিছু বয়স, মেজাজ
এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়; এবং সেখান থেকেই
মানুষের রুচির পার্থক্য, প্রবণতা এবং চরিত্রের বৈচিত্র্য
দেখা দেয়। আপনি কি আমার এই তত্ত্বের বিশালতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন না? এবং এটি যে বিপুল সংখ্যক ঘটনার ওপর আলোকপাত করে, তা কি এর সত্যতা প্রমাণ করে না?”
“ম্যাডাম,” সেলিম উত্তর দিলেন,
“যদি
আপনি এটিকে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখাতেন,
তবে হয়তো এটি আমাদের এমন একটি বিশ্বাস দিত, যা আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি।”
“খুব
আনন্দের সঙ্গে,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, যিনি বুঝতে
পারছিলেন যে তিনি তর্কে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন: “আপনি সন্তুষ্ট হবেন,
শুধু আমার চিন্তার ধারাটি অনুসরণ করুন। আমি কোনো আনুষ্ঠানিক বা
কাঠখোট্টা যুক্তি দাঁড় করাচ্ছি না। আমি আমার হৃদয় থেকে কথা বলি; এটি আমাদের নারীজাতির দর্শন, এবং আপনি এটি
আমাদের মতোই ভালো বোঝেন।”
“এটি
খুবই স্বাভাবিক,”
তিনি যোগ করলেন, “যে আত্মা আট বা দশ বছর বয়স পর্যন্ত পায়ের পাতা এবং পায়েই
থাকে: কিন্তু সেই সময়ের পর, সে
সেই বাসস্থান ছেড়ে দেয়—হয় নিজের ইচ্ছায়, অথবা জোরপূর্বক। জোরপূর্বক, যখন একজন শিক্ষক
তাকে তার জন্মস্থান থেকে বের করে মস্তিষ্কে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ কসরত করেন;
যেখানে সে সাধারণত স্মৃতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, এবং কদাচিৎ বা কখনোই বিচারবুদ্ধিতে রূপান্তরিত হয় না। এটাই
স্কুলছাত্রদের ভাগ্য।”
“একইভাবে,
যদি একজন নির্বোধ গভর্নেস একটি অল্প বয়সী মেয়েকে তৈরি করার
জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, তার মনকে কেবল কেতাবি জ্ঞান দিয়ে
পূর্ণ করে এবং তার হৃদয় ও নৈতিকতাকে অবহেলা করে; তবে
আত্মা দ্রুত মাথার দিকে উড়ে যায়, জিভে গিয়ে থামে,
অথবা চোখে স্থির হয়; এবং তার ছাত্রীটি
হয় কেবল একজন বিরক্তিকর বকবককারী, অথবা একজন চপলা
ছলনাময়ী হয়ে ওঠে।”
“এভাবে:
- কামুক নারী: সে, যার আত্মা তার ‘গোপন রত্নে’ থাকে এবং কখনো সেখান থেকে নড়ে না।
- প্রণয়িনী:
সে, যার আত্মা
কখনো তার রত্নে, কখনো তার চোখে থাকে।
- স্নেহময়ী বা কোমল নারী: সে, যার আত্মা অভ্যাসগতভাবে হৃদয়ে থাকে, তবে
কখনো কখনো তার রত্নেও উঁকি দেয়।
- সতী নারী:
সে, যার আত্মা
কখনো তার মাথায়, কখনো তার হৃদয়ে থাকে—কিন্তু অন্য কোথাও কখনো যায় না।”
“যদি
আত্মা হৃদয়ে স্থির থাকে, তবে সে
সংবেদনশীলতা, সহানুভূতি, সত্যবাদিতা
এবং উদারতার চরিত্র গঠন করে। যদি সে হৃদয় ছেড়ে দিয়ে আর ফিরে না আসে এবং মাথায়
চলে যায়; তবে সে তাদের তৈরি করে যাদের আমরা কঠোরহৃদয়,
অকৃতজ্ঞ, প্রতারক এবং নিষ্ঠুর মানুষ
বলি।”
“যাদের
মধ্যে আত্মা মাথাকে কেবল একটি বাগানবাড়ি হিসেবে দেখে—যেখানে তার অবস্থান সংক্ষিপ্ত—তাদের
সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এই দলে আছে শৌখিন বাবুরা, চপলা নারীরা, নামমাত্র সঙ্গীতজ্ঞ, কবি, সস্তা রোমান্স লেখক, চাটুকার সভাসদ এবং সমস্ত তথাকথিত সুন্দরী মহিলারা। এদের কথাবার্তা
শুনলেই আপনি তাৎক্ষণিকভাবে এদের ‘ভবঘুরে আত্মা’কে চিনতে পারবেন—যারা তাদের ক্ষণস্থায়ী বাসস্থানের আবহাওয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়।”
“যদি
তাই হয়,”
সেলিম বললেন, “তবে প্রকৃতি অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করেছে। অথচ আমাদের
ঋষিরা বলেন যে প্রকৃতি কিছুই বৃথা তৈরি করে না।”
“আপনার
ঋষি এবং তাঁদের ভারী ভারী বুলি ছাড়ুন,” মির্জোজা উত্তর
দিলেন, “এবং
প্রকৃতির কথা বলতে গেলে, আসুন আমরা কেবল
অভিজ্ঞতার চোখ দিয়ে তাকে দেখি। আমরা তার কাছ থেকে শিখব যে, সে মানুষের শরীরে আত্মাকে একটি বিশাল প্রাসাদের মতো স্থাপন করেছে,
যার সবচেয়ে সুন্দর ঘরটি সে সব সময় দখল করে না। মাথা এবং হৃদয়
মূলত তার জন্য বরাদ্দ ছিল পুণ্যের কেন্দ্র এবং সত্যের বাসস্থান হিসেবে: কিন্তু
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সে মাঝপথে থেমে যায়, এবং একটি
চিলেকোঠা, একটি সন্দেহজনক জায়গা, বা একটি নোংরা সরাইখানাকে বেছে নেয়—যেখানে সে চিরকাল মাতাল হয়ে
পড়ে থাকে।”
“আহ!
যদি আমাকে কেবল চব্বিশ ঘণ্টার জন্য আমার পছন্দমতো পৃথিবীটাকে সাজানোর অনুমতি
দেওয়া হতো, তবে আমি আপনাদের
এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখাতাম: এক মুহূর্তে আমি প্রতিটি মানুষের আত্মার বাসস্থানটুকু
রেখে বাকি অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো কেড়ে নিতাম; এবং আপনারা
তখন প্রতিটি ব্যক্তিকে তার অবশিষ্ট অংশ দ্বারা চিনতে পারতেন।”
“এভাবে:
- নর্তকীরা দুটি পায়ে, অথবা বড়জোর দুটি পায়ের পাতায় পরিণত হতো;
- গায়করা কেবল একটি গলায়;
- বেশির ভাগ নারী কেবল একটি ‘গোপন রত্নে’;
- বীর এবং পুরস্কার-যোদ্ধারা একটি সশস্ত্র হাতে;
- কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি মগজহীন একটি খুলিতে;
- একজন জুয়াড়ি নারী কেবল দুটি হাতে—যা অবিরাম তাস ভাঁজছে;
- একজন পেটুক কেবল দুটি চোয়ালে—যা সব সময়
নড়ছে;
- একজন চপলা নারী কেবল দুটি চোখে;
- একজন লম্পট তার কামনার একমাত্র যন্ত্রে;
- আর অজ্ঞ এবং অলসরা কিছুই পেত না—তারা হাওায়
মিলিয়ে যেত।”
“যদি
আপনি নারীদের কোনো হাতই না দেন,” সুলতান বাধা দিয়ে
বললেন, “তবে
সেই পুরুষদের—যাদের
আপনি তাদের কামনার একমাত্র যন্ত্রে সীমাবদ্ধ করবেন—তাদের তো তাড়া করা হবে।
এই শিকার বেশ মজার একটা দৃশ্য হবে: এবং যদি নারীজাতি কঙ্গোর মতো সব জায়গায় এই খেলার
প্রতি এত লোভী হতো, তবে তো মানব
প্রজাতিই দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যেত।”
“কিন্তু,” সেলিম প্রিয়তমাকে
জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি
স্নেহময়ী, সংবেদনশীল নারী,
এবং স্থির ও বিশ্বস্ত প্রেমিকদের কী দিয়ে তৈরি করবেন?”
“একটি
হৃদয় দিয়ে,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন; “এবং আমি ভালো করেই জানি,” তিনি মাঙ্গোগুলের
দিকে একটি কোমল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যোগ করলেন, “আমার হৃদয় কার সঙ্গে
মিলিত হতে চায়।”
সুলতান এই প্রেমের ঘোষণার বিরুদ্ধে আর
নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি তাঁর আসন থেকে লাফিয়ে উঠে প্রিয়তমার দিকে ছুটে
গেলেন। সভাসদরা বুদ্ধিমানের মতো অদৃশ্য হয়ে গেল, এবং সেই নতুন দার্শনিকের চেয়ারটি তাঁদের প্রেমের মঞ্চ হয়ে উঠল। তিনি
তাঁকে বারবার প্রমাণ দিলেন যে—তিনি তাঁর কথার চেয়ে তাঁর অনুভূতিতে কম মুগ্ধ ছিলেন না;
এবং দার্শনিকের সাজপোঞ্জাম প্রেমের ঝড়ে অগোছালো হয়ে পড়ল।
মির্জোজা তাঁর সখীদের কাছে সেই কালো
পেটিকোট ফেরত দিলেন, সেনেশাল সাহেবকে
তাঁর বিশাল পরচুলা পাঠালেন, এবং চ্যাপলিন সাহেবকে তাঁর
চারকোনা টুপি ফেরত পাঠালেন—এই আশ্বাস দিয়ে যে পরবর্তী মনোনয়নে তিনি অবশ্যই তালিকায় থাকবেন।
যদি এই চ্যাপলিন একজন প্রতিভাবান হতেন,
তবে তিনি কী না অর্জন করতে পারতেন? একাডেমিতে
একটি আসন ছিল তাঁর সর্বনিম্ন প্রত্যাশিত পুরস্কার: কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি মাত্র
দুই বা তিনশ শব্দ জানতেন, এবং সেই পুঁজি দিয়ে তিনি কখনোই
দুটি ভালো ছত্রও লিখতে পারেননি।
সাতাশতম
অধ্যায়: পূর্ববর্তী কথোপকথনের জের
মাঙ্গোগুলই একমাত্র ব্যক্তি
যিনি মির্জোজার দার্শনিক বক্তৃতা কোনো বাধা না দিয়েই মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন।
যেহেতু তিনি সাধারণত বিরোধিতা করতে বা তর্কে জড়াতে পছন্দ করেন, তাই তাঁর এই নীরবতায়
মির্জোজা বেশ অবাক হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “সুলতান কি আমার পুরো থিওরিটা আগাগোড়া মেনে
নিলেন? না,
তা তো সম্ভব নয়। নাকি তিনি এটাকে তর্ক করার অযোগ্য বা বাজে বলে
মনে করছেন? তা-ও হতে পারে। স্বীকার করছি, আমার ধারণাগুলো হয়তো আজ পর্যন্ত প্রকাশিত সেরা দর্শন নয়; তবে সেগুলো সবচেয়ে ভুলও নয়; এবং আমি নিশ্চিত
যে এর চেয়েও অনেক বাজে থিওরি মানুষ আগে উদ্ভাবন করেছে।”
এই সন্দেহ দূর করার জন্য
প্রিয়তমা সুলতানকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। “আচ্ছা রাজকুমার,”
তিনি বললেন, “আমার পদ্ধতি সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?”
“অসাধারণ,”
সুলতান উত্তর দিলেন, “তবে এতে আমি কেবল একটিই খুঁত পেয়েছি।”
“সেটা কী?”
প্রিয়তমা জানতে চাইলেন।
“সেটা হলো,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “আপনার পুরো থিওরিটাই আগাগোড়া মিথ্যে। আপনার
ধারণা অনুসারে—আমাদের সবারই আত্মা আছে। কিন্তু দেখুন, আমার আত্মার আনন্দ, এই ধারণায় সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের অভাব আছে। আমার একটি আত্মা আছে,
এটা আমি অনুভব করি। কিন্তু এমন অনেক প্রাণী (মানুষ) আছে যারা
সারাজীবন এমনভাবে চলে যেন তাদের কোনো আত্মাই নেই; এবং
সম্ভবত বাস্তবে তাদের কোনো আত্মাও নেই, এমনকি যখন তারা
এমন ভান করে যেন তাদের আত্মা আছে। তাদের নাক-মুখ দেখতে আমার মতো বলেই যে তাদের
আত্মা থাকবে এবং তারাও আমার মতো চিন্তা করবে—এই যুক্তি হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে
ব্যবহার হয়ে আসছে বটে, কিন্তু হাজার বছর ধরেই এটা অচল।”
“আমি স্বীকার করছি,”
প্রিয়তমা বললেন, “অন্যরা যে চিন্তা করছে, তা সব সময় বাইরে থেকে বোঝা
যায় না।”
“তার সঙ্গে এটাও যোগ করো,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “যে শত শত ক্ষেত্রে এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার
যে তারা আদৌ চিন্তা করে না।”
“তবে আমার মতে,”
মির্জোজা বললেন, “এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে আসাটা ঠিক হবে না যে
তারা কখনোই চিন্তা করে না বা করবে না। একজন মানুষ সব সময়ই পশু নয়, যদিও সে মাঝেমধ্যে পশুর মতো
আচরণ করে; এবং মহামান্য আপনিও...” সুলতানকে চটিয়ে
দেওয়ার ভয়ে মির্জোজা মাঝপথে থেমে গেলেন।
“চালিয়ে যান, ম্যাডাম,” মাঙ্গোগুল বললেন, “আমি বুঝতে পারছি; আপনি কি বলতে চাইছেন যে আমি
কি কখনো পশুর মতো আচরণ করিনি? আমি উত্তর দিচ্ছি—হ্যাঁ, আমি মাঝেমধ্যে করেছি,
এবং অন্যরাও যে আমাকে তাই ভেবেছে, সে
জন্য আমি তাদের ক্ষমাও করেছি। কারণ আপনি সহজেই বুঝতে পারছেন যে তারা মুখে সাহস করে
না বললেও মনে মনে ঠিকই তা ভেবেছে।”
“আহ! রাজকুমার,”
প্রিয়তমা বললেন, “যদি মানুষ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজাকেই আত্মা
দিতে অস্বীকার করে, তবে তারা আর কাকে আত্মা দেবে?”
“দয়া করে তোষামোদ বন্ধ করো,”
মাঙ্গোগুল বললেন। “আমি এক মুহূর্তের জন্য মুকুট আর
রাজদণ্ড সরিয়ে রেখেছি। আমি এখন সুলতান নই,
দার্শনিক; তাই আমি সত্য শুনতে ও বলতে
পারি। আমি বিশ্বাস করি যে আমি আপনাকে এর প্রমাণ দিয়েছি। এখন আমাকে আমার নতুন
চরিত্রের দায়িত্বগুলো পালন করতে দিন।”
“আপনার সঙ্গে একমত হওয়া তো
দূরের কথা,” তিনি চালিয়ে গেলেন, “যে আমার মতো হাত-পা-চোখ-কান থাকলেই
প্রতিটি প্রাণীর আমার মতো আত্মা থাকবে—আমি আপনাকে সাফ জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত:
তিন-চতুর্থাংশ পুরুষ এবং সমস্ত নারীই হলো কেবল একেকটা যন্ত্র (Machine)।”
“আপনার কথায় সম্ভবত ততটাই
সত্যতা আছে,” প্রিয়তমা উত্তর দিলেন,
“যতটা ভদ্রতা আছে।”
“ওহ!” সুলতান বললেন, “ম্যাডাম মনে হয় চটে গেছেন। যদি কাউকে সত্য কথাই বলতে না দেন, তবে দর্শন নিয়ে মাথা ঘামাতে
আসেন কেন? ইশকুলে কি কেউ ভদ্রতা শিখতে যায়? আমি আপনাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছি; দয়া
করে আমাকেও সেই স্বাধীনতাটুকু দিন। আচ্ছা, তাহলে আমি
বলছিলাম যে আপনারা সবাই আসলে পশু।”
“হ্যাঁ, রাজকুমার; কিন্তু ওটাই তো প্রমাণ করা বাকি,” মির্জোজা যোগ করলেন।
“এর চেয়ে সহজ আর কিছু নেই,”
সুলতান উত্তর দিলেন। এরপর তিনি সেই সব পুরোনো একঘেয়ে
যুক্তিগুলোই আউড়াতে লাগলেন, যা বারবার বলা হয়েছে—যাতে বুদ্ধি
বা সূক্ষ্মতার লেশমাত্র ছিল না, বিশেষ করে এমন এক নারীজাতির বিরুদ্ধে যারা এই দুটি গুণই সবচেয়ে বেশি
ধারণ করে। মির্জোজার ধৈর্যের পরীক্ষা এর চেয়ে বেশি আর কখনো নেওয়া হয়নি। আমি যদি
মাঙ্গোগুলের সমস্ত ফালতু যুক্তি এখানে তুলে ধরি, তবে
আপনারা সারা জীবনেও এতটা বিরক্ত হননি। এই রাজপুত্র, যাঁর
এমনিতে বেশ ভালো বুদ্ধি ছিল, সেদিন তিনি সব সীমা ছাড়িয়ে
আবোলতাবোল বকছিলেন; যার বিচারক আপনারা নিজেরাই।
“জুপিটারের দিব্যি, এটা এতটাই ধ্রুব সত্য,” তিনি বললেন, “যে একজন নারী কেবলই একটি প্রাণী। আমি
বাজি ধরতে পারি—যদি আমি আমার মাদী ঘোড়ার ওপর কুকুফার আংটি
ঘোরাই, তবে আমি
তাকে দিয়ে অবিকল একজন নারীর মতোই কথা বলাতে পারব।”
“নিঃসন্দেহে,”
মির্জোজা বিদ্রূপ করে উত্তর দিলেন, “এই যুক্তিটিই আমাদের বিরুদ্ধে করা
বাকি ছিল, যা আগে
কখনো কেউ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।” তারপর তিনি উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন।
মাঙ্গোগুল তাঁর হাসি থামার
অপেক্ষা না করেই বিরক্ত হয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন—মাথায় তখন তাঁর কল্পনায় আসা সেই অদ্ভুত
পরীক্ষাটি করার ভূত চেপেছে।
আঠাশতম
অধ্যায়: আংটির ত্রয়োদশ পরীক্ষা—সেই ছোট মাদী ঘোড়া
আমি হয়তো খুব উঁচুদরের
প্রতিকৃতি-শিল্পী নই। তাই আমি পাঠকদের আমার প্রিয় সুলতানার রূপবর্ণনা দেওয়া থেকে
রেহাই দিয়েছি; কিন্তু
সুলতানের ঘোড়ার বর্ণনা দেওয়া থেকে আমি তাঁদের কিছুতেই রেহাই দিতে পারছি না।
সে ছিল মাঝারি গড়নের, এবং তার চলন-বলন ছিল বেশ
চমৎকার; তবে এ বিষয়ে তার প্রধান খুঁত ছিল এই যে—সে তার মাথাটা
যথেষ্ট সংযত রাখতে পারত না (মানে বড্ড বেশি মাথা নাড়াত)। তার গায়ের রং ছিল ধবধবে সাদা, নীল চোখ, ছোট খুর, ছিপছিপে পা, মজবুত পায়ের পেশি এবং সুডৌল নিতম্ব। তাকে দীর্ঘ সময় ধরে নাচ শেখানো
হয়েছিল, এবং সে একজন অনুষ্ঠান পরিচালকের মতোই মাথা নিচু
করে কায়দা করে অভিবাদন করতে পারত। সব মিলিয়ে সে ছিল এক চমৎকার প্রাণী, এবং স্বভাবের দিক থেকে বিশেষ শান্ত: তাকে সহজেই বাগে আনা যেত, তবে তার পিঠে টিকে থাকতে হলে অশ্বারোহীকে অবশ্যই ওস্তাদ হতে হতো।
সে আগে সিনেটর অ্যারনের
জিম্মায় ছিল। কিন্তু এক সুন্দর সন্ধ্যায় চঞ্চল প্রাণীটি কী দেখে যেন ভয় পেয়ে
বিচারক মশাইকে পিঠ থেকে ফেলে দিল, এবং পূর্ণ গতিতে ছুটতে ছুটতে সোজা সুলতানের আস্তাবলে গিয়ে হাজির হলো।
সঙ্গে নিয়ে গেল তার পিঠের সেই মূল্যবান জিন, লাগাম,
সরঞ্জাম এবং জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জা; যা
তাকে এতটাই মানিয়েছিল যে, রাজকর্মচারীরা আর সেগুলোকে ফেরত
পাঠানোটা খুব একটা জরুরি মনে করেননি।
মাঙ্গোগুল তাঁর প্রধান সচিব
জিগজ্যাগকে সঙ্গে নিয়ে আস্তাবলে গেলেন। “মন দিয়ে শোনো,” তিনি বললেন, “এবং
যা শুনবে টপাটপ লিখে ফেলো।”
সেই মুহূর্তে তিনি তাঁর
আংটিটি ঘোড়াটির ওপর ঘোরালেন। ওমনি সেই মাদী ঘোড়াটি লাফাতে, নাচতে, লাথি মারতে, শরীর ঝাঁকাতে এবং লেজের নিচ দিয়ে
বিকট শব্দ করতে শুরু করল।
“কী হলো, তোমার মনোযোগ কোথায়?” যুবরাজ তাঁর সচিবকে ধমক দিলেন,
“লিখছ না কেন?”
“সুলতান,”
জিগজ্যাগ আমতা আমতা করে উত্তর দিলেন, “আমি অপেক্ষা করছি কখন মহামান্য শুরু
করবেন।”
“আমার ঘোড়া,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “তোমাকে এখন নির্দেশ দেবে। যা বলছে, লেখো।”
জিগজ্যাগ, যিনি মনে করতেন ঘোড়ার
শ্রুতিলিপি নেওয়া তাঁর মতো উচ্চপদস্থ সচিবের জন্য চরম অপমানের, তিনি সুলতানের কাছে বিনীতভাবে এই স্বাধীনতাটুকু নিলেন—তিনি বললেন
যে, তিনি আজীবন
সুলতানের সচিব হয়ে থাকাকেই সর্বোচ্চ সম্মান মনে করবেন, কিন্তু
তাঁর ঘোড়ার সচিব হওয়াটা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
“লেখো, আমি তোমাকে আদেশ করছি,” সুলতান আবার বললেন।
“যুবরাজ, আমি পারব না,” জিগজ্যাগ উত্তর দিলেন,
“আমি এই ধরনের শব্দের
(ঘোড়ার ডাক বা বাতকর্মের) বানান জানি না।”
“তবুও লেখো,”
সুলতান আরও একবার বললেন।
“আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে
মহামান্যকে অমান্য করতে বাধ্য হচ্ছি,” জিগজ্যাগ যোগ করলেন, “কিন্তু...”
“কিন্তু তুমি একটা আস্ত
বেয়াদব,” মাঙ্গোগুল মাঝপথে বাধা দিলেন,
এমন তুচ্ছ অজুহাতে আদেশ অমান্য করায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন;
“আমার প্রাসাদ থেকে
বেরিয়ে যাও, এবং
আর কখনো যেন তোমাকে এখানে না দেখি।”
বেচারা জিগজ্যাগ চোখের পলকে
অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তিনি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখলেন যে—একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত নয় কোনো
বড়লোকের প্রাসাদে ঢোকার সময় নিজের আত্মসম্মান বা অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে ঢোকা; ওটা দরজার বাইরেই রেখে আসা
উচিত।
এরপর তাঁর ডেপুটি বা
সহকারীকে ডেকে পাঠানো হলো। তিনি ছিলেন মফস্বল থেকে আসা (প্রোভেনসাল), স্পষ্টভাষী, সৎ এবং পুরোপুরি স্বার্থহীন লোক। তিনি দেখলেন তাঁর কর্তব্য এবং ভাগ্য
তাঁকে ডাকছে, তাই তিনি উড়ে এলেন। সুলতানকে গভীর শ্রদ্ধা
জানালেন, তাঁর ঘোড়াকে আরও গভীর শ্রদ্ধা জানালেন এবং
প্রাণীটি যা কিছু ‘নির্দেশ’ দিতে রাজি হলো, তার সবটুকুই তিনি অক্ষরে
অক্ষরে লিখে নিলেন।
যাঁরা ঘোড়াটির সেই ঐতিহাসিক
বক্তৃতার বিস্তারিত জানতে আগ্রহী, তাঁদের কঙ্গোর মহাফেজখানা বা আর্কাইভে খোঁজ নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
যুবরাজ অবিলম্বে এর অনুলিপি তাঁর সমস্ত দোভাষী এবং প্রাচীন ও আধুনিক বিদেশি ভাষার
অধ্যাপকদের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশ দিলেন।
পণ্ডিতদের গবেষণার ফলাফল
হলো দেখার মতো:
·
একজন
বললেন যে, এটি
কোনো প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির একটি দৃশ্য, যা তাঁর কাছে
খুব মর্মস্পর্শী মনে হয়েছে।
·
অন্যজন, তাঁর উর্বর মস্তিষ্কের জোরে
আবিষ্কার করলেন যে—এটি আসলে মিশরীয় ধর্মতত্ত্বের একটি গূঢ় অংশ।
·
তৃতীয়জন
দাবি করলেন যে, এটি
‘পুনিক’ ভাষায় লেখা হানিবালের শেষকৃত্যের বক্তৃতার ভূমিকা।
·
এবং
চতুর্থজন জোর দিয়ে বললেন যে, এই অংশটি চীনা ভাষায় লেখা এবং এটি কনফুসিয়াসের উদ্দেশ্যে রচিত একটি
অত্যন্ত ভক্তিমূলক প্রার্থনা।
যখন সাহিত্যিকরা তাঁদের এই
সব পাণ্ডিত্যপূর্ণ অনুমান দিয়ে সুলতানের ধৈর্য পরীক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই সুলতানের মনে পড়ল ‘গালিভারের ভ্রমণকাহিনি’র কথা। এতে
কোনো সন্দেহ ছিল না যে, গালিভার নামের ওই ইংরেজ ভদ্রলোক—যিনি দীর্ঘকাল এমন এক দ্বীপে (হুইনহিমদের
দেশ) বসবাস করেছিলেন যেখানে ঘোড়াদের নিজস্ব সরকার, আইন, রাজা, দেবতা, পুরোহিত, ধর্ম,
মন্দির এবং বেদি আছে—তিনি নিশ্চয়ই তাদের ভাষার একজন ওস্তাদ
হবেন।
সেই অনুযায়ী গালিভারকে ডাকা
হলো। তিনি ঘোড়ার সেই বক্তৃতাটি তাৎক্ষণিকভাবে পড়লেন এবং ব্যাখ্যা করলেন, যদিও মূল লিপিতে প্রচুর
বানান ভুল ছিল। সত্যি বলতে, এটিই ছিল কঙ্গোর ইতিহাসে
একমাত্র নির্ভুল অনুবাদ।
মাঙ্গোগুল তাঁর ব্যক্তিগত
সন্তুষ্টির জন্য এবং তাঁর পদ্ধতির সম্মানের খাতিরে জানতে পারলেন যে—এটি আসলে তিন
লেজওয়ালা এক বৃদ্ধ পাশার ছোট ঘোড়ার সঙ্গে ওই মাদী ঘোড়াটির এক রমরমা প্রেমকাহিনির
সংক্ষিপ্তসার। এবং
আরও জানা গেল যে, পাশার ঘোড়ার সঙ্গে প্রেম হওয়ার আগে, অগণিত ‘গাধা’ তাকে আক্রমণ
করেছিল (বা তার প্রেমিক ছিল)।
এটি ছিল এমন একটি একক
উপাখ্যান, যার
সত্যতা অবশ্য সুলতান বা দরবারের অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে, কিংবা বানজা ও সাম্রাজ্যের বাকি অংশে অজানা ছিল না। (অর্থাৎ সবাই জানত
যে সিনেটর অ্যারনের স্ত্রী বা রক্ষিতারা আসলে কাদের সঙ্গে প্রেম করত!)
আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আমার অসাবধানতার জন্য এমনটা হয়েছে। আমি এখনই ইংরেজি শব্দগুলো বাদ দিয়ে পুরো অংশটা
ঠিক করে দিচ্ছি।
ঊনত্রিশতম
অধ্যায়: সম্ভবত সেরা এবং এই ইতিহাসের সবচেয়ে কম পঠিত অংশ
মাঙ্গোগুলের স্বপ্ন:
অথবা ‘অনুমানের অঞ্চল’-এ একটি যাত্রা
“আহহ্!” মাঙ্গোগুল
একটা বিশাল হাই তুলে চোখ ডলতে ডলতে বললেন,
“আমার মাথাটা দপদপ
করছে। দোহাই তোমাদের, আর কেউ যেন আমার সামনে দর্শন নিয়ে একটা কথাও না বলে। এমন জ্ঞানগর্ভ
আলোচনা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। গত রাতে আমি বিছানায় শুয়েছিলাম বটে, কিন্তু আমার বালিশটা ছিল একগাদা জটিল ধারণায় ঠাসা। সুলতানের মতো
নিশ্চিন্তে ঘুমানোর বদলে, আমার মগজ গত এক রাতে আমার
মন্ত্রীদের এক বছরের কাজের চেয়েও বেশি খাটাখাটনি করেছে। তুমি হাসছ? কিন্তু তোমাকে বোঝানোর জন্য যে আমি মোটেও বাড়িয়ে বলছি না, এবং তোমার ওই কঠিন যুক্তিতর্কের কারণে আমার যে জঘন্য রাত কেটেছে তার
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য—আমি তোমাকে আমার পুরো স্বপ্নটা শোনার শাস্তি দিচ্ছি।”
“আমি যেইমাত্র একটু
তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম এবং আমার কল্পনা ডানা মেলতে শুরু করল, ওমনি আমি আমার পাশে এক
অদ্ভুত প্রাণী লাফিয়ে উঠতে দেখলাম। তার মাথাটা ছিল ঈগলের মতো, পা গ্রিফিনের মতো, শরীর ঘোড়ার মতো আর লেজটা
ছিল সিংহের মতো। প্রাণীটা লাফালাফি করলেও আমি খপ করে তাকে ধরে ফেললাম; এবং তার কেশর আঁকড়ে ধরে এক লাফে তার পিঠে চড়ে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে
তার দুই পাশ থেকে বিশাল ডানা মেলে দিল, এবং আমি
অবিশ্বাস্য গতিতে শূন্যে ভেসে চললাম।”
“অনেক দূর যাওয়ার পর, আমি শূন্যের মাঝে জাদুর মতো
ঝুলে থাকা এক বিশাল প্রাসাদ দেখতে পেলাম। অট্টালিকাটি ছিল বিরাট। আমি বলব না যে এর
ভিত্তির কোনো ত্রুটি ছিল; কারণ আসলে এর কোনো ভিত্তিই ছিল
না! এর স্তম্ভগুলো, যা চওড়ায় আধা ফুটেরও কম ছিল,
ওপরের দিকে উঠতে উঠতে দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছিল এবং এমন সব
খিলানকে ধরে রেখেছিল—যা কেবল অলীক আলোয় আলোকিত হলেই চোখে পড়ত।”
“এই অদ্ভুত ভবনের
প্রবেশপথেই আমার বাহনটি প্রথম থামল। প্রথমে আমি নামব কি না তা নিয়ে দ্বিধায়
ছিলাম: কারণ আমার মনে হচ্ছিল ওই আজব প্রাণীটার পিঠে বসে থাকাটা এই নড়বড়ে
বারান্দার নিচে হাঁটার চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। তবে, সেখানে অসংখ্য বাসিন্দার উপস্থিতি এবং তাদের
চোখেমুখে এক অদ্ভুত নিরাপত্তার ভাব দেখে আমি সাহস পেলাম। আমি নামলাম, এগিয়ে গেলাম, ভিড়ের সঙ্গে মিশে গেলাম এবং
যারা এই ভবনটি তৈরি করেছে তাদের খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম।”
“তারা ছিল সব বৃদ্ধ মানুষ; কেউ ফোলা রোগে আক্রান্ত,
কেউ বা জরাজীর্ণ; শরীরে না ছিল শক্তি,
না ছিল সামঞ্জস্য—প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে বিকৃত।
একজনের মাথা ছিল খুব ছোট, তো অন্যজনের হাত খুব ছোট। কেউ ছিল কুঁজো, কেউ
বা বাঁকা পায়ের। তাদের বেশির ভাগেরই পা ছিল না, এবং তারা
ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটত। একটা সামান্য ফুঁ দিলেই তারা উল্টে পড়ে যেত, এবং মাটিতেই পড়ে থাকত—যতক্ষণ না কোনো নতুন আগন্তুক দয়া করে
তাদের টেনে তুলত। এই সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও,
প্রথম দর্শনেই তারা মন জয় করে নিত। তাদের চেহারায় এমন কিছু
আকর্ষণীয় এবং আত্মবিশ্বাসী ভাব ছিল যে চোখ ফেরানো যেত না। তারা ছিল প্রায় নগ্ন:
কারণ তাদের সমস্ত পোশাক বলতে ছিল কেবল এক টুকরো ছেঁড়া কাপড়, যা তাদের শরীরের একশ ভাগের এক ভাগও ঢাকতে পারত না।”
“আমি ভিড় ঠেলে এগিয়ে
গেলাম এবং একটি মঞ্চের পাদদেশে পৌঁছালাম,
যার ওপর মাকড়সার জালের তৈরি একটি চাঁদোয়া টাঙানো ছিল। এই
মঞ্চের সাহস বা ঔদ্ধত্য মূল ভবনের সাহসের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল। আমার কাছে মনে হলো
এটি যেন একটি সুচের ডগায় বসানো হয়েছে এবং সেখানে কোনোমতে ভারসাম্য বজায় রেখে
টিকে আছে। আমি শতবার শিউরে উঠছিলাম সেই লোকটির জন্য, যিনি
ওই মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন এক বৃদ্ধ, লম্বা
দাড়িওয়ালা; তাঁর শিষ্যদের মতোই তিনি ছিলেন শুষ্ক এবং
নগ্ন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে রাখা ছিল একধরনের সূক্ষ্ম তরল পদার্থ। তিনি একটি
খড়ের পাইপ তাতে ডোবাচ্ছিলেন; তারপর সেটি মুখে দিয়ে ফুঁ
দিচ্ছিলেন এবং তাঁর চারপাশে ঘিরে থাকা দর্শকদের ভিড়ের দিকে একগুচ্ছ সাবানের ফেনার
মতো বুদবুদ উড়িয়ে দিচ্ছিলেন। আর দর্শকরা? তারা সেই
ক্ষণস্থায়ী বুদবুদগুলোকে মেঘের দেশে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের সর্বশক্তি দিয়ে
চেষ্টা করছিল।”
“‘আমি কোথায়?’
এই ছেলেমানুষি কাণ্ডকারখানা দেখে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে আমি
নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। ‘এই বুদবুদ ফুঁকানো লোকটাই বা কী বোঝাতে চাইছে, আর এই সমস্ত জরাজীর্ণ শিশুরা
তাদের ওড়াতেই বা এত ব্যস্ত কেন? কে আমাকে এই রহস্যের
সমাধান দেবে?’ তাছাড়া, তাদের গায়ের সেই ছোট কাপড়ের
টুকরোগুলোও আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল। আমি লক্ষ্য করলাম—যাদের গায়ের
কাপড়ের টুকরো যত বড়, তারা ওই বুদবুদ ওড়ানোতে তত কম আগ্রহী। এই পর্যবেক্ষণ আমাকে সাহস দিল
তাদের দলের মধ্যে সবচেয়ে কম পোশাক পরা (মানে সবচেয়ে বড় টুকরো পরা) লোকটির কাছে
যেতে।”
“আমি এমন একজনকে দেখলাম, যার কাঁধের অর্ধেকটা এমনভাবে
সেলাই করা টুকরো দিয়ে ঢাকা ছিল যে সেলাইগুলো বোঝাই যাচ্ছিল না। সে ভিড়ের মধ্যে
পায়চারি করছিল এবং অন্যরা কী করছে তা নিয়ে তার খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। তার
চেহারা ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ, মুখটা হাসিখুশি, হাঁটাচলায় রাজকীয় ভাব এবং দৃষ্টি ছিল সৌম্য। আমি সোজা তার কাছে গেলাম
এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই জিজ্ঞাসা করলাম: ‘আপনি কে?
আমি কোথায় আছি? এবং এই সমস্ত লোক কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি প্লেটো। আপনি এখন ‘অনুমানের অঞ্চল’-এ আছেন, এবং এই লোকেরা হলো ‘পদ্ধতিবিদ’।’ ‘কিন্তু
কী আশ্চর্য,’ আমি বললাম, ‘স্বয়ং ঐশ্বরিক প্লেটো এখানে! আপনি
এই পাগলদের ভিড়ে কী করছেন?’ ‘নিয়োগ দিচ্ছি,’ তিনি বললেন। ‘এই বারান্দা
থেকে দূরে আমার একটি নিজস্ব অভয়ারণ্য আছে,
যেখানে আমি তাদেরই নিয়ে যাই যারা এই পদ্ধতি বা সিস্টেমের মোহ
ত্যাগ করতে পারে।’ ‘এবং আপনি তাদের কীভাবে নিয়োগ দেন বা দীক্ষা দেন?’
‘নিজেকে জানা, গুণের অনুশীলন করা এবং
অনুগ্রহ বা লাবণ্যের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার মাধ্যমে।’ ‘এগুলো নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ: কিন্তু এই
ছেঁড়া কাপড়ের টুকরোগুলোর মানে কী?
যার কারণে আপনাকে একজন দার্শনিকের চেয়ে বরং ভিক্ষুকের মতো বেশি
দেখাচ্ছে?’ ‘ওহ! আপনি আমাকে কী প্রশ্ন করলেন!’ তিনি দীর্ঘশ্বাস
ফেলে বললেন, ‘এবং আপনি আমার মনে কোন পুরনো স্মৃতি
জাগিয়ে তুললেন? এই
মন্দিরটি একসময় দর্শনের মন্দির ছিল। হায়! এই জায়গাটি কত বদলে গেছে! সক্রেটিসের
আসন ছিল এখানে।’ ‘কী!’ আমি অবাক হয়ে বাধা দিলাম, ‘সক্রেটিসের কাছে কি খড় ছিল,
এবং তিনিও কি বুদবুদ ফুঁকতেন?’ ‘না, না,’ প্লেটো উত্তর দিলেন, ‘এমন ছেলেমানুষি করে তিনি দেবতাদের কাছ থেকে
জ্ঞানী উপাধি পাননি। তাঁর জীবনের প্রধান কাজ ছিল মানুষের মাথা এবং হৃদয় গঠন করা।
তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই রহস্য হারিয়ে গেল। সক্রেটিস মারা গেলেন, এবং দর্শনের সেই সোনালি
দিনগুলোও শেষ হলো। এই কাপড়ের টুকরোগুলো—যা ওই পদ্ধতিবিদরাও গায়ে জড়ানোকে সম্মানের
বিষয় বলে মনে করে—এগুলো আসলে তাঁর (সক্রেটিসের) পোশাকের টুকরো। তাঁর
চোখ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, যারা দার্শনিকের উপাধি পেতে আগ্রহী ছিল, তারা
তাঁর পোশাক কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল।’ ‘আমি বুঝতে পেরেছি,’
আমি বললাম, ‘এই টুকরোগুলো তাদের এবং তাদের দীর্ঘ বংশধরদের জন্য দার্শনিক হওয়ার
টিকিট বা ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করছে।’ ‘কিন্তু কে এই টুকরোগুলো আবার জোড়া লাগাবে,’
প্লেটো বলে চললেন, ‘এবং আমাদের সক্রেটিসের সেই অখণ্ড পোশাকটি
ফিরিয়ে দেবে?’”
“তিনি যখন এই কথাগুলো
বলছিলেন, আমি
দূরে একটি শিশুকে ধীর কিন্তু নিশ্চিত পায়ে আমাদের দিকে হেঁটে আসতে দেখলাম। তার
মাথাটা ছিল ছোট, শরীরটা পাতলা, হাতগুলো
দুর্বল এবং পাগুলো ছোট: কিন্তু সে যত কাছে আসছিল, তার
শরীরের প্রতিটি অঙ্গ অনুপাতে বড় হয়ে উঠছিল। তার এই ক্রমাগত বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায়,
সে আমার সামনে শত শত ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হলো; আমি তাকে আকাশের দিকে একটি লম্বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র তাক করতে দেখলাম,
একটি দোলকের দোলনের সাহায্যে বস্তুর পতনের গতি মাপতে দেখলাম,
পারদ ভরা একটি নলের সাহায্যে বাতাসের ওজন মাপতে দেখলাম এবং একটি
প্রিজম দিয়ে আলোকে ভেঙে সাতরঙা করতে দেখলাম। সে এখন এক বিশাল দৈত্যাকার মূর্তিতে
পরিণত হয়েছিল: তার মাথা আকাশ ছুঁয়েছিল, তার পা পাতালের
অতল গহ্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, এবং তার হাত এক মেরু থেকে
অন্য মেরু পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। তার ডান হাতে সে একটি মশাল ধরেছিল, যার আলো আকাশে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল, এমনকি জলের তলদেশও আলোকিত করেছিল এবং পৃথিবীর গভীরে প্রবেশ করেছিল।”
“আমি প্লেটোকে জিজ্ঞাসা
করলাম, ‘ওই বিশাল মূর্তিটি কী, যা আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে?’ ‘ওটি হলো ‘অভিজ্ঞতা’,’
তিনি বললেন। তিনি আমাকে এই সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই,
আমি দেখলাম অভিজ্ঞতা আরও কাছে চলে এসেছে। তার পায়ের চাপে ‘অনুমানের বারান্দা’র স্তম্ভগুলো
থরথর করে কাঁপতে লাগল, খিলানগুলো ধসে পড়তে শুরু করল, এবং আমাদের
পায়ের নিচের মেঝে ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ‘চলো পালাই,’ প্লেটো চিৎকার করে বললেন,
‘চলো পালাই: এই ভবনটি
আর এক মুহূর্তও টিকবে না।’ এই কথা বলেই তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন, এবং আমিও তাঁকে অনুসরণ
করলাম। সেই বিশাল মূর্তিটি এসে সজোরে বারান্দায় আঘাত করল; বিকট শব্দে পুরো ভবনটি ভেঙে পড়ল, এবং আমি
ধড়মড় করে জেগে উঠলাম।”
“আহ! রাজকুমার,”
মির্জোজা মুগ্ধ হয়ে বললেন, “স্বপ্ন দেখা উচিত তো আপনার মতো। আমি সত্যিই খুব
খুশি হতাম যদি জানতাম যে আপনার একটা ভালো এবং আরামদায়ক রাত কেটেছে: কিন্তু এখন
যেহেতু আমি আপনার স্বপ্নটা জেনেছি,
আমি বরং দুঃখিতই হতাম যদি আপনি এটা না দেখতেন।”
“ম্যাডাম,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “আমি এই জ্ঞানগর্ভ স্বপ্নের চেয়ে বরং একটা
আরামদায়ক ঘুমকেই বেশি পছন্দ করতাম,
যা আপনাকে এত আনন্দ দিচ্ছে। এবং যদি স্বপ্ন দেখা বা না দেখার
চাবিটা আমার হাতে থাকত; তবে এটা খুব স্বাভাবিক যে,
‘অনুমানের দেশে’ আপনাকে
খুঁজে পাওয়ার আশা না করে, আমি বরং অন্য কোনো রোমান্টিক জায়গায় আমার পথ ঘুরিয়ে নিতাম। এবং
তাহলে হয়তো আমার এই মাথাধরাটাও থাকত না, যা আমি এখন
অনুভব করছি; অথবা অন্তত সেই ব্যথার জন্য আমার মনে একটু
শান্তির পরশ থাকত।”
“রাজকুমার,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, “আশা করা যায় যে এটি শীঘ্রই সেরে যাবে; এবং আপনার আংটির এক বা দুটি
নতুন পরীক্ষা আপনাকে এই ব্যথা থেকে মুক্তি দেবে।”
“আমাকে চেষ্টা করতেই হবে,”
মাঙ্গোগুল বললেন। সুলতান এবং মির্জোজার মধ্যে কথোপকথন আরও
কিছুক্ষণ চলল; তাই তিনি বেলা এগারোটা পর্যন্ত তাঁকে
ছাড়লেন না। তারপর তিনি নিম্নলিখিত অধ্যায়ে বর্ণিত অভিযানে বের হলেন।
ত্রিশতম
অধ্যায়: আংটির চতুর্দশ পরীক্ষা—নীরব রত্ন
সুলতানের দরবারে যত উজ্জ্বল
নারী ছিলেন, তাঁদের
মধ্যে তরুণী এগ্লের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় এবং বুদ্ধিমতী আর কেউ ছিল না। তিনি ছিলেন
মহামান্যের প্রধান পানপাত্র-বাহক বা খাস পরিচারকের (Grand Cup-bearer) স্ত্রী। তিনি মাঙ্গোগুলের সব ব্যক্তিগত পার্টিতে উপস্থিত থাকতেন,
কারণ সুলতান তাঁর প্রফুল্ল কথোপকথনে মুগ্ধ ছিলেন। যেহেতু এগ্লেকে
ছাড়া কোনো আনন্দ বা বিনোদনই যেন জমজমাট হতো না, তাই তিনি
দরবারের অন্যান্য অভিজাত ব্যক্তিদের পার্টিতেও নিয়মিত আমন্ত্রিত হতেন। নাচ,
পাবলিক অনুষ্ঠান, ড্রয়িংরুমের আড্ডা,
ভোজসভা, ব্যক্তিগত নৈশভোজ, শিকার বা তাস খেলা—সর্বত্র এগ্লেকে আমন্ত্রণ জানানো হতো, এবং তিনি সবখানেই উপস্থিত
হতেন। মনে হতো যেন তাঁর সঙ্গ পাওয়ার জন্য মানুষের যে তৃষ্ণা, তা মেটাতে বিনোদনের দেবতা তাঁকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিতেন।
তাঁকে সব সময় একদল প্রেমিক
বা প্রশংসাকারী ঘিরে থাকত, এবং লোকে বিশ্বাস করত যে তিনি তাদের সবাইকে খুব একটা কড়া নজরে দেখতেন
না। সেটা অসাবধানতাবশতই হোক বা তাঁর অতিরিক্ত ভালো স্বভাবের কারণেই হোক, তাঁর সাধারণ ভদ্রতাকে অনেকেই বিশেষ মনোযোগ বা প্রশ্রয় বলে ভুল করত।
যারা তাঁকে জয় করার চেষ্টা করত, তারা কখনো কখনো তাঁর
চোখে স্নেহের আভাস খুঁজে পেত—অথচ তিনি হয়তো কেবল বন্ধুত্বের চেয়ে
বেশি কিছু বোঝাতে চাইতেন না। তিনি কখনো কাউকে কটু কথা বলতেন না বা নিন্দাও করতেন না; তিনি মুখ খুলতেন কেবল
আনন্দদায়ক কথা বলার জন্য। তিনি এত প্রাণবন্ত এবং আন্তরিকভাবে তা করতেন যে,
অনেক সময় তাঁর প্রশংসা শুনে সন্দেহ জাগত—হয়তো তিনি
কাউকে বিশেষভাবে পছন্দ করেন এবং তাকে সমর্থন করছেন। এভাবেই দেখা যায় যে, যাদের কাছে এগ্লে ছিলেন
অলঙ্কার বা আনন্দের উৎস, তারাই আসলে তাঁর অযোগ্য ছিল।
এটা খুব স্বাভাবিক ছিল যে, এমন একজন নারী—যাঁর মধ্যে
হয়তো অতিরিক্ত ভালোমানুষি ছাড়া আর কোনো দোষ খুঁজে পাওয়া যেত না—তাঁর কোনো শত্রু
থাকা উচিত নয়। তবুও তাঁর কিছু শত্রু ছিল,
এবং তারা ছিল অত্যন্ত তিক্ত। বানজার ধর্মপ্রাণ বা ভণ্ড নারীরা
দেখল যে, এগ্লের মেজাজ বড্ড বেশি স্বাধীন এবং তাঁর
চালচলনে কিছুটা শিথিলতা আছে; তারা তাঁর আচরণে কেবল
পার্থিব আনন্দের প্রতি আসক্তি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না। সেখান থেকে তারা এই
সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে, তাঁর চরিত্র অন্ততপক্ষে সন্দেহজনক;
এবং তারা ‘দাতব্য কাজ’ হিসেবেই যারা তাদের কথা শুনতে চাইত, তাদের কানে এই সন্দেহের বীজ
ঢুকিয়ে দিল।
দরবারের মহিলারাও এগ্লের
প্রতি খুব একটা সদয় ছিলেন না। তারা তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহ করত, তাঁর কাল্পনিক প্রেমিক
বানিয়ে দিত, এমনকি তাঁকে কিছু বড়সড় কেলেঙ্কারির
নায়িকা বানিয়ে সম্মানিত করত। তারা ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানত এবং সাক্ষীও
হাজির করত!
“শুনেছ,”
তারা ফিসফিস করে বলত, “তাকে মেলরাইমের সঙ্গে বড় পার্কের একটি বাগানে
একদম একান্তে (tête-à-tête) ধরা হয়েছে। এগ্লের বুদ্ধির
অভাব নেই,” তারা বাঁকা হেসে যোগ করত, “কিন্তু রাত দশটায় একটা বাগানে বসে কেবল তার
জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে বিনোদন নেওয়ার মতো এতটা ‘সাধারণ জ্ঞান’ মেলরাইমের
নেই।”
“আপনারা ভুল করছেন,”
একজন শৌখিন বাবু (Petit-maître) বললেন,
“আমি তাঁর সঙ্গে
সন্ধ্যায় শতবার হেঁটেছি, এবং তাতে আমার বেশ সুবিধাই হয়েছে। কিন্তু ওহে, আপনারা কি জানেন যে জুলেমা প্রতিদিন তাঁর প্রসাধন কক্ষে (Toilette)
হাজিরা দেয়?”
“নিঃসন্দেহে আমরা জানি; এবং তার স্বামী যখন দরবারে
ডিউটি দেয়, তখন তার আর প্রসাধনের বালাই থাকে না।”
“বেচারা সেলেবি (এগ্লের
স্বামী),” আরেকজন বলে উঠলেন, “আসলে তার স্ত্রী তাকে সেইসব
হীরা-জহরত আর দামি অলঙ্কার দিয়ে নিজের বিজ্ঞাপন দেয়, যা সে পাশা ইসমাইলের কাছ
থেকে উপহার পেয়েছে।”
“এটা কি সত্যি, ম্যাডাম?”
“একেবারে খাঁটি সত্য, আমি নিজের কানে শুনেছি।
কিন্তু ব্রহ্মার দোহাই, এটা যেন আর বেশি দূর না ছড়ায়।
এগ্লে আমার বন্ধু, এবং তার ক্ষতি হলে আমি খুব দুঃখ পাব।”
“হায়!” তৃতীয়জন দুঃখের
ভান করে বললেন, “বেচারা মেয়েটা খুব আনন্দের সঙ্গেই
নিজেকে ধ্বংস করছে। সত্যিই বড় দুঃখের বিষয়। কিন্তু একবারে বিশটা প্রেমলীলা...
ওটা একটু বেশিই মনে হয় না?”
শৌখিন বাবুরাও তাঁর প্রতি
খুব একটা উদার ছিলেন না। একজন একটা শিকারের গল্প ফাঁদলেন, যেখানে তিনি এবং এগ্লে নাকি
একসঙ্গে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। অন্যজন, ‘নারীজাতির প্রতি শ্রদ্ধার কারণে’, একটা
মুখোশ-পরা নাচের আসরে (Masquerade) এগ্লের সঙ্গে তাঁর এক
রমরমা কথোপকথনের পরিণতি চেপে গেলেন। তৃতীয়জন তাঁর বুদ্ধি ও রূপের এক দীর্ঘ
প্রশংসা-গাথা গাইলেন এবং শেষে পকেট থেকে তাঁর একটি প্রতিকৃতি বের করে দেখালেন—যা তিনি নাকি
‘সেরা
হাত’
থেকেই উপহার পেয়েছেন বলে দাবি করলেন।
“এই প্রতিকৃতিটা,”
চতুর্থজন ফোড়ন কাটলেন, “জেনাকিকে তিনি যে প্রতিকৃতি উপহার দিয়েছিলেন তার
চেয়ে তাঁর মতো বেশি।”
এই সব গল্প অবশেষে তাঁর
স্বামীর কানে পৌঁছাল। সেলেবি তাঁর স্ত্রীকে ভালোবাসতেন, তবে এত শালীনতার সঙ্গে যে
কেউ তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করত না। তিনি প্রথম দিকের গুজবগুলো উড়িয়ে
দিয়েছিলেন; কিন্তু অভিযোগগুলো এত দিক থেকে এবং এত
জোরেশোরে ফিরে এল যে, তিনি শেষমেশ তাঁর বন্ধুদের নিজের
চেয়ে বেশি বিচক্ষণ মনে করতে শুরু করলেন। তিনি এগ্লেকে যত বেশি স্বাধীনতা
দিয়েছিলেন, ততই তাঁর সন্দেহ হলো যে এগ্লে তার অপব্যবহার
করেছে। ঈর্ষা তাঁর আত্মাকে গ্রাস করল। তিনি তাঁর স্ত্রীকে কড়া শাসনে রাখা শুরু
করলেন। এগ্লে স্বামীর এই আচরণের পরিবর্তন সহ্য করতে পারলেন না, কারণ তিনি নিজের নির্দোষিতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাঁর নিজের চঞ্চলতা
এবং বান্ধবীদের কুবুদ্ধি তাঁকে এমন কিছু অবিবেচক কাজ করতে প্ররোচিত করল, যা সবার সন্দেহকে বিশ্বাসে পরিণত করল এবং তাঁর জীবন প্রায় দুর্বিষহ
করে তুলল।
হিংস্র সেলেবি কিছু সময়ের
জন্য নানা ধরনের প্রতিশোধের ছক কষলেন—তলোয়ার, বিষ, ফাঁসি—সবকিছু নিয়েই ভাবলেন। অবশেষে তিনি এক ধীর এবং আরও
নিষ্ঠুর শাস্তি বেছে নিলেন: এগ্লেকে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নির্বাসিত করা। একজন
দরবারের নারীর জন্য এটা মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। এক কথায়, আদেশ জারি হলো। এগ্লেকে তাঁর
ভাগ্য সম্পর্কে জানানো হলো। তাঁর চোখের জল বা যুক্তি—কোনো কিছুতেই
সেলেবি টললেন না। তাঁকে বানজা থেকে দুইশো মাইল দূরে এক পুরনো দুর্গে নির্বাসিত করা
হলো, যেখানে তাঁর
সঙ্গী বলতে দেওয়া হলো কেবল দুজন দাসী এবং চারজন কালো খোজা প্রহরী, যারা তাঁকে দিনরাত চোখে চোখে রাখত।
তিনি চলে যাওয়ার সঙ্গে
সঙ্গেই যেন তিনি নির্দোষ হয়ে গেলেন! শৌখিন বাবুরা তাঁর রোমাঞ্চকর গল্পগুলো ভুলে
গেল; নারীরা তাঁর
বুদ্ধি ও রূপের জন্য তাঁকে ক্ষমা করে দিল; এবং সারা
দুনিয়া তাঁর জন্য মায়াকান্না শুরু করল। মাঙ্গোগুল সেলেবির মুখ থেকে এই কঠোর
সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো জানতে পারলেন, এবং মনে হলো
একমাত্র তিনিই এই শাস্তির অনুমোদন দিলেন।
দুর্ভাগা এগ্লে তাঁর
নির্বাসনে প্রায় ছয় মাস ধরে কষ্ট পাচ্ছিলেন, যখন কেরফায়েলের সেই বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটল।
মির্জোজা আশা করেছিলেন যে এগ্লে নির্দোষ প্রমাণিত হবেন, কিন্তু
সে কথা বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। অবশেষে একদিন তিনি সুলতানকে বললেন: “রাজকুমার, আপনার যে আংটি কেরফায়েলের
জীবন বাঁচিয়েছে, তা কি এগ্লের নির্বাসনের অবসান ঘটাতে
পারে না? কিন্তু আমি ভুলেই গেছি: এর জন্য তো তাঁর ‘গোপন রত্ন’কে জেরা করা
দরকার; আর বেচারি
তো এখান থেকে দুইশো মাইল দূরে ধুঁকে ধুঁকে মরছে।”
“আপনি দেখছি এগ্লের ভাগ্যের
ব্যাপারে বেশ আগ্রহী,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন।
“হ্যাঁ রাজকুমার,”
মির্জোজা বললেন, “বিশেষ করে যদি সে নির্দোষ হয়।”
“আপনি এক ঘণ্টার মধ্যেই এ
বিষয়ে খবর পাবেন,” মাঙ্গোগুল বললেন। “আপনি কি আমার
আংটির বিশেষ গুণের কথা ভুলে গেছেন (স্থানান্তরের ক্ষমতা)?”
এ কথা বলেই তিনি বাগানে গেলেন, আংটি
ঘোরালেন, এবং পনেরো মিনিটেরও কম সময়ে তিনি সেই দুর্গের
পার্কে পৌঁছে গেলেন যেখানে এগ্লে বন্দী ছিলেন।
সেখানে তিনি এগ্লেকে একা
এবং দুঃখে মগ্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন। তাঁর মাথা হাতের ওপর এলানো ছিল, তিনি বিড়বিড় করে স্বামীর
নাম জপছিলেন, এবং তাঁর চোখের জলে পায়ের নিচের সবুজ ঘাস
ভিজে যাচ্ছিল। মাঙ্গোগুল কাছে গেলেন এবং তাঁর ওপর আংটি ঘোরালেন। এগ্লের রত্নটি এক
শোকাতুর সুরে বলে উঠল: “আমি সেলেবিকে ভালোবাসি।”
সুলতান বাকি অংশের জন্য
অপেক্ষা করলেন; কিন্তু
যখন আর কোনো কথা এল না, তখন তিনি তাঁর আংটির সাহায্য
নিলেন। তিনি এগ্লের দিকে তাক করার আগে আংটিটা তাঁর টুপির সঙ্গে দুই-তিনবার ঘষে
নিলেন। কিন্তু তাঁর সব চেষ্টাই বৃথা গেল। রত্নটি শুধু পুনরাবৃত্তি করল: “আমি সেলেবিকে ভালোবাসি,”
এবং থেমে গেল।
“এটা তো দেখছি খুবই বিচক্ষণ
রত্ন,” সুলতান বললেন। “চলুন আরেকবার
চেষ্টা করা যাক, এবং
এবার একদম কাছ থেকে।” এবার তিনি আংটিতে তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেন
এবং দ্রুত এগ্লের ওপর ঘোরালেন। কিন্তু তাঁর রত্নটি হয় পুরোপুরি নীরব রইল, অথবা সেই একই অভিযোগপূর্ণ
কথাগুলো বলে নীরবতা ভাঙল: “আমি সেলেবিকে ভালোবাসি, এবং আর কোনো পুরুষকে
ভালোবাসিনি।”
মাঙ্গোগুল পুরোপুরি
সন্তুষ্ট হয়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে মির্জোজার কাছে ফিরে এলেন।
“কী রাজকুমার,”
তিনি অবাক হয়ে বললেন, “ইতিমধ্যেই ফিরে এসেছেন? তা কী জানলেন? আমাদের আলোচনার জন্য নতুন কোনো মশলা নিয়ে এসেছেন কি?”
“আমি কিছুই নিয়ে আসিনি,”
সুলতান উত্তর দিলেন।
“কী! কিছুই না?”
“একদম কিছুই না। আমি এমন ‘নীরব রত্ন’ বাপের জন্মে
দেখিনি। আমি ওটার কাছ থেকে এই কটা কথা ছাড়া আর কিছুই বের করতে পারিনি: ‘আমি সেলেবিকে ভালোবাসি, আমি সেলেবিকে ভালোবাসি,
এবং আর কোনো পুরুষকে ভালোবাসিনি।’”
“আহ! রাজকুমার,”
মির্জোজা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “আপনি আমাকে কী শোনাচ্ছেন? কী আনন্দের খবর! অবশেষে একজন
সত্যিকারের সতী নারী পাওয়া গেল। আপনি কি তাঁকে আর বেশি দিন এভাবে কষ্ট পেতে দেবেন?”
“না,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “তাঁর নির্বাসনের অবসান হবে। কিন্তু আপনার কি
কোনো ভয় নেই যে এটা তাঁর সতীত্বের বিনিময়ে হতে পারে? এগ্লে পবিত্র, কিন্তু ভেবে দেখুন আমার হৃদয়ের আনন্দ, আপনি
আমার কাছে কী চাইছেন—তাঁকে আমার দরবারে ফিরিয়ে আনতে, যাতে তিনি পবিত্র থাকেন...
তবে তাই হোক, আপনি সন্তুষ্ট হবেন।”
সুলতান অবিলম্বে সেলেবিকে
ডেকে পাঠালেন এবং তাঁকে বললেন যে—এগ্লে সম্পর্কে ছড়ানো গুজবগুলোর ব্যাপারে
তিনি কঠোর তদন্ত করেছেন এবং সেগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মানহানিকর বলে প্রমাণ পেয়েছেন।
তিনি সেলেবিকে নির্দেশ দিলেন এগ্লেকে সসম্মানে দরবারে ফিরিয়ে আনতে। সেলেবি আদেশ
মান্য করলেন এবং তাঁর স্ত্রীকে মাঙ্গোগুলের সামনে হাজির করলেন। এগ্লে সুলতানের
পায়ে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সুলতান তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন:
“ম্যাডাম, মির্জোজাকে ধন্যবাদ জানান।
আপনার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম বন্ধুত্বই আমাকে আপনার ওপর চাপানো মিথ্যা অপবাদগুলো
যাচাই করতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার দরবারকে আপনার উপস্থিতি দিয়ে আলোকিত করতে
থাকুন; কিন্তু মনে রাখবেন—একজন সুন্দরী নারী কখনো কখনো অসাবধানতার
কারণেও নিজের ততটাই ক্ষতি করতে পারে,
যতটা সে কোনো দুঃসাহসিক কাজের মাধ্যমে করে।”
পরের দিনই এগ্লে
মানিমনবান্দার সঙ্গে দেখা করলেন, যিনি তাঁকে হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। শৌখিন বাবুরা তাঁর প্রতি তাদের
আদিখ্যেতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল; এবং মহিলারা সবাই তাঁকে
আলিঙ্গন করতে ও অভিনন্দন জানাতে ছুটে এল—এবং আড়ালে আবার তাঁকে ছিঁড়েখুঁড়ে
টুকরো টুকরো করতে শুরু করল।
আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
আমার অসাবধানতার জন্য বারবার একই ভুল হয়েছে। আপনি ঠিকই বলেছেন, উপন্যাসের প্রবাহে এভাবে
ব্র্যাকেটে ইংরেজি শব্দ থাকলে পড়ার মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়। আমি কথা দিচ্ছি, আর এমনটা হবে না।
আপনার নির্দেশমতো একত্রিশতম
অধ্যায়টি ইংরেজি শব্দ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই একদম ঝরঝরে ও সাবলীল বাংলায় সাজিয়ে
দিচ্ছি।
একত্রিশতম
অধ্যায়: মাঙ্গোগুল কি সঠিক ছিলেন?
যেদিন থেকে মাঙ্গোগুল
কুকুফার কাছ থেকে সেই মারাত্মক উপহারটি পেয়েছিলেন, সেদিন থেকেই নারীদের দোষত্রুটি আর হাস্যকর
দিকগুলো তাঁর ঠাট্টা-তামাশার চিরস্থায়ী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি এসব নিয়ে
সারাক্ষণ খোঁচা দিতে থাকতেন, এবং তাঁর প্রিয়তমার ধৈর্য
প্রায়ই বাঁধ ভাঙত। এই বিরক্তিকর অভ্যাসের দুটি নিষ্ঠুর পরিণতি ছিল—তাঁর মেজাজ
খিটখিটে হয়ে যেত, আর স্বভাবটা হয়ে যেত তিক্ত। এমন সময়ে যেই তাঁর সামনে পড়ত, তারই কপাল পুড়ত। তিনি কাউকেই রেহাই দিতেন না, এমনকি
প্রিয়তমা সুলতানাও তাঁর তীরের লক্ষ্য হতেন।
“রাজপুত্র,”
একদিন এমন এক বিরক্তিকর মুহূর্তে মির্জোজা তাঁকে বললেন, “যদিও আপনি অনেক বিষয়েই এত জ্ঞানী, তবুও হয়তো আজকের তাজা খবরটি
আপনার জানা নেই।”
“সেটা কী?”
মাঙ্গোগুল জিজ্ঞেস করলেন।
“সেটা হলো,”
মির্জোজা বললেন, “লোকে বলছে আপনি নাকি প্রতিদিন সকালে ব্রান্টোম
বা উভিলের লেখা থেকে তিন পৃষ্ঠা করে মুখস্থ করেন; এবং তারা ঠিক করতে পারছে না যে এই দুই গভীর
লেখকের মধ্যে আপনি কাকে বেশি পছন্দ করেন।”
“তারা ভুল করছে, ম্যাডাম,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন,
“আমি আসলে ক্বেবিলন পড়ি, যিনি...”
“ওহ, দয়া করে এমন সব বাজে পড়ার
অভ্যাস থেকে নিজেকে ক্ষমা করবেন না,”
প্রিয়তমা বাধা দিলেন। “আমাদের ওপর যেসব নতুন অপবাদ চাপানো হচ্ছে, সেগুলো এতই পানসে যে তার
চেয়ে পুরোনো অপবাদগুলোকে ঝেড়েপুছে নতুন করে চালানোই ভালো। সত্যি বলতে, ওই ব্রান্টোমের লেখায় বেশ কিছু ভালো জিনিস আছে। আপনি যদি তাঁর ছোট
গল্পগুলোর সঙ্গে বেলের লেখার তিন-চারটি অধ্যায় মিশিয়ে দেন, তবে আপনি এক নিমেষেই মার্কুইস ডি— এবং শেভালিয়ার দে মৌহি-র মতো বুদ্ধিমান
হয়ে উঠবেন। এতে আপনার কথাবার্তায় একটা চমৎকার বৈচিত্র্য আসবে। যখন আপনি নারীদের মাথা
থেকে পা পর্যন্ত ধুয়ে দেবেন, তখন আপনি প্যাগোডা বা ধর্মের ওপর চড়াও হতে পারবেন; আর প্যাগোডা থেকে আবার নারীদের কাছে ফিরে আসতে পারবেন। সত্যি বলতে,
আপনাকে পুরোপুরি ‘আনন্দদায়ক’ করে তোলার জন্য যা দরকার, তা হলো ধর্মদ্রোহিতার একটি
ছোট সংগ্রহ।”
“তুমি ঠিক বলেছ, ম্যাডাম,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন,
“এবং আমি তেমন একটি
ভালো সংগ্রহ জোগাড় করার ব্যবস্থাও করব। যে ব্যক্তি ইহকাল এবং পরকাল—উভয় জগতেই বোকা
বনতে চায় না, তাকে
প্যাগোডাদের ক্ষমতা, পুরুষদের সততা এবং নারীদের সতীত্ব
সম্পর্কে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে।”
“তার মানে, আপনার মতে এই সতীত্ব বা
সদ্গুণ ব্যাপারটা খুবই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন?” মির্জোজা জানতে চাইলেন।
“তুমি যা কল্পনা করছ, তার চেয়েও অনেক বেশি,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন।
“রাজপুত্র,”
মির্জোজা পাল্টা বললেন, “আপনি আমাকে শতবার আপনার মন্ত্রীদের সততার বড়াই
করেছেন—বলেছেন
তাঁরা কঙ্গোর সবচেয়ে সৎ লোক। আমি আপনার সেনেশাল, প্রদেশের গভর্নর, সচিব,
কোষাধ্যক্ষ—এক কথায় আপনার সমস্ত কর্মকর্তাদের গুণগান
এতবার ধৈর্য ধরে শুনেছি যে, আমি সেগুলো তোতাপাখির মতো মুখস্থ বলতে পারি। এটা খুবই অদ্ভুত যে,
আপনার ভালোবাসার পাত্রীই একমাত্র সেই ব্যক্তি—যাকে আপনি আপনার
কাছের মানুষ সম্পর্কে যে ভালো ধারণা পোষণ করেন, তার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন।”
“আর কে তোমাকে বলল যে
এমনটাই সত্যি?” সুলতান উত্তর দিলেন। “ম্যাডাম, নিশ্চিত থাকুন যে—আমি নারীদের
সম্পর্কে যেসব কথা বলি, তা সত্য হোক বা মিথ্যা, তোমাকে কোনোভাবেই
স্পর্শ করে না; অবশ্য যদি না তুমি নিজে সেধে গোটা
নারীজাতির প্রতিনিধি হতে চাও।”
“আমি ম্যাডামকে এমন পরামর্শ
দেব না,” সেলিম যোগ করলেন, যিনি এই কথোপকথনে উপস্থিত ছিলেন। “এতে তাঁর লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।”
“আমি,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, “আমার নিজের জাতির বদনাম করে আমাকে দেওয়া কোনো
প্রশংসাই পছন্দ করি না। যখন কেউ আমার প্রশংসা করতে চায়, তখন আমি চাই না যে তার জন্য
অন্য কাউকে ছোট হতে হোক। আমাদের যেসব মিষ্টি মিষ্টি কথা শোনানো হয়, সেগুলো অনেকটা আপনার সেই পাশাদের দেওয়া জমকালো সংবর্ধনার মতো: যেগুলো
আসলে সাধারণ জনগণের পকেট কেটেই আয়োজন করা হয়।”
“ওসব কথা বাদ দাও,”
মাঙ্গোগুল বললেন। “কিন্তু সত্যি করে বলো তো, তুমি কি নিশ্চিত নও যে
কঙ্গোর নারীদের সতীত্ব কেবলই একটি রূপকথা? দয়া করে লক্ষ্য
করো আমার প্রাণের আনন্দ—আজকালকার শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন, মায়েরা তাঁদের মেয়েদের সামনে
কী উদাহরণ স্থাপন করেন, এবং একটি সুন্দরী মেয়ের মাথা
কীভাবে এই ধারণা দিয়ে ঠাসা থাকে যে—সংসার সামলানো, পরিবার দেখাশোনা করা এবং
স্বামীর সঙ্গে সেঁটে থাকা মানেই একঘেয়ে জীবনযাপন করা, ‘ভ্যাপার্স’ বা মূর্ছায় ভোগা এবং নিজেকে জীবন্ত কবর
দেওয়া? আর একই
সময়ে আমরা পুরুষরা এত বেহায়া ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠি, আর
একটি অনভিজ্ঞ তরুণী মেয়ে সহজেই সেই ফাঁদে পা দিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়। আমি বলেছি যে সতী
নারী বিরল, অতি বিরল; এবং আমি
নির্দ্বিধায় যোগ করতে পারি যে—তারা আরও বেশি বিরল না হওয়াটাই আসলে আশ্চর্যের
বিষয়। সেলিমকে জিজ্ঞেস করো সে এ বিষয়ে কী ভাবে।”
“রাজপুত্র,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, “সেলিম আমাদের নারীজাতির কাছে এত বেশি ঋণী যে, সে আমাদের এমন নির্দয়ভাবে
টুকরো টুকরো করতে পারবে না।”
“ম্যাডাম,”
সেলিম বললেন, “মহামান্য সুলতান, যিনি হয়তো কখনো নিষ্ঠুর নারীর পাল্লায় পড়েননি, তাঁর স্বাভাবিকভাবেই নারীজাতি সম্পর্কে এমন ধারণা থাকা উচিত, যেমনটি তাঁর আছে। আর আপনি, যাঁর স্বভাব
অন্যদের নিজের আয়নায় দেখার মতো সুন্দর, আপনার পক্ষে নিজের
মহৎ অনুভূতির বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করা কঠিন। তবে আমি স্বীকার করব যে, আমি বিশ্বাস করতে প্রস্তুত—এমন কিছু বুদ্ধিমতী নারী আছেন, যাঁরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
সতীত্বের উপকারিতা জানেন, এবং যাঁদের গভীর চিন্তাভাবনা
উচ্ছৃঙ্খল জীবনের খারাপ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত করেছে; যাঁরা
ভালো ঘরে জন্মেছেন, সুশিক্ষিত হয়েছেন এবং নিজেদের কর্তব্য
অনুভব করতে শিখেছেন—যাঁরা একে ভালোবাসেন এবং কখনো এর থেকে বিচ্যুত হবেন
না।”
“এবং অনুমাননির্ভর যুক্তিতে
খেই না হারিয়ে,” প্রিয়তমা যোগ করলেন, “এগ্লে কি তাঁর সমস্ত চঞ্চলতা ও
আকর্ষণ নিয়েও সতীত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নন? রাজপুত্র, আপনি এতে
সন্দেহ করতে পারেন না, এবং সমস্ত বানজা শহর আপনার মুখ
থেকেই তা জেনেছে। এখন, যদি একজন সতী নারী থাকে, তবে হাজার হাজারও থাকতে পারে।”
“ওহ! সম্ভাবনার কথা যদি বলো,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “তবে আমি তা নিয়ে তর্ক করছি না।”
“কিন্তু যদি আপনি এটাকে ‘সম্ভব’ বলে স্বীকার
করেন,” মির্জোজা উত্তর দিলেন,
“তবে কে আপনাকে নিশ্চিত
করল যে বাস্তবে তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই?”
“তাদের ‘গোপন রত্ন’ ছাড়া আর কেউ
নয়,” সুলতান উত্তর দিলেন। “এবং তবুও
আমি স্বীকার করছি যে, এই প্রমাণ তোমার যুক্তির শক্তির কাছে কিছুই নয়। আমি যদি কোনো
ব্রাহ্মণের কাছ থেকে এই যুক্তি ধার না করে থাকি, তবে আমি
যেন একটা তিলে পরিণত হই! মানিমনবান্দার ধর্মযাজককে ডেকে পাঠাও, সে তোমাকে বলবে যে—তুমি সতী নারীর অস্তিত্ব ঠিক সেভাবেই
প্রমাণ করেছ, যেভাবে
সে তার ধর্মতত্ত্বে ব্রহ্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। প্রসঙ্গক্রমে, তুমি কি সেরাগ্লিওতে আসার আগে ওই মহান স্কুলে কোনো ক্রাশ কোর্স করেছিলে?”
“বাজে রসিকতা করবেন না,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন। “আমি সম্ভাবনা থেকে সিদ্ধান্ত নিই না; আমি আমার যুক্তিকে একটি
বাস্তব ঘটনা, একটি পরীক্ষার ওপর দাঁড় করাই।”
“হ্যাঁ,”
মাঙ্গোগুল চালিয়ে গেলেন, “একটি মাত্র ঘটনা, একটি ত্রুটিপূর্ণ পরীক্ষার ওপর; যখন আমার মতামতের পক্ষে আমার হাতে অসংখ্য পরীক্ষার ফলাফল আছে। কিন্তু
আমি আর বিরোধিতা করে তোমার মেজাজ খারাপ করব না।”
“এটা একটা বড় দয়া,”
মির্জোজা বললেন, “যে দুই ঘণ্টা ধরে মাথা খাওয়ার পর আপনি অবশেষে
আমাকে রেহাই দিচ্ছেন।”
“যদি আমি ভুল করে থাকি,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “তবে আমি তার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করব।
ম্যাডাম, আমি
আমার অতীতের সমস্ত জয়ের দাবি ছেড়ে দিচ্ছি। এবং যদি আমি ভবিষ্যতে যেসব পরীক্ষা
চালাব, তাতে একজনও সত্যিকারের এবং অবিচল সতী নারীকে খুঁজে
পাই...”
“তাহলে আপনি কী করবেন?”
মির্জোজা চট করে বাধা দিলেন।
“আমি সবার সামনে ঘোষণা করব, যদি তুমি চাও, যে আমি সতী নারীর সম্ভাবনা সম্পর্কে তোমার যুক্তিতে মুগ্ধ হয়েছি;
আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমার যুক্তির খ্যাতি রক্ষা করব;
এবং তোমাকে আমার ‘আমারা দুর্গ’ উপহার দেব—তার ভেতরের সমস্ত স্যাক্সন চীনামাটির
জিনিসপত্র সমেত; এমনকি
সেই ছোট সাপাজু, বা এনামেলের লাল মুখওয়ালা বানর, এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রও বাদ যাবে না, যা আমি মাদাম দে ভেরুয়ের ক্যাবিনেট থেকে পেয়েছি।”
“রাজপুত্র,”
মির্জোজা বললেন, “আমি দুর্গের চীনামাটির জিনিসপত্র এবং ওই ছোট
বানরটি পেলেই খুশি থাকব।”
“চুক্তি হলো তবে,”
সুলতান উত্তর দিলেন, “সেলিম আমাদের বিচারক হবে। তবে এগ্লের রত্ন
পরীক্ষা করার আগে আমি একটু সময় চাই। রাজদরবারের পরিবেশ এবং তার স্বামীর ঈর্ষাকে
কাজ করার জন্য একটু সময় দিতে হবে।”
মির্জোজা মাঙ্গোগুলকে এক
মাস সময় দিলেন; যা
তাঁর প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ ছিল। এবং তাঁরা দুজনেই আশায় বুক বেঁধে বিদায় নিলেন।
বানজা শহরজুড়েও নিশ্চয়ই
পক্ষে-বিপক্ষে বাজির ধুম পড়ে যেত, যদি সুলতানের এই প্রতিশ্রুতির কথা ফাঁস হয়ে যেত। কিন্তু সেলিম গোপনীয়তা
বজায় রাখলেন, এবং মাঙ্গোগুল গোপনে জেতা বা হারার জন্য
প্রস্তুত হতে লাগলেন। যখন তিনি প্রিয়তমার কক্ষ থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন তিনি তাঁর ক্লোসেট বা ছোট ঘর থেকে মির্জোজাকে ডাকতে শুনলেন: “রাজপুত্র, মনে রাখবেন—এবং সেই ছোট
বানরটি কিন্তু!”
“হ্যাঁ, এবং সেই ছোট বানরটিও,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন,
এবং বেরিয়ে গেলেন। তিনি সোজা একজন সিনেটরের ব্যক্তিগত বাগানবাড়ির
দিকে রওনা হলেন, যেখানে আমরা তাঁর সঙ্গে যাব।
বত্রিশতম
অধ্যায়: আংটির পনেরোতম পরীক্ষা — আলফানা
সুলতান জানতেন না যে
দরবারের তরুণ লর্ড বা আমাত্যদের নিজস্ব ব্যক্তিগত লজ (বাগানবাড়ি) আছে; তবে তিনি সম্প্রতি জানতে
পেরেছিলেন যে, সেই সব গোপন আস্তানা বা আশ্রয়স্থলগুলো
কিছু সিনেটরও ব্যবহার করছেন। এতে তিনি যারপরনাই অবাক হয়েছিলেন।
“তারা সেখানে করেটা কী?”
তিনি মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করলেন (কারণ এই খণ্ডেও তিনি সেই
স্বগতোক্তির অভ্যাস বজায় রাখবেন, যা তিনি প্রথম খণ্ডে
শুরু করেছিলেন)। “আমার তো মনে হয়, যে ব্যক্তির হাতে আমি আমার জনগণের শান্তি,
ভাগ্য, স্বাধীনতা এবং জীবন তুলে দিয়েছি,
তাঁর এমন কোনো ব্যক্তিগত লজ থাকা উচিত নয়। তবে হতে পারে একজন
সিনেটরের বাগানবাড়ি একজন শৌখিন বাবুর বাগানবাড়ি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একজন
ম্যাজিস্ট্রেট, যাঁর সামনে আমার সবচেয়ে গণ্যমান্য
প্রজাদের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করা হয়, যাঁর হাতে থাকে
সেই ভাগ্যনির্ধারক পাত্র (Urn) যেখান থেকে তিনি বিধবাদের
নিয়তি তুলে আনেন—তিনি কি তাঁর পদের মর্যাদা এবং কর্তব্যের গুরুত্ব
ভুলে যেতে পারেন? যখন কোচিন (আইনজীবী) নিজের ফুসফুস ফাটিয়ে তাঁর কানে এতিমের কান্না
পৌঁছে দেন, তখন কি তিনি এমন কোনো প্রণয়লীলা নিয়ে মাথা
ঘামাতে পারেন, যা কোনো গোপন ব্যভিচার-কুঠুরির দরজার
শোভাবর্ধন করবে? তা হতেই পারে না।—যাই হোক, চলো দেখা যাক।”
এ কথা বলে তিনি আলকান্তোর
উদ্দেশে রওনা হলেন, যেখানে সিনেটর হিপ্পোমেনিসের ব্যক্তিগত লজটি অবস্থিত ছিল। তিনি সেখানে
প্রবেশ করলেন, কক্ষগুলো ঘুরে দেখলেন এবং আসবাবপত্র
পরীক্ষা করলেন। সবকিছুর মধ্যেই একটা বিলাসী ও আমুদে ভাব ফুটে উঠেছিল। এজিসিলাস—যিনি তাঁর দরবারের
সবচেয়ে শৌখিন ও কামুক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত—তাঁর বাগানবাড়িও এর চেয়ে বেশি জাঁকজমকপূর্ণ
ছিল না।
তিনি কী ভাববেন তা ঠিক করতে
না পেরে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন; (কারণ সেই সব বিলাসবহুল
বিছানা, আয়না-লাগানো ছোট কুঠুরি বা অ্যালকোভ, নরম সোফা, দামি মদের আলমারি এবং অন্য সবকিছুই
ছিল তাঁর প্রশ্নের নীরব কিন্তু স্পষ্ট সাক্ষী); ঠিক তখনই
তিনি একটি সোফার ওপর এক বিশালবপু নারীকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন।
তিনি তাঁর আংটিটি সেই নারীর ওপর ঘোরালেন, এবং তার ‘গোপন রত্ন’ থেকে তিনি
নিচের কাহিনিটি শুনতে পেলেন:
“আলফানা এক সিনেটরের মেয়ে।
যদি তার মা আরেকটু কম দিন বাঁচতেন,
তবে আজ আমাকে এই অবস্থায় থাকতে হতো না। পরিবারের বিপুল সম্পদ ওই
বুড়ি নিজের খেয়ালখুশিতে উড়িয়ে দিয়েছে; এবং সে তার
চার সন্তান—তিন ছেলে এবং এক মেয়ে—তাদের জন্য প্রায় কিছুই রেখে যায়নি।
হায়! আমি সেই মেয়েরই রত্ন, এবং আমার কপালটাই খারাপ—নিশ্চয়ই এটা আমার পাপের ফল। আমি জীবনে
কত অপমান সহ্য করেছি! আরও কত যে সহ্য করতে হবে! লোকে বলত, আলফানার চেহারা আর ভাগ্যের
সঙ্গে মঠের জীবন বা সন্ন্যাসিনী হওয়াই সবচেয়ে ভালো মানায়; কিন্তু আমি দেখলাম ওটা আমার ধাতে সইবে না। আমি সন্ন্যাসী জীবনের চেয়ে
বরং ‘সামরিক শিল্প’ বা যুদ্ধজয়েই বেশি আগ্রহী ছিলাম; তাই আমি আমার প্রথম
অভিযানগুলো শুরু করেছিলাম আমির আজালাফের অধীনে। এরপর মহান নাঙ্গাজাকির অধীনে আমি
নিজেকে আরও পাকা করে তুলেছিলাম। কিন্তু সেই সেবার অকৃতজ্ঞতা আমাকে বিরক্ত করেছিল
এবং আমাকে তলোয়ার ছেড়ে বিচারকের পোশাক গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল। এখন আমি এক
ছোটখাটো, শয়তান সিনেটরের (হিপ্পোমেনিস) অধীনে কাজ করার
চেষ্টা করছি—যে কিনা নিজের মেধা, বুদ্ধি, চেহারা, সাজসজ্জা এবং বংশপরিচয় নিয়ে বেজায়
অহংকারী। আমি এখন দু-ঘণ্টা ধরে তার জন্য অপেক্ষা করছি। নিশ্চিতভাবেই সে আসবে,
কারণ তার ভৃত্য আমাকে জানিয়েছে যে—মানুষকে দীর্ঘক্ষণ
বসিয়ে রাখাটাই হলো তার একধরনের বদভ্যাস বা পাগলামি।”
আলফানার রত্ন যখন এ পর্যন্ত
বলেছে, তখনই
হিপ্পোমেনিস এসে পৌঁছাল। তার সঙ্গীদের হইচই এবং তার প্রিয় গ্রে-হাউন্ড কুকুরটির
প্রতি তার আদরের বহর দেখে আলফানার ঘুম ভেঙে গেল।
“ওহ! তুমি কি এখানে, আমার রানি?” সেই ছোটখাটো প্রেসিডেন্ট
(বিচারপতি) বললেন। “তোমার কাছে আসাটা যে কী কঠিন! আমার এই ছোট কুঠুরিটা
তোমার কেমন লাগছে? এটা অন্যদের মতোই ভালো, তাই না?”
আলফানা একটা লাজুক, ভীতু এবং বিচলিত ভাব ধরলেন—যেন তিনি জীবনে
এর আগে কখনো এমন বাগানবাড়ি দেখেননি,
এবং যেন তাঁর নিজের কোনো কেলেঙ্কারিতে তাঁর কোনো হাতই ছিল না।
রত্নটি ফিসফিস করে টিপ্পনী কাটল। আলফানা শোকাতুর ভঙ্গিতে বললেন: “হায় লর্ড প্রেসিডেন্ট! আমি আপনার
জন্য কী এক অবর্ণনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি! যে আবেগ আমাকে আপনার কাছে টেনে এনেছে তা
নিশ্চয়ই খুব প্রবল, কারণ এটি আমাকে সেই সব বিপদের কথা ভুলিয়ে দিয়েছে যা আমার সামনে ওঁত
পেতে আছে। কারণ, যদি আমার এখানে আসার ব্যাপারে
বিন্দুমাত্র সন্দেহ জাগে, তবে লোকে কী বলবে?”
“আপনি ঠিকই বলেছেন,”
হিপ্পোমেনিস উত্তর দিলেন; “আপনার এই কাজকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।
তবে আপনি আমার বিচক্ষণতার ওপর ভরসা রাখতে পারেন।”
“কিন্তু,”
আলফানা বললেন, “আমি আপনার আচরণের ওপরও ভরসা রাখি।”
“ওহ! সে বিষয়ে,”
হিপ্পোমেনিস বললেন, “আমি খুবই ভদ্র থাকব। আর এমন এক বাগানবাড়িতে
একজন দেবদূতের ভক্ত না হয়ে কি থাকা যায়?
সত্যি বলতে, আপনার ঘাড়টি বড়
মনোমুগ্ধকর...”
“থামুন,”
আলফানা বললেন, “আপনি এখনই আপনার কথা ভাঙছেন।”
“মোটেই না,”
প্রেসিডেন্ট উত্তর দিলেন: “তবে আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি।
এই আসবাবপত্রগুলো সম্পর্কে আপনার কী মত?” এরপর তিনি তাঁর গ্রে-হাউন্ড
কুকুরটির দিকে ফিরে বললেন, “এদিকে এসো ফোলি, তোমার থাবা দাও সোনা। ফোলি খুব লক্ষ্মী মেয়ে।—ম্যাডাম কি
বাগানে একটু ঘুরে আসতে চান? চলুন আমাদের ছাদে গিয়ে হাঁটি, ওটা বেশ মনোরম
জায়গা। আমার কিছু প্রতিবেশী আমাকে দেখতে পেলেও, সম্ভবত
তারা আপনাকে চিনতে পারবে না।”
“আমার লর্ড প্রেসিডেন্ট, আমার ওসব দেখার কোনো কৌতূহল
নেই,” আলফানা
বিরক্ত মুখে বললেন। “আমার মনে হয় আমরা এখানেই ভালো আছি।”
“আপনার যেমন ইচ্ছা,”
হিপ্পোমেনিস উত্তর দিলেন। “যদি আপনি ক্লান্ত বোধ করেন, তবে ওই যে বিছানা আছে। যদি
আপনার সামান্যতম ইচ্ছাও থাকে, তবে আমি আপনাকে ওটা
ট্রায়াল দিয়ে দেখার পরামর্শ দিচ্ছি। তরুণী অ্যাস্টেরিয়া এবং ছোট ফেনিস—যারা এসব
ব্যাপারে বড় জহুরি—আমাকে আশ্বাস দিয়েছে যে ওটা বেশ ভালো বিছানা।”
হিপ্পোমেনিস যখন আলফানার
সঙ্গে এমন সব অভদ্র ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলছিলেন,
তখন তিনি আলফানার হাত ধরে তাঁর গাউন খুলে ফেললেন, বক্ষবন্ধনী শিথিল করলেন, পেটিকোটের ফিতা খুলে
দিলেন এবং তাঁর দুটি বিশাল পা ছোট দুটি চটিজুতো থেকে মুক্ত করলেন।
যখন আলফানা প্রায় নগ্ন
হয়ে পড়লেন, তখন
তাঁর হঠাৎ খেয়াল হলো যে হিপ্পোমেনিস তাঁকে কাপড়চোপড় ছাড়া করছে। “আপনি কী করছেন?”
তিনি একেবারে আকাশ থেকে পড়ে চিৎকার করে উঠলেন। “প্রেসিডেন্ট, আপনি কি কিছুই বিবেচনা করছেন
না? আমি এবার সত্যি সত্যিই রেগে যাব।”
“আহ, আমার রানি,” হিপ্পোমেনিস উত্তর দিলেন,
“যে আপনাকে আমার মতো
ভালোবাসে, তার
ওপর রাগ করাটা এমন এক অদ্ভুত ব্যাপার হবে যা আপনার স্বভাবের সঙ্গে ঠিক যায় না।
আমি কি আপনাকে এই বিছানায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করার সাহস করতে পারি?”
“এই বিছানায়!” আলফানা আঁতকে
উঠে বললেন। “আহ! লর্ড প্রেসিডেন্ট,
আপনি আমার কোমলতার সুযোগ নিচ্ছেন। আমি বিছানায় যাব! আমি—আমি বিছানায়
যাব!”
“না, না, আমার রানি,” হিপ্পোমেনিস উত্তর দিলেন, “ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়, কেউ আপনাকে জোর করে সেখানে
যেতে বলছে না। তবে আপনি যদি চান, তবে নিজেকে সেখানে ‘নিয়ে যেতে’ দিতে হবে:
কারণ আপনার যা আকার, তা দেখে আপনি সহজেই অনুমান করতে পারেন যে—আপনাকে কোলে
করে ওখানে নিয়ে যাওয়ার মতো মনের অবস্থা বা শক্তি আমার নেই।”
তবুও তিনি আলফানার কোমর ধরে
তোলার চেষ্টা করলেন এবং খানিকটা কসরত করে বললেন, “উফ! ও
যে কী ভারী! কিন্তু সোনা আমার, তুমি যদি একটু সাহায্য না করো, তবে আমরা কখনোই
ওখানে পৌঁছাতে পারব না।”
আলফানা বুঝতে পারলেন যে
হিপ্পোমেনিস সত্যি কথাই বলছে। তিনি সাহায্য করলেন, নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন, এবং সেই বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন—যা দেখে তিনি এতক্ষণ ভয় পাওয়ার ভান
করছিলেন। তিনি কিছুটা নিজের পায়ে হেঁটে এবং কিছুটা হিপ্পোমেনিসের কাঁধে ভর দিয়ে
সেখানে পৌঁছালেন। তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন: “নিশ্চিতভাবেই আমি এখানে এসে একটা মস্ত বড়
বোকামি করেছি। আমি আপনার ভদ্র আচরণের ওপর আস্থা রেখেছিলাম, কিন্তু আপনার এই বাড়াবাড়ি
একেবারেই অযৌক্তিক।”
“মোটেই না,”
প্রেসিডেন্ট উত্তর দিলেন, “মোটেই না। আপনি দেখতেই পাচ্ছেন যে আমি যা করছি
তা অত্যন্ত শালীন, খুবই শালীন।”
সম্ভবত তাঁরা এই ধরনের আরও
অনেক ‘ভদ্র’ ও ‘শালীন’ কথাবার্তা
বলেছিলেন; কিন্তু
যেহেতু সুলতান তাঁদের এই অর্থহীন আলাপে আর সময় নষ্ট করাটা সমীচীন মনে করলেন না,
তাই সেই সব মহামূল্যবান বাণী ভবিষ্যতের জন্য হারিয়ে গেল। কী
দুঃখের বিষয়!
তেত্রিশতম
অধ্যায়: আংটির ষোড়শ পরীক্ষা — শৌখিন বাবুদের আসর
সপ্তাহে দুবার প্রিয়তমা
সুলতানা একটি ঘরোয়া জলসার আয়োজন করতেন। আগের দিন সন্ধ্যায় তিনি সেই সব মহিলার
নামের তালিকা দিতেন, যাঁদের তিনি সানন্দে দেখতে চাইতেন; আর সুলতান
ঠিক করতেন কোন কোন পুরুষ সেখানে আমন্ত্রিত হবে। অতিথিরা সব সময় জাঁকজমকপূর্ণ
পোশাকে সেজে আসত।
কথোপকথন কখনো হতো সাধারণ
বিষয় নিয়ে, আবার
কখনো নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নিয়ে। যখন দরবারের প্রেমঘটিত কেলেঙ্কারি বা বাস্তব
রোমাঞ্চকর ঘটনার ভাঁড়ার ফুরিয়ে যেত, তখন তাঁরা নিজেরাই
গল্প বানাতেন। প্রয়োজনে সেসব গল্প কখনো কখনো বেশ কুরুচিকরও হয়ে উঠত; যেগুলোকে তাঁরা ঠাট্টা করে ‘আরব্য রজনীর গল্পের সিক্যুয়েল’ বলতেন। পুরুষদের
পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল তাদের মাথায় যা আসে—সেসব উদ্ভট কথা বলার; আর মহিলারা সেলাই করতে করতে
সেই সব আজগুবি গল্প শুনতেন। এই সভাগুলোতে সুলতান এবং তাঁর প্রিয়তমা প্রজাদের
সঙ্গে একই স্তরে নেমে মিশে যেতেন। তাঁদের উপস্থিতি বিনোদনে কোনো বাধা সৃষ্টি করত
না; এবং খুব কম লোকই এই সময়টাকে একঘেয়ে মনে করত।
মাঙ্গোগুল জীবনের শুরুতেই একটা দামি শিক্ষা পেয়েছিলেন—সিংহাসনের ওপর
বসে সত্যিকারের আনন্দ পাওয়া যায় না;
এবং তাঁর মতো এত সুন্দরভাবে আর কেউ রাজকীয় গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে
সাধারণের কাতারে নামতে জানত না।
সুলতান যখন সিনেটর
হিপ্পোমেনিসের বাগানবাড়ি জরিপ করছিলেন,
তখন মির্জোজা তাঁর গোলাপি রঙের বৈঠকখানায় অপেক্ষা করছিলেন।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন যুবতী জাইদ, প্রফুল্ল লিওক্রিস,
প্রাণবন্ত সেরিকা; দুই আমিরের স্ত্রী
আমিনা ও বেনজাইরা; ‘সতীসাধ্বী’ অর্ফিসা; এবং ভেটুলা—যিনি মহান সেনেশালের
স্ত্রী এবং সমস্ত ব্রাহ্মণদের তথাকথিত মা। মাঙ্গোগুল শীঘ্রই সেখানে হাজির হলেন।
তিনি কাউন্ট হ্যানেটিলন এবং শেভালিয়ার ফাদেস-এর সঙ্গে প্রবেশ করলেন। তাঁদের পিছু
পিছু ঢুকলেন বৃদ্ধ লম্পট আলসিফেনর এবং তাঁর শিষ্য তরুণ মারমোলিন। তার দু-মিনিট
পরেই এসে পৌঁছালেন পাশা গ্রিফগ্রিফ,
আগা ফোর্টিমবেক এবং সেলিক্টার ভেলভেট-পাও। এরা ছিল দরবারের
সবচেয়ে জাঁদরেল ‘শৌখিন বাবু’ বা কেতাদুরস্ত নাগর।
মাঙ্গোগুল ইচ্ছে করেই এদের
সবাইকে একসঙ্গে জড়ো করেছিলেন। এদের মুখে নিজেদের বীরত্বপূর্ণ প্রেমকাহিনির
হাজারটা গালগল্প শোনার পর, তিনি ঠিক করেছিলেন আজ এমনভাবে তথ্য সংগ্রহ করবেন যা ভবিষ্যতের সমস্ত
সন্দেহ দূর করে দেবে।
“আচ্ছা ভদ্রমহোদয়গণ,”
তিনি তাঁদের বললেন, “প্রণয়ের রাজ্যে তো আপনাদের নজর এড়িয়ে কিছুই
ঘটে না, তা
ওখানকার তাজা খবর কী? সেই সব ‘বাচাল রত্ন’রা কত দূর এগোল?”
“হুজুর,”
আলসিফেনর উত্তর দিলেন, “তারা যে হট্টগোল শুরু করেছে তা দিন দিন বাড়ছেই; অবস্থা এমন যে—এভাবে চলতে
থাকলে আমরা শীঘ্রই নিজেদের কথাই নিজেরা শুনতে পাব না। তবে জোবেইদার রত্নটির মতো বেহায়াপনা
আর কেউ করেনি। ওটা তার স্বামীকে তার সব গোপন অভিযানের একটা ফর্দ ধরিয়ে দিয়েছে।”
“এবং সে এক অসাধারণ ফর্দ!” মারমোলিন ফোড়ন
কাটল, “ওতে পাঁচজন আগা, বিশজন ক্যাপ্টেন, প্রায়
একটা গোটা জেনিসারি বাহিনী, এবং বারোজন ব্রাহ্মণের নাম
উল্লেখ করা হয়েছে। লোকে তো বলছে আমার নামও নাকি সেখানে আছে—তবে ওটা নিছকই
একটা রসিকতা।”
“মজার ব্যাপার হলো,”
গ্রিফগ্রিফ যোগ করলেন, “ভীতু স্বামীটা ওই সব শুনে কানে আঙুল দিয়ে
পালিয়ে গেছে।”
“এটা বেশ ভয়ঙ্কর,”
মির্জোজা বললেন।
“হ্যাঁ ম্যাডাম,”
ফোর্টিমবেক মাঝপথে বলে উঠলেন, “ভয়ঙ্কর,
ভয়াবহ, জঘন্য!”
“তার চেয়েও বেশি জঘন্য,”
প্রিয়তমা উত্তর দিলেন, “কেবল শোনা কথায় কান দিয়ে একজন মহিলাকে এভাবে
অসম্মান করা।”
“ম্যাডাম, এটা আক্ষরিক অর্থেই সত্যি,
মারমোলিন গল্পে একটা শব্দও বাড়িয়ে বলেনি,” ভেলভেট-পাও নিশ্চিত করলেন।
“এটা একদম সত্যি,”
গ্রিফগ্রিফ সায় দিলেন।
“তাছাড়া,”
হ্যানেটিলন বললেন, “ইতোমধ্যেই এ নিয়ে একটা ব্যঙ্গাত্মক কবিতা
বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে, আর আগুন না থাকলে তো ধোঁয়া ওড়ে না।”
“কিন্তু মারমোলিনই বা কেন
রত্নদের বকবকানি থেকে রেহাই পাবে?” ভেলভেট-পাও বললেন। “সিনারার রত্ন
তো এবার নিজের পালা বুঝে নিয়ে কথা বলার জন্য জেদ ধরেছে, আর আমাকে এমন সব লোকের সঙ্গে
এক কাতারে মেশাতে চাইছে, যারা তাদের সর্বস্ব বাজি ধরে না।
কিন্তু এটা এড়ানোর উপায় কী? বুদ্ধিমানের কাজ হলো—এতে বিরক্ত
না হওয়া।”
“তুমি ঠিক বলেছ,”
হ্যানেটিলন উত্তর দিলেন, এবং তৎক্ষণাৎ
গুনগুন করে গাইতে শুরু করলেন: “আমার ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন ছিল যে বিশ্বাসই হয়
না...”
“কাউন্ট,”
মাঙ্গোগুল হ্যানেটিলনকে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে আপনি সিনারার সঙ্গে বিশেষভাবে
পরিচিত ছিলেন?”
“হুজুর,”
ভেলভেট-পাও পাশ থেকে উত্তর দিলেন, “কে সন্দেহ করে? কাউন্ট তো এক মাসেরও বেশি
সময় ধরে তার সঙ্গে ঘুরেছেন। তাঁরা গান গেয়েছেন; এবং এই
প্রেমলীলা আজ পর্যন্ত চলত, যদি না কাউন্ট অবশেষে আবিষ্কার
করতেন যে সিনারা মোটেও সুন্দরী নন এবং তাঁর মুখটা বড্ড বড়।”
“স্বীকার করছি,”
হ্যানেটিলন বললেন, “তবে সেই ত্রুটিটুকু তাঁর অসাধারণ কমনীয়তা দিয়ে
পুষিয়ে যেত।”
“এই ঘটনাটি কত দিন আগের?”
অর্ফিসা (সেই ভণ্ড সতী নারী) জানতে চাইলেন।
“ম্যাডাম,”
হ্যানেটিলন উত্তর দিলেন, “সাল-তারিখ আমার স্মৃতিতে নেই। এর জন্য আমাকে
আমার প্রেমজয়ের কালপঞ্জি বা তালিকার আশ্রয় নিতে হবে। সেখানে দিন এবং মিনিট
পর্যন্ত লেখা আছে। তবে ওটা একটা বিশাল মোটা খাতা, যা নিয়ে আমার ভৃত্যরা বাইরের ঘরে বসে নিজেদের
বিনোদন করে।”
“থামো,”
আলসিফেনর বললেন, “আমার মনে আছে, গ্রিফগ্রিফ ম্যাডাম সেনেশালের সঙ্গে ঝগড়া করার
ঠিক এক বছর পরের ঘটনা এটি। গ্রিফগ্রিফের স্মৃতিশক্তি দেবদূতের মতো, সে আপনাকে সঠিক সময়টা বলে দিতে পারবে।”
“আপনার এই তারিখের চেয়ে
মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না,” সেনেশালের স্ত্রী (ভেটুলা)
গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন। “এটা সবাই জানে যে, বোকা লোকেরা কখনোই আমার
পছন্দের তালিকায় ছিল না।”
“তবুও ম্যাডাম,”
আলসিফেনর নাছোড়বান্দার মতো বললেন, “আপনি আমাদের কখনোই এটা বোঝাতে পারবেন
না যে—মারমোলিন
খুব জ্ঞানীর মতো কাজ করত, যখন মহামান্য সেনেশালকে রাজদরবারের কাজে ডাকা হতো, আর ঠিক তখনই তাকে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে আপনার কামরায় নিয়ে যাওয়া হতো।”
“আমার মতে এর চেয়ে বড়
সময়ের অপচয় আর কিছু হতে পারে না,” ভেলভেট-পাও টিপ্পনী কাটলেন,
“কোনো মহিলার কক্ষে
লুকিয়ে প্রবেশ করা, অথচ সেখানে গিয়ে ‘কিছুই না’ করা! কারণ লোকে তার ওই গোপন সাক্ষাৎ
নিয়ে যা ভাবত, তা
কেবলই সত্য ছিল; আর ম্যাডাম ইতিমধ্যেই সেই সততার খ্যাতি
উপভোগ করছিলেন, যা তিনি তখন থেকে আজ পর্যন্ত এত ভালোভাবে
ধরে রেখেছেন।”
“কিন্তু ওটা তো অনেক আগের
কথা,” ফাদেস বললেন। “প্রায় সেই
একই সময়ে জুলিকা সেলিক্টারের কাছ থেকে সরে গিয়েছিল—যে তার বিনয়ী সেবক ছিল—যাতে সে গ্রিফগ্রিফকে
দখল করতে পারে। আবার ছয় মাস পর সে গ্রিফগ্রিফকেও ছেড়ে দেয়; এখন সে ফোর্টিম্বেকের কাছে
এসে ভিড়েছে। আমার বন্ধুর এই ছোটখাটো সৌভাগ্যে আমি মোটেই দুঃখিত নই; আমি মেয়েটিকে দেখি, প্রশংসা করি, কিন্তু কোনো দাবি রাখি না।”
“তবুও জুলিকা মেয়েটি,”
প্রিয়তমা বললেন, “খুবই প্রেমময়ী। তার বুদ্ধি, রুচি এবং তার মুখে এমন কিছু
একটা আছে—যা আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারব না—কিন্তু আমি
সেটাকে আকর্ষণীয় মনে করি; নিছক রূপের চেয়েও ওটা আমার বেশি পছন্দ।”
“আমি তা স্বীকার করি, ম্যাডাম,” ফাদেস উত্তর দিলেন, “কিন্তু সে বড্ড রোগা, তার কোনো গলা বা ঘাড় নেই
বললেই চলে, এবং তার উরু এতই সরু যে দেখলে করুণা হয়।”
“আপনি নিশ্চয়ই এটা খুব
ভালো করে জানেন,” সুলতানা বাঁকা হেসে যোগ
করলেন।
“ওহ! ম্যাডাম,”
হ্যানেটিলন উত্তর দিলেন, “আপনি তা সহজেই অনুমান করতে পারেন। আমি জুলিকার
সঙ্গে খুব কমই দেখা করেছি, তবুও আমি ফাদেসের মতোই ওর শরীরের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানি।”
“সেটা আমি সহজেই বিশ্বাস
করতে পারি,” প্রিয়তমা বললেন।
“কিন্তু
প্রসঙ্গত, গ্রিফগ্রিফকে
জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে,”
সেলিক্টার বললেন, “সে জিরফিলার দখলে কতদিন ধরে আছে। তাকে আপনি নিঃসন্দেহে একজন
সুন্দরী মহিলা বলতে পারেন। তার শরীরের গঠন এককথায় চমৎকার।”
“তাতে
আর সন্দেহ কী!”
মারমোলিন সায় দিলেন।
“সেলিক্টার
কত সুখী,”
ফাদেস বলে চললেন।
“আমি
কিন্তু ফাদেসকেই এগিয়ে রাখব,” সেলিক্টার মাঝপথে
বাধা দিয়ে বললেন, “দরবারের
সেরা ‘সুসজ্জিত’
প্রেমিক হিসেবে ওঁর জুড়ি নেই। আমার জানা মতে, ওঁর দখলে আছে এক উজিরের স্ত্রী, অপেরার দুজন
সবচেয়ে সুন্দরী অভিনেত্রী এবং একজন মনোরম সাধারণ ঘরের মেয়ে—যাকে
উনি ওঁর বাগানবাড়িতে রাখেন।”
“আর
আমি,” ফাদেস উত্তর দিলেন, “আমি ওই উজিরের স্ত্রী, দুজন অভিনেত্রী আর সাধারণ মেয়েটিকে হাসিমুখে ছেড়ে দেব—শুধুমাত্র
একজন বিশেষ মহিলার এক ঝলক দেখার বিনিময়ে, যাঁর সঙ্গে সেলিক্টারের সম্পর্ক খুবই গভীর, অথচ
বেচারির বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে দুনিয়াশুদ্ধ লোক তা জানে;” এই বলে তিনি
লিওক্রিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার ওই লাজুক ভাবটা বড়ই মনমুগ্ধকর।”
“হ্যানেটিলন
দীর্ঘদিন ধরে দোদুল্যমান ছিল,” মারমোলিন বললেন,
“মেলিসা
এবং ফাতিমার মধ্যে। দুজনই সুন্দরী। একদিন সে সুন্দরী মেলিসার পক্ষে থাকত তো পরের
দিন শ্যামাঙ্গী ফাতিমার পক্ষে।”
“বেচারা,” ফাদেস টিপ্পনী
কাটলেন, “খুবই
দোটানায় ছিল: সে কেন দুজনকেই বেছে নিল না?”
“সে
তাই করেছিল,”
আলসিফেনর ফোড়ন কাটলেন।
আমাদের শৌখিন বাবুরা,
যেমনটি আপনারা দেখছেন, থামার পাত্র
ছিলেন না। ঠিক তখনই জোবেইদা, সিনারা, জুলিকা, মেলিসা, ফাতিমা
এবং জিরফিলা—এই মহিলারা আসরে উপস্থিত হলেন। এই অসময়ের আগমন তাঁদের এক মুহূর্তের
জন্য বিচলিত করেছিল বটে; কিন্তু তাঁরা
দ্রুত সেই অস্বস্তি কাটিয়ে উঠলেন এবং অন্য নারীদের নিন্দায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন—যাঁদের
বদনাম এতক্ষণ করা হয়নি শুধু সময়ের অভাবেই।
মিরজোজা তাঁদের এসব কথায় অধৈর্য হয়ে
বললেন: “ভদ্রমহোদয়গণ,
আপনাদের যোগ্যতা এবং সততার কথা বিবেচনা করে নিঃসন্দেহে এটা
স্বীকার করতেই হবে যে—আপনারা যেসব সৌভাগ্যের বড়াই করছেন,
তা সত্যিই আপনারা উপভোগ করেছেন। তবুও আমাকে স্বীকার করতেই হচ্ছে,
আমি এ বিষয়ে এই উপস্থিত নারীদের ‘গোপন রত্ন’গুলোর
জবানবন্দি শুনতে খুব আগ্রহী। এবং আমি ব্রহ্মাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাব,
যদি তিনি তাদের মুখ দিয়ে সত্যের প্রতি ন্যায়বিচার করতে রাজি হন।”
“তার
মানে,” হ্যানেটিলন উত্তর দিলেন, “ম্যাডাম একই কথা দুবার শুনতে চাইছেন: ঠিক আছে,
তাঁকে খুশি করার জন্য আমরা নাহয় সেই গল্পগুলোই আবার শুনব।”
কিন্তু মাঙ্গোগুল জ্যেষ্ঠতার ক্রম
অনুসারে তাঁর আংটি প্রয়োগ করতে শুরু করলেন। তিনি শুরু করলেন সেনেশালের স্ত্রী
(ম্যাডাম লা সেনেশাল)-কে দিয়ে। তাঁর রত্নটি তিনবার খকখক করে কেশে উঠল,
এবং তারপর কাঁপানো ও ভাঙা গলায় বলল:
“আমার
যৌবনের প্রথম আনন্দের জন্য আমি মহান সেনেশালের কাছে ঋণী। কিন্তু আমি তাঁর সম্পত্তি
হিসেবে মাত্র ছয় মাস ছিলাম। তারপর এক তরুণ ব্রাহ্মণ আমার মালকিনকে বোঝালেন যে—একজন
স্ত্রী তাঁর স্বামীর কোনো ক্ষতি করে না, যতক্ষণ সে মনে মনে স্বামীর কথাই ভাবে। আমি এই নীতিটি খুব পছন্দ করলাম।
তারপর থেকে আমি নিরাপদে একজন সিনেটর, তারপর এক প্রিভি
কাউন্সিলর, তারপর এক পন্টিফ, তারপর
এক-দুজন উচ্চপদস্থ আমলা, এবং শেষে একজন সঙ্গীতজ্ঞকে গ্রহণ
করতে পেরেছি...”
“আর
মারমোলিন?”
ফাদেস পাশ থেকে প্রশ্ন ছুড়লেন।
“মারমোলিন?” রত্নটি উত্তর দিল,
“আমি
তাকে চিনি না; অবশ্য যদি না সে
ওই তরুণ অহংকারী ছোকরাটা হয়—যাকে আমার মালকিন
কিছু বেয়াদবির জন্য বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন। সে কী
বেয়াদবি করেছিল, তার বিস্তারিত আমি
ভুলে গেছি।”
এবার সিনারার রত্ন কথা বলা শুরু করল: “আপনারা কি
আমাকে আলসিফেনর, ফাদেস এবং
গ্রিফগ্রিফ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছেন? আমি সত্যিই বেশ ভালো
ভালো মানুষের সেবা পেয়েছি; কিন্তু এই প্রথম আমি এই
লোকগুলোর নাম শুনলাম। তবে, আমি আমির আমালেক, ফিন্যান্সিয়ার টাইলেনর, বা উজির আবদিরামের
কাছ থেকে এদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে পারি—যাঁরা পুরো দুনিয়াকে
চেনেন এবং আমার খুব ভালো বন্ধু।”
“সিনারার
রত্নটি দেখছি খুব বিচক্ষণ,”
হ্যানেটিলন আমতা আমতা করে বললেন, “এটি জারাফিস,
আহিরাম, বৃদ্ধ ট্রেবিস্টার এবং তরুণ
মাহমুদের নাম উল্লেখই করছে না—যাঁদের ভোলা অসম্ভব; এমনকি এটি সামান্যতম কোনো ব্রাহ্মণের নামও নিচ্ছে না, যদিও এটি গত বারো বছর ধরে মঠগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
“আমি
আমার জীবনে কিছু পুরুষের ছোঁয়া পেয়েছি ঠিকই,” মেলিসার রত্ন বলে
উঠল, “কিন্তু
গ্রিফগ্রিফ বা ফোর্টিম্বেকের কাছ থেকে একবারও নয়,
এবং হ্যানেটিলনের কাছ থেকে তো আরও নয়।”
“আমার
রত্নের ছোট্ট কলিজা,”
গ্রিফগ্রিফ নির্লজ্জের মতো উত্তর দিলেন, “তুমি ভুল করছ। তুমি
ফোর্টিম্বেক এবং আমাকে অস্বীকার করতে পারো, কিন্তু হ্যানেটিলনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। সে তোমার সঙ্গে তোমার
ধারণার চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ। সে আমাকে এ বিষয়ে এক-দুটি কথা বলেছে, এবং সে কঙ্গোর সবচেয়ে সত্যবাদী প্রেমিক—তুমি যাদের চিনেছ তাদের
সবার চেয়ে ভালো মানুষ, এবং এখনো সে তোমার
রত্নের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম।”
“একজন
ধড়িবাজ প্রতারকের খ্যাতি তার বন্ধু ফাদেসের মতো তার কাছ থেকেও পালাতে পারে না,” ফাতিমার রত্ন
কাঁদতে কাঁদতে বলল। “এই দানবদের কাছে নিজেকে অসম্মানিত করার জন্য আমি কী করেছি?
আবিসিনিয়ান সম্রাটের পুত্র এর্গেবজেডের দরবারে এসেছিলেন: আমি
তাঁকে খুশি করেছিলাম; তিনি আমাকে চেয়েছিলেন; কিন্তু তিনি সফল হতে পারতেন না, এবং আমি আমার
স্বামীকেই বিশ্বস্ত থাকতাম—যাঁকে আমি ভালোবাসতাম;
যদি না ওই বিশ্বাসঘাতক ভেলভেট-পাও এবং তার নিচ সহযোগী ফাদেস আমার
দাসীদের ঘুস দিয়ে হাত করত, এবং ওই তরুণ রাজপুত্রকে গোপনে
আমার স্নানাগারে ঢুকিয়ে দিত।” (অর্থাৎ ফাদেস আর
ভেলভেট-পাও প্রেমিক ছিল না, ছিল দালাল!)
জিরফিলা এবং জুলিকার রত্ন,
যাদের একই স্বার্থ রক্ষার ছিল, তারা একই
সময়ে কথা বলে উঠল। কিন্তু তারা এত দ্রুত কথা বলছিল যে তাদের প্রত্যেকের কথা আলাদা
করা কঠিন ছিল।
“দোহাই
আপনাদের!” একজন চিৎকার করে উঠল। “ওই ভেলভেট-পাওকে বিশ্বাস করবেন না!”
অন্যজন বলে উঠল। “জিনজিমের
কথা আলাদা...” “সেরবেলন...”
“বেমেঙ্গেল...”
“আগারিয়াস...”
“ফরাসি
দাস রিকুয়েলি...” “তরুণ
ইথিওপিয়ান থেজাকা...” “কিন্তু
ওই বিস্বাদ ভেলভেট-পাও...” “ঔদ্ধত্যপূর্ণ
ফাদেস...” “আমি
ব্রহ্মার দিব্যি কেটে বলছি...” “আমি
মহান প্যাগোডা এবং জিনিয়াস কুকুফাকে সাক্ষী মানছি...”
“আমি
ওদের চিনি না...” “আমার
ওদের সঙ্গে কখনোই কোনো সম্পর্ক ছিল না।”
জিরফিলা এবং জুলিকা যে আরও কতক্ষণ
বকবক চালিয়ে যেত তা ঈশ্বরই জানেন, যদি
না মাঙ্গোগুল তাঁর আংটি ঘুরিয়ে নিতেন। কিন্তু এই জাদুর আংটি তাদের ওপর কাজ করা
বন্ধ করতেই, তাদের রত্নগুলো মুখে কুলুপ আঁটল, এবং সেই হট্টগোলের পর ঘরে এক গভীর নীরবতা নেমে এল।
তারপর সুলতান উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সেই
তরুণ বোকাদের দিকে আগুনের মতো দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন: “তোমরা এমন সব নারীর
বদনাম করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছ, যাদের
ধারেকাছে যাওয়ার যোগ্যতাও তোমাদের কোনোদিন হয়নি, এবং যারা
হয়তো তোমাদের নামটুকুও জানে না। কে তোমাদের এত সাহস দিল যে তোমরা আমার সামনে
দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলবে? কাঁপতে থাকো, হতভাগারা!”
এই কথা বলে তিনি তাঁর তলোয়ারে হাত
দিলেন: কিন্তু ভীত নারীদের আর্তনাদে তাঁর হাত থেমে গেল।
“আমি
যাচ্ছিলাম তোমাদের প্রাপ্য মৃত্যুদণ্ড দিতে,” মাঙ্গোগুল বললেন,
“কিন্তু
যেসব নারীকে তোমরা আঘাত করেছ, আজ
তোমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করার অধিকার কেবল তাদেরই। এটা তাদের ওপর নির্ভর করবে—তোমাদের
পিষে ফেলা, নাকি তোমাদের
বাঁচতে দেওয়া। বলুন মহিলারা, আপনাদের আদেশ কী?”
“ওরা
বেঁচে থাকুক,”
মির্জোজা বললেন, “এবং যদি সম্ভব হয়, তবে যেন চুপ থাকে।”
“বেঁচে
থাক তবে,”
সুলতান রায় দিলেন, “এই মহিলারা তোমাদের অনুমতি দিচ্ছেন। কিন্তু যদি তোমরা কখনো
ভুলে যাও কোন শর্তে তোমাদের প্রাণভিক্ষা দেওয়া হলো, তবে আমি আমার পিতার আত্মার শপথ করে বলছি...”
মাঙ্গোগুল তাঁর শপথ শেষ করতে পারলেন
না; তাঁর শয়নকক্ষের একজন ভদ্রলোক এসে তাঁকে
বাধা দিয়ে জানালেন যে অভিনেতারা প্রস্তুত। এই রাজপুত্র নিজের ওপর একটি নিয়ম জারি
করেছিলেন যে—তিনি কখনোই জনসমক্ষে কোনো বিনোদন বা অনুষ্ঠান বিলম্বিত করবেন না।
“তাদের
শুরু করতে বলো,”
তিনি বললেন, এবং অবিলম্বে তাঁর হাত
প্রিয়তমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন, যাঁকে তিনি সসম্মানে তাঁর
রাজকীয় বক্সে নিয়ে গেলেন।
চৌত্রিশতম
অধ্যায়: আংটির সপ্তদশ পরীক্ষা — কমেডি বা প্রহসন
যদি কঙ্গোতে ভালো আবৃত্তির
কদর বা রুচি থাকত, তবে হয়তো কিছু অভিনেতার চাকরি যেত। কিন্তু ত্রিশ জনের ওই নাট্যদলে
মাত্র একজন মহান অভিনেতা এবং দুজন মোটামুটি মানের অভিনেত্রী ছিল। লেখকদের
প্রতিভাকে বাধ্য হয়েই সাধারণ মানের সঙ্গে আপস করতে হতো। অভিনেতাদের ত্রুটিগুলোর
কথা মাথায় রেখে চরিত্র তৈরি না করলে কোনো নাটক সফল হওয়ার আশা ছিল না। আমার সময়ে
মঞ্চের রীতিনীতি এমনই ছিল। আগে অভিনেতারা নাটকের জন্য তৈরি হতেন; কিন্তু এখন নাটকগুলো তৈরি হয় অভিনেতাদের জন্য। যদি আপনি একটি নতুন
নাটক জমা দিতেন, তবে এটা নিশ্চিতভাবেই পরীক্ষা করা হতো যে—বিষয়বস্তু
আকর্ষণীয় কি না, কাহিনি জমাট কি না, চরিত্রগুলো জোরালো কি না
এবং সংলাপ সাবলীল কি না: কিন্তু যদি তাতে বিখ্যাত অভিনেতা রসিয়াস এবং অভিনেত্রী
আমিয়ানার জন্য কোনো জুতসই ভূমিকা না থাকত, তবে তা সঙ্গে
সঙ্গেই বাতিল করা হতো।
সুলতানের বিনোদনের
দায়িত্বে থাকা কিসলার আগাসি (প্রধান খোজা) যেখান থেকে পেরেছিলেন, একদল অভিনেতাকে জোগাড়
করেছিলেন। আজ সেরাগ্লিও বা রাজপ্রাসাদে একটি নতুন বিয়োগান্তক নাটক (Tragedy)-এর প্রথম প্রদর্শনী। এটি একজন আধুনিক লেখকের রচনা, যাঁর খ্যাতি এতটাই ছিল যে—তিনি যদি একগাদা আবর্জনাই লিখে আনতেন, তবুও তা নিশ্চিতভাবে সাদরে
গৃহীত হতো। কিন্তু তিনি তাঁর প্রতিভার অপচয় করেননি। তাঁর নাটকটি চমৎকার লেখা ছিল,
দৃশ্যগুলো নিপুণভাবে সাজানো, ঘটনাপ্রবাহ
চাতুর্যের সঙ্গে পরিচালিত, এবং চরিত্রগুলোর আবেগ ক্রমশ
বিকশিত হচ্ছিল। দর্শকরা টানটান উত্তেজনায় পরবর্তী দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করছিল এবং
যা দেখছিল তাতেই মুগ্ধ হচ্ছিল। নাটকটি এই সেরা সৃষ্টির চতুর্থ অঙ্কে পৌঁছেছিল;
একটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য চলছিল, যা দর্শকদের আরও গভীর আবেগের জন্য প্রস্তুত করছিল। ঠিক তখনই মাঙ্গোগুল,
নাটকের ওইসব ন্যাকা-কান্না বা অতিরিক্ত আবেগী অংশ শোনার
বিড়ম্বনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে, পকেট থেকে তাঁর চশমা (Opera-glass)
বের করলেন এবং অমনোযোগী হওয়ার ভান করে বিভিন্ন বক্সে বসা
দর্শকদের জরিপ করতে লাগলেন।
সামনের সারির একটি বক্সে
তিনি একজন মহিলাকে দেখলেন, যিনি ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন; কিন্তু
তাঁর সেই আবেগ নাটকের ঘটনার সঙ্গে খুব একটা খাপ খাচ্ছিল না, বরং মনে হচ্ছিল অসময়ে বা ভুল জায়গায় তিনি আবেগ দেখাচ্ছেন। মাঙ্গোগুল
তৎক্ষণাৎ তাঁর আংটিটি সেই মহিলার দিকে তাক করলেন। মঞ্চে যখন সবচেয়ে করুণ সংলাপ
চলছে, ঠিক তখনই একটি রত্ন হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস নেওয়ার
ফাঁকে ফাঁকে অভিনেতাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল:
“আহ!—আহ!—দয়া
করে থামুন, অর্গোগ্লি;—আপনি আমাকে একেবারে গলিয়ে দিচ্ছেন—আহ!—আহ!—উফ! এটা আর সহ্য করা যাচ্ছে না।”
দর্শকরা এই অদ্ভুত স্বর
শুনে চমকে উঠল এবং যেখান থেকে আওয়াজটা আসছিল সেদিকে তাকাল। দর্শকাসনের (Pit) পেছনের সারিতে কানাঘুষা
শুরু হয়ে গেল যে—এটি কোনো মানুষের গলা নয়, একটি ‘গোপন রত্ন’ কথা বলছে।
“কার রত্ন?”
একজন জিজ্ঞেস করল, “আর ওটা কী বলল?” উত্তরের অপেক্ষা না করেই চারদিক থেকে হাততালি আর চিৎকারের রোল উঠল: “এনকোর! এনকোর!” (মানে, আবার হোক!)
লেখক, যিনি পর্দার আড়ালে
দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি ভয়ে অস্থির হয়ে উঠলেন—পাছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত
ঘটনা তাঁর নাটকের বারোটা বাজায়! তিনি রাগে ফেটে পড়লেন এবং রত্নদের পুরো জাতটাকে নরকের
আগুনে (বেলজেবুবের কাছে) পাঠিয়ে দেওয়ার অভিশাপ দিলেন।
হট্টগোল ছিল বিশাল এবং
দীর্ঘস্থায়ী; এবং
যদি সুলতানের প্রতি সম্মান দেখানোর বাধ্যবাধকতা না থাকত, তবে
নাটকটি ওখানেই পণ্ড হয়ে যেত। কিন্তু মাঙ্গোগুল হাত ইশারায় নীরবতার আদেশ দিলেন;
অভিনেতারা আবার তাদের অভিনয় শুরু করল এবং কোনোমতে নাটকটি শেষ
করল।
সুলতান এমন একটি প্রকাশ্য
ঘোষণার পরিণতি কী হয় তা জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। তিনি আদেশ দিলেন ওই
রত্নটির মালকিনের ওপর নজর রাখতে। শীঘ্রই তাঁকে খবর দেওয়া হলো যে, ওই অভিনেতা (অর্গোগ্লি) নাটক
শেষ করেই সোজা এরিফিলা নামের সেই ভদ্রমহিলার বাড়িতে যাবে। মাঙ্গোগুল তাঁর আংটির
জাদুবলে অভিনেতার আগেই সেখানে পৌঁছে গেলেন, এবং অর্গোগ্লি
যখন তার নাম ঘোষণা করছিল, তখন তিনি এরিফিলার শোবার ঘরেই
উপস্থিত ছিলেন।
এরিফিলা প্রস্তুত ছিলেন; অর্থাৎ, তিনি একটি ঢিলেঢালা কিন্তু আবেদনময়ী পোশাক (Dishabille) পরে অলসভাবে একটি সোফায় শুয়ে ছিলেন। সেই কৌতুকাভিনেতা বা ভাঁড় একজন
বিশ্বজয়ী বীরের মতো গম্ভীর, অহংকারী এবং কিছুটা নির্বোধ
ভঙ্গিতে ঘরে প্রবেশ করল। বাম হাতে সে একটি সাদা পালক লাগানো সাধারণ টুপি ঘোরাচ্ছিল,
এবং ডান হাতের আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের নাক ও উপরের ঠোঁট আলতো করে
ঘষছিল—যা ছিল একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রশংসিত নাট্যভঙ্গি। তার অভিবাদন
ছিল অশ্বারোহী সৈনিকের মতো চটপটে, এবং তার প্রশংসা ছিল অতি-ঘনিষ্ঠ।
“ওহ! আমার রানি,”
সে এরিফিলার দিকে ঝুঁকে এক ধরনের মেকি বা ঢং করা স্বরে বলল,
“আপনাকে কী দারুণ
দেখাচ্ছে! আপনি কি জানেন যে এই অগোছালো পোশাকেও আপনি কতটা মনমুগ্ধকর?”
এই নিচু শ্রেণীর লোকটার এমন
সুর মাঙ্গোগুলকে হতভম্ব করে দিল। রাজপুত্র তরুণ ছিলেন, এবং সম্ভবত সমাজের নিচু তলার
কিছু অদ্ভুত রীতিনীতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা কম ছিল।
“তাহলে তুমি আমাকে পছন্দ
করো, আমার প্রিয়?” এরিফিলা গদগদ হয়ে উত্তর
দিলেন।
“আনন্দের সঙ্গে, আমি আপনাকে বলছি।”
“এটা শুনে আমার দারুণ আনন্দ
হচ্ছে। আমি চাই তুমি সেই বিশেষ সংলাপটি আবার আবৃত্তি করো, যা কিছুক্ষণ আগে আমার মধ্যে
এমন তীব্র আবেগ জাগিয়েছিল। ওই যে সেই অংশটা—হ্যাঁ—ওটাই—উফ! কী প্রলোভনকারী বদমাশ তুমি!—থামো না, চালিয়ে যাও; এটা আমাকে অদ্ভুতভাবে নাড়া দেয়।”
এই কথাগুলো বলার সময়, এরিফিলা তাঁর ‘নায়ক’-এর দিকে এমন
এক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন যা সব কিছু স্পষ্ট করে দিল, এবং নিজের হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিলেন—যা সেই অভদ্র
অর্গোগ্লি তার মুক্তির সনদ হিসেবে চুমু খেল। সে এরিফিলাকে জয় করার চেয়ে নিজের অভিনয়ের
জাদুতে বেশি গর্বিত হয়ে উঠল, এবং সজোরে আবৃত্তি শুরু করল। ভদ্রমহিলা এতটাই মোহিত হয়ে পড়েছিলেন যে,
এক মুহূর্ত তিনি তাকে চালিয়ে যেতে বলছিলেন, তো পরের মুহূর্তেই থামতে বলছিলেন।
মাঙ্গোগুল এরিফিলার হাবভাব
দেখে বুঝলেন যে, তাঁর
‘গোপন রত্ন’টিও এই মহড়ায় বা রিয়ার্সেলে স্বেচ্ছায় অংশ
নিতে যাচ্ছে। তাই তিনি সেখানে উপস্থিত থাকার চেয়ে বাকি দৃশ্যটা অনুমান করে
নেওয়াই শ্রেয় মনে করলেন। তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং প্রিয়তমার কাছে ফিরে এলেন, যিনি তাঁর জন্য অপেক্ষা
করছিলেন।
সুলতান তাঁকে পুরো অভিযানের
বিবরণ দেওয়ার পর মির্জোজা চিৎকার করে উঠলেন: “রাজপুত্র,
আপনি কী বলছেন? তাহলে নারীরা নিচতার
একেবারে তলানিতে নেমে গেছে! একজন সামান্য কৌতুকাভিনেতা, একজন
জনগণের দাস! একটা ভাঁড়! ঠিক আছে, যদি এদের বিরুদ্ধে কেবল
এদের পেশা বা সামাজিক অবস্থান ছাড়া আর কোনো অভিযোগ না থাকত: কিন্তু এদের বেশির
ভাগের তো কোনো নীতি বা অনুভূতিই নেই; এমনকি তাদের মধ্যেও
এই অর্গোগ্লি তো কেবল একটা যন্ত্র। সে জীবনে কখনো নিজের মগজ দিয়ে চিন্তা করেনি;
এবং যদি সে তোতাপাখির মতো নাটকের সংলাপ মুখস্থ না করত, তবে সম্ভবত সে জীবনে কখনো কথাই বলতে পারত না।”
“আমার হৃদয়ের আনন্দ,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “তুমি পুরো বিষয়টা যথেষ্ট বিবেচনা না করেই বিলাপ
করছ। তুমি কি হারিয়ার সেই কুকুরগুলোর কথা ভুলে গেছ? জুপিটারের দিব্যি, আমার
তো মনে হয়—একটা পাগ-কুকুরের চেয়ে একজন কৌতুকাভিনেতা অন্তত
একটু ভালো।”
“আপনি ঠিক বলেছেন, রাজপুত্র,” প্রিয়তমা মেনে নিলেন। “আমি এমন সব
প্রাণীর জন্য নিজেকে উদ্বিগ্ন করে ভুল করছি,
যারা এর যোগ্যই নয়। পালাব্রিয়া তার বেবুনদের পূজা করুক! সালিকা
তার ‘ভ্যাপার্স’ বা মূর্ছা রোগের চিকিৎসা ফারফাদির কাছে তার নিজের
কায়দায় করাক! হারিয়া তার কুকুরদের পালের মধ্যে বাঁচুক আর মরুক! আর এরিফিলা
কঙ্গোর সমস্ত ভাঁড়দের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিক! এসবে আমার কী আসে যায়? আমি এর দ্বারা শুধু শুধু
একটা ‘দুর্গ’ (আমারা দুর্গ) হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছি। না, আমি বুঝতে পারছি যে আমাকে
এসব নিয়ে ভাবলে চলবে না; এবং আমি সেই অনুযায়ী আমার
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।”
“তাহলে বিদায়, আমার ছোট্ট বানর,” মাঙ্গোগুল মির্জোজাকে খেপিয়ে
বললেন (বাজির শর্ত মনে করিয়ে দিয়ে)।
“বিদায়, ছোট্ট বানর,” মির্জোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে
উত্তর দিলেন; “এবং
আমার নিজের নারীজাতি সম্পর্কে আমার যে উচ্চ ধারণা ছিল, আমার মনে হয় আমি তা আর
কোনোদিন ফিরে পাব না। রাজপুত্র, আপনি আমাকে অন্তত আগামী
পনেরো দিনের জন্য আমার এই দরজায় কোনো নারীকে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অনুমতি দিন।”
“কিন্তু তোমার তো কিছু সঙ্গ
দরকার,” সুলতান চিন্তিত হয়ে বললেন।
“আমি আপনার সঙ্গ উপভোগ করব, অথবা আপনার আসার অপেক্ষায়
নিজেকে আনন্দিত রাখব,” প্রিয়তমা উত্তর দিলেন: “এবং যদি আমার হাতে কিছু বাড়তি সময় থাকে, তবে আমি রিকারিক এবং সেলিমকে
ডেকে পাঠাব, যারা আমার প্রতি অনুগত এবং যাদের কথাবার্তা
আমি পছন্দ করি। যখন আমার ওই লেকচারার বা অধ্যাপকের পাণ্ডিত্য আমার কাছে একঘেয়ে
মনে হবে, তখন আপনার ওই সভাসদ তাঁর যৌবনের রোমাঞ্চকর গল্প দিয়ে
আমাকে বিনোদন দেবেন।”
পঁয়ত্রিশতম
অধ্যায়: সাহিত্য নিয়ে কথোপকথন
প্রিয়তমা মির্জোজা নিজে
পণ্ডিত সাজার ভান না করলেও, তিনি প্রতিভাবান পুরুষদের সঙ্গ ভীষণ পছন্দ করতেন। তাঁর প্রসাধন টেবিলে
হীরা-জহরত আর প্রসাধনী সামগ্রীর ফাঁকে ফাঁকে সমসাময়িক উপন্যাস আর পুস্তিকাও
ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যেত, এবং তিনি সেগুলো নিয়ে
চমৎকার আলোচনা করতে পারতেন। তিনি অনায়াসে জুয়ার টেবিল (কাভানোল বা বিরিবি) ছেড়ে
একজন শিক্ষাবিদ বা পণ্ডিতের মতো গভীর আলোচনায় ডুবে যেতে পারতেন। আর সবাই একবাক্যে
স্বীকার করত যে, তাঁর বুদ্ধির স্বাভাবিক ধার তাঁকে
বিভিন্ন রচনায় এমন সব সৌন্দর্য বা খুঁত ধরতে সাহায্য করত, যা অনেক সময় বড় বড় পণ্ডিতদেরও নজর এড়িয়ে যেত।
মির্জোজা তাঁর অন্তর্দৃষ্টি
দিয়ে তাঁদের বিস্মিত করতেন, প্রশ্নবাণে বিব্রত করতেন; কিন্তু তাঁর রূপ ও
বুদ্ধি তাঁকে যে বাড়তি সুবিধা দিত, তিনি কখনোই তার
অপব্যবহার করতেন না। তাই তাঁর কাছে তর্কে হেরে গিয়েও কেউ দুঃখ পেত না।
একদিন শেষ বিকেলে, যখন তিনি মাঙ্গোগুলের সঙ্গে
সময় কাটাচ্ছিলেন, তখন সেলিম সেখানে এলেন এবং মির্জোজা
রিকারিককে ডেকে পাঠালেন।
আফ্রিকান লেখক সেলিমের
চরিত্রচিত্রণ অন্য কোনো সময়ের জন্য তুলে রেখেছেন। কিন্তু রিকারিক সম্পর্কে তিনি
আমাদের জানাচ্ছেন যে—রিকারিক ছিলেন কঙ্গো একাডেমির একজন সদস্য। তাঁর অগাধ
পাণ্ডিত্য অবশ্য তাঁকে একজন বুদ্ধিমান মানুষ হওয়া থেকে আটকাতে পারেনি। তিনি প্রাচীন
যুগ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছিলেন;
তিনি ছিলেন প্রাচীন নিয়মকানুন বা ব্যাকরণের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত
এবং কথায় কথায় সেগুলো উদ্ধৃত করতেন। তিনি ছিলেন নিয়মের দ্বারা চালিত এক
যন্ত্রবিশেষ। এবং তিনি কঙ্গোর আদি লেখকদের, বিশেষ করে
মিরুফলারের এক গোঁড়া ভক্ত ছিলেন। এই মিরুফলার প্রায় ৩০৪০ বছর আগে কাফ্রিয়ান ভাষায়
এক মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, যার বিষয়বস্তু ছিল—কীভাবে কাফ্রিরা
একটি বিশাল বন থেকে বানরদের তাড়িয়ে সেই বন দখল করেছিল, যারা অনাদিকাল থেকে সেখানে
বসবাস করছিল। রিকারিক এই মহাকাব্যটি কঙ্গো ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন এবং টীকা-টিপ্পনী,
ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন পাঠভেদ যোগ করে এর একটি অতি সুন্দর সংস্করণ
প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়াও, তিনি ব্যাকরণের সব নিয়ম মেনে
দুটি অত্যন্ত জঘন্য বিয়োগান্তক নাটক (Tragedy), কুমিরদের
প্রশংসায় একটি প্রবন্ধ এবং কিছু অপেরা বা গীতিনাট্য লিখেছিলেন।
“ম্যাডাম, আমি আপনার জন্য একটি উপন্যাস
এনেছি,” রিকারিক
মাথা নিচু করে বিনীতভাবে বললেন, “যা মূলত মার্কুইস তামাজির নামে বাজারে চলছে; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা
এতে মুলহাজেনের হাতের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এ ছাড়াও এনেছি আমাদের সভাপতি
ল্যাম্বাদাগোর সেই বক্তৃতার উত্তর—যা কবি টুক্সিগ্রাফাস গতকাল আমাদের
পাঠিয়েছেন; এবং
সবশেষে এনেছি এই ‘টেমারলান’ নাটকটি।”
“অসাধারণ!” মাঙ্গোগুল
বললেন। “ছাপাখানা তো দেখছি বিরামহীন চলছে! যদি কঙ্গোর স্বামীরা লেখকদের মতো এমন
উৎসাহ নিয়ে তাদের ‘কর্তব্য’ পালন করত, তবে দশ বছরেরও কম সময়ে আমি
ষোল লক্ষ পদাতিক সৈন্য তৈরি করে ফেলতে পারতাম এবং মোনোয়েমুগির বিজয় নিশ্চিত করতে
পারতাম। যা হোক, উপন্যাসটা আমরা অবসর সময়ে পড়ব। এখন বরং
ওই বক্তৃতাটা দেখা যাক, বিশেষ করে যে অংশটুকু আমার সঙ্গে
সম্পর্কিত।”
রিকারিক পাতা উল্টে সেই
বিশেষ অনুচ্ছেদটি বের করলেন এবং পড়ে শোনালেন: “আমাদের মহান সম্রাটের পূর্বপুরুষরা নিঃসন্দেহে
নিজেদের মহিমান্বিত করেছিলেন। কিন্তু মাঙ্গোগুল, তাঁদের চেয়েও বহুগুণে মহান, ভবিষ্যতের যুগের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশংসার ক্ষেত্র প্রস্তুত
করেছেন। আমি শুধু প্রশংসা কেন বলছি? আসুন আরও নিখুঁতভাবে
বলি—অবিশ্বাস্যতার ক্ষেত্র। যদি আমাদের পূর্বপুরুষদের এ কথা বলার কারণ
থাকত যে, ভবিষ্যৎ
প্রজন্ম কানাগলুর রাজত্বের বিস্ময়কর ঘটনাগুলোকে নিছক গল্পকথা বলে মনে করবে;
তবে আমাদের এটা ভাবার কত বেশি কারণ আছে যে, আমাদের বংশধররা জ্ঞান ও বীরত্বের সেই অলৌকিক ঘটনাগুলোকে বিশ্বাসই করতে
চাইবে না, যার সাক্ষী আজ আমরা হচ্ছি?”
“আমার বেচারা মিস্টার
ল্যাম্বাদাগো,” সুলতান বিরস মুখে বললেন,
“আপনি কেবল সস্তা বুলির
ফেরিওয়ালা। আমি বরং এটা বিশ্বাস করার কারণ খুঁজে পাচ্ছি যে—আপনার উত্তরসূরিরা
একদিন আমার পুত্রের গৌরব দিয়ে আমার গৌরবকে ম্লান করে দেবে, ঠিক যেমন আপনি আজ আমার পিতার
গৌরবকে আমার সামনে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছেন; এবং এভাবেই চলতে
থাকবে, যতক্ষণ না দেশে একজনও একাডেমিশিয়ান অবশিষ্ট
থাকবেন। আপনি কী মনে করেন, মিস্টার রিকারিক?”
“রাজপুত্র, আমি এটুকু বলতে পারি,” রিকারিক উত্তর দিলেন, “যে, আমি মহামান্যকে যে অনুচ্ছেদটি পড়ে শোনালাম,
তা সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে।”
“তাহলে তো অবস্থা আরও খারাপ,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন। “তার মানে কঙ্গোতে বাগ্মীতার আসল স্বাদ
হারিয়ে গেছে? মহান
বক্তা হোমিলোগো কিন্তু মহান আবেনের প্রশংসা এভাবে করতেন না।”
“রাজপুত্র,”
রিকারিক বোঝানোর চেষ্টা করলেন, “সত্যিকারের বাগ্মীতা আর কিছুই নয়—মহৎ এবং একই
সঙ্গে মনোরম ও প্ররোচনামূলক উপায়ে কথা বলার শিল্প।”
“এবং সংবেদনশীল উপায়েও,”
সুলতান যোগ করলেন, “আর এই নীতির ওপর ভিত্তি করে আপনার বন্ধু
ল্যাম্বাদাগোকে বিচার করুন। আধুনিক বাগ্মীতার প্রতি আমার সমস্ত শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি কেবল একজন মিথ্যা
বক্তা।”
“কিন্তু রাজপুত্র,”
রিকারিক আমতা আমতা করে বললেন, “মহামান্যের প্রতি আমার ঋণের সীমা অতিক্রম না
করেই বলছি, আপনি
কি আমাকে অনুমতি দেবেন...”
“আমি আপনাকে যা করার পূর্ণ
অনুমতি দিচ্ছি,” মাঙ্গোগুল তীক্ষ্ণভাবে উত্তর
দিলেন, “তা হলো—আমার আভিজাত্যের
চেয়ে আমার সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। এবং আমাকে বুকে হাত দিয়ে
বলুন তো, একজন
প্রকৃত বাগ্মী ব্যক্তি কি কখনো নিজের বক্তৃতায় আবেগের কিছু লক্ষণ না দেখিয়ে থাকতে
পারেন?”
“না, রাজপুত্র,” রিকারিক উত্তর দিলেন, এবং তিনি কর্তৃপক্ষের এক দীর্ঘ তালিকা তৈরি করতে যাচ্ছিলেন—আফ্রিকা, দুই আরব এবং চীনের সমস্ত
অলঙ্কারশাস্ত্রবিদদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে স্বতঃসিদ্ধ জিনিসটি প্রমাণ করার
জন্য—ঠিক তখনই সেলিম তাঁকে বাধা দিলেন।
“আপনার সমস্ত লেখক,”
সভাসদ সেলিম বললেন, “কখনোই এটা প্রমাণ করতে পারবেন না যে
ল্যাম্বাদাগো একজন অত্যন্ত আনাড়ি এবং অশালীন বক্তা নন। দয়া করে মিস্টার রিকারিক, আমার এই সোজা কথাগুলো ক্ষমা
করবেন। আমি আপনাকে এক বিশেষ উপায়ে সম্মান করি; কিন্তু
সত্যিই, আপনার ওই লেখক-ভ্রাতৃত্বের অন্ধভক্তি বাদ দিয়ে
আপনি কি আমাদের সঙ্গে একমত হবেন না যে—বর্তমান সুলতান যেমন ন্যায়পরায়ণ, প্রেমময়, উপকারী এবং একজন মহান যোদ্ধা, তেমনি তাঁর
পূর্বপুরুষদের মতো মহান হওয়ার জন্য আপনার অলঙ্কারশাস্ত্রবিদদের মিথ্যা সাজসজ্জার
কোনো প্রয়োজন তাঁর নেই? এবং একজন পুত্র, যে তার পিতা এবং পিতামহকে ছোট করে নিজে বড় হয়, সে খুব হাস্যকরভাবেই অহংকারী হবে—যদি সে এটা অনুভব না করে যে, এক হাতে তাকে সাজানোর সময়
অন্য হাতে তাকে আসলে বিকৃত করা হচ্ছে। মাঙ্গোগুল যে তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই সুগঠিত
পুরুষ, তা প্রমাণ করার জন্য কি আপনি এর্গেবজেদ এবং
কানাগলুর মূর্তির মাথা কেটে ফেলাটা জরুরি মনে করেন?”
“মিস্টার রিকারিক,”
মির্জোজা বললেন, “সেলিম একদম ঠিক বলেছেন। প্রত্যেকে যার যার
প্রাপ্য গৌরবটুকু উপভোগ করুক। আমরা জনগণকে এটা সন্দেহ করার সুযোগ দেব না যে, আমাদের এই প্রশস্তি-গাথাগুলো
আসলে আমাদের পিতাদের স্মৃতির ওপর চালানো এক ধরনের ডাকাতি। একাডেমির পরবর্তী
পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে আমার পক্ষ থেকে এই বার্তাটি পৌঁছে দেবেন।”
“মানুষ এই প্রথাটি এত দীর্ঘ
সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছে,” সেলিম হতাশ হয়ে বললেন,
“যে এই উপদেশে খুব একটা
কাজ হবে বলে মনে হয় না।”
“আমি বিশ্বাস করি স্যার, আপনি ভুল করছেন,” রিকারিক সেলিমকে বললেন। “একাডেমি এখনো
ভালো রুচির পবিত্র স্থান; এবং প্রাচীনকালের এমন কোনো দার্শনিক বা কবি নেই, যাঁদের সমকক্ষ কাউকে আমরা এই যুগে দাঁড় করাতে পারি না। আমাদের মঞ্চ বা
থিয়েটার অনেক এগিয়েছে, এবং এখনো একে আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ
মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ওহ! টুক্সিগ্রাফাসের লেখা ‘টেমারলান’ কী অসাধারণ
এক সৃষ্টি! এতে আছে ইউরিসোপের হৃদয়স্পর্শী আবেগ এবং আজোফার গাম্ভীর্য। এটি যেন
বিশুদ্ধ প্রাচীনত্বের এক পুনর্জন্ম।”
“আমি ‘টেমারলান’-এর প্রথম প্রদর্শনী
দেখেছি,” প্রিয়তমা বললেন; “এবং আমি আপনার সঙ্গে একমত যে নাটকটি
সুন্দরভাবে পরিচালিত, সংলাপগুলো মার্জিত এবং চরিত্রগুলোর যথার্থতা বেশ ভালোভাবেই বজায় রাখা
হয়েছে।”
চমৎকার! এই অধ্যায়টি
সাহিত্য ও নাট্যতত্ত্বের ওপর একটি গভীর অথচ উপভোগ্য বিতর্ক। এখানে মির্জোজা (যিনি
মূলত দিদরোর নিজের মতামতেরই প্রতিফলন) আধুনিক নাটকের কৃত্রিমতা এবং অবাস্তবতার
তীব্র সমালোচনা করছেন। বিশেষ করে নাটকে সময়ের সীমাবদ্ধতা, সংলাপের অতি-পাণ্ডিত্য এবং
অভিনেতাদের অতিরঞ্জিত আচরণের প্রতি তাঁর কটাক্ষগুলো খুবই ধারালো।
আমি আপনার নির্দেশনা মেনে
ইংরেজি শব্দ বর্জন করেছি এবং ভাষাশৈলীকে আধুনিক প্রমিত চলিত রীতিতে ও
বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডার মেজাজে সাজিয়ে দিয়েছি।
ছত্রিশতম
অধ্যায়: সাহিত্য ও নাট্যতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক
“ম্যাডাম, কী আকাশ-পাতাল তফাত,” রিকারিক বাধা দিয়ে বললেন,
“টুক্সিগ্রাফাসের মতো
একজন লেখকের মধ্যে—যিনি প্রাচীনদের পাঠে সমৃদ্ধ—আর আমাদের
এই আধুনিক লেখকদের মধ্যে!”
“তবুও এই আধুনিকরা,”
সেলিম প্রতিবাদ করলেন, “যাদের আপনারা এখানে নিজেদের সুবিধামতো ধুয়ে
দিচ্ছেন, তারা
কিন্তু অতটা তুচ্ছ নয় যতটা আপনারা দাবি করছেন। কী আশ্চর্য! আপনারা কি তাঁদের মধ্যে
প্রতিভা, উদ্ভাবনী শক্তি, তেজ,
বিস্তারিত বর্ণনা, চরিত্রায়ন এবং
বুদ্ধির সূক্ষ্ম ঝলক দেখতে পান না? আর একজন লেখক যদি
আমাকে আনন্দ দিতে পারেন, তবে নিয়মকানুন দিয়ে আমার কী হবে?
নিশ্চিতভাবেই সেই জ্ঞানী আলমুদির এবং বিদ্বান আবালডকের
পর্যবেক্ষণ, কিংবা গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ফাকারদিনের কবিতার
নিয়মাবলি—যা আমি কখনোই পড়িনি—তা আমাকে আবুলকাজেমা, মুহাদার, আলবাবুকরে এবং আরও অনেক সারাসেন লেখকের কাজের প্রশংসা করা থেকে আটকাতে
পারবে না! প্রকৃতির অনুকরণ ছাড়া আর কোনো নিয়ম আছে কি? আর
যাঁরা প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করেছিলেন (প্রাচীনরা), তাঁদের মতো
আমাদের কি ভালো চোখ নেই?”
“প্রকৃতি,”
রিকারিক উত্তর দিলেন, “প্রতি মুহূর্তে আমাদের সামনে তার বিভিন্ন রূপ
তুলে ধরে। সেগুলো সবই সত্য, কিন্তু সবই সমান সুন্দর নয়। এই প্রাচীন কাজগুলোতে—যেগুলোকে আপনি
খুব একটা দাম দিচ্ছেন না বলে মনে হচ্ছে—আমাদের উচিত সেখান থেকে বেছে নিতে শেখা।
এগুলো হলো তাঁদের নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং তাঁদের পূর্বসুরীদের কাজের সারাংশ।
একজন ব্যক্তির বোঝার ক্ষমতা যতই প্রখর হোক না কেন, জিনিসগুলোকে ক্রমান্বয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হয়;
এবং একজন মানুষ তার সংক্ষিপ্ত জীবনে আশা করতে পারে না যে সে তার
সময় পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবকিছু একাই দেখে ফেলবে। তা না হলে তো আমাদের দাবি করতে হয়
যে—যেকোনো একটি বিজ্ঞান তার জন্ম,
অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত পরিপূর্ণতার জন্য কেবল একটি মাথার কাছেই ঋণী
হতে পারে: যা অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিরোধী।”
“মিস্টার রিকারিক,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “আপনার যুক্তি থেকে আমি যে একমাত্র উপসংহার টানতে
পারি তা হলো—যেহেতু আধুনিকরা তাদের সময় পর্যন্ত সঞ্চিত ধনসম্পদের উত্তরাধিকারী, তাই তাদের প্রাচীনদের চেয়ে
বেশি ধনী হওয়ার কথা; অথবা, যদি
এই তুলনা আপনাকে অসন্তুষ্ট করে, তবে বলি—যেহেতু তারা
সেই ‘দৈত্যদের’ (প্রাচীনদের)
কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাই তাদের উচিত পূর্বসুরীদের চেয়েও বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া। এবং
আসলেই তো তাই; তাদের পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, নৌবিদ্যা, বলবিদ্যা, গণিত—আমাদের তুলনায়
কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে! তাহলে আমাদের বাগ্মীতা এবং কাব্য কেন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারবে
না?”
“সেলিম,”
সুলতানা বললেন, “রিকারিক উপযুক্ত সময়ে আপনাকে এই পার্থক্যের কারণ
বুঝিয়ে বলবেন। তিনি আপনাকে বলবেন কেন আমাদের বিয়োগান্তক নাটক (Tragedy) প্রাচীনদের চেয়ে নিচু
মানের: তবে আমার পক্ষ থেকে, আমি আপনাকে দেখাতে চাই যে—বাস্তবতা আসলেই
তাই। আমি আপনাকে প্রাচীন সাহিত্য না পড়ার জন্য অভিযুক্ত করব না,”
তিনি চালিয়ে গেলেন, “আপনার মন তাদের মঞ্চ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার জন্য
বেশ ভালোভাবেই তৈরি। এখন, তাদের রীতিনীতি, চালচলন এবং ধর্ম সম্পর্কিত
কিছু ধারণা বাদ দিয়ে—যা কেবল সময়ের পার্থক্যের কারণে আপনার কাছে অদ্ভুত
মনে হতে পারে—আপনি স্বীকার করবেন যে,
তাদের বিষয়বস্তু মহৎ, সু-নির্বাচিত এবং
আকর্ষণীয়; কাহিনির ক্রিয়া বা অ্যাকশন খুব স্বাভাবিকভাবেই
বিকশিত হয়; তাদের সংলাপ সহজ এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি;
তাদের নাটকের জট খোলার প্রক্রিয়াটি কৃত্রিম নয়; তাদের আগ্রহ বিভক্ত হয়ে যায় না, কিংবা মূল
কাহিনি অপ্রয়োজনীয় উপকাহিনি দিয়ে ভারাক্রান্ত হয় না।”
“নিজেকে একবার আলিন্দালা
দ্বীপের কল্পনায় নিয়ে যান; সেখানে যা ঘটে তা খেয়াল করুন; যুবক ইব্রাহিম
এবং ধূর্ত ফরফান্তি সেখানে নামার পর থেকে যা যা বলা হয় তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন;
হতভাগ্য পলিপসিলের গুহার কাছে যান; তার
অভিযোগের একটি শব্দও বাদ দেবেন না; এবং তারপর আমাকে বলুন—কোনো একটি পরিস্থিতিও
কি আপনাকে বিভ্রম বা নাটকের ঘোর থেকে বের করে এনেছে? আমাকে একটি আধুনিক রচনার নাম বলুন যা এই একই
পরীক্ষায় টিকতে পারবে এবং একই মাত্রার পরিপূর্ণতা দাবি করতে পারবে; আমি আপনাকে বিজয়ী ঘোষণা করব।”
“ব্রহ্মার দিব্যি,”
সুলতান হাই তুলে চিৎকার করে বললেন, “ম্যাডাম তো দেখছি আস্ত একখানা
একাডেমিক প্রবন্ধ লিখে ফেলেছেন!”
“আমি নিয়মকানুন বুঝি না,”
প্রিয়তমা বলে চললেন, “আর যেসব ভারী ভারী শব্দে সেগুলো প্রকাশ করা হয়, সেগুলো তো আরও বুঝি না: তবে
আমি এটুকু জানি যে—সত্য ছাড়া আর কিছুই মানুষকে আনন্দ দিতে বা
স্পর্শ করতে পারে না। আমি আরও জানি যে,
একটি নাটকীয় রচনার সার্থকতা নিহিত থাকে কোনো ঘটনার নিখুঁত
অনুকরণের মধ্যে—যাতে দর্শক ক্রমাগত প্রতারিত হয়ে কল্পনা করতে থাকে
যে সে সত্যিই সেই ঘটনার সাক্ষী। এখন দয়া করে বলুন, আপনারা যেসব আধুনিক ট্র্যাজেডির প্রশংসা করেন,
সেগুলোর মধ্যে কি এর ছিটেফোঁটাও আছে?”
“আপনারা কি সেগুলোর
পরিচালনার পদ্ধতির প্রশংসা করেন? ওগুলো সাধারণত এতটাই জটিল যে, এত অল্প সময়ে এত
কিছু ঘটে যাওয়াটা একমাত্র অলৌকিক ঘটনা ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। একটি
সাম্রাজ্যের ধ্বংস বা রক্ষা, একটি রাজকুমারীর বিবাহ,
একজন রাজপুত্রের পতন—এই সব কিছু ঘটে যায় চোখের পলকে, যেন হাতের মোচড়ে! বিষয়বস্তু
কি কোনো ষড়যন্ত্র? বেশ, প্রথম
অঙ্কে তার খসড়া করা হলো; দ্বিতীয় অঙ্কে তা পাকাপোক্ত করা
হলো; সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হলো, বাধাগুলো
সরানো হলো, ষড়যন্ত্রকারীরা তৃতীয় অঙ্কে কাজের জন্য
প্রস্তুত হলো; আর ওমনি এক বিদ্রোহ, এক সংঘর্ষ, হয়তো বা এক সম্মুখযুদ্ধ হয়ে গেল!
এবং আপনারা একেই বলেন পরিচালনা, আগ্রহ, তেজ, সম্ভাবনা! আমি আপনাদের—যাঁরা জানেন
না যে একটি করুণ ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটাতে বাস্তবে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়; এবং সামান্যতম রাজনৈতিক
বিষয়েও ব্যবস্থা গ্রহণ, পূর্ববর্তী সভা এবং আলোচনায় কত
সময় ব্যয় হয়—তাঁদের এই ভুল আমি কখনো ক্ষমা করতে পারি না।”
“আমি স্বীকার করছি ম্যাডাম,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “আমাদের রচনাগুলো উপকাহিনি দিয়ে একটু বেশিই
ভারাক্রান্ত থাকে; তবে এটি একটি প্রয়োজনীয় মন্দ (Necessary Evil): উপকাহিনির সহায়তা ছাড়া দর্শকরা ঝিমিয়ে পড়বে।”
“তার মানে, একটি ঘটনার উপস্থাপনাকে
প্রাণবন্ত করার জন্য, সেটিকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যা
বাস্তবে হয় না এবং হওয়া উচিতও নয়? এটা সর্বোচ্চ মাত্রার
হাস্যকর ব্যাপার; অবশ্য এর চেয়েও বেশি অযৌক্তিক ব্যাপার
হলো—যখন দর্শকরা একজন রাজপুত্রের জন্য গভীর উদ্বেগে থাকে, যে কিনা তার প্রেমিকা,
তার সিংহাসন এবং তার জীবন হারানোর দ্বারপ্রান্তে—ঠিক তখন বেহালায়
চটুল নাচের সুর বাজানো।”
“ম্যাডাম, আপনি ঠিক বলেছেন,” মাঙ্গোগুল বললেন, “সেই সব অনুষ্ঠানে সঙ্গীত বিষণ্ণ হওয়া
উচিত; এবং আমি
আপনার জন্য সেই ধরনের কিছু ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি।” (অর্থাৎ, সুলতানের এই আলোচনা বোরিং
লাগছে, তাই তিনি উঠে গেলেন)। মাঙ্গোগুল উঠে বেরিয়ে গেলেন,
এবং সেলিম, রিকারিক ও প্রিয়তমার মধ্যে
কথোপকথন চলতে থাকল।
“অন্তত ম্যাডাম,”
সেলিম বললেন, “আপনি এটা অস্বীকার করবেন না যে—যদি উপকাহিনিগুলো আমাদের বিভ্রম থেকে
বের করে আনে, তবে
সংলাপ আমাদের আবার তাতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আমি এমন কাউকে দেখি না যারা আমাদের
ট্র্যাজিক লেখকদের মতো সংলাপ রচনা এত ভালো বোঝে।”
“তাহলে বলব, কেউ-ই এটা বোঝে না,” মির্জোজা আবার শুরু করলেন। “এর মধ্যে যে
জোর, বুদ্ধিদীপ্ততা
এবং কৃত্রিম সজ্জার প্রাধান্য দেখা যায়, তা প্রকৃতি বা
বাস্তবতা থেকে হাজার মাইল দূরে। লেখক নিজেকে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করেন, কিন্তু আমার চোখ তীক্ষ্ণ এবং আমি নাটকের চরিত্রগুলোর পেছনে তাঁকেই
অবিরাম উঁকি দিতে দেখি। সিন্না, সার্টোরিয়াস, ম্যাক্সিমাস এবং এমিলিয়াস—সবাই যেন প্রতিটি পৃষ্ঠায় কর্নুলির (Corneille) হয়ে কথা বলার
একেকটি যন্ত্র। আমাদের প্রাচীন সারাসেন লেখকদের বইয়ে মানুষ এভাবে কথা বলে না।
রিকারিক যদি চান, তাঁদের কিছু দৃশ্য আপনাদের অনুবাদ করে
শোনাতে পারেন; এবং তখন আপনারা তাঁদের মুখ দিয়ে বিশুদ্ধ
প্রকৃতিকে কথা বলতে শুনবেন। আমি আধুনিক লেখকদের নির্দ্বিধায় বলতে পারি: ‘ভদ্রমহোদয়গণ, প্রতিটি মুহূর্তে আপনাদের
চরিত্রগুলোকে জোর করে বুদ্ধিমান বানানোর পরিবর্তে, তাদের
এমন পরিস্থিতিতে ফেলুন যা তাদের ভেতর থেকে সত্যিকারের অনুপ্রেরণা বের করে আনবে।’”
“ম্যাডাম আমাদের নাটকের
পরিচালনা এবং সংলাপ সম্পর্কে যা রায় দিলেন,
তার পরে,”
সেলিম বললেন, “প্লট বা কাহিনির বিন্যাসের প্রতি তিনি যে খুব একটা দয়া দেখাবেন, এমন সম্ভাবনা কম।”
“অবশ্যই না,”
প্রিয়তমা উত্তর দিলেন, “একশোটির মধ্যে হয়তো একটি ভালো পাওয়া যায়।
বাকিগুলো সঠিকভাবে আগায় না, সেগুলো আগাগোড়া অলৌকিক। একজন লেখক কোনো একটি চরিত্র নিয়ে বিপদে পড়লেন,
যাকে তিনি পাঁচটি অঙ্ক ধরে দৃশ্য থেকে দৃশ্যে টেনে এনেছেন—হঠাত তিনি তাকে
একটি ছুরির আঘাতে মেরে নাটক শেষ করে দেন! সবাই কাঁদতে শুরু করে, আর আমি হাসিতে ফেটে পড়ি।
তাছাড়া, রক্তমাংসের মানুষ কি কখনো আমাদের নাটকের
চরিত্রদের মতো করে কথা বলে? রাজা এবং রাজকুমাররা কি একজন
সুশিক্ষিত মানুষের চেয়ে অন্য রকমভাবে হাঁটেন? তাঁরা কি সব
সময় ভূতগ্রস্ত বা উন্মাদ ব্যক্তির মতো অঙ্গভঙ্গি করেন? রাজকুমারীরা
কি সব সময় তীক্ষ্ণ কিঁচকিঁচে সুরে কথা বলেন? সাধারণত মনে
করা হয় যে আমরা ট্র্যাজেডিকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে গেছি; কিন্তু আমি এর ঠিক উল্টোটা মনে করি। আমার মতে, গত কয়েক যুগে আফ্রিকানরা যেসব সাহিত্যকর্মে নিজেদের নিয়োজিত করেছে,
তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে অসম্পূর্ণ।”
প্রিয়তমা যখন আমাদের
নাট্যকর্মের বিরুদ্ধে তাঁর আক্রমণে এত দূর এগিয়েছেন, ঠিক তখনই মাঙ্গোগুল ফিরে এলেন। “ম্যাডাম,”
তিনি বললেন, “আপনি চালিয়ে গেলে আমি কৃতজ্ঞ থাকব। তবে আপনি দেখতেই পাচ্ছেন যে, কোনো কাব্যিক বিষয়কে
সংক্ষিপ্ত করার একটি গোপন উপায় আমার জানা আছে—যখন আমি সেটিকে বিরক্তিকর মনে করি।”
“আমি
কল্পনা করছি,”
প্রিয়তমা বলে চললেন, “ধরা যাক অ্যাঙ্গোলা থেকে সদ্য আগত এক ব্যক্তি,
যে জীবনে কখনো নাটকের নামও শোনেনি; তবে
তার সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান ও ভদ্রতাবোধের কোনো অভাব নেই। রাজদরবার, আমাত্যদের ষড়যন্ত্র, মন্ত্রীদের ঈর্ষা এবং
নারীদের দ্বিমুখী আচরণ সম্পর্কে তার বেশ ভালো ধারণা আছে। আমি তাকে গোপনে ডেকে
বললাম: ‘শোনো
বন্ধু, রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে (Seraglio) এখন এক ভয়ানক গোলমাল চলছে। সুলতান তাঁর ছেলের ওপর ক্ষিপ্ত। তিনি
সন্দেহ করছেন যে ছেলের সঙ্গে মানিমনবান্দার কোনো অবৈধ সম্পর্ক আছে; আর সুলতান এমন এক ব্যক্তি যিনি এই সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাদের দুজনের
ওপরই নিষ্ঠুরতম প্রতিশোধ নিতে পারেন। এই ঘটনা সম্ভবত এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে
এগোচ্ছে। যদি তুমি চাও, তবে যা ঘটছে তার একজন
প্রত্যক্ষদর্শী তোমাকে আমি বানাতে পারি।’”
“সে
আমার প্রস্তাব লুফে নিল। আমি তাকে একটি পর্দানশীন বক্সে নিয়ে গেলাম,
যেখান থেকে সে মঞ্চটি দেখতে পায়—যাকে সে সত্যিকারের
সুলতানের দরবার বলে মনে করছে। এখন আপনি কি বিশ্বাস করেন,
আমি যতই গম্ভীর ভান করি না কেন, ওই
ব্যক্তির বিভ্রম বা ভুল ধারণা এক মুহূর্তও টিকবে? আপনারা
কি আমার সঙ্গে একমত হবেন না যে—অভিনেতাদের সেই আড়ষ্ট ও কৃত্রিম ভঙ্গি,
তাদের বিদঘুটে পোশাক, বাড়াবাড়ি রকমের
অঙ্গভঙ্গি, ছড়া ও ছন্দের বাঁধাধরা ভাষায় চিৎকার করা,
এবং আরও হাজারো দৃষ্টিকটু অসংগতি—প্রথম দৃশ্য শেষ হওয়ার আগেই
তাকে হাসাতে হাসাতে মেরে ফেলবে? সে
হয়তো আমার মুখের ওপরই হেসে উঠে বলবে যে, আমি তার সঙ্গে
ইয়ার্কি করছি, অথবা সুলতান এবং তাঁর পুরো দরবার পাগল
হয়ে গেছে।”
“আমি
স্বীকার করছি,”
সেলিম বললেন, “আপনার এই অনুমানটি বেশ আঘাত করার মতো। তবে আমি কি আপনাকে বলতে
পারি না যে—মানুষ
নাট্যশালায় যায় এই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়েই যে, তারা একটি ঘটনার ‘অনুকরণ’ দেখতে যাচ্ছে, ঘটনাটি নিজে নয়।”
“আর
সেই বিশ্বাস কি,”
মির্জোজা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “অভিনেতাদের ঘটনাটিকে
সবচেয়ে স্বাভাবিক ও জীবন্ত উপায়ে উপস্থাপন করতে বাধা দেবে?”
“এসব
কথার মানে হলো, ম্যাডাম,” মাঙ্গোগুল মাঝপথে
বাধা দিয়ে বললেন, “আপনি
নিজেকে সমালোচকদের সর্দারনি হিসেবে জাহির করছেন।”
“এবং
যদি আপনার মতামত গৃহীত হয়,”
সেলিম যোগ করলেন, “তবে সাম্রাজ্যের সুরুচির বারোটা বাজবে;
বর্বর যুগ আবার ফিরে আসবে, এবং আমরা সেই
মামুরহা ও ওরোনদাদোর যুগের অজ্ঞতার অন্ধকারে তলিয়ে যাব।”
“আমার
প্রভু, দয়া করে অমন অলুক্ষুনে কথা বলবেন না। আমি
খিটখিটে মেজাজের সমালোচকদের ঘৃণা করি, এবং তাদের সংখ্যা
বাড়ানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তাছাড়া, মহামান্যের গৌরব
আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ; তাঁর রাজত্বের জৌলুস
কমানোর কথা আমি স্বপ্নেও ভাবি না। তবে আমাদের কথা যদি শোনা হয়, তবে মিস্টার রিকারিক, এটা কি সত্য নয় যে
সাহিত্য আরও বেশি ঔজ্জ্বল্য নিয়ে জ্বলে উঠবে?”
“কী,” মাঙ্গোগুল জানতে
চাইলেন, “এ
বিষয়ে আমার সেনেশালের কাছে পেশ করার মতো কোনো স্মারকলিপি কি আপনার নেই?”
“না
স্যার,” রিকারিক বিনীতভাবে উত্তর দিলেন; “তবে মহামান্য যে সাহিত্যিকদের জন্য নতুন পরিদর্শক নিয়োগ
করেছেন, তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর পর,
আমি সেনেশালকে বিনীতভাবে মনে করিয়ে দিতে চাই যে—পাণ্ডুলিপি
পর্যালোচনা করার জন্য নিযুক্ত বিদ্বান ব্যক্তিদের নির্বাচন একটি অত্যন্ত
স্পর্শকাতর বিষয়। এই পবিত্র দায়িত্ব প্রায়ই এমন ব্যক্তিদের ওপর অর্পিত হয়,
যারা আমার মতে তাদের পদের যোগ্য নয়। এর ফলে একগাদা খারাপ প্রভাব
দেখা দেয়: ভালো ভালো কাজ ছাঁটাই করা হয়; সেরা
প্রতিভাদের কণ্ঠরোধ করা হয়—যারা নিজেদের মতো করে লেখার স্বাধীনতা না পেয়ে হয় লেখালেখিই
ছেড়ে দেন, অথবা গাঁটের পয়সা
খরচ করে বিদেশে তাদের রচনা পাঠান; নিষিদ্ধ বিষয়গুলো
সম্পর্কে মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি হয়; এবং আরও
হাজারটা সমস্যা—যা মহামান্যকে বলে বিরক্ত করতে চাই না।”
“আমি
তাঁকে আরও পরামর্শ দেব কিছু ‘সাহিত্যিক জোঁক’-এর পেনশন কমিয়ে দিতে, যারা কেবল পরগাছার মতো অন্যের ওপর নির্ভর করে বাঁচে। আমি বোঝাতে চাইছি
সেই সব টীকাকার (Glossator), প্রত্নতাত্ত্বিক, ভাষ্যকার এবং এই জাতীয় অন্যদের—যারা তাদের কাজ ঠিকঠাক করলে
খুব দরকারি হতে পারত; কিন্তু যারা এখন
কেবল অস্পষ্ট অংশগুলো এড়িয়ে যাওয়া এবং যেসব জায়গায় কোনো জটিলতা নেই, সেখানে পাণ্ডিত্য জাহির করার জঘন্য অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছে। আমি তাঁকে
প্রায় সমস্ত মরণোত্তর (Posthumous) কাজ প্রকাশ করা বন্ধ
করতে বিশেষ মনোযোগী হতে বলব; এবং কোনো মহান লেখকের
স্মৃতিকে কোনো লোভী প্রকাশকের হাতে কলঙ্কিত হতে দেব না—যিনি
লেখকের মৃত্যুর বহুকাল পরে এমন সব বাজে লেখা খুঁজে বের করে ছাপেন,
যা লেখক নিজেই তাঁর জীবদ্দশায় আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন।”
“এবং
আমি,” প্রিয়তমা যোগ করলেন, “তাঁকে মিস্টার রিকারিকের মতো হাতে গোনা কয়েকজন বিশিষ্ট গুণী
ব্যক্তির কথা জানাব, যাঁদের ওপর তিনি
আপনার দান অকৃপণভাবে বর্ষণ করতে পারেন। এটা কি আশ্চর্যজনক নয় যে, এই বেচারা লোকটির জন্য কোনো ব্যবস্থাই করা হয়নি, অথচ মানিমনবান্দার ওই শৌখিন ‘হস্তরেখাবিদ’
আপনার রাজকোষ থেকে বছরে এক হাজার সিকুইন মাসোহারা পায়?”
“ঠিক
আছে ম্যাডাম,”
মাঙ্গোগুল ঘোষণা করলেন, “আমি আমার রাজকোষ থেকে মিস্টার রিকারিককে ওই একই পরিমাণ অর্থ
(এক হাজার সিকুইন) বরাদ্দ করছি—আপনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে যে চমৎকার সুপারিশ করেছেন,
তার সম্মানে।”
“মিস্টার
রিকারিক,”
প্রিয়তমা বললেন, “আপনার জন্য আমারও কিছু করা উচিত। আপনার খাতিরে আমি আমার
আত্মপ্রেমের সামান্য ক্ষোভটুকু বিসর্জন দিচ্ছি; এবং মাঙ্গোগুল আপনার যোগ্যতার যে কদর করেছেন, তার
সম্মানে আমি তাঁর করা সেই অপমানটা ভুলে যাচ্ছি।”
“দয়া
করে ম্যাডাম, আমি কি জানতে পারি
সেই অপমানটা কী ছিল?”
মাঙ্গোগুল কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন।
“আপনি
অবশ্যই পারেন স্যার, এবং আমি আপনাকে
বলব। আপনি নিজেই আমাদের সাহিত্য নিয়ে একটি আলোচনায় টেনে এনেছিলেন: আপনি আধুনিক
বাগ্মীতার একটি সাধারণ অনুচ্ছেদ দিয়ে শুরু করলেন; এবং
যখন আমরা আপনাকে সম্মান দেখানোর জন্য আপনার শুরু করা সেই একঘেয়ে যুক্তিগুলো
অনুসরণ করতে প্রস্তুত হলাম, ঠিক তখনই আপনি অস্বস্তি আর
হাই তোলায় আক্রান্ত হলেন! আপনি আসনে উসখুস করতে লাগলেন, একশো
বার বসার ভঙ্গি বদলালেন; এবং অবশেষে, ভদ্রতার মুখোশ ধরে রাখতে ক্লান্ত হয়ে—যা আপনার জন্য সত্যিই দুঃখজনক—আপনি
হুট করে উঠে পড়লেন এবং হাওয়া হয়ে গেলেন! এবং তারপর আপনি কোথায় গেলেন?
সম্ভবত কোনো এক ‘গোপন রত্ন’-এর
কেচ্ছা শুনতে!”
“আমি
ঘটনাটা স্বীকার করছি ম্যাডাম, তবে
এতে আমি এমন কিছু দেখছি না যা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি
সুন্দর জিনিস শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে পড়ে এবং খারাপ বা সস্তা জিনিস শুনে নিজেকে
বিনোদন দিতে চায়—তবে তার জন্য সেটা আরও খারাপ। এই ভুল পছন্দের কারণে সে যা ত্যাগ
করল, তার গুণমান কমে যায় না: সে কেবল নিজেকেই
একজন ‘বাজে
বিচারক’
হিসেবে প্রমাণ করে। এর সঙ্গে আমি যোগ করতে পারি ম্যাডাম,
যখন আপনি সেলিমকে ধর্মান্তরিত করতে বা তাঁর মত বদলাতে ঘাম
ঝরাচ্ছিলেন, তখন আমি আপনাকে একটি ‘দুর্গ’
(আমারা দুর্গ) পাইয়ে দেওয়ার জন্য আরও বেশি পরিশ্রম করছিলাম—যদিও
কোনো সাফল্য ছাড়াই। অবশেষে, যদি
আমাকে দোষী হতেই হয়—যেহেতু আপনি আমাকে তাই ঘোষণা করেছেন—তবে আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে
পারি যে, আপনি ঠিক সেই
সময়েই আপনার মধুর প্রতিশোধটি নিয়ে নিয়েছেন।”
“দয়া
করে বলুন, সেটা কীভাবে?” প্রিয়তমা অবাক
হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“এভাবে,” সুলতান উত্তর দিলেন,
“সেই
একাডেমিক আলোচনার একঘেয়েমি কাটিয়ে নিজেকে চনমনে করার জন্য আমি কিছু রত্ন পরীক্ষা
করতে গিয়েছিলাম...”
“তারপর,
রাজপুত্র?”
“তারপর...
আমি আমার জীবনে এমন দুটি নির্বোধ প্রাণীর বকবকানি শুনিনি,
যাদের ওপর আমি আলো ফেলেছিলাম।”
“এটা
শুনে আমি যারপরনাই আনন্দিত হলাম,” প্রিয়তমা হাসতে
হাসতে উত্তর দিলেন।
“তারা
দুজনেই এমন এক দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতে শুরু করল... তারা যা বলেছে তার সবটাই আমি
আগাগোড়া শুনেছি; কিন্তু আমাকে মেরে
ফেললেও আমি তার একটি শব্দেরও মানে বুঝতে পারিনি!”
ছত্রিশতম
অধ্যায়: আংটির আঠারো ও ঊনিশতম পরীক্ষা
চ্যাপ্টা গোলক (The Flattened Spheroid) এবং
সেই প্যাঁচালো বক্তা (The Girgiro)
“ব্যাপারটা অদ্ভুত,”
প্রিয়তমা বলে চললেন, “এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল যে, রত্নদের প্রধান দোষ হলো তারা
বড্ড বেশি স্পষ্টভাবে বা সোজাসাপ্টা কথা বলে।”
“ওহ! ম্যাডাম,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন, “কিন্তু এই দুটি সেই গোত্রের নয়। এদের কথা যে
বুঝতে পারে, সেই
বুঝুক—আমার কর্ম নয়।”
“আপনি নিশ্চয়ই সেই ছোটখাটো, কুঁজো মহিলাটিকে চেনেন—যার মাথাটা
কাঁধের মধ্যে ধসে গেছে, যার হাতগুলো প্রায় দেখাই যায় না, পা-দুটো
অতিশুতর এবং পেটটা এমন শুকনো যে তাকে অনায়াসেই একটা হেজহগ (কাঁটাচুয়া) বা কোনো
অপরিণত কিম্ভূতকিমাকার ভ্রূণ বলে ভুল হতে পারে? লোকে তাকে
ডাকনাম দিয়েছে ‘চ্যাপ্টা গোলক’ (Flattened Spheroid)। সে নিজের মাথায় এই অদ্ভুত ধারণা
ঢুকিয়ে রেখেছে যে, ব্রহ্মা তাকে জ্যামিতি অধ্যয়নের জন্যই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, কারণ তিনি তাকে অনেকটা একটা বাটির মতো গোলগাল আকৃতি দিয়েছেন। তাঁর যা
শারীরিক গঠন, তাতে কামানের গোলা হিসেবে পেশা বেছে নিলেও
তিনি বেশ মানিয়ে যেতেন; কারণ তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি
প্রকৃতির গর্ভ থেকে ঠিক কামানের গোলার মতোই ছিটকে বেরিয়ে এসেছেন।”
“তাঁর রত্নটির কাছ থেকে
কিছু তথ্য পাওয়ার আশায় আমি সেটিকে পরীক্ষা করলাম। কিন্তু সেই ঘূর্ণায়মান প্রাণীটি
এমন সব বিদঘুটে জ্যামিতিক পরিভাষায় কথা বলতে শুরু করল যে, আমি তার একটি বর্ণও বুঝলাম
না; সম্ভবত সে নিজেও নিজের ভাষা বোঝে না। সে শুধু বকবক
করে গেল—সরলরেখা,
অবতল পৃষ্ঠ, প্রদত্ত রাশি, দ্রাঘিমাংশ, অক্ষাংশ, গভীরতা, কঠিন পদার্থ, জীবন্ত শক্তি, মৃত শক্তি, শঙ্কু (Cone), সিলিন্ডার, কনিক সেকশন, বক্ররেখা, স্থিতিস্থাপক বক্ররেখা, অন্তর্মুখী বক্ররেখা
এবং তার সংযোগ বিন্দু...”
“দোহাই আপনার! আমি
মহামান্যকে অনুরোধ করছি আমাকে বাকিটা শোনা থেকে রেহাই দিন,”
প্রিয়তমা আর্তনাদ করে উঠলেন। “আপনার স্মৃতিশক্তি বড়ই নিষ্ঠুর, যা একজন মানুষকে মেরে ফেলার
জন্য যথেষ্ট। ওসব শুনে আমার এমন মাথা ঘোরাচ্ছে যে, বাজি
ধরে বলতে পারি আগামী আট দিনেও এই চক্কর কাটবে না। কিন্তু অন্য রত্নটি? সেটিও কি এমনই বিনোদনদায়ক ছিল?”
“সেটা আপনিই বিচার করবেন,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন। “ব্রহ্মার পবিত্র পায়ের কসম, আমি এক অলৌকিক কাজ করেছি।
আমি তার সেই বিচিত্র জগাখিচুড়ি বুলি শব্দে শব্দে মনে রেখেছি; যদিও তা এতটাই অর্থহীন এবং অস্পষ্ট যে, ম্যাডাম,
আপনি যদি আমাকে এর একটি সূক্ষ্ম ও সমালোচনামূলক ব্যাখ্যা দিতে
পারেন, তবে আমি সেটাকে একটি বড় উপহার হিসেবে গণ্য করব।”
“আপনি কী বললেন, রাজপুত্র?” মির্জোজা চিৎকার করে উঠলেন। “আমি মরে যাই, যদি আপনি এই বাক্যটি
(সমালোচনামূলক ব্যাখ্যার কথাটি) কারও কাছ থেকে চুরি না করে থাকেন!”
“আমি বলতে পারব না কীভাবে
এটা ঘটল,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন,
“কারণ আজ আমি কেবল এই
দুটি রত্নকেই কথা বলার সুযোগ দিয়েছি। শেষেরটি, যার ওপর আমি আমার আংটি ঘুরিয়েছিলাম, সে এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর শ্রোতাদের সম্বোধন করার মতো ভঙ্গিতে বলতে
শুরু করল:
“‘ভদ্রমহোদয়গণ,
“‘আমি আমার নিজের
যুক্তির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেই,
চিন্তা করার এবং নিজেকে প্রকাশ করার কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচ বা মডেল
খোঁজা থেকে বিরত থাকার স্বাধীনতা নেব। তবে যদি আমি নতুন কিছু বলি, তবে জানবেন তা কোনো কৃত্রিমতা নয়, বরং
বিষয়বস্তুই আমাকে তা সরবরাহ করেছে; আর যদি আমি এমন কিছু
পুনরাবৃত্তি করি যা ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে, তবে জানবেন তা
আমার নিজস্ব চিন্তা হিসেবেই এসেছে—যেমনটি অন্যদের ক্ষেত্রেও হয়েছে। বিদ্রূপ
যেন আমার এই প্রস্তাবনাকে উপহাসে পরিণত করতে না আসে, এবং আমাকে যেন কেউ অভিযুক্ত
না করে যে—হয় আমি কিছুই পড়িনি, অথবা আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে
পড়েছি। আমার মতো একটি রত্ন পড়ার জন্য তৈরি হয়নি, বা পড়া
থেকে লাভবান হওয়ার জন্য, কিংবা কোনো আপত্তি অনুমান করে
তার জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।
“‘আমি আমার
বিষয়বস্তুর সঙ্গে মানানসই চিন্তাভাবনা এবং অলঙ্করণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করব না; বরং এ বিষয়ে এটি অত্যন্ত
বিনয়ী, এবং কোনো বড় আড়ম্বর বা চাকচিক্য দাবি করবে না। তবে
আমি সেই সব তুচ্ছ ও খুঁটিনাটি বিবরণের কচকচানি এড়িয়ে যাব, যা সাধারণত বন্ধ্যা বক্তাদের (যাদের বলার কিছু নেই) কপালে জোটে। এই
ত্রুটির জন্য সন্দেহভাজন হওয়াটা আমার জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক হবে।
“‘ভদ্রমহোদয়গণ, আমার আবিষ্কার এবং বাগ্মিতা
থেকে আপনারা কী আশা করতে পারেন—তা জানানোর পর, আমার চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার
জন্য মাত্র কয়েক আঁচড় তুলির টানই যথেষ্ট হবে।
“‘আপনারা জানেন
ভদ্রমহোদয়গণ, আমার মতোই দুই ধরনের রত্ন আছে: গর্বিত রত্ন এবং বিনয়ী রত্ন। প্রথমটি
অহংকারী এবং সব সময় সম্মানের আসনটি দাবি করে। পরেরটি বিনয়ী হওয়ার ভান করে এবং
বশ্যতার ভঙ্গিতে নিজেকে উপস্থাপন করে। এই দুটি উদ্দেশ্য তাদের পরিকল্পনার
বাস্তবায়নে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় এবং উভয় প্রকারকেই তাদের পথপ্রদর্শক প্রতিভার
নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য করে।
“‘আমি আমার
প্রাথমিক শিক্ষার কুসংস্কারের প্রতি আনুগত্যবশত কল্পনা করেছিলাম যে—যদি
আমি গর্বের পরিবর্তে বিনয়ের পথটি বেছে নিই, তবে আমি নিজের জন্য একটি নিরাপদ, সহজ এবং আরও আনন্দদায়ক কর্মজীবন উন্মুক্ত করব; এবং তাই আমি শিশুসুলভ লাজুকতা এবং মন-জয়-করা অনুনয় সহকারে সবার কাছে
নিজেকে উপস্থাপন করেছিলাম, যাদের সঙ্গে আমার দেখা করার
সৌভাগ্য হয়েছিল।
“‘কিন্তু হায়!
সময়টা ছিল বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। দশ বারেরও বেশি ‘কিন্তু’, ‘যদি’ এবং ‘এবং’—যা সবচেয়ে বেকার রত্নকেও ধৈর্যহারা করার
জন্য যথেষ্ট ছিল—তার পরে আমার পরিষেবাগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল। হায়!
এই চাকরিটাও ছিল স্বল্পস্থায়ী। আমার প্রথম মালিক একটি নতুন বিজয়ের চাটুকারপূর্ণ
গৌরবে নিজেকে সমর্পণ করে আমাকে বাতিল করে দিল, এবং আমি হঠাত নিজেকে বেকার
অবস্থায় আবিষ্কার করলাম।
“‘আমার যৌবনের
সম্পদ ফুরিয়ে গিয়েছিল, এবং ভাগ্য যে এর ক্ষতিপূরণ দেবে—এমন কোনো সান্ত্বনাও আমি নিজেকে
দিইনি। অবশেষে সেই শূন্য স্থানটি দখল হলো বটে, তবে তা পূর্ণ হলো ষাটোর্ধ্ব
এক ব্যক্তির দ্বারা—যার সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিল না, কিন্তু উপায়ের (ক্ষমতার) বড়ই
অভাব ছিল।
“‘তিনি আমাকে
আমার অতীত অবস্থা ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। তিনি আমার প্রতি
সেই সমস্ত আচরণ করেছিলেন, যা আমার পেশায় মার্জিত এবং আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হয়: তবে তাঁর হাজারো
প্রচেষ্টা আমার অনুশোচনাকে জয় করতে পারেনি।
“‘বলা হয় যে
শিল্পকলা বা কৌশল কখনো ব্যর্থ হয় না;
যদি সেই কৌশল প্রাকৃতিক অক্ষমতার ভাণ্ডারে আমার দুঃখের কিছু উপশম
খুঁজে পেত—তবেই ভালো হতো; কিন্তু আমার কাছে এই
ক্ষতিপূরণ অপর্যাপ্ত বলে মনে হয়েছিল। আমার কল্পনাশক্তি প্রতিদিন নতুন নতুন সাদৃশ্য
খুঁজে বের করতে এবং এমনকি কাল্পনিক সাদৃশ্য অনুমান করতেও চেষ্টা করত, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
“‘প্রথম হওয়ার
সুবিধা এটাই যে—এটি ধারণাটিকে দখল করে রাখে এবং পরে অন্য কোনো
রূপে যা কিছুই আসুক না কেন,
তার বিরুদ্ধে একটি বাধা তৈরি করে: এবং আমি কি বলব, এটা আমাদের লজ্জার বিষয় যে—রত্নদের প্রকৃতিই এমন অকৃতজ্ঞ যে তারা
কখনোই সদিচ্ছাকে কাজের সমতুল্য মনে করে না।
“‘এই মন্তব্যটি
আমার কাছে এত স্বাভাবিক বলে মনে হয় যে, কারও কাছে ঋণী না হয়েও, আমি মনে করি না যে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এটি করেছেন। তবে যদি আমার
আগে কেউ এটি দ্বারা আঘাত পেয়ে থাকে; অন্তত, ভদ্রমহোদয়গণ, আমিই প্রথম ব্যক্তি যিনি এটি
প্রমাণ করে এর পূর্ণ মূল্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে উদ্যোগী হয়েছি।
“‘আমি তাদের ওপর
সামান্যতম দোষারোপ করা থেকেও অনেক দূরে, যারা এতক্ষণ তাদের কণ্ঠস্বর উঁচুতে তুলেছেন—এই আঘাতটি
তাদের হাত থেকে ফসকে যাওয়ার জন্য;
এত বিশাল সংখ্যক বক্তার পরে আমার পর্যবেক্ষণকে নতুন কিছু হিসেবে
উপস্থাপন করতে পেরে আমার আত্মপ্রেম আজ যথেষ্টই সন্তুষ্ট...’”
“আহ! রাজপুত্র,”
মির্জোজা তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করে উঠলেন, “আমার মনে হচ্ছে আমি মানিমনবান্দার
সেই হস্তরেখাবিদকে (পণ্ডিতকে) শুনছি। আপনি বরং তাঁর কাছে যান; সেখানেই আপনি এর সেই ‘সূক্ষ্ম এবং
সমালোচনামূলক’ ব্যাখ্যাটি পাবেন, যা আপনি অন্য কারও কাছ থেকে বৃথা আশা করবেন।”
আফ্রিকান লেখক বলেছেন যে, মাঙ্গোগুল হাসলেন এবং এগিয়ে
গেলেন। “তবে আমি
তার বক্তৃতার বাকি অংশ আর বলতে চাই না,” তিনি বললেন। “এই শুরুটা যদি
‘লা
ফে টপ’-এর
(La Fée Taupe - সমসাময়িক
একটি ব্যাঙ্গাত্মক লেখা) প্রথম পৃষ্ঠাগুলোর মতো ততটা বিনোদন না দিয়ে থাকে, তবে এর বাকি অংশ ‘ফে মুস্টাচ’-এর শেষ পৃষ্ঠাগুলোর চেয়েও বেশি ক্লান্তিকর
হবে।”
সাঁইত্রিশতম
অধ্যায়: মির্জোজার স্বপ্ন
মাঙ্গোগুল যখন সেই
প্যাঁচালো বক্তার (গিরগিরো) দুর্বোধ্য বক্তৃতা শোনানো শেষ করলেন, ততক্ষণে রাত নেমে এল এবং
সঙ্গীরা যার যার ঘরে চলে গেল।
সেই রাতে প্রিয়তমা শান্তির
ঘুমের আশা করতেই পারতেন: কিন্তু সন্ধ্যার সেই দার্শনিক কথোপকথন তাঁর ঘুমের মধ্যেও
ঘুরপাক খেতে লাগল; এবং সেই সব ধারণা অন্যদের সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত স্বপ্নের জন্ম দিল,
যা তিনি সুলতানকে নিচের কথাগুলোতে বলতে ভুললেন না:
“আমি কেবল গভীর ঘুমে
তলিয়েছি, এমন সময়
আমি কল্পনা করলাম যে আমাকে বইয়ে ঠাসা এক বিশাল গ্যালারিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বইগুলোর ভেতরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আমি কিছুই বলব না: সেই সময় সেগুলো আমার কাছে যা
ছিল, জেগে থাকা অনেকের কাছেও তাই (অর্থাৎ দুর্বোধ্য)।
এমনকি আমি একটা শিরোনামও দেখার সুযোগ পেলাম না, কারণ তার
আগেই আরও এক আকর্ষণীয় দৃশ্য আমার সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিল।”
“বইয়ের তাকগুলোর মাঝখানে
নির্দিষ্ট দূরত্বে কিছু বেদি বা মঞ্চ ছিল,
যার ওপর মার্বেল পাথর এবং ব্রোঞ্জের তৈরি কিছু অপরূপ সুন্দর
আবক্ষ মূর্তি (Bust) স্থাপন করা ছিল। সময়ের আঘাত যেন
তাদের ছুঁতেও পারেনি; এবং কিছু ছোটখাটো খুঁত বাদ দিলে,
সেগুলো ছিল অক্ষত এবং নিখুঁত। প্রাচীন বা ক্লাসিক কাজের সেই
মহত্ত্ব এবং কমনীয়তা তাদের ওপর খোদাই করা ছিল। তাদের বেশির ভাগেরই লম্বা দাড়ি ছিল,
আপনার মতো চওড়া কপাল ছিল এবং মুখগুলো ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।”
“আমি তাদের নাম ও যোগ্যতা
জানার জন্য উসখুস করছিলাম, এমন সময় জানালার কাঁচ ভেদ করে এক নারীমূর্তি নেমে এসে আমাকে সম্বোধন
করলেন। তাঁর শরীর ছিল সুগঠিত, চালচলন ছিল রাজকীয় এবং
ভঙ্গি ছিল মহৎ। তাঁর চোখে মাধুর্য ও গাম্ভীর্যের এক অদ্ভুত মিশ্রণ ছিল, আর কণ্ঠস্বরে ছিল এমন এক অনির্বচনীয় আকর্ষণ যা শুনলেই মন ভালো হয়ে যায়।
তাঁর পরনে ছিল একটি শিরস্ত্রাণ বা হেলমেট, গায়ে বর্ম এবং
নিচে একটি দীর্ঘ ঘাঘরা। ‘আমি তোমার কৌতূহল বুঝতে পারছি,’
তিনি আমাকে বললেন, ‘এবং আমি তা মেটাতে এসেছি: যেসব পুরুষের আবক্ষ
মূর্তি তোমাকে মুগ্ধ করেছে, তারা ছিল আমার প্রিয়পাত্র। তারা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল সেই সব
মার্জিত শিল্পের পরিপূর্ণতার সাধনায়, যা আমার কাছে ঋণী।
তারা বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য দেশগুলোতে বাস করত; এবং তাদের
লেখা—যা একসময় তাদের সমসাময়িকদের আনন্দ দিত—তা আজও বর্তমান যুগের জন্য প্রশংসার বিষয়।
কাছে এসো, এবং
তুমি বিভিন্ন বেদির গায়ে খোদাই করা কিছু দৃশ্য দেখতে পাবে, যা তোমাকে অন্তত তাদের লেখার ধরন সম্পর্কে ধারণা দেবে।’”
“আমি প্রথম যে আবক্ষ
মূর্তিটি পরীক্ষা করলাম, সেটি ছিল এক মহৎ বৃদ্ধের, যাঁকে দেখে অন্ধ বলে
মনে হলো (ইনি হোমার)। সম্ভবত তিনি যুদ্ধের গান গেয়েছিলেন: কারণ তাঁর বেদির গায়েও
তেমন বিষয়বস্তুই খোদাই করা ছিল। সামনের অংশটি কেবল একটি একক চিত্রে পূর্ণ ছিল—একজন তরুণ বীরের
(একিলিস)। তার হাতে তলোয়ারের বাঁট ধরা ছিল,
এবং একজন দেবীর হাত তাকে পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরে টানছিল—যাতে তার ক্রোধ
সংযত করা যায়।”
“এই মূর্তির ঠিক উল্টো দিকে
একজন যুবকের আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা ছিল: সে ছিল বিনয়ের প্রতিচ্ছবি (ইনি
ভার্জিল)। তার চোখ গভীর মনোযোগের সঙ্গে বৃদ্ধের দিকে ফেরানো ছিল। সেও যুদ্ধ এবং
বীরগাথা লিখেছিল: তবে ওটাই তার একমাত্র বিষয় ছিল না। কারণ তাকে ঘিরে থাকা খোদাই
করা দৃশ্যগুলোর মধ্যে প্রধানটিতে দেখা যাচ্ছিল—একদিকে কৃষকরা লাঙল দিয়ে জমি চাষ করছে; অন্যদিকে রাখালরা ঘাসের ওপর
শুয়ে ভেড়া আর কুকুরের মাঝে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে।”
“একই পাশে বৃদ্ধের নিচে
রাখা মূর্তিটির চেহারা ছিল বন্য বা উন্মাদপ্রায় (ইনি পিন্ডার)। তার চোখ যেন পালিয়ে
যাওয়া কোনো বস্তুকে অনুসরণ করছিল: এবং তার নিচে একটি অবহেলায় ফেলে রাখা বীণা (Lyre), ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লরেল
পাতা, ভাঙা রথ এবং বিশাল সমভূমিতে ছুটে চলা অগ্নিময় ঘোড়ার
চিত্র আঁকা ছিল।”
“এর সামনে আমি এমন একটি
আবক্ষ মূর্তি দেখলাম, যা আমার মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলল। আমি এখনো তাকে চোখের সামনে দেখতে
পাচ্ছি। তাঁর চেহারা ছিল সুন্দর, নাকটি ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ,
দৃষ্টি ছিল স্থির এবং ঠোঁটে লেগেছিল এক দুষ্টু হাসি (ইনি ভলতেয়ার
বা লুসিয়ান)। তাঁর বেদি সাজানো খোদাই করা দৃশ্যগুলো এতই বিষয়বস্তুপূর্ণ ছিল যে,
তা বর্ণনা করতে গেলে শেষ হবে না।”
“আরও কিছু মূর্তি দেখার পর, আমি আমার পথপ্রদর্শিকাকে
প্রশ্ন করতে শুরু করলাম।”
“‘ইনি কে,’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘যাঁর ঠোঁটে সত্য এবং চোখে সততার ছাপ?’
‘ইনি ছিলেন,’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘সত্য ও সততা—উভয়েরই বন্ধু এবং শিকার (ইনি সক্রেটিস)।
তিনি তাঁর জীবন ব্যয় করেছিলেন সহনাগরিকদের জ্ঞান ও গুণে উন্নত করার কাজে, আর সেই অকৃতজ্ঞ নাগরিকরাই
তাঁকে হত্যা করেছিল।’”
“‘এবং তাঁর ঠিক নিচে রাখা
এই মূর্তিটি?’ ‘কোনটি? যেটি তাঁর বেদির পাশে খোদাই করা লাবণ্যদেবীদের (Graces) দ্বারা সমর্থিত বলে মনে হচ্ছে?’ ‘হ্যাঁ, সেটাই।’ ‘ইনি সেই ওপরে উল্লিখিত হতভাগ্য গুণী
ব্যক্তির শিষ্য এবং তাঁর জ্ঞান ও নীতির উত্তরাধিকারী (ইনি প্লেটো)।’”
“‘আর এই বলিষ্ঠ প্রফুল্ল
ব্যক্তি, মাথায়
আঙুরলতা ও মার্টল পাতার মুকুট পরা—ইনি কে?’
‘ইনি এক সুন্দর
দার্শনিক, যিনি
গান গাওয়া ও জীবন উপভোগ করাকেই একমাত্র কাজ মনে করতেন। তিনি ভোগবিলাসের কোলে মারা
গেছেন (ইনি এপিকিউরাস বা অ্যানাক্রিয়ন)।’”
“‘আর এই অন্য অন্ধ মানুষটি?’—‘ইনি,’ সে বলল—কিন্তু আমি
তার উত্তরের অপেক্ষা করলাম না। আমার মনে হলো আমি আমার পরিচিতদের মধ্যেই এসে পড়েছি, এবং দ্রুত তার উল্টো দিকে
রাখা একটি আবক্ষ মূর্তির দিকে গেলাম। এটি শিল্প ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রতীকের ওপর
স্থাপন করা হয়েছিল: প্রেমের দেবতারা (Cupids) এর পাদদেশের
এক পাশে খেলা করছিল: অন্য দিকে ছিল রাজনীতি, ইতিহাস এবং
দর্শনের দেবতারা। তৃতীয় দিকে, খোদাই করা চিত্রে দুটি
সেনাবাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; প্রতিটি
মুখে বিস্ময় ও ভয়, যা প্রশংসা ও করুণার সঙ্গে মিশে ছিল।
এই আবেগগুলো সম্ভবত একটি দৃশ্যের কারণে তৈরি হয়েছিল—সেখানে একজন
যুবক মারা যাচ্ছিল, এবং তার পাশে একজন বৃদ্ধ যোদ্ধা নিজের বুকে তলোয়ার বিঁধিয়ে দিচ্ছিল। এই
মূর্তিগুলো ছিল অত্যন্ত সুন্দর, এবং একজনের হতাশা ও
অন্যজনের মরণাপন্ন দুর্বলতা এর চেয়ে বেশি শৈল্পিকভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব ছিল না।
আমি কাছে গেলাম, এবং এর নিচে সোনালী অক্ষরে লেখা পড়লাম: ‘হায়! এ ছিল তারই পুত্র।’ অন্য
পাশে একটি ক্রুদ্ধ সুলতানকে খোদাই করা হয়েছিল, যে সবার সামনে একজন যুবকের বুকে ছোরা বসিয়ে
দিচ্ছে। কেউ কেউ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, অন্যরা কাঁদছে: এবং
এই দৃশ্যের চারপাশে লেখা ছিল: ‘এ কি তুমি, নেরেস্তান?’”
“আমি যখন অন্য মূর্তিদের
দিকে এগোতে যাব, হঠাত
একটা শব্দ শুনে পেছনে তাকালাম। একদল লম্বা কালো গাউন পরা লোক সেখানে হাজির হলো।
কারও হাতে ছিল ধূপদানি, যা থেকে ঘন ধোঁয়া বের হচ্ছিল;
অন্যদের হাতে ছিল ফুলের মালা, যা
এলোমেলোভাবে সংগ্রহ করা এবং রুচিহীনভাবে সাজানো। তারা মূর্তিগুলোর দিকে এগিয়ে গেল
এবং তাদের উদ্দেশ্যে ধূপ নিবেদন করতে লাগল, আর দুটি অজানা
ভাষায় (ল্যাটিন ও গ্রিক) স্তব গাইতে লাগল। তাদের ধূপের ধোঁয়ায় মূর্তিগুলো কালচে
হয়ে গেল, এবং তাদের চাপানো ফুলের মুকুটগুলো এক অত্যন্ত
হাস্যকর দৃশ্য তৈরি করল। কিন্তু সেই প্রাচীন মূর্তিগুলো শীঘ্রই তাদের নিজস্ব জৌলুস
ফিরে পেল, এবং আমি দেখলাম মুকুটগুলো শুকিয়ে কুঁচকে মাটিতে
পড়ে গেল। এই বর্বরদের দলের মধ্যে ঝগড়া বেধে গেল, কারণ
তাদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যদের মতে ‘যথেষ্ট নিচু হয়ে’ হাঁটু গাড়েনি; এবং তারা প্রায় হাতাহাতি
করার উপক্রম করছিল, যখন আমার পথপ্রদর্শিকা এক দৃষ্টিতে
তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেন এবং সেখানে শান্তি ফিরিয়ে আনলেন।”
“তারা অদৃশ্য হতে না হতেই, আমি উল্টো দিকের দরজা দিয়ে
একদল পিগমি বা বামনকে প্রবেশ করতে দেখলাম। এই ছোট মানুষগুলো উচ্চতায় দুই হাতের
সমানও ছিল না, কিন্তু তার বদলে তাদের ছিল খুব ধারালো দাঁত
এবং খুব লম্বা নখ। তারা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে মূর্তিগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কেউ কেউ
বেদির গায়ের খোদাই করা কাজগুলো আঁচড়ানোর চেষ্টা করছিল, এবং
মেঝেতে তাদের ভাঙা নখ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছিল। অন্যরা, আরও
বেশি ঔদ্ধত্যের সঙ্গে, একে অপরের কাঁধে চড়ে মূর্তির মাথার
উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেল এবং তাদের খুদে মুষ্টি দিয়ে আঘাত করতে লাগল। কিন্তু যা
আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিল তা হলো—এই আঘাতগুলো মূর্তির নাকে লাগার বদলে
উল্টো পিগমিদের নাকেই ফিরে আসছিল; যার ফলে কাছে গিয়ে দেখলাম তাদের বেশির ভাগেরই নাক চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।”
“‘তুমি দেখছ,’
আমার পথপ্রদর্শিকা বললেন, ‘এই পিঁপড়েদের ঔদ্ধত্য ও তার শাস্তি। এই যুদ্ধ
অনেক দিন ধরে চলছে, এবং সবসময় তাদের ক্ষতিই হচ্ছে। আমি এদের প্রতি কালো গাউন পরাদের চেয়ে
কম কঠোর। পরের দলের (কালো গাউন পরাদের) ধূপ হয়তো মূর্তিগুলোকে বিকৃত করতে পারত;
কিন্তু এদের (পিগমিদের) আঁচড়ানোর চেষ্টা সাধারণত মূর্তিগুলোর
সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয় (অর্থাৎ সমালোচনা ধ্রুপদী সাহিত্যের কদর বাড়ায়)। কিন্তু
যেহেতু তোমার এখানে এক বা দুই ঘণ্টার বেশি থাকার সময় নেই, তাই আমি তোমাকে অন্য দৃশ্যের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।’”
“সেই মুহূর্তে একটি বিশাল
পর্দা সরে গেল, এবং
আমি একটি কর্মশালা বা ওয়ার্কশপ দেখলাম যা অন্য এক ধরনের পিগমিদের দখলে ছিল। এদের
দাঁত বা নখ কিছুই ছিল না; কিন্তু তার বদলে তারা ক্ষুর ও
কাঁচি দিয়ে সজ্জিত ছিল। তাদের হাতে ছিল কিছু জীবন্ত মানুষের মাথা; এবং তারা এই মাথাগুলো নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল—কারও চুল ছাঁটছিল, কারও নাক ও কান ছিঁড়ে ফেলছিল;
এর ডান চোখ উপড়ে ফেলছিল তো ওর বাম চোখ; এবং
তাদের প্রায় সবাইকেই ব্যবচ্ছেদ করছিল। এই ‘সুন্দর’ অপারেশনের পর, তারা মনোযোগ দিয়ে সেগুলো
দেখছিল এবং হাসছিল—যেন তারা মনে করছিল এগুলোই বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর
মাথা।”
“মাথাগুলো ব্যথায় চিৎকার
করছিল, কিন্তু
তারা সেদিকে কান দিচ্ছিল না। আমি একজনকে তার নাক ফেরত চাইতে শুনলাম, এবং প্রতিবাদ করতে শুনলাম যে সে ওই নাক ছাড়া জনসমক্ষে মুখ দেখাতে পারবে
না। ‘আমার বন্ধু,’
পিগমিটি উত্তর দিল, ‘তুমি বোকা। ওই নাক, যার জন্য তুমি কাঁদছ,
তা তোমাকে বিকৃত করেছিল। ওটা বড্ড লম্বা ছিল—ওটা দিয়ে তুমি
কখনোই তোমার ভাগ্য গড়তে পারতে না। কিন্তু যেহেতু ওটা এখন ছোট করা হয়েছে এবং ছাঁটা
হয়েছে, তুমি এখন
অনেক বেশি আকর্ষণীয় (Charming), এবং তোমার পেছনে এখন অনেক
মেয়ে (Spark) ঘুরবে।’”
“যখন ওই মাথাগুলোর ভাগ্য
আমার সহানুভূতি জাগিয়ে তুলছিল, তখন দূরে আমি অন্য একদল আরও ‘দাতব্য’ বা দয়ালু পিগমিকে দেখলাম, যারা চোখে চশমা পরে হামাগুড়ি
দিয়ে মাটিতে কিছু খুঁজছিল। তারা ছাঁটাই করা নাক ও কান কুড়িয়ে নিচ্ছিল, এবং কিছু পুরোনো মাথার সঙ্গে সেগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছিল—যেগুলো থেকে
সময় তাদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই সফল হচ্ছিল: বাকিরা যেখানে
কান থাকার কথা সেখানে নাক বসাচ্ছিল,
আর যেখানে নাক থাকার কথা সেখানে কান: এবং এতে মাথাগুলো আগের
চেয়েও আরও বিকৃত হয়ে উঠছিল।”
“এই সব কিছুর মানে কী তা
জানার জন্য আমি খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। আমি আমার পথপ্রদর্শিকাকে জিজ্ঞাসা করলাম:
এবং তিনি আমাকে উত্তর দেওয়ার জন্য সবেমাত্র ঠোঁট খুলেছিলেন, ঠিক তখনই আমি ভয়ে জেগে
উঠলাম।”
“এটা বড়ই নিষ্ঠুর হলো,”
মাঙ্গোগুল বললেন: “ওই ভদ্রমহিলা তোমাকে অনেক রহস্যের সমাধান
দিতে পারতেন। কিন্তু তার বদলে, আমি মনে করি আমাদের উচিত আমার জাদুকর ব্লোকোলোকাস-এর কাছে যাওয়া।”
“কে?”
প্রিয়তমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“সেই বোকা লোকটা, যাকে তুমি তোমার দরবারে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ (Magic Lantern) দেখানোর
একচেটিয়া অধিকার দিয়েছ।”
“সেই একই লোক,”
সুলতান উত্তর দিলেন। “সে-ই তোমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারবে, অথবা কেউ পারবে না।
ব্লোকোলোকাসকে ডেকে পাঠাও।”
আটত্রিশতম
অধ্যায়: আংটির একুশতম ও বাইশতম পরীক্ষা
ফ্রিকামোনা ও
ক্যালিপিগ্যা
আফ্রিকান লেখক আমাদের
জানাননি যে ব্লোকোলোকাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়টুকুতে মাঙ্গোগুল ঠিক কী করেছিলেন।
তবে এটা খুবই সম্ভব যে তিনি বাইরে গিয়েছিলেন,
এবং কিছু ‘গোপন রত্ন’ পরীক্ষা করেছিলেন; কারণ তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া
তথ্যে সন্তুষ্ট হয়েই তিনি প্রিয়তমার কাছে ফিরে এসেছিলেন এবং আনন্দের আতিশয্যে
চিৎকার করে এই অধ্যায়টি শুরু করলেন।
“বিজয়! বিজয়!” তিনি চিৎকার
করে বললেন। “ম্যাডাম, আপনি জিতেছেন; সেই দুর্গ, চীনামাটির বাসন এবং ওই ছোট বানর—সব এখন আপনার।”
“নিশ্চয়ই এগ্লে-র কথা বলছেন?”
প্রিয়তমা জানতে চাইলেন।
“না ম্যাডাম, না, এগ্লে নয়,” সুলতান বাধা দিয়ে বললেন, “বরং অন্য একজন মহিলা।”
“রাজপুত্র,”
প্রিয়তমা বললেন, “এই ফিনিক্স পাখিকে (দুর্লভ নারীকে) চেনার আনন্দ
থেকে আমাকে আর বঞ্চিত করবেন না।”
“আচ্ছা, কে হতে পারে বলে আপনার মনে
হয়?”
“কে?”
প্রিয়তমা ভাবলেন।
“ফ্রিকামোনা,”
মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন।
“ফ্রিকামোনা!” মির্জোজা বললেন।
“আমি
এতে কোনো অসম্ভবতা দেখছি না। এই ভদ্রমহিলা তাঁর যৌবনের বেশির ভাগ সময় একটি মঠে কাটিয়েছেন; এবং সেখান থেকে বের হওয়ার পর
থেকে তিনি অত্যন্ত নীতিবান এবং নির্জন জীবন যাপন করছেন। কোনো পুরুষ তাঁর দরজার
চৌকাঠ মাড়ায়নি। তিনি একদল তরুণী ভক্তকে নিজের কাছে রাখেন এবং অনেকটা মঠের
অধ্যক্ষের মতোই তাদের ‘পরিপূর্ণতার’ শিক্ষা দেন। আপনার উদ্দেশ্য পূরণ করার
মতো কিছুই সেখানে ঘটার কথা নয়,” প্রিয়তমা হাসতে হাসতে মাথা
নেড়ে যোগ করলেন।
“ম্যাডাম, আপনি ঠিকই বলেছেন,” মাঙ্গোগুল বললেন। “আমি তাঁর রত্ন
পরীক্ষা করেছি, কিন্তু
কোনো উত্তর পাইনি। আমি আমার আংটিটি ঘষে তার শক্তি দ্বিগুণ করলাম এবং আবার চেষ্টা
করলাম। কিছুই হলো না। আমি নিজেকে বললাম, ‘নিশ্চিতভাবেই এই রত্নটি বোবা বা বধির।’ আমি ফ্রিকামোনাকে
সেই পালঙ্কে রেখেই চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই তিনি কথা বলতে শুরু করলেন—মানে মুখ দিয়ে।”
“‘প্রিয় আকারিস,’
তিনি আবেগে গদগদ হয়ে বললেন, ‘আমি কতই না সুখী সেই মুহূর্তগুলোতে—যখন আমি জাগতিক
সব ব্যস্ততা থেকে নিজেকে ছিনিয়ে এনে কেবল তোমাকেই সঁপে দিই। তোমার বাহডোরে কাটানো
মুহূর্তগুলোর পর, এগুলিই আমার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি সময়।—কিছুই আমাকে বিরক্ত করে না; আমার চারপাশে সব নিস্তব্ধ:
জানালার পর্দা পুরোপুরি টানা নয়, শুধু ততটুকু আলোই আসছে
যা আমাকে এই কোমলতা অনুভব করতে এবং তোমাকে দেখতে সাহায্য করে। আমি আমার কল্পনাকে
আদেশ করি: এটি তোমাকে ডেকে আনে, এবং অবিলম্বে আমি তোমাকে
দেখতে পাই। প্রিয় আকারিস, তোমাকে কত সুন্দর দেখাচ্ছে!—হ্যাঁ, এই তো তোমার চোখ, তোমার হাসি, তোমার মুখ। তোমার ওই সুডৌল বুকটি
আমার কাছ থেকে লুকিয়ো না—আমাকে ওতে চুম্বন করতে দাও—আমি ওটা প্রাণভরে
দেখিনি।—আমাকে আবার চুম্বন করতে দাও। আহ! আমাকে এর ওপরেই মরতে দাও—এ কিসের উন্মাদনা
আমাকে গ্রাস করছে?—আকারিস, প্রিয় আকারিস, তুমি কোথায়?—এসো
তবে, প্রিয় বন্ধু
আমার। আহ! প্রিয় ও কোমল সখী, আমি দিব্যি করে বলছি,
এক অজানা অনুভূতি আমার আত্মাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আমার হৃদয়
কানায় কানায় পূর্ণ, সে বিস্মিত, সে
আর ধারণ করতে পারছে না।—ঝরে পড়ো,
আনন্দাশ্রু, ঝরে পড়ো, এবং আমাকে গ্রাস করা এই তীব্রতাকে প্রশমিত করো।—না, প্রিয় আকারিস, না; ওই আলিয়ালি—যাকে তুমি আমার
চেয়ে বেশি পছন্দ করো—সে তোমাকে আমার মতো ভালোবাসবে না—কিন্তু ও কিসের
শব্দ শুনছি—আহ! ওই তো আকারিস আসছে নিঃসন্দেহে—এসো, প্রিয় সখী, এসো—’”
“ফ্রিকামোনা ভুল করেননি,”
মাঙ্গোগুল বলে চললেন; “কারণ সেই আগন্তুক আকারিস আসলে একজন নারীই ছিলেন।
আমি তাঁদের একে অপরের সঙ্গে বিনোদন করতে দিলাম; এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে ফ্রিকামোনার রত্ন
তার বিচক্ষণতায় অটল থাকবে (কারণ সেখানে কোনো পুরুষের প্রবেশ নেই), আমি আপনাকে জানাতে ছুটে এলাম যে আমি আমার বাজি হেরে গেছি।”
“কিন্তু,”
সুলতানা উত্তর দিলেন, “আমি এই ফ্রিকামোনা সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে
আছি। হয় সে পাগল, অথবা সে মারাত্মকভাবে ‘ভ্যাপার্স’ বা মতিভ্রমে আক্রান্ত। না রাজপুত্র, না; আপনার কল্পনার চেয়ে আমার বিবেক অনেক বেশি জাগ্রত। এই পরীক্ষার ফলাফলে
আমার কোনো আপত্তি নেই: কিন্তু তবুও আমি এতে এমন কিছু দেখছি, যা আমাকে এর থেকে কোনো সুবিধা নিতে বাধা দিচ্ছে। এবং আমি সিদ্ধান্ত
নিয়েছি যে আমি কোনো অন্যায্য সুবিধা নেব না। যদি আমি কখনো আপনার কাছ থেকে ওই দুর্গ
এবং চীনামাটির বাসন গ্রহণ করি, তবে তা আরও সম্মানজনক এবং
স্বচ্ছ কোনো কারণে হতে হবে।” (মির্জোজা বোঝাতে চাইলেন, পুরুষবর্জিত কৃত্রিম উপায়ে
রত্নকে নীরব রাখাটা সত্যিকারের সতীত্ব নয়।)
“ম্যাডাম,”
মাঙ্গোগুল হতাশ হয়ে বললেন, “আমি আপনাকে বুঝতে পারছি না। আপনি অবিশ্বাস্য
রকমের খুঁতখুঁতে। নিশ্চিতভাবেই আপনি ওই ছোট বানরটাকে ভালো করে দেখেননি।”
“রাজপুত্র, আমি ওটা খুঁটিয়ে দেখেছি,” মির্জোজা উত্তর দিলেন। “আমি জানি ওটা
একটা চমৎকার জিনিস। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে যে এই ফ্রিকামোনা সেই ব্যক্তি নন, যাঁর খোঁজ আমি করছি। আপনি
যদি চান যে আমি একদিন ওই দুর্গের মালকিন হই, তবে অন্য
কোথাও চেষ্টা করুন।”
“বিশ্বাস করুন ম্যাডাম,”
মাঙ্গোগুল অনেক ভেবেচিন্তে বললেন, “আমি মিরোলোর প্রেমিকা ছাড়া আর কাউকেই
দেখছি না যে আপনাকে এই বাজি জেতাতে পারে।”
“আহ! রাজপুত্র, আপনি দিবাস্বপ্ন দেখছেন,” প্রিয়তমা উত্তর দিলেন। “আমি আপনার এই
মিরোলোকে চিনি না; কিন্তু সে যেই হোক না কেন, যেহেতু তার একজন
প্রেমিকা আছে, নিশ্চয়ই সে তাকে শুধু শুধু পুষছে না।”
“খুবই সত্য কথা,”
মাঙ্গোগুল বললেন; “এবং তবুও আমি আরও একটা বাজি ধরতে রাজি আছি যে—ক্যালিপিগ্যার
(Mirolo-র
প্রেমিকা) রত্ন এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।” (অর্থাৎ মিরোলো রত্নটিকে ব্যবহারই করে
না)।
“দয়া করে নিজের কথার সঙ্গে
সঙ্গতি রাখুন,” প্রিয়তমা বললেন। “দুটি জিনিসের
মধ্যে একটি অবশ্যই ঘটবে, হয় ক্যালিপিগ্যার রত্ন কথা বলবে... কিন্তু আমি কেন এক হাস্যকর তর্কে
জড়াচ্ছি—রাজপুত্র,
আপনি যা ভালো মনে করেন তাই করুন: ক্যালিপিগ্যার রত্ন পরীক্ষা
করুন; যদি এটি নীরব থাকে, তবে তা
মিরোলোর জন্য খারাপ খবর, আর আমার জন্য ভালো।”
মাঙ্গোগুল চলে গেলেন, এবং মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে
সেই রুপালি সুতোয় বোনা হলুদ সোফার (Jonquil sofa) কাছে
আবিষ্কার করলেন, যার ওপর ক্যালিপিগ্যা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
তিনি তাঁর আংটি ক্যালিপিগ্যার ওপর ঘোরাতেই, একটি অস্পষ্ট
কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন—যা বিড়বিড় করে নিচের কথাগুলো বলল:
“তুমি আমাকে কী
জিজ্ঞাসা করছ? আমি তোমার প্রশ্নগুলো বুঝতেই পারছি না। আমাকে নিয়ে তো কেউ চিন্তাই করে
না: এবং তবুও আমি মনে করি আমি অন্য যে কারো মতোই যোগ্য। মিরোলো, এটা সত্যি যে প্রায়ই আমার দরজার পাশ দিয়ে যাতায়াত করে, কিন্তু...”
(এখানে মূল
পাণ্ডুলিপিতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বা ছেঁড়া অংশ আছে। সাহিত্যের জগত নিশ্চয়ই সেই
ব্যক্তির কাছে চিরঋণী থাকবে, যিনি ক্যালিপিগ্যার রত্নটির
পুরো বক্তৃতা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন—যার মাত্র শেষ দুটি লাইন আমাদের কাছে
অবশিষ্ট আছে। আমরা পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি বিষয়টি গবেষণা করার জন্য—যে এই
ঘাটতিটি কি লেখকের ইচ্ছাকৃত,
যিনি হয়তো যা লিখেছিলেন তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না, নাকি তিনি এর চেয়ে ভালো কিছু খুঁজে পাননি বলে বাদ দিয়েছেন?)
“...লোকে
বলে যে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর বেদি বা পূজার আসন নাকি আল্পস পর্বতের ওপারে। হায়!
মিরোলো না থাকলে, সারা দুনিয়া আমার কদর করত।”
মাঙ্গোগুল অবিলম্বে
সেরাগ্লিওতে ফিরে এলেন, এবং প্রিয়তমাকে ক্যালিপিগ্যার রত্নের অভিযোগ হুবহু শুনিয়ে দিলেন: কারণ
তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ।
“এই গল্পের প্রতিটি
পরিস্থিতি, ম্যাডাম,” তিনি বললেন, “আপনাকে জেতানোর পক্ষেই কথা বলছে: আমি
পুরো বাজি ছেড়ে দিচ্ছি; এবং আপনি যখন উপযুক্ত মনে করবেন, ক্যালিপিগ্যাকে
ধন্যবাদ জানিয়ে দেবেন।”
“স্যার,”
মির্জোজা গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, “আমি এই বাজি জিততে বদ্ধপরিকর, তবে তা হতে হবে নিশ্চিত
গুণের বা সতীত্বের জোরে, অন্য কোনো কারণে নয়...”
“কিন্তু ম্যাডাম,”
সুলতান উত্তর দিলেন, “আমি এমন কোনো গুণের কথা জানি না যা শত্রুকে এত
কাছ থেকে দেখেও অক্ষত থাকে (অর্থাৎ মিরোলো কাছে থেকেও রত্নকে ছোঁয়নি—এটিই তো বড়
প্রমাণ)।”
“আর আমার পক্ষ থেকে
রাজপুত্র,” প্রিয়তমা উত্তর দিলেন,
“আমি আমার নিজের
শর্তগুলো ভালোভাবেই বুঝি: এবং ওই তো সেলিম ও ব্লোকোলোকাস আসছেন, তাঁরাই আমাদের বিচারক হবেন।”
সেলিম ও ব্লোকোলোকাস প্রবেশ
করলেন: মাঙ্গোগুল তাঁদের কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বললেন, এবং তাঁরা দুজনেই মির্জোজার
পক্ষে রায় দিলেন। (অর্থাৎ, প্রেমিকের বিকৃত রুচির কারণে
রত্ন অব্যবহৃত থাকলে তাকে সতী নারী বলা যায় না।)
পর্যালোচনা: এই অধ্যায়ে দিদরো অত্যন্ত চতুরতার
সঙ্গে ‘আল্পসের
ওপারে বেদি’
(Altars beyond the Alps) উপমাটি ব্যবহার করেছেন। অষ্টাদশ শতকের
ইউরোপে ‘ইতালীয় ভপক’ বা ‘আল্পসের ওপারের রীতি’ বলতে পায়ুকাম
বা সমকামিতাকে ইঙ্গিত করা হতো। ক্যালিপিগ্যার রত্নটি অভিযোগ করছে যে মিরোলো তাকে উপেক্ষা
করে অন্য পথে (পিছনের দরজায়) আগ্রহী। আর তাই মির্জোজা এই ‘অব্যবহার’কে সতীত্ব বলে মানতে নারাজ।
চমৎকার! এই অধ্যায়টিতে
দিদরো স্বপ্নের মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের ব্যঙ্গ করার এক
অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে ব্লোকোলোকাসের তত্ত্ব—যে স্বপ্ন আসলে আমাদের পূর্বের
অভিজ্ঞতার এলোমেলো সংমিশ্রণ—তা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের খুব কাছাকাছি। আর শেষের দিকে
গ্রিক ভাষা না জেনেই অনুবাদ করার প্রসঙ্গটি তৎকালীন সস্তা অনুবাদকদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ।
আমি আপনার নির্দেশনা মেনে
ইংরেজি শব্দগুলো বাদ দিয়েছি, ‘টয়’-এর জায়গায় ‘গোপন রত্ন’ বা ‘রত্ন’ ব্যবহার করেছি এবং ভাষাশৈলীকে আধুনিক
প্রমিত চলিত রীতিতে ও বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার মেজাজে সাজিয়ে দিয়েছি।
ঊনত্রিশতম
অধ্যায়: স্বপ্নের ব্যাখ্যা
“আমার প্রভু,”
প্রিয়তমা ব্লোকোলোকাসকে বললেন, “আপনাকে আমার আরও একটি উপকার করতে
হবে। গত রাতে একগাদা আজগুবি কল্পনা আমার মাথায় ভর করেছিল। সেটা ছিল এক অদ্ভুত
স্বপ্ন; এবং আমি
শুনেছি যে কঙ্গোতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার ব্যাপারে আপনার চেয়ে দক্ষ আর কেউ
নেই। তাহলে চটপট আমাকে এর ব্যাখ্যা দিন;” এবং এর সঙ্গে তিনি নিজের স্বপ্নটি খুলে বললেন।
“ম্যাডাম,”
ব্লোকোলোকাস বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, “আমি একজন সাধারণ স্বপ্নবিশারদ (Oneirocritic)...”
“দোহাই আপনার, এই খটমট পরিভাষাগুলো বাদ দিন,” প্রিয়তমা মাঝপথে থামিয়ে
দিয়ে বললেন, “আপনার
পাণ্ডিত্য একপাশে সরিয়ে রেখে আমার সঙ্গে সাধারণ যুক্তির ভাষায় কথা বলুন।”
“ম্যাডাম, আপনার আদেশ শিরোধার্য।
স্বপ্ন সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু অনন্য ধারণা আছে; এবং
সম্ভবত এর জন্যই আমি আপনার সঙ্গে কথা বলার এবং ‘গম্ভীর’ (Saturnine) উপাধি পাওয়ার সম্মান পেয়েছি। আমি
আমার সাধ্যমতো সহজ ভাষায় আপনাকে সেগুলো ব্যাখ্যা করব।”
“আপনি নিশ্চয়ই জানেন
ম্যাডাম,” তিনি বলে চললেন, “এ বিষয়ে দার্শনিকদের বেশির ভাগ এবং
সাধারণ মানুষ কী বলে থাকে। তারা বলে যে,
যেসব বস্তু আগের দিন আমাদের ইন্দ্রিয়কে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়,
রাতে সেগুলোই আমাদের আত্মাকে ব্যস্ত রাখে। আমাদের মস্তিষ্কের
তন্তুগুলোতে তারা যে ছাপ ফেলে যায়, তা মুছে যায় না।
প্রাণশক্তি বা ‘প্রাণীজ আত্মা’ (Animal Spirits), যা নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হতে
অভ্যস্ত, তা ঘুমের মধ্যেও সেই পরিচিত পথই অনুসরণ করে;
এবং সেখান থেকেই এই অনিচ্ছাকৃত ছবিগুলো ভেসে ওঠে—যা আমাদের কখনো
কষ্ট দেয়, কখনো
আনন্দিত করে। এই তত্ত্ব অনুসারে আমি মনে করব, একজন সুখী
প্রেমিকের স্বপ্ন সব সময় মধুর হওয়া উচিত। তবুও প্রায়শই দেখা যায় যে, যে মানুষটি জেগে থাকা অবস্থায় প্রেমিকার কাছে রাজা, ঘুমের মধ্যে সে হয়তো দাসের মতো ব্যবহার পাচ্ছে; অথবা একজন সুন্দরী নারীকে উপভোগ করার বদলে সে হয়তো তার বাহুবন্ধনে এক
কুৎসিত দানবকে আবিষ্কার করছে।”
“সেটাই তো ঠিক আমার গত
রাতের ঘটনা!” মাঙ্গোগুল মাঝপথে বলে উঠলেন। “কারণ আমি খুব কমই স্বপ্ন না দেখে রাত
কাটাই। এটা আমাদের এক পারিবারিক ব্যাধি;
সুলতান তোগ্রুলের আমল থেকে—যিনি ৭৪৩৫০০০০০০২ সালে প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন—আমরা বাবা
থেকে ছেলে, বংশপরম্পরায়
স্বপ্ন দেখে আসছি। এখন শুনুন ম্যাডাম, গত রাতে আপনি আমাকে
স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন,” তিনি মির্জোজাকে বললেন। “‘সেটা ছিল আপনারই কোমল ত্বক, আপনারই বাহু, আপনার বুক, আপনার ঘাড়, আপনার কাঁধ... এক কথায় আপনি নিজেই ছিলেন; তফাত
শুধু একটাই—সেই মোহময়ী মুখের বদলে, সেই আরাধ্য মাথার বদলে যা
আমি দেখার আশা করেছিলাম, আমি নিজেকে এক ডাচ পাগ-কুকুরের
থ্যাবড়া নাকের সঙ্গে নাক ঘষতে দেখলাম!”
“আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম; আমার খাস-পরিচারক কোটলুক
দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে। ‘মির্জোজা,’
আমি আধো-ঘুমন্ত অবস্থায় উত্তর দিলাম, ‘এইমাত্র সবচেয়ে জঘন্য রূপান্তর
ঘটেছে। সে একটা ডাচ কুকুর হয়ে গেছে।’ কোটলুক আমাকে জাগানোটা উচিত মনে করেনি; সে চলে গেল, এবং আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। কিন্তু আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি যে,
আমি আপনাকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল করিনি—আপনার শরীর, কিন্তু একটি কুকুরের মাথা!
ব্লোকোলোকাস কি আমাকে এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন?”
“আমি আপনাকে হতাশ করব না,”
ব্লোকোলোকাস উত্তর দিলেন, “যদি মহামান্য আমার সঙ্গে একটি খুব সাধারণ নীতিতে
একমত হন; সেটি
হলো—সমস্ত প্রাণীর একে অপরের সঙ্গে অনেক মিল আছে তাদের সাধারণ গুণাবলীর
কারণে; এবং
গুণাবলীর একটি নির্দিষ্ট সংমিশ্রণই তাদের আলাদা করে এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে।”
“সেটা তো স্পষ্ট,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন। “যেমন ইপসিফিলার পা, হাত এবং মুখ আছে—ঠিক একজন বুদ্ধিমতী
নারীর মতো;”
“এবং ফারাসমেনা,”
মাঙ্গোগুল যোগ করলেন, “তার তলোয়ার একজন সাহসী পুরুষের মতোই বহন করে।”
“যদি একজন ব্যক্তি সেই
গুণাবলী সম্পর্কে যথেষ্ট পরিচিত না হন—যার সংমিশ্রণ এই বা ওই প্রজাতিকে
আলাদা করে; অথবা
যদি তিনি হুট করে সিদ্ধান্ত নেন যে এই সংমিশ্রণটি অমুক ব্যক্তির সঙ্গে মেলে কি না;
তবে তিনি তামাকে সোনা, কাঁচকে হীরা,
একজন সাধারণ হিসাবরক্ষককে জ্যামিতিবিদ, একজন
সস্তা বুলির ফেরিওয়ালাকে পণ্ডিত, ক্রিটোকে একজন সৎ মানুষ
এবং ফেডিমার মতো কাউকে সুন্দরী মহিলা বলে ভুল করার ঝুঁকি নেন,” সুলতানা যোগ করলেন।
“আচ্ছা ম্যাডাম,”
ব্লোকোলোকাস উত্তর দিলেন, “আপনি কি জানেন যারা এমন ভুল বিচার করে তাদের
সম্পর্কে কী বলা যেতে পারে?”
“তারা জেগে জেগে স্বপ্ন
দেখে,” মির্জোজা বললেন।
“খুব ভালো বলেছেন ম্যাডাম,”
ব্লোকোলোকাস চালিয়ে গেলেন; “এবং হাজারো পরিস্থিতিতে এই পরিচিত প্রবাদটির
চেয়ে বেশি দার্শনিক বা সঠিক আর কিছুই নেই: ‘আমি বিশ্বাস করি আপনি স্বপ্ন দেখছেন’। কারণ এমন
মানুষের অভাব নেই যারা মনে করে যে তারা যুক্তি দিয়ে চিন্তা করছে, অথচ বাস্তবে তারা চোখ খোলা
রেখেই স্বপ্ন দেখছে।”
“এদের সম্পর্কে,”
প্রিয়তমা বাধা দিয়ে বললেন, “আক্ষরিক অর্থেই বলা যেতে পারে যে তাদের পুরো
জীবনটাই একটা স্বপ্ন।”
“আমি আপনার প্রশংসায়
পঞ্চমুখ না হয়ে পারছি না ম্যাডাম,” ব্লোকোলোকাস বললেন, “আপনি কত সহজে এত জটিল ধারণাগুলো বুঝে
ফেলেন! আমাদের স্বপ্নগুলো আসলে দ্রুত ঘটে যাওয়া কিছু বিচার বা সিদ্ধান্ত—যা অবিশ্বাস্য
গতিতে একর পর এক আসে, এবং দূরবর্তী গুণের ভিত্তিতে বস্তুগুলোকে অদ্ভুতভাবে জোড়া লাগিয়ে এক
কিম্ভূতকিমাকার ছবি তৈরি করে।”
“যদি আমি আপনাকে ঠিক বুঝে
থাকি,” মির্জোজা বললেন, “যেমনটা আমি মনে করি আমি বুঝেছি—স্বপ্ন হলো
একটা তালি মারা কাঁথার (Patchwork)
মতো। যার তালিগুলো সংখ্যায় যত বেশি হবে এবং যত এলোমেলোভাবে
জোড়া লাগানো হবে—স্বপ্নদ্রষ্টার চিন্তাভাবনা তত বেশি প্রাণবন্ত, কল্পনা তত দ্রুত এবং
স্মৃতিশক্তি তত নিখুঁত হবে। পাগলামিও কি এর মধ্যে পড়তে পারে? ধরুন, যখন পাগলাগারদের একজন বাসিন্দা চিৎকার
করে বলে যে সে বজ্রপাত দেখছে, মেঘের ডাক শুনছে এবং তার
পায়ের নিচে মাটি ফাঁক হয়ে যাচ্ছে; অথবা যখন আরিয়াডনে
আয়নায় নিজেকে দেখে হাসে—ভাবছে তার চোখ জ্বলজ্বল করছে, গায়ের রং ফর্সা, দাঁতগুলো মুক্তোর মতো এবং মুখটা ছোট (অথচ বাস্তবে উল্টো)—তখন কি আমরা
বলতে পারি না যে, এই দুটি অসুস্থ মস্তিষ্ক খুব দূরের বা অস্পষ্ট সাদৃশ্যের দ্বারা
প্রতারিত হয়ে কাল্পনিক বস্তুকেই বাস্তব হিসেবে দেখছে?”
“আপনি একদম ঠিক ধরেছেন
ম্যাডাম: হ্যাঁ, পাগলদের
সঠিকভাবে পরীক্ষা করলেই বোঝা যায় যে তাদের অবস্থা আসলে একটি বিরামহীন বা অনন্ত
স্বপ্নের চেয়ে বেশি কিছু নয়।”
“আমার কাছে,”
সেলিম ব্লোকোলোকাসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এমন কিছু অভিজ্ঞতা আছে যার ওপর আপনার
এই তত্ত্ব খুব ভালোভাবে খাটে; এবং যা আমাকে এটি মেনে নিতে বাধ্য করছে। একবার আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম যে
আমি গাধার ডাক শুনছি, এবং দেখলাম দুটি সমান্তরাল সারিতে
অদ্ভুত সব প্রাণী বড় মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসছে; তারা
পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে গম্ভীরভাবে হাঁটছিল; তাদের মুখ
ঢাকা ছিল এমন সব টুপিতে যাতে দুটো করে ফুটো ছিল—যেখান থেকে দুটো লম্বা লোমশ কান বেরিয়ে
নড়াচড়া করছিল; এবং
খুব লম্বা হাতার জামা তাদের সামনের পাগুলোকে ঢেকে রেখেছিল। আমি তখন মগজ
ঘামাচ্ছিলাম এই অদ্ভুত দৃশ্যের মানে কী হতে পারে। কিন্তু এখন আমার মনে পড়ছে যে,
আগের দিন সন্ধ্যায় আমি মন্টমার্ত্রে (প্যারিসের একটি এলাকা,
সম্ভবত সেখানে গাধার পিঠে চড়ার চল ছিল বা বিশেষ কোনো মেলা ছিল)
গিয়েছিলাম।”
“অন্য এক সময়, যখন আমরা মহান সুলতান
এর্গেবজেদের নেতৃত্বে যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম এবং আমি এক দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রার পর
আমার তাঁবুতে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম—তখন আমি ভাবলাম যে রাজদরবারে (Divan) একটি জরুরি কাজ মেটানোর
জন্য আমাকে আবেদন করতে হবে। আমি রিজেন্সি কাউন্সিলের সামনে হাজির হলাম: কিন্তু
আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না যখন আমি দেখলাম—দরবারকক্ষটি খড়ের গাদা, জাবনা খাওয়ার পাত্র এবং
মুরগির খাঁচায় ভর্তি; মহান সেনেশালের আরামকেদারায় আমি
দেখলাম একটি গরু বসে জাবর কাটছে; সেনাপতির জায়গায় একটি
বারবারি ভেড়া; খাজাঞ্চির আসনে একটি ঈগল—বাঁকা ঠোঁট
আর লম্বা নখ নিয়ে বসে আছে; কাজি বা বিচারকদের জায়গায় পশমের পোশাক পরা দুটো বড় পেঁচা; এবং উজিরদের জায়গায় ময়ূরের পেখমওয়ালা সব রাজহাঁস। আমি আমার আবেদন
পেশ করলাম, এবং সঙ্গে সঙ্গে এক বিকট শব্দ শুনে জেগে
উঠলাম।”
“এটা ব্যাখ্যা করা কি খুব
কঠিন?” মাঙ্গোগুল বললেন, “আপনার সেই সময় দরবারে কিছু কাজ ছিল, আর সেখানে যাওয়ার আগে আপনি
নিশ্চয়ই চিড়িয়াখানা (Menagerie) দেখতে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সিগনর ব্লোকোলোকাস, আপনি আমার সেই কুকুরের মাথার
স্বপ্নের ব্যাপারে কিছুই বলছেন না।”
“রাজপুত্র,”
ব্লোকোলোকাস উত্তর দিলেন, “শতকরা নিরানব্বই ভাগ নিশ্চিত যে—ম্যাডাম হয়তো
একটি ‘সেবল’ (Sable - এক ধরনের লোমশ প্রাণী)
এর লোম দিয়ে তৈরি মাফলার বা টিপেট পরেছিলেন, অথবা আপনি
অন্য কোনো মহিলাকে তা পরতে দেখেছিলেন; এবং আপনি সম্প্রতি
যে ডাচ কুকুরটি দেখেছিলেন, সেটি আপনার কল্পনায় গেঁথে
ছিল। ঘুমের সময় আপনার মনকে ব্যস্ত রাখার জন্য আপনার হাতে দশগুণ বেশি এলোমেলো
সংযোগ বা সূত্র থাকে: রঙের মিল থাকার কারণে আপনার মস্তিষ্ক মাফলারের লোমের বদলে
কুকুরের লোম বসিয়ে দিয়েছে, এবং চোখের পলকে এক সুন্দরী
মহিলার মাথার জায়গায় এক কুৎসিত কুকুরের মুণ্ডু বসিয়ে দিয়েছে।”
“আপনার ধারণাগুলো আমার কাছে
বেশ যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন: “আপনি কেন এগুলো
প্রকাশ করছেন না? এগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎবাণী করার বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে
সাহায্য করতে পারে—যা দুই হাজার বছর আগে খুব চর্চা করা হতো, কিন্তু এখন অবহেলিত। আপনার
পদ্ধতির আরেকটি সুবিধা হলো—এটি প্রাচীন ও আধুনিক অনেক কাজের ওপর
আলোকপাত করতে পারবে, যা আসলে স্বপ্নেরই একটি ধারা বা প্রলাপ মাত্র; যেমন প্লেটোর ‘আইডিয়া’ সম্পর্কিত গ্রন্থ, হার্মিস ট্রিসমেগিস্টাসের
লেখা, ফাদার হার্ডুইনের আজগুবি সাহিত্যিক তত্ত্ব, নিউটনের আলোকবিজ্ঞান, এবং কোনো এক ব্রাহ্মণের
সর্বজনীন গণিত। উদাহরণস্বরূপ, মিস্টার জাদুকর, আপনি কি আমাদের বলবেন না—অর্কোটোমাস দিনের বেলা কী দেখেছিলেন, যখন তিনি তাঁর ওই অদ্ভুত
থিওরি স্বপ্ন দেখেছিলেন? ফাদার ক্যাসটেল কী দেখেছিলেন,
যখন তিনি তাঁর ‘রঙের বাদ্যযন্ত্র’ (Ocular Harpsichord) তৈরির
স্বপ্ন দেখেছিলেন? এবং ক্লিওবুলাস কী স্বপ্ন দেখেছিলেন,
যখন তিনি তাঁর ওই বিয়োগান্তক নাটকটি লিখেছিলেন?”
“একটু ধ্যান করলেই স্যার,”
ব্লোকোলোকাস উত্তর দিলেন, “আমি এই সব কিছু বের করতে পারতাম: কিন্তু আমি এই
সূক্ষ্ম তথ্যগুলো সেই সময়ের জন্য তুলে রাখছি, যখন আমি আমার ‘ফিলোক্সেনাস’-এর অনুবাদ প্রকাশ করব; যার জন্য আমি মহামান্যের
কাছে বিশেষ অনুমতি বা কপিরাইট প্রার্থনা করছি।”
“আমার পূর্ণ সম্মতি রইল,”
মাঙ্গোগুল বললেন: “কিন্তু এই ফিলোক্সেনাসটি কে?”
“রাজপুত্র,”
ব্লোকোলোকাস উত্তর দিলেন, “তিনি একজন প্রাচীন গ্রিক লেখক, যিনি স্বপ্নের ব্যাপারে অগাধ
জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।”
“তার মানে আপনি গ্রিক ভাষা
বোঝেন?”
“আমি? স্যার, এক বর্ণও না।”
“আপনি কি আমাকে বলেননি যে
আপনি ফিলোক্সেনাসের অনুবাদ করছেন, এবং তিনি গ্রিক ভাষায় লিখেছেন?”
“হ্যাঁ স্যার; কিন্তু একটি ভাষা অনুবাদ
করার জন্য সেটা বোঝার কোনো দরকার নেই: কারণ অনুবাদগুলো তো কেবল তাদের জন্যই তৈরি
করা হয়, যারা মূল ভাষাটা বোঝে না।”
“অসাধারণ!” সুলতান হেসে
বললেন; “সিগনর ব্লোকোলোকাস, তাহলে না বুঝেই গ্রিক অনুবাদ
করতে থাকুন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে আপনার এই গোপন কথা আমি ফাঁস করব না; এবং এর জন্য আপনার প্রতি আমার সম্মান একবিন্দুও কমবে না।”
চমৎকার! এই অধ্যায়টিতে
দিদরো অভিজাত সমাজের ভণ্ডামি এবং ফ্যানিয়ার মতো নারীর চঞ্চল চরিত্রটি খুব
সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে আমিষাদারের সঙ্গে ফ্যানিয়ার কথোপকথন—যেখানে সে প্রথমে
‘রূপান্তরিত’ (ধার্মিক)
হওয়ার ভান করে এবং পরে ঠিক উল্টো পথে হাঁটে—তা খুবই হাস্যরসাত্মক।
আমি আপনার নির্দেশনা মেনে ‘টয়’-এর জায়গায়
‘গোপন রত্ন’ বা ‘রত্ন’ ব্যবহার করেছি। সেই সাথে ‘কনভার্ট’ (Convert)-এর জায়গায় ‘পরিবর্তন’ বা ‘ধর্মান্তর’ এবং অন্যান্য শব্দগুলোকে যথাসম্ভব
মানানসই বাংলায় অনুবাদ করেছি। ভাষাশৈলীকে আধুনিক প্রমিত চলিত রীতিতে এবং
নাটকীয় ভঙ্গিতে সাজিয়ে দিয়েছি।
চল্লিশতম
অধ্যায়: আংটির তেইশতম পরীক্ষা — ফ্যানিয়া
দিনের আলো তখনও পুরোপুরি
নেভেনি, যখন এই
কথোপকথন শেষ হলো। মাঙ্গোগুল তাঁর শোবার ঘরে বিশ্রাম নিতে যাওয়ার আগে আরও একবার
তাঁর আংটি পরীক্ষা করার ইচ্ছে করলেন; যদিও উদ্দেশ্য ছিল
কেবল সেই সব আনন্দময় স্মৃতির ওপর ভর করে একটু শান্তিতে ঘুমানো। তিনি সরাসরি
ফ্যানিয়ার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন; কিন্তু গিয়ে
দেখলেন তিনি সেখানে নেই। রাতের খাবার খাওয়ার পর তিনি আবার গেলেন; তখনও ফ্যানিয়া অনুপস্থিত। তাই অগত্যা তিনি তাঁর পরীক্ষা পরের দিনের
জন্য স্থগিত রাখলেন।
আফ্রিকান লেখকের দিনপঞ্জি
বা জার্নাল অনুযায়ী—যার অনুবাদ আমরা করছি—মাঙ্গোগুল পরদিন সকাল সাড়ে নটায় ফ্যানিয়ার
বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। ফ্যানিয়া সবেমাত্র বিছানায় শুয়েছিলেন। সুলতান তাঁর বালিশের
কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, কিছুক্ষণ তাঁকে ভালো করে দেখলেন, এবং ভেবে
অবাক হলেন যে—এত সাধারণ রূপ নিয়েও এই নারী কীভাবে এতগুলো রোমাঞ্চকর
অভিযানের নায়িকা হতে পারলেন!
ফ্যানিয়া ছিলেন যাকে বলে ‘বিবর্ণ ফর্সা’ (Insipidly Fair); লম্বা,
বেঢপ গড়ন, অশালীন চালচলন, চেহারায় বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, এবং
একধরনের বেপরোয়া হাবভাব—যা রাজদরবার ছাড়া অন্য কোথাও অসহ্য মনে হতো।
বুদ্ধির দিক থেকে তাঁকে ততটুকুই বুদ্ধিমান বলা যায়, যতটুকু একজন বেহায়া নারীর প্রয়োজন হয়: এবং
একজন নারীকে সত্যিই খুব নির্বোধ হয়ে জন্মাতে হবে, যদি সে
বিশটি গোপন প্রেমের পরেও কিছু চালাকি বা বুলি আয়ত্ত করতে না পারে; কারণ ফ্যানিয়া ঠিক তত দূরই এগিয়েছিলেন।
এই মুহূর্তে তিনি এমন একজন
পুরুষের দখলে ছিলেন, যিনি তাঁর চরিত্রের সঙ্গে বেশ মানানসই। সেই পুরুষটি ফ্যানিয়ার
অবিশ্বস্ততা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না; যদিও তিনি
জনসাধারণের মতো অতটা ভালো খবর রাখতেন না যে ফ্যানিয়া আসলে কত দূর পর্যন্ত
গড়িয়েছেন। তিনি ফ্যানিয়াকে গ্রহণ করেছিলেন নিছক খেয়ালবশত, এবং রেখে দিয়েছিলেন অভ্যাসবশত—ঠিক যেন ঘরের একটা পুরোনো আসবাবপত্র।
তাঁরা সারা রাত বলরুমে কাটিয়েছিলেন,
সকাল নটায় বিছানায় এসেছিলেন এবং কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই
ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আলোনজোর (প্রেমিকের নাম) এই উদাসীনতা ফ্যানিয়ার সহজ স্বভাবের
সঙ্গে বেশ খাপ খেয়ে গিয়েছিল।
সুতরাং আমাদের এই দম্পতি
যখন পিঠোপিঠি হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন,
ঠিক তখনই সুলতান ফ্যানিয়ার রত্নটির ওপর তাঁর আংটি ঘোরালেন। ওমনি
সেটি কথা বলতে শুরু করল, তার মালকিন নাক ডাকা শুরু করলেন,
আর আলোনজো ধড়মড় করে জেগে উঠল।
কয়েকবার হাই তোলার পর
রত্নটি বলল: “এটা
আলোনজো নয়... কটা বাজে?...
কে আমাকে চায়?... ধুর ছাই! আমার তো মনে
হচ্ছে আমি বেশিক্ষণ বিছানায় থাকিনি, আমাকে আরেকটু ঘুমাতে
দাও।”
রত্নটি আবার ঘুমানোর
প্রস্তুতি নিচ্ছিল; কিন্তু সুলতানের উদ্দেশ্য তো তা ছিল না। “কী অত্যাচার!” রত্নটি
বিরক্ত হয়ে বলল। “আবার
কে আমাকে বিরক্ত করছ, এবং কেন? নামী বংশের সন্তান হওয়াটাই দেখছি
বড় দুর্ভাগ্য: একটি ‘খেতাবপ্রাপ্ত রত্ন’-এর
কপাল কতই না পোড়া! যদি আমার এই একঘেয়ে জীবনের ক্লান্তি থেকে আমাকে কেউ একটুও
শান্তি দিতে পারত, তবে তা হতো সেই ভদ্রলোকের (আলোনজো) উদারতা—যার
সম্পত্তি আমি। ওহ! নিঃসন্দেহে সে এদিক থেকে পৃথিবীর সেরা মানুষ। সে আমাদের কখনো সামান্যতম
অস্বস্তিও দেয়নি: এবং এর বিনিময়ে আমরা তার দেওয়া স্বাধীনতাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছি।
আমার কী দশা হতো, হে মহান ব্রহ্মা, যদি আমি এমন কোনো নিস্তেজ
হতভাগার পাল্লায় পড়তাম, যারা সব সময় পাহারা দিয়ে রাখে?
আহা! আমরা কী চমৎকার জীবনই না কাটিয়েছি!”
এখানে রত্নটি কিছু শব্দ
বিড়বিড় করে বলল, যা মাঙ্গোগুল বুঝতে পারলেন না। তারপর সে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় একগাদা
বীরত্বপূর্ণ, হাস্যকর, ব্যঙ্গাত্মক
এবং বিয়োগান্ত-মিলনান্তক (Tragi-comic) অভিযানের কাহিনি
শোনাতে শুরু করল। একনাগাড়ে বলতে বলতে সে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছিল, তখন সে এই শর্তে থামল: “তুমি দেখছ আমার স্মৃতিশক্তি একেবারে ফেলনা নয়।
কিন্তু আমি অন্যদের মতোই; আমাকে যা বিশ্বাস করে বলা হয়েছিল, তার খুব
সামান্য অংশই আমি মনে রেখেছি। অতএব আমি যা তোমাকে বলেছি তাতেই সন্তুষ্ট থাকো,
বর্তমানে আমার আর কিছু মনে পড়ছে না।”
“এটা বেশ ভালোই ছিল,”
মাঙ্গোগুল মনে মনে বললেন; কিন্তু তবুও
তিনি আবার অনুরোধ করলেন। “আহ! তুমি বড্ড বিরক্তিকর,”
রত্নটি আবার বলে উঠল: “যেন একজন রত্নর কথা বলা ছাড়া আর
কোনো কাজ নেই! ঠিক আছে এসো,
যেহেতু বলতেই হবে, আমরা কথা বলি: সম্ভবত
আমি যখন সব বলে ফেলব, তখন আমাকে অন্য কিছু করার (মানে আসল
কাজ করার) অনুমতি দেওয়া হবে।”
“আমার মালকিন
ফ্যানিয়া,” রত্নটি বলতে শুরু করল,
“হঠাৎ এক
অবিশ্বাস্য সন্ন্যাস-জীবনের শখ চেপে বসায়, রাজদরবার ছেড়ে বানজা শহরে তার নিজের বাড়িতে
নিজেকে বন্দী করে রেখেছিল। তখন ছিল শরতের শুরু, এবং সবাই
শহরের বাইরে ছিল। তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো সে সেখানে কী করত; সত্যি বলছি, আমি বলতে পারব না। কিন্তু
ফ্যানিয়া কখনোই ‘একটি কাজ’ ছাড়া অন্য কিছু করত না; এবং যদি সে সেই কাজে নিযুক্ত
থাকত, তবে আমি তা জানতাম (কারণ আমিও তাতে অংশ নিতাম)।
সম্ভবত সে বেকার ছিল: হ্যাঁ, আমার এখন মনে পড়ছে, আমরা দেড় দিন নিখুঁত অলসতায় কাটিয়েছিলাম, যা
আমাদের এক ভয়ানক বিষণ্ণতায় ফেলে দিয়েছিল।”
“আমি এই একঘেয়ে
জীবনে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম,
যখন আমিষাদার আমাদের উদ্ধার করতে দেবদূতের মতো এসে হাজির হলো।”
“‘আহ! তুমি এসেছ, আমার বেচারা আমিষাদার,’ ফ্যানিয়া বলল, ‘সত্যিই তুমি আমাকে অনেক আনন্দ
দিয়েছ। তুমি একদম সঠিক সময়ে এসেছ।’ ‘আর কে জানত যে তুমি এই সময়ে বানজায়
আছ?’ আমিষাদার অবাক হয়ে বলল। ‘কেউ না সত্যি; এবং তুমি বা অন্য কেউ
কল্পনাও করতে পারবে না যে কী কারণে আমি এখানে এসেছি। তুমি কি কারণটা অনুমান করতে
পারছ?’ ‘না, সত্যিই, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ ‘একদমই না?’
‘না, একদমই না।’ ‘তাহলে জেনে রাখো আমার প্রিয়, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি—আমি
পরিবর্তিত (Converted) হব।’ (মানে ধর্মে মন দেব)। ‘তুমি? পরিবর্তিত হবে?’ ‘হ্যাঁ, আমি।’ ‘একটু আমার দিকে তাকাও তো: তুমি তো
আগের মতোই সুন্দরী আছ, এবং আমি তোমার মুখে এমন কিছুই দেখছি না যা দেখে মনে হয় তুমি
সন্ন্যাসিনী হতে চলেছ। এসবই তোমার কৌতুক।’ ‘না, সত্যি, আমি সিরিয়াস। আমি পৃথিবী ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি এসব
কিছুতে ক্লান্ত।’ ‘এটা একটা সাময়িক খেয়াল, যা শীঘ্রই উবে যাবে। আমি মরে
যাই, যদি তুমি কখনো সত্যিই ভক্তিতে ডুবে যাও।’ ‘আমি করবই, আমি তোমাকে বলছি: মানুষের
মধ্যে কোনো আন্তরিকতা নেই।’ ‘দয়া করে বলো, মাজুল কি তোমাকে ধোঁকা
দিয়েছে?’ ‘আমি তাকে এই যুগে দেখিনি।’ ‘তাহলে কি জুম্ফোলো?’
‘আরও কম, আমি তাকে দেখা বন্ধ করে
দিয়েছি—কবে থেকে তা আমি বলতেও পারব না, এমনকি এটা নিয়ে আমি
ভাবিওনি।’ ‘আহ! আমার মনে পড়েছে, এটা কি তরুণ ইমোলা?’ ‘ধুর! কে এমন তুচ্ছ জিনিস নিয়ে মাথা ঘামায়?’
‘তাহলে
ব্যাপারটা কী?’ ‘আমি বলতে পারছি না, আমি আসলে পুরো পৃথিবীর ওপর
রেগে আছি।’ ‘আহ ম্যাডাম, আপনি ভুল করছেন; কারণ এই পৃথিবী—যার ওপর আপনি রেগে আছেন—তা আপনাকে
আপনার ক্ষতির চেয়েও বেশি কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে।’ ‘তাহলে আমিষাদার, আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন
যে—এখনো কিছু ভালো আত্মা আছে, যারা যুগের এই দুর্নীতি থেকে
রক্ষা পেয়েছে, এবং ভালোবাসতে সক্ষম?’ ‘কী! ভালোবাসা! এটা কি সম্ভব যে আপনি এখনো সেই
করুণ সেকেলে ধারণায় বিশ্বাস করেন?
আপনি ভালোবাসতে চান? আপনি?’ ‘কেন নয়?’ ‘কিন্তু ম্যাডাম, মনে রাখবেন—যে পুরুষ
ভালোবাসে, সে একাই ভালোবাসতে চায়। আপনার এত ভালো কাণ্ডজ্ঞান আছে যে—আপনি
নিশ্চয়ই একজন কোমল এবং বিশ্বস্ত প্রেমিকের ঈর্ষা এবং খামখেয়ালিপনার কাছে নিজেকে দাসী
বানাবেন না। এই ধরনের লোকেরা বড্ড ক্লান্তিকর। কেবল তাদের দেখা, কেবল তাদের ভালোবাসা,
কেবল তাদের স্বপ্ন দেখা, কেবল তাদের
জন্যই সাজগোজ করা বা বুদ্ধি খরচ করা—এই সব নিঃসন্দেহে আপনার জন্য উপযুক্ত
নয়। আপনাকে ওই তথাকথিত ‘মহৎ আবেগে’ নিজেকে জড়াতে দেখা এবং একজন ছোট শহরের
মেয়ের মতো সস্তা প্রেমিকার অভিনয় করতে দেখাটা বেশ মজার ব্যাপার হবে।’ ‘আচ্ছা আমিষাদার, আপনার কথা ঠিকই মনে হচ্ছে।
আমি সত্যিই মনে করি যে আমাদের ওই চাটুকারপূর্ণ ভালোবাসায় ডুবে যাওয়া উচিত নয়।
তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত বদলাই, যেহেতু এটাই নিয়তি। তাছাড়া,
আমি তো দেখি না যে সেই সব তথাকথিত প্রেমময়ী মহিলারা—যাদের
আমাদের সামনে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হয়—তারা অন্যদের চেয়ে বেশি সুখী।’ ‘কে আপনাকে এটা বলল, ম্যাডাম?’ ‘কেউ না, তবে এটা সহজেই অনুমান করা যায়।’ ‘এমন দূরদৃষ্টিতে বিশ্বাস করবেন না।
একজন প্রেমময়ী নারী নিজের এবং তার প্রেমিকের সুখ তৈরি করে: কিন্তু এই ভূমিকাটি সব
নারীর জন্য উপযুক্ত নয়।’ ‘সত্যি আমার প্রিয়, এটা কারো জন্যই উপযুক্ত নয়:
কারণ যারা চেষ্টা করে, তারা সবাই শেষমেশ ভোগে। একজনের
সঙ্গে আঠার মতো লেগে থেকে কী লাভ?’ ‘হাজারটা
লাভ আছে। যে নারী তার স্নেহ একজনে স্থির রাখে, সে তার সম্মান রক্ষা করে;
সে যাকে ভালোবাসে তার কাছে দেবীর মতো পূজিত হয়; এবং আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না যে—ভালোবাসা সম্মানের কাছে কতটা ঋণী।’ ‘আমি আপনার কথার মানে বুঝতে পারছি না; আপনি সম্মান, ভালোবাসা, খ্যাতি এবং আরও কী কী যেন সব
গুলিয়ে ফেলছেন। আপনি কি বোঝাতে চান যে অস্থিরতা বা চঞ্চলতা একজন নারীকে অসম্মানিত
করে? কী আশ্চর্য! আমি একজন পুরুষকে গ্রহণ করলাম, এবং দেখলাম সে আমার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না: আমি অন্য একজনকে
গ্রহণ করলাম, এবং আবারও হতাশ হলাম: আমি তাকে তৃতীয়
একজনের জন্য পরিবর্তন করলাম, যে আগের দুজনকে টেক্কা দিতে
পারল না: এবং যেহেতু আমার কপাল খারাপ যে আমি পরপর বিশটা ভুল পছন্দ করেছি—তাই
বলে আমাকে দয়া করার বদলে, আপনি...’ ‘আমি, ম্যাডাম, এমন একজন
নারীকে পরামর্শ দেব যিনি তাঁর প্রথম পছন্দে প্রতারিত হয়েছেন—দ্বিতীয়বার
ভুল না করতে; আবার প্রতারিত হওয়ার ভয়ে, এবং এক ভুল থেকে
আরেক ভুলে ঝাঁপ দেওয়ার ভয়ে।’ ‘হে ঈশ্বর, কী অদ্ভুত আপনার নীতি! আমার
মনে হয় আমার প্রিয়, আপনি আমাকে কিছুক্ষণ আগে সম্পূর্ণ
ভিন্ন ধরনের কিছু বোঝাচ্ছিলেন। জানতে পারি কি—কোন ধরনের নারী আপনার পছন্দ?’
‘খুব আনন্দের
সঙ্গে ম্যাডাম, কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেছে, এবং আলোচনাটি খুব
দীর্ঘ হবে।’ ‘তা আরও ভালো: আমি একা, এবং আপনি আমার সঙ্গী হবেন।
তাহলে ব্যাপারটা ঠিক হয়ে গেল, তাই না? এই পালঙ্কে বসুন, এবং চালিয়ে যান: আমি আরও
আরামে শুনতে পারব।’”
“আমিষাদার বাধ্য
হলো, এবং
ফ্যানিয়ার পাশে বসল। ‘আপনার গায়ের ওই চাদরটা (Mantelet), ম্যাডাম,’ সে ফ্যানিয়ার দিকে ঝুঁকে
তাঁর বুক খানিকটা অনাবৃত করে বলল, ‘আপনাকে বড় অদ্ভুতভাবে ঢেকে রেখেছে।’ ‘আপনি ঠিকই বলেছেন।’ ‘তাহলে আপনি এমন সুন্দর জিনিস কেন
লুকিয়ে রাখেন?’ সে যোগ করল, এবং সেখানে চুমু খেল। ‘থাক, যথেষ্ট হয়েছে। আপনি কি জানেন যে আপনি পাগল?
আপনি অসহনীয়ভাবে বেপরোয়া হয়ে গেছেন। মিস্টার নীতিবাগিশ,
আপনি যে কথোপকথন শুরু করেছিলেন তা আবার শুরু করুন।’”
“‘আচ্ছা
তাহলে,’ আমিষাদার
বলল, ‘আমি
আমার প্রেমিকার মধ্যে একটি সুন্দর চেহারা, ভালো বুদ্ধি, গভীর অনুভূতি এবং সর্বোপরি
শালীনতা দেখতে চাই। আমি চাই সে আমার উপস্থিতিকে সমর্থন করুক; সে যেন আমাকে তার রূপ দিয়ে প্রতারিত না করে; সে
অন্তত একবার আমাকে ভালোভাবে বোঝাক যে আমি তার কাছে আকর্ষণীয়; এবং এমনকি আমাকে এ-ও জানাক যে কীভাবে আমি আরও আকর্ষণীয় হতে পারি। সে
যেন আমার অগ্রগতির কথা তার মনের মধ্যে গোপন না রাখে; সে
যেন আমাকে ছাড়া আর কারও কথা না শোনে, আমাকে ছাড়া আর
কারও দিকে না তাকায়; সে যেন আমাকে ছাড়া আর কিছু না ভাবে,
এমনকি স্বপ্নেও না দেখে; সে যেন কেবল
আমাকেই ভালোবাসে; কেবল আমাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে; এবং আমাকে এই সব বোঝানোর জন্য যা কিছু করা দরকার, তার বাইরে আর কিছুই না করে: এবং সবশেষে আমার ভালোবাসার কাছে নিজেকে
পুরোপুরি সঁপে দিয়ে আমাকে স্পষ্টভাবে বুঝতে দেয় যে—আমি
আমার সবকিছুর জন্য আমার ভালোবাসা এবং তার ভালোবাসার কাছে ঋণী। ওহ! কী অসাধারণ
বিজয় হবে সেটা, ম্যাডাম! এবং এমন
একজন নারীকে যে পুরুষ পাবে, সে কতই না সুখী হবে!’
‘হায়!
আমার বেচারা আমিষাদার,’ ফ্যানিয়া
বলল, ‘আপনি
নিশ্চয়ই আপনার কাণ্ডজ্ঞান হারিয়েছেন। আপনি এমন একজন নারীর ছবি এঁকেছেন যার
অস্তিত্বই নেই।’
‘আমাকে
ক্ষমা করবেন ম্যাডাম, এমন
নারী আছেন। আমি স্বীকার করছি যে তাঁরা বিরল; কিন্তু তবুও
আমি একজনের সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলাম। হায়! যদি মৃত্যু তাকে আমার কাছ
থেকে কেড়ে না নিত—কারণ মৃত্যু কেবল এমন নারীদেরই কেড়ে নেয়—তবে
সম্ভবত আমি এখন তার বাহুতেই থাকতাম।’
‘কিন্তু
তাহলে আপনি তার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছিলেন?’
‘আমি
তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম, এবং আমার আবেগের প্রমাণ দেওয়ার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতাম না। আমি
সেই মধুর তৃপ্তি পেয়েছিলাম যে আমার ভালোবাসা সাদরে গৃহীত হয়েছিল। আমি তার প্রতি
এবং সে আমার প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিল। আমাদের মধ্যে একমাত্র লড়াই ছিল—কার
ভালোবাসা বেশি শক্তিশালী; এবং
এই ছোটখাটো মান-অভিমানের মাধ্যমেই আমরা আমাদের হৃদয় একে অপরের কাছে উন্মুক্ত
করতাম। আমাদের আত্ম-বিশ্লেষণের পর আমরা একে অপরের প্রতি আরও বেশি মুগ্ধ হতাম।
আমাদের ভুল বোঝাবুঝি মেটানোর পর আমাদের আলিঙ্গনগুলো আরও বেশি কোমল এবং গভীর হয়ে
উঠত। ওহ! তখন আমাদের চোখে কী গভীর ভালোবাসা এবং সত্য খেলা করত! আমি তার চোখে
পড়তাম, এবং সে আমার চোখে পড়ত যে—আমরা
দুজনেই সমান এবং পারস্পরিক আবেগে জ্বলছি।’
‘এবং
এই সব কিছুর শেষ কোথায় হতো?’
‘সেই
সব আনন্দে—যা আমাদের চেয়ে কম প্রেমময় এবং কম আন্তরিক মানুষের কাছে
অজানা।’
‘আপনি
কি তা উপভোগ করেছেন?’
‘হ্যাঁ,
আমি উপভোগ করেছি; কিন্তু এমন একটি ভালো
জিনিসের ওপর আমি অসীম মূল্য দিয়েছিলাম। যদি সম্মান নেশাগ্রস্ত না-ও করে, তবে অন্তত এটি সেই নেশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। আমরা কোনো রাখঢাক না
রেখেই নিজেদের উন্মোচন করতাম, এবং আপনি কল্পনাও করতে
পারবেন না যে এটি আমাদের আবেগকে কতটা শক্তিশালী করেছিল। আমি তাকে যত বেশি জানতাম,
তত বেশি তার মধ্যে পরিপূর্ণতা খুঁজে পেতাম, এবং আমার আবেগ তত বাড়ত। আমি আমার দিনের অর্ধেক সময় তার পায়ে বসে
কাটাতাম, এবং বাকি অর্ধেক সময় আফসোস করতাম কেন তার কাছে
নেই। আমি তার সুখ তৈরি করতাম, এবং সে আমার সুখের পাত্র
পূর্ণ করে দিত। আমি সব সময় তাকে আনন্দের সঙ্গে দেখতাম, এবং
সব সময় বুকভরা কষ্ট নিয়ে তাকে বিদায় জানাতাম। এভাবেই আমরা একসঙ্গে থাকতাম: এবং
এখন ম্যাডাম, আপনি বিচার করুন—এমন
প্রেমময় নারীরা কি সত্যিই করুণার পাত্র?’
‘না,
তারা নয়—যদি আপনার কথা
সত্যি হয়; কিন্তু আমি এটা
বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনি যেমন বর্ণনা করছেন তেমন ভালোবাসা বাস্তবে নেই। বরং,
আমি কল্পনা করি যে আপনি যে ধরনের আবেগ অনুভব করেছেন, তা একজন পুরুষকে তার সামান্য আনন্দের জন্য অনেক বেশি মূল্য চোকাতে
বাধ্য করে।’
‘আমারও
কিছু সমস্যা ছিল ম্যাডাম, কিন্তু
আমি সেগুলো পছন্দ করতাম। আমি ঈর্ষার কিছু যন্ত্রণা অনুভব করতাম। তার মুখের
সামান্যতম পরিবর্তনও আমার পুরো সত্তায় উদ্বেগের ছায়া ফেলত।’
‘কী
পাগলামি! অনেক ভেবেচিন্তে আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে—বর্তমান
যুগের ফ্যাশনেবল উপায়ে ভালোবাসা করাই ভালো; একজন প্রেমিককে নিজের ইচ্ছামতো গ্রহণ করা, যতক্ষণ
সে আনন্দ দেয় ততক্ষণ তাকে রাখা, যখন সে বিরক্তিকর হয়ে
ওঠে তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া, অথবা যখন আমাদের মন অন্য কারও
দিকে ঝোঁকে তখন তাকে বিদায় করা। এই অস্থিরতা বা পরিবর্তনশীলতা আপনাকে এমন বিচিত্র
সব আনন্দ দেয়, যা একঘেয়ে বা অলস প্রেমিকদের অজানা।’
‘আমি
স্বীকার করছি যে এই পদ্ধতিটি ছোটখাটো রক্ষিতা এবং সাধারণ নারীদের জন্য উপযুক্ত হতে
পারে; কিন্তু কোমলতা এবং
সূক্ষ্মতা সম্পন্ন একজন পুরুষের জন্য এটি মোটেও মানানসই নয়। এটি তাকে তখনই আনন্দ
দিতে পারে, যখন তার হৃদয় মুক্ত থাকে এবং সে তুলনা করতে
ইচ্ছুক হয়। সোজা কথায়, একজন ‘সাহসী’
(বেপরোয়া) নারী আমার পছন্দের তালিকায় নেই।’
‘আপনি
ঠিকই বলেছেন, আমার প্রিয়
আমিষাদার, আপনার চিন্তাভাবনা সত্যিই মুগ্ধকর। কিন্তু আপনি
কি বর্তমানে কাউকে ভালোবাসেন?’
‘কাউকে
না ম্যাডাম, শুধু আপনাকে ছাড়া;
এবং আমি আপনাকে তা বলার সাহসও পাচ্ছি না।’
‘আহ!
আমার প্রিয়, সাহস করুন: আপনি
চালিয়ে যেতে পারেন,’
ফ্যানিয়া তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে উত্তর দিল।”
“আমিষাদার
এই উত্তরের অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল। সে পালঙ্কের ওপর এগিয়ে গেল এবং ফ্যানিয়ার
বুকের ওপর ঝুলে থাকা একটি ফিতা নিয়ে খেলতে শুরু করল;
এবং তাকে বাধা দেওয়া হলো না। তার হাত, কোনো
বাধা না পেয়ে, আরও নিচে নেমে গেল। সে তাকে দৃষ্টি দিয়ে
উত্তেজিত করতে থাকল, যা সে ভুল বোঝেনি। আমার পক্ষ থেকে,” রত্নটি বলল,
“আমি
দেখলাম, সে একজন বেশ
সংবেদনশীল পুরুষ। সে সেই ঘাড়ে একটি চুম্বন আঁকল, যার সে
এতক্ষণ ধরে প্রশংসা করছিল। তাকে থামতে বলা হলো বটে, কিন্তু
এমন এক সুরে যা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিল যে—সে যদি থামে
তবে ম্যাডাম বরং মন খারাপ করবেন; এবং সেই অনুযায়ী সে থামল না। সে তার হাতে চুমু খেল, আবার ঘাড়ে ফিরে এল, তারপর মুখে... কিছুই তাকে
আটকাতে পারল না। নিজের অজান্তেই ফ্যানিয়ার পা আমিষাদারের উরুর ওপর চলে গেল। সে
তার হাত তার ওপর রাখল: এটি নরম ছিল, এবং আমিষাদার তা
লক্ষ্য করতে ভুল করল না। তার প্রশংসাগুলো একটু এলোমেলো বা বিভ্রান্ত শোনাল। এই অন্যমনস্কতার
সুযোগে, আমিষাদারের হাত এগিয়ে গেল এবং দ্রুতগতিতে তার
হাঁটুতে পৌঁছাল। ফ্যানিয়া তখনও ঘোরের মধ্যে ছিল; এবং
আমিষাদার যখন চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন
ফ্যানিয়া হঠাত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল। সে সেই ছোট দার্শনিককে তার অসম্মানের
জন্য অভিযুক্ত করল; কিন্তু আমিষাদার তখন নিজের ঘোরে এতটাই
মগ্ন ছিল যে সে হয়তো একটা কথাও শোনেনি, অথবা অন্তত সে
তার তিরস্কারের কোনো জবাব দেয়নি—কেবল তার সুখ
পূর্ণ করা ছাড়া।”
“আমার
কাছে সে কী এক মনোমুগ্ধকর পুরুষ মনে হয়েছিল! তার আগে এবং পরে যারা এসেছিল তাদের
ভিড়ের মধ্যে, কেউই কখনো আমার এত
পছন্দের ছিল না। তার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আমি হাঁপিয়ে উঠছি। দয়া করে আমাকে
একটু শ্বাস নিতে দাও! আমার মনে হয় আমি যথেষ্ট সময় ধরে বকবক করেছি, বিশেষ করে এটা আমার প্রথম বক্তৃতা হিসেবে।”
আলোনজো (ফ্যানিয়ার বর্তমান প্রেমিক)
ফ্যানিয়ার রত্নের একটি শব্দও মিস করেনি; এবং সে মাঙ্গোগুলের চেয়ে কম অধৈর্য ছিল না বাকি কাহিনি শোনার জন্য।
কিন্তু তাদের কারোরই অধৈর্য হওয়ার সুযোগ হলো না, কারণ
গল্প বলা রত্নটি এই কথাগুলো দিয়ে আবার শুরু করল:
“গভীর
চিন্তাভাবনার পর আমি যা বুঝতে পারি তা হলো—কয়েক দিন পর
আমিষাদার গ্রামে গিয়েছিল, তাকে
শহরে থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এবং সে আমার
মালকিনের সঙ্গে তার অ্যাডভেঞ্চারের গল্প সবাইকে বলে দিয়েছিল। কারণ আমিষাদার এবং
তার এক পরিচিত ব্যক্তি—আমাদের দরজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়—হয়
ঘটনাক্রমে বা ইচ্ছাকৃতভাবে জিজ্ঞাসা করেছিল যে ম্যাডাম বাড়িতে আছেন কি না,
নিজের নাম পাঠিয়েছিল এবং ওপরে উঠে এসেছিল।”
“‘আহ!
ম্যাডাম, কে কল্পনা করতে
পারত যে আপনি বানজায় আছেন? এবং আপনি কত দিন ধরে এখানে
আছেন?’ ‘এক যুগ ধরে
আমার প্রিয়! এই পনেরো দিন ধরে আমি সমাজ ত্যাগ করেছি।’
‘আমি
কি জিজ্ঞাসা করার সাহস করতে পারি ম্যাডাম, কী কারণে?’
‘হায়!
কারণ আমি এসব কিছুতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। মহিলারা আজকাল এমন অদ্ভুত
স্বাধীনচেতা হয়ে গেছে যে তাদের সহ্য করা যায় না। হয় তাদের মতো হতে হবে,
অথবা বোকা হিসেবে পরিচিত হতে হবে; এবং
সত্যি বলতে, আমি মনে করি উভয় চরম পন্থাই এড়ানো উচিত।’
‘সত্যি
ম্যাডাম, আপনি বেশ
নীতিবাগীশ হয়ে উঠেছেন। দয়া করে বলুন, এটা কি ব্রাহ্মণ
ব্রেলিবিবির উপদেশ যা আপনার পরিবর্তন ঘটিয়েছে?’ ‘না, এটা
দর্শনের একটা ঝড়, এটা ভক্তির একটা ঝোঁক। এটা আমাকে হঠাৎ
করেই ধরেছিল; এবং এটা বেচারা আমিষাদারের দোষ নয় যে—আমি
বর্তমানে সর্বোচ্চ কঠোরতা বা সংযম অনুশীলন করছি না।’
‘তাহলে
ম্যাডাম কি তাকে সম্প্রতি দেখেছেন?’ ‘হ্যাঁ, একবার
বা দুবার।’ ‘এবং
আপনি আর কাউকে দেখেননি?’ ‘না, সত্যি।
সে-ই একমাত্র চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী ও সক্রিয় সত্তা,
যে আমার এই অনন্ত নির্জনবাসের সময় আমার দরজায় পা রেখেছে।’
‘এটা
অদ্ভুত।’
‘এবং
এতে কী অদ্ভুততা আছে?’ ‘বানজার এক মহিলার সঙ্গে তার সেদিনের একটি অ্যাডভেঞ্চার ছাড়া
আর কিছুই নয়—আপনার মতোই একা, আপনার মতোই ভক্ত, আপনার মতোই পৃথিবী থেকে
বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আমাকে আপনাকে গল্পটা বলতেই হবে: সম্ভবত এটা আপনাকে আনন্দ দেবে।’
‘নিঃসন্দেহে,’ ফ্যানিয়া
উত্তর দিল।”
“এবং
তৎক্ষণাৎ আমিষাদারের বন্ধু তার অ্যাডভেঞ্চার হুবহু বর্ণনা করতে শুরু করল,
ঠিক যেমনটি আমি করেছি,” রত্নটি বলল,
“এবং
যখন সে এখনকার মতো এত দূর অগ্রসর হয়েছিল...”
“‘আচ্ছা
ম্যাডাম,’ সে
বলল, ‘আপনি
কী ভাবছেন? আমিষাদার কি একজন
ভাগ্যবান পুরুষ নয়?’
‘কিন্তু,’ ফ্যানিয়া
উত্তর দিল, ‘আমিষাদার
হয়তো মিথ্যাবাদী: আপনি কি কল্পনা করেন যে—এমন বেহায়া
নারী আছে যারা কোনো লজ্জা ছাড়াই নিজেদের এভাবে বিলিয়ে দেয়?’ ‘কিন্তু ম্যাডাম মনে রাখবেন,’ মার্সুফা
(আমিষাদারের বন্ধু) উত্তর দিল, ‘যে আমিষাদার কারও নাম উল্লেখ করেনি,
এবং এটা খুবই অসম্ভাব্য যে সে মিথ্যা বলেছে।’
‘আমি
ব্যাপারটা বুঝতে শুরু করেছি,’ ফ্যানিয়া
বলল: ‘আমিষাদারের বুদ্ধি আছে, এবং সে একজন সুদর্শন পুরুষ; সে নিশ্চিতভাবে এই
বেচারা নির্জন মহিলার মনে কামুক আনন্দের কিছু ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা তাকে বশ করেছে। হ্যাঁ, এটাই হবে: এই ধরনের
লোকেরা বিপজ্জনক, এবং আমিষাদার সেই দিক থেকে অতুলনীয়।’
‘কী
ম্যাডাম,’ মার্সুফা
বাধা দিল, ‘আমিষাদারই
কি একমাত্র পুরুষ যার পটিয়ে ফেলার ক্ষমতা আছে?
এবং আপনি কি অন্যদের প্রতি ন্যায়বিচার করবেন না, যারা তার মতোই আপনার সম্মানের ভাগীদার হতে পারে?’ ‘দয়া করে বলুন, আপনি কাকে বোঝাতে চাইছেন?’
‘নিজেকে,
ম্যাডাম—যিনি আপনাকে একজন মনোমুগ্ধকর নারী মনে করেন,
এবং...’ ‘আমার
মনে হয় আপনি মজা করছেন। আমার দিকে তাকান মার্সুফা। আমার মুখে কোনো রং বা প্রলেপ
নেই। আমার রাতের টুপি আমাকে মোটেও মানায় না। আমাকে নিশ্চয়ই ভয়ানক দেখাচ্ছে।’
‘আপনি
ভুল করছেন ম্যাডাম: ওই অগোছালো পোশাক আপনাকে আশ্চর্যজনকভাবে মানিয়ে গেছে। এটি
আপনাকে এত আকর্ষণীয় এবং কোমল একটা ভাব এনে দিয়েছে!’”
“এই
বীরত্বপূর্ণ কথাগুলোর সঙ্গে মার্সুফা আরও কিছু যোগ করল (কাজে নেমে পড়ল)। আমি
অলক্ষ্যে কথোপকথনে (মানে কাজে) যোগ দিলাম; এবং যখন মার্সুফা আমার সঙ্গে কাজ শেষ করল, তখন
সে আমার মালকিনের সঙ্গে আবার কথা বলা শুরু করল।”
“‘সত্যিই,
আমিষাদার আপনার ‘পরিবর্তন’
বা ধর্মান্তরের চেষ্টা করেছে; ধর্মান্তরকরণে তার হাত জশ দারুণ। আপনি কি আমাকে তার নৈতিকতার একটা
নমুনা দিতে পারেন? আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে সেগুলো আমার
মতোই।’ ‘আমরা
সাহসিকতা বা প্রেমের কিছু বিষয় নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছি। আমরা একজন ‘স্নেহময়ী
নারী’
এবং একজন ‘সাহসী নারী’র (Gallant) মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করেছি। সে স্নেহময়ী নারীদের পক্ষে।’
‘এবং
আপনিও নিঃসন্দেহে?’ ‘একদমই না আমার প্রিয়। আমি তাকে বোঝানোর জন্য অনেক কষ্ট করেছি
যে আমরা সবাই একই রকম, এবং
আমরা একই নীতিতে চলি: কিন্তু সে এই মতের নয়। সে অসীম পার্থক্য খুঁজে পায়—যা
আমার মনে হয় তার কল্পনা ছাড়া আর কোথাও নেই। সে নিজের জন্য আমি জানি না কী এক আদর্শ
প্রাণী, নারীর এক কল্পিত
প্রতিমূর্তি, এক টুপি-পরা অস্তিত্বহীন সত্তা তৈরি করেছে।’
‘ম্যাডাম,’ মার্সুফা
উত্তর দিল, ‘আমি
আমিষাদারকে চিনি। সে একজন বুদ্ধিমান ছেলে, এবং সে নারীজাতির সঙ্গে খুব বেশি মেলামেশা করেছে। যদি সে আপনাকে বলে
থাকে যে এমন কিছু আছে...’ ‘ওহ!
এমন কিছু থাকুক বা না থাকুক,’ ফ্যানিয়া
বাধা দিল, ‘আমি
কখনোই তাদের রীতিনীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব না।’
‘আমি
সেটা বিশ্বাস করি,’ মার্সুফা
বলল: ‘এবং সেই অনুযায়ী আপনি আপনার জন্ম ও যোগ্যতার সঙ্গে আরও মানানসই
অন্য এক ধরনের আচরণ বেছে নিয়েছেন। সেই বোকা প্রাণীদের (সতী নারীদের) দার্শনিকদের কাছেই
ছেড়ে দিন: তাদের রাজদরবারে কখনোই দেখা যাবে না।——’”
এখানে ফ্যানিয়ার রত্নটি হঠাত থেমে
গেল। এই অদ্ভুত বক্তাদের অন্যতম প্রধান গুণ ছিল—তাদের বক্তৃতা ঠিক সময়ে
থামিয়ে দেওয়া। তারা এমনভাবে কথা বলত যেন তারা আর কিছুই করেনি (মানে রত্নটি আর ব্যবহৃত
হয়নি): যেখান থেকে কিছু লেখক অনুমান করেছেন যে তারা ছিল বিশুদ্ধ যন্ত্র। এই জায়গায়
আফ্রিকান লেখক কার্টেসিয়ানদের (দেকার্তের অনুসারী) সেই আধিভৌতিক যুক্তিগুলো তুলে
ধরেছেন—যা
তিনি রত্নদের বাচালতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছেন। সংক্ষেপে,
তাঁর মত হলো—রত্নরা পাখির গানের মতো কথা বলে; অর্থাৎ, শেখানো ছাড়াই এত নিখুঁতভাবে বলে যে,
নিশ্চিতভাবেই তারা কোনো উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত হয়।
কিন্তু আপনারা আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন
যে তিনি তাঁর রাজপুত্রকে (মাঙ্গোগুল) এখন কোথায় পাঠাবেন?
তিনি তাঁকে প্রিয়তমার সঙ্গে রাতের খাবার খেতে পাঠাচ্ছেন: অন্তত
পরের অধ্যায়ে আমরা তাঁকে সেখানেই পাব।
একচল্লিশতম
অধ্যায়: সেলিমের ভ্রমণকাহিনি
মাঙ্গোগুল, যাঁর চিন্তাভাবনা সব সময়
নিজের আনন্দকে বৈচিত্র্যময় করা এবং আংটির পরীক্ষা বাড়ানোর ওপরই নিবদ্ধ ছিল;
দরবারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রত্নগুলোকে জেরা করার পর, তিনি এবার শহরের সাধারণ রত্নদের কথা শুনতে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। কিন্তু
যেহেতু তাদের কাছ থেকে খুব একটা উচ্চমানের কিছু শোনার আশা তিনি করছিলেন না,
তাই তিনি আনন্দের সঙ্গে পরামর্শ করতে চাইলেন এবং তাদের খুঁজে বের
করার ঝামেলা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইলেন।
তাদের কীভাবে নিজের কাছে
আনবেন, তা নিয়ে
তিনি একটু বিপাকে পড়লেন। “আপনি একটি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বড্ড বেশি মাথা ঘামাচ্ছেন,”
মির্জোজা বললেন। “স্যার, আপনাকে কেবল একটি বলনাচের আয়োজন করতে হবে,
এবং আমি আপনাকে এই রাতেই সেই সব বক্তাদের (রত্নদের) এক বিশাল
সমাবেশ উপহার দেব, যা আপনি শুনতে চাইবেন।”
“আমার হৃদয়ের আনন্দ, তুমি একদম ঠিক বলেছ,” মাঙ্গোগুল উত্তর দিলেন;
“এবং তোমার কৌশলটি আরও
ভালো, কারণ আমরা
নিশ্চিতভাবে কেবল তাদেরই পাব যাদের আমাদের প্রয়োজন।”
তৎক্ষণাৎ কিসলার-আগাছি
(প্রধান খোজা) এবং উৎসবের প্রধানের কাছে আদেশ পাঠানো হলো—বলনাচের প্রস্তুতি নিতে এবং চার হাজারটির
বেশি টিকিট বিতরণ না করতে। সম্ভবত সেই দেশে ছয় হাজার লোকের জন্য কতটা জায়গা
লাগবে, সে
সম্পর্কে তাদের ধারণা অন্য জায়গার চেয়ে ভালো ছিল।
বলনাচ শুরু হতে হতে নিজেদের
বিনোদন দেওয়ার জন্য সেলিম, মাঙ্গোগুল এবং প্রিয়তমা একে অপরের সঙ্গে গল্পগুজব শুরু করলেন।
“ম্যাডাম কি জানেন,”
সেলিম প্রিয়তমাকে বললেন, “যে বেচারা কোদিন্দো (জ্যোতির্বিদ) মারা গেছেন?”
“আমি এই প্রথম শুনলাম,”
প্রিয়তমা বললেন। “কিন্তু সে কীসের জন্য মারা গেল?”
“হায় ম্যাডাম,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “সে ‘আকর্ষণ’ (Gravitation) তত্ত্বের শিকার হয়েছে। সে যৌবনে
নিউটনের এই সিস্টেম দিয়ে মাথা ভর্তি করেছিল, আর শেষ
বয়সে এসে ওটাই তার মস্তিষ্কে আঘাত করল।”
“কীভাবে?”
প্রিয়তমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“সে খুঁজে পেয়েছিল,”
সেলিম বলতে লাগলেন, “হ্যালি এবং সার্সিনো—মনোয়েমুগির দুই বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী—এর পদ্ধতি অনুসারে, কানাগলুর রাজত্বের শেষের
দিকে যে বিশেষ ধূমকেতুটি এত শোরগোল ফেলেছিল, তা গত পরশু
ফিরে আসার কথা ছিল। আর পাছে ধূমকেতুটি তার গতি বাড়িয়ে দেয় এবং সে সেটি প্রথম
দেখার সুযোগ হারায়—এই ভয়ে সে তার পর্যবেক্ষণাগারে (Observatory) রাত কাটানোর
সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবং গতকাল সকাল নটা পর্যন্ত তার চোখ টেলিস্কোপে আঠার মতো লেগে
ছিল।”
“তার ছেলে এত দীর্ঘ সময়
ধরে বসে থাকার পরিণতি আঁচ করতে পেরে,
আটটার সময় বাবার কাছে গেল, হাত ধরে
টানল এবং কয়েকবার ডাকল: ‘বাবা, বাবা।’ কিন্তু কোনো উত্তর নেই। ‘বাবা, বাবা,’ তরুণ কোদিন্দো আবার ডাকল। ‘এটা এখনই দেখা যাবে,’
কোদিন্দো বিড়বিড় করে বলল: ‘এটা দেখা যাবেই; ধুর! আমি এটা দেখবই।’ ‘কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না বাবা, বাইরে ভয়ানক কুয়াশা আছে...’ ‘আমাকে এটা দেখতেই হবে, আমি এটা দেখব, আমি তোকে বলছি।’”
“ছেলের কাছে এই উত্তরগুলো
শুনে মনে হলো যে কুয়াশা আসলে বাবার মাথাতেই ঢুকেছে। সে সাহায্যের জন্য চিৎকার
করল। বাড়ির লোকজন ছুটে এল এবং ডাক্তার ফারফাদিকে ডাকতে পাঠাল; আমি তখন তাঁর (ডাক্তারের)
সঙ্গেই ছিলাম (কারণ তিনি আমারও চিকিৎসক), যখন কোদিন্দোর
চাকর হাঁপাতে হাঁপাতে এল। ‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি স্যার, জলদি চলুন, বুড়ো কোদিন্দো, আমার মনিব...’ ‘কী হয়েছে শ্যাম্পেন? তোমার মনিবের কী হয়েছে?’ ‘স্যার, উনি পাগল হয়ে গেছেন।’ ‘তোমার মনিব পাগল হয়ে গেছেন?’
‘ওহ! হ্যাঁ স্যার। তিনি
চিৎকার করে বলছেন যে তাঁকে পশু দেখতে হবে,
তিনি পশু দেখবেন; যে তারা আসবে। ওষুধের
দোকানদার ইতিমধ্যেই তাঁর সঙ্গে আছেন, এবং তাঁরা আপনার
জন্য অপেক্ষা করছেন। জলদি চলুন।’ ‘ম্যানিয়াকাল (উন্মাদ),’
ফারফাদি বিড়বিড় করে বললেন, তাঁর গাউন
পরতে পরতে এবং টুপি খুঁজতে খুঁজতে; ‘ম্যানিয়াকাল, এক ভয়ানক ম্যানিয়াকাল ফিট।’ তারপর চাকরের
দিকে ফিরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘তোমার মনিব কি প্রজাপতি দেখছেন না? তিনি কি তাঁর কম্বলের কোণা
ধরে টানাটানি করছেন না?’ ‘ওহ! না স্যার,’
শ্যাম্পেন উত্তর দিল। ‘বেচারা তাঁর পর্যবেক্ষণাগারের ওপরে আছেন, যেখানে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ছেলে তাঁকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। জলদি চলুন, আপনার টুপিটা কাল খুঁজে নেবেন।’”
“কোদিন্দোর রোগটা আমার কাছে
একটু অদ্ভুত মনে হলো: আমি ফারফাদিকে আমার গাড়িতে তুললাম, এবং আমরা পর্যবেক্ষণাগারে
গেলাম। সিঁড়ির নিচ থেকেই আমরা কোদিন্দোকে এক উগ্র সুরে চিৎকার করতে শুনলাম: ‘আমাকে ধূমকেতু
দেখতে হবে, আমি
এটা দেখবই: সরে যা সব শয়তানের দল!’”
“সম্ভবত তাঁর পরিবারের
লোকেরা তাঁকে নিচে নামাতে না পেরে,
তাঁর বিছানা ওপরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল: কারণ আমরা
তাঁকে পর্যবেক্ষণাগারের ওপরে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখলাম। আমাদের আসার আগেই
স্থানীয় ওষুধের দোকানদার এবং এলাকার পুরোহিতকে ডাকা হয়েছিল। পুরোহিত তাঁর কানে
মন্ত্র জপছিলেন: ‘ভাই,
প্রিয় ভাই, আপনার আত্মার মুক্তি ঝুঁকির
মুখে: আপনি দিনের এই সময়ে একটি ধূমকেতু দেখার আশা করতে পারেন না: আপনি নিজেকে
অভিশপ্ত করছেন।’ ‘সেটা আমার ব্যাপার,’ কোদিন্দো বলল। ‘ব্রহ্মার সামনে গিয়ে আপনি কী উত্তর
দেবেন, যার সামনে
আপনি এখনই উপস্থিত হতে যাচ্ছেন?’
পুরোহিত ধমক দিলেন। ‘মিস্টার রেক্টর,’ কোদিন্দো টেলিস্কোপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, ‘আমার উত্তর হবে এই যে—আপনার কাজ হলো
টাকার বিনিময়ে আমাকে উপদেশ দেওয়া,
আর ওই ওষুধের দোকানদারের কাজ হলো আমাকে তার গরম জলের প্রশংসা
শোনানো; যে চিকিৎসক আমার নাড়ি টিপে কিছুই না বুঝেও তার
কর্তব্য পালন করে; আর আমি আমার নিজের কর্তব্য পালন করছি—ধূমকেতুর জন্য
অপেক্ষা করা।’ বৃথাই তারা তাঁকে বিরক্ত করল,
তাঁর কাছ থেকে আর কিছুই বের করতে পারল না: তিনি বীরের মতো শেষ
পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে গেলেন; এবং তিনি ছাদেই মারা
গেলেন—তাঁর বাম হাত চোখের ওপর রাখা,
ডান হাত টেলিস্কোপের নলে, এবং ডান চোখ
আই-পিসে (Eye-piece) লাগানো। তাঁর ছেলে চিৎকার করে বলছিল
যে বাবার গণনায় ভুল ছিল; ওষুধের দোকানদার তাঁকে এনিমা
দেওয়ার চেষ্টা করছিল; ডাক্তার মাথা নেড়ে ঘোষণা করলেন যে
আর কিছুই করার নেই; এবং পুরোহিত বিড়বিড় করে বলছিলেন: ‘ভাই, অনুশোচনা করুন, এবং নিজেকে ব্রহ্মার কাছে সমর্পণ করুন...’”
“একে বলে,”
মাঙ্গোগুল বললেন, “যাকে তারা ‘সম্মানের বিছানায় মৃত্যু’ বলে।”
“বেচারা কোদিন্দোকে বাদ দাও,”
প্রিয়তমা যোগ করলেন, “ওকে শান্তিতে ঘুমাতে দাও, এবং আরও আনন্দদায়ক বিষয়ে
যাওয়া যাক।” তারপর তিনি সেলিমের দিকে ফিরে বললেন, “আমার প্রভু, যেহেতু আপনি এই বয়সেও এত সাহসী, এত বুদ্ধিমান,
প্রতিভাবান এবং সুপুরুষ, এবং আপনি এমন
এক দরবারে বাস করতেন যা আনন্দের প্রতি নিবেদিত ছিল; তাই
রত্নরা যদি আগে আপনার খ্যাতির গুণগান করে থাকে তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে
আমার সন্দেহ হচ্ছে যে—তারা আপনার সম্পর্কে যা জানত তার সবটুকু বলেনি। আমার
ওই বাড়তি তথ্যের দরকার নেই: আপনার সেটা গোপন করার ভালো কারণ থাকতেই পারে। কিন্তু
এই ভদ্রলোকেরা (রত্নরা) আপনাকে যেসব অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে সম্মানিত করেছে, তার পরে আপনার নারীজাতিকে
খুব ভালোভাবেই চেনা উচিত: এবং এটি এমন একটি তুচ্ছ বিষয়, যা
আপনি নিরাপদে স্বীকার করতে পারেন।”
“এই প্রশংসা ম্যাডাম,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “বিশ বছর বয়সে হলে আমার আত্মপ্রেমকে মুগ্ধ করত:
কিন্তু আমি এখন কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি,
এবং আমার প্রথম উপলব্ধিগুলোর মধ্যে একটি হলো—এই ব্যবসা
(প্রেম) যত বেশি অনুশীলন করা হয়, তত কম জ্ঞান অর্জন করা যায়। আমি, নারীদের
জানি! না, তবে আমি যে তাদের নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি,
তা মেনে নেওয়া যেতে পারে।”
“আচ্ছা, আপনি তাদের সম্পর্কে কী
ভাবেন?” প্রিয়তমা
জিজ্ঞেস করলেন।
“ম্যাডাম,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “তাদের রত্নগুলো তাদের সম্পর্কে যা কিছুই প্রকাশ
করুক না কেন, আমি
পুরো নারীজাতিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখি।”
“সত্যিই আমার বন্ধু,”
সুলতান টিপ্পনী কাটলেন, “তুমি নিজেই একটা ‘রত্ন’ হওয়ার যোগ্য; তোমার কোনো মুখবন্ধের (Muzzle)
প্রয়োজন হবে না।”
“সেলিম,”
সুলতানা যোগ করলেন, “ব্যঙ্গ করার স্বভাব ত্যাগ করো, এবং সত্যি কথা বলো।”
“ম্যাডাম,”
দরবারী উত্তর দিলেন, “আমি সম্ভবত আমার বর্ণনার সঙ্গে কিছু অপ্রীতিকর
সত্য মিশিয়ে ফেলতে পারি: আমাকে এমন একটি জাতিকে অপমান করার কাজে বাধ্য করবেন না, যারা সব সময় আমার সঙ্গে
যথেষ্ট ভালো আচরণ করেছে এবং যাদের আমি শ্রদ্ধা করি...”
“কী! সব সময় শ্রদ্ধা! আমি
মিষ্টিভাষী লোকেদের চেয়ে বেশি খিটখিটে আর কাউকে জানি না, যখন তারা আসল রূপ দেখায়,” মির্জোজা মাঝপথে বাধা দিলেন;
এবং মনে করলেন যে সেলিমের এই দ্বিধার কারণ হলো তাঁর (সুলতানার)
প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। “আমার উপস্থিতি যেন আপনাকে আড়ষ্ট না করে,”
তিনি যোগ করলেন: “আমরা কেবল নিজেদের বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা
করছি; এবং আমি
আমার সম্মানের শপথ করে বলছি যে—আপনি আমার জাতি সম্পর্কে যা কিছু মজার
কথা বলবেন, তা
আমি নিজের ওপর প্রয়োগ করব, আর বাকিটা (খারাপ কথাগুলো)
অন্য মহিলাদের জন্য ছেড়ে দেব। আচ্ছা, আপনি নারীদের নিয়ে
অনেক গবেষণা করেছেন? দয়া করে, আপনার
সেই গবেষণার গতিপথ সম্পর্কে আমাদের একটু বিবরণ দিন: আপনার সাফল্যের বহর দেখে মনে
হচ্ছে সেটা বেশ চমকপ্রদ হবে।”
বৃদ্ধ দরবারী সুলতানার
ইচ্ছা পূরণ করলেন, এবং এভাবে শুরু করলেন:
“রত্নরা, আমি স্বীকার করছি, আমার সম্পর্কে অনেক কথাই বলেছে: কিন্তু তারা সব বলেনি। যারা আমার
ইতিহাস সম্পূর্ণ করতে পারত, তারা হয় আর বেঁচে নেই,
অথবা আমাদের এই দেশে নেই: এবং যারা শুরু করেছে, তারা কেবল হালকাভাবে বিষয়টা ছুঁয়ে গেছে। আমি এতক্ষণ পর্যন্ত তাদের
কাছে দেওয়া গোপনীয়তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি; যদিও
তাদের চেয়ে আমার বলার মতো অনেক রসালো গল্প ছিল: কিন্তু যেহেতু তারাই নীরবতা
ভেঙেছে, তাই আমি মনে করি তারা আমাকে সেই প্রতিশ্রুতির
বাঁধন থেকে মুক্তি দিয়েছে।”
“একটি কামুক
স্বভাব নিয়ে জন্মানোর ফলে,
আমি একজন সুন্দরী নারী কী—তা জানার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভালোবাসতে
শুরু করেছিলাম। আমার এমন গভর্নেস ছিল যাদের আমি ঘৃণা করতাম; কিন্তু বিনিময়ে আমি আমার
মায়ের পরিচারিকাদের সঙ্গ খুব উপভোগ করতাম। তারা বেশির ভাগই ছিল তরুণী এবং
সুন্দরী: তারা আমার সামনে কোনো রাখঢাক ছাড়াই কথা বলত, পোশাক
পরত এবং ছাড়ত; তারা এমনকি আমাকে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতেও
উস্কাত, এবং আমার স্বভাবগতভাবেই সাহসিকতার (প্রেমের)
প্রতি ঝোঁক থাকায় আমি সব সুযোগ লুফে নিতাম। এই প্রাথমিক শিক্ষার পর, পাঁচ বা ছয় বছর বয়সে আমাকে পুরুষদের তত্ত্বাবধানে রাখা হলো; এবং ঈশ্বর জানেন আমি তাদের কাছে কতটা উন্নতি করেছিলাম! যখন প্রাচীন
লেখকদের বই আমার হাতে দেওয়া হলো, এবং আমার শিক্ষকরা
নির্দিষ্ট কিছু অংশ ব্যাখ্যা করলেন—যার অর্থ সম্ভবত তারা নিজেরাই বুঝতে পারেননি।
আমার বাবার খাস-পরিচারকরা (Pages)
আমাকে কিছু চমৎকার ‘কলেজ-কৌশল’ শিখিয়েছিল: এবং ‘অ্যালোসিয়া’ (Aloysia - সম্ভবত একটি ইরোটিক
বই) পড়ে আমার মনে নিজেকে নিখুঁত করার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা জাগল। তখন আমার বয়স
চৌদ্দ বছর।”
“আমি আমার
চারপাশে চোখ বুলিয়ে বাড়িতে আসা মহিলাদের মধ্যে একজনকে খুঁজছিলাম, যার কাছে আমি আমার প্রেম
নিবেদন করতে পারি: কিন্তু তারা সবাই আমাকে আমার এই বিরক্তিকর নির্দোষতার (Innocence)
বোঝা থেকে মুক্তি দিতে সমানভাবে উপযুক্ত মনে হলো। অবশেষে,
পরিচিতির সুবাদে এবং আমার সমবয়সী কাউকে আক্রমণ করার সাহস থাকার
কারণে—যা অন্যদের ক্ষেত্রে আমার ছিল না—আমি
আমার এক কাজিন এমিলিয়াকে বেছে নিলাম। এমিলিয়া ছিল যুবতী, এবং আমিও ছিলাম তরুণ: আমি
তাকে সুন্দরী মনে করতাম, এবং সে আমাকে পছন্দ করত: সে খুব
একটা কঠিন ছিল না, এবং আমি ছিলাম উদ্যোগী: আমি শিখতে
চাইতাম, এবং সে-ও জানতে কম আগ্রহী ছিল না। আমরা প্রায়ই
একে অপরকে খুব স্পষ্ট এবং কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতাম: এবং একদিন সে তার
অভিভাবকদের নজর এড়িয়ে আমার কাছে এল, এবং আমরা একে অপরকে
শেখালাম। আহ! প্রকৃতি কত বড় শিক্ষক! এটি শীঘ্রই আমাদের আনন্দের রাজপথে নিয়ে গেল,
এবং আমরা পরিণতির কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা না করেই তার প্ররোচনায়
নিজেদের ভাসিয়ে দিলাম। এমিলিয়ার কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিল, যা সে লুকানোর খুব একটা চেষ্টা করল না, কারণ
সে এর কারণটাই জানত না। তার মা তাকে জেরা করলেন, আমাদের
সম্পর্কের কথা বের করলেন, এবং আমার বাবাকে জানানো হলো।
তিনি আমাকে কিছু বকুনি দিলেন বটে, কিন্তু তাতে একধরনের
সন্তুষ্টির ছাপ ছিল; এবং অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো
যে আমাকে ভ্রমণে পাঠানো হবে। আমি একজন গভর্নরের সঙ্গে যাত্রা করলাম, যাকে আমার ওপর নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আমাকে খুব বেশি কড়াকড়ি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ
মাস পর, খবরের কাগজ মারফত জানলাম যে এমিলিয়া গুটিবসন্তে
মারা গেছে; এবং আমার বাবার চিঠিতে জানলাম যে, আমার প্রতি তার অতিরিক্ত ভালোবাসাই তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমার
ভালোবাসার প্রথম ফসল (সন্তান) এখন সুলতানের সেনাবাহিনীতে বীরত্বের সঙ্গে কাজ করছে:
আমি সর্বদা তাকে আমার প্রভাব দিয়ে সাহায্য করেছি, এবং আজ
পর্যন্ত সে আমাকে কেবল তার একজন হিতাকাঙ্ক্ষী বা রক্ষক হিসেবেই জানে।”
“আমরা তিউনিসে
ছিলাম, যখন
আমি তার জন্ম এবং তার মায়ের মৃত্যুর খবর পেলাম। তার ভাগ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ
করেছিল, এবং আমি বিশ্বাস করি যে আমি শোকে পাথর হয়ে যেতাম,
যদি না আমি এক জাহাজ-ক্যাপ্টেনের স্ত্রীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তাম—যে আমাকে
হতাশ হওয়ার সময়ই দেয়নি। তিউনিসিয়ান মহিলাটি ছিল নির্ভীক, এবং আমি ছিলাম বেপরোয়া: সে
আমাকে একটা দড়ির মই ছুড়ে দিত, আর আমি প্রতি রাতে আমার
আস্তানা থেকে তার ছাদে যেতাম, এবং সেখান থেকে একটা ছোট
ঘরে ঢুকতাম... এমিলিয়া যেখানে শেষ করেছিল, সে সেখান
থেকেই শুরু করল। তার স্বামী এক সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরে এলেন, ঠিক সেই সময় যখন আমার গভর্নর আমাকে ইউরোপে যাওয়ার জন্য তাড়া
দিচ্ছিলেন। আমি লিসবনের উদ্দেশে একটি জাহাজে উঠলাম, তবে
তার আগে এলভিরাকে (তিউনিসিয়ান প্রেমিকা) বেশ কয়েকবার বিদায় জানিয়ে এলাম—যার
কাছ থেকে আমি এই হীরাটি উপহার পেয়েছি।”
“যে জাহাজে আমরা
যাত্রা করছিলাম, সেটি মালামালে ঠাসা ছিল; কিন্তু আমার রুচি
অনুযায়ী জাহাজের সবচেয়ে মূল্যবান পণ্যটি ছিল ক্যাপ্টেনের স্ত্রী। তার বয়স বিশের
কোঠায়ও পৌঁছায়নি: এবং তার স্বামী তার প্রতি বাঘের মতো ঈর্ষান্বিত ছিল—এবং
সেটা অকারণে নয়। আমরা সবাই শীঘ্রই একে অপরকে বুঝে ফেললাম: ডোনা ভেলিনা বুঝতে পারল
যে আমার তার প্রতি দুর্বলতা আছে;
আমি বুঝলাম যে সে আমার প্রতি উদাসীন নয়; এবং তার স্বামী বুঝল যে সে আমাদের দুচোখের বিষ। নাবিক ব্যাটা লিসবনে না
পৌঁছানো পর্যন্ত আমাদের চোখের আড়াল না করার সিদ্ধান্ত নিল। আমি তার প্রিয়
স্ত্রীর চোখে পড়লাম—স্বামীর এই বাড়াবাড়ি তাকে কতটা বিরক্ত
করছে: আমার চোখও তাকে একই বার্তা দিল,
এবং স্বামী আমাদের ইশারা চমৎকারভাবে বুঝতে পারল। আমরা দুই দিন
ধরে কামনার এক অসহ্য যন্ত্রণায় কাটালাম; যা নিশ্চিতভাবেই
আমাদের মেরে ফেলত, যদি না স্বর্গ আমাদের সাহায্য করত:
কিন্তু স্বর্গ সর্বদা পীড়িত আত্মাদের সাহায্য করে। আমরা জিব্রাল্টার প্রণালী পার
হওয়ার ঠিক পরেই, এক প্রচণ্ড ঝড় উঠল। আমি এখন চাইলে
আপনার কানে ঝোড়ো হাওয়া বইয়ে দিতে পারতাম, আপনার মাথার
ওপর বজ্রপাত ঘটাতে পারতাম; বিদ্যুৎ দিয়ে আকাশ চিরে
ফেলতাম; ঢেউগুলোকে মেঘ পর্যন্ত তুলে দিতাম... যদি না আমি
আপনাকে একটি সত্য ইতিহাস বলতাম। আমি কেবল আপনাকে এটুকুই বলব যে, নাবিকদের চিৎকারে ক্যাপ্টেন তার কেবিন ছেড়ে যেতে এবং এক বিপদ এড়াতে
গিয়ে নিজেকে আরেক বিপদে ফেলতে বাধ্য হলো। সে আমার গভর্নরের সঙ্গে ডেকে উঠে গেল,
আর আমি কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমার সুন্দরী পর্তুগিজের বাহুতে
ঝাঁপিয়ে পড়লাম; সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম যে পৃথিবীতে সমুদ্র,
ঝড় বা তুফান বলে কিছু আছে; ভুলে গেলাম
যে আমরা এক দোল খাওয়া জাহাজে আছি; এবং নিজেকে
নির্দ্বিধায় সেই বিশ্বাসঘাতক প্রকৃতির কাছে সঁপে দিলাম। আমাদের গতি ছিল ঝড়ের
মতোই দ্রুত, এবং আপনি সহজেই অনুমান করতে পারেন ম্যাডাম,
সেই আবহাওয়ায় আমি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কতটা ‘ভূমি’ (মানে
সুখ) দেখলাম। আমরা ক্যাডিজ বন্দরে পৌঁছলাম, যেখানে আমি সিগনোরার কাছে কথা দিয়ে এলাম যে
লিসবনে তার সঙ্গে দেখা করব—যদি আমার মেন্টর (গভর্নর) রাজি হন, যাঁর উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি
মাদ্রিদে যাওয়া।”
“স্প্যানিশ
মহিলারা আমাদের দেশের নারীদের চেয়ে অনেক বেশি সংযত এবং বেশি প্রেমময়। সেই দেশে
প্রেম পরিচালিত হয় এক ধরনের দূত বা দালালদের মাধ্যমে—যাদের কাজ হলো বিদেশীদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের কাছে প্রস্তাব পৌঁছে
দেওয়া, এবং তাদের গোপন জায়গায় আনা-নেওয়া করা; আর মহিলারা দায়িত্ব নেয় তাদের খুশি করার। পরিস্থিতির কারণে আমাকে এই
সব ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। সম্প্রতি এক বড় বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের
রাজপরিবারের এক রাজপুত্র স্পেনের সিংহাসনে বসেছিলেন: তাঁর আগমন এবং রাজ্যাভিষেক
উপলক্ষে দরবারে উৎসব চলছিল, যেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
এক মাস্ক্যারেড বা মুখোশ-নাচের আসরে আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হলো; এবং পরদিন দেখা করার ব্যবস্থা করা হলো। আমি চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলাম
এবং একটি ছোট বাড়িতে গেলাম। সেখানে আমি কেবল এক মুখোশধারী পুরুষকে পেলাম—যার
নাক আলখাল্লায় ঢাকা ছিল—যিনি আমাকে একটি চিঠি দিলেন। চিঠিতে ডোনা
ওরোপেজা জানালেন যে তিনি পরদিন একই সময়ে দেখা করবেন। আমি ফিরে এলাম, এবং পরদিন এক জাঁকজমকপূর্ণ
সাজানো ও মোমবাতি দিয়ে আলোকিত কামরায় প্রবেশ করলাম। আমার দেবী আমাকে বেশিক্ষণ
অপেক্ষা করালেন না। তিনি আমার ঠিক পেছনেই প্রবেশ করলেন, এবং
একটি শব্দও না বলে বা মুখোশ না খুলে সোজা আমার বাহুতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সে কি
কুৎসিত ছিল? নাকি সুন্দরী? আমি
জানতাম না। সোফায়—যেখানে সে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল—আমি
কেবল লক্ষ্য করলাম যে সে যুবতী,
সুগঠিত এবং আনন্দ ভালোবাসে। যখন সে আমার ‘প্রশংসায়’ (কাজে)
সন্তুষ্ট হলো, তখন সে মুখোশ খুলল, এবং আমাকে এই ছবির আসল
মানুষটিকে দেখাল—যা আপনি আমার নস্যির কৌটোয় দেখছেন।”
সেলিম কৌটোটি খুললেন এবং
প্রিয়তমার হাতে দিলেন। এটি ছিল সোনার তৈরি এবং চমৎকার কারুকার্য ও রত্নখচিত। “উপহারটি চমৎকার,”
মাঙ্গোগুল বললেন। “আমি এতে সবচেয়ে বেশি যার কদর করছি,”
প্রিয়তমা যোগ করলেন, “তা হলো প্রতিকৃতিটি। কী চোখ! কী মুখ! কী গলা!
কিন্তু এগুলো কি বাড়িয়ে আঁকা নয়?”
“খুবই সামান্য ম্যাডাম,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “ওরোপেজা সম্ভবত আমাকে মাদ্রিদে আটকে রাখত, যদি না তার স্বামী আমাদের
সম্পর্কের কথা জেনে গিয়ে হুমকি দিয়ে বাগড়া দিত। আমি ওরোপেজাকে ভালোবাসতাম,
কিন্তু জীবনটাকে আরও বেশি ভালোবাসতাম। তাছাড়া, আমার গভর্নরও এই মতের ছিলেন না যে—তার স্ত্রীকে আরও কয়েক মাস ভোগ করার
জন্য আমার কোনো ঈর্ষান্বিত স্বামীর হাতে খুন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া উচিত। তাই আমি সুন্দরী
স্প্যানিশ ডোনার কাছে এক অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী বিদায়ী চিঠি লিখলাম—যা আমি আসলে
ওই দেশের কোনো এক সস্তা প্রেমের উপন্যাস থেকে চুরি করেছিলাম—এবং ফ্রান্সের
উদ্দেশে রওনা হলাম।”
“ফ্রান্সে তখন যে
রাজা রাজত্ব করছিলেন, তিনি ছিলেন স্পেনের রাজার দাদা; এবং তাঁর
দরবারকে ইউরোপের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ, মার্জিত এবং শৌখিন
বলে গণ্য করা হতো। আমি সেখানে এক অদ্ভুত ‘নমুনা’ হিসেবে হাজির হলাম। ‘কঙ্গোর এক তরুণ লর্ড!’ এক
সুন্দরী মারকুইস অবাক হয়ে বললেন। ‘এটা নিশ্চয়ই খুব মজার হবে: এই পুরুষরা
আমাদের দেশের পুরুষদের চেয়ে ভালো হয়। আমার মনে হয় কঙ্গো মরক্কো থেকে খুব বেশি
দূরে নয়।’ নৈশভোজের আয়োজন করা হলো, যেখানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। আমার
কথাবার্তায় সামান্যতম বুদ্ধি থাকলেও, তাকে ‘অসাধারণ’ এবং
‘চমৎকার’ বলে বাহবা দেওয়া হলো: যারা প্রথমে আমাকে বোকা ভেবেছিলেন, তাঁরাও তাঁদের মত পাল্টালেন। ‘সে একজন আকর্ষণীয় পুরুষ,’
অন্য এক দরবারের মহিলা চটপট বললেন: ‘এত সুন্দর
একটা ছেলেকে ওই দুঃখের দেশে ফিরে যেতে দেওয়াটা পাপ হবে—যেখানে মেয়েদের পাহারা দেয় এমন সব পুরুষ
যারা আর পুরুষই নয় (খোজা)। এটা কি সত্যি স্যার? শোনা যায়, ওদের নাকি কিছুই থাকে না? একজন পুরুষের জন্য
এটা খুব অশোভন।’ ‘কিন্তু,’ আরেকজন যোগ করলেন, ‘আমাদের এই বড় ছেলেটিকে এখানে রাখতেই হবে
(যেহেতু সে সম্ভ্রান্ত বংশের),
এমনকি যদি তাকে কেবল মাল্টার নাইট (সন্ন্যাসী যোদ্ধা) বানানো
হয়। আমি কথা দিচ্ছি, যদি আপনি চান, আমি তাকে একটা চাকরি জুটিয়ে দেব; এবং আমার
পুরোনো বান্ধবী ডাচেস ভিক্টোরিয়া, প্রয়োজনে রাজার কাছে
তার হয়ে সুপারিশ করবেন।’”
“আমি শীঘ্রই
তাদের সদিচ্ছার অকাট্য প্রমাণ পেলাম,
এবং মারকুইসকে মরক্কো ও কঙ্গোর পুরুষদের যোগ্যতার ব্যাপারে মতামত
দেওয়ার সুযোগ করে দিলাম। আমি দেখলাম যে ডাচেস এবং তাঁর বান্ধবী আমাকে যে চাকরির
প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পালন করা কঠিন ছিল; তাই আমি তা ছেড়ে দিলাম। এই বিরতির সময়েই আমি চব্বিশ ঘণ্টার সেই ‘মহৎ
আবেগ’ বা ক্ষণস্থায়ী প্রেম তৈরি করতে শিখলাম। আমি ছয় মাস ধরে এক ঘূর্ণাবর্তে
ঘুরপাক খেলাম, যেখানে একটি অ্যাডভেঞ্চার শেষ হওয়ার আগেই অন্যটি শুরু হয়ে যেত;
কারণ উপভোগই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। অথবা যদি তা পেতে দেরি হতো,
বা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন ভরে যেত, তবে
আমরা নতুন আনন্দের সন্ধানে ছুটে যেতাম।”
“তুমি আমাকে কী বলছ সেলিম?”
প্রিয়তমা বাধা দিলেন। “তাহলে ওই দেশগুলোতে শালীনতা বলে কি কিছুই
নেই?”
“আমাকে ক্ষমা করবেন ম্যাডাম,”
বৃদ্ধ দরবারী উত্তর দিলেন। “তাদের মুখে শালীনতা ছাড়া আর কোনো কথাই
থাকে না। কিন্তু ফরাসি নারীরা তাদের প্রতিবেশীদের চেয়ে কামনার প্রতি বেশি আসক্ত নয়।”
“কোন প্রতিবেশী?”
মির্জোজা জানতে চাইলেন।
“ইংরেজ মহিলারা,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “যারা দেখতে ঠান্ডা এবং অবজ্ঞাপূর্ণ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা
আবেগপ্রবণ, কামুক, এবং
প্রতিহিংসাপরায়ণ; ফরাসি নারীদের চেয়ে কম বুদ্ধিমান
কিন্তু বেশি যুক্তিবাদী। এরা আবেগের বুলি পছন্দ করে, তারা
আনন্দের প্রকাশ্য ভঙ্গি ভালোবাসে। কিন্তু লন্ডনেও প্যারিসের মতোই—মানুষ ভালোবাসে, আলাদা হয়, আবার নতুন করে আলাদা হওয়ার জন্যই একত্রিত হয়। একজন লর্ড বিশপের (এরা
একধরনের ব্রাহ্মণ যারা ব্রহ্মচর্য পালন করে না) মেয়ের কাছ থেকে আমি এক ব্যারনেটের
স্ত্রীর কাছে গেলাম। যখন তিনি হাউজ অফ কমন্সে (পার্লামেন্টে) সরকারের বিরুদ্ধে
জাতির স্বার্থে গরম গরম ভাষণ দিচ্ছিলেন; তখন তাঁর স্ত্রী
এবং আমি তাঁর বাড়িতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ‘বিতর্কে’ লিপ্ত ছিলাম। কিন্তু অধিবেশন শেষ হলো, এবং ম্যাডামকে বাধ্য হয়ে
তাঁর নাইটের (স্বামী) সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হলো। আমি তখন এক কর্নেলের
স্ত্রীর পাল্লায় পড়লাম... আমি পরে লেডি মেয়রেসের (মেয়েরের স্ত্রী) খপ্পরে
পড়লাম। আহ! কী মহিলা! আমি কঙ্গোকে আর কোনো দিন দেখতাম না, যদি আমার গভর্নরের বিচক্ষণতা—যিনি আমাকে ক্ষয় হয়ে যেতে দেখছিলেন—আমাকে এই নরক
থেকে উদ্ধার না করত। তিনি আমার পরিবারের কাছ থেকে কিছু জাল চিঠি তৈরি করলেন, যা আমাকে দ্রুত দেশে ফিরতে
বাধ্য করল, এবং আমরা হল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হলাম:
আমাদের উদ্দেশ্য ছিল জার্মানি হয়ে ইতালিতে যাওয়া, যেখান
থেকে আফ্রিকায় যাওয়ার জাহাজ পাওয়া সহজ।”
“হল্যান্ডকে আমরা
কেবল জানালার বাইরে দিয়ে সরে যেতে দেখলাম (দ্রুত পার হলাম); এবং জার্মানিতেও বেশি দিন
থাকলাম না। সেখানকার সমস্ত উচ্চপদস্থ মহিলা যেন এক-একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গের মতো—যাদের
রীতিমতো আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ করে জয় করতে হয়। তাদের বশ করা যায়, কিন্তু কাছে যাওয়ার জন্য এত
আয়োজন লাগে, আত্মসমর্পণের শর্ত ঠিক করতে এত ‘যদি’ এবং
‘কিন্তু’ থাকে যে, সেই বিজয়গুলো শীঘ্রই আমাকে ক্লান্ত করে তুলল।”
“আমি কখনোই ভুলব
না এক জার্মান অভিজাত মহিলার উক্তি—যিনি আমাকে এমন কিছু দেওয়ার কথা বলছিলেন
যা তিনি অন্যদেরও দেননি। ‘হায়!’ তিনি দুঃখের সঙ্গে কেঁদে উঠলেন, ‘আমার বাবা মহান আলকিজি কী বলতেন, যদি তিনি জানতেন যে আমি
কঙ্গোর মতো এমন এক নিচু জাতের প্রাণীর কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছি।’ ‘তিনি কিছুই বলতেন না ম্যাডাম,’
আমি উত্তর দিলাম: ‘এত মহত্ত্ব আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে, তাই আমি সরে যাচ্ছি।’ এটা
আমার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ ছিল;
কারণ যদি আমার সাধারণত্ব তাঁর আভিজাত্যের সঙ্গে মিশে যেত,
তবে হয়তো আমাকে পরে পস্তাতে হতো। ব্রহ্মা, যিনি আমাদের এই স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া রক্ষা করেন, নিঃসন্দেহে সেই সংকটময় মুহূর্তে আমাকে সুবুদ্ধি দিয়েছিলেন।”
“ইতালীয় মহিলারা—যাদের
সঙ্গে আমরা পরে মেলামেশা করলাম—তারা এত নাক-উঁচু স্বভাবের ছিল না। তাদের
সঙ্গেই আমি আনন্দের প্রকৃত কৌশলগুলো শিখলাম। সেই সব সূক্ষ্মতার মধ্যে সত্যিই অনেক
খেয়ালিপনা এবং খামখেয়ালি আছে;
কিন্তু আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন মহিলারা, যদি আমি বলি যে—কখনো কখনো ওসব ছাড়া আপনাদের পুরোপুরি
খুশি করা যায় না। ভেনিস এবং রোম থেকে আমি কিছু মজার ‘রেসিপি’ (কৌশল) নিয়ে এসেছি যা আমাদের এই বর্বর
দেশে আমার আগে অজানা ছিল। কিন্তু আমি তার সমস্ত কৃতিত্ব ইতালীয় মহিলাদেরই দিচ্ছি, যারা আমাকে ওগুলো
শিখিয়েছিল।”
“আমি ইউরোপে
প্রায় চার বছর কাটিয়েছি, এবং মিশর হয়ে এই সাম্রাজ্যে ফিরে এসেছি, যেমনটি
আপনারা দেখছেন—ইতালির সেই বিরল গোপন রহস্যগুলো সঙ্গে নিয়ে, যা আমি খুব শীঘ্রই এখানে
প্রচার করেছি।”
এখানে আফ্রিকান লেখক বলেন, সেলিম বুঝতে পারলেন যে তাঁর
ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনি এবং বিভিন্ন দেশের নারীদের চরিত্র সম্পর্কে তিনি প্রিয়তমার
কাছে যে সাধারণ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তা মাঙ্গোগুলকে গভীর
ঘুমে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। তাই তিনি সুলতানকে জাগানোর সাহস না করে প্রিয়তমার কাছে
আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে নিচু গলায় বলতে লাগলেন:
“ম্যাডাম,”
তিনি বললেন, “যদি আমি ভয় না পেতাম যে,
একটি গল্প দিয়ে আমি আপনাকে বিরক্ত করে ফেলছি—যা হয়তো ইতিমধ্যেই
অনেক দীর্ঘ হয়ে গেছে; তবে আমি আপনাকে সেই দুঃসাহসিক অভিযানের কথা বলতাম, যার মাধ্যমে আমি প্যারিসে পা রাখার পরপরই আমার কাজ শুরু করেছিলাম: আমি
ভাবতেই পারছি না কী করে এটা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেল।”
“বলুন, আমার প্রিয় বন্ধু,” প্রিয়তমা উৎসাহিত হয়ে বললেন;
“আমি আমার মনোযোগ
দ্বিগুণ করব, এবং
সুলতানের অমনোযোগের ক্ষতিপূরণ দেব—যিনি কিনা ঘুমাচ্ছেন।”
“মাদ্রিদে,”
সেলিম বলে চললেন, “আমরা ফ্রান্সের দরবারের কিছু লর্ডের জন্য
সুপারিশপত্র নিয়েছিলাম, এবং প্যারিসে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বন্ধুত্বের নিমন্ত্রণে ডুবে
গেলাম। তখন ছিল বছরের সবচেয়ে মনোরম ঋতু, এবং সন্ধ্যায়
আমার গভর্নর ও আমি ‘প্যালে রয়েল’-এর
বাগানে হাঁটতে যেতাম। একদিন সেখানে কিছু শৌখিন বাবু (Petits-maîtres) আমাদের সঙ্গে
যোগ দিল। তারা আমাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত সুন্দরীদের
চেনাতে লাগল, এবং তাদের সত্য-মিথ্যা ইতিহাস বলতে লাগল—অবশ্য
প্রতিবারই নিজেদের নামটা তার সঙ্গে জুড়ে দিতে ভুলল না, যেমনটা আপনি সহজেই কল্পনা
করতে পারেন। বাগানটি ইতিমধ্যেই প্রচুর মহিলার ভিড়ে জমজমাট ছিল; কিন্তু প্রায় আটটার দিকে একঝাঁক নতুন মহিলা এসে পৌঁছাল। তাদের গয়নার
বহর, পোশাকের জাঁকজমক এবং পরিচারকদের ভিড় দেখে আমি তাদের
অন্তত ডাচেস (Duchess) ভেবেছিলাম। আমি সঙ্গীদের একজনকে
আমার ধারণাটা বললাম। সে উত্তরে বলল যে, সে বুঝতে পেরেছে
আমি একজন জহুরি; এবং যদি আমি ইচ্ছুক হই, তবে সেই রাতেই তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী কয়েকজনের সঙ্গে নৈশভোজ
করার আনন্দ আমি পেতে পারি। আমি তার প্রস্তাব লুফে নিলাম। এক মুহূর্তের মধ্যে সে
তার দুই-তিনজন বন্ধুর কানে কিছু ফিসফিস করে বলল। তারা বাগানের বিভিন্ন দিকে
ছড়িয়ে পড়ল, এবং পনেরো মিনিটেরও কম সময়ে আমাদের কাছে
তাদের আলোচনার ফলাফল জানাতে ফিরে এল। ‘ভদ্রমহোদয়গণ,’
তারা আমাদের বলল, ‘আজ রাতে ডাচেস অ্যাস্টারিয়ার বাড়িতে নৈশভোজের
জন্য আপনাদের অপেক্ষা করা হচ্ছে।’ যারা পার্টিতে ছিল না, তারা আমাদের সৌভাগ্যের জন্য
অভিনন্দন জানাল: এবং বাগানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর, তারা
আমাদের ছেড়ে চলে গেল, আর আমরা আমাদের গাড়িতে উঠলাম।”
“আমরা একটি ছোট
দরজার সামনে নামলাম, একটি খুব সরু সিঁড়ির গোড়ায়। সেখান দিয়ে আমরা দোতলায় উঠলাম;
এবং আমি অ্যাপার্টমেন্টগুলোকে এখন আমার কাছে যতটা মনে হচ্ছে তার
চেয়ে অনেক বেশি প্রশস্ত এবং সুসজ্জিত অবস্থায় পেলাম। আমাকে বাড়ির মালকিনের কাছে
উপস্থাপন করা হলো। আমি তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানালাম—যা আমি
এত বাড়াবাড়ি রকমের প্রশংসার সঙ্গে করলাম যে তিনি প্রায় বিচলিত হয়ে পড়লেন। নৈশভোজ
পরিবেশন করা হলো, এবং আমাকে একটি ছোটখাটো কিন্তু অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ব্যক্তিত্বের পাশে
বসানো হলো—যিনি ডাচেসের অভিনয় চমৎকারভাবে চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সত্যি বলতে, আমি জানি না কীভাবে আমি তাঁর প্রেমে পড়ার সাহস করেছিলাম: কিন্তু সেটাই
ঘটেছিল।”
“তাহলে আপনি জীবনে অন্তত
একবারের জন্য হলেও ভালোবেসেছিলেন,” প্রিয়তমা বাধা দিলেন।
“ওহ! হ্যাঁ ম্যাডাম,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “ঠিক যেমন আঠারো বছর বয়সে মানুষ ভালোবাসে—একটি সদ্য শুরু
হওয়া সম্পর্ককে শেষ পর্যন্ত (বিছানায়) নিয়ে যাওয়ার জন্য চরম অধৈর্যতার সঙ্গে। আমি
সেই রাতে এক মুহূর্তও ঘুমাতে পারিনি,
এবং ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই আমি আমার সেই সুন্দরীর জন্য
একটি অত্যন্ত সাহসী প্রেমপত্র লিখতে বসলাম। আমি সেটি পাঠালাম, একটি উত্তর পেলাম, এবং একটি সাক্ষাতের
ব্যবস্থা করলাম। উত্তরের ধরন বা ওই মহিলার নমনীয় স্বভাব আমাকে বিন্দুমাত্র
সন্দিগ্ধ করল না; এবং আমি সেই নির্ধারিত জায়গায় ছুটে
গেলাম—দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে আমি কোনো প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী বা মেয়ের
সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। আমার দেবী একটি বিশাল সোফায় আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন:
আমি তাঁর পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, তাঁর হাত ধরলাম, অস্বাভাবিক আবেগের সঙ্গে
চুম্বন করলাম, এবং নিজেকে অভিনন্দন জানালাম সেই অনুগ্রহের
জন্য যা তিনি আমাকে দিতে রাজি হয়েছেন।”
“‘এটা কি সত্যি,’
আমি গদগদ হয়ে বললাম, ‘যে আপনি সেলিমকে আপনাকে ভালোবাসার এবং তা বলার
অনুমতি দিচ্ছেন; এবং সে কি আপনাকে বিরক্ত না করেই মিষ্টিতম আশা নিয়ে নিজেকে খুশি করতে
পারে?’ এই কথাগুলো শেষ করেই আমি তাঁর ঘাড়ে একটি চুম্বন এঁকে দিলাম; এবং যেহেতু তিনি শুয়ে ছিলেন, আমি জোরের সঙ্গে
আক্রমণ শানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই তিনি আমাকে
থামিয়ে বললেন:
‘থামো বন্ধু, তুমি একটি সুন্দর ছেলে,
তোমার মাথায় বেশ বুদ্ধি আছে, তুমি
দেবদূতের মতো কথা বলো; কিন্তু আমার চারটা লুই দ’র (স্বর্ণমুদ্রা)
দরকার।’ ‘তুমি
কী বলছ?’ আমি থমকে গিয়ে বললাম। ‘আমি তোমাকে বলছি,’
সে সোজাসাপ্টা উত্তর দিল, ‘যদি তুমি চারটা লুই না আনো, তবে কিছুই হবে না।’ ‘কী মিস!’ আমি সম্পূর্ণ আকাশ থেকে পড়ে বললাম, ‘এটাই কি তোমার পুরো দাম? এমন সামান্য জিনিসের জন্য
কঙ্গো থেকে আসাটা আমার জন্য বেশ দামিই পড়ল।’ এবং এক মুহূর্তে আমি নিজেকে সামলে নিলাম, দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে
গেলাম এবং তাকে চিরতরে ছেড়ে চলে এলাম।”
“আমি শুরু
করেছিলাম ম্যাডাম, যেমনটি আপনি দেখছেন—অভিনেত্রীদের রাজকুমারী ভেবে ভুল করার
মাধ্যমে।”
“আমি এতে বেশ অবাক হচ্ছি,”
মির্জোজা উত্তর দিলেন, “নিশ্চয়ই পার্থক্যটা অনেক বড় হওয়ার কথা।”
“আমার কোনো সন্দেহ নেই,”
সেলিম বললেন, “কিন্তু তারা শত শত অশালীন কাজ করেছিল (যা রাজকীয় নয়)। কিন্তু তাতে
কী? একজন তরুণ,
তাও আবার বিদেশী—এত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক হয় না। আর আমি
কঙ্গোতে বসে ইউরোপীয় নারীদের স্বাধীনতা সম্পর্কে এত বাজে সব গল্প শুনেছিলাম যে...”
এখানে মাঙ্গোগুল জেগে উঠলেন, এবং হাই তুলে চোখ ডলতে ডলতে
বললেন: “খোদার কসম,
ও তো এখনো প্যারিসে পড়ে আছে! কেউ কি আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে,
প্রিয় গল্পকার, আপনি কখন বানজায় ফিরে
আসার আশা করছেন, এবং আমাকে আর কতক্ষণ ঘুমাতে হবে? কারণ আপনার জানা উচিত বন্ধু, যে ভ্রমণের
কাহিনি শুরু করলেই আমার হাই উঠতে থাকে। এটা একটা বদভ্যাস, যা আমি ট্যাভার্নিয়ার এবং অন্যান্য ভ্রমণকারীদের বই পড়ে অর্জন করেছি।”
“রাজপুত্র,”
সেলিম উত্তর দিলেন, “আমি এক ঘণ্টারও বেশি সময় আগে বানজায় ফিরে
এসেছি।”
“আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাই,”
সুলতান উত্তর দিলেন; এবং তারপর সুলতানার
দিকে ফিরে বললেন, “ম্যাডাম, মাস্ক্যারেড বা মুখোশ-নাচের
সময় হয়ে গেছে: আমরা রওনা হব, যদি ভ্রমণের ক্লান্তি
আপনাকে অনুমতি দেয়।”
“রাজপুত্র, আমি প্রস্তুত,” মির্জোজা উত্তর দিলেন।
মাঙ্গোগুল এবং সেলিম তাঁদের ডমিনো (মুখোশ ও আলখাল্লা) পরলেন, এবং প্রিয়তমাও তাঁরটি নিলেন: সুলতান তাঁকে বলরুমে নিয়ে গেলেন যেখানে
তাঁরা ভিড়ে মিশে যাওয়ার জন্য আলাদা হয়ে গেলেন। সেলিম তাঁদের অনুসরণ করলেন,
“এবং আমিও তাই করলাম,”
আফ্রিকান লেখক বলেন; “যদিও আমার নাচ দেখার চেয়ে ঘুমানোর ইচ্ছাই বেশি
ছিল।”
বিয়াল্লিশতম
অধ্যায়: আংটির চব্বিশ ও পঁচিশতম পরীক্ষা — মাস্ক্যারেড ও পরবর্তী ঘটনা
বানজা শহরের যত সব অদ্ভুত ও
বিচিত্র ‘গোপন রত্ন’ ছিল,
তারা কেউ-ই এই আনন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে ভিড় জমাতে ভুলল না। কেউ এল
শহরের ঘোড়ার গাড়িতে, কেউ ভাড়া করা যানবাহনে, আবার কেউ বা পায়ে হেঁটে। আফ্রিকান লেখক—যাঁর পাণ্ডুলিপি বহন করার সম্মান আমার
হয়েছে—তিনি
লিখেছেন, “আমি কখনোই শেষ করতে পারব না, যদি মাঙ্গোগুল সেই রাতে
তাদের ওপর যেসব কৌশল খাটিয়েছিলেন তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে যাই।”
সেই রাতে তিনি একাই তাঁর
আংটিটি এত বেশি ব্যবহার করেছিলেন, যা জিনিয়াস কুকুফা তাঁকে দেওয়ার পর থেকে আর কখনো করেননি। তিনি কখনো
একজনের ওপর, কখনো অন্যজনের ওপর, আবার
প্রায়শই একসঙ্গে বিশজনের ওপর আংটি ঘোরাচ্ছিলেন। আর তখনই তারা সমস্বরে যে অদ্ভুত
শব্দ তৈরি করছিল, তা ছিল এককথায় মনমুগ্ধকর (বা
কানফাটানো)।
কারও রত্ন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে
চিৎকার করে বলল, “ওহে বেহালাবাদক, দয়া করে আমাদের ‘ডাঙ্কির্ক-এর
ক্যারিলন’ (Carillon
of Dunkirk) বাজিয়ে শোনাও;” অন্য একজন কর্কশ গলায় দাবি
করল, “আমি
‘সোট্রিওটস’ চাই;” তৃতীয়জন বলল, “আর আমি চাই ‘ট্রিকোটস’।” আবার একদল রত্ন একসঙ্গে পুরোনো
দিনের গ্রাম্য নাচগুলোর দাবি তুলল—যেমন ‘লা বুরে’, ‘চার নিতম্ব’ (Les Quatre Fesses), ‘লা ক্যালোটিন’, ‘শিকল’ (La Chaîne), ‘পিস্তল’, ‘লা মারি’... এবং বারবার শুধু ‘পিস্তল, পিস্তল, পিস্তল’!
এই সব চিৎকারের সঙ্গে মিশে
ছিল লক্ষ লক্ষ উদ্ভট সংলাপ। একদিক থেকে শোনা গেল: ‘এই মূর্খটাকে দূর করো, একে আবার স্কুলে পাঠানো হোক।’ অন্যদিকে, ‘আমাকে কি তাহলে আমার অগ্রিম পাওনা ছাড়াই ফিরে
যেতে হবে?’ এখানে কেউ বলছে, ‘আমার গাড়ির ভাড়া কে দেবে?’
ওখানে কেউ বলছে, ‘সে আমার কাছ থেকে পালিয়েছে বটে, কিন্তু আমি তাকে খুঁজে বের
না করা পর্যন্ত তাড়া করব।’ আবার কোথাও শোনা গেল, ‘কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করব; কিন্তু অন্তত বিশ লুই
(স্বর্ণমুদ্রা) চাই, নইলে কিচ্ছু হবে না।’ সংক্ষেপে
বলতে গেলে, বলনাচের
আসরটি কামনার অভিব্যক্তি আর গোপন কীর্তিকলাপের এক বিশাল হাটে পরিণত হলো।
ভিড়ের মধ্যে এক সাধারণ
নাগরিকের মেয়ে—যে ছিল যুবতী এবং সুন্দরী—মাঙ্গোগুলকে আলাদা করে ফেলল। সে তাঁকে
অনুসরণ করতে লাগল এবং তাঁকে এতটাই উসকে দিল যে, সুলতান শেষমেশ তাঁর আংটি মেয়েটির ওপর ঘোরালেন।
তখন তার রত্নটি চিৎকার করে উঠল: “তুমি আমাকে কেন এড়িয়ে যাচ্ছ? থামো, ওহে আকর্ষণীয় মুখোশধারী! আমার মতো একটি রত্ন যখন তোমার জন্য জ্বলছে,
তখন তার আবেগের প্রতি এমন উদাসীন থেকো না।”
এই বেপরোয়া ঘোষণায় সুলতান
হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং সেই বেয়াদব প্রাণীটিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সংকল্প করলেন।
তিনি ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং তাঁর রক্ষীদের মধ্যে এমন একজনকে খুঁজে বের
করলেন যার শারীরিক গঠন তাঁর সঙ্গে বেশ মানানসই। তিনি তাকে নিজের মুখোশ এবং ‘ডমিনো’ (আলখাল্লা)
দিলেন এবং তাকে সেই ছোট মেয়েটির পেছনে লেলিয়ে দিলেন। মেয়েটি বাহ্যিক পোশাকে প্রতারিত
হয়ে তাকেই মাঙ্গোগুল ভেবে হাজারো হাস্যকর ও প্রেমপূর্ণ কথা বলতে লাগল।
নকল সুলতান (রক্ষী) মোটেও
বোকা ছিল না; সে
এমন একজন লোক যে ইশারায় কথা বলতে পারত। সে একটি ইঙ্গিত করল, যা সুন্দরীকে একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে গেল। সেখানে এক ঘণ্টারও বেশি সময়
ধরে মেয়েটি নিজেকে ‘প্রিয় সুলতানা’ ভেবে সপ্তম স্বর্গে ভাসল; এবং ঈশ্বর জানেন তার ছোট
মাথায় তখন কী সব বিশাল পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল! কিন্তু জাদু বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো
না। সে যখন নকল সুলতানকে আদর করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল, তখন
সে তাঁকে মুখোশ খুলতে বলল। রক্ষীটি তা-ই করল, এবং এমন
একটি মুখ দেখাল যা একজোড়া বিশাল গোঁফ দিয়ে সজ্জিত ছিল—যা মাঙ্গোগুলের
ছিল না।
“ওহ! ছিঃ!” ছোট মেয়েটি
চিৎকার করে উঠল, “ছিঃ, এ কী!”
“কেন সোনা,”
সেই সুইস রক্ষীটি উত্তর দিল, “তোমার কী হয়েছে? আমি তো ভেবেছিলাম আমি তোমাকে যথেষ্ট ভালো সেবা
দিয়েছি, যাতে এখন আমার আসল পরিচয় জেনে তুমি আর রাগ করবে
না।”
কিন্তু তার দেবী তাকে কোনো
উত্তর না দিয়ে দ্রুত তার হাত ফসকে বেরিয়ে গেল এবং ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
তবে যেসব রত্ন এত বড়
সম্মানের (সুলতানের সঙ্গ) আশা করেনি,
তারাও কিন্তু আনন্দ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়নি। এবং তারা সবাই যার
যার মতো বানজা শহরে ফিরে গেল, তাদের এই নৈশভ্রমণ নিয়ে
পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়ে।
কোম্পানি বা অতিথিরা যখন
চলে যাচ্ছিল, তখন
মাঙ্গোগুল তাঁর দুজন প্রধান কর্মকর্তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনলেন।
“সে আমার প্রেমিকা,”
একজন (আলিবগ) বলল, “আমি তাকে গত বারো মাস ধরে রেখেছি, আর তুমিই প্রথম যে আমার
পেছনে লাইন দেওয়ার কথা ভেবেছ। তুমি আমাকে কেন অস্বস্তিতে ফেলছ? নাসেস, বন্ধু আমার, অন্য
কোথাও চেষ্টা করো; তুমি শত শত সুন্দরী নারী পাবে, যারা তোমাকে পেয়ে নিজেদের ভাগ্যবতী মনে করবে।”
“আমি আমিনাকে ভালোবাসি,”
নাসেস জেদ ধরে বলল। “আমি তাকে ছাড়া আর কাউকেই দেখি না, যে আমার মন জয় করতে পারে। সে
আমাকে আশা দিয়েছে, এবং তোমাকে আমাকে সেই আশা পূরণ করার
অনুমতি দিতেই হবে।”
“আশা!” আলিবগ বিদ্রূপ
করে বলল। “হ্যাঁ, আশা।”
“বাজে কথা, মোটেও না।”
“আমি তোমাকে বলছি স্যার, এটাই সত্যি; এবং তুমি আমাকে যে মিথ্যুক বলছ, তার জন্য আমি
এই মুহূর্তেই এর ফয়সালা (তলোয়ার যুদ্ধ) চাই।”
তারা অবিলম্বে প্রাঙ্গণে
নেমে গেল; তাদের
তলোয়ার ইতিমধ্যেই কোষমুক্ত ছিল, এবং তারা এক মর্মান্তিক
উপায়ে তাদের বিবাদের নিষ্পত্তি করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই
সুলতান তাদের থামালেন। তিনি তাদের আদেশ দিলেন যে, তাদের
সেই ‘হেলেনা’র (আমিনার) সঙ্গে পরামর্শ না করা পর্যন্ত যেন তারা
যুদ্ধ না করে।
তারা বাধ্য হয়ে আমিনার
বাড়ির দিকে রওনা হলো, এবং মাঙ্গোগুল তাদের ঠিক পেছনেই চললেন।
“বলনাচ আমাকে পুরোপুরি
ক্লান্ত করে দিয়েছে,” আমিনা হাই তুলতে তুলতে বললেন,
“আমার চোখ তো কোটর থেকে
বেরিয়ে আসছে। তোমরা বড় নিষ্ঠুর মানুষ,
আমি যখন বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক তখনই এসে হাজির
হলে। কিন্তু তোমাদের দুজনকেই খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছে। আমাকে কি জানানো যেতে পারে—কী তোমাদের
এই অসময়ে এখানে এনেছে?”
“সামান্য ব্যাপার,”
আলিবগ উত্তর দিল। “এই ভদ্রলোক গর্ব করে, এমনকি অহংকার করে বলছেন যে—তুমি নাকি তাঁকে
আশা দিয়েছ। ম্যাডাম, ব্যাপারটা আসলে কী?”
আমিনা মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সুলতান ঠিক সেই
মুহূর্তে তাঁর আংটি ঘোরালেন। আমিনা মুখ বন্ধ করলেন, এবং
তাঁর হয়ে তাঁর ‘গোপন রত্ন’ উত্তর দিল:
“আমার মতে নাসেস
ভুল করছে: না, ম্যাডাম তাকে বেছে নেননি। তার কি একজন শক্তিশালী ভৃত্য নেই, যে নাসেসের চেয়েও বেশি কাজের মানুষ? ওহ! এই
পুরুষরা কত বোকা যে তারা মনে করে—মর্যাদা, সম্মান, পদবি, নাম আর অর্থহীন সব শব্দ রত্নদের ওপর
প্রভাব ফেলে! প্রত্যেকের নিজস্ব দর্শন আছে, এবং আমাদের
দর্শন হলো ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা ‘সত্যিকারের ক্ষমতা’কে বিচার
করা—যা কেবল কাল্পনিক পদমর্যাদা থেকে আলাদা। মঁসিয়ে ডি ক্লাভিলের অনুমতি
নিয়েই বলছি, তিনি এ বিষয়ে আমাদের চেয়ে কম জানেন; যা আমি
এখনই প্রমাণ করব।”
“আপনারা দুজনেই,”
রত্নটি বলে চলল, “মার্কুইস বিবিকোসাকে চেনেন। আপনারা
ক্লিয়ান্ডারের সঙ্গে তাঁর প্রেম,
তাঁর অসম্মান, এবং আজকাল তিনি যে
উচ্চমার্গের ভক্তি বা ধার্মিকতা দেখাচ্ছেন তা-ও জানেন। আমিনা একজন ভালো বন্ধু;
সে বিবিকোসারের সঙ্গে তার পুরোনো ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেছে এবং তার
বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেনি—যেখানে সব ধরনের ব্রাহ্মণদের আড্ডা
বসে। একদিন এদের মধ্যে একজন আমার মালকিনকে (আমিনাকে) চাপ দিল বিবিকোসারের কাছে তার
হয়ে সুপারিশ করার জন্য।”
“‘দয়া করে বলো, আমি তাঁকে কী জিজ্ঞাসা করব?’ আমিনা উত্তর দিল। ‘সে একজন
ডুবে যাওয়া বা দেউলিয়া মহিলা,
যে নিজের জন্যই কিছু করতে পারে না। নিশ্চিতভাবেই, আপনি তাকে এখনো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন জেনে
সে আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। বিশ্বাস করুন বন্ধু, প্রিন্স
ক্লিয়ান্ডার এবং মাঙ্গোগুল তার জন্য কিছুই করবেন না, এবং
আপনি শুধু শুধু তার অ্যান্টি-চেম্বারে (লবিতে) বসে জমে বরফ হয়ে যাবেন।’”
“‘কিন্তু ম্যাডাম,’
ব্রাহ্মণটি নাছোড়বান্দার মতো বলল, ‘ব্যাপারটা সামান্য, যা সম্পূর্ণরূপে মার্কুইসের
ওপরই নির্ভর করে। তিনি তাঁর বাড়িতে একটি ছোট চ্যাপেল বা ভজনালয় তৈরি করেছেন—নিঃসন্দেহে
সালাহ বা প্রার্থনার জন্য—যার জন্য একজন ইমাম বা পুরোহিতের
দরকার; এবং
আমি এই জায়গাটি চাই।’”
“‘আপনি কী বলছেন?’
আমিনা অবাক হয়ে বলল। ‘একজন ইমাম! আপনি কি কিছুই বিবেচনা করছেন
না? মার্কুইস
বড়জোর একজন ‘মারাবো’ (Marabout - সন্ন্যাসী বা ফকির)
চাইতে পারে, যাকে সে মাঝে মাঝে ডাকবে—যখন
বৃষ্টি হবে, বা যখন সে বিছানায় যাওয়ার আগে একটু প্রার্থনা করতে চাইবে। কিন্তু তার
বাড়িতে একজন ইমামকে রাখা, তাকে পোশাক দেওয়া, খাওয়ানো, বেতন দেওয়া—বিবিকোসারের
সামর্থ্যের সঙ্গে মানায় না। আমি তার আর্থিক অবস্থা জানি। বেচারা মহিলার বছরে ছয় হাজার
জেচিনও আয় নেই, আর আপনি আশা করছেন যে সে এর মধ্যে দুই হাজার একজন ইমামকে দেবে? নিশ্চয়ই এটি একটি অদ্ভুত কল্পনা।’”
“‘ব্রহ্মার কসম,’
পবিত্র ব্যক্তিটি উত্তর দিল, ‘আমি এর জন্য দুঃখিত: কারণ যদি আমি
একবার তার ইমাম হতে পারতাম,
তবে আমি শীঘ্রই তার কাছে আরও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতাম; এবং যখন কেউ অত দূর (অন্দরমহলে) পৌঁছে যায়, তখন
সোনা এবং পেনশন আকাশ থেকে বর্ষিত হয়। আপনি আমাকে যেমনই দেখুন না কেন, আমি মনোমোটাপার লোক, এবং আমি আমার কর্তব্য
অত্যন্ত ভালোভাবে পালন করতে জানি।’”
“‘দ্বিতীয়বার
ভেবে দেখছি,’ আমিনা হঠাত তার দিকে তাকিয়ে
বলল, ‘আপনার
ব্যাপারটা হয়তো অসম্ভব নয়। দুঃখের বিষয় যে আপনি যে ‘যোগ্যতা’র কথা বলছেন তা আমার অজানা।’”
“‘আমার দেশের
লোকদের ভালো কাজ করতে বা পারফর্ম করতে কোনো ঝুঁকি নেই,’
মনোমোটাপান উত্তর দিল, ‘দয়া করে পরীক্ষা করে দেখুন।’—সে
অবিলম্বে আমিনাকে তার সেই ‘আশ্চর্যজনক যোগ্যতা’র এমন
এক চাক্ষুষ ও জোরালো প্রমাণ দিল যে—সেই মুহূর্ত থেকে আপনারা দুজনেই
(আলিবগ ও নাসেস) তার চোখে আপনাদের মূল্যের অর্ধেক হারিয়ে ফেললেন। সাবাশ!
মনোমোটাপানরা দীর্ঘজীবী হোক!”
আলিবগ এবং নাসেস মুখ চুন
করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল; তাদের মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হলো না। কিন্তু যখন তারা তাদের বিস্ময়ের
ঘোর কাটাল, তখন তারা একে অপরকে আলিঙ্গন করল; এবং আমিনার দিকে একদলা ঘৃণা ছুড়ে দিয়ে তারা সুলতানের পায়ে লুটিয়ে পড়ল।
তারা তাঁকে ধন্যবাদ জানাল এই মহিলার বিষয়ে তাদের ভুল ভেঙে দেওয়ার জন্য এবং তাদের
জীবন ও পারস্পরিক বন্ধুত্ব রক্ষা করার জন্য।
তারা ঠিক তখনই এসে পৌঁছেছিল
যখন মাঙ্গোগুল, প্রিয়তমার
কাছে ফিরে এসে, তাঁকে আমিনার এই রসালো ইতিহাস বলছিলেন।
এটি মির্জোজাকে হাসিয়েছিল বটে, কিন্তু দরবারের মহিলা এবং
ব্রাহ্মণদের প্রতি তাঁর সম্মান একবিন্দুও বাড়ায়নি।