কাঁচের প্রাসাদ
ঘুট ঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। রাত কেটে যাচ্ছিল ধীর
গতিতে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে
শেয়ালের কান্না আর কুকুরের ঘেউ ঘেউ করে পরিবেশের নিস্তব্ধতা ক্ষণিকের জন্য বিলীন
হয়ে যায়।
রাত ১০ টা বাজে। রায়পুরের বাসিন্দারা প্রায় সবাই নিজেদের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ বা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। শর্মিলী তার স্বামী সরজুর সাথে তাদের বাড়ির উঠানের খাটে শুয়ে ছিল। তার চোখে থেকে ঘুম হারিয়ে গেছে। সে অন্যদিকে ফিরে শোয়। তাঁর দৃষ্টি স্থির তাঁর বাড়ি থেকে অল্প দূরে অবস্থিত চমৎকার কাঁচের প্রাসাদে, যা ঠাকুর জগৎ সিং তাঁর স্ত্রী রাধা দেবীর মুখরূপে তৈরি করেছেন। অনেকটা শাহজাহান যেমন মমতাজের জন্য তাজমহল তৈরি করেছিলেন। এখানে পার্থক্য শুধু এই যে ঠাকুর সাহেব তার স্ত্রীর জীবদ্দশায় এই কাচের প্রাসাদটি তৈরি করেছেন।
ঠাকুর সাহেব রাধাদেবীকে খুব ভালবাসতেন। বিয়ের দিনই ঠাকুর
সাহেব রাধা দেবীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি তার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণ
করবেন যা মানুষ যুগ যুগ ধরে মনে রাখবে। এবং তিনি তার কথা রেখেছেন। বিয়ের দেড়
বছরের মধ্যে ঠাকুর সাহেব তার প্রতিজ্ঞা পূরণ করলেন। এই প্রাসাদটি তৈরি করে রাধা
দেবীর কাছে উপস্থাপন করেন। যখন এই প্রাসাদটি সম্পন্ন হয়, তখন
মানুষদের চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। প্রাসাদ দেখে তারা রাধা দেবীর ভাগ্যের প্রতি
ঈর্ষাম্বিত হয়।
শর্মিলী প্রতিদিন প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে ঠাকুরের
হৃদয়ে রাধাদেবীর প্রতি ঠাকুরের অপরিসিম ভালোবাসা অনুমান করে। এখনও তার দৃষ্টি
স্থির ছিল প্রাসাদের দিকে। অন্ধকার রাতেও এই প্রাসাদটি তার আভা ছড়াচ্ছে। প্রাসাদের
দেয়াল তার বাহ্যিক আলোয় মিটমিট করছিল।
আর প্রাসাদের ভিতর থেকে নির্গত আলো প্রাসাদের রংধনু রঙ দিচ্ছিল।
শর্মিলী মুখ ফিরিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা তার স্বামী
সরজুর দিকে তাকাল। সে মৃদুস্বরে ডাকল সরজুকে
“ঘুমিয়েছো?"
সরজু তখনও হালকা ঘুমে, হালকা
গলায় বলল
"কি?"
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি, সত্যি
বলবে?” স্বামীর দিকে আদরি দৃস্টিতে তাকিয়ে
বলল শর্মিলী। এ সময় তার হৃদয়ে প্রেমের সাগর প্রকম্পিত হয়।
কিন্তু সরজু তার মনোভাব বুঝতে পেরেও সাড়া দেয় না। সারাদিনের
ক্লান্তিতে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। নিজের অজান্তেই সে বললো-
"তোমাকে মিথ্যে বলে আমার কি লাভ? আমি সত্যই
বলবো।"
“তুমি সোজা কথা বল না কেন?” অসন্তুস্ট
স্বরে শর্মিলি বলল। এ সময় স্বামীর মুখ থেকে এমন কথা তিনি আশা করেননি।
“তাহলে সরাসরি জিজ্ঞেস করো না
কেন, কি জিজ্ঞেস করতে চাও জিজ্ঞেস করো।"
সে এই সময়ে লড়াই করার মেজাজে ছিল না। শান্ত কন্ঠে
বললো - "আমার মৃত্যুর পর আমার স্মৃতিতেও কি কিছু করবে?” শর্মিলীর
এই কথাগুলো ছিল ভালোবাসায় নিমজ্জিত। কথায় লুকিয়ে ছিল লাখো ইচ্ছা।
“হ্যাঁ...!” মৃদুস্বরে
বলল সরজু।
স্বামীর মুখ থেকে হ্যাঁ শুনে শর্মিলীর মন লাফিয়ে উঠল।
মনটা প্রেমের পাক্ষীর মতো উড়তে থাকে। এই হাঁ শুনে সে যে পরিমান সুখ পেয়েছিল তা
অনুমান করা কঠিন। এখন যদি এই হ্যা এর বিনিময়ে সারজু তার জীবন চায় তাহলে সে
স্বামীর জন্য খুশিতে জীবন বিসর্জন দিয়ে দিত। সে সারজুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল
- "কি করবে?"
“মালিকের কাছ থেকে কিছু টাকা
ধার নিয়ে তোমার জন্য একটা সুন্দর কবর বানাবো। তারপর যে টাকা থাকবে তা দিয়ে সারা
গ্রামে মিষ্টি বিতরণ করবো।"
শর্মিলীর মন মুহুর্তে তিক্ততায় ভরে গেল। চোখ থেকে অশ্রু
গড়িয়ে পড়ল। স্বামীর মনে নিজের জন্য এমন চিন্তা জেনে তার আত্মা কেঁদে উঠল। সে
কাঁদতে কাঁদতে বললো - এই কি পনের বছর তোমার সাথে থাকার পুরস্কার?
শর্মিলীর আজে বাজে কথায় সরজুর ঘুম ছুটে গেল। সে রেগে
বলল “আমি মালিকের মত ধনী নই, না
তুমি মালকিনের মত সুন্দরী। তাহলে আমার মাথা খাচ্ছ কেন?"
সারজুর তিরস্কারে শর্মিলীর মনটা দমে যায়। কিন্তু কিছু
বলার আগেই রাতের নিস্তব্ধতায় প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল এক প্রচণ্ড মহিলার চিৎকার, যা
আত্মাকে নাড়া দিয়েছিল। প্রাসাদ থেকে এই চিৎকার এসেছে। শর্মিলীর সাথে সাথে সরজুও তড়িগড়া
করে খাট থেকে উঠে পড়ল।
“মালকিন...!” সারজু বিড়বিড় করে খাট থেকে নামল-
"মালকিনের মনে হয় আবার স্ট্রোক হয়েছে। আমি রাজবাড়িতে যাচ্ছি।” ধুতি শক্ত করে দ্রুত বলল। তারপর
কুর্তা তুলে ছুটল প্রাসাদের পথে।
শর্মিলী তখনও দাঁড়িয়ে থাকা প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে
ছিল। তার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করছিল। ভয়ে তার শরীর কাঁপছিল। তারপর আবার সেই একই হৃদয়
বিদারক আর্তনাদ কানে এল।
শর্মিলী কাঁপতে কাঁপতে খাটের উপর শুয়ে পড়ল। প্রাসাদ
থেকে নির্গত চিৎকার তাকে তার সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। এখন রাধা দেবীর দুঃখ সেই
জায়গায় জায়গা করে নিয়েছে। ভাবতে লাগলেন রাধা দেবীর কথা।
রাধা দেবী - কি অদ্ভুত কাকতালীয়। ঠাকুর সাহেব রাধা
দেবীর মুখ দেখানোর জন্য যে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন তার আনন্দ তিনি পাননি। বেচারা
যেদিন এই প্রাসাদে এসেছিলেন, সেদিন রাধা
দেবী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সেদিন এমন কোন ঘটনা ঘটেছিল তা কেউ জানে না।
তারপর থেকে তিনি পুরো ২০ বছর ধরে একটি ঘরে তালাবদ্ধ। আর এই ধরনের চিৎকার আসতেই
থাকে। তার এমন চিৎকারের কথা সবাই জানে কিন্তু কেন? সেই
রাতে প্রাসাদে কি এমন ঘটনা ঘটেছিল যে সে পাগল হয় গেল কেউ জানে না। এটি একটি রহস্য
যা আজো সবার কাছে অজানা রয়ে গেছে।
২
সারজু হাঁপাতে হাঁপাতে প্রাসাদে ঢুকে সোজা মালকিনের
ঘরের দিকে চলে গেল। মালকিনের ঘরের দরজায় পৌঁছে সে থামল। সেখানে হাভেলীর অন্য
চাকরগণও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরে গিয়ে কী ঘটছে তা দেখার সাহস
তাদের কারও ছিল না। সারজু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তার নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে, তারপর
কম্পিত হৃদয়ে ভিতরে তাকাল। ভেতরের দৃশ্য দেখে তার চিত্তি-পিত্তি হয়ে গেল। মালকিন
লাল চোখে হিংস্র সিংহীর মত ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠাকুর সাহেব দাঁড়িয়ে
কাঁপতে কাঁপছিলেন। মালকিন ডানে বামে তাকাচ্ছে আর যা কিছু পাচ্ছে তুলে ঠাকুর
সাহেবের দিকে ছুঁড়ে মারছেন।
“রাধা .... হুশে আসো রাধা।” মালিক, ভয়ে
কাঁপতে কাঁপতে, ধীরে ধীরে মালকিনের দিকে এগিয়ে গেল।
"আমার জান রাধা... আমি তোমার স্বামী জগৎ সিং।"
“মিথ্যা .....” রাধা দেবী চিৎকার করে বলে-
"তুমি খুনি..... আমার কাছে এলে আমি তোমাকে মেরে ফেলব। আমি জানি তুমি আমার
মেয়েকে মারতে চাও, কিন্তু তার আগেই তোমাকে মেরে ফেলব।
" এই কথা বলার পর সে আবার কিছু খুঁজতে লাগলো... যাতে সে ঠাকুর সাহেবকে ছুড়ে
মেরে ফেলতে পারে। কিছু না পেয়ে ভয়ে পিছু হটে। তার হাতে কাপড়ের তৈরি একটি পুতুল
ছিল, যাকে সে তার মেয়ে ভেবে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল। ঠাকুর
সাহেবকে তার দিকে অগ্রসর হতে দেখে তার চোখে ভয় জেগে উঠে। রাধা পুতুলটিকে বাহুতে
লুকিয়ে রাখতে লাগল। তারপর কিছু একটার খোঁজে চারিদিকে তাকাতে লাগলো। হঠাৎ তার চোখ
জ্বলে উঠল, সে দেখল মাটিতে একটা গ্লাস পড়ে আছে।
সে তাড়াতাড়ি গ্লাসটা তুলে বিদ্যুতের বেগে ঠাকুর সাহেবের দিকে মারল। রাধা দেবী
গ্লাসটি এত দ্রুত ছুড়ে মেরেছিলেন যে ঠাকুর সাহেব আত্মরক্ষা করতে পারেননি। গ্লাসটা
তার কপালে লেগে গেল। সে চিৎকার করে পিছু হটে। তার কপাল থেকে রক্তের ধারা নেমে আসে।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সরজু তাদের কাছে গিয়ে ঠাকুর সাহেবকে টেনে বাইরে নিয়ে
গেল। অন্য চাকররা তড়িঘড়ি করে বাইরে থেকে তাদের মালকিনের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
সরজু ঠাকুর সাহেবকে হলের মধ্যে নিয়ে এসে কপাল থেকে
বয়ে যাওয়া রক্ত পরিষ্কার করতে লাগল। অন্যান্য সেবকরাও ওষুধ ও ব্যান্ডেজ নিয়ে ঠাকুর
সাহেবের কাছে এসে দাঁড়াল। এসময় দরজা দিয়ে ঢুকলেন দিওয়ান জি। তিনি এসে সরাসরি ঠাকুর
সাহেবের পাশে বসলেন। ঠাকুর সাহেবের অবস্থা দেখে তার ঠোঁট কুঁচকে উঠল।
“আপনি মালকিনের ঘরে গেলেন কেন
সরকার?” দিওয়ান জি কপালের ক্ষতের দিকে
তাকিয়ে বললেন।
“দিওয়ান জি, রাধাকে শেষ দেখেছি
এক মাস হয়ে গেছে। ওর মুখ দেখার খুব ইচ্ছে ছিল... আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।” ঠাকুর সাহেব ব্যাথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে
বললেন। কপালে আঘাতের কারণে তার ব্যথা হয়নি। তার যন্ত্রণা তার হৃদয়ে আঘাতের কারণে
হয়েছিল যা তিনি নিজেই করেছিলেন। নিজের সর্বনাশের জন্য তিনি নিজেই দায়ী ছিলেন।
স্ত্রীর আজকের এই অবস্থার জন্য সে নিজেই দায়ী। ঠাকুর সাহেব ছাড়া দিওয়ানজিও এ
কথা জানতেন। আর তিনি এটাও জানতেন যে ঠাকুর সাহেব তার স্ত্রী রাধা দেবীকে কতটা
ভালোবাসেন। তাই ঠাকুরের দুঃখ-দুর্দশার কথা তাঁর মতো আর কেউ জানত না। ঠাকুর সাহেবের
কথায় দিওয়ান জী চুপ হয়ে গেলেন। বলার কোন ভাষা ছিল না তার, শুধু
সহানুভূতিশীল চোখে তাকিয়ে রইল।
“দিওয়ান জি... আপনি বোম্বেতে
একজন দক্ষ ডাক্তারের কথা বলেছেন, তার কি কোন
খবর আছে? কখন আসবেন?” নিজের
ক্ষতকে পাত্তা না দিয়ে তিনি দিওয়ান জিকে জিজ্ঞেস করলেন।
আসবে, কয়েকদিনের মধ্যে আসবে। দিওয়ানজি তাকে আশ্বস্ত
করলেন।
“এই ডাক্তার কিছু করতে পারবে কি
না জানি না। যে আসে, সবাই টাকা খেতে আসে। আজকাল ডাক্তারি পেশায়ও কোন সততা নেই।” ঠাকুর সাহেব হতাশ হয়ে বললেন।
“আমি এই ডাক্তারকে নিয়ে অনেক
আলোচনা শুনেছি। লোকে বলে যে খুব অল্প বয়সে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছে। অনেক জটিল কেস
সমাধান করেছে। মালকিনের মতো রোগীদের সুস্থ করেছেন। আমার মন বলছে মালিক, আপনার
মালকিন সুস্থ হয়ে উঠবে। এর
উপর আস্থা রাখুন।"
দেওয়ান জির কথায় ঠাকুর সাহেব একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস
ফেললেন তারপর বললেন- "এখন আর কিছুতেই ভরসা নেই, দেওয়ান
জি। এখন মনে হচ্ছে আমাদের রাধা কখনো ভালো হবে না। আমরা বাকিটা জীবন এভাবেই কষ্ট
করতে থাকব। আমার জীবন। আমার বেঁচে থাকার কোনো আশা নেই... আমি জানি না আমার মৃত্যুর
পর রাধার কি হবে।
“বিশ্বাসের চেয়ে বড় কিছু নেই, মালিক।
বিশ্বাস রাখুন, মালকিন একদিন ভালো হবে। আর মরার কথাও
ভাববেন না... কেন ভুলে গেলেন আপনার মেয়েও আছে।"
ঠাকুর সাহেব দিওয়ান জির দিকে তাকালেন। দেওয়ান জির কথা
মলমের মতো কাজ করে। মেয়ের কথা মনে পড়তেই শুকিয়ে যাওয়া মুখটা ফুলে উঠল, দেওয়ান
জিকে বললেন- "কেমন আছে আমাদের নিক্কি? দেওয়ান জি। আমার দুর্ভাগ্য যে আমি
আমার বাবার দায়িত্বও ঠিকমতো পালন করতে পারিনি। সে কখন আসছে?"
“নিক্কি মা আগামীকাল আসছে।
সন্ধ্যার মধ্যে বেটি আপনার সামনে থাকবে।” দিওয়ান জি হাসলেন।
অনেকদিন ঠাকুর সাহেব নিক্কির মুখ দেখেননি। যখন ওর বয়স ৬
বছর, তখন তিনি তার প্রিয় মেয়েকে বোর্ডিংয়ে
পাঠিয়েছিলেন। এখানে থাকলে ওর মায়ের অসুস্থতাতে প্রভাবিত হতে পারে তাই। আজ যখন
দিওয়ান জি নিক্কির আসার খবর দিলেন, তখন তাঁর মন
তাঁর মেয়েকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। কিন্তু একদিকে যেমন তিনি তার মেয়ের
সাথে দেখা করতে উদগ্রিব ছিলেন, অন্যদিকে
নিক্কি ওর মায়ের সাথে দেখা হলে ওর মনের কী হবে তা নিয়েও তিনি চিন্তিত ছিলেন।
"এখন আপনি বাড়িতে যান, দেওয়ান জি, অনেক
রাত হয়ে গেছে।” ঠাকুর সাহেবকে এখন হালকা লাগছে। দিওয়ান জিকে অকারণে বসিয়ে
রাখা তিনি উপযুক্ত মনে করলেন না।
“আপনার আদেশ শিরোধার্য।” দিওয়ান জি বললো আর হাত গুটিয়ে উঠে
দাঁড়ালো। প্রাসাদের বাম পাশে তার বাড়িটাও ছিল একটু অন্যরকম। বলতে গেলে একটা
বাড়ি হলেও ছোট প্রাসাদের চেয়ে কম নয়। এটাও ঠাকুর সাহেবের দয়ার ফল। দিওয়ান জি
তার খুব কাছের আর মানুষ ছিলেন। আর তার সব কাজ দেখতেন। ঠাকুর সাহেব তাকে অন্ধভাবে
বিশ্বাস করতেন।
দিওয়ানজী চলে যাবার পর ঠাকুর সাহেব উঠে নিজের ঘরের
দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘুম তার চোখ থেকে অনেক দূরে। রাত প্রায় জেগেই কেটে যাচ্ছিল।
এটা তার জন্য নতুন কিছু না। জেগে থেকেই তার বেশিরভাগ রাত কেটে যায়। সে সিগার
জ্বালিয়ে আরামদায়ক চেয়ারে নিজেকে ছেড়ে দিলেন। তারপর হালকা চুরুটের পাফ নিতে
শুরু করলেন। চুরুট হাতে নিয়ে ঠাকুর সাহেব অতীতের গভীরে ডুবে যান। তার অতীতই এখন
তার বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। তিনি প্রায়শই তার অতীত রোমন্থন করেন।
৩
নিক্কি গত ২০ মিনিট ধরে রায়পুরের রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে। রাগে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। দেওয়ান
জি ড্রাইভারকে পাঠিয়েছে নিক্কিকে তুলতে কিন্তু তার কোনো খবরই নেই। রাগে
প্ল্যাটফর্মে হাঁটছিল নিক্কি।
নিক্কি একটি গোলাপি রঙের ফ্রক পরা। তার চোখে সানগ্লাস
আর মাথায় সান টুপি। ফ্রকটা এতই ছোট যে অর্ধেক উরু উন্মুক্ত। প্ল্যাটফর্মের লোকেরা
তার সুন্দর উরু এবং ফুলে যাওয়া বুকের দিকে লোভের দৃস্টিতে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ একটা
বাইকের এক্সিলারেটরের বিকট শব্দ তার কানে আসে। আওয়াজটা এতটাই জোরে ছিল যে নিক্কির
রাগ সপ্তম আকাশে পৌঁছে যায়। নিক্কি চোখ ফেরাল। সামনে বাইকে বসা এক সুদর্শন যুবক
বাইকের কান মোচড়াতে ব্যস্ত। যতক্ষণ তিনি অক্সলেটার ঘোরায়, বাইকটি
স্টার্ট থাকে, অক্সলেটার ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথে
বাইকটি উন্মত্তভাবে থেমে যায়। সে আবার লাথি মেরে... অক্সলেটার নিয়ে বাইক স্টার্ট
দেয়। সে ঘামে ভিজে গেছে। নিক্কি ৫ মিনিট ধরে তার এই ভন ভন শুনতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তার ধৈর্য্যের বাধ
ভাঙ্গে। যুবকটির দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো- "হ্যালো মিস্টার, আপনার
এই রদ্ধি মালাটাকে লাথি মারামারি বন্ধ করুন অথবা দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে শুরু
করুন। এর বিকট শব্দে আমার কানের পর্দা ফেটে যাচ্ছে।"
বাইক স্টার্ট না হওয়ায় যুবকটিও সমানভাবে বিরক্ত, তারমধ্যে
তাকে এমন বকাবকি, তার বাইকের এমন অপমান... সে সহ্য করতে
পারেনা। রাগে কিছু একটা বলার জন্য ধাই করে ঘুরতেই নিক্কির দিকে চোখ পড়তেই সে
হতভম্ব হয়ে গেল। এক অপরূপ সৌন্দর্যকে সামনে দেখে তার রাগ ক্ষণিকের মধ্যে উবে গেল।
তারপর বললো- "আপনি আমার বাইককে বলছেন? এই বাইকে বসে
কত রেস জিতেছি, আপনি জানেন?"
“রেস...? আর
সেটাও এই বাইক দিয়ে? এটা চলে! স্টার্ট হয় কিনা সন্দেহ আছে।” সে ব্যঙ্গ করে হাসল।
যুবকটি খুব রেগে গেল কিন্তু আবার মন খারাপ হয়ে গেল। সে
অদ্ভুত চোখে বাইকের দিকে তাকালো তারপর একটা হার্ড কিক মারলো। এবারও বাইক স্টার্ট
হয়নি। সে বারবার চেষ্টা করতে থাকে এবং অক্সলেটারের আওয়াজে নিক্কিকে হয়রানি করতে
থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিক্কির ড্রাইভার একটা জিপ নিয়ে এসে হাজির। ড্রাইভার জিপ
থেকে নেমে নিক্কির কাছে এল।
“এত সময় লাগলো কেন আসতে?” ড্রাইভারকে
দেখেই নিক্কি চোটপাট শুরু করে।
“ভুল হয়েছে ছোট মালকিন ... হয়েছে
কি ... আসলে ...” ড্রাইভার বলতে শুরু করে
“চুপ কর।” নিক্কি রেগে চিৎকার করে উঠল।
ড্রাইভার স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখ মাটিতে।
“অন্য কেউ কি লাগেজ নিতে আসবে?” ওকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার জ্বলে উঠল নিক্কি। চালক অ্যাকশনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং
লাগেজ তুলে জিপে রাখতে শুরু করে।
নিক্কির চোখ গেল ওই বাইক নিয়ে যুবকের দিকে। সে এখানে
তাকিয়ে আছে। তাকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিক্কি আবারও ব্যঙ্গাত্মক একটা হাসি
দিয়ে তার জিপের দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ যা ঘটল যা নিক্কি কল্পনাও করেনি। যুবকটি বাইক
স্টার্ট দিল। নিক্কি যুবকের দিকে তাকাল। এবার যুবকের হাসির পালা। সে বাইকে বসল এবং
নিক্কিকে দেখে মাথায় একটা ধাক্কা দিয়ে হুইসেল দিয়ে বাইকটা সজোরে ছুটিয়ে দিল।
নিক্কি কিছুক্ষন বোকা হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।
ড্রাইভার আগেই লাগেজ উঠিয়ে দিয়েছে জিপে। নিক্কি
স্টিয়ারিং সিটে উঠে বসল। চাবি ঘুরিয়ে গিয়ার বদলে ফুল স্পিডে জিপ ছেড়ে দিল।
“ছোট মালকিন...!” চিৎকার
করে জীপের পিছনে দৌড়াতে থাকে ড্রাইভার।
নিক্কি পাহাড়ি রাস্তায় জিপ দ্রুত চালিয়ে যাচ্ছিল।
কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর একটা বাইক নিয়ে এক যুবককে দেখতে পায়। সে জিপের গতি
বাড়িয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে তার সমানে পৌঁছে গেল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলল- “হ্যালো
মিস্টার”।
যুবকটি নিক্কির দিকে তাকাল, সে
কিছু একটা বলার কথা ভাবছিল আর নিক্কি নিমিষেই জীপটিকে দ্রুত গতিতে সামনে নিয়ে
গেল। যুবকটি রাগে নিক্কির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ জ্বলে উঠে, সে
অক্সিলেটরে হাত রেখে ফুল স্পিডে বাইক ছেড়ে দিল। কিছুদূর যেতইই কিছু মেয়েকে
রাস্তা পার হতে দেখে দ্রুত ব্রেক কষে। কিন্তু তার গতি ছিল খুব বেশি, বাইকটি
পিছলে সরাসরি একটি পাথরে ধাক্কা মারে। যুবক ছিটকে দূরে পড়ে গেল। তার বাইকের সাথে
বাঁধা স্যুটকেস খুলে সব জামাকাপড় এদিক ওদিক রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। আর এসব ঘটে
গেল মুহুর্তের মধ্যে। একটু হুশে আসলে একটা মেয়ের হাসির শব্দ কানে এল। ফিরে তাকিয়ে
দেখে সালোয়ার কুর্তা পরা এক গ্রামের মেয়ে হো হো করে হাসছে। তার পিছনে দাঁড়িয়ে
থাকা তার সখিরাও হাসছে। ওই সব মেয়ের হাতেই বই ছিল, যুবকের
বুঝতে বেশি সময় লাগেনি যে এই মেয়েরা পাশের গ্রামের এবং এই সময়ে কলেজ থেকে
ফিরছে।
“এই দেখ, কাঠের
উল্লু” মেয়েটি হেসে হেসে সখিদের বলল।
যুবকের চোখ তার দিকে স্থির। সে দেখতে খুবই সুন্দরী।
গরমের কারণে তার মুখ ঘামছে। ঘামে ভেজা তার ফর্সা মুখ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের মতো
সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল। তার দুপাট্টা গলায় ঝুলিয়ে পিছন দিকে দুলছিল।
সম্মুখে তার পুরুস্ট স্তন যুগল পাহাড়ের চূড়ার মত টানটান হয়ে তার দিকে তাকিয়ে
আছে। পেট চ্যাপ্টা, কোমর পাতলা কিন্তু নিতম্ব চওড়া এবং
ভারী গোলাকার। জামাকাপড় লুকাতে পারছিল না তার মাতাল করা সুগঠিত শরীর। যুবকটি
কয়েক মুহূর্তের জন্য তার সৌন্দর্যে হারিয়ে গেল। সে ভুলে গেছে যে এই মেয়েটি তাকে
কিছুক্ষণ আগে কাঠের উল্লু বলেছে। এমনকি খেয়ালও নেই যে তার বাইকটি রাস্তায় পড়ে
গেছে এবং প্রবল বাতাসে তার জামা কাপড় রাস্তায় ছিটকে পড়ছে।
কিন্তু মেয়েরা তার অবস্থা দেখে আআর হেসে উঠল। হাসি
শুনে তার চেতনা ফিরে এল। সে ভ্রু তুলে মেয়েটির দিকে তাকালেন যে তাকে কাঠের উল্লু বলেছে।
"কি বললে? আবার বল।"
“কাঠের উল্লু।” মেয়েটি আবার বলে আবার হাসল।
“আমাকে কি তোমার কাঠের উল্লু
মনে হচ্ছে?” যুবকটি রাগ আর অপমানিত গলায় বলল।
“আর না হলে তো কি .... তোমার
মুখের দিকে তাকাও, তোমাকে শক্ত কাঠের পেঁচার মতো লাগছে।” তার সাথে তার সখিরাও হাসতে লাগল।
যুবকটি অপমানে অপমানিত হয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলল, কিন্তু
ঠোঁটে কোন রা বের হল না। সে তার অবস্থার কথা বুঝতে পেরেছে, সে
আর কথা বাড়িয়ে মেয়েদের কাছে নিজেকে আরো অপদস্ত হতে চায়নি। সে ঘুরে তার জামা কাপড়
স্যুটকেসে ভরতে লাগল। মেয়েরা হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল।
নিক্কি প্রাসাদে পৌঁছতেই দেখে ঠাকুর সাহেব বাইরে
অপেক্ষা করছে। দিওয়ান জিও সঙ্গে ছিলেন। জীপ থেকে নেমে দিওয়ান জি নিক্কির কাছে
এসে বললেন, "এসো বেটি। কতদিন ধরে তোমার
জন্য অপেক্ষা করছে মালিক।"
নিক্কি ঠাকুর সাহেবকে হাত জোড় করে প্রণাম করল তারপর ঠাকুর
সাহেবের কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ঠাকুর সাহেব ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে। বছরের পর
বছর ধরে ধুঁকতে থাকা তার হৃদয় আজ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে তিনি এ
সময় তার সব দুঃখ ভুলে গেছেন। সে নিক্কির কপালে চুমু খেয়ে বললো- "নিক্কি, তোমার
যাত্রা কেমন ছিল? এখানে আসতে কোনো সমস্যা হয়েছিল?"
“ওরে বাবা, আমি
কি বাচ্চা যে আমার কষ্ট হবে?” নিক্কি
এমনভাবে বলল যে ওর কথা শুনে ঠাকুর সাহেব ও দিওয়ান স্যার হেসে ফেলেন।
“নিক্কি মা, ড্রাইভার
তোমার সাথে আসেনি, সে কোথায় গেল?” নিক্কিকে
একা দেখে দেওয়ান জি বললেন।
“আমি তাকে সেখানেই রেখে এসেছি।
সে আমাকে পুরো ২০ মিনিট অপেক্ষা করতে বাধ্য করেছে। এখন তার কিছু শাস্তি হওয়া উচিত
তাই না?” দেওয়ান জি নিক্কির কথায় হেসে উঠলেন, ঠাকুর
সাহেবের মুখেও তার মেয়ের দুষ্টুমিতে হাসি দেখা গেল।
৪
ঠাকুর সাহেব নিক্কিকে নিয়ে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ
করলেন। ওকে দেখতে বাড়ির সব চাকর-বাকর ওর হুকুম পালন করতে ওর ডানে-বামে চলে আসলো।
ঠাকুর সাহেব নিক্কিকে নিয়ে হলঘরে বসলেন। দিওয়ান জিও পাশে
বসলেন।
“আজ তোমাকে আমাদের সাথে পেয়ে
আমরা খুব খুশি, বেটি” ঠাকুর সাহেব আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন।
“বাবা তোমার সাথে দেখা করার
আমারও খুব পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আর কখন তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।” নিক্কি ওনার কাঁধে মাথা রেখে বলল।
“হ্যাঁ বেটি, তোমাকে
আর কোথাও যেতে হবে না। এখন তুমি সবসময় আমাদের সাথে থাকবে।"
ঠাকুর সাহেবের কথা মাত্রই শেষ হয়েছে তখন প্রাসাদের
দরজা দিয়া এক অপরিচিত লোক প্রবেশ করে। তার হাতে একটি স্যুটকেস। চুলগুলো বিক্ষিপ্ত
এবং দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে।
নিক্কির চোখ যুবকের দিকে পড়তেই হতভম্ব হয়ে গেল। এ সেই
যুবক যার সাথে সে রেলস্টেশনে জড়িয়ে পড়েছিল। তাকে দেখে দিওয়ান জি উঠে
দাঁড়ালেন। যুবকটি ভেতরে আসতেই হাত জোড় করে অভিবাদন জানায়।
“আসুন ডঃ বাবু। আপনার অপেক্ষায়
ছিলাম।” দিওয়ান জি ওই যুবকের সঙ্গে করমর্দন করে বললেন। তারপর ঠাকুর
সাহেবের দিকে ফিরে বললেন- "মালিক, ইনি রবিবাবু।
তার কথাই আপনাকে বলেছি।"
ঠাকুর সাহেব ডাক্তার স্যারের পরিচয় পাওয়ার সাথে সাথে
নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর তার সাথে করমর্দন করে বললো- "এখানে
পৌছাতে তোমার কি কোন সমস্যা হয়েছে?"
“তেমন কিছু না ঠাকুর সাহেব
.....” নিক্কির
দিকে তাকিয়ে বলল সে।
“আপনি নিশ্চয়ই ক্লান্ত। আগে
গিয়ে বিশ্রাম নিন। সন্ধ্যায় দেখা হবে।” ঠাকুর সাহেব রবিকে বললেন।
“ধন্যবাদ...!”
“আসুন, আমি
আপনাকে আপনার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।” দিওয়ান জি রবিকে বললেন।
রবি ঠাকুর সাহেবকে আবার সালাম জানিয়ে দিওয়ান স্যারকে
নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। তার রুম ছিল উপরের তলায়। সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই বাঁ দিকে
একটা গ্যালারি দেখা গেল। ওই পাশে চারটি কক্ষ ছিল। প্রথম রুম দেওয়া হল রবির থাকার
জন্য।
রবি দিওয়ান জিকে নিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করল। ঘরের
সাজসজ্জা আর কাঁচের খোদাই দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল রবি। এমনিতেই প্রাসাদের ভিতরে পা
রাখার পর থেকেই সে নিজেকে স্বর্গে পৌঁছেছেন বলে অনুভব করছিল। প্রাসাদের সৌন্দর্য ওকে
বিমোহিত করে ফেলেছে।
“যদি আপনার কখনও কিছু প্রয়োজন
হয় তবে নির্দ্বিধায় বলবেন।” হঠাৎ দিওয়ান জির কথায় সে চমকে উঠে।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। কিছু আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা করে দিওয়ান জি সেখান থেকে
চলে গেলেন।
নিক্কি তখনও হলের মধ্যে বসে তার বাবা ঠাকুর জগৎ সিং-এর
সঙ্গে কথা বলছিল। চাকরেরা ডানে-বামে দাঁড়িয়ে নিক্কির কথা শুনছিল। নিক্কির কথায় ঠাকুর
সাহেবের ঠোঁটে বারবার হাসি ফুটে উঠে।
“ব্যাস …
.ব্যাস….ব্যাস বেটি নিক্কি, বাকি
গল্পগুলো পরে বলো। এখন বিশ্রাম নাও। তুমি অনেক দূরের যাত্রা থেকে এসেছো এবং
নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছো।” ঠাকুর সাহেব নিক্কিকে
থামাতে চেস্টা করে।
“ঠিক আছে বাবা, তবে
কাউকে পাঠিয়ে কাঞ্চনকে ডেকে পাঠিও। ওর সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে।” নিক্কি এ কথা বলে নিজের রুমের দিকে
চলে গেল। সিঁড়ি বেয়ে ডানদিকের গ্যালারিতে তার ঘর। সে রুমে পৌঁছে গেল। নিক্কি
সত্যিই ক্লান্ত বোধ করছিল, ভাবল গোসল
করা দরকার। নিক্কি বাথরুমে ঢুকল। জামাকাপড় খুলে ঝরনার নিচে চলে গেল। শাওয়ার থেকে
গড়িয়ে পড়া ঠাণ্ডা পানি ওর শরীরে পড়লে সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। অনেকক্ষন
নিজেকে ঘষতে থাকে আর শাওয়ার উপভোগ করতে থাকে। তারপর বাইরে এসে পোশাক পরে কাঞ্চনের
জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
কাঞ্চন তার ছোটবেলার বন্ধু। কাঞ্চন ছাড়া নিক্কির কোনো
বন্ধু ছিল না। নিক্কি ছোটবেলা থেকেই খুব অহংকারী এবং জেদী ছিল। তবে কুঁড়েঘরে থাকা
কাঞ্চন তার প্রিয় ছিল। উভয়ের মধ্যে ছিল জমিন-আকাশের পার্থক্য। কিন্তু দুজনের
মধ্যে একটা জিনিস মিল ছিল। দুজনেই মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত, সম্ভবত
এটাই ছিল তাদের গভীর বন্ধুত্বের রহস্য। যে কোনো মুহূর্তে প্রাসাদে প্রবেশের
স্বাধীনতা ছিল কাঞ্চনের। কেউ বাধা দিলে নিক্কি চিৎকার করে প্রাসাদ মাথায় তুলে
নিত। ঠাকুর সাহেবও কখনো ভুল করে কাঞ্চনের মনে আঘাত দিতেন না। এত বছর কাঞ্চনের কাছ
থেকে দূরে থাকার পরও নিক্কি তাকে ভুলতে পারেনি। নিক্কি শহর থেকে কাঞ্চনের জন্য
অনেক কাপড় এনেছিল, নিক্কি সেই কাপড়ের প্যাকেট বের করে
কাঞ্চনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
রবি গত ৩০ মিনিট ধরে তার ঘরে বসে ছিল সেই চাকরের জন্য
যাকে সে তার কাপড় ইস্ত্রি করতে দিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় তার কাপড়ের ইস্ত্রি
নষ্ট হয়ে গেছে। যেই পোশাকে প্রাসাদে এসেছে এখন পর্যন্ত সে একই পোশাক পরে আছে। সে
পেঁচার মতো চেয়ারে বসে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“ঠক ..ঠক ...!” হঠাৎ দরজায় কে যেন টোকা দিল। নিক্কি
উঠে দরজার কাছে গেল। দরজা খুলতেই সামনে সালোয়ার কামিজ পরা এক সুন্দরী মেয়ে
হাসছে। তাকে দেখেই নিক্কির চোখ চকচক করে উঠল। সে ছিল কাঞ্চন। নিক্কি ওর হাত ধরে
ঘরের ভিতরে টেনে নিয়ে গেল। তারপর শক্তকরে জড়িয়ে ধরল। দুজনের আলিঙ্গন এত গভীর
ছিল যে দুজনেই একে অপরের মধ্যে চাপা পড়ে গেল। এ সময় নিক্কির পড়নে নীল জিন্স এবং
সবুজ টি-শার্ট। কাঞ্চন ওকে দেখেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। “নিক্কি
তুই কত বদলে গেছিস। এই পোশাকে তোকে খুব সুন্দর লাগছে।"
“আমার জান... তুই চিন্তা করিস
কেন। আমি তোর জন্যও এই রকমের পোশাক নিয়ে এসেছি। ওই জামাগুলো পরলে তোকেও আমার মতো হট
লাগবে।” ওকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল নিক্কি।
“আমি আর এরকম জামা? না
বাবা না....! আমি এমন পোশাক পরতে পারবো না।” কাঞ্চন আতঙ্কিত হয়ে বললো - "এই
জামা পরলে সারা গ্রামে আমার কুখ্যাতি হবে। আর যদি সম্ভব হয়, তুইও
এই জামাকাপড় পরা বন্ধ কর, অন্তত যতদিন তুই এখানে আছিস।"
“কেউ কিছু বলবে না, তুই
এটা পরবি। আর তুই আমার চিন্তা ছেড়ে দে... আমি এখন থেকে এখানে থাকব এবং এই রকম
পোশাকই পরব।” নিক্কি হেসে উঠল।
“তুই এখানে চিরকাল থাকতে পারবি
না, সবসময় এমন পোশাক পরতেও পারবি না।” কাঞ্চন মুচকি হেসে বললো- "আমার জান, তুই
তো মেয়ে, একদিন তোকে বিয়ে করে তোর শ্বশুর
বাড়িতে যেতে হবে। তারপর তার পছন্দের পোশাক পরতে হবে।"
কাঞ্চনের কথা শুনে হঠাৎ রবির মুখ ভেসে উঠল নিক্কির চোখের
সামনে। বললো- "আজকে পথে একটা মজার এক্সিডেন্ট হয়েছে জানিস?"
“দুর্ঘটনা? কি
দুর্ঘটনা?” কাঞ্চনের মুখ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ
বেরিয়ে এল।
“স্টেশনে একটা বোকাকে পেয়েছিলাম।
তার একটা লক্করঝক্কর বাইক ছিল। পুরো ২০ মিনিট ধরে সে তার লক্করঝক্কর বাইকের শব্দে
আমাকে বিরক্ত করেছে।” নিক্কি হেসে বলে।
“তারপর...?” কাঞ্চন
উদ্বিগ্ন হয়ে বলল।
“তারপর আর কি...! আমিও ওকে ওর
অবস্থান কোথায় দেখিয়ে ছিলাম। আর এখন সেই বোকাটা আমাদের বাড়ির অতিথি হয়ে বসে আছে।
বাবা বলে উনি একজন ডাক্তার। কিন্তু আমি ওকে একজন প্রথম শ্রেণীর বলদ মনে করি।” বাঁকা মুখে বলল নিক্কি।
“সে এখন কোথায়?” কাঞ্চন
জিজ্ঞেস করল।
“তার রুমে থাকবে হয়তো। তাকে নিয়ে
মজা করতে হবে। সে নিজেকে খুব স্মার্ট মনে করে।” নিক্কি ওর হাত ধরে টানতে টানতে বলল।
“না ...না ... নিক্কি, ঠাকুর
কাকার খারাপ লাগবে।” কাঞ্চন হাত ছেড়ে দিয়ে বলল। কিন্তু
নিক্কি ওকে দরজা দিয়ে টেনে বের করে রুমের বাহিরে চলে আসে।
গ্যালারিতে আসতেই দেখল মঙ্গলু বাড়ির চাকর সিঁড়ি দিয়ে
উঠছে। তার হাতে ছিল রবির কাপড় যা সে ইস্ত্রি করে এনেছে। সে বাঁদিকের সিঁড়ি বেয়ে
চলে গেল। তার পা রবির ঘরের দিকে।
“এই, শোন...!” নিক্কি তাকে ডাকে।
চাকরটি থেমে গিয়ে ঘুরে নিক্কির কাছে এল। "আরে ছোট
মালকিন?"
“এগুলো কার কাপড়?"
“ডাঃ বাবুর .... তিনি ইস্ত্রি করতে
দিয়েছিলেন। এখন আমি তাকে দেব।” চাকর তোতা পাক্ষীর মত এক নিঃশ্বাসে সব
কথা বলে গেল।
“এই কাপড়গুলো নিয়ে ভিতরে আসো।” নিক্কি আঙুল দিয়ে ইশারা করল ওকে।
ভৃত্য নিক্কির দিকে অবোধ্য ভঙ্গিতে তাকিয়ে তারপর
অনিচ্ছায় ভিতরে প্রবেশ করল।
“তোমার নাম কি?” নিক্কি
চাকরকে জিজ্ঞেস করল।
“মঙ্গলু...!” চাকর দাঁত বের করে উত্তর দেয়।
“মুখ বন্ধ করো...।” নিক্কি ধমক দিয়ে বললো- "এই
কাপড়গুলো এখানে রাখো আর ইস্ত্রি আনতে যাও।"
“কিন্তু ইস্ত্রি করা হয়ে গেছে, ছোট
মালকিন?” চাকর মাথা চুলকায়।
“আমি জানি। তোমাকে আবার ইস্ত্রি
করতে হবে। আমাদের স্টাইলে।” নিক্কির ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি
নেচে উঠে - "তুমি গিয়ে আয়রন নিয়ে এসো। আর কোন প্রশ্ন করো না, বাবার
সাথে কথা বলে তোমাকে ছাড়িয়ে দেবো। বুঝলে?"
“জি...ছোট মালিক।” ভৃত্য ভয়ে কেঁপে উঠে - "সব
বুঝলাম। আমি এখনই ইস্ত্রি করে দিচ্ছি।” বলে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
"তুই কি করতে চাস?” অবাক
হয়ে বলে কাঞ্চন।
“তুই
শুধু দেখতে থাক।” নিক্কির ঠোঁটে হাসি আর চোখে দুষ্টু
ভাব, নিক্কি কাঞ্চনকে তার পরিকল্পনার কথা বলতে শুরু
করে। তার কথা শুনে কাঞ্চনের চোখে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে।
তখন মঙ্গলুকে দরজা দিয়ে ভেতরে আসতে দেখা যায়। সে ইস্ত্রিটা
নিক্কির সামনে রাখল। নিক্কি সেটা ইলেকট্রিক পয়েন্টের সাথে সংযুক্ত করে। কিছুক্ষণ
পর ইস্ত্রি চুল্লির মতো গরম হয়ে গেল। ও একটি কাপড় তুলে, খুলে
এবং তার উপরে জ্বলন্ত ইস্ত্রিটি রাখে। ভৃত্য কাপড়ের এমন অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলল।
"ছোট মালকিন, আমি তোমার পায়ে পড়ি। আমার কাজের
প্রতি দয়া করুন। এই জামাকাপড় দেখে ডাঃ বাবু মালিকের কাছে অভিযোগ করবেন। তারপর
আমার...?"
“তুমি চুপচাপ বসে থাকো।” নিক্কি চোখ রাঙ্গায়। আর এক এক করে সব
কাপড় গরম ইস্ত্রি দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। তারপর একই ভাবে ভাঁজ করা শুরু করে।
সব কাপড় ভাঁজ করে ফেলার পর মঙ্গলুকে বলল- "এখন নাও আর ঘোঁচুর ঘরে রেখে আসো।"
“মোটেই না।” মঙ্গলু চিৎকার করে উঠল। "তুমি
চাইলে আমাকে ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে দাও। নইলে আমার মাথা কেটে দাও। আমি এসব কাপড়
নিয়ে রবিবাবুর ঘরে যাব না।” সে কথা বলে চোখের পলকে ঘর থেকে অদৃশ্য
হয়ে গেল।
নিক্কি তাকে ডাকতে থাকে। মঙ্গলু চলে যাওয়ার পর নিক্কি
কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার হাসিতে দুষ্টুমি ভরা।
“আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছো
কেন?” কাঞ্চনের কন্ঠে সন্দেহ।
“আমার প্রিয় বন্ধু, এখন
তুই এই জামাকাপড়গুলো ওই ক্লাউনের ঘরে নিয়ে যাবি।"
“কে ... কি???” কাঞ্চন
আতঙ্কিত হয়ে বলল- "না... না নিক্কি, আমি এই কাজ
করব না। কোনো মূল্যেই না। তোর প্রতিশোধ তোকেই নিতে হবে। আমি তোকে এই কাজে সাহায্য
করব না।"
৫
"তুই করবি না?” নিক্কি
তার নাকের ছিদ্র প্রসারিত করল।
“না ...!” একই
গোয়ার্তামির সাথে আবার বলল কাঞ্চন।
“ঠিক আছে তাহলে আমি এখন ফ্যানের
সাথে ঝুলে আমার জীবন দেব। আমি তোর জন্য সারা দুনিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে পারি আর তুই
আমার জন্য একটা ছোট কাজ করতে পারবি না।” নিক্কি কুমির চোখের জল ফেলে বললো- “তুই বদলে গেছিস কাঞ্চন, এখন
তুই আমার বন্ধু না যে আমার সুখের জন্য দিনরাত আমার সাথে থাকতো, সে
আমার ইশারায় যে কোন কিছু করতো, তুই আমার
হৃদয়ে আঘাত দিয়েছিস কাঞ্চন... .এখন আমি তোকে এবং এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে চিরতরে
দূরে চলে যাচ্ছি। শুধু তোর স্কার্ফ দে।"
“উড়না... কি করবি উড়না দিয়ে?” মৃদুস্বরে
জিজ্ঞেস করল কাঞ্চন।
আমার কাছে তো কোন দড়ি নেই, তাই
না?
“কে... কি?” কাঞ্চন
ঘাবড়ে গেল। ও ঘামতে থাকে। ও জানত নিক্কি খুব জেদি। নিক্কি ওর প্রত্যাখ্যানের জন্য
তার জীবন দেবে না, তবে তার হৃদয় অবশ্যই ভেঙে যাবে।
নিক্কির মন নিশ্চয়ই ওর প্রতি কাদা হয়ে যাবে। সে নিক্কিকে হারাতে চায়না। কি করবে
বুঝতে পারছিল না। নিজেকে বাঁচানোর কোনো উপায় দেখতে পায় না। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে
দিয়ে বললো- "ঠিক আছে নিক্কি, তুই যা বলবি
আমি তাই করব। কিন্তু আর কখনো তোর জীবন দেবার কথা বলবি না।"
“ওহ ধন্যবাদ কাঞ্চন” নিক্কি ছুটে গেল কাঞ্চনের কাছে। তারপর
ওকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চুমু দিয়ে বললো- "তুই খুব সুন্দর, তোর
বন্ধুত্বে আমি গর্বিত। এখন এই কাপড়টা তুলে ঐ ভাঁড়ের ঘরে গিয়ে রাখ।"
কাঞ্চন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল, তারপর
সেই কাপড়গুলো হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে।
কপালে ঘাম।
রবি নিজের ঘরে বসে বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত। চাকর কাপড়
নিয়ে গেছে প্রায় ঘন্টাখানেক হল। কিন্তু এখনও তার জামাকাপড় নিয়ে ফেরার নাম নেই।
ভাবল আর বসে না থেকে গোসলটা সেড়ে ফেলা যাক।। সকাল থেকে গোসল না করায় মাথা ব্যাথা
শুরু হয়েছে। ক্লান্তিতে শরীর থমথমে। সে উঠে ভিতর থেকে দরজার লক খুলে দিল। তারপর
তোয়ালেটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে। জামাকাপড় খুলে সাওয়ারের নিচে দাঁড়ায়। তার গোসল
করতে কিছু সময় লাগল তারপর তোয়ালে দিয়ে ভেজা শরীর মুছতে লাগল। গোসল সেরে খুব
হালকা লাগছে। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেল সে। ভাবল চাকর হবে। এত দেরিতে আসার
জন্য সে তার উপর বিরক্ত ছিল। ওকে তিরস্কার করা দরকার। তোয়ালে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো।
বাথরুম থেকে বের হতেই কাঞ্চনকে দেখতে পায়। কাঞ্চনের পিঠ তার দিকে এবং কাপড় রেখে
বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
“শোন মেয়ে...!” রবির কর্কশ কণ্ঠ কানে লাগে কাঞ্চনের। ওর
চলমান পদক্ষেপ থেমে গেল। হার্টবিট বেড়ে গেছে। ও দাঁড়াল কিন্তু ঘুরলো না। ও রবির
কাছে মুখ দেখাতে চায়না।
“এত সময় নিলে কেন?” রবি
ওকে কাজের মেয়ে ভেবে বকাঝকা শুরু করে।
“জী...ওটা ...আমি ...মানে...ওটা!” কি উত্তর দেবেন বুঝতে পারছিলন না।
“আমার দিকে ফিরে আস্তে করে কথা
বল।” রবি
চিৎকার করে উঠল।
কাঞ্চনের সিত্তি পিট্টি গোল হয়ে গেল। পালানোর উপায় ছিল
না। নিক্কির দুষ্টুমিতে সে বলির পাঁঠা হয়ে গেছে। ওর পা কাঁপছে। সে ঘুরে গেল। রবির
দিকে চোখ পড়তেই হতভম্ব হয়ে গেল।
“তুমি...!” কাঞ্চনের
মুখে রবির চোখ পড়তেই তার মুখ থেকে বিরক্তি বেরিয়ে এল।
“হ্যা …..আমি…!” কাঞ্চনও
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। ওর সাথে যে এমন কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে পারে তা ও ভাবেনি।
“তুমি কি সেই মেয়ে যে আমাকে
রাস্তায় লাম্বারজ্যাক বলেছিল?” কাঞ্চনের
দিকে তাকিয়ে বলল রবি। কাঞ্চনকে প্রাসাদে দেখে ও ভয়ঙ্কর হতবাক হয়ে গেছে। ভুলে
গেছে যে এই সময়ে সে শুধু গামছা পরে একটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কাঞ্চনের অবস্থাও খুব খারাপ। নিজের দুর্ভাগ্য দেখে
কেঁদে ফেলার উপক্রম। কিছু না বলে ওখান থেকে পালিয়ে যাওয়াই ভালো মনে করলো। সে
ঘুরে দ্রুত পায়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রবি স্তব্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে
রইল।
এই মেয়ে এখানে কি করছে? কলেজ
থেকে পড়া শেষ করে আসা কিছু মেয়ের সাথে একে দেখেছিলাম। তাহলে কি এই মেয়েটি
প্রাসাদে দাসীর কাজ করে? কিন্তু কলেজ পড়ুয়া একটা মেয়ে কেন
কারো বাড়িতে কাজের মেয়ের কাজ করবে? সে জামাটা
তুলে নিল। কিন্তু খুলতেই মাথার খুলি ফেটে গেল। চোখে রক্ত ফুটে উঠল। একটা লোহার
আকারের গর্ত সেই জামায়। সে দ্বিতীয় জামাটা তুলে নিল। এটার অবস্থা আরও খারাপ। তারপর
তৃতীয় জামাটা তুলে, তারপর চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ,তার
সব জামাকাপড়ই মাঝখানে পুড়ে গেছে। জামার এমন অবস্থা দেখে ওর মন খারাপ হয়ে গেল।
আশ্চর্য হয়ে গেল। রাগে ওর নাসারন্ধ্র ফুলে উঠে। উত্তেজনায় ওর মুখ কাঁপতে লাগল। ওর
চোখ জ্বলে উঠে। সে রাগে মুঠি মুঠো করল। সে মেয়েটির (কাঞ্চন) উপর এতটাই রেগে গেল
যে সে যদি এই সময়ে তার সামনে থাকত, সে ওর গলা
টিপে দম বন্ধ করে দিত। এখন সে কি পড়বে! ওর কাছে পরার জন্য একটি তোয়ালে পর্যন্ত
ছিল না। এমনকি যে জামাকাপড় পরে এসেছে সেগুলো বাথরুমে ভেজা। সাবান দিয়ে ভাল করে
ধুয়ে এসেছে। রবি মাথা চেপে বসে রইল।
তখন সন্ধ্যা ৫ টা। ঠাকুর সাহেব, নিক্কি
আর দিওয়ান স্যার হলের মধ্যে বসে কথা বলছিলেন। নিক্কিকে আগামীকাল আসবে বলে কথা
দিয়ে কাঞ্চন তাড়াতাড়ি তার বাড়িতে ফিরে গেছে। তারা সবাই অপেক্ষা করছিল রবির নামার
জন্য। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ঠাকুর সাহেব দিওয়ান জিকে বললেন - "দিওয়ান জী
তার তো এতক্ষণে নেমে আসা উচিত ছিল। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে?"
“আমি নিজে গিয়ে দেখব, মালিক?” দিওয়ান জি কথা বলে উঠে দাঁড়ালেন।
সিঁড়ি বেয়ে রবির ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর দিওয়ান জি উপর থেকে একজন
চাকরকে ডাকলেন। চাকর দৌড়ে উপরে গেল। তারপর দ্বিতীয় মিনিটেই সে দৌড়ে নিচে এসে
প্রাসাদের বাইরে যেতে লাগল। ঠাকুর সাহেব তাকে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে বাধা
দিলেন- "আরে মন্টু কোথায় পালাচ্ছো?"
“মালিক, আমি
দিওয়ানের বাড়িতে যাচ্ছি। ওর বাড়ি থেকে কিছু কাপড় আনতে।” বলে এবং ঠাকুর সাহেবের অনুমতির
অপেক্ষা করতে লাগে।
“ঠিক আছে তুমি যাও।” ঠাকুর সাহেব চাকরকে চলে যেতে বললেন।
আর ভাবনায় হারিয়ে গেল। সে কিছু বুঝতে পাড়লো না কি হয়েছে। দেওয়ান জিও উপরে গিয়ে
আটকে আছে।
কিছুক্ষণ পর মন্টু কিছু জামাকাপড় নিয়ে প্রাসাদে ফিরে
এসে রবির ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তার উপরে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই দিওয়ানজিও নেমে
এলেন। নিচে নামার সাথে সাথে ঠাকুর সাহেব বললেন - "সব কিছি ঠিক আছে তো দিওয়ান
জি? কেন মন্টুকে আপনার বাড়িতে কাপড় আনতে পাঠালেন?"
“ডাক্তার বাবুর সমস্যা হয়েছে, মালিক” দিওয়ান জি কপালে হাত বুলাতে বুলাতে
বললেন - "তার পরনের কাপড় নেই।"
“কি...? ঠাকুর সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন-
"পরার মতো কাপড় নেই, তাইলে কি খালি
হাতে বাড়ি থেকে এসেছেন?
“হ্যাঁ...না।” এই আওয়াজটা সিঁড়ির পাশ থেকে ভেসে
এল। ঠাকুর সাহেবের সাথে সবার চোখ গেল তার দিকে। রবিকে দেখা গেল সিঁড়ি দিয়ে
নামতে। তার গায়ে দেওয়ান জির কাপড়। রবিকে এই পোশাকে কার্টুনের মতো লাগছিল। তাকে
একবার দেখে নিক্কি হো হো করে হেসে উঠল। ঠিক তখনই ঠাকুর সাহেব তাড়াহুড়ো করে তার
কথায় চলে গেলেন। রবির কানে যে তার কথা পৌছতে পারে সে সম্পর্কে তার মোটেও ধারণা
ছিল না।
৬
“মাফ করবেন ডাক্তার .... আমরা
আসলে অনেকক্ষণ ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আপনি না আসায় আমাদের মন খারাপ
হয়ে যাচ্ছিল।” ঠাকুর সাহেব দ্বিধা মুছে দিয়ে বললেন - "যাই হোক, আপনার
জামাকাপড়ের কি হয়েছে? দিওয়ানজী বলছিলেন আপনার কাপড়
নেই।"
“আসলে পথে যাওয়ার সময় আমার
সাথে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল।” রবি ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন
- "পথে একটা বন্য বিড়াল আমার সাথে ধাক্কা খেয়েছে। এর ফলে আমি ভারসাম্য
হারিয়ে ফেলি এবং আমার গাড়িটি একটি পাথরের সাথে ধাক্কা লেগে গেল। আমার স্যুটকেসটি
খুলে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে এবং আমার সমস্ত জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। এখানে এসে
আমি একজন ভদ্রলোককে কাপড় ইস্ত্রি করতে দিয়েছিলাম, তারপর
তিনি কাপড় নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। প্রায় এক ঘন্টা পর একজন কাজের মেয়ে আমার
কাপড় নিয়ে এলো। আমি যখন পরার জন্য কাপড় তুললাম, দেখলাম
আমার সব কাপড় পুড়ে গেছে।” রবি তার কথা শেষ করল।
“কোন দাসী আপনার জামাকাপড়
পুড়িয়ে দিয়েছে?” ঠাকুর সাহেব অবাক হয়ে বললেন -
"কিন্তু প্রাসাদে একজনই দাসী আছে। আর সে অনেক বছর ধরে আমাদের সাথে কাজ করছে।
সে তা করতে পারে না। ঠিক আছে, যাই ঘটুক না
কেন, আমরা খুঁজে বের করব। আপনার কষ্টের জন্য আমরাও খুব
মর্মাহত হয়েছি, আমরা খুঁজে বের করব। আমি দুঃখিত।” ঠাকুর সাহেব বিনীত কণ্ঠে বলিলেন।
“আপনি আমার চেয়ে বড় ঠাকুর
সাহেব” রবি ঠাকুর সাহেবকে বলল এবং তারপর
নিক্কির দিকে চোখ রাখল - "আপনি আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে আমাকে ছোট করবেন না।”
ওর কথায় নিক্কির মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে লাল চোখে রবির
দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু রবি বিনা দ্বিধায় ঠাকুর সাহেবের দিকে ফিরল - "আমি
আপনার স্ত্রী রাধা দেবীকে দেখতে চাই। আমাকে তার ঘর দেখান।"
“চলুন।” ঠাকুর সাহেব বললেন। আর রবিকে নিয়ে রওনা
দিল রাধা দেবীর ঘরের দিকে। নিক্কি ও দেওয়ান জিও তাদের পেছনে পেছনে।
ঠাকুর সাহেব রাধা দেবীর ঘরের বাইরে এসে থামলেন। দরজায়
তালা লাগানো ছিল। তার রুম সবসময় বন্ধ থাকে। তার ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য
দিনে একবার খোলা হত। আর এই কাজের দায়িত্ব ছিল বাড়ির একমাত্র কাজের মেয়ে
ধনিয়ার। সে ছাড়া এই ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়না। সেই রাধা দেবীর জন্য
খাবার এবং কাপড় সরবরাহ করতেন। প্রাসাদতে সে একমাত্র সদস্য, যাকে
দেখে রাধা দেবীর খিঁচুনি হয়না। সে পাগলামি করে না। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকে। ধনিয়া
তাকে শুধু খাবারই খাওয়াত না, তাকে তোষামত
করে গোসল করাত, তার পোশাকও বদলাতো। তবে এর জন্য ওকে
কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।
চাকর দরজার তালা খুলে দেয়। রবি ঠাকুর সাহেবকে বললেন -
"আপনারা বাইরে থাকুন। আমি বললে ভিতরে আসবেন।"
ঠাকুর সাহেব সম্মতিতে মাথা নাড়লেন। নিক্কির হার্টবিট
বেড়ে গেল। মাকে দেখেছে অনেক বছর কেটে গেছে। তার মুখটাও আর মনে নেই। মাকে দেখার
জন্য ও খুবই উদগ্রিব ছিল।
রবি ভিতরে পৌছালো। তার হার্টবিট বেড়ে গেছে। কিন্তু মুখ
শান্ত। মনটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। রাধা দেবীর খোঁজে চোখ বুলায় ঘরের এপাশে
ওপাশে। রাধা দেবীকে তার বিছানার একপাশে শুয়ে থাকতে দেখতে পায়। তার পিঠ ছিল রবির
দিকে। সে জেগে নাকি ঘুমিয়ে তা বলা মুশকিল।
রবি কম্পিত হৃদয়ে তার দিকে পা বাড়াল। পায়ের শব্দে
রাধা ঘুরে যায়। তার কোলে সেই কাপড়ের পুতুলটা। রবিকে দেখে রাধা দেবী হুট করে উঠে
দাঁড়ালেন। রাধা দেবী বড় বড় চোখ করে রবির দিকে তাকাতে লাগলেন। পরের মুহুর্তে তার
চোখে ভয় নেমে আসে। রাধা দেবী তার হাতে থাকা পুতুলটিকে তার হাত দিয়ে লুকিয়ে ফেলে।
রবি শান্ত ছিল, সে খুব মনোযোগ দিয়ে তার প্রতিটি
গতিবিধি দেখছে। বুঝতে পারে যে রাধা দেবী ওকে দেখে ভয় পেয়েছে। ও তার সামনে হাত
জোড় করে প্রণাম করল। ওর স্টাইল ছিল রাজার সামনে মাথা নত করে নমস্কার করার মতো-
"নমস্কার মা জি।"
রাধার চোখ সরু হয়ে গেল। সে বিস্ময় আর ভয়ের মিশ্র ভাব
নিয়ে রবির দিকে তাকাল। তারপর তাদের হাতও নমস্কার বলার ভঙ্গিতে মিলিত হল -
"নমস্কার।” সে ভীতু গলায় বলল। তার কণ্ঠ কাঁপে- "কে তুমি? আমাকে
চেনো?"
“হ্যাঁ।” রবি শান্ত কন্ঠে বললো- "আমার নাম
ডাঃ রবি ভাটনাগর। আমাকে আপনার মেয়ে নিক্কি এখানে পাঠিয়েছে। তার বিয়ের কথা বলার
জন্য।"
“নিক্কি ...নিক্কি কে?” রাধা
দেবী হতবাক হয়ে গেল। তারপর তার পুতুলের দিকে তাকিয়ে বলল - "আমার মেয়ের নাম
নিক্কি না.... রানী। ও এখনো অনেক ছোট।"
রবি মৃদু হেসে দু পা এগিয়ে গেল। “আপনার
হাতে নিক্কির পুতুল। নিক্কি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ও অনেক বড় হয়ে গেছে।"
রাধা দেবী ঘাড় তুলে দরজার বাইরে তাকাল। সেখানে দেখার
মতো কেউ ছিল না। চোখ গেল রবির দিকে। রবি দ্রুত তার মুখের পরিবর্তনশীল অভিব্যক্তি
পড়ছিল। ভয় আর কষ্ট তার চোখে ভয়ের জায়গা করে নিয়েছে। - "আপনি কি নিক্কির
সাথে দেখা করতে চান?"
রাধা দেবী ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন। রবি হেসে
নিক্কিকে ডাকলো। - "নিক্কি... ভেতরে এসো।"
দরজার দিকে রাধা দেবীর চোখ থেমে গেল। তারপর নিক্কি
দরজায় হাজির, সে ধীরে ধীরে হেঁটে রবির কাছে এসে
দাঁড়াল। ভারী চোখে মায়ের দিকে তাকাল সে। ওর মনে একটা আকাংখা জেগে উঠে, এখনই
এগিয়ে গিয়ে মাকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু রবির নির্দেশ ছাড়া সে কিছু করতে চায়না, যাতে
পুরো পরিবেশটি নষ্ট হয়ে না যায়।
রাধাও নিক্কির দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, তার
কপালে ভাঁজ। সে নিক্কিকে চেনার চেষ্টা করছিল। “আমি
কিছু মনে করতে পারছি না। তোমাকে আগে কখনো দেখিনি। তুমি কি সত্যিই আমার মেয়ে
নিক্কি?"
“মা!” নিক্কির
কান্না ভেসে উঠল। মমতার তৃষ্ণার্ত নিক্কি নিজেকে আটকাতে পারল না, সে
এগিয়ে গিয়ে রাধাকে জড়িয়ে ধরল।
“আরে কি হয়েছে ওর? কাঁদছে
কেন?” রাধা ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
“অনেকদিন আপনার কাছ থেকে দূরে
ছিল, আজকে আপনাকে পেয়ে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেছে।” রবি রাধা দেবীর সাথে কথা বলে।
রাধা নিক্কিকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। সে তার দুর্বল হাত
তার পিঠে ঘুরাতে থাকে। অন্য হাত দিয়ে নিক্কির গাল বেয়ে অশ্রু মুছতে থাকে। “কান্না
করিস না মেয়ে, তবে এতদিন আমার থেকে দূরে থাকলি কেন?
আমায় যদি এত মিস করতে, তাহলে আগে দেখা করতে এলে না কেন?"
“আমি শহরে পড়তাম, মা।
তাই তোমার সাথে দেখা করতে পারিনি।” নিক্কি নিজেকে সংযত করে বলল।
“তোমরা দুজনে একসাথে পড়ো?” রাধা
নিক্কির মুখ তুলে বলল।
“পড়তো।” রবি বলল- "এখন আমাদের পড়াশুনা
শেষ। এখন আপনার দোয়া নিয়ে বিয়ে করতে চাই। আপনি কি আমার হাতে নিক্কির হাত দেবেন?"
“হ্যাঁ...হ্যাঁ, কেন
না, এতকিছুর পরেও তোমরা দুজন দুজনকে ভালোবাস। আমার
মেয়ের জন্য তোমার মতো বরই চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাড়ি থেকে কোনো বড় মানুষ
ছেলের বিয়ের কথা বলতে আসেনি। তোমার কি কেউ নেই? বাড়ি?” রাধা
দেবী রবিকে জিজ্ঞেস করলেন। সে এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কথা বলছিল। নিক্কি তখনও তাকে
আঁকড়ে ধরে আছে।
রবি এগিয়ে গেল। আর রাধাকে বললো- "আমার মা, আমার
মা আছে কিন্তু তার স্বাস্থ্য ভালো না, সেজন্য সে
আসতে পারেনি। কিছুদিনের মধ্যে মাও আসবে।"
“ঠিক আছে, আমি
কয়েকদিন অপেক্ষা করব। আমিও চাই নিক্কি তাড়াতাড়ি বিয়ে করে সুখে থাক।"
“তাহলে এখন আমাদের অনুমতি দিন।” রবি বলল- "আমরা আবার দেখা করতে
আসব। আপনি বিশ্রাম করুন। আমরা অন্য ঘরে আছি। আপনা যে কোন প্রয়োজনে আমাদের ডাকবেন।"
“হ্যাঁ...হ্যাঁ, বিশ্রামে
যাও। তোমরা নিশ্চয়ই দূরের শহর থেকে এসেছো খুব ক্লান্ত।” রাধা কথা বলতে বলতে নিক্কির মাথায়
হাত বুলাতে লাগল।
রবি আবার তাকে নমস্কার বলে নিক্কিকে নিয়ে বেরিয়ে এল।
৮
রবি ও নিক্কি রাধা দেবীর ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
বাইরে ঠাকুর সাহেবের পাশাপাশি সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে
ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখছিলেন। ঠাকুর সাহেব এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে তাঁর
কান্না থামাতে পারেননি।
রবি বের হতেই ঠাকুর সাহেব বললেন - "ডাক্তার রবি, আমাদের
রাধা ঠিক হয়ে যাবে বলে কি মনে করেন? আমার আশা
বেড়ে গেছে। ডাক্তার স্যার বলুন, রাধা কতদিনে
সুস্থ হতে পারবে।"
“ধৈর্য্য ধরুন ঠাকুর সাহেব।
ভগবান চাইলে ১ মাসে বা সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে রাধাজী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে
যাবেন।"
“কিভাবে ধৈর্য ধরবো ডাক্তার? ২০
বছর ধরে আমি যে মানষিক অত্যাচারের মুখোমুখি হয়েছি তা শুধু আমিই জানি। আমার স্ত্রী ২০ বছর ধরে কয়েদির মতো
রুমে তালাবদ্ধ। এত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমাদের রাধাকে কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়েছে।
না খাবার, না পরার জন্য কাপড়, তার
চেয়ে ভালো জীবন নিয়ে আমাদের বাড়ির চাকররা বেঁচে আছে। ২০ বছর ধরে সে পাগলের মতো
জীবন কাটাচ্ছে। আমি তার কষ্ট আর দেখতে পারঠি না, ডাক্তার।
ঠাকুর সাহেব তার কথা বলতে বলতে শিশুদের মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন।
“দেখুন, ঠাকুর
সাহেব ..... নিজেকে সামলান।” রবি তার কাঁধ চেপে ধরে বললো -
"আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি যে সে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি ক্ষ্যান্ত
হব না। আমি এখান থেকে যাব না।” রবি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
“আমি আপনাকে বিশ্বাস করি
ডাক্তার। আমি নিশ্চিত যে আপনি অবশ্যই আমার রাধাকে সুস্থ করবেন।"
রবি হাসল। তারপর তিনি দিওয়ান জির দিকে ফিরে -
"দিওয়ান জি, আমি কিছু ওষুধ এবং ইনজেকশন লিখে
দিচ্ছি, সেগুলো শহর থেকে নিয়ে আসুন। এবং আমার বাড়ি থেকে
আমার জামা কাপড় আনানোর ব্যবস্থা করুন।"
“আমি এখনই শহরে কাউকে পাঠাব ডাক্তারবাবু, আপনার
জামাকাপড় এবং ওষুধ ২ দিনের মধ্যে চলে আসবে।"
“আমি আপনাদের সবাইকে আর একটি
কথা বলতে চাই”- "আজকের পর আপনারা আমাকে
শুধু রবি বলেই ডাকবেন। ডক্টর রবি বা অন্য কিছু বলে নয়।"
ঠাকুর সাহেব হাসলেন। "ঠিক আছে রবি। আমরা তোমাকে
সেভাবেই ডাকব।
কিছুক্ষণ পর চাকর সবার জন্য চা-নাস্তা নিয়ে এলো।
কিছুক্ষণ রবি সবার সাথে বসে গল্প করলো। তারপর ঠাকুর সাহেবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে
নিজের ঘরে চলে আসে।
মা রাধা দেবীর সাথে দেখা করার পর, রবির
জন্য নিক্কির যে তিক্ততা ছিল তা এখন কেটে গেছে। সে এখন তাকে শ্রদ্ধার সাথে দেখছিল।
২ দিন কেটে গেছে। শহর থেকে রবির কাপড়ও এসেছে। এই দুই
দিনে রবির বেশির ভাগ সময় কাটত তার ঘরে। সে তার ঘর থেকে বের হতেন শুধুমাত্র রাধা
দেবীকে দেখার জন্য। সে দিওয়ানজির পোশাক পরে অন্যদের সামনে আসতে দ্বিধাবোধ করত।
এখন তার জামাকাপড় এসে গেছে, সে রায়পুরে
যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২ দিন ধরে প্রাসাদের ভিতরে বদ্ধ থাকায় তার মন বিরক্ত
হয়ে গেছে।
জামা কাপড় পরে বেরিয়ে এল। তখন ৫ টা। সে চাকরকে তার বাইক পরিষ্কার করতে
বলল। রায়পুরে আসার কয়েকদিন আগে রবি পরিবহনের মাধ্যমে রায়পুরে বাইক পাঠিয়েছিল।
এবং রায়পুর স্টেশনে নামার পর সে মালঘর থেকে তার বাইকটা নিয়ে নেয়।
আজ সে বাইকে করে রায়পুর যাওয়ার কথা ভাবল। ভৃত্য তার
বাইক পরিস্কার করে দেয়। রবি বাইকে বসে প্রাসাদের চার দেওয়াল থেকে বেরিয়ে এল।
প্রাসাদের সীমানা ছেড়ে যেতেই রবি দুটি পথ দেখতে পেল। তাদের একটা গেছে স্টেশনের
দিকে। আর অন্য পথ জনবসতির দিকে। জনবসতির দিকে বাইক ঘুরিয়ে দিল। রাস্তাটা খুব
খাড়া। প্রাসাদ জনবসতি থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিতল। প্রাসাদের ছাদ থেকে পুরো
রায়পুর দেখা যেত।
কিছুদূর চলার পর সেই রাস্তাটাও দুই পথে পরিণত হলো। রবি
বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দুই রাস্তায় চোখ চালায়। বাঁদিকের রাস্তা চলে গেছে
বসতির দিকে। বসতি বেশি দূরে ছিল না। কিন্তু সেখানে অনেক জনসংখ্যা। যেখানে বসতি শেষ
তার সামনে মাঠের অংশ ও বন শুরু। অন্য পথ পাহাড়ে চলে গেছে। তার পাশে ছিল উঁচু
পাহাড় আর গভীর উপত্যকা। রবি বাইকটা ডানদিকে ঘুরিয়ে দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রবি ঝর্না থেকে জল পড়ার শব্দ শুনতে পায়।
কিছুদূর এগোনোর পর সে দেখতে পেল একটা বয়ে চলা নদী। এতে অর্ধেক কাপড়ে জড়ানো কিছু
মেয়েকে নদীতে সাঁতার কাটতে দেখা গেছে। সে বাইক থামিয়ে দূর থেকে সেই রঙিন
প্রজাপতিগুলো দেখতে লাগল। হঠাৎ তার চোখ চিক চিক করে উঠে, সেই
মেয়েদের মধ্যে সেই মেয়েটিকেও দেখতে পেল মনে হয় যে প্রাসাদে তার কাপড় পুড়িয়ে
দিয়েছে। কিন্তু এত দূর থেকে সেই মেয়েটি কিনা দিধা আছে। তাই তাকে আরো একটু কাছে
গিয়ে পর্যবেক্ষণ করা উপযুক্ত মনে করে। সে বাইক থেকে নেমে পায়ে হেঁটে নদীর দিকে
এগিয়ে গেল।
নদীর ধারে পৌঁছে ঝোপের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে।
এখান থেকে সে ওই মেয়েদের ভাল ভাবে দেখতে পায়। প্রাসাদের মেয়েটিকে সে স্পষ্ট
চিনতে পেরেছে। একটি হলুদ পেটিকোট পরে আছে, তার অর্ধেক শরীর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তার জলে ভিজে ফর্সা শরীর সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল। সেই মেয়ের সৌন্দর্যে রবির চোখ
আটকে গেল। সে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অর্ধনগ্ন মেয়েদের সৌন্দর্যে সাড়া দিতে থাকে।
হঠাৎ কারো আওয়াজে সে চমকে উঠল। রবি কন্ঠের দিকে ফিরে।
সামনে একটা বাচ্চা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এভাবে চুরি করে দেখতে গিয়ে ধরা
পড়ে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল রবি। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বাচ্চাকে বললো-
"তোমার নাম কি?"
“চিন্টু” শিশুটি উচ্চস্বরে বলল - "আর
তোমার নাম কি?"
রবি তার উচ্চস্বরে চমকে উঠে। সে দ্রুত পার্স বের করে দশ
টাকার নোট বের করে চিন্টুর দিকে বাড়িয়ে দেয়। নোটটা হাতে আসতেই হেসে ফেলে চিন্টু।
“তুমি কি আমার কাছ থেকে আরও
টাকা নিতে চাও?” রবি হাঁটু গেড়ে বসে বলল।
“হ্যাঁ...!” শিশুটি সম্মতিতে মাথা নাড়ে।
“তাহলে আমি তোমাকে যাই জিজ্ঞেস
করি, তুমি কি আমাকে সত্য বলবে?” রবি
ওর পার্স বের করে শিশুটিকে বলে।
চিন্টু রবির মানিব্যাগটা দেখে ওর জিভটা ঠোঁটের কাছে
নাড়ল। - "হ্যাঁ"
“ঠিক আছে তাহলে ঐ হলুদ পেটিকোট পড়া
মেয়েটির দিকে তাকাও।” রবি কাঞ্চনের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল-
"ওকে চেন?"
“হ্যাঁ।” শিশুটি মাথা নাড়ল।
“ওর নাম কি?” রবি
জিজ্ঞেস করল।
“আগে টাকা দাও। তারপর বলবো।” ছেলেটি স্মার্ট। রবি ওর দিকে ১০ টাকার
নোট বাড়িয়ে দিল।
“সে আমার কাঞ্চন দিদি।” ১০ টাকার নোট পকেটে রেখে শিশুটি বলল।
“তোমার বোন?” রবি
ওর কথার পুনরাবৃত্তি করল।
“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি তার নাম
জিজ্ঞেস করলে কেন?” শিশুটি উল্টো প্রশ্ন করল।
“এই এমনি, আমি
যখন কাউকে দেখি তার নাম জিজ্ঞাসা করি। যেমন তুমি জিজ্ঞাসা করেছিলে।"
চিন্টু অদ্ভুত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।
“ঠিক আছে চিন্টু, এখন
আর একটা কাজ করবে?"
“টাকা পাবো?” ঠোঁটে
জিভ চেটে দিল চিন্টু।
রবি ওকে ১০ টাকার নোট দিল। - "তুমি কি তোমার বোনের
কাপড় আমার কাছে আনতে পারবে?"
“দিদির জামা, না
..... দিদি আমাকে মেরে ফেলবে।” চিন্টু ভয়ে বলল।
“তাহলে আমার সব টাকা ফেরত দাও।” রবি চোখ দেখায়।
চিন্টু মুঠিতে থাকা নোটটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল
আর ভাবতে থাকল। তারপর বললো- "দিদির কাপড় দিয়ে কি করবে?"
“কিছু না ... শুধু হাতে নিয়ে
দেখতে চাই তোমার বোনের কাপড় কেমন।"
চিন্টু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে একদিকে টাকার
লোভ, অন্যদিকে দিদির বকাবকি খাওয়ার চিন্তা। অবশেষে
টাকাটা পকেটে রেখে জামার দিকে এগিয়ে গেল। পর মিনিটেই কাঞ্চনের জামা নিয়ে ফিরে
আসে। রবি ওর হাত থেকে জামাটা নিয়ে বললো- চিন্টু মহারাজ, এখন
যদি চাও তোমার বোন তোমাকে মারবে না, তাহলে এখান
থেকে সরে যাও।
চমকে উঠল চিন্টু। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রবির দিকে তাকাল। “এখন
তুমি দিদির জামা ফেরত দাও।"
“এই জামাগুলো তোমার বোনের হাতে
দেব।"
কিন্তু বোন আমাকে মেরে ফেলবে। সে ভয়ে বলল। ভয়ে তার
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
“তোমার বোনকে কে বলবে যে তুমি
আমাকে তার জামা দিয়েছ।” রবি ওর ভয় দূর করে- "তুমি যখন
এখানে না থাকো, সে তোমাকে মারবে কিভাবে?"
“কিন্তু তুমি দিদিকে বলো না যে
আমি তোমাকে তার কাপড় দিয়েছি।"
“আমি বলবো না। কথা দিলাম।” রবি ওর গলা ছুঁয়ে বলল।
পরের মুহূর্তে চিন্টু হাওয়া হয়ে গেল। রবি কাঞ্চনের
জামাকাপড় পাশের ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে কাঞ্চনের জলের বাইরে আসার অপেক্ষা করতে
লাগল।
৮
রবি ঝোপের মধ্যে লুকিয়েছিল। তার মনে প্রতিশোধের
স্পৃহা। এই মেয়েটির কারণে তাকে প্রাসাদে অপদস্থ হতে হয়েছে। রবি কাঞ্চনকে শিক্ষা
দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ও কি করে ভুলবে যে এই মেয়ে কোন কারণ ছাড়াই তার
জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়েছে। এই কারণে, তাকে দুই দিন
ধরে জোকার হয়ে প্রাসাদে থাকতে হয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে সে ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থেকে
কাঞ্চনকে খুঁজে বেড়াতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর মেয়েরা একে একে বের হয়ে নিজেদের পোশাক
পরে নিজ নিজ বাড়িতে যেতে লাগল। রবি ঝোপের বাইরে থেকে ১ ঘন্টা ধরে এই সব দেখছিল।
এখন সূর্যও দিগন্তে অস্ত গেছে। সন্ধ্যার লালিমা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এখন নদীতে
মাত্র ২টি মেয়ে অবশিষ্ট। তাদের একজন
কাঞ্চন, অন্যজন তার বান্ধবী। কিছুক্ষণ পর তার বান্ধবীও নদী
থেকে বেরিয়ে এসে তার কাপড় পরতে শুরু করে। হঠাৎ বুঝতে পারে এখানে কাঞ্চনের কাপড়
নেই। সে কাঞ্চনের কাপড়ের খোঁজে এদিক ওদিক তাকালো, কিন্তু
কাপড় কোথাও দেখা পেল না। সে কাঞ্চনকে ডাকে। “কাঞ্চন, তোমার
কাপড় কোথায় রেখেছ? এখানে দেখা যাচ্ছে না।"
“ওগুলো ওখানেই ছিল। হয়তো
বাতাসে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে গেছে। আমি এসে দেখব” বলে
কাঞ্চন জল থেকে বেরিয়ে এল। সে তার জামাকাপড় যেখানে রেখেছিল সেখানে চলে এলো।
সেখানে শুধু তার ব্রা আর প্যান্টি পড়ে আছে। বাকি জামাকাপড় হাওয়া। সে তার
জামাকাপড় খুঁজতে ছুটতে লাগল। কখনও ঝোপের মধ্যে আবার কখনও পাথরে খুঁজে বেড়ায়।
কিন্তু জামাকাপড় কোথাও মেলে না। এবার কাঞ্চনের চিন্তা বেড়ে গেল। সে কষ্টে
এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতে থাকে, তারপর তার বান্ধবীর
কাছে যায়। "লতা জামাটা সত্যিই নেই!"
“তাহলে কি আমি মিথ্যা বলছিলাম?” লতা
হাসে।
“এখন বাড়ি যাব কিভাবে?
"
“কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। আলো শেষ
হলে বের হয়ে বাড়ি যাও। অন্ধকারে কেউ চিনবে না।"
“তুমি কি আমার বাসা থেকে কাপড়
আনতে পারবে?” কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল।
“আমি...! না বাবা না।” লতা মানা করলো - "তুমি জানো আমার
মা আমাকে আসতে দিবে না। তাহলে আমাকে আসতে বলছ কেন?"
“লতা, তাহলে
তুমিও একটু থাকো। দুজনে একসাথে যাবো। আমি এখানে একা থাকতে পারবো না।” কাঞ্চন প্রায় কেদে দেয়।
“কাঞ্চন, আমি
যদি থাকতে পারতাম, আমি থাকতাম না? যদি একটু দেরি হয়, তবে
আমার সৎ মা আমাকে মেরে ফেলবে। "
কাঞ্চন চুপ করে গেল। সে ভালো করেই জানত, লতার
সৎ মা ওকে মারধর করে। একটি কাজ ১০ বার করায়। তিনি প্রায়শই এই আশায় থাকেন যে লতা
কিছু ভুল করুক আর সে এই বেচারিকে মারধর করে। ওর বৃদ্ধ বাবাও স্ত্রীর রাগ থেকে দূরে
থাকে।
“আরে ইয়ার এত চিন্তিত কেন? তুমি
এভাবে আমার সাথে বাড়িতে চল।” লতা ওকে পরামর্শ দেয়।
“কেউ যদি তোমাকে এমন অবস্থায়
দেখে, তুমি কি বলবে?” কাঞ্চন
উদ্বিগ্ন স্বরে বলল।
“কেউ কিছু বলবে না। উল্টো মানুষ
শুধু তোমার কাঞ্চন শরীরের প্রশংসা করবে।” লতা ওর কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে-
সত্যি বলছি, তোমাকে এমন অবস্থায় দেখে গ্রামের
সমস্ত মজনু মনেপ্রাণে প্রার্থনা করবে তোমাকে পাওয়ার জন্য।
“লতা, তুমি
মজা করছ আর আমি এখানে আমার জান যাচ্ছে।” কাঞ্চন গম্ভীর গলায় বলল।
“তোমার কি অন্য কোন উপায় আছে?” লতা
ওর চোখে উঁকি মেরে বললো - "হয় তুমি এভাবে আমার সাথে বাসায় চলো... না হয়
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করো। কিন্তু আমাকে অনুমতি দাও। আমি
চলে গেলাম।” এই বলে লতা তার পথে চলে গেল। কাঞ্চন তাকে চলে যেতে
দেখতে থাকে।
রবি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে এসব দেখছিল। লতা চলে যেতেই সে
বেরিয়ে আসে। আর ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কাঞ্চনের দিকে এগুতে থাকে। কাঞ্চন ওর
দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রবি ওর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে ওর দিকে দেখতে লাগলো। এই
প্রথম কোনও মেয়েকে এই অবস্থায় দেখতে পেল সে। কাঞ্চন ভেজা পেটিকোট পরে দাঁড়িয়ে
ছিল। ওর ভেজা পেটিকোট ওর পাছার সাথে আটকে আছে। পেটিকোট ভিজে যাওয়ায় সম্পূর্ণ
স্বচ্ছ হয়ে গেছে। অল্প আলোতেও তার বিশাল গোলাকার পাছা রবি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
পেটিকোট দুটো পাছার ফাঁকে আটকে গেছে, এক অপরুম মোহময় দৃশ্য। রবি অবাক হয়ে তার
অপূর্ব রূপের দিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ কাঞ্চন অনুভব করলো ওর পেছনে কেউ আছে। সে
দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। সাথে সাথে মুখ ঘুরিয়ে চিৎকার করে চার পা পিছিয়ে গেল। অবাক
হয়ে রবির দিকে তাকায়। রবি ওর চিৎকারকে পাত্তা না দিয়ে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ওর দিকে
তাকিয়ে রইল। ওর অর্ধনগ্ন স্তনের বোঁটাগুলো দেখে রবির চোখ দুটো অদ্ভুত আভায় ভরে
গেল। তার চোখ স্থির ছিল পাহাড়ের মতো শক্ত চাকের দিকে। ভেজা পেটিকোটে, ওর
টানটান স্তন এবং ওর গাঁট বাক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। রবি ওর ঠোঁটে জিভ নাড়ায়।
কাঞ্চনের অবস্থা ছিল বেগতিক। এমন অবস্থায় সামনে একজন
অপরিচিত লোককে দেখে ওর হৃৎপিণ্ড জোরে জোরে স্পন্দিত হচ্ছিল। বুকটা দ্রুত ওপরে নিচে
উঠছে নামছে। যখন সে তার শরীরে রবির কাতর চোখ বুঝতে পারল, সে
তার হাত কাঁচির আকার দিয়ে বুক ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। ও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে
রইল লজ্জার বান্ডিল হয়ে। তারপর সাহস করে বললো- "আপনি এই সময়ে এখানে... এমনভাবে
একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে আপনার কি লজ্জা লাগে না?"
জবাবে হাসল রবি। তারপর ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় বললেন-
"একই কথা। কৃষ্ণ করলে লীলা। আমরা করলে রাসলীলা।"
“আমি বুঝতে পারছি না।” মৃদু কণ্ঠে বলল কাঞ্চন।
রবি হাত বাড়িয়ে জামাকাপড় দেখাল। কাঞ্চন রবির হাতে
তার জামা দেখে প্রথমে চমকে উঠল তারপর চোখ তুলে বলল - "ওহ... তাইলে আপনিই আমার
জামা চুরি করেছেন। আমি জানতাম না যে শহুরে লোকেরাও মেয়েদের জামা চুরি করতে
অভ্যস্ত। এটা বড় হতাশার বিষয়। দিন আমার জামাকাপড় আমাকে দিন।"
রবি ব্যঙ্গ করে হাসল। "আমিও জানতাম না যে গ্রামে
যারা থাকে তারা পোশাক জ্বালিয়ে অতিথিকে তাদের বাড়িতে স্বাগত জানায়, সেটা
খুব ভাল কাজ তাই না।” হঠাৎ রবির কণ্ঠে কঠরোতা ফুটে উঠল- "এখন
কেমন? তোমার উপর
আমার অপমানের প্রতিশোধ নিতে দাও। তোমার শরীর থেকে এই শেষ কাপড়টাও খুলে ফেলো না
কেন?
কাঞ্চন কেঁপে উঠল। তার চোখ থেকে ভয়ে অশ্রু গড়িয়ে
পড়ল। সে ভীতু গলায় বললো- "আমি আপনার জামাকাপড় পোড়াইনি, স্যার, সে
করেছে... সে করেছে...।” বলতে বলতে কাঞ্চন হঠাৎ থামে। ও নিজেই
লজ্জাজনক অবস্থায় আছে, এখন নিক্কিকেও লজ্জা দেওয়া ঠিক হবে না।
“সেটা কে? এখন
বলছ অন্য কেউ ওই কাজটা করেছে। যে মেয়েটা আমার পোড়া কাপড় নিয়ে আমার ঘরে
গিয়েছিল সে অন্য কেউ না, তুমি।"
“স্যার ...সত্যি বলছি, আমি
আপনার জামাকাপড় পোড়াইনি।"
“তুমি যা করেছে তা তোমার মিথ্যা
দিয়ে ঢাকতে পারবে না। আমি তোমার এই সাদা শরীরের ভিতরে কালো মন দেখেছি।"
কাঞ্চন রেগে গেল, রবির কটূক্তি
ওর হৃদয়ে বিঁধে যাচ্ছে। ও সাহায্যের জন্য চারপাশে তাকায় কিন্তু এমন কাউকে দেখতে
পায়না যাতে ও সাহায্য চাইতে পারে। ও সেই মুহূর্তে নিক্কিকে সারাজীবনের জন্য অভিশাপ
দেয়। আমি যদি সেদিন ওর কথায় না আসতাম। ও আবার রবির দিকে ঘাড় তুলে বলল -
"স্যার, আমার জামাকাপড় দিন। আমার বাড়ির সবাই
চিন্তা করবে।” তার কণ্ঠে আকুতি ছিল এবং ওর চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। সে
এখন কেদে দিবে।
৯
রবি মনোযোগ দিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল। লজ্জা আর ভয়ে ওর
মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ওর সুন্দর চোখে ঘন ফোঁটা অশ্রু। ওর ঠোঁট কাঁপছিল।
অসহায়ভাবে ওর শুকনো ঠোঁটে জিভ নাড়ছিল। রবি ওর অবস্থা দেখে ওর প্রতি করুণা অনুভব করে।
হাতে ধরা কাপড়টা ওর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো- "তোমার জামাটা নাও, পরে
বাসায় যাও। আমি সেই লোকদের মত নই যারা কারো অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। তবে বাসায়
যাওয়ার পর সময় পেলে তোমার মনের ভিতরে দেখ এবং ভেবো আমি তোমার সাথে যা করেছি তা
কেন করেছি তখন তুমি সম্ভবত বুঝতে পারবে যে কারও মনে আঘাত দিলে অন্যের মনে কী হয়।
রবি চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল, তারপর থেমে
গিয়ে কাঞ্চনকে বললো- "আর একটা কথা... যদি তুমি নিজের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে
কারো মন ভরাতে না পার, তবে চেষ্টা করো যেন কেউ তোমাকে ঘৃণা
না করে।” এই বলে রবি ঘুরে তার বাইকের দিকে এগিয়ে গেল।
কাঞ্চন রকিকে চলে যেতে দেখতে থাকল। তখনও ওর চোখে জল।
রবির শেষ কথাগুলো ওর কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
“আমি দুঃখিত, স্যার।” বিড়বিড় করে বললো- "আমি জানি
আমার কারণে আপনার হৃদয় ভেঙে গেছে, আমি ভুল করে
আপনার আত্মসম্মানে আঘাত করেছি। কিন্তু আমাকে ঘৃণা করবেন না স্যার।"
কাঞ্চন ভারী পায়ে ঝোপের দিকে এগিয়ে গিয়ে জামা কাপড়
পরতে লাগল। পোশাক পরে সে বাড়ির পথে রওনা দিল। সে সারাটা পথ রবির কথা ভাবতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর বাড়িতে পৌঁছে যায়। কাঞ্চন বাড়ির আঙিনায় পা দিতেই খালা জিজ্ঞেস করল
“কাঞ্চন এত
দেরি করলি কেন? কতবার বুঝিয়েছি সন্ধেবেলা দেরি করে
বাইরে থাকিস না। নিজের খেয়াল আছে নাকি?"
কাঞ্চন বুয়ার দিকে তাকায়, বুয়া
উঠোনের চুলায় রুটি বানাচ্ছেন। তার বাবা সুগনার চুলা থেকে একটু দূরে খাটের ওপর বসে
ছিলেন। কাঞ্চন তাকে বাবা বলে ডাকতো। “আজ
দেরি হয়ে গেছে বুয়া, এখন থেকে আর হবে না।” কাঞ্চন বুয়ার সাথে কথা বলে নিজের
রুমের দিকে চলে গেল। ওদের মাটির ঘর আর মাটির ঘরে ছিল মাত্র দুটি ঘর। এক ঘরে কাঞ্চন
ঘুমাতো, অন্য ঘরে তার বুয়া শান্তা, বারান্দায়
সুগনার খাট। চিন্টুর জন্য আলাদা খাট ছিল না। যার সাথে ইচ্ছা তার সাথে ঘুমায়। তবে
বেশির ভাগ সময় কাঞ্চনের সঙ্গেই ঘুমায়। কাঞ্চন ওর ঘরে ঢুকে গেল। ভেতরে পড়াশোনা
করছিল চিন্টু। কাঞ্চনকে দেখে সে ঘাবড়ে গেল। আর বই বন্ধ করে ঘর হতে বের হতে লাগল।
“তুই কোথায় যাচ্ছিস?” কাঞ্চন
ওকে বাধা দেয়।
“কোথাও না, বাইরে
মা ... মায়ের কাছে।” সে ছটফট করল।
“মায়ের কাছে নাকি বাবার কাছে?” কাঞ্চন
তাকিয়ে বললো, "আর এত ছটফট করছিস কেন?"
চিন্টু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর কপালে ঘাম। ভয়ে ওর মুখ
ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কথা বলার জন্য মুখ খুলল কিন্তু আওয়াজ
বের হল না।
চোখ কুচকে কাঞ্চন মনোযোগ দিয়ে ওর দিকে দেখতে লাগলো।
"ব্যাপার কি?” কাঞ্চন মনে মনে বলল- ও এতো ভয় পাচ্ছে
কেন? চিশ্চয়ই বিনা কারণে নয়।
চিন্টু কাঞ্চনকে চিন্তায় মগ্ন দেখে গভীর পদক্ষেপে
সেখান থেকে চলে গেল। কাঞ্চন ভাবতে থাকে। ওর চোখ হঠাৎ জ্বলে ওঠে। নদীতে গোসল করতে
গিয়ে চিন্টুর গলা শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু দেখতে পায়নি। "এমন না তো, ওই
আমার কাপড় চুরি করে স্যারকে দিয়েছে।” ও বিড়বিড় করে বললো- "এমনটাই
নিশ্চয় হয়েছে। নইলে স্যার কি করে জানবে আমার জামা কোনটা?"
ওর কাছে এবার বিষয়টি পরিস্কার। কাঞ্চন দাঁতে দাঁত
কিড়মিড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বাবার কোলে বসে কথা বলছিল চিন্টু। কাঞ্চনকে
রাগে নিজের দিকে আসতে দেখে ওর হুঁশ উড়ে গেল। কিন্তু কিছু করার আগেই কাঞ্চন ওকে
ধরে ফেলে। কাঞ্চন ওর হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে গেল। রুমে পৌঁছে কাঞ্চন চিন্টুকে
খাটের ওপর বসিয়ে ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিতে থাকে। চিন্টু এটা দেখে ভয়ে কেঁপে
উঠে। আজ যে তার প্রহার নিশ্চিত তা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি। টাকার লোভে শহুরে
বাবুর কথা মেনে নেওয়াকে অভিশাপ দেয়।
কাঞ্চন এসে দরজার লাচ ধরে ওর কাছে দাঁড়াল। "কেন
তুই... আমার থেকে পালাচ্ছিস কেন?"
“দিদি, তুমি
কি সত্যিই আমাকে মেরে ফেলবে?” ভয়ে
ভয়ে জিজ্ঞেস করল চিন্টু।
কাঞ্চনের চিন্টুর হলুদ মুখ দেখে সমস্ত রাগ উধাও।
মেয়েটা হাসল, তারপর ওর সাথে খাটে বসে ওর গালে চুমু
খেয়ে বলল- “না, আমি
কি তোকে মেরে ফেলতে পারি, কিন্তু তুই শুধু বল তুই আমার জামাটা স্যারকে
দিয়েছিস, সত্যি বলবি, নাহলে
তোকে অবশ্যই মেরে ফেলব।"
চিন্টু হাসল। সে কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে লজ্জিত হয়ে
বলল- হ্যাঁ!
“কেন দিলি?” কাঞ্চন
আবার গালে চুমু খেতে খেতে বলল।
“আমি বলবো না, তুমি
মেরে ফেলবে।” চিন্টু হাসল।
“আমি না বললে মেরে ফেলব” কাঞ্চন
চোখ দেখিয়ে বলল”আমার
জামাকাপড় দিলি কেন?"
“তিনি আমাকে টাকা দিয়েছিলেন
এবং বলেছিলেন যে আমি যদি সে যা বলে তাই করি তবে তিনি আমাকে আরও টাকা দেবেন।” চিন্টু কাঞ্চনকে নদীর পুরো ঘটনা খুলে
বলল।
“টাকা কোথায়?” সব
শুনে কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল।
চিন্টু পকেট থেকে টাকা বের করে কাঞ্চনকে দেখিয়ে বলল -
"দিদি আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে মেরে ফেলবে। আজকের পর আর কখনো এমন করব না...
সত্যি.!"
কাঞ্চন মুচকি হেসে বুকে জড়িয়ে ধরে মনে মনে বললো-
"তুই জানিস না, তোর জন্য আজ আমি কি পেলাম।” পরের মুহুর্তে ওর মনে প্রশ্ন জাগলো।
"কিন্তু আমি কি পেলাম যে আমি এত খুশি হচ্ছি? স্যার
তো আমার কোনো ভালো করেননি, আমাকে অপমানই
করেছেন। তাহলে আমার মন ময়ূর হয়ে গেল কেন?"
“না স্যার আমাকে অপমান করেননি, তিনি
আমার ভালোর জন্য যাই বলুন না কেন, তিনি একজন
ভালো মানুষ, আজ তিনি চাইলে আমার সাথে যা কিছু করতে
পারতেন না। কিন্তু তিনি কিছুই করেননি। তিনি সত্যিই একজন ভালো মানুষ।"
“ধরে নিই তিনি একজন ভালো মানুষ।
কিন্তু আমি কেন তাকে নিয়ে ভাবছি। তাকে নিয়ে ভাবার কি অধিকার আমার আছে। আমি কি
তার প্রেমে পড়তে শুরু করেছি?"
“আমি করলেও বা কি খারাপ, ভালোবাসা
মন্দ নয়। ভালোবাসা একদিন সবারই হয়, আমারও হয়েছে।"
কাঞ্চনের হৃদয়ে স্পন্দন। তার বুকে একটা মিষ্টি আভা। সে
তার বুক ঘষতে লাগল। "আমার কি হচ্ছে, আমি ওকে
নিয়ে এত ভাবছি কেন। আমার কিছু হয়েছে, আমি কি
সত্যিই প্রেমে পড়ে গেছি?"
কাঞ্চনের মনে প্রেমের অঙ্কুর ফুটেছে। এবং তা খুব দ্রুত
বেড়ে উঠছে। নদীতে রবির সাথে দেখা হওয়া ওর উপর খুবই প্রভাব ফেলেছে। তা ওর মন থেকে
যাচ্ছেই না। প্রতি মুহূর্তে রবির চিন্তায় ডুবে যাচ্ছিল। ইচ্ছে করেও সেই চিন্তা
থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।
১০
বোনকে হারিয়ে যেতে দেখে চিন্তায় পড়ে গেল চিন্টু।
কাঞ্চন ভাবছিল, কখনও ওর ঠোঁট হাসছে আবার কখনও শক্ত
হয়ে যাচ্ছে। ছোট চিন্টু কিছুই বুঝতে পারল না। “কি
হয়েছে দিদি, চুপ করে আছো কেন?"
চিন্টুর কথায় কাঞ্চন জেগে উঠে, সে
দেখল চিন্টু তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। “বলো
দিদি, হাসছিলে কেন?” চিন্টু
আবার জিজ্ঞেস করল।
“চিন্টু তোকে কি বলবো? আমি
নিজেও জানি না, আমার কি হয়েছে? কি
হচ্ছে? কেন আমার সবকিছু ভালো লাগতে শুরু করেছে। তুইও সেই
একই, এই বাড়ি, একই উঠান, তাহলে
আমার কেন সব কিছু নতুন লাগছে? যদি কেউ
আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর বলতে পারে... কাঞ্চন ওর কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে, ওর
কন্ঠস্বর মনে হচ্ছে দূরে কোথাও থেকে আসছে।
চিন্টু পলক ফেলল। সে তখনও কিছু বুঝতে পারেনি- "আমি
গিয়ে বাবাকে বলবো?” কাঞ্চনের কোল থেকে উঠে বলল।
কাঞ্চন কেঁপে উঠে। সে তাড়াতাড়ি চিন্টুর হাত টেনে
নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। ওকে বাহুতে ভরে ওর গালে চুমু খেয়ে চলে। “দিদি, আমাকে
ছেড়ে দাও।” চিন্টু ছাড়া পেতে মরিয়া, কিন্তু
কাঞ্চনের খপ্পর শক্ত ছিল- "তুমি যদি আমার গাল ভিজিয়ে দাও, আমি
আর তোমার কাছে আসব না।"
“তাহলে আমি কার গাল ভিজাব... বল?” একটানা
চুমু খেতে খেতে কাঞ্চন বলল।
“যাও সেই শহুরে বাবুর গাল
ভিজিয়ে দাও যে তোমার কাপড় নিয়েছে।” চিন্টু আবার জোড়াজুড়ি করে ছাড়া পাওয়ার
জন্য।
“কিন্তু এটা তুই দিয়েছিস।” কাঞ্চন ওকে সুড়সুড়ি দিয়ে বলল।
চিন্টুকে কিছুক্ষণ লাল হলুদ করার পর কাঞ্চন ওকে ছেড়ে দেয়।
হাত থেকে ছাড়া পেতেই চিন্টু দৌড়ে বাইরে গেল। কাঞ্চন বিছানায় পড়ে রবির কথা ভাবতে
থাকে। রবির শেষ কথাটা আবার কানে ধ্বনিত হলো- "যদি তুমি কারো হৃদয় নিজের
প্রতি ভালোবাসায় ভরাতে না পার, তবে চেষ্টা
করো কেউ যেন তোমাকে ঘৃণা না করে।"
“স্যার, আমি
আপনার জন্য আমার হৃদয় পূর্ণ রাখব। একদিন, স্যার, আপনি
এই কাঞ্চনকে আপনার বাহুতে জড়িয়ে ধরবেন। আপনি আমাকে ভালোবাসবেন। আমি আপনার
হৃদয়কে নিজের জন্য এত ভালবাসা দিয়ে পূর্ণ করব যে আপনি সাত জন্মের জন্য সেই
ভালবাসা মুছে ফেলতে পারবেন না।” কাঞ্চনের ঠোঁটে হাসি। বালিশে মাথা
লুকিয়ে স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যেতে থাকে।
রাত বারোটা বাজে। নিক্কি ওর বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু
ওর চোখ থেকে ঘুম উধাও। ওর চিন্তায়ও রবি। আপনি হয়তো ভাবছেন সেও কাঞ্চনের মতো
রবিকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু তা নয়, ওর চিন্তার
ভিত্তি অন্য কিছু। নিক্কি প্রেমকে ঘৃণা করে, সে প্রেমকে
বোকা মানুষের ধারণা বলে মনে করে। ওর বিশ্বাস প্রেমে মানুষের বুদ্ধিমত্তা কমে যায়।
ভালোবাসা শুধু টেনশন দেয় আর কিছু না। প্রেম করার পর মানুষ তার স্বাধীনতা হারায়।
মানুষ অন্যের দাস হয়েই থাকে। নিক্কির হৃদয়ে মাত্র দুই জনের জন্য ভালবাসা। একজন ওর
বাবা ঠাকুর জগৎ সিং, অন্যজন কাঞ্চন ওর বান্ধবী। এদের ছাড়া
ও কাউকে অন্তরে ঢুকতে দেয়নি। হ্যাঁ, মায়ের জন্য ওর
হৃদয় এখনও খালি। রবিকে নিয়ে ভাবনায় আসার কারণ হল, ওর
শহরে কাটানো জীবনের কথা মনে পড়ছে। সেখানে ওর সবকিছুর স্বাধীনতা ছিল, কেউ
বাধা দেওয়ার ছিল না। কারও সাথে আড্ডা দিতে চাওয়া, গভীর রাত পর্যন্ত বাইরে থাকা, নিজের
বন্ধুদের সাথে কিছু করা, কোনও বাধা ছিল না। কিন্তু এখানে ঠিক
উল্টো। এখানে নিক্কি সেই সমস্ত স্বাধীনতা পাচ্ছিল না। কলেজে অনেক মজা করতো। অগণিত
ছেলের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক ছিল। ও সেই সব মেয়েদের মধ্যে একজন যারা পোশাক কম, বিছানা
বেশি পাল্টায়। ওর কাছে পুরুষদের সাথে বন্ধুত্ব ছিল শুধুমাত্র শারীরিক তৃপ্তি এবং
এর বেশি কিছু নয়। ও ওর শহুরে জীবনে সেক্সে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, কারো
সাথে সেক্স করতে দ্বিধা করত না। কিন্তু কখনো কাউকে ওর উপর কর্তৃত্ব করতে দেয়নি।
কখনো অন্য কোন নেশাদ্রব্য স্পর্শ করেনি। কখনই মদ এবং সিগারেটে অভ্যস্ত হয়নি।
শহর থেকে আসার ৪ দিন হয়ে গেল। গত ৬ দিন ধরে ও শারীরিক
সুখ থেকে বঞ্চিত। এখানে আসার
পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত ওর মন সেদিকে যায়নি। কিন্তু এখন সেক্স মিস করতে শুরু
করেছে। আজ বিছানায় শুয়ে আনন্দের দোলায় কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়ছে ওর।
সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লে শরীর শিউরে ওঠে। কামের ঢেউ ভেসে উঠছিল শরীরে। আর
এই সময় একটাই মুখ দেখতে পেল যা ওর লালসা প্রশমিত করতে পারে। আর সেটা ছিল রবি।
কিন্তু সে একটা দ্বিধায় পড়েছে, যদিও অনেকের
সাথে সেক্স করেছে, কিন্তু রবি ওর কাছে অন্য রকমের লোক
বলে মনে হয়েছে। ওর ভয় যে রবি ওর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু লাখ চাওয়ার
পরও নিজের ভেতরের লালসাকে দমন করতে পারেনি। শরীরের ক্ষুধা মনের উপর আধিপত্য
বিস্তার করছিল। উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। এই সময়ে ওর শরীরে একটি খুব স্বচ্ছ
নাইটি। নিজেকে আয়নায় দেখতে লাগল।
"আমার এই সৌন্দর্য কি গলে যাবে রবি?” সে তার উদ্ধত স্তনের দিকে তাকাল।
সেগুলো মাথা উঁচু করে যেকোনো চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত। নিক্কি আলতো করে তার দুই
হাত দুটো স্তনের উপর রেখে আদর করে। তাদের অভিনন্দন জানানোর মতোই। ওর হাতের স্পর্শে
স্তনগুলো আরও শক্ত হয়ে গেল। নিক্কি হাসে। একই সঙ্গে ওর ডান হাত নিচের দিকে নেমে
সোজা কোমরের কাছে পৌঁছে যায়। হাত কোমর বেয়ে প্যান্টি পর্যন্ত পৌঁছে গেল।
প্যান্টির ইলাস্টিকের উপর আঙুল আটকে রাখল, তারপর আস্তে
আস্তে প্যান্টিটি নীচে নিচে নামাতে থাকে। প্যান্টিটা উরু পর্যন্ত পৌছলে হাত সরিয়ে
নিল। এরপর আয়নায় নিজের নগ্ন সৌন্দর্য দেখতে লাগল। কিছুক্ষণের জন্য নিজের চোখে ওর
ধ্বংসাত্মক সৌন্দর্যকে পুনরুজ্জীবিত করার পরে, নিক্কি
প্যান্টি তুলে। তারপর বিছানার দিকে ফিরল। কিছুক্ষন বিছানায় বসে ভাবতে থাকে রবির
কাছে যাওয়া উচিত হবে কি না। অবশেষে রবির কাছে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেয়। নিক্কি
চাদরটা তুলে শরীরে জড়িয়ে নিল। তারপর ঘড়ির দিকে তাকায়, সাড়ে
বারোটা বাজে। ধীরে ধীরে
ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গ্যালারিতে এসে দেখে গ্যালারি জনশূন্য। ওর ঘরের দরজা ঠেলে
রবির রুমের দিকে চলে যায়। ওর পূর্ণ আশা এই সময়ে রবি জেগে থাকবে। রবির ঘরের বাইরে
নিজের চলন্ত পদক্ষেপগুলো থামিয়ে দিল। তারপর আস্তে আস্তে দরজায় টোকা দিল।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে রবির কন্ঠ ভেসে এলো- কে?
“আমি নিক্কি ...দরজা খুলুন।” নিক্কি নরম গলায় বলল।
কিছুক্ষন পর রবি দরজা খুলে নিক্কির দিকে অবাক হয়ে
তাকাল - "তুমি... মানে আপনি... এই সময়ে?"
“আমাকে আসতে বলবেন না।” নিক্কি হেসে বলল।
“আসুন” দরজা থেকে সরে গিয়ে বলল রবি।
নিক্কি রুমে ঢুকে সোফায় বসল। রবি সামনে দাঁড়িয়ে
প্রশ্নবিদ্ধ চোখে নিক্কির দিকে তাকাতে লাগল। মনের সব জানালা খুলে সে ভাবতে লাগল এত
রাতে নিক্কি তার রুমে এমন রুপে এলো কেন? কিন্তু
লক্ষাধিক মনের ঘোড়া দৌড়ানোর পরও সে কিছু বুঝতে না পেরে নিক্কির দিকে তাকাল।
নিক্কি ওর দিকে তাকিয়ে ছিল, রবি অবাক
হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে নিক্কি হেসে বলল- দরজা বন্ধ করুন।
“আপনি গরমের রাতে চাদর পরেছেন
কেন?” নিক্কির কথা উপেক্ষা করে রবি ওকে
জিজ্ঞেস করল।
“আসলে আমি একটা ট্রান্সপারেন্ট
নাইটি পরে আছি ভিতরে। আর আপনি বোধহয় পছন্দ করবেন না আমি ওই জামায় আপনার কাছে আসি।
তাই এই চাদরটা দিয়ে ঢেকে রেখেছি।”এই বলে
নিক্কি হেসে রবির দিকে তাকাতে লাগল।
“এই সময়ে এমন অবস্থায় আসার কারন
কি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল রবি। তার মুখ
শান্ত। যদিও সে নিক্কির মুখ থেকে শুনে অবাক হয়েছিলেন যে সে স্বচ্ছ পোশাক পরে আছে। তার ভেতরের তরুণ হৃদয় প্রবলভাবে
স্পন্দিত হচ্ছিল। কিন্তু নিক্কির সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে দেননি।
“বিশেষ কিছু না, আমার
ঘুম আসছিল না, তাই ভাবলাম আপনার সাথে কিছুক্ষণ কথা
বলি।” নিক্কি মৃদু হেসে বলল - "আমি জানতাম আপনিও জেগে
থাকবেন।"
“আপনি কি করে জানলেন আমি জেগে
আছি?” রবি জিজ্ঞেস করল।
“আমার জন্ম এই বাড়িতে, আমার
শৈশবও কেটেছে এখানে, সবাই আমাকে চেনে, আমি
সবাইকে জানি, তবুও আমার মন এখানে টিকছে না। নিজেকে বড়
একা লাগছে। দিনটা কোন মতে পার হয় কিন্তু রাতটা কঠিন হয়ে যায়, পুরোটা
রাতই জেগে কেটে যায়। সে কিছুক্ষণ থেমে, তারপর মুচকি
হেসে বলল - "আমারই যখন এমন অবস্থা তখন আপনি এখানে অপরিচিত। আপনার কিভাবে ভালো
ঘুম হবে।"
১১
“আমি জেগে থাকার কারণটা অন্য
কিছু, নিক্কি। রবি গম্ভীর গলায় বললো- আপনার মায়ের কথা
ভাবছিলাম।
“ওহ...!” মার কথা শুনে নিক্কির মুখ ঝুলে গেল -
"তাহলে হয়তো আমি আপনাকে বিরক্ত করছি।"
“না, এটা
সেরকম নয়।” মৃদুস্বরে বলল রবি। আর নিক্কির দিকে তাকাতে লাগলো। সে
বুঝতে পারছিল না নিক্কিকে কি বলবে। এই সময় তার রুমে থাকার কারণে সে খুব নার্ভাস
হয়ে পড়েছিল। সে একজন শালীন ব্যক্তি, সে তার
সম্মানের প্রতি খুবই সচেতন। সে চায়নি যে এই সময়ে নিক্কিকে তার ঘরে কেউ দেখুক এবং
তার সম্মান উড়ে যাক। কিন্তু সরাসরি নিক্কিকে চলে যেতে বলতে পারছে না। এটা করা হবে
আর আচরণের পরিপন্থী।
নিক্কি মাথা নিচু করে চিন্তায় হারিয়ে গেল। রবিকে
কিভাবে আসল কথা বলবে তাও বুঝতে পারছিল না। যদিও সে খুব খোলামেলা প্রকৃতির ছিল, সে
কাউকে কিছু বলতে দ্বিধা করত না।
কিন্তু এখানে পরিস্থিতি ভিন্ন। এক, সে রবির
ভদ্রতাকে ভয় পাচ্ছিল, দ্বিতীয়ত এই সময়ে সে নিজের বাড়িতে।
তার একটি ভুল তাকে তার নিজের বাড়িতে অপমানিত করতে পারে।
“আপনার বাসায় কে কে আছে?” নিক্কি
কিছু একটা নিয়ে কথা এগোনোর জন্য রবির পরিবারের কথা বলে বসল।
“আমার মা এবং আমি।” রবি মৃদু হাসল।
“আর আপনা বউ?” নিক্কি
ওর মুখে চোখ রেখে বলল।
“বউ এখনো আসেনি। অর্থাৎ আমি
এখনো বিয়ে করিনি।"
“হুমমম ...তাই জনাব এখন পর্যন্ত
শুধু গার্লফ্রেন্ড দিয়েই কাজ চালাচ্ছেন।” নিক্কি
ফ্লার্টেটিভ ভঙ্গিতে কথাটা বললেও তার কথায় ছিল কামুকতার মিশ্রণ।
রবি নিক্কির স্পষ্ট কথায় হতবাক। নিক্কি যে এত খোলামেলা
কথা বলতে পারে তার কোনো ধারণাই ছিল না। সে হাত উঠিয়ে বললো- "আমার কোন
গার্লফ্রেন্ড নেই।"
“কি... কি?” নিক্কির
মুখ খুলে গেল। এটা জেনে তার মনে হাজারো লাড্ডু ফটফটিয়ে উঠে। কিন্তু হতভম্ব হওয়ার
ভান করে বললো- "বিশ্বাস হচ্ছে না। আপনি অনেক হ্যান্ডসাম, নিশ্চয়ই
কোনো না কোনো গার্ল ফ্রেন্ড আছে। হ্যাঁ... তুমি না বলতে চাইলে অন্য ব্যাপার।"
“তোমাকে মিথ্যে বলে কি পেলাম?”রবি জবাব দিল।
“হয়তো তুমি এই অজুহাতে আমাকে
এড়িয়ে যেতে চাও। “নিক্কি আসল
বিষয়ে কথা বলেছেন।
“আমি... আমি কিছুই বুঝলাম না।”রবি
নড়বড়ে হয়ে গেল। - "আমি তোমাকে এড়িয়ে যেতে চাই কেন? তারপর...
কিসের জন্য?"
“তাহলে তুমি আমার কাছ থেকে
পালাতে চাও না?”নিক্কি
তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো - "তাহলে এত দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এখানে
এসে আমার পাশে বসো।"
রবির মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাকে কিছুতেই উত্তর দিতে
বাধ্য করবেন না। “নিক্কি জী, কি
বলছো, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। যা বলতে চাও, পরিষ্কার
করে বলো।"
“এত নির্বোধ হয়ো না, রবিজি।”নিক্কি
উঠে দাঁড়িয়ে বললো- "এই সময়ে এখানে কেন এসেছি বুঝতে পারছ না? তবে
স্পষ্ট শুনতে চাইলে শোন।”এই বলতে বলতে
নিক্কি তার শরীরের চারপাশে জড়ানো চাদরটা খুলে ফেলল - "আমি তোমার সাথে সেক্স
করতে চাই।"
বাকরুদ্ধ সূর্য! অশ্রুসজল চোখে নিক্কির দিকে তাকিয়ে
রইল। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে এই মেয়ে তার সাথে এত নির্লজ্জভাবে সেক্স করার কথা
বলতে পারে। তার চোখ মুখ নীচু হয়ে গেল। যখন তার চোখ নিক্কির স্তনের উপর পড়ল, তখন
পিঁপড়া তার শরীরে হামাগুড়ি দিয়ে গেল। নিক্কির স্বচ্ছ পোশাকে কিছুই লুকিয়ে ছিল
না। উপরের পুরো অংশটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। সে ভিতরে ব্রা পরেনি। তার টানটান স্তন
এবং বাদামী বোটা খাড়া হয়ে উপরে দৃশ্যমান। নাইটিটি এত ছোট ছিল যে এটি কেবল কোমরের
একটু নিচ পর্যন্ত ঢেকে রাখতে সক্ষম ছিল, আর সেই আবরণ ছিল
একই। নাইটির ভিতর থেকে তার প্যান্টি দেখা যাচ্ছিল। রবির চোখ যখন তার ফোলা গুদের
উপর পড়ল, তখন তার মুখ থেকে "আহহ”বের
হতে থাকলো। তার ভারী ভারী উরুগুলো রবির ভেতর লুকিয়ে থাকা তার যৌবনের চেতনাকে
প্রবাহিত করছিল। নিজের ভেতরে কিছু একটা গলে যাচ্ছে অনুভব করে। তার কানের ধমনী
দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হতে থাকে। সে অনুভব করল তার পায়ের শক্তি কমে যাচ্ছে। পুরো অজ্ঞান
হয়ে পড়ার আগেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল। আর ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে নিজের বিছানায়
এসে যড়ষড় হয়ে বসে।
“কি হয়েছে রবিজি? নিক্কি
ওর কাছে এসে বললো।
রবি নিক্কির গলায় ঘাড় তুলল, তার
চোখ নিক্কির সাথে মিলিত হল। নেশায় চোখ ভরে গেল তার দিকে তাকিয়ে। নিক্কি এক হাত
দিয়ে তার উরুতে আদর করতে শুরু করে এবং তারপরে অন্য হাতটি তার স্তনের উপর নাড়াতে
শুরু করে।
রবির কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ল। তার বাঁড়া পায়জামার
ভিতর থেকে হাসফাস করতে লাগল। সে চোখ ঘুরিয়ে নিল।
“কি হয়েছে রবি? তুমি
আমার থেকে চোখ লুকাচ্ছো কেন? আমাকে পছন্দ
করো না? তুমি মনোযোগ দিয়ে দেখ রবি, আমার
শরীরের অংশ সৌন্দর্যে ভরপুর। আমার স্তনের দিকে তাকাও, ওগুলো
কত শক্ত। ওদের ছুঁতে হাত লাগাও। রবি এর কঠোরতা অনুভব কর।” নিক্কি বলল এবং রবির হাত ধরে ওর স্তনে
রাখতে চাইল। কিন্তু রবি হাত টেনে নেয়।
“এখান থেকে চলে যাও নিক্কি।
তুমি এই মুহুর্তে সচেতন নও। সকালে কথা হবে।” রবি তার থেকে ঘুরে মুখ ফিরিয়ে কথা
বলল।
নিক্কি তার উদাসীনতায় খুব রাগ হয় কিন্তু সে তার রাগ গিলে
এগিয়ে গিয়ে রবির পিঠে আঁকড়ে ধরলেন। “রবি
আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, একটা মেয়ে
যখন তার প্রকাশ্য লজ্জা ঘুচিয়ে একজন পুরুষের কাছে আসে, তখন
সে খুব বাধ্য হয়ে আসে। এমন অবস্থায় সেই লোকটার জন্য তার অনুভূতির মুল্য দেওয়ার
দরকার হয়ে পড়ে। তুমি কি করছ? আমার প্রেমের
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আমাকে অপমান করতে চাও?"
“এটি প্রেম নয়, এটি
লালসা।” রবি এক ঝাঁকুনি দিয়ে আলাদা হয়ে বললো "তুমি যাকে
ভালোবাসা বলছো সেটা ভালোবাসা নয়, ভালোবাসা আর
লালসার মধ্যে অনেক পার্থক্য।"
নিক্কির পারদ চড়ে গেল, সে
গলার স্বর উচু করে বলল- "কি পার্থক্য?"
“ভালোবাসা এবং লালসার মধ্যে
পার্থক্য হল প্রেম ত্যাগ চায় এবং লালসা পূর্ণতা"। রবি জবাব দিল। "দুটি
দেহের মিলন না হয়েও প্রেম সম্পূর্ণ হয়, কিন্তু লালসা
পূর্ণ হয় দুটি দেহের মিলনে। কিন্তু তুমি হয়তো পার্থক্য বুঝবে না। কিন্তু আমি
পার্থক্যটা বুঝি। তাই আমি এমন কোনো কাজ করি না যাতে পরে আমাকে লজ্জিত হতে
হয়।"
রবির কথায় নিক্কি মনে মনে একটা কাঠির মত হয়ে গেল।
রবির কথায় তার রোম-রোম ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আজ পর্যন্ত কেউ তাকে এভাবে অপমান করেনি।
অপমান তো দূরের কথা, আজ পর্যন্ত কেউ নিক্কিকে অস্বীকার
করার সাহস করেনি।
নিক্কি কিছু বলল না, রবিও
চুপ করে থাকে। সে সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ জ্বলন্ত চোখে রবির দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর
হঠাৎ ঘুরে দরজার বাইরে চলে যায়। মাটিতে পড়ে থাকা চাদরটাও তুলল না। ওকে এমন
অবস্থায় বের হতে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল রবি। কিন্তু কিছু বলার আগেই নিক্কি তার ঘর
থেকে বেরিয়ে গেল। সে একই অবস্থায় নির্ভয়ে করিডোর পেরিয়ে নিজের ঘরে পৌঁছে গেল।
রুমে ঢোকার সাথে সাথে বিছানায় পড়ে কাঁদতে লাগলো। সে কাঁদতে বাধ্য। জীবনে পরাজয়
দেখেননি। কিন্তু আজ সে পরাজিত হল। আজ প্রথমবারের মতো সে তার সীমানা থেকে নিচে থাকা
কারো সামনে তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু হতাশা ও অপমান ছাড়া কিছুই পায়নি। সে
অপমানিত হয়েছিল। রবি তার ভেতরের নারীকে অপমান করেছিল। লালসার আগুনে পুড়তে থাকা
নারীকে কেউ যখন অসম্মান করে, তখন সেই নারী
আহত সিংহীর চেয়েও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এটা অনেকটা সাপের মত যার লেজের উপর একজন
মানুষের পা পড়ে তখন যতক্ষণ না সে তার লেজে পা দেয়া ব্যক্তিকে কামড়ায় ততক্ষণ সে
স্বস্তি পায় না। এই জাতীয় মহিলা প্রতিশোধের চেতনায় নিজের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
নিক্কি বিছানায় মুখ লুকিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদতে থাকে।
তারপর তার দুঃখ হালকা করে সে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের দিকে তাকাল
সে। সবকিছু একই আছে। সেই একই সুন্দর শরীর, পাহাড়ের মতো
উঁচু উঁচু চূড়া, একই চ্যাপ্টা মসৃণ পেট, সেই
একই কোমর যা হাজারো হৃদয়ে বিদ্যুৎ চমকিছে, প্যান্টিতে
একই ফুঁপানো গুদ, একই ফর্সা আর বাঁকা উরু। কিন্তু এই
সময়ে সে তার সৌন্দর্য দেখে প্রতিটি অংশই তার কাছে অসহ্য লাগছে। রাগ আবার তার চোখে
উঠতে শুরু করেছে। রবির কথা আবার তার কানে বিষ ঢালতে লাগল। সে মনে মনে বিড়বিড় করে
বললো - "মিস্টার রবি, আমি যদি
তোমাকে আমার পায়ে প্রণাম না করাই, তবে আমি
ঠাকুরের মেয়ে নই। আমি তোমাকে এত জোর করব যে তুমি নিজেই আমার আশ্রয়ে আসবে। এটা
নিক্কির জেদ। মাথা নত করতে হবে।” তার সপথ ছিল ইস্পাতের মত দৃঢ়। সে
ঘুরে বিছানায় ছড়িয়ে পড়ল। আর চাদর ঢেকে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
১২
নিক্কি চলে যাওয়ার পর রবি দরজা বন্ধ করে বিছানায়
ঢুকল। তারপর চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল। চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে নিক্কির
আগুনের মত শরীর নেচে ওঠে। তার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে নির্গত যৌবনের স্ফুলিঙ্গের
উত্তাপ তাকে আবার জ্বালিয়ে দিতে থাকে। তার ধমনীতে প্রবাহিত রক্ত আবার গরম হতে
থাকে। অবশ্যই রবি নিক্কির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু
সে তার সৌন্দর্যের সম্মোহন থেকে বাঁচতে পারেনি। সে ছিল দৃঢ় সংকল্পের মানুষ। তবে
এটাও সত্যি যে আজ সে যা দেখেছে তা তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। রবি সারা জীবনে কোন মেয়েকে
এমন যৌনতায় জ্বলতে দেখেনি। এখনকার মেয়েরা কি সত্যিই এমন? যারা
বাবা-মা নির্বিশেষে যে কারও সামনে কাপড় খুলে ফেলতে দ্বিধাবোধ করে না। রবি
সাইকোথেরাপিস্ট হলেও মেয়েদের প্রতি তার জ্ঞান ছিল শূন্য।
কারণ ছিল তার লাজুক স্বভাব।.আর মায়ের প্রতি প্রবল ভক্তি!
তার মায়ের ইচ্ছা ছিল সে যেন ডাক্তার হয়, সাধারণ
পরিবারের হয়েও তার মা তার পড়ালেখায় কোনো ঘাটতি করতে দেননি। তার বাবা... যখন তার
বয়স ৫ বছর, তাকে কাজের জন্য কোথাও চলে যেতে
হয়েছিল, যিনি আর কখনও বাড়ি ফেরেননি। তার বাবা
বেঁচে আছে কি না ওপরওয়ালাই জানে। তার মা নিজে লাখো দুঃখের মধ্যেও তাকে কোনো কিছুর
অভাববোধ করতে দেননি। সেও ছোটবেলা থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সে তার মায়ের
স্বপ্ন পূরণ করবে। এই কারণেই যখনই কোন মেয়ে তার পাশ দিয়ে যেত, সে
কলেজের সেক্সি এবং হৃদয়গ্রাহী মেয়েদের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিত।
বয়ঃসন্ধিকালে সে এতটাই লাজুক ছিল যে কোনও মেয়ে তাকে ডাকলে ঘামত। তার হাত-পা ফুলে
উঠল যেন কোনো যোদ্ধা তাকে যুদ্ধের জন্য চ্যালেঞ্জ করেছে। তার এই স্বভাবের কারণে
তার বন্ধুরা তাকে অনেক জ্বালাতন করত, তাদের
প্রেমের রসালো গল্প শুনিয়ে উত্যক্ত করত। রবি যখন তার বন্ধুদের মুখ থেকে তাদের প্রেমের
গল্প শুনত, তখন তারও একটি সুন্দরী মেয়েকে নিজের
করার ইচ্ছা জেগে উঠত, তখন তার ভিতরের মানুষটি তাকে বলত যে
তুমিও একটি প্রেমিকা বানাও। সেই অবস্থায় তখন তার মায়ের কথা তার পা বেঁধে দিত।
মায়ের দুঃখকে যত্ন করে ধারন করে বুকের মধ্যে জেগে ওঠা কামনাগুলোকে সে নিবারণ করত।
সে ছিল বইয়ের পোকা, বই তার একাকীত্ব দূর করে, বইই
তার প্রেমিকা। সে প্রেমের অনেক গল্প পড়েছে, বন্ধুদের কাছ
থেকে যৌনতা ও লালসার গল্পও শুনেছিল।
কিন্তু সে নিক্কির মতো কোন মেয়ের কথা পড়েনি, কোনো
বন্ধুও তাকে এমন মেয়ের কথা জানায়নি। সে অন্যরকম.....সবচেয়ে আলাদা!
রবি জীবনে কখনও বিরক্ত হয়নি, তার
মন খুব শক্ত ছিল, কিন্তু আজ নিক্কি তাকে বিরক্ত করেছিল।
তার মনে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। “তার
এখন কি করা উচিৎ? নিক্কির মত মেয়ে শান্তিতে বসার মেয়ে
নয়, সে আবার চেষ্টা করবে, নয়তো
অপমান করে তার অপমানের প্রতিশোধ নেবে। এমন অবস্থায় তার কাছে রক্ষা করার জন্য
মাত্র দুটি বিকল্প ছিল, হয় ঠাকুরকে তার সব সত্য বলা উচিত, তারপর
তাকে এখান থেকে চুপচাপ চলে যেতে হবে। প্রথম বিকল্পটি তার কাছে বিরক্তিকর মনে
হয়েছিল। নিক্কির কান্ডের কথা বলে সে ঠাকুর সাহেবকে হত্যা করতে চায়নি, এমনিতেই
তিনি রাধা দেবীর দুঃখে অর্ধেক মৃত। এখন নিক্কির অপকর্ম জেনে সেই ভালো মানুষটি
পুরোপুরিই মারা যাবে। এখন অন্য উপায় ছিল প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু এখান
থেকে চলে যাওয়া মানেই তার চিকিৎসা পেশাকে অপমান করা, ঠাকুর
সাহেবকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তার স্ত্রী রাধাকে সুস্থ না করে এখান থেকে যাবে না।
ঠাকুর সাহেব গত ২০ বছর ধরে বেঁচে ছিলেন এই আশায় যে কোন ডাক্তার তার স্ত্রীকে
সুস্থ করবে। কত ডাক্তার এসেছে আর টাকা খেয়ে গেছে তার ইয়াত্তা নেই। ঠাকুর সাহেব
রবির উপর খুব আশা করে আছেন।এখন যাই ঘটুক না কেন, সে
এখানেই থাকবে, শুধুমাত্র একটি মেয়ে তার জীবনের
সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, আর কোন চরিত্রহীন মেয়ে তো কিছুতেই
না! সে প্রাসাদ ছাড়বে না, নিক্কি তার
সৌন্দর্যের লাখো বজ্রপাত ঘটালেও না, তার সামনে
নগ্ন হয়ে শুয়ে থাকলেও সে নড়বে না।
সে তার অভিপ্রায় দৃঢ় করে এবং চাদরটি প্রসারিত করে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে।
****
রবি তার নিয়মিত সময়ে ঘুম থেকে উঠে, গোসল
সেরে জুস ও ওষুধ নিয়ে রাধা দেবীর ঘরে গেল। এই ছিল তার প্রতিদিনের কাজ, দিনে
দুবার রাধা দেবীকে ওষুধ ও জুস দিতে হতো, একবার সকাল
১০ টায় এবং আরেকবার রাত ৯ টায়।
এ সময় তার সঙ্গে থাকে নিক্কিও। আজও রবি আর নিক্কি রাধা দেবীর ঘরে গেল কিন্তু
দুজনে এবার একে অপরের থেকে দূরে। হ্যাঁ রবি নিক্কিকে রাধা দেবীর সামনে আসা থেকে
আটকাতে পারেনি আজ। নিক্কি তার সাথে আটকে থাকল যতক্ষণ সে সেখানে থাকল। রাধা দেবীর
ঘরে নিক্কি কখনো রবির কাঁধে মাথা রাখে, কখনো রবির
বাহুতে তার স্তন ঘষে, আবার কখনো এমন ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তার
চোখের দিকে তাকাত যে রবির লোম দাঁড়িয়ে যেত। কোনরকমে কাজ সেরে রবি নিজের রুমে চলে
এলো। তার মন ফুঁসে উঠে। সারাদিন নিজের ঘরে শুয়ে নিক্কির কথা ভাবতে থাকে। কিন্তু
নিক্কিকে নিয়ে যতই ভাবতে থাকে তার মন খারাপ হতে থাকে।
বেলা ৩ টার দিকে প্রাসাদ থেকে বের হয়। তখন খুব রোদ, কিন্তু
রবি প্রাসাদের বাইরে যেয়ে নিক্কির চিন্তা থেকে দূরে সরে যেতে চেয়েছিল। সে তার
বাইক নিয়ে পাহাড়ের দিকে রওনা দিল। উপত্যকায় পৌঁছে সে তার বাইক থামিয়ে পায়ে
হেঁটে ঝর্নার দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বিশাল ঝর্নার কাছে এসে
দাঁড়ালো সে। দাঁড়িয়ে লেকের ঝর্না দেখতে থাকে। সে ভাবল এত কোলাহল সত্ত্বেও কত
শান্তি। আর প্রাসাদে কোলাহল না থাকলেও শান্তি নেই। সে একটু এগিয়ে গেল, হ্রদে
জল পড়া দেখার ইচ্ছা। কারণ সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে লেকের পৃষ্ঠ দেখা
যাচ্ছিল না। সে আগে পদক্ষেপ ফেলে। সে তার ডানদিকে মাত্র দুই কদম হেঁটেছে এবং সে
বুঝতে পারে কেউ সেখানে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটা মেয়ে পাথরের উপর বসে আছে।
মেয়েটির শরীরের অর্ধেক অংশ পাথরের আড়ালে লুকানো ছিল। শুধু মেয়েটির বাম কাঁধটি
বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। দমকা হাওয়ার কারণে তার লম্বা চুলগুলো বারবার উড়ছে, যা
একটি মেয়ের অস্তিত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। মেয়েটাকে দেখতে রবি একটু এগিয়ে গেল। এখন
সে মেয়েটির মাত্র দশ কদম পিছনে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে তাকে হাল্কাভাবে দেখতে পায়।
শুধু দেখতেই পায়নি, এখন রবি তাকে চিনতেও পেরেছে। কাঞ্চন।
সে তখনও একই পোশাকে ছিল যেটা রবি তার ভাইয়ের সাহায্যে চুরি করেছিল তাকে শিক্ষা
দিতে। সে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, সে ভয় পেল
যে সে তার দিকে ফিরে তাকাবে, কিন্তু না, সে
মনে হয় গভীর কোন চিন্তায় মগ্ন। তার চোখ স্থির হয়ে আছে পড়তে থাকা ঝর্নার দিকে।
হঠাৎ রবির মাথায় একটা চিন্হা তড়িৎ খেলে যায়। এই মেয়ে আত্মহত্যা করতে এসেছে না তো? শহরগুলোতে
যেমন বাস বা ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করার রেওয়াজ আছে, তেমনি
গ্রামে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে, কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার প্রবনতা আছে।
পরের মুহুর্তে তার মনে প্রশ্ন জাগলো "কিন্তু কেন সে মরতে চায়? এই
বয়সে কি এমন হয়েছে যে সে মরতে প্রস্তুত। গতকাল যা বলেছিলাম তাতে সে কোন দুঃখ
পেয়েছে? যার জন্য সে তার জীবন দিতেও প্রস্তুত? এমন
কিছু কি ঘটতে পারে? এই মানুষগুলো খুব নাজুক মনের হয়।
মেয়েটি গভীর লেকে বিলীন হওয়ার আগেই ডেকে উঠল- "এই মেয়ে, মরতে
চাও কেন?"
রবির কন্ঠ তার কানে পড়ার সাথে সাথে সে হতভম্ব হয়ে
ঘুরে গেল। তার মুখে গভীর দুঃখের আস্তরণ ছিল, তার চোখ এমন
লাল ছিল যেন সে সারারাত ঘুমায়নি। রবি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“আপনি .....! “অবাক
হয়ে রবির দিকে তাকিয়ে বললো কাঞ্চন, তারপর মৃদু
হাসলো। ওর হাসিটা ছিল মরার মতন। যার মধ্যে ব্যথা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মেয়েটা
আরও বলল- “আমি কেন মরব? আর
আপনি কেন আমাকে মারতে চান? আপনি কি
আমাকে এতটাই ঘৃণা করেন যে আমি বেঁচে থাকলেও আপনার ভালো লাগে না?"
কাঞ্চনার কথায় ব্যঙ্গে পরিপূর্ণ। রবি লাল হয়ে গেল।
সাথে সাথে কোনো উত্তর দিতে পারল না। খানিক পড়ে সে ছটফট করতে করতে বললো- "আমি
তা বলতে চাইনি, তুমি ঝর্নার এত কাছে দাঁড়িয়ে ছিলে
যে আমার এমন মায়া হয়েছিল যে তুমি হয়ত তোমার জীবন দিতে চাও। আমি দুঃখিত।“
মৃদুস্বরে বলল রবি।
“আমি এত দুর্বল মেয়ে নই যে
কারো অবজ্ঞায় দুঃখ পেয়ে জীবন দিয়ে দেব। আমি আমার জীবনকে ভালোবাসি।”কাঞ্চন
বিষণ্ণ চিত্তে কথা বলে সেখান থেকে উঠে চলে যেতে থাকে।
কাঞ্চনের কথায় রবি একটা ব্যাথা অনুভব করলো, ওর
মনে হলো সে যেন ভেতরে ভেতরে কাঁদছে। রবি নির্দোষ হলেও কেন জানি কাঞ্চনের
দুঃখ-দুর্দশার জন্য নিজেকেই দায়ী মনে হলো। কাঞ্চনের কথাগুলো সে মনে মনে অনুভব
করল। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকে যেতে দেখল তারপর পিছন থেকে ডাক দিল -
"শোন..."
কাঞ্চন রবির ডাকে থেমে গেল, তারপর
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। রবি ধীরে ধীরে হেঁটে তার কাছে গেল। “কি
হয়েছে? এত মন খারাপ কেন?"
রবি এত অন্তরঙ্গভাবে জিজ্ঞাসা করেছিল যে কাঞ্চন আবেগে
ভরে যায়। যখন কেউ দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়কে ভালবাসায় স্নেহ করে, তখন
সেই মনটি তার নিজের সম্পর্কের স্নেহের সাথে আরও বেশি আবেগী হয়ে ওঠে। রবির অন্তরঙ্গভাবে
কাঞ্চনকে জিজ্ঞাসা করা তাকে আরও আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল। সে তার আবেগ সংবরণ করতে
পারল না এবং তার চোখ জলে ভরে গেল। কিছু উত্তর না দিয়ে সে শুধু ভেজা চোখে রবির
দিকে তাকিয়ে রইল। সে বলবে কি? সে নিজেও
জানত না তার কি হয়েছে। হঠাৎ কেন তার পৃথিবী বদলে গেল, কেন
সে এখন আগের মতো কথা বলে না, কেন সে এখন
একা থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। তার মন কেন সবসময় চায় যে সে একা বসে শুধু তার স্যারের
কথাই ভাবুক।
“আরে ... এটা কি?” চোখের কোণে
জলের ফোঁটা দেখে রবি বলল- "কাঁদছো তুমি? কোন
সমস্যা হলে বলো। কেউ কিছু বলেছে?"
“আপনি যান স্যার, আমি
হাসছি না কাঁদছি তাতে আপনার কি করার আছে। আমার হাসি কাঁদাতে আপনার মান-সম্মান
ক্ষুন্ন হবে না।”
কাঞ্চন বলল।
“গতকাল যা ঘটেছিল তার জন্য যদি তুমি
দুঃখ পেয়ে থাক তবে দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবে। কিন্তু তুমি নিজেই ভাব সেদিন
প্রাসাদে আমার কাপড়ের কী হয়েছিল - ঠিক আছে?"
১৩
কাঞ্চন কিছু বলল না, শুধু
ভেজা চোখের পাতায় রবির দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকল। “স্যার
আমাকে ভুল বুঝেছেন, তিনি মনে করেন আমি তার জামা পুড়িয়ে
দিয়েছিলাম। আমাকে অপরাধী মনে করেন।”
কাঞ্চনের মনে একটা ভাবনা জেগে উঠল। এটা উপলব্ধি করে সে আঁতকে উঠল, কিভাবে
তার স্যারকে বলবে যে সে সেদিন প্রাসাদে ঠিকই কিন্তু তার জামাকাপড় পুড়িয়ে
দেয়নি। নিক্কি তার জামাকাপড় পুড়িয়েছিল, সে কেবল
নিক্কির চাপে পড়ে তার ঘরে কাপড় রাখতে গিয়েছিল। কিছু বলার জন্য তার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু
শুধু চোখ ছলছল করছে, মুখ দিয়ে কথা বের হলো না।
“তুমি কি সত্যিই দুঃখিত কারণ
আমি তোমাকে গতকাল নদীর তীরে কিছু কটু কথা বলেছিলাম?” তাকে চুপচাপ
দেখে রবি আবার জিজ্ঞেস করল।
“না স্যার ….সেদিন
নদীর জলে আপনার মুখ থেকে যে কটু কথা বেরিয়েছিল, আমার
কাছে মধুর চেয়েও মিষ্টি লেগেছিল। আমি দুঃখিত কারণ… আমি
আপনাকে…..!”
সে এর পরে আর কথা বলতে পারে না। হঠাৎ তার মুখের রঙ দ্রুত বদলে গেছে।
যে মুখ কিছুক্ষণ আগে দুঃখে ফ্যাকাশে ছিল, সেই মুখ এখন
লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। সে আবার মাটির দিকে তাকাতে লাগলো।
“আমি আপনাকে কি?” রবি কিছুটা
হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল।
জিজ্ঞেস করায় কাঞ্চন চোখ তুলে ওর মুখে স্থির করল। বড়
বড় চোখ করে রবির দিকে তাকিয়ে রইল। একবার ভাবে তাকে বলে - "স্যার, আমি
আপনাকে ভালোবাসি, আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আপনি কি
আমাকে আপনার পাত্রী বানাবেন? আমি দিনরাত
আপনার সেবা করব, আমি কখনও অভিযোগ করার সুযোগ দেব না।
আপনি যেমন রাখবেন, আমি তেমনই হব। আমি কখনই কিছু চাইব না।
তুমি যা দেবে আমি তাই রাখব, তুমি যা পরবে
তাই আমি পরব। শুধু আমার হয়ে আমাকে তোমার করে ফেল।”
কিন্তু সে বলতে পারল না - "যান... বলবো না, আপনি
বড়....” কাঞ্চন
জোরে জোরে কথা বলে এবং বাড়ি ফেরার পথে তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেল।
রবি ওকে যেতে দেখছিল। সে তখনও কিছু বুঝতে পারেনি।
সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে যা বলছে তা ভাবতে থাকে। তারপর মাথা আঁচড়ে
বাইকের দিকে এগিয়ে গেল। এখন নিক্কির বদলে মনে স্থির হয়ে গেল কাঞ্চন।
কিছুক্ষণ পর সে তার বাইকটি যেখানে দাঁড় করিয়েছিল
সেখানে এলো, সে বাইক থেকে একটু দূরে থাকতেই তার
চোখ বাইকের দিকে যেতেই তার চলন্ত পা থেমে যায়। মুখে বিভ্রান্তির রেখা। একজন
গ্রামবাসী তার বাইকে বসে আছে। তার গায়ে কালো কুর্তা এবং কোমরে লুঙ্গি জড়ানো।
উচ্চতা হবে প্রায় ৬ ফুট। বুক ছিল চওড়া এবং শরীর ছিল ক্রীড়াবিদের মত। মুখে ছিল
বড় এবং ঘন গোঁফ। তার বয়স প্রায় ৩২-৩৩ বছর হবে। সে সাইকেলে বসে গ্রামের পথের
দিকে তার চোখ স্থির, যেন কারো পথ দেখছে বা কাউকে যেতে
দেখছে। মুখে পান। পথের দিকে তাকিয়ে বারবার পিচকারি মাটিতে ফেলছিল। এই ছিল বিরজু।
গ্রামের সবচেয়ে নিকৃষ্ট বখাটে, টাকা নিয়ে
কারো পা ভাঙ্গা, দুর্বলকে ভয় দেখানো ছিল তার পেশা।
যাইহোক, সে মহিলাদের প্রেমিক ছিল। ১৮ বছর বয়স থেকে সে
গ্রামের কুমারী মেয়েদের রস চুষতে আসত। গ্রামের অনেক মেয়ে ও নারীকে সে পায়ের
নিচে শুইয়ে দিয়েছে। কাউকে স্বপ্ন দেখিয়ে কাউকে এত জোর করতো যে নিজেই বাহুতে ঢলে
পড়তো। গ্রামের মানুষ তার থেকে দূরে থাকত, তার বন্ধুত্ব
ও শত্রুতা দুটোই অন্য মানুষের জন্য ক্ষতিকর ছিল। যে কারণে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা
বলত না। আর তখন তার মাথায় ছিল গ্রামের মুখিয়া জির হাত। বিরজু তার কাজ করে। যদিও
মুখিয়াজি খুব ভালো মানুষ, গ্রামে সবার
সাথেই তার ভালো সম্পর্ক ছিল, কিন্তু
বিরজুর বিরুদ্ধে কেন জানি কিছু শুনতে তার ভালো লাগত না। গ্রামের কোনো ব্যক্তির কাছ
থেকে বিরজুর বিরুদ্ধে কিছু শুনলেই তার ওপর বর্ষণ করতেন। তাই গ্রামের মানুষ নিজেদের
মুখ বন্ধ রাখত।
বিরজু গত ১৫ বছরে অগণিত মেয়ে ও নারীর সর্বনাশ করেছে।
কিন্তু কয়েক বছর ধরে তার চোখ শুধু একটি মেয়ের দিকেই স্থির ছিল, সে
কাঞ্চন...! যখনই সে তার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখত, তখনই
তার ভেতরের প্রাণীটি জেগে উঠত। তখন তার মনে একটাই চিন্তা আসত- যে করেই হোক, একবার
কাঞ্চনে চড়তে হবে। একবার তাকে খেতে
হবে। কিন্তু কাঞ্চনের স্বপ্ন দেখা যতটা সহজ তা অর্জন করা ততটাই কঠিন। কাঞ্চন খুব
ভালো মেয়ে ছিল, সে জানতো ভুলিয়ে সে কখনো কাঞ্চনের
যৌবনের রস চুষতে পারবে না, আর জোর করার
মানে তার মৃত্যুতে ভোজ করা। তার বাবা সুগনা তার সময়ে বিরজুর চেয়েও বড় গুন্ডা
ছিলেন। বিরজু এতদিন শুধু মানুষের হাত-পা ভেঙেছে, কিন্তু
কত লাশ যে ফেলেছে সুগনা তা সে নিজেই জানে না। কিন্তু সুগনাই শুধু বিরজুর কাঞ্চনের
কাছে পৌঁছানোর একমাত্র কাঁটা ছিল না। কোনোভাবে সুগনাকে পথ থেকে সরিয়ে দিলেও
কাঞ্চনের কাছে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ ছিল নিক্কি, নিক্কির
বন্ধুত্ব ছিল কাঞ্চনের ঢাল। পুরো গ্রামের নারী পুরুষদের মধ্যে কাঞ্চনই একমাত্র যার
প্রাসাদে প্রবেশ করার অধিকার ছিল। তিনি চাকরদের আদেশ দিতে পারতেন, যতদিন
ইচ্ছা রাজবাড়ীতে থাকতে পারতেন, ঠাকুর সাহেব
তাকে নিজের মেয়ের মতই স্নেহ করতেন। বিরজু জানত কাঞ্চনের গায়ে হাত ধরার সহজ মানে
ঠাকুরের ঘাড়ে হাত দেওয়া। আর ঠাকুরের ঘাড়ে হাত দেওয়া মানেই তাঁর মৃত্যু! এই
কারণেই দূর থেকে কাঞ্চনকে দেখেই তৃষ্ণা মেটাত। আর তখন পর্যন্ত ঠাকুর তার সম্পর্কে
কিছুই জানত না। এখন পর্যন্ত ঠাকুর সাহেবের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পৌঁছায়নি।
বিরজু নির্যাতিত মানুষ মনে করে যে, ঠাকুর সাহেব
নিজেই বিশ বছর ধরে দুঃখ-দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন, তাদের
দুঃখ শুনিয়ে তার দুঃখ বাড়ানো ঠিক হবে না, তাই তারা চুপচাপ
ছিল।
বিরজু সেই কুমিরে পরিণত হয়েছিল যে ধীরে ধীরে পুরো
গ্রাম চাটছিল। কিন্তু কাঞ্চনের মধ্যে যা ছিল তা কারো মধ্যে ছিল না। প্রতিদিন সে তা
অর্জনের জন্য কিছু পরিকল্পনা করত, কিন্তু
ঠাকুরের কথা মাথায় আসার সাথে সাথেই তার সমস্ত পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আজ
যখন সে কাঞ্চনকে এভাবে একা একা ঘুরে বেড়াতে দেখল, খুব
অবাক হল। কাঞ্চন কখনো এভাবে একা হাঁটত না। কিন্তু রবির বাইকের দিকে চোখ পড়লে তার
কৌতূহল বেড়ে যায়, কাঞ্চন কারো সাথে দেখা করতে এসেছে। তাই সে সেখানে বাইকে বসে
সেই লোকটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কাঞ্চন যে পথ দিয়ে গেছে সেদিকেই সে তখনও
তাকিয়ে আছে।
ঘাড় সোজা করতেই চোখ পড়ল রবির দিকে। রবিকে দেখে সে তার
কালো দাঁত দেখিয়ে হাসল।
রবি অকপটে তার বাইকের কাছে গেল। সে বিরজুকে উপর থেকে
নিচ পর্যন্ত সারসরি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো - "আমি আপনাকে চিনতে পারছি না। আপনার
পরিচয়?"
বিরজু তখনও তার বাইকে বসে ছিল, সে
এটাকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। সে রবির দিকে তাকিয়ে মাটিতে পানের পিক মারল, তার
মনে হল যেন সে রবির গায়ে থুথু ফেলছে। তারপর বলল- "বাবু জি বিরজু নামটা আমার।”
সে গোঁফ নাড়ল- "রায়পুরের ছেলেমেয়েরা আমাকে চেনে। তিন গ্রামে
আমার মতো কুস্তিগীর নেই।"
“আপনার সাথে দেখা করে খুব খুশি
হলাম।” রবি
উত্তর দিল - "এখন দয়া করে আপনি কি আমার বাইক থেকে উঠবেন?"
“অবশ্যই ... উঠুন।”
সে হেসে বলল- আমি আপনার বাইক পাহারা দিচ্ছিলাম।
“পাহাড়া?” রবি অবাক
হয়ে ওর দিকে তাকাল।
“এই গ্রামে, কিছু
চোর ঘোরাফেরা করে, সুযোগ পেলেই অন্যের জিনিসে হাত
পরিষ্কার করে। আমি আপনাকে এইজন্য বলছি কারণ আপনি প্রাসাদের অতিথি।"
“আপনি কি করে জানলে আমি
প্রাসাদের অতিথি?”
বাইকে বসে রবি বলল।
“কি বলেন বাবুজী, এই
গ্রামে কে আছে যে আপনাকে চেনে না?” তার কথায়
হাসি ফুটল। “কেউ একজন প্রাসাদে এসেছে আর তা
লোকে জানবে না এমন কখনো ঘটেনি। এই গ্রামের প্রতিটি মানুষ জানে আপনি একজন ডাক্তার
এবং ঠাকুরাইনের চিকিৎসা করতে এসেছেন।"
“ওহহহহ...!” বেরিয়ে এল রবির
মুখ থেকে।
“কিন্তু একটা জিনিস বুঝলাম না
বাবুজী।” বিরজু
কাঁটা দৃষ্টিতে রবির দিকে তাকিয়ে বলল - "আপনি তো ঠাকুরাইনের চিকিৎসা করতে
এসেছেন, কিন্তু আমাদের গ্রামের মেয়েকে নিয়ে এখানে একা কি
করছিলেন?"
রবি কেঁপে উঠল। কী বলবে বুঝতে পারছে না, হঠাৎ
এই প্রশ্ন করায় হাত-পা ফুলে উঠল। “দেখুন, কাঞ্চনের
সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি এখানে
ঘুরতে এসেছিলাম, তার সাথে আমার দেখা হয়ে গেছে।"
“আপনি কি করে জানলেন ওর নাম
কাঞ্চন?”
বিরজুর কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা।
রবি চমকে উঠল। একটা স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল তার শরীরে।
তার ভয় পাচ্ছে এই কারণে না যে সে বিরজুকে ভয় পায়। তার ভয় ছিল যে তার কারণে
গ্রামে কাঞ্চন অপমানিত হতে পারে। "সে নিজেই বলেছে।”
রবি নড়বড়ে বলল।
“আরে সাব, বেশি
টেনশন নিবেন না, আমি মজা করছিলাম।”
বিরজু আবার তার নোংরা দাঁত দেখাল।
জবাবে রবিও হাসল। তারপর নিজের বাইক স্টার্ট করার পর ঘুড়ে
চলে গেল প্রাসাদের ভেতর দিয়ে।
বিরজু তাকে যেতে দেখতেই রইল। সে রবিকে সন্দেহ করছিল।
উদ্বিগ্ন ছিল যে একজন বিদেশী মেয়েটিকে পেয়ে যাবে যা সে পেতে চায়। এই উপলব্ধি তার
মনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে যে কিছুক্ষণ আগে কাঞ্চন শহরের সাথে এই লোকটির সাথে নির্জন
জায়গায় একা ছিল। এই ভাবনায় তার মন ভীত হয়ে পড়ে। ওই ডাক্তার কান্চনকে নিয়ে কী করেছে এখানে? কাঞ্চন এই
লোকের ফাঁদে পড়ে তার শরীরটাকে ভোগ করার জন্য দিয়ে দিয়েছে না তো! এই গ্রামের
নিষ্পাপ মেয়েরা বিশ্বাস করে খুব দ্রুত তাদের হৃদয় দিয়ে দেয় শহরের মানুষদের
কাছে। যদি এমন হয়, তবে দুজনকেই মেরে ফেলব, কাঞ্চনের
যৌবনের রস আর কেউ পান করতে পারবে না। আমাকে অবিলম্বে কিছু করতে হবে।
সে ভাবতে থাকে। সে এখনই রবির ব্যাপারে কিছু করতে পারছে
না। রবি হয়তো ঠিকই বলেছে। প্রমাণ ছাড়া সে রবির কিছু করতে পারবে না। সে কিছুক্ষণ
ভাবতে থাকল তারপর দ্রুত মুখিয়া জির বাড়ির দিকে চলে গেল। সে জানে তাকে কি করতে
হবে। এখন যাই ঘটুক সে কাঞ্চন অর্জনের চেষ্টা করতে থাকবে।
কিছুক্ষণের মধ্যে বিরজু মুখিয়া জির বাড়িতে। এ সময়
বাড়িতে শুধু মুখিয়া ধনপত রায়ের স্ত্রী সুন্দরী ছিল। তার বয়স হবে প্রায় ৩৫ বছর।
সুন্দরী অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সুন্দরী। এমনকি ৩৫ বছর বয়সেও তাকে ৩০ এর বেশি লাগে
না। শুধু শরীরটা একটু ভারী।
বিরজুকে দেখে চোখ চকচক করে উঠল। “আসুন
মহারাজ....আজ চারদিন পর এসেছেন, কোথায়
কুঁকড়ে যাচ্ছেন আজকাল?"
বিরজু সুন্দরীর কাছে গেল, তাকে
কোলে তুলে সোজা বেডরুমে ঢুকল। তাড়াতাড়ি বিছানায় ফেলে সে তার বড় বড় স্তন মালিশ
করা শুরু করে। “কি করছিস? আজকে
কি প্রাণ নেওয়ার ইচ্ছা এসেছিস?” সুন্দরী একটা
কাঁপুনি দিয়ে বলল।
কিন্তু বিরজুর মনে রাগ। তার মনে হল কাঞ্চন তার সামনে
শুয়ে আছে, সুন্দরী নয়। এবং সে তাকে শাস্তি
দিচ্ছে কারণে সে শহুরে লোককে বন্ধু করেছে।
১৪
সে দ্রুত সুন্দরীর কাপড় খুলতে থাকে। শরীর থেকে কাপড়
টেনে খুলে বিরজু তার স্তনের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। সে নির্দয় ভাবে স্তন চুষতে লাগল।
সুন্দরী প্রথম দিকে ব্যথা অনুভব করলেও এখন ধীরে ধীরে ভালো বোধ করতে শুরু করে।
বিরজুর আগ্রাসন তাকে আজ অন্যরকম মজা দিচ্ছিল। সে ওর প্রতিটি পদক্ষেপে সিৎকার করতে
থাকে। তার শরীর খুব দ্রুত গলে যাচ্ছিল। ওর যোনি থেকে জল বেরোতে শুরু করেছে। বিরজু
তার উরু পর্যন্ত এসে তার যোনি চুষতে থাকে এবং তার উরু চাটতে থাকে। সুন্দরীর মুখ
থেকে কামুক দীর্ঘশ্বাস বেরোতে লাগলো। “উফফ...আহহহ
কি করছিস বিরজু? কি হয়েছে তোর?"
বিরজু কিছু বলল না, এবার
ওর যোনিতে জিভ রাখল, আর ওর রস চাটতে লাগল। আগুনে পুড়তে
থাকে সুন্দরীর শরীর। সুন্দরীও আজ খুব কামুক হিসি করছিল। কিছুক্ষন ওর যোনি চাটার পর
বিরজু উঠে দাড়িয়ে ওর জামা কাপড় খুলতে লাগলো।
সুন্দরী বিছানায় উঠে বসল, বিরজুর
দিকে কামুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, ওর পেটানো
শরীর দেখে সে সব সময় এমনই করে চেয়ে থাকে। বিরজু জামাকাপড় খুলে আসার সাথে সাথে সে
তার বাঁড়া ধরে তাকে আদর করতে লাগল। নরম উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় তার পুরুষালি অঙ্গটা
কাঁপতে লাগল। বিরজু দেরি না করে সুন্দরীকে বিছানায় নামিয়ে দিল, তারপর
পা চওড়া করে ওর যোনির দরজায় ওর অঙ্গ-প্রহরীকে বসিয়ে একটা ধারালো ধাক্কা দিয়ে
গভীরে ঢুকিয়ে দিল।
“আহহহ ... ”
সুন্দরীর মুখ থেকে একটা নীরব চিৎকার বেরিয়ে এল।
বিরজু ওর পা দুটো চেপে ধরে ওর কোমরে জোরে ধাক্কা দিতে
লাগল। তার প্রতিটি ধাক্কা এত শক্তিশালী ছিল যে সুন্দরী তার প্রতিটি ধাক্কার উপরে পিছলে
যেতে থাকে।
প্রায় ১৫ মিনিট তাকে চড়ার পর বিরজু হাফাতে হাফাতে তার
উপর পড়ে যায়।
বিউটি তাকে নিজের বাহুতে আকড়ে ধরে চুমু খেতে লাগল। আসলে, তার
এবং বিরজুর সম্পর্ক ছিল ১৫ বছরের। কিন্তু আজকে সে যে মজা দিয়েছে, এর
আগে কখনো সে মজা পায়নি। বিরজুর চুলে ছোড়াছুড়ি করতে করতে সে সেই মুহুর্তে
হারিয়ে গিয়েছিল, যখন সে বধূ হয়ে এ বাড়িতে এসেছিল।
তখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। বিয়ের আগেও অনেক পুরুষের কাছ থেকে যৌবনের আনন্দ
নিয়েছিল সে।
এটি ছিল ধনপত জির দ্বিতীয় বিয়ে, তখন
তার বয়স হবে ৩৫ বছর। তার প্রথম স্ত্রীর একটি মেয়ে ছিল। যার নাম অনিতা রেখেছিলেন
ধনপত জি। তখন তার বয়স ৫ বছর।
ধনপত জির বাড়িতে আসার সাথে সাথেই প্রথম রাতেই সুন্দরী
বুঝতে পেরেছিল যে তার স্বামীর সেই শক্তি নেই যাতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, কয়েকদিন
সে শান্ত থাকে এবং তারপর তার চোখ এখানে সেখানে ছুটতে থাকে। আর একদিন সে বিরজুকে
চোখে পড়ে। তখন বিরজুর বয়স ছিল ১৮ বছর। তার শরীরচর্চা করা পেটানো শরীর প্রথম থেকেই
নারীদের আকর্ষণ করত। সুন্দরী যখন তাকে দেখে, সে তার গায়ে
স্ট্রিং লাগাতে শুরু করে, এবং একদিন তাকে তার বাড়িতে একা পেয়ে
সে তার উপর আরোহণ করে। বিরজুর যেন তার কাঙ্খিত ইচ্ছা পুরন করার সুযোগ পেয়েছে। সে
তাকে প্রচণ্ড চুম্বন করল, সেই একটি চুম্বন সুন্দরীকে বিরজুর
দাসী বানিয়ে দিল। সেদিনের পর থেকে এই চক্র চলতে থাকে।
একদিন মুখিয়া দুইজনকেই হাতেনাতে ধরে ফেলে। বিরজু ভয়
পেলেও সুন্দরী উল্টে বৃষ্টি বর্ষণ করল মুখিয়া জির ওপর। তাকে হুমকি দেয় যে সে যদি
বিরজুকে এখানে আসতে বাধা দেয় তবে সে সারা গ্রামে হৈচৈ করবে যে সে নামর্দ। তার কথা
শুনে মুখিয়া জির হুঁশ উড়ে গেল। তিনি ভাবতেও পারেননি যে, যে
নারীকে সে তার ঘরে নিয়ে এসেছে তাকে ইজ্জত-সম্মান করে, সেই
নারীই একদিন তার সাথে এমনটা করতে পারে। অসহায়ত্বের অশ্রু পান করে চলে যান তিনি।
সেই নারীর স্বভাবের সাথে পরিচিত হয়ে উঠেছিল, সে
জানতে পেরেছিল যে এই নারী তার লালসা প্রশমিত করার জন্য সবকিছু করতে পারে। কিছু
মানুষ তাদের সম্মানকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে, মুখিয়াও
ছিলেন সেই মানুষগুলোর একজন। সেদিন থেকে সে তাকে তার অবস্থাতেই ছেড়ে দেয়। তারপর
থেকে আজ অবধি বিরজু তার স্ত্রীর সাথে লেগে ছিল। আর ছিনতাই করেছে অনেক নারীর ইজ্জত
সুন্দরীর মাধ্যমে।
বিউটি কিছুক্ষণ বিরজুর চুলে আদর করে তারপর বললো -
"আজ তোর কি হয়েছে? তুই তো পশু হয়ে গেছিস।"
বিরজু বিছানায় উঠে বসে দুহাতে মুখে চুমু দিয়ে বললো-
"তোমার কি খারাপ লাগছে? যদি এমন হয়
তাহলে আমি করবো না।"
বিউটি অবাক হয়ে গেল। বিরজুকে এত মিষ্টি করে কথা বলতে
সে কখনো শোনেনি। সে বিরজুকে চুমু খেয়ে বললো - "না রাজা, আমার
খারাপ লাগেনি। বরং আজকে এমন মজা পেয়েছি যা আজকের আগে কখনো পাইনি।"
“তুমি চাও আমি তোমাকে এভাবে
প্রতিদিন উপভোগ করি?”
বিরজু তার স্তন স্নেহ করতে করতে বলে।
“এটা কি আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়? আমি
এই মজার জন্য সব কিছু করতে পারি।"
“সত্যি বলছ?” বিরজু তাকে
জড়িয়ে ধরল।
“আমি আমার জীবন দেব, কিন্তু
আমি তোকে ছাড়বো না। এখন বল আমাকে তোর কি হয়েছে?”
“তাহলে শোন ... কাঞ্চনকে আমার পেতে
হবে কিন্তু সে ভালোবাসার মেয়ে নয়। আমাদের চালাকি আর ছলনা দিয়ে কাজ করতে হবে।
কিন্তু এর সাথে আমাদের আর একটা কাজ করতে হবে। কাঞ্চনের বুয়া শান্তাকে তোমাকে নিতে
হবে তোমার নিজের ফাঁদে। যদি তাকে হাত করতে পারো তাহলে বুঝো আমি কাঞ্চনকে পেয়ে গেছি।
শান্তাকে তোমার ফাঁদে ফেলতে হবে। এটা খুবই সামান্য কাজ তোমার জন্য।"
“কাঞ্চনের খেয়াল ছাড়, বিরজু, সে
তোর হাতে আসবে না।"
“আমি যা বলেছি তুমি তাই করো”
বিরজু রেগে বললো - "যেকোন মূল্যে আমি ওকে অর্জন করব। আমি ছাড়া যদি
অন্য কেউ এর রস পান করে.... আমি তা মানব না। ও যদি আমার না হয়, তাহলে
কেউ পাবে না।"
“ঠিক আছে রাজা, আমি
আমার কাজ করব।” সুন্দরী
হেসে বলল। আর বিরজুকে টেনে তার উপর ফেলে দেয়।
তারা দুজন আবার একে অপরের মধ্যে মিশে যেতে লাগল।
কাঞ্চন বর্তমানে তার ঘরে খাটে বসে আছে। ঝর্নার কাছে
রবির সাথে দেখা হওয়ার মুহূর্তগুলোতে সে ডুবে আছে। রবির অন্তরঙ্গভাবে বলা কথাগুলো তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেসব
কথা মনে পড়লে কখনো তার ঠোঁটে হাসি ফুটে আবার কখনো মন খারাপ হয়।
সে ভাবছিল- আজ কত ভালো সুযোগ ছিল...স্যারের কাছে আমার
মনের কথা বলার। কিন্তু আমি এত বোকা তাকে বলিনি কেন? বললে
কি হতো? উফফ সেও জিজ্ঞেস করেছিল… কিন্তু
আমি ভাবতে থাকলাম… আর তাকে
কিনা বললাম, "যান… আমি
বলব না, আপনি বড়...।”কেন
এমন বোকামি বললাম? এখন আমাকে নিয়ে কি ভাবছেন স্যার? স্যার
কি এখনও আছে সেখানে? আমি কি ফিরে গিয়ে দেখব....হয়তো স্যারের
সাথে দেখা হয়ে যাবে আবার। কিন্তু তার সাথে আবার দেখা হলে কি ভাববে? স্যার
যাই ভাবুক, কিন্তু আমি যদি তার সাথে সেখানে দেখা
করি, তবেই তিনি আমার অবস্থা জানতে পারবেন। আমি না গেলে
ওনি জানবে কি করে আমার হৃদয়ে কি আছে?
“কিরে, তোর
কি হয়েছে কাঞ্চন?”
হঠাৎ কাঞ্চনের কানে আওয়াজ পড়লে সে উল্টে যায়। উপরে তাকাতে দেখে বুয়া
সামনে দাড়িয়ে আছে। আর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
“কখন থেকে আমি তোর দিকে তাকিয়ে
আছি, তুই নিজেই নিজেই হাসছিস, মাঝে
মাঝে তুই নিজের উপর বিরক্ত হচ্ছিস, আমি তোর
সামনে দাঁড়িয়ে আছি অথচ খেয়ালই করছিস না, সবকিছু ঠিক
আছে তো?”
বুয়া জিজ্ঞেস করল।
“না.... হ্যাঁ .... আমি... আমার
কিছু হয়নি, আমি ঠিক আছি।”
কাঞ্চন হড়বড় করে বলে।
বুয়া অবাক হয়ে কাঞ্চনের অবস্থা দেখে বলল,
"কি বলছিস? আস্তে করে বল। এভাবে মন খারাপ করে বসে আছিস কেন? তোর
কিছু ভুল হয়েছে?"
“কিছু হয়নি, বুয়া
আমি ভালো আছি।”কাঞ্চন কথা বলে ঘর থেকে
বেরিয়ে যেতে লাগল।
“এখন কোথায় যাচ্ছি? এখনই
তো বাইরে থেকে এসেছিস... বাইরে আবার কি করতে যাচ্ছিস?” ওকে বের হতে
দেখে শান্তা বুয়া বলল - "আর তুই আজ স্কুলে যাসনি কেন?"
“স্কুলে যেতে ভালো লাগছে না, কাল
যাবো, আমি এখন প্রাসাদে যাচ্ছি।”
এই বলে সে তাড়াতাড়ি চলে গেল।
কাঞ্চন দ্রুত হেঁটে সেই ঝর্নার কাছে পৌঁছে যায়, যেখানে
সে রবিকে ছেড়ে গিয়েছিল। তার আশা যে রবি এখনও সেখানে থাকবে।
সেই জায়গায় পৌঁছে চারদিকে খুজতে লাগল। কিন্তু রবিকে
কোথাও না পেয়ে মনটা ভেঙ্গে গেল। আবার সব জায়গায় আতিপাতি করে খুঁজতে থাকে, কিন্তু
সেখানে যা ছিল না তা কীভাবে খুঁজে পাবে। হতাশ হয়ে একটি পাথরের উপর বসে পরে। বাড়ি
থেকে সে এত উত্তেজনা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু রবিকে
না পেয়ে তার মন ভারী হয়ে গেল। হঠাৎ সে উঠে প্রাসাদের দিকে চলতে থাকে।
১৫
নিক্কি হলের মধ্যে একা বসে আছে, হাতে
একটি বই, কিন্তু সে পড়ছিল না – কেবল
আনমনে পৃষ্ঠাগুলি উল্টাচ্ছিল। তার মন অস্থির এবং সে মনটাকে বইএ মনোনিবেশ করার
চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেই বই তার মনকে বিনোদন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শেষপর্যন্ত
নিক্কি বইটা সেন্টার টেবিলে ছুড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল
তখন কাঞ্চন হলের ভিতরে ঢুকল। তাকে দেখা মাত্রই তার সব উত্তেজনা দূর হয়ে গেল।
অস্থির মনে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস অনুভব করল, তার সবচেয়ে
মিষ্টি খেলনাটি এসেছে, চিৎকার করে উঠল এবং দৌড়ে গিয়ে দুই
বন্ধাবী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। তারপর নিক্কি ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
"এত দিন পর এলি? ভুলে গেছিস
আমি যে এখানে এসেছি।"
“আমার মন ভালো ছিল না। আমি আজ
স্কুলেও যাইনি।”
“কেন কি হয়েছে তোর?” নিক্কি
বিরক্ত হয়ে বললো - "চল ঘরে বসি।”
এই বলে নিক্কি ওর হাত ধরে রুমে চলে এলো। তারপর তাকে বিছানায় বসিয়ে
দিয়ে বললো - "এখন বল তোর কি হয়েছে? তোর এই ফুলের
মত মুখটা শুকিয়ে গেছে কেন?"
“কি বলবো? আমি
নিজেও জানি না আমার কী হয়েছে।
মাত্র কয়েকদিন হলো, খুব অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি হয়েছে।”
কাঞ্চন তার কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে।
নিক্কি মনোযোগ দিয়ে ওর মুখটা দেখতে থাকল। তারপর সে
এগিয়ে গিয়ে বিছানায় তার পাশে বসল। তারপর তার গলায় হাত রেখে তার গালে চুমু খেল।
কাঞ্চনের জন্য এটা নতুন কিছু না। যখনই নিক্কি তার
সম্পর্কে কিছু পছন্দ করত সে এভাবে তার গালে চুমু দিত। শুধু গালে নয় ঠোঁটেও।
নিক্কি কাঞ্চনের মুখটা তার দিকে ঘুরিয়ে বললো -
"কাঞ্চন, তুই কি জানিস ভালোবাসা কি?"
কাঞ্চন তার কথায় লাল হয়ে গেল। রবির মুখটা তার মনে
ভেসে উঠে। তারপর নিক্কির দিকে তাকিয়ে বললো- "আমি বেশি কিছু জানি না, আমি
শুধু জানি কারো প্রেমে পড়লে খুব খারাপ অবস্থা হয়ে যায়, কখনো
কখনো সবকিছু ভালো মনে হয় আবার কখনো কিছুই ভালো লাগে না। দিন রাত সমান হয়ে যায়। রাতে
ঘুম হয় না দিনে বিশ্রাম হয় না খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা থাকে না, লেখাপড়ায়
মন বসে না মানুষটি। প্রতি মুহূর্তে প্রেমিকের মুখ তার চোখে ভেসে ওঠে। তার
চিন্তায়। এবং আরও অনেক কিছু ঘটে। যা আমি জানি না কি হয়।"
নিক্কি মুচকি হেসে কাঞ্চনের কথাগুলো শুনছিল। কাঞ্চন
থেমে গেলে দ্রুত আবার তার গালে চুমু খেল। তারপর বললো- "তুই বলছিলি ভালোবাসার
কথা একটু জানিস। এটা কি একটু? এখন আর জানার
কি বাকি আছে? এত জ্ঞান কোথায় পেলি?” নিক্কি ওর
চোখে উঁকি দিয়ে বললো- "তুই কি কখনো কারো প্রেমে পড়েছিস? দেখ...
আমি ভালোবাসার একটাই সত্য জানি... দুঃখ ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। আর আমি আমার
প্রিয় বন্ধুকে দুঃখী দেখতে চাই না। তাই বলবো এই প্রেমের সম্পর্কে জড়াবি না।
নিক্কির কথায় কাঞ্চন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে উদাস
মুখে বলল- "এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে নিক্কি, তুই
বলতে দেরি করেছিস। এখন তোর এই বন্ধুটি প্রেমে পড়েছে, এবং
দুঃখও পেয়েছে। কিন্তু সে
দুঃখিত খুব মিষ্টি। তোর এই বন্ধুও এই দুঃখের প্রেমে পড়েছে। কাঞ্চনের ঠোঁটে হাসি।
“আরে হাসছিস কেন? কি
হয়েছে তোর?”
নিক্কি তাকে নিজে নিজে হাসতে দেখে বলল - "তুই সত্যি না বললে
আমি তোকে মেরে ফেলব।"
“আমার কিছু হয়নি, নিক্কি।”
আসল কথাটা লুকিয়ে রাখে কাঞ্চন। নিক্কিকে তার মনের অবস্থা জানাতে
চায়নি। সে নিজেও জানে না রবির মনে কি আছে, সে মেনে নেবে
কি না, এমন পরিস্থিতিতে সে চায়নি নিক্কি তার সাথে দুঃখি হওক।
সে আরও বলে - "তোর কথা শুনে আমি হাসলাম।
“চল ঠিক আছে, এখন
দাঁড়া।” নিক্কি, কাঞ্চনের
দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি করে বললো- "আর তোর জামা খুলে ফেল।"
“কেন...?” হতবাক হয়ে কাঁপা কাঁপা
গলায় বলল কাঞ্চন।
নিক্কি হাসে। কাঞ্চনের এই অবস্থা দেখে সে খুব জোরে হেসে
উঠল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে তারপর বলল- "আমার জান, জামা
না খুললে আমার আনা জামাটা পরবি কিভাবে?"
“না.. আমি ঐ কাপড় পরব না।”
কাঞ্চন আন্তরিকভাবে কথা বলে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ভেবেছিল যে
নিক্কি যদি জোর করে, সে অবিলম্বে দরজা থেকে পালিয়ে যাবে।
কিন্তু নিক্কি আজকে যে পোশাক এনেছে তাকে পরিয়েই ছাড়বে
আজ। সে চোখের পলকে কাঞ্চনের কাছে পৌঁছে তার কাপড় খুলতে লাগল।
কাঞ্চন তার কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে
থাকে। কিন্তু নিক্কি কথা না শুনে প্রথমে তার পাজামাটা টানাটানি শুরু করে। টানতে
টানতে প্রায় খুলে ফেলে। কাঞ্চনের হাত ওর পায়জামার দিকে চলে গেল তাকে থামানোর
জন্য। তারপর নিক্কি ওর কুর্তির দিকে হাত বাড়াতে গেল। কাঞ্চন লাখ চেষ্টা করেও
নিক্কির সাখে পেড়ে উঠল না। টানা টানি দস্তাদস্তিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে শুধু ব্রা
আর প্যান্টি পরে দাঁড়িয়ে। কাঞ্চনের অবস্থা খারাপ, জীবনে
প্রথমবার কারো সামনে এত নগ্ন হল। নিক্কি যদিও মেয়ে ছিল, কিন্তু
তবুও, তার সামনে এমন অবস্থায় থাকা, লজ্জায়
মরে যাচ্ছে। সে এক হাতে তার বুক এবং অন্য হাতে তার প্যান্টি ঢেকে রাখার ব্যর্থ
চেষ্টা করছিল।
নিক্কি তার ভড়াট মাংসল এবং মসৃণ দেহের দিকে উজ্জ্বল চোখ
দিয়ে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাকাল, তারপর তার
ঠোঁটটি বাকিয়ে একটি বিশেষ উপায়ে শিস দেয়। রাস্তা দিয়ে মেয়েদের হেঁটে যাওয়া
দেখে বখাটে ছেলেরা যেভাবে শিস দেয় সেভাবে।
শিসের শব্দে কাঞ্চন অনেক কষ্টে ঘাড় তুলে তার দিকে
তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিক্কি তার একটা চোখ বন্ধ করে কামুক কন্ঠে বললো-
"হাই আমার জান, কি ঘাতক যৌবন তোর, তোর
এই রূপ যদি একজন পুরুষ দেখে, তবে পুরো
খাড়া...!” সে
বিষয়টি অসমাপ্ত রাখে। তারপর বললো- "এবার তোর বুক থেকে হাত সরিয়ে তোর বুক
দেখা।"
“ছি...!”
কাঞ্চন মৃদু রাগের সুরে বললো- "তুই খুব নষ্ট হয়ে গেছিস নিক্কি, এত
নোংরা কথা বলতে শুরু করেছিস।“
নিক্কি এবার গম্ভীর হয়ে গেল। “দুঃখিত
কাঞ্চন, আমি এখন থেকে আর করব না। কিন্তু এখন আমি যে জামাটা
এনেছি তা পড়। আর সাবধান যদি তুই আর কখনো প্রাসাদে না আসিস... আমি তোকে মেরে
ফেলব।"
নিক্কির কথায় কাঞ্চনের রাগও কেটে গেল। আর সে তার আনা
কাপড়গুলো পালাক্রমে পরতে থাকল, কাপড়গুলো
এতই ফ্যাশনেবল যে বন্ধ ঘরেও পরতে লজ্জা বোধ করছিল কাঞ্চন। কিন্তু নিক্কি তাকে
ভালোবেসে নিয়ে এসেছে তাই সে অস্বীকার করতে পারেনি। কাঞ্চন যে জামাই পরুক না
কেন... পরার পর সে রবির কথা ভাবতো, আর সে ভাবতো-
রবি যদি তাকে এই পোশাকে দেখতে পেত, তাহলে তা! অবশ্যই
তাকে মুগ্ধ করবে।
জামা-কাপড় পরার প্রক্রিয়া চলতে থাকে কিছুক্ষন। এ
পোশাকে কাঞ্চনকে দেখে নিক্কি বিস্মিত। কিন্তু কাঞ্চনের প্রতি তার মনোযোগ ছিল না। সে
রবির চিন্তায় মগ্ন। বার বার কোন না কোন অজুহাতে ঘর থেকে বের হয়ে আসে এবং কোন
কারণ ছাড়াই চাকরদের উচ্চস্বরে কিছু বা কিছু আনতে বলছে….!
যদিও সে ক্ষুধার্ত বা তৃষ্ণার্ত ছিল না... কিন্তু তবুও চাকরদের কাছে জল, কখনও
চা এবং কখনও কিছু খাবার আনতে বলে। এটা করার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, তার কণ্ঠ রবির
কানে পৌঁছানো। এক ঘন্টার মধ্যে, সে বেশ
কয়েকবার বাহিরে আসে। কিন্তু তার আওয়াজ রবির কানে পৌঁছল না এবং সে বেরও হল না।
কাঞ্চনের ভেতরে এখন হতাশা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সে দুঃখ পেতে থাকল। কী
উদ্দেশ্যে সে এখানে এসেছিল এবং কী করতে শুরু করেছিল। রবির কাছ থেকে এমন উদাসীনতা
সে আশা করেনি। তার চোখ বারবার তার দরজার দিকে যেতে থাকে শুধু এক ঝলক দেখার জন্য।
কিন্তু হতাশা ছাড়া কিছুই পাচ্ছিল না। তার হৃদয় ভারী হয়ে উঠল। চোখ থেকে অশ্রু
গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু নিক্কির মনোযোগ ধরে রাখল ওকে।
হঠাৎ তার মন বলে উঠল-স্যার হয়তো এখনও প্রাসাদে ফেরেননি, হয়তো
স্যার এখনো সেখানেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন...এবং এমনও হতে পারে যে তিনি হয়তো আমার পথ
চেয়ে আছেন। "আহহ”
সম্ভবত তাই। আমার এখানে আসা উচিত হয়নি। তাহলে আমি নিক্কিকে বলে
ফিরে যাই। হয়তো আমি আপনাকে খুঁজে পেতে পারি স্যার।
তার মন ভেঙ্গে গিয়েছিল কিন্তু তবুও সে হার মানে না। সে
তখনও বিশ্বাস করছিল যে অবশ্যই রবির সাথে দেখা হবে। এবং তাকে তার হৃদয়ের অবস্থা
জানাবে। এই ভেবে সে নিক্কির ঘরে ফিরে এল এবং তাকে বাড়িতে যেতে হবে বলে প্রাসাদ
থেকে বেরিয়ে এল এবং মনে মনে তার স্যারের সাথে দেখা করার আশায় সে রুক্ষ পাথুরে
পথে লাফিয়ে দ্রুত উপত্যকার দিকে ছুটে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে বিরজু মুখিয়া জির বাড়ির দরজার বাইরে পা
দিল… সে দেখতে পেল মুখিয়া ধনপত রায় আসছেন।
সঙ্গে ছিল তার মেয়ে অনিতা।
অনিতা এই বছর ২০ এ পা দিয়েছে। তীক্ষ্ণ চোখ। লম্বা এবং নিটোল ফর্সা শরীর। চুলগুলো ছিল
কালো আর কোমর পর্যন্ত ঝুলন্ত। সে চুল বেঁধে রাখায় অভ্যস্ত ছিল না। সবসময় খোলা
রাখত। তার স্তন সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত এবং খাড়া খাড়া। তাকে দেখলে যে কোনো মানুষ
দীর্ঘশ্বাস ফেলতে বাধ্য। পেট চ্যাপ্টা এবং কোমর ছিল সরু। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল
তার নিতম্ব, প্রসারিত। সে সবসময় শুধু কুর্তা পায়জামা পরত। পাছার ফাঁক এতটাই গভীর
ছিল যে প্রায়ই তার কুর্তি ওই ফাটলে আটকে যেত। কোমরটি এমনভাবে ছিল যে দেখতে থাকা
মানুষের মুখ থেকে অনিচ্ছাকৃতভাবেই গরম দীর্ঘশ্বাস পড়ে। সামগ্রিকভাবে বলা যায় তার
মধ্যে যৌবন এসেছিল পরিপুর্ণভাবে আর উপরওয়ালা তাকে দিয়েছিল উপচে পড়া যৌবন। বিরজুর
ক্ষুধার্ত চোখ প্রায়ই গোপনে তার যৌবন পান করত। কিন্তু বিরজুর কাছে অনিতা ছিল ডিম
পাড়া মুরগির মতো। সে জানত এই মুরগি খেয়ে ফেললে ভবিষ্যতে তাকে আর ডিম খেতে হবে না।
প্রচুর ডিম খাওয়ার ইচ্ছার কারনে সে এই মুরগিকে রেহাই দিয়েছে।
বিরজুকে দেখেই মুখিয়া জির মন মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগে মেয়ের সঙ্গে থাকার সময় তার মুখে যে খুশি ছড়িয়েছিল তা মুহুর্তের
মধ্যে মিলিয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু বিরজুর জন্য মুখিয়া
জির বিদ্বেষও ছিল আশীর্বাদ। মুখিয়া কাছে আসতেই হাত গুটিয়ে সালাম জানালেন। “নমস্কার
মুখিয়া।” তার
মুখে বিদ্রুপের হাসি।
“তুই এখানে কি করতে এসেছিস?” বীরজু কেন
এসেছে তা সব জেনেও মুখিয়া তার মেয়ের উপস্থিতির কারনে রেগে গেলেন।
তার ফ্লেয়ার ছিল একটি ভান। কিন্তু তার রাগ ছিল সত্য।
বিরজুর ছায়াকেও সে সত্যিই ঘৃণা করত।
“সবাই সব জানে মুখিয়া, এখনও
লেজ দিচ্ছেন।” বিরজু
দাঁত বের করে হাসে। “অনেক বছর ধরে
একটাই কাজ করতে আসি, আর কিসের জন্য আসব।”
কথা শেষ করতে করতে সে অনিতার দিকে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাকাল।
অনিতা বিরজুর এমন চেহারায় পাত্তা দেয়না। কিন্তু তার
নোংরা চোখ মুখিয়া জির চোখ এড়ালো না। নিজের মেয়ের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুখিয়া
জির চোখ বিরজুর জন্য রক্তে ভরে গেল। পাড়লে এক্ষুনি বিরজির চোখ বের করে নিত। কিন্তু
সে শুধু ভাবতে পারল আর ভাবতেই থাকল।
মুখিয়া জির রাগ অনুমান করে বিরজু একটা মুচকি হাসি
দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।
রবি প্রাসাদে নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে আছে। মনে মনে
ঘুরপাক খাচ্ছিল কাঞ্চনের মুখ। আজ উপত্যকায় কাঞ্চনের সাথে আকশ্মিক মিলন একটি
সুন্দর দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। মনের অজান্তেই কাঞ্চনের কথা ভাবতে থাকে। লাখো
চেষ্টা করেও সে কাঞ্চনের ভেজা চোখ আর বিবর্ণ মুখ ভুলতে পারেনা। সে ভাবছিল- এই
মেয়েটা আজ কেন মন খারাপ করলো, আর আমার কেন
মনে হলো তার দুঃখের জন্য আমি দায়ী কিন্তু আমি তার কিছুই করিনি, তার
এতই খারাপ লাগলো নদীর ব্যাপারটার জন্য। সে যদি এতই নরম হয় তাহলে আমার জামাকাপড়
পোড়াবে কেন? হয়ত এটাও সম্ভব যে, কারো
চাপে পড়ে সে আমার জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কার...?” তার মন
আলোড়িত হল, তখন তার মনে আরেকটি মুখ ফুটে উঠল-
নিক্কি, হয়তো নিক্কি তাকে এটা করতে বাধ্য করেছে অথবা
নিক্কি তার জামাকাপড় পুড়িয়ে কাঞ্চনের হাতে দিয়ে পৌঁছে দিতে পাঠিয়েছিল। হ্যা! নিশ্চয়ই
এটাই হয়েছে। আর এরজন্য আমি সেই সাদাসিধে কাঞ্চনের হৃদয়ে আঘাত করেছি। হয়তো সে
কারণেই সে দুঃখ পেয়েছিল। উফ আমি কি করেছি। আমি তাকে নিয়ে এত ভুল ভাবতাম। আর এখন
সে না জান আমাকে নিয়ে কী ভাববে। সে কতটা ভাববে? আমাকে
ঘৃণা করছে? কিন্তু আজ যখন ঝর্নার কাছে দেখা হলো তখন তার চোখে আমার প্রতি কোন ঘৃণা
ছিল না, কিন্তু তার চোখে একটা আশা ছিল…যেন
সে আমার কাছে কিছু চায়। কিন্তু কি? সে আমার কাছে
কি চায়? সেকি আমাকে ভালবাসতে শুরু করেছে, কিন্তু
সে আমাকে কেন ভালবাসবে? সে এত বোকা নয় যে তার হৃদয়ে আঘাত করেছে
সে তাকেই ভালবাসবে।
রবি অনেকক্ষণ কাঞ্চনের কথা ভাবতে থাকে তারপর ভাবতে
ভাবতে ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়। এর মধ্যে কাঞ্চনও এসে চলে গেল। কিন্তু সে জানতে
পারেনি যে সে তার ভালবাসায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তাকে খুঁজছে।
কাঞ্চন দৌড়ে দৌড়ে সেই ঝর্নার কাছে পৌঁছে গেল। সে তার
তৃষ্ণার্ত চোখ সর্বত্র চালায়। কিন্তু রবিকে কোথাও দেখা গেল না। একবার তার মন চাইল
সে জোরে জোরে "স্যার”বলে ডাকে, রবি
যদি এখানে কোথাও থাকে, তবে তার কণ্ঠ শুনে সে নিশ্চয়ই
বেরিয়ে আসবে। কিন্তু পরের মূহুর্তে ভাবলো যে, অন্য
কেউ তাকে এভাবে ডাকতে দেখলে তার বড় বদনাম হবে, তার
ঠোঁট সিল হয়ে গেল। সে রবির নাম ধরে ডাকতে পারেনি। সে তাকে খুঁজতে থাকে
এখানে-সেখানে। যেখানেই তার সত্তার সম্ভাবনা আছে মনে হয়, সেখানেই
খোঁজাখুঁজি শুরু করে। যখনই পাতার সামান্য গর্জন বা টিকটিকির নড়াচড়ার শব্দ হত, তখনই
সে আনন্দে ঘুরে যেত যেন তার স্যার তার পিছনে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেও যখন রবিকে পাওয়া গেল না, তখন
সে সেখানেই পাথরের ওপর বসে রইল। এ সময় তার মন কাঁদতে চাইছিল, তার
মন চাইছিল সে যেন হাউ মাউ করে কাঁদে। কি বাজে অবস্থা হয়ে গেছে ওর, যে
মেয়েটা সব সময় হাসতো আর হাসতো, আজ সেই হাসি
উধাও হয়ে গেছে ওর ঠোঁট থেকে। সে নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছিল যে কেন সে এমন একজনের
প্রেমে পড়ল যে তাকে মোটেও পাত্তা দেয় না। মনে মনে বললো- "তুমি বোকা, কাঞ্চন, তুমি
যে নির্মম মানুষের অপেক্ষায় আছো। তাকে ভুলে যাও, নাহলে
সারা জীবন এভাবেই কষ্ট পেতে থাকবে, সব শেষে তুমি
গ্রামের একজন সহজ সরল মেয়ে এবং সে শহরের খুব শিক্ষিত ডাক্তার। তোমার মত মেয়ের
জন্য তার হৃদয়ে কোন জায়গা হয় কি করে। একটা শিক্ষিত শহুরে মেয়ে নিশ্চয়ই তার
জন্য অপেক্ষায় আছে, তাহলে সে তোমাকে ভালোবাসবে কেন? তার
যোগ্য না কাঞ্চন, দেখো তোমার মর্যাদার কাউকে নিয়ে
স্বপ্ন দেখো, আকাশ-পাতালের মিলন কখনো হয়নি আর হবেও
না, তাতে মন বসালে দুঃখ ছাড়া কিছুই পাবে না, এখনো
সময় আছে। তোমার পথে ফিরে যেতে।
“তাহলে বাস্তবে আমি কখনোই স্যারের
সাথে দেখা করতে পারবো না, আমার সত্যিকারের ভালোবাসার কি আসলেই
কোন গুরুত্ব থাকবে না, স্যার কি সত্যিই আমাকে তার স্ত্রী
হিসেবে মেনে নেবেন না। সম্পদই কি আসলেই সবকিছু, মন
যা চায় তার কোন মূল্য নেই। "
এসব ভেবে কান্নায় ভেঙে পড়ে কাঞ্চন। সে তার হাতের
তালুতে মুখ ঢেকে কাঁদছিল। বেচারির এই উপলব্ধি তার হৃদয় ভেঙ্গেচুড়ে দিচ্ছিল যে তার
দারিদ্র্যের কারণে রবি তাকে গ্রহণ করবে না। মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে। কিছুক্ষন পর
যখন তার কান্না থামল তখন সে মনে মনে বলল - "ঠিক আছে স্যার, আমি
চলে যাচ্ছি, আজকের পর আর কোনদিন তোমার পথে আসবো না, তোমার
জন্য আমি কোনদিন আমার হৃদয় জ্বালাবো না। আমার চোখ আর কোনদিন তোমাকে মনে করবে না। আর্দ্র
হবে না। আমি আর কখনো তোমাকে ভালোবাসবো না।"
কাঞ্চন উঠে চোখের জল মুছে বাড়ি ফিরে যেতে গেল। তখন সে
অবাক হয়ে গেল যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্চর্য দেখেছে। বিস্ময়ে চোখ বড় বড়
হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারছিল না যে তার চোখ তাকে কী দেখাচ্ছে। রবি তার সামনে
দাঁড়িয়ে।
“আপনি...”
কাঞ্চনের মুখ থেকে বিস্ময় আর আনন্দের মিশ্র সুর বেরিয়ে এল। রবিকে
সামনে দেখে তার মনে হল ভগবান তার কান্না শুনে তার প্রেম দেবতাকে তার কাছে
পাঠিয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে বিচ্ছেদে ভিজে যাওয়া তার চোখ এখন আনন্দে জ্বলজ্বল করছে।
তার ঘন অশ্রু তার গাল বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সে ভেজা চোখে রবির দিকে তাকিয়ে থাকে, যে
মনটা কিছুক্ষণ আগে তার কাছ থেকে পালানোর কথা বলেছিল, তার
সাথে দেখা না করার, কখনো তার প্রেমে না পড়ার, সে
এখন তার দিকে টানতে থাকে। তার মন চাইল সে এগিয়ে গিয়ে রবিকে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু
সে সাহস দেখাতে পারেনি। হ্যাঁ, খুশির বদলে
একটু রাগ অভিমান ফুটে উঠল মুখে। সে ঘাড় ঝাঁকিয়ে রাগ করে চলে যেতে লাগল।
তাড়াতাড়ি সে রবির পাস দিয়ে এগিয়ে গেল, রবিও
দ্রুত ঘুরে গেল। তখন রবির পায়ের নিচে থাকা ছোট পাথরটি পিছলে যায়। পাথরটা পিছলে
যাওয়ার সাথে সাথে তার পা পিছলে যায় এবং সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। পড়ে যেতেই
তার শরীর দ্রুত খাদের দিকে পিছলে যায়।
কাঞ্চন ওর পড়ে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে পেয়েই দ্রুত ঘুরে
দাঁড়াল। রবিকে খাদের দিকে পড়তে দেখে কেঁদে উঠল - "স্যার...স্যার।"
রবিকে বাঁচাতে সে খাদের দিকে দৌড়ে গেল, সে
খাদের পাশে দাঁড়িয়ে রবির দিকে তাকাল। রবি একটা পাথর ধরে ঝুলছিল। তার একটি পা
পাথরের সাহায্যে এবং অন্য পা বাতাসে দুলছিল। এর ঠিক নিচে ছিল গভীর খাদ।
কাঞ্চন রবিকে এভাবে মৃত্যুর দোলনায় দুলতে দেখে তার দম
আটকে গেল। সে ভয়ে কেঁপে উঠল। সে তাকে বাঁচানোর উপায় ভাবতে লাগল। প্রথমে ঘাড়
উঁচিয়ে চারদিকে দেখে একজন মানুষের খোঁজে, কিন্তু
সন্ধ্যার প্রান্তরে, দূরে কাউকে দেখতে পেল না। হতাশ হয়ে
চোখ ফেরাল রবির দিকে। রবি তখনও উঠার চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ কাঞ্চনের একটা কৌশল মাথায় এলো, সে
তাড়াতাড়ি গলায় জড়ানো ওড়নাটা টেনে পেছনে গিঁট বেঁধে রবির দিকে ছুড়ে দিল। “নিন
স্যার।"
“না...! “অস্বীকার
করে মাথা নাড়ল রবি। “এভাবে তুমিও
নেমে আসবে।"
“আমাকে বিশ্বাস করুন স্যার, আমার
কিছু হবে না।” কাঞ্চন
ধৃষ্টতার সাথে বললো- "আপনি আমার ওড়নাটা চেপে ধরে ওঠার চেষ্টা করুন।"
রবি তাই করল, এক হাত দিয়ে
ওর ওড়নাটা চেপে ধরে অন্য হাত দিয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে লাগল, পাথরের
সাপোর্ট নিয়ে।
কাঞ্চন গ্রামের জল খেয়ে বড় হয়েছে। সে বিন্দুমাত্র
ঘাবড়াল না এবং তার সর্বশক্তি দিয়ে রবিকে টেনে তুলতে থাকল। সাথে সাথে রবি উঠে
এলো। সে এক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে নিজেকে স্থির করে। তারপর কাঞ্চনের দিকে তাকাল।
কাঞ্চন রাগে ঘামে ভিজে তার চারপাশে ঘুরছিল। রবি কিছু বলতে মুখ খুলতেই কাঞ্চন রেগে
বললো - "এতো গভীর খাদের কাছে দাঁড়ানোর কি দরকার ছিল? আপনি
কি ভেবেছিলে যে এই খাদটা কোন খামারের পাড়...... কিছু হবে না? আজ
যদি আমি না থাকতাম, আমি জানি না আপনার কি হত।
রবি হতভম্ব হয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে
রাগে লাল-হলুদ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল সে এখনই রবিকে ধুয়ে দেবে। সে তাকে এমনভাবে
ধমক দিচ্ছিল যেন সে তার বাড়ির চাকর, এবং সে কিছু
বড় বোকামি করেছে। কাঞ্চনের এমন রূপ সে আগে কখনো দেখেনি। মেয়েটি, যে
সবসময় শান্ত এবং স্পর্শকাতর ছিল, এই সময়ে
একটি সিংহীর রূপ ধারণ করেছে। মুখে যা আসছিল তা রবিকে বলছে। তার মুখ রাগে লাল হয়ে
গেছে, তার চোখ চুল্লির মতো জ্বলে উঠেছে। নিঃশ্বাস এত দ্রুত
চলছিল যেন সে মাইলের পর মাইল হেঁটে এসেছে। তার বুক জোরে জোরে ওঠা নামা করছিল।
অপরাধীর মতো রবি চুপ করে দাঁড়িয়ে তার ধমক শুনতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর রাগ কমে গেলে সে চুপ হয়ে যায়। রবি তখনও
তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে তখনও কাঞ্চনের ওড়না ধরা, যা
ঘষে ঘষে তার ঘাবড়ে যাওয়া দূর করার চেষ্টা করছিল। কাঞ্চন বুকের ওড়না ছাড়া ওর
সামনে দাঁড়িয়ে। আর রাগের
আধিক্যে তা উঠা নামা করছে। রবি তার ঘামে ভেজা মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে
বললো - "কোন অধিকারে তুমি আমাকে এভাবে বকা দিচ্ছো? এটা
আমার জীবন.... আমি খুশি তাই করব...... আমি এখান থেকে লাফ দিব। পাহাড়ের চূড়া থেকে...
আমাকে নির্দেশ দেওয়ার তুমি কে?” রবি তার
মেজাজের সাথে পরিচিত ছিল। তবু মন ছোঁয়াতে মিথ্যে রাগ দেখাল।
কাঞ্চনের ঠোঁট কেঁপে ওঠে। মেয়েটা কিছু বলতে চাইল
কিন্তু বলতে পারল না। ভারী চোখে রবির দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে নিল।
“বলো, উত্তর
দাও।” রবি
আবার জিজ্ঞেস করল। “এভাবে কি ভেবে
আমাকে বকা দিচ্ছিলে? আমার এত খেয়াল রাখার কে তুমি?"
কাঞ্চন আবার চোখ তুলে তাকালো রবির মুখে। তার মনে এলো বলে
যে সে তাকে ভালোবাসে, তার জীবনসঙ্গী হতে চায়, তাকে
ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না, আঘাত পেলে
সেও মরবে। কিন্তু মনের ভেতরের অনুভূতিগুলো সে বের করে আনতে পারেনি। সে ভেজা চোখে
চুপচাপ রবির দিকে তাকিয়ে থাকে।
“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?” রবি তার
নীরবতায় বলল। “তাই কি আমি মারা গেলে তুমি
বাঁচবে না? যদি তাই হয়, তাহলে
তুমি আমাকে বলছ না কেন আমাকে ভালোবাসো।"
“সা…
..স্যার ….! ”
রবি হাত বাড়িয়ে দুই হাতে ওর মুখ চেপে ধরল। তারপর
বললো- "কেন লুকিয়ে কাঁদছো? একবারও বলোনি
কেন তুমি আমাকে ভালোবাসো?"
“স্যার...!”সে
হেঁচকি দিয়ে বললো - "মানে... আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি, স্যার, আমি
আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, স্যার। আমাকে
নিয়ে যান, স্যার, আপনি
যা বলবেন আমি তা পালন করব, আপনি যা
বলবেন আমি তাই করব। আমি থাকব আপনি যেমন রাখেন। আমি খাবার কম খাব, আমি
ঘরের সব কাজ করব। কিন্তু স্যার আমাকে নিয়ে যান।”
এই বলে কাঞ্চন রবির সামনে হাত জোড় করে।
রবি ওর হাত ধরে চুমু খেল। তারপর বললো- "তুমি কি
আমাকে পাথরের মানুষ ভেবেছো কাঞ্চন, আমার বুকে কি
হৃদয় নেই, যে তোমার নিঃশর্ত ভালোবাসার বিনিময়ে
তোমাকে ঘরের কাজ করতে বাধ্য করবে। আমি তোমাকে কম খাবার খাওয়াব। আমি রাখব আমার
হৃদয়ে, আমার হৃদয়ের ভিতরে। কারণ আমিও তোমাকে ভালবাসি।
পৃথিবীর কোন শক্তি তোমাকে আমার হৃদয় থেকে বের করে নিতে পারবে না।"
“স্যার...!”
বুকে জড়িয়ে থাকা এই সুখ আর সামলাতে পারেনি কাঞ্চন।
রবি খুব শক্ত করে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। দুটি হৃদয় এক
হয়ে গেল। কাঞ্চন রবির বাহুতে বন্দী হয়ে অনুভব করলো যেন সে পুরো পৃথিবী পেয়েছে।
সে তার বাহুগুলির বৃত্তকে শক্তিশালী করতে থাকল। এই মুহূর্তে সে যে আনন্দ অনুভব
করছে তা ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না।
সে ছিল সেই পাক্ষীর মতো যে এক ফোঁটা জলের জন্য মরুভূমিতে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু জল
পায় না। আর পাওয়া গেলে তার তৃষ্ণার্ত মন যে সুখ পায়, সেই
সুখ এ সময়ে অনুভূত হয়। আজ তার তৃষ্ণার্ত মন শুধু একফোঁটা জলই পায়নি, বরং পেয়েছে
সমগ্র সাগর। সে সেই সাগরের গভীরে হারিয়ে যেতে চেয়েছিল এবং হারিয়েও গিয়েছিল।
১৯
অনেকক্ষণ দুজনে লতা-পাতার মতো একে অপরকে জড়িয়ে ধরে
একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে থাকে। কাঞ্চন যেন এই সময়ে পুরো পৃথিবী ভুলে গেছে। এই
সময়ে রবির কোলে থাকতে সে যে সুখ পাচ্ছে, তা সে আগে
কখনো অনুভব করেনি।
কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকার পর রবি মৃদু গলায় ডাকল-
"কাঞ্চন।"
রবি তাকে আদর করে ডাকল। রবির কন্ঠস্বর কাঞ্চনের কানে
এসে পড়লে সে তার বন্ধ চোখের পাতা খুলে রবির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। “বলুন
স্যার।"
রবি দুই হাতে মুখ ভরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল।
কাঞ্চনের গালে তখনও ভেজা কান্নার চিহ্ন। এক হাত দিয়ে তার গাল থেকে অশ্রু মুছে
দিল। তারপর কাঞ্চনকে বললো “আমাকে ক্ষমা
করে দিও। আমি আমার অজান্তে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
“ছি ছি ... কি?” কাঞ্চন দম
বন্ধ করে বলল - “আপনি আমার
পিছনে আমার কথা শুনছিলেন। যান, আমি আপনার
সাথে কথা বলব না।”
কাঞ্চন মুখ ফুলিয়ে বলল।
“আমি ভুল করেছি, এখন
হাসো।” রবি
ওর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল।
তার কথায় মৃদু হাসল কাঞ্চন।
“এখন সবসময় এভাবেই হাসতে থাকো।
আমি আর এই চোখে অশ্রু দেখতে চাই না।”
রবি হেসে ওর চোখের দিকে তাকাল।
“স্যার, আপনি
আমাকে ছেড়ে যাবেন না তো?”
কাঞ্চন গম্ভীর হয়ে বললো- "আপনি জানেন না স্যার, আপনার
জন্য আমি কতটা ব্যাকুল।
“আহহ ... কি বললে কাঞ্চন?” রবি ক্ষোভের
সাথে বললো- "আমি সেরকম নই। তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। তোমাকে আমার দরকার।
বছরের পর বছর আমিও এই সত্যিকারের ভালোবাসার সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি আর কোথায়
পাবো তোমার চেয়ে সুন্দর মানুষ যে আমাকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসে। আজ আমি আমার
মাকে জানাবো যে আমি তার পুত্রবধূ পছন্দ করেছি। দ্রুত এসে তার পুত্রবধূকে দেখে নিক।
তোমার পুত্রবধূ হতে কনে খুব তাড়াহুড়ো করছে"
রবির দুষ্টুমি কথায় হঠাৎ কাঞ্চন লাল হয়ে গেল। সে মুখ
ঘুরিয়ে লজ্জিত হয়ে বললো - "ধাত...! আমি কেন তাড়াহুড়ো করব? আমি
জন্মের পর জন্ম পর্যন্ত আমার স্যারের জন্য অপেক্ষা করতে পারি।"
“তুমি আমাকে স্যার ডাকছ কেন?” অবাক হয়ে
জিজ্ঞেস করল রবি। “স্যার তোমার
মুখ থেকে শুনে মনে হচ্ছে আমি কোন মোটা, বুড়ো, বড়লোক
আর তুমি আমার কাজের মেয়ে।"
“আমি একজন দাসী।”
কাঞ্চন হাসল “সে দাসী যে সব সময় আপনার চরনে থাকবে।"
“সাবধান...!” গর্জে উঠল রবি। “আবার
কোনদিন নিজেকে আমার দাসী বলবে না। তুমি আমার ভাবী বউ, তোমার
স্থান আমার পায়ে নয়, আমার হৃদয়ে। বুঝেছ।”
কাঞ্চনকে বুকে লাগিয়ে রবি বলল।
কাঞ্চন আবেগে বুকে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তারপর তার বুকের
উপর থেকেই বলে "মা জি আমাকে গ্রহণ করবেন, এমন
হবে না যে তিনি আমাকে গরীব জেনে আমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করবেন।"
“মোটেই না।”
রবি তার গালে চুমু খেয়ে বললো- "আমার মা আমার সবচেয়ে ভালো
বন্ধু, আমার পছন্দ তার পছন্দ হবে।"
কিছুক্ষণ, দুজনেই একে
অপরকে জড়িয়ে কথা বলতে থাকে এবং প্রতিশ্রুতি দেয়। তারপর কিছুক্ষন পর কাঞ্চন বললো
- "আচ্ছা স্যার, আমাকে এখন অনুমতি দিন, বুয়া
আর বাবা আমার জন্য চিন্তা করছেন।”
গভীর অন্ধকার দেখে চিন্তিত গলায় বলল কাঞ্চন।
আজ সকাল থেকে সে এখানে-সেখানে দৌড়াচ্ছিল। তখন মনে শুধু
রবিই ঘুরছিল। কিন্তু এখন রবিকে পেয়েছে। তাই তার খেয়াল হয় পরিবারের কথা।
“ঠিক আছে।”
রবি ওকে আলাদা করে বললো- "আবার কবে দেখা হবে।"
“আগামীকাল সন্ধ্যা ৫ টায় একই
স্থানে।”
কাঞ্চন হেসে রবির কাছ থেকে ওড়নাটা নিয়ে গলায় পরে নিল।
“আরে ... আমার অন্য জুতো কোথায়
গেল?”
অবাক হয়ে বলল রবি। সে যখন পিছলে গিয়েছিল, তখন
তাঁর পায় থেকে একটি জুতা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু খাদ থেকে ওঠার পর দুজনেই একে
অপরের মধ্যে এমনভাবে হারিয়ে গিয়েছিল যে রবির জুতোর কথা খেয়াল করেনি। আর এখন
সন্ধ্যাও নেমে গেছে।
“এটা নিশ্চয়ই এখানে কোথাও আছে।”
কাঞ্চন বলে জুতা খুঁজতে এদিক ওদিক তাকাতে থাকে।
সূর্যাস্ত হয়ে গেছে, কিন্তু
অন্ধকার এতটা গভীর ছিল না যে মাটিতে পড়ে থাকা কোনো বস্তু দেখা যেত না।
জুতা খুঁজতে খুঁজতে খাদের কাছে পৌঁছে গেল কাঞ্চন। সে
দেখল রবির জুতো পাথরের ফণাতে। সে তাড়াহুড়ো করে জুতাটা তুলে ওড়নায় লুকিয়ে রাখল, রবির
চোখ ফাকি দিয়ে। “স্যার, এখন
আপনার জুতা পাবেন না। আর খুঁজতে যাবেন না। অন্য জুতা কিনে নিন। আমি বাড়ি যাচ্ছি।
আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
“আরে ....দাঁড়াও, কিছুক্ষণ
দেখা যাক। হয়তো খুঁজে পাব।”
রবি কাঞ্চনের দিকে ফিরে বলল। হঠাৎ সে অনুভব করল যেন কাঞ্চন কিছু
লুকানোর চেষ্টা করছে। “তোমার হাতে
কি? কি লুকিয়ে রেখেছো?"
রবিকে তার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে কাঞ্চন দ্রুত দৌড়ে
উপরে চলে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর সে থেমে গেল, তারপর
রবিকে জুতো দেখিয়ে বলল - "স্যার, আপনার জুতো
আমার কাছে আছে। কিন্তু আমি দেব না। নিজের জন্য অন্য জুতা কিনুন।”এই
বলে কাঞ্চন হেসে বাড়ির পথে পালিয়ে গেল।
“আরে ..... দাঁড়াও, দাও
আমার জুতোটা দাও।”
পিছন থেকে ডাক দিল রবি। কিন্তু কাঞ্চন থামেনা। ছুটে গিয়ে তার
দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল।
“অদ্ভুত মেয়ে।”
রবি বকাঝকা করে। “সেদিন আমার
জামাকাপড় পুড়িয়েছিল আর আজ সে আমার জুতা নিয়ে গেছে। আমার জামা-জুতায় ওর এত
শত্রুতা কেন।” রবি
মাথা খামচে ভাবল।
এক পায়ে জুতা পড়ে হাঁটতে হাঁটতে সে কোনোরকমে তার
বাইকের কাছে পৌঁছায় এবং তারপর বাইক স্টার্ট করে প্রাসাদের দিকে চলে যায়।
রাত ৮ টা বাজে, নিক্কি তার
রুমে সোফায় শুয়ে আছে। মনটা একেবারে অস্থির। যখন থেকে সে শহরে থাকতে শুরু করেছে, সে
সবসময় বন্ধুদের মধ্যে থাকতে অভ্যস্ত ছিল। কোলাহল, পার্টি, গান, নাচ, তারপর
সারা রাত বন্ধুদের সাথে মজা করা। ছেলে না মেয়ে, মেয়ে
না ছেলে, সবার সামনেই জামা খুলে ফেলেছে, সে
ছেলে না মেয়ে তার পরোয়া ছিল না। সে
শুধু মজা চেয়েছিল, যেকোনো মূল্যে।
কিন্তু আজ সে একেবারে একা হয়ে গেছে, না
সেই মানুষগুলো আছে, না সেসব হৈচৈ, না সেসব
পার্টি না সারা রাতের মজা। সে হয়ে গিয়েছিল সেই পাক্ষীর মতো যে আকাশে সব সময় আপন
গতিতে উড়তে থাকে, নিজের ইচ্ছামত গন্তব্য ঠিক করে চলে।
কিন্তু যখন তাকে খাঁচায় বন্দী করা হয়, তখন সে শুধুই
হাপিয়ে উঠে। নিক্কি বন্দী ছিল না কিন্তু তার দোলাচল ছিল খাঁচার পাক্ষীর মতো। কাঞ্চন
যতক্ষন তার সাথে থাকত ততক্ষণ সে সব ভুলে যেত, কিন্তু
চলে যাওয়ার সাথে সাথে সে আবার একা হয়ে যায়। ঠাকুর সাহেবের সাথেও শুধু রাতের
খাবারের সময়ই দেখা হত, না হলে দিনে কিছুক্ষণ হলঘরে একসঙ্গে
বসে থাকতেন, কিছু কথা বলার পর নিজের ঘরে চলে
যেতেন।
এই পরিবেশে নিক্কি দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। সেজন্য সে
রবির সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল, কিন্তু তাকে
অসম্মান করে আরও খারাপ করে দিয়েছিল সে। সে তার অপমানের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল।
এবং সর্বদা এই প্রচেষ্টা ছিল রবির কোন দুর্বলতা খুজে যদি পাওয়া যায় সেটা সে
আঁকড়ে ধরবে, তখন তাকে নিজের ইচ্ছায় নাচতে বাধ্য
করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধুই হতাশ।
হঠাৎ সে উঠে জামাকাপড় বদলাতে লাগলো, গায়ের
কাপড়গুলো শরীর থেকে আলাদা করে তার জায়গায় একটা সালোয়ার কুর্তা পরে হলের দিকে
এলো। সে সরজুকে বলল যে সে বসতিতে যাচ্ছে, কিছুক্ষণের
মধ্যেই ফিরবে। তারপর সে বেরিয়ে গেল।
সে বের হয়ে তার জীপে বসল এবং জীপ চালিয়ে বসতির দিকে
চলে গেল। জীপের আলোয় অন্ধকার ছিঁড়ে সে অল্প সময়ের মধ্যে বসতির শুরুতে পৌঁছে
গেল। সে বাম দিকে মোড় নিয়ে চলছিল তখন সে তার ডানদিকে একটি ছায়া দেখতে পেল।
দ্রুত ব্রেক কষে “চরররর...”
শব্দে।
২০
জীপ থামতে দেখে ছায়াও নিজের জায়গায় থেমে দাঁড়াল।
নিক্কি সেই ছায়ার দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। অন্ধকারে সেই অন্ধকার ছায়াটিকে
সে চিনতে পারল না, কিন্তু সে তার উচ্চতা অনুমান করেছিল। তার
উচ্চতা ছিল প্রায় ৬ ফুট। নিক্কি ওর দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে বলল- "কে তুমি? সামনে
এসো"
ছায়া এগিয়ে গেল। আর জীপের কাছে গেল। নিক্কি তার দিকে
মনোযোগ দিয়ে তাকালো, তার মুখটা কিছুটা পরিচিত মনে হলো। “তুই
কাল্লু, তাই না?"
“হ্যাঁ নিক্কিতা, আমি
কাল্লু।”সে মাথা নিচু করে বিষণ্ণ কণ্ঠে
বলল।
গ্রামের সবচেয়ে কালো কাল্লু ছিল কুৎসিত নিগ্রোর মতো
দেখতে একজন যুবক। সে দেখতে যেমন কুৎসিত ছিল, ভিতরটা ছিল
তেমনই সুন্দর। মুখিয়া জির ক্ষেতে কাজ করে নিজের ও বৃদ্ধা মাকে খাওয়াতেন।
যখন ৬ বছর তখন তার বাবা মারা যান। তার বাবা চাষের নামে কিছু জমি রেখেছিলেন। যা পরে
নিজেকে ও কাল্লুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তার মা বিক্রি করে দেন। এখন একটা ছোট্ট
মাটির কুঁড়েঘর ছাড়া তার আর কিছুই ছিল না।
শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত কাল্লু শুধু দুঃখ দেখেছে। তার
কুৎসিত চেহারার কারণে সে ছোটবেলা থেকেই গ্রামের অন্য ছেলেমেয়েদের কাছে অপমানিত হত।
ছোটবেলায় যার কাছে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিত, ঘৃণার
বশে সে হাত সরিয়ে দিত। সে এমন এক নিঃসঙ্গ পাখি যে সে যে সব ডালে বসত সে সব ডালের
সবাই একা ফেলে উড়ে যেত।
কিশোর বয়সে পৌঁছানোর পর তার দুঃখ আরও বেড়ে যায়।
গ্রামের যে কোন ছেলেকে কোন মেয়ের সাথে কথা বলতে দেখলে বা কাউকে একা মেয়ের সাথে
হাঁটতে দেখলে তার মন কেঁপে উঠত। প্রতিটা ছেলের মত তারও ইচ্ছা ছিল কেউ তাকেও
ভালোবাসুক, কোথাও খামারের শস্যাগারে কেউ যেন তার
জন্য অপেক্ষা করুক। কখনও কখনও ঝর্নার কাছে বসে একটি মেয়ের সাথে খেলবে। কেউ তার উপর
রাগবে, ঝগড়া করবে, তার সাথে হাসবে, তাকে আদর করবে। কিন্তু এ সব তার ভাগ্যে ছিল না।
গ্রামের সব মেয়েরা তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াত। কোনো
মেয়ে তাকে ভালোবাসা তো দুরের কথা সরাসরি তার সঙ্গে কথাও বলত না। কোন মেয়েই বা কোন
কুৎসিতকে পছন্দ করবে, প্রতিটি মেয়েই চায় তার ভাবী স্বামী
সুন্দর, সুশিক্ষিত, উচ্চ
পরিবারের এবং ধনী হোক।
কিন্তু এসব কিছুই তার কাছে ছিল না। কোন মেয়ে তার জন্য
পাগল হবে এমন রূপ তার ছিল না, না সে
শিক্ষিত ও ধনী ছিল। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের মধ্যে এমন একটা মেয়ে ছিল, যাকে
কাল্লু খুব পছন্দ করত। সে ছিল কাঞ্চন।
সমস্ত গ্রামের একমাত্র মেয়ে যে কাল্লুর সাথে হেসে কথা
বলত, কখনও তার মুখ ফিরিয়ে নিত না। যখনই তার সাথে দেখা
হতো, সে তার কাছে ভালভাবে তার অবস্থা জানতে চাইতো।
কাঞ্চনের এই ভালো ব্যবহার কাল্লুর পছন্দ হল এবং সে মনে
মনে কাঞ্চনকে ভালবাসতে লাগল। কিন্তু কাঞ্চনকে কখনোই তার মনের কথা বলতে পারেনি। দূর
থেকে দেখেই তার মনের তৃষ্ণা মিটাত। ভাল করেই জানে যে, চাঁদ
ও চাকরের মিলন কখনো হয়নি এবং হবেও না।
কাঞ্চনও দরিদ্র ছিল কিন্তু তার চেয়ে লক্ষ গুণ ভালো।
তাছাড়া সে সুন্দরী, সুশিক্ষিত। তার আর কাঞ্চনের মধ্যে
কোনো মিল ছিল না। তার ভয় ছিল কাঞ্চনকে মনের কথা বললে তার খারাপ লাগবে। আর তার
খারাপ লাগলে সে আর কখনো তার সাথে কথা বলবে না। এখন যে তার সাথে একটু কথা বলে, সে
তাও বলবে না...
পাওয়ার চেয়ে বেশি হারানোর ভয় ছিল তার। তার একটা ভুল
যেন তাকে কাঞ্চনের কাছ থেকে চিরতরে দূরে রাখতে না পারে এই ভেবে সে তার মনের
অনুভূতিগুলোকে কখনো তার ঠোঁটে পৌঁছাতে দেয়নি।
দিনভর পশুর মতো মাঠে কাজ করত আর রাতে কাঞ্চনকে ভাবনায়
রেখে তৃষ্ণার্ত মনের পিপাসা মেটানোর চেষ্টা করত। কিন্তু একাকীত্বে কাঞ্চনের স্মৃতি
তার তৃষ্ণার্ত মনের তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিত। যন্ত্রণা সীমা ছাড়িয়ে গেলে শিশুর মতো
কাঁদত। তবে মনের কষ্ট কাউকে বলত না।
তার কষ্টের কথা সে ছাড়া আর কেউ জানত না। এই হতভাগ্য
ব্যক্তিকে নিয়ে কারইবা কোনো উদ্বেগ থাকবে?
যদি কেউ তার একাকীত্বের বেদনার সাথে পরিচিত ছিল তবে তা
কেবল তার মা। যখনই সে কাল্লুকে দুঃখী দেখত, সে তাকে তার
ভালবাসার কোলে নিয়ে তাকে প্রলুব্ধ করত। সে ছিল কুৎসিত কিন্তু সেই মায়ের হৃদয়ের
টুকরো। তার একমাত্র অবলম্বান। কিন্তু তার মা সবসময় চিন্তায় থাকতেন যে কে তার
মেয়েকে তার গরীব কুৎসিত ছেলের হাতে দেবে? তার ছেলে কি
সবসময় একা থাকবে?
কিন্তু সে কাল্লুর কাছে তার উদ্বেগ প্রকাশ করে না। যখনই
উভয়ে একে অপরের সামনে থাকত, একে অপরের
কাছ থেকে তাদের দুঃখ লুকিয়ে রাখত, তারা একে
অপরের প্রতি তাদের ভালবাসার উচ্ছ্বাস করত।
এ সময় সে সুগনার বাড়ি যাচ্ছিল, তার
শরীর জ্বরে পুড়ছিল, শরীর ঠান্ডায় কাঁপছিল। ঠাণ্ডা থেকে
বাঁচতে ছেঁড়া পুরনো শাল দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছিল। জ্বর এতই বেশি যে সে যেতেও পারছিল না, কিন্তু
সুগনার ডাকে এই অবস্থায়ও তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল।
গ্রামে দুজন লোক ছিল যাদের কথা কাল্লু কখনও ফেলত না।
একজন ছিলেন মুখিয়া ধনপত রায়, যিনি তাকে
মজুরি দিতেন। দ্বিতীয় সুগনা, তিনি
কাঞ্চনের বাবা বলে সুগনার ডাক কখনও এড়িয়ে যেতনা।
আজ যখন সুগনা তাকে ডেকেছে তাই সে এমন অবস্থায়ও তার
বাড়ি যেতে রওনা দিয়েছে। বসতির শেষ প্রান্তে ছিল তার বাড়ি। সে তার বাড়ি থেকে বের
হয়ে রাস্তার কাছেও পৌঁছায়নি তখন জিপ থামার শব্দে তার চলন্ত পা থেমে যায়। তারপর
নিক্কি আওয়াজ দিতেই সে তার জিপের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“উফফ ... তুই আমাকে ভয় পাইয়ে
দিয়েছিস।” নিক্কি
নিঃশ্বাস ফেলে বলল- "এমন রূপ নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?"
“জি ...সুগনা কাকার বাসায়
যাচ্ছা। কোনো কাজে ডেকেছে।"
“ওহহহহ ... তুই এভাবে শাল পরে
যাচ্ছিস কেন?"
“আমার একটু জ্বর, নিক্কি
জি।” শালটা
সামলাতে সামলাতে কাল্লু বললো- "তাই তো শালটা দিয়ে ঢেকে রেখেছি।"
“তাহলে আমার জিপে বস, আমিও
কাঞ্চনের বাসায় যাচ্ছি।”
নিক্কি বলে তাকে সিটে বসার ইঙ্গিত দিল।
“নিক্কি জি আমি ঠিক যেতে পারব।
আপনি কষ্ট করবেন না"
“আরে... আমি যখন সেখানে যাচ্ছি
তখন আমার সাথে যেতে সমস্যা কি?” নিক্কি জ্বলে
উঠল। কেউ তাকে অস্বীকার করলে তার রাগ সপ্তম আকাশে পৌঁছে যেত। মেয়েটি আরও বললো -
"চুপচাপ আমার সাথে গাড়িতে বস।"
কাল্লু এবার অস্বীকার করতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে
জিপে তার পাশে বসল। আজ সে জীবনে প্রথম ফোর হুইলারে বসেছিল।
কাল্লু জীপে বসতেই নিক্কি জীপটাকে এগিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর কাঞ্চনের বাসার সামনে জীপ থামল। নিক্কি
প্রথমে নেমে দরজা ঠেলে উঠানে ঢুকল। কাল্লুও পেছনে পেছনে উঠোনে তাকে অনুসরণ করল।
শান্তা বুয়া উঠানে রুটি বানাচ্ছিল। পাশের খাটে বসে
হুক্কা টানছিল সুগনা।
নিক্কিকে দেখে বুয়া অবাক হয়ে সুগনাকে বলে- দেখো, কোন
মেয়ে এসেছে।
শান্তার কথা শুনে সুগনা দরজার দিকে মাথা ঘুরাল। নিক্কি
হাসতে হাসতে তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ওর দিকে তাকাতেই সুগনা বলল- "আরে
শান্তা, এতো নিক্কি, চিনতে পারলি
না?"
শান্তা অবাক হয়ে সুগনার দিকে তাকাল। তারপর নিক্কির
দিকে চোখ রাখল। সে কিছু বলার আগেই নিক্কি তার কাছে এসে বলল - "নমস্কার চাচা। নমস্কার
বুয়া।” হাত
জোড় করে পালাক্রমে দুজনকেই সালাম করল। তারপর প্রণাম করে সুগনার পা ছুঁয়ে দিল।
"তুমি কত বড় হয়ে গেছ নিক্কি।”
বুয়া অবাক হয়ে বললো- "তুমি যখন এর আগে এখানে এসেছো তখন কত ছোট
ছিলে।"
বুয়ার কথায় নিক্কি হাসল। “কাঞ্চন
কোথায়, বুয়া?"
“দিদি এখানে।”
চিন্টুর আওয়াজ নিক্কির ঘাড় ঘুরিয়ে দিল, চিন্টু
আর কাঞ্চনকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। নিক্কির গলা শুনে দুজনেই
বেরিয়ে এসেছে।
নিক্কিকে দেখে কাঞ্চন তার দিকে ছুটে গেল। তারপর ওর হাত
ধরে বললো- "আজ ভুলে আমার বাড়ির পথে কেমন করে?"
“আরে, আমার
একা একা লাগছিল তাই ভাবলাম তোর সাথে দেখা করব।” নিক্কি উত্তর
দিল।
“দিদি তুমি আমার জন্য শহর থেকে
কি এনেছ? ”নিক্কির
কুর্তি টেনে বলল চিন্টু।
নিক্কি তাকে বলতে লাগলো। নিক্কির আগমনে সবাই তাকে নিয়ে
মেতে উঠে। কাল্লু কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল, জ্বরে
কাঁপছিল, কিন্তু কেউ তার দিকে লক্ষ্যও করল না।
২১
কিছুক্ষন কাল্লু সেদিকে তাকিয়ে থেকে তারপর সুগনার কাছে
চলে গেল। সেও সবার হাসিতে সামিল ছিল। ভুলে গেছে সে কাল্লুকে তার বাড়িতে ডেকেছিল
এবং সে কখন এসেছে।
“চাচা...আপনি আমাকে ডেকেছেন?"
কাল্লুর ডাক শুনে সাথে সাথে সুগনার মনোযোগ তার দিকে
গেল।
“আরে, তুই
এখানে কখন এলি?” হতভম্ব হয়ে বলল সুগনা।
“আমি নিক্কিজির সাথে এসেছি, চাচা।” কাল্লু উত্তর দিল।
“সরি কাল্লু, আমি
তোকে দেখতে পাইনি।” সুগনা হাসিমুখে বললো - "কিন্তু
তোর কি হয়েছে? শাল পরে এসেছিস কেন? ভালো
আছিস তো?"
সুগনার কথা শুনে চিন্টু আর শান্তা হেসে উঠল। কাঞ্চন এই
বিষয়ে চিন্টুকে একটু বকাঝকা করে কাল্লুর দিকে তাকাতে লাগল।
“একটু জ্বর আছে চাচা। সকাল হলেই
কমে যাবে।” কাল্লু বললো - "বলুন চাচা... আমাকে কেন ডেকেছেন?"
“আমি মুখিয়া জির কাছ থেকে জানলাম
তুই আগামীকাল সার আনতে শহরে যাচ্ছিস। ভাবলাম নিজের জন্যও এক বস্তা সার আনিয়ে নেই।” সুগনা উত্তর দিল। “কিন্তু
তুই এখন অসুস্থ হলে যাবি কিভাবে?"
“সকালের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। ”কাল্লু
উত্তর দিল। “আগামীকাল যাবার আগে দেখা হবে।
এখন অনুমতি দিন।"
“দাঁড়া ..... কিছুক্ষণ বস। আমি
এক গ্লাস গরম দুধে হলুদ দিয়ে দিচ্ছি... সকাল হলেই জ্বর কমে যাবে।” সুগনা ওকে থামিয়ে বলল। তারপর
কাঞ্চনকে দুধ গরম করতে বলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঞ্চন তার হাতে এক গ্লাস গরম দুধ
দিল। কাঞ্চনের হাত থেকে গ্লাসটা নিতে নিতে কাল্লুর হাতটা প্রবলভাবে কেঁপে উঠল। তার
বুকে একটা মিষ্টি ব্যাথা হল। বুঝতে পেরে কাঞ্চন ওর জন্য এক গ্লাস দুধ ধরে
রেখেছে....জ্বরে থাকার পরেও সে রোমাঞ্চিত হল। সে একবার তাকিয়ে কাঞ্চনের মুখ দেখে
তারপর কাঞ্চনের হাত থেকে গ্লাসটা নিল।
দুধ পান করা পর্যন্ত কাঞ্চন তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
আস্তে আস্তে দুধটা খেয়ে খালি গ্লাসটা কাঞ্চনকে দিল। দুধ পান করার পর তার ইচ্ছা হলো
আরো কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকার। সে কাঞ্চনকে আরও কিছুক্ষণ দেখতে চাইল। কিন্তু
বাড়ির লোকজন যেন তাকে ভুল না বুঝে তা ভেবে উঠে দাঁড়াল। তারপর সকালে সুগনার সাথে
দেখা করবে বলে বেরিয়ে যায়।
প্রায় ঘন্টা খানেক কাঞ্চনের বাসায় থাকার পর নিক্কি কাচের
প্রাসাদে ফিরে এলো। প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার সময় সে খুব টেনশনে ছিল, কিন্তু
কাঞ্চনের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সে সব টেনশন দূর হয়ে গেছে। প্রাসাদে পৌছলে দেখে
ভৃত্যরা রাতের খাবার সাজাচ্ছে। ঠাকুর সাহেব সোফায় বসে অপেক্ষা করছিলেন।
নিক্কির হলঘরে পা দিতেই ঠাকুর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন-
"এই সময় কোথা থেকে আসলে? কাঞ্চনের
বাড়িতে গিয়েছিলে?"
“হ্যাঁ বাবা।” নিক্কি হেসে তাকে জড়িয়ে ধরে।
“তোমার মুখে খুশি দেখে বুঝলাম
তুমি কাঞ্চনের বাড়ি থেকে আসছো।”ঠাকুর সাহেব
গালে আদর করে বললেন - "ওখানে সব ঠিক আছে?"
“হ্যাঁ ..... সব ঠিক আছে, শান্তা
বুয়াও ভালো আছে, সুগনা কাকার স্বাস্থ্যও ভালো। ৬ বছর
আগে যা দেখেছিলাম তেমন কিছুই বদলায়নি, সব একই রকম।” নিক্কি একে একে সবার অবস্থা বলতে
লাগলো - "শুধু চিন্টু বদলে গেছে। আগে নাক দিয়ে পানি পড়ত আর টুকটাক কথা বলত, এখন
কাউকে কথা বলতে দেয় না।” এই বলে নিক্কি চুপ হয়ে গেল।
“যাক, ভালই
হয়েছে, তুমি তাদের সাথে দেখা করে এসেছ।” ঠাকুর সাহেব আদর করে বললেন- "এখন
এসো আমরা বাকি কথা খাবার টেবিলে করব।"
নিক্কি হেসে খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর তার
চেয়ার টেনে বসল।
“সঞ্জয়” ঠাকুর সাহেব কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একজন
চাকরকে বললেন - "রবিকে নিয়ে এসো। তাকে বলো আমরা খাবার টেবিলে তার জন্য
অপেক্ষা করছি।"
“জি মালিক।” সঞ্জয় রবির ঘরের দিকে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রবিকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেল।
ডাইনিং টেবিলের কাছে এসে ঠাকুর সাহেবকে প্রণাম করে হাসিমুখে, তারপর
নিক্কির দিকে তাকিয়ে ওকে হ্যালো বলে চেয়ারে বসলেন।
নিক্কি তার হ্যালোর উত্তর দিতে আগ্রহী ছিল না। কিন্তু ঠাকুর
সাহেবের উপস্থিতির কারনে তাকে জোর করে হ্যালো বলতে হলো।
চাকররা থালায় খাবার বেরে দেয়ার পর তিনজনই খেতে ব্যস্ত
হয়ে পড়ল। ঠাকুর সাহেব শুধু নামেই খেলেন। কিন্তু খাওয়ার ব্যাপারে আপোষ করেনি
রবি।
“তোমার কি এখানে ভালো লাগছে, রবি?” খাওয়ার
মাঝখানে ঠাকুর সাহেব রবিকে জিজ্ঞেস করলেন।
রবি প্লেট থেকে সরে গিয়ে ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকাল, তারপর
মুচকি হেসে বলল - "কেন ঠাকুর সাহেব ভাল লাগবে না। এখানকার পরিবেশ যে কারো মন
কেড়ে নেবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে রাঙানো এই জায়গাটা। আর আমি একজন প্রকৃতি প্রেমী।” এই বলে রবি নিক্কির দিকে তাকাল। তারপর আরও বলে- "শহরের কৃত্রিম
সৌন্দর্যের চেয়ে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমার বেশি ভালো লাগে।"
রবির কথার মর্ম বুঝতে পেরে নিক্কির মুখ রাগে জ্বলে উঠল।
কিন্তু তার বাবাকে খেয়াল করে নিয়ে সে দ্রুত তার রাগ নিয়ন্ত্রণ করে।
“হুম ... ঠিক বলেছ।” ঠাকুর সাহেব রবির কথায় সায় দিয়ে
বললেন - "আমাদেরও এই জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে। তাই এখানে এসে বসতি স্থাপন
করেছি।"
“তাহলে কি ... এটা কি আপনা
পূর্বপুরুষদের জায়গা নয়?” কৌতুহল
নিয়ে জিজ্ঞেস করল রবি।
“না ...!” ঠাকুর
সাহেব বললেন- "আমরা বেনারসের বাসিন্দা। আমাদের বাপ-দাদার জমি এখনও আছে। এখানে
একবার এসেছি কোনো কাজে। আমাদের এই জায়গাটা ভালো লেগেছিল এবং আমরা এখানে জমি
কিনেছিলাম। তারপর এই অট্টালিকা তৈরি করি।” প্রাসাদের কথা বলতে বলতে ঠাকুর
সাহেবের মুখ বিষণ্ণ হয়ে উঠল। তবে এর কারণ জানতে চায়নি রবি। এবং নিক্কিও করেনি।
একবার রবির মনে এলো যে সে এর কারণ জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু
এই সময়ে সে এই প্রশ্ন করা সঙ্গত মনে করল না। খাবারের মাঝখানে দুঃখের কথা জিজ্ঞাসা
করা উচিত নয়। কিন্তু রবির মনে এমন কিছু প্রশ্ন ছিল যার উত্তর একমাত্র ঠাকুর সাহেবই
দিতে পারেন। এমনকি রাধা দেবীর অসুস্থতার বিষয়ে তাকে যা বলা হয়েছিল তাও তার কাছে
গ্রহণযোগ্য ছিল না।
ঠাকুর সাহেব তাকে বলেছিলেন যে একদিন রাধা গর্ভবতী
হওয়ার সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পিছলে পড়েছিলেন। যার জেরে রাধা দেবীকে
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই একই হাসপাতালে দিওয়ান জির স্ত্রীও সন্তান
প্রসবের জন্য ভরতি ছিলেন। এবং দুর্ভাগ্যবশত উভয়ই একই দিনে ভর্তি হয়েছিল। ওই দিন
দিওয়ান জির স্ত্রী একটি মৃত কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। নার্স যখন এই খবর নিয়ে এসে শিশুটির মৃত্যুর কথা
জানায়, তখন রাধার মনে হয়েছিল যে তার মেয়েটি পড়ে
যাওয়ার কারণে মারা গেছে। সে সেই জিনিসটা সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য
হারিয়ে ফেলে।
যখন সে তার চিন্তা থেকে বেরিয়ে এল, দেখল
যে নিক্কি তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাবারের প্লেটে চোখ
স্থির করল।
কিছুক্ষণ পর সবাই খাবার টেবিল থেকে উঠে নিজ নিজ রুমের
দিকে চলে গেল।
বেলা ১১ টা বাজে।
শান্তা নদীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাঞ্চন ও চিন্টু এ সময় স্কুলে গেছে।
সুগনা তার ক্ষেতে কাজ করতে গেছে। শান্তা ঘরে একা বসে না থেকে নদীতে গিয়ে গোসল
করাই ভালো ভাবল। সে তার পরনের জামা কাপড় বের করে বাইরে থেকে ঘর তালা দিয়ে নদীর
পাড়ে চলে গেল।
গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই নদীতে গোসল করত। নদীতে
মহিলাদের জন্য আলাদা এবং পুরুষদের জন্য আলাদা ঘাট ছিল। পুরুষরা মহিলা ঘাটের দিকে
যায় না আর মহিলারা পুরুষদের ঘাটে যায় না।
শান্তা বসতি ছেড়ে কিছুদূর হাঁটতেই পিছন থেকে কে যেন
নাম ধরে ডাক দিল- "আরে ও শান্তা, একটু আস্তে
চল..... আমিও আসছি।"
শান্তা ঘুরে দেখল সুন্দরী দ্রুত এগোচ্ছে।
“আরে, সুন্দরী
ভাবী। তাড়াতাড়ি আমি দাঁড়িয়ে আছি।” সুন্দরীর কাছে আসতেই শান্তা সুন্দরীর
সাথে কথা বলে।
“আরে বোন, তুমি
জানো না ... আমি একা চলতে কত ভয় পাই।” সুন্দরী বলল। “তখন
থেকে ভাবছিলাম নদীর ধারে যাই, কিন্তু কোন
সঙ্গী পাচ্ছিলাম না। তোমাকে যেতে দেখেই দৌড়ে এসেছি।"
“ভাবী এখন তো দিন ... তুমি কি
দিনের আলোতেও ভয় পাচ্ছ?” শান্তা হেসে বলল আস্তে আস্তে পা
বাড়াতে লাগলো।
২২
সুন্দরীও পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকে।
“আমি একাকীত্বকে ভয় পাই, দিন
বা রাতে নয় পাগলি।” সুন্দরী হেসে বলল।
“বুঝলাম না ভাবী, তুমি
কি বলতে চাও?” শান্তা একটু অবাক হয়ে বলল।
“দিদি, আমার
মত তোমারও একই কাহিনী। তবুও তুমি বুঝ না?” সুন্দরী
অবাক হয়ে বলল।
“তুমি আমাকে নিয়ে মজা করছ কেন ভাবী?” সুন্দরীর
হাসিখুশি জীবনকে তার বর্ণহীন জীবনের সাথে তুলনা করা হলে সে আহত হয়ে বললো-
"তোমার সব আছে। মুখিয়া দাদার মতো স্নেহময়ী স্বামী, তোমার
বড় ঘর, অনিতার মতো সুন্দরী ও ভদ্র মেয়ে পেয়েছ। আর কি চাও তুমি?"
“আমি একই জিনিস মিস করি দিদি, তুমি
যা মিস কর।” সুন্দরী হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললো- "হ্যাঁ দিদি, সব
কিছুর পরও আমার কিছু নেই। আমার স্বামী আছে, কিন্তু শুধু
লোক দেখানোর জন্য। আমার একটি মেয়ে আছে তবুও আমাকে বন্ধ্যা বলা হয়।” এই বলে সুন্দরী কেঁদে ফেলল।
“তাহলে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছ না
কেন?” শান্তা আবেগে কথা বলে।
“ডাক্তার কি করবেন দিদি? যখন
বীজই বোনা হয় না, ফল আসবে কোথা থেকে।"
“তাহলে সমস্যা কি...?” শান্তা
কথার থেমে গেল।
“তাদের মধ্যে কোন দোষ নেই, দিদি।
যদিও তারা গ্রাম জুড়ে খুব বীরের মত হাঁটে, কিন্তু
বিছানায় আসার সাথে সাথে তারা আলগা হয়ে যায়।” চোখের জল মুছতে মুছতে বলল সুন্দরী। “আমার
আর তোমার মধ্যে পার্থক্য একটাই যে আমার স্বামী আমার সাথে থাকে আর তোমার স্বামী
তোমার থেকে দূরে।”
“তাহলে এখনে বিয়ে করেছো কেন...?” শান্তার
চোখ ভিজে উঠল। তার দুঃখে সে তার দুঃখের প্রতিফলন দেখতে পেল। “এখন পর্যন্ত কিভাবে আছো ভাবী?"
“না ...দিদি, আমি
এত সহনশীল মহিলা নই।” সুন্দরী শান্তাকে বললো - "বিয়ের
এক বছর ধরে আমি কষ্ট পাচ্ছিলাম। কিন্তু কতদিন ....? সেই দিনগুলোতে বীরজুকে মুখিয়া
জি নতুন কাজে নিয়োগ দিয়েছিল। একদিন কোনো অজুহাতে তাকে বাড়ির ভেতরে ডেকে নিয়েছি।
সেও আনন্দেই করেছে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত সে আমার শরীর শান্ত করছে।
সুন্দরীর এই খোলামেলা প্রকাশে শান্তা হতবাক। তার ওঠার
ধাপগুলো মাটিতে আটকে গেল। মুখের উপর হাত রেখে সুন্দরীর দিকে বিস্ময়ের মত দেখতে
লাগলো।
তাকে অবাক হতে দেখে তার পাও থেমে গেল। কিন্তু তার মনে
কোনো লজ্জা ছিল না। সে মৃদু হাসল। তারপর বললো- "আমি আর কি করবো। তাদের নিয়ে
চিন্তা করবো কেন যারা আমার দুঃখের কারন। আমার বাবা কি আমাকে বিয়ে দেয়ার আগে
ভেবেছিল এই সম্পর্ক নিয়ে আমার মেয়ের জীবন সুখের হবে কি না। আমার স্বামী কখনো
ভেবেছিলেন তার অর্ধেক বয়সের মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে এনে তাকে খুশি রাখতে পারবে
কিনা? সখি, না আমার বাবা আমার সুখের কথা ভেবেছিল
না আমার স্বামী। বাবার মাথার বোঝা ঝেড়ে ফেলতে হবে, তাই
ঝেড়ে ফেললেন। নববধূকে গ্রহণ করলেন স্বামী।
একটু ভাব দিদি, ৩৫ বছরের
মহিলা যদি ২০ বছরের ছেলেকে বিয়ে করে, তাহলে লোকে
বলবে এই বয়সে সে কেমন মহিলা যে দেহের মজা নিতে গেছে। এমন জঘন্য কাজ শুধু একজন
পতিতাই করে, এ নারীর নামে কলঙ্ক, নারী
নয়, এমন নারীর ছায়া থেকে দূরে থাকা উচিত। কিন্তু একজন
পুরুষ যদি একই কাজ করে, তখন লোকে বলে, বাহ, কী
লোক, এই বয়সেও যুবতী বউ আনতে পেরেছে। তাহলে সমাজে তার
মর্যাদা আরও বাড়বে, স্ত্রী হয়তো বিছানায় কয়লার ওপর
শুয়ে থাকবে। কিন্তু তারা গোঁফ তুলে বাইরে ঘুরে বেড়ায়।
শুধু নিজের কথা ভাব....! তোমার স্বামী তোমাকে ছেড়ে চলে
গেছে, ওখানে কি করে জানি না। কখনো এই মেয়ের সাথে ঘুমায়
আবার কখনো অন্য কারো সাথে। আর না জানি কত বেজন্মা বেড়ে উঠছে।
কিন্তু যেদিন সে ফিরে আসবে। তুমিও জিজ্ঞেস করবে না কার
সাথে এত দিন ঘুমিয়েছিলে, কার সাথে জেগেছিলে। আর এই সমাজও
জিজ্ঞেস করবে না। কিন্তু তুমি যদি একই কাজ কর, তাহলে
হাজার মানুষ একসাথে প্রশ্ন করবে। স্বামী তোমাকে ঘর থেকে বের করে দেবে। পুরো সমাজে
তোমাকে কলংকিত করা হবে। কারণ তুমি একজন নারী।"
শান্তা কিছু বলল না। সে নীরবে সুন্দরীর কথাগুলো সত্যের
দাঁড়িপাল্লায় ওজন করতে থাকে। সুন্দরীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিটি শব্দের
মধ্যে সত্য লুকিয়ে ছিল। সে সুন্দরীর প্রতি সহানুভূতি অনুভব করে।
“বলো, আমি
যদি মিথ্যা বলি, আমার মাথায় তোমার চপ্পল মার।” তাকে চুপ থাকতে দেখে সুন্দরী আরও
বললো- "আমি এইসব পুরুষদের কেয়ার করা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন ফলাফল যাই হোক না
কেন, আমি পাত্তা দিচ্ছি না। আমি আমার জীবন যাপন করছি
এবং এভাবেই বাঁচব।"
“কিন্তু দাদার কিছু সীমাবদ্ধতা
আছে?” শান্তা মনের মধ্যে জেগে উঠা প্রশ্নটা
সুন্দরীর সামনে রাখল।
“এগুলিও পুরুষদের দ্বারা তৈরি।” উত্তরে সুন্দরী বললো- "দিদি, আমাদের
বাধ্যতা হল আমরা পুরুষদের এতটাই ভয় পাই যে আমরা আমাদের সুখের কথা কম চিন্তা করি
এবং তাদের সম্মানের কথা বেশি চিন্তা করি। সত্যি বলতে, আমরা
নিজেদের জন্য বাঁচি না। আমাদের সুখও তাদের ইচ্ছায়। আমরা দাসী এবং আমাদের সম্মানও
তাদের সম্পত্তি। আমাদের নিজেদের কিছু নেই। না এই সমাজ,না
এই ঘর.....! আমরা শুধুই বস্তু। যখন আমাদের যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারে।
সত্যি বলছি দিদি, আজ মুখিয়া
জির চেয়ে বিরজুকে আমার বেশি শ্রদ্ধা। কারণ এখন পর্যন্ত যা কিছু সুখ পেয়েছি, বিরজুর
কাছ থেকে পেয়েছি, কোন দুঃখ পাইনি। আমি বলি তুমিও কারো
হাত ধরো। তোমার যৌবন নষ্ট করছ কেন? তোমার মধ্যে
এখনও অনেক মোহনীয়তা বাকি, এটি যে কোনও
মানুষের মনকে নাড়া দিতে পারে।”
“না ভাবী।” শান্তা সুন্দরীর কথায় আতঙ্কিত হয়ে
বললো - "এ সব আমার দ্বারা হবে না। এখন সামান্য জীবনই বাকি আছে, এভাবেই
কাটাবো।"
“শান্তা কেন সেই মাতালের
অপেক্ষায় তোমার যৌবন নষ্ট করছ। তার অপেক্ষা ছেড়ে কারো হাত ধরো, আমি
তোমাকে আবার বিয়ে করতে বলছি না, শুধু কারো
কোলে বন্দী হয়ে সুখ উপভোগ করার কথা বলছি। সত্যি করে বলো, তুমি
চাও না কেউ তোমাকে ভালোবাসুক, তোমার এই
সুন্দর ঠোঁটের রস পান করুক, কেউ তোমার এই
নাজুক অংশে হাত রাখুক।” এই বলে সুন্দরী এক হাতে তার স্তন টিপে
দিল।
“ভাবী ... কি করছো?” শান্তা
মাথা নেড়ে সরে গেল। সুন্দরীর ছোঁয়ায় তার সারা শরীর যেন এক আভায় ভরে গেল।
উত্তেজনায় তার চোখ ভারী হয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে শান্ত গলায় বললো-
"আমার স্বপ্ন জাগিও না, ভাবী, আমি
অপবাদে ভয় পাই। তুমি যা পারবে আমি তা পারবো না।"
“দিদি, একদিনের
অপবাদের ভয়ে কেন সারা জীবন নরক বানিয়ে ফেলছ। তোমার বয়স এখন কত? তুমি
এখনো অনেক মজা করতে পারো। সংসারের যত্ন বাদ দাও..... তোমার জীবন যাপন করো। যদি
তুমি বলো, আমি তোমাকে সাহায্য করি। বিরজু খুব
শক্তিশালী একজন মানুষ। তার পুরুষালি অংশটা খুবই দর্শনীয়।” সুন্দরী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার
বললো- "কি নিষ্ঠুরভাবে যে বিছানায় ঘষে, সত্যি
বলছি, যখন সে গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন
আমি পৃথিবী ভুলে যাই। একবার তার সেবা নিয়ে দেখো... কিভাবে তোমার বছরের তৃষ্ণা মেটে?
নেশায় শান্তার চোখ লাল হয়ে গেল। শরীরে লালসা রক্তের
মতো বয়ে গেল। শরীর এত গরম হয়ে গেল যে ওর যোনি ভিজে গেল। সুন্দরীর কথায় বিরজুর
শক্ত শরীর একসময় ভাবনায় ভেসে ওঠে। তার মনে হল যেন বিরজুর হাত সেই স্তনের উপর
হামাগুড়ি দিচ্ছে যা কিছুক্ষণ আগে সুন্দরী টিপেছিল। এই অনুভূতি তার চিন্তাকে আরও
গভীর করে তুলেছে… এখন তার মনে
হতে লাগল যেন বিরজুর হাত তার সারা শরীরে স্পর্শ করছে, কখনো
সে বিরজুর শক্ত হাতের স্পর্শ অনুভব করে তার স্তনে আবার কখনো তার পাছায় তার হাত।
মাঝে মাঝে সে অনুভব করে যে বিরজু তাকে বাহুতে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁট চুষছে।
২৩
শান্তা মনের থেকে বিরজুর চিন্তাগুলোকে ছুড়ে ফেলার
আপ্রাণ চেষ্টা করল। কিন্তু বিরজু তার মন কেড়ে নিচ্ছিল। শান্তা তার ভারী চোখের
পাতা খুলে সুন্দরী দিকে তাকাল। সে মৃদু হাসছিল।
“কি হয়েছে দিদি, হঠাৎ
চুপ হয়ে গেলে কেন?” শান্তার মুখের বদলে যাওয়া
অভিব্যক্তির দিকে তাকিয়ে কথা বলল সুন্দরী।
“কিছু না ভাবী।” শান্তা আস্তে আস্তে বলে কাঁপা কাঁপা
পায়ে নদীর দিকে এগিয়ে গেল।
সুন্দরীও তার সাথে বহমান নদীর দিকে এগোতে থাকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দুইজনে নদীতে পৌঁছে গেল। সারাটা পথ ধরে সুন্দরী শান্তার সাথে
একই বিষয়ে কথা বলতে থাকে, আর তার
ঘুমন্ত স্বপ্নগুলোকে জাগিয়ে তুলতে থাকে। কিন্তু নদীর ধারে পৌঁছতেই তাকে চুপ করে
যেতে হলো। কারণ নদীতে আগে থেকেই কিছু মহিলা উপস্থিত ছিলেন। আর সে চায়নি যে তাদের
কথা অন্য কেউ শুনুক।
সুন্দরী চুপ করে গেলেও শান্তার মনে ঝড় ওঠে। যে আগুন
শান্তা ১০ বছর ধরে দমন করেছিল, আজ সুন্দরী
তা জাগিয়ে দিয়েছে। শান্তার মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। এমনকি গোসল করার সময়, সে
সুন্দরীর বলা কথা নিয়ে চিন্তা করতে থাকে।
ঠাকুর জগৎ সিং তার ঘরে বসে দিওয়ান জির অপেক্ষায়
ছিলেন। ৫ মিনিট আগে মঙ্গল্লুকে তার বাসায় ডেকে পাঠায়। তার মুখে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু
দুশ্চিন্তা বিন্দুমাত্রও ছিল না। সে চেয়ার থেকে উঠে একটা সিগার জ্বালিয়ে জানালার
কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল।
চুরুটটায় একটা লম্বা টান দিতেই দিওয়ান জি দরজা দিয়ে
ঢুকলেন। পায়ের শব্দে ঠাকুর সাহেব ঘুরে দাঁড়ালেন। দিওয়ান জিকে দেখে তাঁর চেয়ারে
ফিরে এসে বসলেন।
দিওয়ান জি তখনও দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠাকুর সাহেব চেয়ারে
বসার সাথে সাথেই দিওয়ান জি তাকে বললেন - "কোন চিন্তা সরকার?"
“না দিওয়ান জি। ভগবানের ইচ্ছায়
যখন থেকে রবি এসেছে, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। আমি আপনার সাথে
একটি ভাল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে চাই।"
দিওয়ানজি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে
রইলেন। তার বোঝার কিছু ছিল না।
“আপনি বসুন।” ঠাকুর সাহেব চেয়ারের দিকে ইশারা করে
দিওয়ান জিকে বসতে বললেন।
দিওয়ান জি তার কাছে থাকা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন। -
" বলুন, সরকার। আদেশ দিন।"
“আদেশ না দিওয়ান জি, আমি
আপনার রায় জানতে চাই।” ঠাকুর
সাহেব চুরুটের শেষ পাফটা নিয়ে এসট্রেতে নিভিয়ে দিয়ে বললেন- রবিকে আপনার কেমন
লাগে?
“রবি?” দিওয়ানজি অবাক হয়ে বললেন -
"কিসের কথা জিজ্ঞেস করছেন?"
“নিক্কি সম্পর্কে।” ঠাকুর সাহেব দিওয়ান জির সামনে মনের
কথা ব্যক্ত করলেন - "আমাদের নিক্কির জন্য রবি কেমন হবে? তার
বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথা নেই, সে
একজন ডাক্তার এবং ভালো ভদ্র ছেলে। এটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।"
“সরকার, আপনি
আমার মনের কথা বলেছেন।” দেওয়ান জি খুশিতে কিচিরমিচির করে
বললেন - "আমি রবিকে সেদিনই পছন্দ করেছিলাম যেদিন দিল্লিতে তার সাথে দেখা
হয়েছিল। নিক্কি আর রবির জুটি লাখে এক হবে। একটুও দেরি করবেন না। এই বিষয়ে আজই
রবির সাথে কথা বলুন।”
“আচ্ছা, সন্ধ্যেবেলা, চলুন
রবি আর নিক্কিকে বসিয়ে দুজনের ইচ্ছা জেনে নিই।” ঠাকুর সাহেব আবার চুরুটের দিকে হাত
বাড়িয়ে বললেন।
“জো হুকুম।”দিওয়ান
উঠে বলল।
তারপর ঠাকুর সাহেবের অনুমতি নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে
এলেন। দরজার বাইরে যেতেই তার চোখ নিক্কির সাথে আঘাত করে। সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে
দিওয়ান জি আর ঠাকুর সাহেবের কথা শুনছিল।
সে ঠাকুর সাহেবের কাছে কোনো কাজে আসছিল এমন সময় দরজার
বাইরে থেকে ঠাকুর সাহেবকে নিজের সম্পর্কে এবং রবির সম্পর্কে কিছু বলতে শুনে দরজার
বাইরে আটকে গেল। তারপর কিছুক্ষণ ওই অবস্থায় থেকে সব কথা শোনে। এখন যখন দিওয়ান জি
তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, সে সাথে সাথে
লজ্জা পেয়ে দ্রুত তার ঘরের দিকে ছুটে যায়।
নিক্কি যে এই সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত তা বুঝতে দেওয়ান
জির সময় লাগেনি। সে হাসিমুখে তার পথে চলে গেল।
নিক্কি সোজা নিজের রুমে এসে বিছানায় পড়ে গেল। তারপর
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বাবা ও দিওয়ান জির মুখে শোনা কথাগুলো মনে করতে লাগলো।
সে খুশি ছিল, কিন্তু সে কেন খুশি তা বুঝতে পারল না। যার কাছ থেকে সে তার অবজ্ঞার
প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল সেই ব্যক্তির সাথে তার বিয়ের কথা শুনে তার হৃদয় কেন এত
খুশি? সে রবিকে অপমান করতে চেয়েছিল, তাহলে
আজ কেন তাকে তার দাবিতে সাজানোর কথা ভাবছে? হয়ত রবির
ভালো লাগাই নিক্কির মন থেকে সব ময়লা দূর করে দিয়েছিল। নিক্কির মন আগেই জেনেছিল
রবি লাখে একজন। যে ব্যক্তি তার নগ্ন দেহ ত্যাগ করে সে সাধারণ মানুষ হতে পারে না।
রবির এই ভালো লাগাই ছিল তার সুখের কারণ। রবির মতো একজন ভদ্রলোক তার স্বামী হতে
যাচ্ছে বলে সে খুশিই বোধ করছিল।
রবিকে নিজের ভাবনায় স্থির করে নিক্কি মনে মনে হাসল
তারপর মনে মনে বলল- "এখন বলুন মিস্টার রবি, আমার
কাছ থেকে পালিয়ে কোথায় যাবেন? এখন আমি এমন
একটা বাঁধন বাঁধতে যাচ্ছি যে সারাজীবন আমার সাথে থাকতে হবে। তাহলে দেখ কিভাবে
প্রতিশোধ নেব আমি তোমার কাছ থেকে। তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছো।
মুহুর্তে তার মাথায় একটা চিন্তা এলো, এখনই
তার রুমে গিয়ে তাকে এই সম্পর্কের কথা বলি না কেন। তাকে একটু উত্যক্ত করা যাক।
মেয়েটা হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর রবির ঘরের
দিকে পা বাড়াতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে রবির ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে। সে শুধু
দরজায় টোকা দিতে যাবে তখন তার চোখ দরজার ল্যাচের দিকে যায় যা বাইরে থেকে বন্ধ।
দরজা বন্ধ দেখে নিক্কির কপালে একটা বলিরেখা ফুটে উঠল।
ঘড়িতে সময় দেখল। সময় তখন ৫ টা।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবল, তারপর সিঁড়ি
বেয়ে হলের দিকে এল। সে একজন চাকরকে রবির কথা জিজ্ঞেস করে জানতে পারল সে তার বাইকে
করে কোথাও গেছে।
নিক্কি চিন্তায় পড়ে গেল। কয়েকদিন ধরে সে লক্ষ্য
করছিল যে রবি ঘনঘন সন্ধ্যায় প্রাসাদের বাইরে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু তিনি কোথায়
যেতেন, কেন যেতেন তা কখনো জানার চেষ্টা করেনি। কিন্তু কেন
জানি আজ তার মনে একটা অজানা সন্দেহ ঘুরপাক খাচ্ছিল।
সে অস্থিরভাবে হলের মধ্যে পায়চারি করতে করতে একটাই কথা
ভাবছিল- ' রবির কি কোনো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক
আছে? কিন্তু কি দরকার? তার
যদি সত্যিই একজন মেয়ের অভাব অনুভব করত তবে তো সে আমার কাছেই আসত। আমি তো সব সময়
তাকে দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য কোথাও ঘুরতে হবে কেন
তার?
“কিছু একটা আছে, নিক্কি।” মনটা মৃদুভাবে কেঁপে উঠল। “মেজাজ আর আবহাওয়া বদলাতে বেশি সময়
লাগে না। তুমি এভাবে চোখ বন্ধ করে থাকো, পাছে পাখি
অন্য কোথাও দানা খায়। সন্ধ্যাবেলা কোথায় যায় তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে। এমনও হতে
পরে যে সে তোমার সামনে সন্ন্যাসী হওয়ার ভান করে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, গ্রামের
ফুলের রস চুষে খায়।”
এই ভেবে নিক্কির মুখ শক্ত হয়ে গেল। মেয়েটি দ্রুত
প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এল। তারপর তার জিপে বসে জীপটিকে উপত্যকার দিকে ছুটাল।
২৪
পঁচিশ মিনিট ধরে ঝর্নার কাছে পাথরের ওপর বসে কাঞ্চনের
জন্য অপেক্ষা করছিল রবি।
গতকাল সে এই জায়গায় তার সাথে দেখা করবে বলে গিয়েছিল।
কিন্তু কাঞ্চনের অপেক্ষায় আধঘণ্টা পার হয়ে গেলেও সে এখনও আসেনি।
রবি পেঁচার মতো তাকিয়ে ছিল বহমান ঝর্নার দিকে। কখনো
রোমিও, কখনো ফরহাদ আবার কখনো মজনু আর রাঞ্জার অদেখা ছবি
তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই জন্য না যে সে নিজেকে সেই মহান প্রেমিকদের সাথে তুলনা
করছিল, কিন্তু কারণ আজ সে সত্যিই তাদের ব্যথা অনুভব
করেছিল।
আজ সে বুঝতে পারছে বিচ্ছেদ কাকে বলে? একাকীত্বে
বসে নিজের প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করা কেমন? আজ সে জানতে
পেরেছিল যে প্রেমিকদের জামা ছিঁড়ে কেন? কেন পাগলের
মত রাস্তায় ঘুরে বেড়াও? একা একা বসে পাথরে মাথা ঠুকে কেন? কারণ
আজ সেও প্রেমে পড়েছে। আজ সেও কারো জন্য অপেক্ষা করছে।
বই, চলচ্চিত্র
এবং বন্ধুদের কাছ থেকে এই মহান প্রেমিকদের সম্পর্কে অনেক দেখেছে এবং শুনেছে। কিন্তু কখনো অনুভব করতে পারেনি তাদের
সত্যিকারের ভালোবাসার আকুলতা। তাদের কেমন লাগতো? জ্বাল
ছাড়া যেমন জ্বলে না। তেমনি ভালবাসার আকাঙ্ক্ষা ছাড়া ভালবাসা উপলব্ধি হয় না। এ
বিষয়ে কোনো এক কবি বলেছেনঃ
“খালিশ দরদ-ই-মহব্বতেরও
একই অনুভূতি।
যারা কাউকে নিজের থেকে বেশি ভালোবাসে।"
আজ তাকেও সেই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। সে কখনো পাথরের
উপর বসে চুল টানছিল, আবার কখনো বিরক্তি নিয়ে ফিরে
তাকাচ্ছিল।
এবারও বিরক্তিতে ঘাড় ফেরানোর সাথে সাথে তার চোখ আনন্দে
চকচক করে উঠল। পাথর থেকে পড়ে যাওয়া বাঁচাতে বাঁচাতে কাঞ্চনকে আসতে দেখে। সে
খুশিতে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকাতে লাগল।
কাঞ্চনের পরনে ছিল নীল সালোয়ার কামিজ। ওই পোশাকে তাকে
খুব সুন্দর লাগছিল। স্কার্ফটা গলায় পেঁচিয়ে পেছনে ঝুলছিল। টাইট কুর্তিতে তার
পাহাড়ের চূড়াগুলোর আকার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কাঞ্চন এসে রবির পাশে দাঁড়াল।
তারপর রবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“কয়টা বাজে?” কাঞ্চনকে
হাতের কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল রবি। “আমি
গত আধাঘন্টা ধরে পাগলের মত বসে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। তুমি আমাকে পাত্তা দিলে
না। এটাই কি তোমার ভালোবাসা।” না চাইলেও রবির কথায় রাগ ফুটে উঠে।
রবির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কড়া কথায় কাঞ্চন স্তব্ধ
হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে সে এখানে এসেই তার
কাছ থেকে এমন তিরস্কার শুনতে পাবে। ঘর থেকে বের হতে হতে তার মনে হাজারো আশা, পথ
জুড়ে কিচিরমিচির, মনে হাজারো ইচ্ছা এসে ভর করেছিল। কিন্তু এখানে আসার সাথে সাথে তার
মনের মধ্যে ফুটে থাকা স্বপ্নের সব ফুল নিমেষে শুকিয়ে গেল। সে নীচু স্বরে রবির
সাথে কথা বলল - "ভুল হয়েছে স্যার। আমাকে ক্ষমা করবেন। বুয়া আমাকে একটা কাজে আটকে
দিয়েছিলেন।” এই বলে লজ্জায় কাঞ্চনের ঘাড় নিচু হয়ে গেল।
কাঞ্চনের ছিন্নভিন্ন মুখ দেখে রবি তার ভুল বুঝতে পারল।
তার সমস্ত রাগ এক নিমিষেই উবে গেল। কারণ না জেনেই কাঞ্চনকে বকাঝকা করেছে এই ভেবে
তার মনটা অপরাধবোধে ভরে গেল।
সে ধীরে ধীরে কাঞ্চনের কাছে এল। কাঞ্চন তখনও ঘাড় নিচু
করে দাঁড়িয়ে আছে।
সে তার হাত দিয়ে তার চিবুক স্পর্শ করে তার মুখ তুলল।
কাঞ্চনের চোখ ভিজে গেল। তার চোখের পাতার মাঝে দুটি মুক্তোর মতো ফোঁটা জ্বলে উঠে।
ওর চোখে জল দেখে রবির নিজের উপর রাগ হল। তার এই ভুলের জন্য এখন পাথরে মাথা ঠুকতে
ই্চ্ছে করছে। সে এত অবিবেচক হল কিভাবে? চোখের জল মুছিয়ে
দিয়ে বললো “আমাকে
মাফ করে দাও কাঞ্চন, আমি আর কখনো তোমার উপর রাগ করব না।
কথা দিলাম। তুমি চাইলে আমি কান ধরে উঠ বস করতে পারি এই ভুলের জন্য। কিন্তু প্লিজ
আমাকে ক্ষমা করে দাও আর একবার ভালোবেসে হাসো। "
রবির কথাগুলো শুনে সত্যি হাসল কাঞ্চন। তার ভিতরকার সব
কষ্ট এক নিমিষেই দূর হয়ে গেল। পলকহীন চোখে রবির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে
অনুনয়ের সুরে বলল - "স্যার, আমাকে কোনদিন
কষ্ট দিবেন না, কখনো আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না।
আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না।"
“আমিও কি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে
পারব?” এই বলে রবি ওর কপালে চুমু দিল। “এসো...ওখানে
বসি।"
রবি তার বাম দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিশাল গাছের দিকে
ইশারা করে তারপর কাঞ্চনের হাত ধরে সেদিকে বাড়তে থাকে। গাছের নিচে একটা বড় সমতল
পাথর পড়ে ছিল। পাথরটি এত বড় যে ৩ জন মানুষ আরামে ঘুমাতে পারে। পাথর থেকে দুই কদম
এগিয়েই ছিল গভীর খাদ। রবি গাছের গোড়ায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইল। কাঞ্চন তার একটু
সামনে বসে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা ফুলের উপত্যকার দিকে তাকাতে লাগল।
যদিও কাঞ্চন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগেই দেখেছে। কিন্তু
আজ তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল পার্থক্য। আজ সে দেখতে পেল ভালোবাসার রঙ মিশে আছে এই
সুন্দর মোকদ্দমায়। সে যেদিকেই তাকালো দেখতে পেল সব গাছ, পাতা, চারাগাছ, ফুল
তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সূর্য ছিল দিগন্তের দিকে। বায়ুমণ্ডলে লালচে ভাব
ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার লালে আরও সুন্দর হয়ে উঠছিল এই উপত্যকা। সব কিছু দেখতে
দেখতে হারিয়ে গেল কাঞ্চন। কখন যে তার পিছনে বসে রবি তাকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে
সেটা সে নিজেও জানে না।
রবিও তার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে গিয়েছিল।
তারপর কাঞ্চন ওর দিকে ফিরল। রবিকে এভাবে দেখে তার চোখে লজ্জা ফুটে উঠল, সে
মৃদু লজ্জিত হয়ে বলল - "কি দেখছেন স্যার?"
“তুমি যা দেখছিলে তাই।” রবি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আমি তো এই উপত্যকার সৌন্দর্য
দেখছিলাম।” কাঞ্চন মুচকি হেসে বলল- "কিন্তু আপনি তো...!” কথা অসম্পূর্ণ রেখে চোখ নামিয়ে
নিলেন।
“তো কি ভুল বললাম। আমিও
সৌন্দর্যই খুঁজছিলাম।"
“ধাত...!”
কাঞ্চন লজ্জা পেল।
“সত্যি বলছি কাঞ্চন। সারা
পৃথিবীতে তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে আর নেই।” রবি তার সৌন্দর্যে হারিয়ে গিয়ে বলল।
“আপনি এক নম্বর মিথ্যাবাদী।” কাঞ্চন তার সুন্দর চোখ রবির মুখের
দিকে রেখে বললো- "আমি জানি আমি খুব সুন্দরী নই। আমি নিক্কির মতো সুন্দর নই।
আর শহরে নিশ্চয়ই আমার থেকে আরো অনেক সুন্দরী মেয়েরা থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় আপনি
শহরের লোক। আপনি ফিরে গিয়ে আমাকে ভুলে যাবেন।"
“আহহহ ... কি বললে কাঞ্চন? কেন
ভাবছো আমি তোমাকে ছেড়ে যাব?” রবি
সরে ওর কাছে গিয়ে বললো- "তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না? যদি
তাই হয়, তাহলে তোমাকে আমার বউ না করা পর্যন্ত
আমি শহরে যাব না। তোমাকে বিয়ে করার পর তোমাকে নিয়ে শহরে যাবো।”
“কিন্তু আপনার মা? তাকে ছাড়া বিয়ে করবেন?”
“আমি আমার মাকে এখানে ডাকব।” রবি ওর গাল চেপে ধরে বলল।
রবির কথায় কাঞ্চনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। রবির কাঁধে
মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।
রবি এক হাতে কাঞ্চনের কাঁধ ধরে অন্য হাতে চুলে আদর করতে
থাকে। সে তার যৌবনের শুরুর মুহূর্তগুলি মনে করতে শুরু করে যখন তার বন্ধুরা তাকে
নিয়ে মজা করত। সে তার একাকীত্ব নিয়ে কতটা আতঙ্কিত ছিল। তখন সে কখনো ভাবেনি যে
একটা মেয়েও তাকে ভালোবাসতে পারে। কেউ তার প্রতিও আসক্ত হতে পারে। কিন্তু আজ ভাগ্য
তাকে কাঞ্চনের সাথে মিশিয়ে দিয়ে তার সব অভিযোগ দূর করে দিয়েছে। মাঝে মাঝে তার
মনে হয় সে গভীর ঘুমে আছে, এখন তার চোখ
খুলবে এবং সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি কাঞ্চনের প্রেমে পড়েছিলেন। নিজেকে তার ভালোবাসার
কাছে ঋণী মনে হলো। কাঞ্চনের দিকে তাকাল সে। সে এখনও চোখ বন্ধ করে তার কাঁধে মাথা
রেখেছিল।
সে তার মাথায় আদর করে চুমু দিল।
চুমু খাওয়ার অনুভূতিতে কাঞ্চনের মনোযোগও বিক্ষিপ্ত
হয়ে গেল। হয়তো সেও কিছু চিন্তায় মগ্ন ছিল। মৃদুস্বরে বললো- “স্যার, মা
কখন আসবেন?"
“আজ আমি ওনাকে ফোন করে সব খুলে
বলব। এবং এখানে আসার জন্য অনুরোধ করব।” রবি তার গালে হাত বুলিয়ে বললো -
"সে যত তাড়াতাড়ি আসবে, আমরা যত
তাড়াতাড়ি সম্ভব গাঁট বেঁধে ফেলব।"
“মা জি... আপনার মা কি আমার মতো
গ্রামের মেয়েকে মেনে নেবে?” কাঞ্চন
আবার চিন্তিত হয়ে বলল।
“মাকে নিয়ে চিন্তা করছ কেন? সে
পুরানো ধাঁচের একজন নারী। সে উচ্চ প্রফাইলের মেয়ে চায় না। সে তোমার মতো লাজুক ও
ভদ্র মেয়েকেই পুত্রবধু হিসেবে চায়। সে চায় পুত্রবধূর মধ্যে মাত্র ২টি গুন। প্রথমত, সেই
মেয়েটি বাড়ির লোকদের সম্মান করবে, দ্বিতীয়ত, ঘরের
কাজকর্ম সামলাতে পারবে, ঘর ঠিকমতো দেখাশুনা করতে পারবে এবং
নিজের হাতে খাবার তৈরি করে খাওয়াতে পারবে। মা সবসময় নিজের হাতে রান্না করে খাবার
খেয়েছে। সে পুত্রবধুর হাতের খাবার খেতে পছন্দ করবে। এটুকুই। এখন নিশ্চয়ই এতটুকু সে
চাইতেই পারে তাই না? এই বলে সে কাঞ্চনের দিকে তাকাল।
কাঞ্চন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে
কাঁদছিল। সারা জীবন চিন্টুর সাথে খেলে লাফিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। কদাচিৎ ঘরের কোন
কাজ করেছে। আর রান্নার কথা বলতে গেলে চা ছাড়া আর কিছুই জানে না। রবির কথা শুনে সে
চিন্তায় পড়ে গেল। মন ছটফট করছিল পালিয়ে বাড়ি গিয়ে বুয়ার কাছ থেকে রান্না
শেখার।
“ওহ হ্যাঁ .....!”
হঠাৎ রবি চমকে উঠে বললো- "খাওয়ার কথায় মনে পড়ে গেল। না, খিচড়ি…..
খিচড়িও না …….হ্যাঁ, ক্ষীরের
কথা মনে পড়ল ….. ক্ষীর করতে পারো তো তাই না,
নিয়ে আসতে পারবে?"
কাঞ্চনের কষ্ট বাড়ল, প্রথমে
সে চিন্তিত ছিল যে সে রান্নাই করতে জানে না, এখন সে রবির
জন্য ক্ষীর রান্না করবে কীভাবে?
রবিকে কী উত্তর দেবে সে বুঝতে পারছিল না। যদি সে বলে যে
আগামীকাল সে ক্ষীর তৈরি করে আনবে, তাহলে তাকে
প্রতিদিন ক্ষীর আনতে হবে। আর যদি সে বলে যে সে ক্ষীর বানাতে জানে না, তাহলে
যদি রবি রেগে যায়।
“কি ভাবছ?” রবি
তাকে বাধা দেয়। "তুমি তো ক্ষীর বানাতে জানো, তাই
না? আমি ছোটবেলা থেকেই ক্ষীর ভালোবাসি।"
“হ্যাঁ, স্যার, আমি
আগামীকাল আপনার জন্য ক্ষীর তৈরি করব।” বলল কাঞ্চন। কিন্তু বলার পর গভীর
চিন্তায় পড়ে গেল। “স্যার, এখন
বাসায় যাবো? বুয়া তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে
বলেছে।"
রবি কাঞ্চনের দিকে তাকাল। তার মুখে কষ্টের ছাপ কিন্তু
এর সঠিক কারণ সে বুঝতে পারল না। হেসে বলে - "ঠিক আছে। তবে কাল তাড়াতাড়ি আসবে।
আর ক্ষীর আনতে ভুলবে না।"
“জি।” কাঞ্চনও মাথা নাড়ে। তারপর চলে
যাওয়ার জন্য উঠে পড়ল।
রবিও জুতা পরে উঠে দাঁড়াল। তারপর একসাথে দুজনে উঠে
আসতে লাগলো। হঠাৎ রবি কাঞ্চনকে বললো- "ওহ, এটা
তো ভুল কথা। আমাদের প্রথম প্রেমের মিলন শেষ হতে চলেছে অথচ আমরা একে অপরকে কোন
চিহ্ন দেইনি।"
“চিহ্ন?” কাঞ্চন
হতভম্ব হয়ে গেল। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে রবির দিকে তাকাল।
“বইয়ে পড়েছি, প্রেমের
প্রথম সাক্ষাতে প্রেমিকরা একে অপরকে চুম্বন করে ভালোবাসার ইঙ্গিত দেয়, চুম্বন
ছাড়া প্রেম অসম্পূর্ণ বলে মনে করা হয়। কিন্তু আমরা মোটেও চুমু খাইনি।"
রবির কথায় লজ্জা পেল কাঞ্চন। আর নিচের দিকে তাকাতে
লাগলো।
“কি হয়েছে?” রবি
দুই হাতে ওর মুখ ভরাট করতে করতে জিজ্ঞেস করল। “তুমি
যদি না চাও তাহলে কোন জবরদস্তি নেই।"
কাঞ্চনের মনে হলো, আজ
যদি সে রাজি না হয়, তাহলে যদি তার প্রতি রবির ভালোবাসা
কমে যায়! - "আমি কি প্রত্যাখ্যান করেছি স্যার।” এই বলে সে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল।
রবি তার মুখের দিকে তাকাল, যেখানে
লজ্জার পাশাপাশি আত্মসমর্পণের গভীর ছাপ। সে মুখ নিচু করে কাঞ্চনের কাঁপা ঠোঁটে
ঠোঁট রাখল।
কাঞ্চনের সারা শরীর কেঁপে ওঠে। সে রবির বাহুতে আবৃত্ত।
রবি একটা লম্বা চুমু খেয়ে ওর থেকে ওর ঠোঁট আলাদা করল।
তারপর কাঞ্চনের চোখের দিকে তাকাল। লজ্জায় ও উত্তেজনায় তার চোখ লাল হয়ে গেছে।
“এখন মিলন শেষ।” রবি হাসল। "তুমি এখন বাড়ি যেতে
পার।"
কাঞ্চন ভারি চোখের পলকে কিছুক্ষণ রবির দিকে তাকিয়ে
থাকল, তারপর হঠাৎ লজ্জা পেয়ে নিজের পথে দৌড়ে গেল।
রবি তার বাইকের কাছে এলো। আসতেই পায়ের নিচ থেকে মাটি
বেরিয়ে গেল।
নিক্কি জিপে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। যে জায়গায়
রবি আর কাঞ্চন দাঁড়িয়ে চুমু খাচ্ছিল ওই জায়গাটা জীপ থেকে বেশি দূরে ছিল না।
সেখান থেকে একটু নামলেই নিক্কি তাকে স্পষ্ট দেখতে পায়।
রবি বাইকে উঠে এল। তারপর নিক্কির দিকে তাকাল। তার চোখ
চকচক করছিল। তার মুখ রাগে ফেটে পড়ার জন্য প্রস্তুত।
২৫
তার জ্বলন্ত চোখ এবং রাগী চেহারা দেখে রবি বুঝতে পারে
যে নিক্কি তাকে কাঞ্চনের সাথে দেখেছে।
এভাবে চুরি ধরা পড়ায় তার পোট্টি নষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু সে তার নার্ভাসনেস নিক্কিকে দেখতে দেয়নি। নিক্কির দিকে তাকিয়ে বললো-
"নিক্কি, তুমি এখানে, এই
সময়ে?"
“আমাকে সাথে কথা বলবে না তুমি।” নিক্কি রেগে চিৎকার করে উঠল। “আমাকে
যখন তোমার পছন্দই না তাহলে এই মিথ্যা সম্মান কেন?"
রবি অবাক হয়ে তার রাগ দেখে। নিক্কি যে তার উপর এভাবে
রেগে যেতে পারে তা সে ভাবেনি। কিন্তু সে রাগের পরোয়া না করেই বললো- "আমি
কিছুই বুঝলাম না।"
“বুঝো না?” নিক্কি
ব্যঙ্গ করে হাসল। তারপর সেই একই বাঁকা গলায় বললো- "নিরবে লুকিয়ে যদি পাপ
করতেই হতো, তাহলে আমাকে প্রত্যাখ্যান করে অপমান
করলে কেন?"
“কি বাজে কথা বলছ তুমি?” রবির
দৃঢ়তার সাথে উত্তর দিল। সে তার জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল।
নিক্কির কথার মর্ম বুঝতে পারার সাথে সাথে সে খুব রেগে
গেল। নিক্কি তাকে চরিত্রহীন বলেছে বলে সে রাগ করেনি, সে
রাগ করেছিল যে নিক্কি নিরপরাধ, নির্দোষ
কাঞ্চনের উপর কাদা ছোড়ার চেষ্টা করেছিল। যে
তার ঘনিষ্ট বান্ধবীও।
“এটা যদি বাজে কথা হয়, তাহলে
তোমরা দুজন এখানে একা কি করছিলে?” নিক্কি
কাঁটা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর
দিতে বাধ্য নই।” রবি ওকে দুই টুকরো উত্তর দিয়ে মেজাজ খারাপ করে বাইকের
দিকে চলে গেল।
“কেন বলবে না, নাকি
তোমার কাছে ব্যাখ্যা করার ভাষা নেই।” ওকে ঘুরে রেগে বলল নিক্কি।
তার কথায় বিরক্ত হয়ে রবি মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু
রাগের চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারল না। শুধু দাঁত কিড়মিড় করছে। বিদ্বেষে ভুগছে এমন
একজন নারীকে কেউ কীভাবে বোঝাবে? এমন একটা
পাথর তার বুদ্ধির উপর পড়ে আছে যে লাখ চেষ্টা করলেও সে পাথর সরবে না। সে নীরব
থাকাই শ্রেয় মনে করে।
রবি তার বাইকের দিকে ফিরে গেল, নিক্কির
দিকে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি নিক্ষেপ করে।
রবির এই অবহেলার আচরণ সইতে পারল না নিক্কি। সে রেগে জিপ
থেকে নেমে তার দিকে এগিয়ে গেল। “আমি জিজ্ঞেস
করছি...... কাঞ্চনের মধ্যে এমন কি আছে যা আমার মধ্যে নেই? আমি
কি সুন্দরী নই? আমার কি যৌবন নেই? দেখ, আমাকে
আর বল। আমার মধ্যে কিসের অভাব?” এই
বলে নিক্কি তার সামনে বুক উচু করে তুলল।
এটার করার ফলে তার স্তন সাদা টাইট ফিট টি-শার্টে পূর্ণ
আকার প্রদর্শন করে। না চাইলেও রবির চোখ গেল তার পাহাড়ের মতো উঠে আসা পাহাড়ের
দিকে। চোখের কাছে তার প্রসারিত স্তন দেখে রবির সারা শরীর কেঁপে ওঠে। কিন্তু পরের
মুহুর্তে সে তার বুক থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
“তোমার মধ্যে সবচেয়ে বড় দোষ
হল তুমি লালসার মেয়ে।” নিক্কির চোখে ভেসে আসা আবেগের ঢেউয়ের
দিকে তাকিয়ে রবি বললো- "তুমি কাঞ্চনের সাথে নিজেকে কিভাবে তুলনা কর?"
“আমি লালসায় ভুগছি তাই না? তো
তুমি কি? তুমিও কিছুক্ষণ আগে কারো উষ্ণ কোলে
শুয়ে ছিলে।” নিক্কি জ্বলন্ত গলায় বললো- "তুমি আমার সামনে ঋষি
হয়ে পিছনে নষ্টামী করছো। আমি জানি না?"
“তোমার বাজে কথা বন্ধ করো।” রবি রেগে চিৎকার করে। “আমারকে
বলছ ঠিক আছে কিন্তু কাঞ্চনের উপর অপবাদ দিবে না।"
“সে নিষ্পাপ, নিশ্চয়ই
তোমার পাল্লায় পড়ে এসেছে। কিন্তু এতটুকু মনে রেখো... তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে
অন্য কাউকে নিলে, তোমাকে শান্তিতে থাকতে দেব না।” নিক্কি দাঁত চিবিয়ে বলল।
রবির প্রতি তার আকুলতা আর শুধু শারীরিক আনন্দের বিষয়
ছিল না। এখন সে রবিকে স্বামী হিসেবে পেতে চেয়েছে। কিন্তু আজ নিজের বদলে কাঞ্চনের
দিকে রবির ঝোঁক দেখে সে রাগে পাগল হয়ে গেল।
সে নিজেকে সব দিক দিয়ে কাঞ্চনের চেয়ে ভালো মনে করত।
কাঞ্চন তার মতো শিক্ষিতও ছিল না, তার মতো ধনীও
ছিল না, তার বংশের চেয়ে কাঞ্চনের বংশও বড় ছিল না। সে
নিক্কির চেয়ে ভাল পোশাক পরত না, সে নিক্কির
চেয়ে ভালভাবে কথা বলতে জানত না। রবি তার অতিথি। তার বাড়িতে এসেছে তাদের কাজের
জন্য। তারপরও সে তার বদলে কাঞ্চনকে ভালবাসে। নিক্কির অহংকারী মেয়েলি স্বভাব এতে
দুঃখিত ও ক্রোধে ভরে উঠে।
কাঞ্চনকে সে তার শত্রু মনে করছিল না, কিন্তু
যে কাঞ্চন তার প্রতি সর্বদাই মুগ্ধ ছিল, সেই কাঞ্চন
যাকে সে কুঁড়েঘর থেকে তুলে এনে প্রাসাদে বসিয়েছিল, সেই কিনা... এই সত্যটা সে
সহ্য করতে পারেনি। যার সাথে সে
তার থালা ভাগ করে নিয়েছে, যার জন্য সে
সব ভেদাভেদ মুছে দিয়েছে, আজ সেই কাঞ্চন তার উপর ভারী হয়ে
উঠছে। এতে তার অহংকারী মন আঘাত পায়।
রবি তার সাথে আরও কথা বলা ঠিক মনে করল না। সে ঘুরে তার
বাইকে উঠল।
“তুমি কোথায় যাচ্ছ?” নিক্কি
তার কব্জি ধরে চিৎকার করে উঠল।
“যদি এখানেই রাত কাটাতে চাও, তবে
আনন্দে কাটাও। আমি আমার মত করে চলে গেলাম।” সে বলে বাইকের চাবি ঘুরিয়ে দিল।
“তুমি এভাবে যেতে পারো না।” নিক্কি বলে উঠে।
“তাই...?” অবাক
হয়ে তাকিয়ে রইলো রবি।
“তোমাকে কাঞ্চনের মতো করে আমাকে
ঠোঁটে চুমু খেতে হবে।” এই বলে নিক্কি ওর ঠোঁট রবির ঠোঁটের
কাছে নিয়ে গেল।
“মোটেই না।” অস্বীকার করে ঘাড় নাড়ল রবি।
“রবি!” নিক্কি সাপের মতো ফুঁসে ওঠে। “কসম
করে বলছি। তুমি যদি আমাকে চুমু না দাও, আমি এখনই
আমার জিপ নিয়ে এই পাহাড়ের নিচে লাফ দেব।"
“তামাশা বন্ধ কর এবং বাড়িতে যাও।” মনে মনে কেপে উঠে বলল রবি। নিক্কির
মুখের কথায় কেঁপে উঠল সে।
“তুমি মনে করছ আমি মজা করছি।” নিক্কি হেসে বলল। তার চোখ জ্বলে উঠেছে
- "আচ্ছা, আমার কথার সত্যতা যদি পরীক্ষা করতে
চাও, তাহলে এখান থেকে এক কদম এগিয়ে দেখাও। আমি যদি এই
পাহাড় থেকে লাফ না দিই, তবে আমি ঠাকুর জগৎ সিংয়ের মেয়ে নই।” পাথরের মত দৃঢ় ভাবে বলল - "তবে
রবি মনে রেখ। সারাজীবন এই ভুলের জন্য তুমি অনুশোচনা করবে। কারণ আমি রসিকতা করি
না।"
রবি মাথা থেকে পা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। সে নিক্কির দিকে
মনোযোগ দিয়ে তাকাল। এ সময় নিক্কি খুব রেগে আছে। তার চোখে রাগের পাশাপাশি গভীর
বেদনার স্তরও ছিল। রবি একজন সাইকিয়াট্রিস্, এটা বুঝতে
তার বেশি সময় লাগেনি যে সে যদি নিক্কিকে আরও আঘাত করে, তাহলে
সে সত্যিই তার জীবন দেবে।
প্রেমে অপমানিত একজন নারী, যৌন-আগুনে
জ্বলন্ত শরীর যা কিছু করতে পারে। এর
আগে একবার নিক্কিকে তুচ্ছ করেছিল। রবি চায়নি যে তার একটা ভুলের জন্য তার গলায় আবার
কোনো বড় সমস্যা পড়ুক। নিক্কি যদি তার ভুলের জন্য কিছু করে বসে তাহলে সে ঠাকুর সাহেবকে কী জবাব দেবে? ঠাকুর
সাহেবের কি হবে যখন তিনি জানতে পারবেন যে তিনি যাকে তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য
ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছিলেন, সেই খুনি
হয়ে তার মেয়েকে হত্যা করেছে।
এই উপলব্ধিতে রবি আবার কেঁপে উঠল। সে হতবুদ্ধি হয়ে
ঠোঁট কামড়াতে লাগল। নিজেকে বাঁচানোর কোনো উপায় দেখতে পায় না।
সে নিক্কির দিকে তাকাল, সে
তখনও রাগে জ্বলন্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“ঠিক আছে।” রবি নিজের রাগ নিভিয়ে বললো -
"কিন্তু এর পর তুমি আর তর্ক করবে না সোজা প্রাসাদে ফিরে যাবে?"
“আমি রাজি।” ঠোঁটে বিজয়ী হাসি দিয়ে বলল নিক্কি।
জবাবে রবি তার দিকে ঠোঁট এগিয়ে দিল। নিক্কি পেছন থেকে
তার ঘাড় চেপে ধরে তার সাথে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল। তারপর পাকা আমের মত ওর ঠোঁট
চুষতে লাগলো। একটা তীব্র
শিহরণ রবির সারা শরীরে ভরে গেল। নিক্কির শরীরের উত্তাপ মুখ দিয়ে নামতে লাগল।
নেশায় তার চোখ বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। তার মনে হলো সে যেন অন্য জগতে পৌঁছে গেছে।
নিক্কি ঠোঁট চোষায় পারদর্শী ছিল। সে একইভাবে রবির ঠোঁট
চুষতে থাকল। তারপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্টির পর সে রবির থেকে আলাদা হয়ে যায়।
নিক্কি আলাদা হওয়ার সাথে সাথে রবি নিজের ভারী চোখের
পাতা খুলে তার দিকে তাকাল। নিক্কির মুখে আনন্দ ঠোঁটে সাফল্যে গর্বের হাসি।
লজ্জায় রবির ঘাড় নিচু হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ওর মুখের
দিকে তাকিয়ে রইল। নিক্কি তাকে দেখে হাসতে থাকে। রবি তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বাইকে
জোর করে একটা কিক দিল। সে এগোতে চাইলে নিক্কির কন্ঠ তার কানে লাগে - "থামো"
“আবার কি হয়েছে?” প্রশ্নবিদ্ধ
চোখে রবি তার দিকে তাকায়।
“তুমি বলোনি কার স্বাদ আর গন্ধ
ভালো? এই শহরের গোলাপ নাকি পাহাড়ি ফুল?” নিক্কির
ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি।
রবি তার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে হাসল। তারপর বলে-
"শহরের টবে ফোটা ফুলে সেই সুবাস কোথায় যেটা পাহাড়ের গাঁয়ে ফুটে থাকা ফুলে পাওয়া
যায়? "
রবির কথায় নিক্কির সমস্ত শরীর অপমানে জ্বলে উঠল। কিন্তু
রবিকে কোন উত্তর দিতে পারার আগেই রবি এক ঝাঁকুনি দিয়ে এগিয়ে গেল। নিক্কি রাগ করে
তাকে চলে যেতে দেখল।
২৬
কাঞ্চন যখন বাসায় পৌছে তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাতের
খাবার রান্না করতে মাটির চুলায় আগুন জ্বালিয়েছিলেন শান্তা বুয়া। সুগনা তখনও
বাড়ি ফেরেনি। চিন্টু বোধহয় ভিতরে পড়াশোনা করছিল।
কাঞ্চন শান্তাকে খুঁজতে রান্নাঘরে এলো। শান্তা ভাত
রান্না করতে হাঁড়িতে পানি ভরছিল। সে শান্তাকে ডাক দিল - "বুয়া.... আজকে কি
খাবার রান্না করছ?"
কাঞ্চনের কণ্ঠে শান্তা ঘুরে ওর দিকে তাকাল। তার চোখেওও
একই প্রশ্ন। সেই সাথে তার মুখে কিছুটা অস্বস্তিও। - "তুই আজকে জিজ্ঞেস করছিস
কেন? আমার হাতের তৈরি সব কিছুই তো তোর পছন্দ।"
“আরে...বুয়া! “কাঞ্চন
আঙ্গুলে উড়না নাড়তে নাড়তে বলল - “বুয়া আজ ক্ষীর
বানাও, আজকে ক্ষীর খেতে মন চাইছে।"
“ক্ষীর...?” শান্তা
অবাক হয়ে তার দিকে তাকায় - "কিন্তু ক্ষীরের জিনিসপত্র কই?"
“তাহলে বুয়া নিয়ে এসো না। যা যা
লাগে। আজ আমার বড় খেতে মন চাইছে...” কাঞ্চন ক্ষোভের সাথে বলল। তারপর
আঙ্গুলে উড়না ঘুরাতে লাগলো।
শান্তা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কাঞ্চনের দিকে। আজ
কাঞ্চনকে একটু অদ্ভুত লাগছিল ওর। খাওয়ার এত অস্থিরতা ওর তো কখনো ছিল না। তাকে যা
দেওয়া হত তাই খেত। কিন্তু আজ কেন সে ক্ষীর খেতে এত জেদ করছে?
শান্তা মনে মনে ভাবতে লাগলো- ওর বয়স আর কত, শুধু
শরীরে বড় হয়েছে। বুদ্ধি এখনও বাচ্চাদের মতোই। হয়তো কারো বাড়িতে ক্ষীর তৈরি হতে
দেখেছে। আর নিজেরও ক্ষীর খেতে ইচ্ছে করছে হয়ত। “আজ
ক্ষীর খাওয়ার এত তাগিদ কেন?” শান্তা
জিজ্ঞেস করল।
“অনেকদিন হয়ে গেছে না ...!” কাঞ্চন সরলভাবে বললো “কি... বুয়া, বানাবে না?"
“তুই যে কি না। এত ভালোবাসা
দিয়ে কথা বলছিস যখন।” শান্তা মুচকি হেসে বলল - "তোকে
কিছু জিনিসের কথা বলি.... বনিয়ার দোকান থেকে নিয়ে আয়।"
কাঞ্চন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। তারপর শান্তার কথা শুনে
তাড়াতাড়ি উঠোনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ততক্ষণে শান্তা অন্য কাজে ব্যস্ত।
প্রায় ৩০ মিনিট পর কাঞ্চন ফিরল। তার হাতে জিনিস ভর্তি
ব্যাগ। ওকে দেখে শান্তার চোখ বিস্ময়ে বিস্তীর্ণ হয়ে গেল। “এত
কি এনেছিস?"
শান্তা তাকে একদিনের জিনিস আনতেও বলেছিল। কিন্তু কাঞ্চন
অনেকদিনের কথা ভেবে সারা সপ্তাহের মাল নিয়ে এসেছে। বুয়াকে বললো- "একবারে এনে
দিলাম। ভালো হয়নি বুয়া। আবার
যদি খেতে চাই?"
“তাহলে নিয়ে আয়।” ব্যাগ চেক করতে করতে শান্তা বলল। “এত! বেশিদিন
রাখলে তো নষ্ট হয়ে যাবে না?"
কাঞ্চন চুপ করে গেল। এখন সে তার বুয়াকে কিভাবে বোঝাবে
যে তার এখন প্রতিদিন ক্ষীর খেতে ইচ্ছে করবে।
তার মন খারাপ দেখে শান্তা বলল - "ভাল করেছিস মেয়ে
তুমি এনেছিস। প্রতিদিন দোকানে যেতে কষ্ট হয়। এখন যখনই তোর ক্ষীর খেতে ইচ্ছে করবে, আমাকে
বলবি আমি বানিয়ে দেব।"
শান্তা কাঞ্চনের কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে সেখান থেকে
জিনিসপত্র বের করতে লাগল। সে কখনও কাঞ্চনের কোন আবদার ফেলত না। ওর কোন দুঃখ যাতে
না হয় সবসময় খেয়াল রাখত। মা হাড়া দুঃখী মেয়েটাকে সে সবসময় আগলে রাখে। ছোটবেলা
থেকেই এইভাবে ছোটখাটো জিনিসের যত্ন নিত। যেন সে তারই গর্ভের সন্তান। কখনো শান্তা
চিন্টুর উপর বৃষ্টি বর্ষণ করতো আবার কখনো তার দুষ্টুমির জন্য মারধর করতো, কিন্তু
কখনো ভুল করেও কাঞ্চনকে বকাঝকা করতো না।
আজও তার বিষণ্ণ মুখ দেখে যন্ত্রণায় সে কাতর।
কাঞ্চন তখনও শান্তার পিছনে দাঁড়িয়ে জিনিসপত্র বের
করতে দেখছিল।
শান্তা ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেসে বলল - "বেটি...
আমি ক্ষীর বানাচ্ছি। তুই চিন্টুর সাথে বসে কিছুক্ষণ পড়াশুনো কর। ক্ষীর বানানোর
সাথে সাথেই তোকে ডাকবো।"
“আমি তোমাকে ক্ষীর বানাতে দেখতে
চাই বুয়া।” কাঞ্চন জোর দিয়ে বলল। - "কীভাবে ক্ষীর বানায়...
আমি শিখতে চাই।"
“কেন তুই শিখতে চাস?” শান্তা
জিজ্ঞেস করলো - "তোর কি মনে হয় আমি তোকে আর কখনো ক্ষীর খাওয়াবো না?
"
“সেটা নয়, বুয়া।
আমি এখন ঘরের সব কাজ শিখতে চাই। তুমি আমাকে এখনও কিছু শেখাওনি।” অভিযোগ করে কাঞ্চন।
সে সত্যিই দুঃখিত যে তাকে কখনও ঘরের কাজ করতে দেয়নি।
রান্না শেখায়নি। আর কিছু না হলেও সে যদি ক্ষীর বানাতে শিখে তাহলে অন্তত নিজের
হাতে বানানো ক্ষীর রবিকে খাওয়াতে পারত।
ওখানে দাঁড়িয়ে শান্তা অবাক হয়ে ওকে দেখছিল। সে আজ
কাঞ্চনের স্বভাবের অনেক পরিবর্তন দেখতে পেল। প্রথমে ক্ষীর খাওয়ার তাগিদ আর এখন
ঘরের কাজের প্রতি আসক্তি..."কিছু তো একটা হয়েছে ওর।” সে মনে মনে ভাবল।
“হঠাৎ করে কেন তোর মনে হল ঘরের
কাজ শিখতে?” শান্তা হেসে জিজ্ঞেস করলো।
“আমি যদি না শিখি…..
আমি যখন শ্বশুর বাড়িতে যার, তখন আমার
শাশুড়ি আমাকে বকাবকি করবে না? বলবে না… আমি
ঘরের কোনো কাজ করি না।” কাঞ্চন বলতে থাকে
“তাহলে বুয়া বল কত খারাপ হবে? তাহলে
শাশুড়ি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। তাই এখন আমি তোমার সাথে রোজ রান্না শিখব
আর ঘরের অন্যান্য কাজও করব।"
কাঞ্চনের নিষ্পাপ কথা শুনে একদিকে শান্তা মৃদু হাসছিল, অন্যদিকে
সে বিস্মিতও যে কাঞ্চন আজ এত কিছু শিখল কোথা থেকে। সে আগে কখনো এভাবে কথা বলত না।
“তুমি হাসছ কেন?” শান্তাকে
হাসতে দেখে কাঞ্চনের মুখে লজ্জার লালিমা ছড়িয়ে পড়ে।
“এমনিই।” শান্তা হেসে জবাব দিল। তারপর ওর নত
মুখ দুহাতে চেপে ধরে সে বলল। “ঠিক আছে, আমি
তোকে সব শিখিয়ে দেব। কিন্তু তোর মনে এই শ্বাশুড়ির ভয় কে ভরেছে?"
কাঞ্চনের সামনে রবির মুখ ঘুরে গেল। কিন্তু বুয়াকে তার
কথা বলতে পারেনা। লজ্জিতভাবে চুপচাপ তাকিয়ে রইল শান্তার দিকে।
“ঠিক আছে, বলিস
না, আমার সাথে বস, আমি
আজ তোকে ক্ষীর বানিয়ে দেখাবো। তারপর তোর শ্বশুরবাড়িতে তোর শাশুড়ির জন্য বানিয়ে
দিস।” এই বলে শান্তা কাঞ্চনের হাত ধরে চুলার কাছে নিয়ে গেল।
তারপর সে তাকে একে একে সব পদ্ধতি বলা শুরু করল এবং কাঞ্চন তার নির্দেশ মতো ক্ষীর
তৈরি করতে লাগল।
কাঞ্চন শান্তার বলা কথাগুলো পুরো মনোযোগ দিয়ে চালিয়ে
যেতে থাকে। কাঞ্চন এই কাজে এতটাই হারিয়ে গিয়েছিল যে চিন্টু বারবার ডাকলেও সে তার
কাছে যায়নি। এই সময়ে প্রতিদিন সে চিন্টুকে পড়াতো, কিন্তু
আজ সে তার ভাইয়ের দিকে তাকায়নি।
অবশেষে! কাঞ্চনের কঠোর পরিশ্রম সম্পন্ন হল এবং তার
মিষ্টি ক্ষীর প্রস্তুত হল। এর মধ্যে সুগনাও ফিরে এসেছে। উঠানে পা দিতেই ক্ষীরের
সুগন্ধ নাকে এসে পড়ল।
“ওহহহ... তো আজকে ঘরেই ক্ষীর বানানো
হচ্ছে।” সুগনার নাকে গন্ধ পেয়ে চুলার কাছে চলে এল। "এটা
দারুণ গন্ধ।"
“ভাই সুগন্ধ আসবে না কেন।
কাঞ্চনের হাতে যে তৈরি।” সুগনাকে জল দিতে দিতে শান্তা বলল।
“কি .....!” খুশিতে
ভরা কণ্ঠস্বর বেরিয়ে এল সুগনার মুখ থেকে। সে কাঞ্চনের দিকে তাকাল, ঠোঁটে
হাসি আর চোখে লজ্জা নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। “এটা
জেনে আমার ক্ষুধা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার খেয়ে নেব... তবে
এখন বাটিতে খানিকটা ক্ষীর নিয়ে এসো। দেখি আমার মেয়ে কেমন ক্ষীর বানিয়েছে।"
সুগনা বলতে দেরি আর কাঞ্চন দৌড়ে গেল ক্ষীর আনতে।
রান্নাঘর থেকে একটা বাটি এনে ক্ষীরে ভরে সুগনাকে দিল। তারপর সুগনার প্রশংসা শোনার
জন্য কাছে দাঁড়াল।
সুগনা চামচ দিয়ে ক্ষীর তুলে মুখে নিল। তারপর জিভ
নাড়িয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকাল। কাঞ্চন একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হাজারো
সংশয়...না জানি বাপুর ক্ষীর কেমন পছন্দ হয়েছে। খারাপ হলে বাপু রেগে যাবে। কিন্তু
পরের মুহুর্তে তার সমস্ত সন্দেহ অমুলকত প্রমাণিত হয়… যখন
তার চোখ পড়ে সুগনার ঠোঁটে ছড়িয়ে থাকা হাসির দিকে।
“বলো বাপু, কেমন
লাগলো ক্ষীর?” কাঞ্চনের আর তর সইছে না। তার কঠোর
পরিশ্রমের ফল জানার আগ্রহ ছিল চরমে।
“সুস্বাদু .... খুবই সুস্বাদু!” সুগনা খুশি হয়ে বললো- আমার মেয়ে এত
ভালো ক্ষীর বানাতে পারে আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না।
কাঞ্চন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। বাবার মুখ থেকে নিজের
হাতে বানানো ক্ষীরের প্রশংসা শুনে লোম শিহরিত হয়ে উঠে। মন চাইছিল ময়ূরের মতো
নাচতে। কিন্তু বাবার সামনে থাকাতে তার সুখ হৃদয়েই সমাহিত করে রাখে।
তার খুশি শুধু এ কারণেই নয় যে সে ভালো ক্ষীর তৈরি
করেছিল এবং তার বাবার প্রশংসা করেছিল। তার খুশির কারণ ছিল রবি....! আগামীকাল সে
তার স্যারকে নিজ হাতে ক্ষীর বানিয়ে খাওয়াতে পারবে ভেবে সে আনন্দিত বোধ করছিল।
তার মুখ থেকে নিজের সত্যিকারের প্রশংসা শুনতে পারবে। সে খুশি ছিল যে এখন সে রবিকে নিজের
করে নিতে পারবে। বলতে গেলে, সে কেবল
ক্ষীর বানাতে শিখেছে… তবে কেউ যদি
তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে তবে সে বুঝতে পারবে সেই ক্ষীরের মধ্যে কত অনুভূতি লুকিয়ে
ছিল।
রবি যখন প্রাসাদে পৌঁছল, নিক্কিও
তার পিছনে প্রাসাদে প্রবেশ করল। দিওয়ান ঠাকুর সাহেবের সঙ্গে হলঘরে বসেছিলেন। তারা
নিজেদের মধ্যে কিছু কথা বলছিল তখন রবি তাদের হাত জোড় করে শুভেচ্ছা জানাল।
বাইরে থেকে রবি আর নিক্কিকে একসঙ্গে আসতে দেখে ঠাকুর
সাহেবের চোখে আনন্দে হাসি ফুটল। “এসো রবি, আমরা
তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। তোমার সাথে আমার কিছু জরুরি কাজ আছে।” ঠাকুর সাহেব রবিকে বললেন।
বিস্ময়ে রবির চোখ সরু হয়ে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা
নিক্কির দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল তার ঠোঁটে বিষাক্ত হাসি। সে আবার ঠাকুর সাহেবের
মুখের দিকে চোখ ফেরাল। তার মুখে গভীর তৃপ্তির ছাপ। রায়পুরে আসার পর এই প্রথম ঠাকুর
সাহেবকে এত খুশি দেখে। কিন্তু তার সন্তুষ্টির কারণ ছিল তার বোধগম্যতার বাইরে।
২৭
“বস, রবি, দাঁড়িয়ে
আছ কেন?” ঠাকুর সাহেব রবিকে দাঁড়িয়ে থাকতে
দেখে বসার ইঙ্গিত করলেন।
“জি ধন্যবাদ।” রবি ঠাকুর সাহেবকে উত্তর দিল, ধীরে
ধীরে হেঁটে সোফায় বসল। তারপর ঠাকুর সাহেবের দিকে প্রশ্নাতীত দৃষ্টিতে তাকাল -
"আমার সাথে কি কথা বলতে চেয়েছিলেন বলুন?” রবি
জিজ্ঞেস করলো.. নিক্কির সাথে সংঘর্ষের উত্তেজনা তখনো মুখে ছড়িয়ে আছে।
“ব্যাপারটা তোমার, রবি।” ঠাকুর সাহেব বললেন - "যখন থেকে তুমি
এই প্রাসাদে এসেছ। সবকিছুই আমাদের জন্য শুভ হয়ে উঠছে। সত্যি বলতে, এখন
আমাদের মনে হতে শুরু করেছে যেন আমাদের সমস্ত সুখ তোমার মাধ্যমে চলে যায়।"
“বুঝলাম না ... আপনি কি বলতে চাচ্ছেন?” হতভম্ব
হয়ে বলল রবি।
“রবি ব্যাপারটা হল যে .....!” ঠাকুর
সাহেব ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ রেখে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর হাঁটতে
হাঁটতে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবতে লাগলেন।
তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দিওয়ানজিও সোফা ছেড়ে উঠে
গেলেন। কিন্তু রবি নিজের জায়গায় বসে ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠাকুর
সাহেব তার কাছে পিঠ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তার দুই হাত পিছনে বাঁধা ছিল।
“আসলে ...আমরা চাই নিক্কি বিয়ে
করুক।” ঠাকুর সেই ভাবে দাঁড়িয়ে বললেন। সে আসলে রবির সাথে
সরাসরি কথা বলতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল না।
“খুবই খুশির ব্যাপার ঠাকুর
সাহেব।” জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলল রবি। সে নিক্কির দিকে
তাকাল যে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
“ঠিক বলেছ রবি।” ঠাকুর সাহেব রবির দিকে মুখ ফিরিয়ে
বলিলেন- "আসলে সুখের ব্যাপার, কিন্তু
আমাদের সুখ এখনও অসম্পূর্ণ, তা তখনই পূরণ
হবে যখন তোমার ইচ্ছাও এতে অন্তর্ভুক্ত হবে।"
“ম... আমার ইচ্ছা?” রবি
নড়বড়ে হয়ে গেল। “আমি কিছুই
বুঝলাম না। কিসের কথা বলছেন?"
“রবি, আমরা
জানি না কিভাবে কথাটা বলব।” রবির নার্ভাসনেস উপেক্ষা করে ঠাকুর
সাহেব বললেন - "আসল কথা হল আমরা নিক্কির জন্য তোমার সম্মতি চাই। নিক্কির জন্য
আমরা যে সব গুণ চেয়েছিলাম তা সবই তোমার মধ্যে আছে। সত্যি হল রবি আমরা যা চাই।
যেদিন তুমি ছেলে হওয়ার ভান করেছিলে- রাধার সামনে জামাই....সেদিন থেকে আমরাও
তোমাকে জামাই হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। এখন তুমি অনুমতি দিলে আমরা এই সম্পর্কটা
নিশ্চিত করতে চাই।"
রবি তো মহা ভাবনায় পড়ে গেল। ঠাকুর তাকে যে এভাবে
মুড়ে ফেলবেন সে ভাবতেও পারেনি। রবি বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে ঠাকুর সাহেবকে সকলের
সামনে না বলে অপমান করতে চায়নি। আর হ্যাঁও বলতে পারেনি।
“কি হয়েছে রবি? কি
ভাবছো?” হঠাৎ ঠাকুর সাহেবের কণ্ঠে রবি চমকে
উঠল। ঠাকুর সাহেবের দৃষ্টি স্থির হইল তার উপর।
“ঠাকুর সাহেব, আপনাদের
সবার প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা, প্লিজ ...
আমার কথাগুলো খারাপ ভাবে নেবেন না।” রবি বিনীত কণ্ঠে ঠাকুর সাহেবকে বলে -
"আমি এই মুহূর্তে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। আমার কিছু বাধ্যবাধকতা
আছে। আমার একটু সময় দরকার।” সে নিক্কির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আরও বলতে শুরু করল - "আপাতত আমি আপনার কাছে একটা জিনিসের অনুমতি দিতে চাই।
আমি আমার মাকে এখানে ডাকতে চাই... যদি আপনার কোন সমস্যা না হয়?"
“সমস্যা নেই, রবি, আমাদের
কোন তাড়া নেই। তুমি ঠিক করে ভেবে দেখো তারপর আমাদের বলবে।” ঠাকুর
সাহেব তার দ্বিধা মুছে দিয়ে বললেন - "এখন যেহেতু তোমার মায়ের আগমনের
ব্যাপার, তাহলে অবশ্যই তাকে ফোন করো....
আমাদেরও তার সাথে দেখা করার ইচ্ছা আছে। তার সাথে দেখা করে আমরা খুব খুশি হব।"
“ধন্যবাদ ... ঠাকুর সাহেব।” রবি উঠে দাড়িয়ে বলল – মাকে
ফোন করে কাল এখানে ডেকে আনব।
“রবি বাবু।” হঠাৎ দিওয়ান জি বললেন- “আমি
একদিনের মধ্যে কিছু কাজে শহরে যাব।
“এর চেয়ে ভালো আর কি, দিওয়ান
জি। আমি তার একা আসার চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এখন আমার দুশ্চিন্তা কেটে গেছে।” রবি দিওয়ান জির প্রতি কৃতজ্ঞতা
প্রকাশ করেন।
“ঠিক আছে রবি, এখন
তুমি গিয়ে বিশ্রাম নাও। তোমার মা আসার পরই এ বিষয়ে কথা বলব।” ঠাকুর সাহেব বললেন।
“হ্যাঁ... নমস্কার।” রবি হাত জোড় করে ঠাকুর সাহেব ও
দেওয়ান জিকে প্রণাম করল। তারপর নিক্কিকে দেখে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
“দেওয়ান জি আপনার কি মনে হয়? রবি
কি এই সম্পর্ককে হ্যাঁ বলবে?” রবি
চলে যাওয়ার পর, ঠাকুর সোফায় বসে দেওয়ান জিকে
জিজ্ঞেস করলেন।
“সে হ্যাঁ বলবে না, বাবা!”
দেওয়ান জির সামনেই নিক্কি বলল।
নিক্কির কথায়, দিওয়ানজি
এবং ঠাকুর সাহেব একসাথে হতবাক হয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। দুজনের চোখ এক সাথে
নিক্কির মুখের দিকে পড়ল। বিষাদের ঘন মেঘ তার মুখে ঝুলে ছিল। সে অসহায়ভাবে ঠোঁট
কামড়াচ্ছিল।
নিক্কির এমন অবস্থা দেখে দুজনেই স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠোঁট
চিবিয়ে নিক্কি আরও বলল- "আমি রবির পছন্দ নই পাপা। ওর পছন্দ কাঞ্চন।”এই
বলে নিক্কি ঘাড় ফেরাল। যেন সে ভয় পাচ্ছে যে তার চোখের বেদনা প্রকাশ পেয়ে যেতে
পারে। সে তার বাবাকে চোখের জল দেখাতে চায়নি।
“কি বলছ নিক্কি?” ঠাকুর
সাহেব আহত চোখে নিক্কির দিকে তাকিয়ে বললেন।
“এটা সত্যি বাবা, মেনে
নাও। রবির সাথে এ নিয়ে কথা বলা বৃথা। তার স্বপ্ন এই প্রাসাদে থাকা নিক্কির নয়, সেই
কুঁড়েঘরে থাকা কাঞ্চনের জন্য।” এই বলে নিক্কির গলা ভারী হয়ে গেল।
তার চোখের জল লুকানো কঠিন হয়ে গেল। “আমি
আমার রুমে যাচ্ছি বাবা।” নিক্কি বলে দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে
গেল।
ঠাকুর সাহেব ও দিওয়ানজী পাথরের মূর্তি হয়ে তা দেখতে
থাকলেন।
“হঠাৎ কি হল দেওয়ান জি?” হুশ
ফেরার সাথে সাথে ঠাকুর সাহেব দিওয়ান জিকে বললেন - "এই সব আমাদের পিছনে ঘটছে আর
আমরা জানতেও পারিনি।"
“আমিও এ বিষয়ে জানতাম না, সরকার
... তবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। বিষয়টি এখনও সুরাহা করা যেতে পারে।” দেওয়ান স্যার ঠাকুর সাহেবকে
সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- "এই মুহূর্তে আমাকে নিক্কি বেটার সাথে কথা বলার
অনুমতি দিন। প্রথমে তার হৃদয়ের অবস্থা আমার জানতে হবে।"
“যান ..... দেওয়ান জি, গিয়ে
নিক্কিকে দেখে আসুন। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। জানি না কেন আমাদের কপালে সুখ সয়
না।” ঠাকুর
সাহেব হতাশ হয়ে বললেন।
“যদি আমি হতাম.... এইবার দরজা
দিয়ে সুখ ফিরবে না। দেওয়ান জি আবার তাকে আশ্বস্ত করলেন- "আমি আগে নিক্কি
বেটার সাথে দেখা করব তারপর আপনার সাথে কথা বলব।” এই বলে দিওয়ান জি নিক্কির ঘরের দিকে
এগিয়ে গেল।
দরজায় পৌঁছে দেওয়ান জি দরজায় আলতো করে স্পর্শ করলেন, দরজা
খুলে গেল। দিওয়ান জির চোখ ঢুকে গেল ভিতরে। নিক্কি বিছানায় মুখ থুবড়ে শুয়ে ছিল।
“নিক্কি বেটা।”দিওয়ান
জি দরজা থেকেই কথা বললেন। নিক্কি মুখ ফিরিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দেওয়ানজির
দিকে তাকিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
“নিক্কি বেটা …
.আমাদেরকে বলো….পুরো গল্পটা বলো….তোমার, রবি
আর কাঞ্চনের মধ্যে যা কিছু আছে, সব বলো।”
দিওয়ান জি অধৈর্য হয়ে কথা বললেন।
“তারা দুজনে একে অপরকে ভালোবাসে, চাচা...।” নিক্কি দেওয়ান জির দিকে তাকিয়ে ভারি
গলায় বলে- "আমি নিজ চোখে দেখেছি দুজনের মিলন।"
“কিন্তু তুমি কি চাও, বেটা?” দেওয়ান
জি নিক্কির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন - "যে যাই কিছু চাক... কিন্তু তুমি যা
চাও তাই হবে। এটা আমার ওয়াদা।” হঠাৎ দিওয়ান জির কন্ঠে রূঢ়তা।
নিক্কি বিস্ময়ে দেওয়ানের দিকে তাকাল। এ সময় তার
বুড়ো চোখেও একটা স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। নিক্কি তার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে
বললো - " চাচা আমি কাঞ্চনের খারাপ চাই না... তবে আমি রবিকে ছাড়া বাঁচতে পারব
না। প্রথম দিকে আমি রবিকে পছন্দ করতাম না কিন্তু কেন আমি জানি না ওর কাছ থেকে যতটা
দূরে থাকতাম আমি ততটাই কাছের অনুভব করতাম। কখন যে ওর প্রেমে পড়তে শুরু করি বুঝতেই
পারিনি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রবি অন্য কারোর এখন।"
“ওকে তোমারই হতে হবে নিক্কি।” দেওয়ান জি নিক্কির মাথা ছুঁয়ে চুলে
আদর করে বললেন। “সে অন্য কারো
হতে পারে না। আমি তাকে অন্য কারো হতে দেব না।” কাঁপা কাঁপা দৃঢ় গলায় দিওয়ান জি
বললেন।
“চাচা ..... ” দেওয়ানের রাগী কথা শুনে কেঁপে উঠল
নিক্কি। - "আপনি কি... ক্ষতি করবেন কাঞ্চনে। সে আমার বন্ধু।
নিক্কির গলা শুনে দেওয়ান জি হাসলেন। - "তুমি
চিন্তা করো না নিক্কি বেটা। আমরাও কাঞ্চনের খারাপ চাই না... আর ওর খারাপ করার কথাও
ভাবতে পারি না।"
“এটা কি সম্ভব চাচা...?” নিক্কি
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল দেওয়ানজির দিকে। “রবি
কাঞ্চনকে খুব ভালোবাসে। ওকে কখনো ছেড়ে যাবে না।"
“ওকে নিয়ে চিন্তা করো না বেটা...!”
দিওয়ান জি মৃদু হাসলেন। তারপর নিক্কির মুখটা দুহাতে নিয়ে ওর চোখে উঁকি দিয়ে
বললো- "শুধু একটা প্রতিজ্ঞা করো যে আমরা শহর থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি
তোমার পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেবে না। আর কাঞ্চন যেভাবে চলছে, যেতে
দাও। তুমি শুধু ভরসা রাখো। আমি দেখছি।
“ঠিক আছে চাচা....” দেওয়ানজির কথায় নিক্কি রাজি হল -
"আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। আপনার শহর থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি কিছু
করব না। কিন্তু আপনি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন।"
“একদম বেটা ..... আমার মাত্র
তিন-চার দিন লাগবে। তবে আর একটা কথা মনে রেখো। এই ঘরে তোমার আর আমার মধ্যে যা কিছু
হয়েছে... মালিককে বলো না। মালিক
জিজ্ঞেস করলে বলতে পারো... যেটাতে রবি আর কাঞ্চন খুশি, তুমিও
তাতেই খুশি। ওদের সম্পর্ক নিয়ে তুমি খুশি। মালিক এমনিতেই খুব দুঃখী...। .. তোমার
দুঃখের কথা জানলে ওনি আরো ভেঙ্গে যাবে। তুমি সবসময় তার সামনে হাসি খুশি
থাকবে।"
“হ্যা ... বুঝলাম চাচা...” নিক্কি সম্মতিতে ঘাড় নাড়ল।
“ঠিক আছে বেটা ...এখন যাচ্ছি।
নিজের খেয়াল রেখো।” এই বলে দিওয়ান জি নিক্কির ঘর থেকে
বেরিয়ে গেল।
২৮
রবি নিজের ঘরে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন। মায়ের আগমনের
পর সে ঠাকুর সাহেবকে কী উত্তর দেবে তা বুঝতে পারছে না। ঠাকুর সাহেবের বড় আশা তার
প্রতি। কিভাবে সে তা অস্বীকার করতে পারে? বেচারা
এমনিতেই দীর্ঘদিনের স্ত্রীর দুঃখে ভুগছে...নিক্কিকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলে তার
কতটা কষ্ট হবে?
“যাই হোক ...!”
রবি নিজে নিজই বকবক করে। “আমি কাঞ্চনের
প্রতি অবিচার করতে পারি না। নিক্কি একজন ধনী বাবার মেয়ে। সে খুব সহজেই ভালো
সম্পর্ক করতে পারে। কিন্তু কাঞ্চন...? সে কুঁড়েঘরে
বসবাসকারী গরীব কৃষকের মেয়ে। পৃথিবী এদিক ওদিক হয়ে গেলেও কাঞ্চনের পাশ ছাড়ব না।
হ্যাঁ... ঠাকুর সাহেবের হৃদয়ে নিশ্চয়ই ব্যাথা হবে। তবে তিনি একজন বিচক্ষণ
ব্যক্তি এবং আমার অনুভূতি বুঝবেন। এখন আমাকে শুধু মাকে বোঝাতে হবে"
ঠিক করে, কাঞ্চনের জন্য
প্রয়োজন হলে সে মায়েরও বিরোধিতা করবে। যাইহোক, তার
মায়ের প্রতি তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে সে তার সুখের বিরুদ্ধে যাবে না।
কাঞ্চনের কথা মনে পড়তেই ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। ওর
মায়াবী মুখের কথা মনে পড়তেই সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। মস্তিস্কের সব ভার নেমে
এসেছে। কাঞ্চনের স্মৃতিতে হারিয়ে যেতে থাকে সে।
বেলা ১ টা বাজে।
শান্তা আপন মনে নদীর দিকে যাওয়া এবড়ো-খেবড়ো পথ ধরে হাঁটছিল। এ সময় সে তার ভাই
সুগনার জন্য খাবার দিতে মাঠে গিয়েছিল। তাকে খাওয়ানোর পর সে এখন নদীর দিকে
যাচ্ছিল।
এ সময় সুগনার জন্য খাবার নিয়ে প্রতিদিন মাঠে যেত
শান্তা। কিন্তু আজ সেও মাঠে কিছু কাজ করেছে। মাত্র এক ঘণ্টার পরিশ্রম তাকে
পুরোপুরি ক্লান্ত করে দিয়েছে। সে ঘামে ভিজে গেছে। এমতাবস্থায় বাড়ি যাওয়ার আগে
নদীতে গিয়ে গোসল করাই সঙ্গত মনে করল।
সে কোন গভীর চিন্তায় হারিয়ে পথ দিয়ে যাচ্ছিল এমন সময়
একটা পুরুষালী কণ্ঠ তার কানে এল। কন্ঠটা জোড়ালো ছিল আর সে ছিল নিজের ভুবনে ফলে
চমকে উঠল। কণ্ঠের মালিকের চোখ পড়তেই তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। তাকে দেখে শান্তার
মনটা কেঁপে ওঠে।
“আচ্ছা, তুমি।” নিঃশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে শান্তা বললো-
"নালায়েক বিরজু, কেউ কি কাউকে এমন আওয়াজ দেয়? আমাকে
ভয় পাইয়ে দিয়েছ।"
“ভুল হয়ে গেছে বুয়া। কোথায়
যাচ্ছেন?” বিরজু তার কালো দাঁত দেখিয়ে হাসল।
“এর সাথে তোমার কি সম্পর্ক? আমি
যেখানেই যাই। কেন জিজ্ঞেস করছো?” বুয়া
জিজ্ঞেস করল।
“আরে বুয়া, আমাদের
যদি একটাই গন্তব্য হয় তাহলে আমরা একসাথে যাব না কেন।” বিরজু দুই অর্থপূর্ণ কথায় বলল।
শান্তা অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"তোমার মতো পাপীর চেয়ে আমি একাই ভালো আছি। "
“আমি কি করলাম, বুয়া, আপনি
আমাকে পাপী বলছেন?” বিরজু কাছে পৌঁছে বলল। “আমি
কখনো আপনার শ্লীলতাহানি করিনি... আপনাকে হয়রানি করিনি, আপনাকে
কখনো নোংরা কথা বলিনি, আপনার শরীর স্পর্শও করিনি। তাহলে আপনি
আমাকে পাপী বলছেন কেন?” বিরজু ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত শান্তার
শরীরের দিকে তাকিয়ে রইল।
শান্তা তার কামুক চোখের কাঁটা নিজের শরীরে অনুভব করে
মৃদু কেঁপে উঠল। বিরজুর তৃষ্ণার্ত চোখ তার নাজুক অঙ্গে গড়িয়ে পড়তে দেখে তার
শরীরে প্রবল শিহরণ জাগে। নিজের স্বামীর অনুভূতিতে ভেজা সেই মুহূর্তগুলোর কথা তার
মনে পড়ে। কি একটি পাগল মুহূর্ত ছিল। সে কি মজার মধ্যে ডুবে ছিল। আজ আবার সেই একই
জ্বর ধীরে ধীরে গ্রাস করছে তাকে। নেশায় তার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল।
শান্তা তার ভারী চোখের পাতা খুলে বিরজুর দিকে তাকাল।
তারপর বললো- "প্রথমে আমাকে বুয়া ডাকো না......! তুমি আমার থেকে মাত্র তিন
বছরের ছোট।"
“তাহলে কি বলব? শান্তা...?” শান্তার
বদলে যাওয়া মেজাজ দেখে বিরজু বলল।
সে ছিল একজন ঘাগু শিকারী। শান্তার চোখে আবেগের ঢেউ
ছড়িয়ে পড়তে দেখেছে সে। শরীরে উত্তাপ বেড়েই চলেছে তার। শান্তার মনের স্ফুলিঙ্গে
আরও একটু হাওয়া দেওয়া দরকার। তারপর সেই স্ফুলিঙ্গ শোলা হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগবে
না। সে এটাও জানতো যে শান্তা তার
কথার বিরোধিতা করলেও সে কোনো আওয়াজ করবে না।
“তোমার মনে যা চায় বলো ...
কিন্তু বুয়া বলো না।” কাঁপা কাঁপা গলায় বলল শান্তা।
“ঠিক আছে, শান্তা
... এখন বল... কোথায় যাচ্ছ?” বিরজু
কামুক সুরে বলল।
“আমাকে বল তুমি ঠিক কি চাও?” শান্তা
ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আমি তো চাই... আমি খুব দুষ্টু …
.কিন্তু তুমি যা খুশি দিয়ে দাও, আমি তাই
নেব.....শান্তা।” হাসিমুখে বলে। শান্তা কথাটার ওপর আবার
জোর দিল।
মাথা থেকে পা পর্যন্ত কেঁপে উঠল শান্তা। বিরজুর সাহস
দেখে সে অবাক হলো। কিন্তু কেন জানি রাগ হল না বিরজুর উপর.. বিরজুর চোখের দিকে
তাকালো, সেখানে সে লালসা ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না।
মেয়েটা কিছু বলল না। শুধু স্তব্ধ হয়ে বিরজুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার
হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। বিরজুর চোখের উত্তাপ সে নিজের ভেতরে অনুভব করতে
লাগল।
তারপর হঠাৎ এমন একটা ঘটনা ঘটল যা শান্তা কল্পনাও করেনি।
বিরজু এক হাতে ওর ঘাড় ধরে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখল।
শান্তা….বাকরুদ্ধ! এত
তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে সে কিছুই বুঝতে পারল না। বিরজু ঠোঁট কামড়াতে শুরু করেছে।
শান্তা কিছু করার আগেই বিরজু আরেকটি বিপর্যয় ঘটিয়েছে।
এক হাত ওর স্তনের উপর রেখে টিপতে থাকে।
শুধু শান্তার শরীর নয়, তার
আত্মাও কেঁপে ওঠে। বিদ্যুতের গতিতে তার শরীরে লালসার প্রবল ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু তারপরও তার বিরোধিতা অব্যাহত ছিল। শান্তা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে
ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল.....কিন্তু বিরজুর শক্ত হাতের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে
পারছিল না।
বিরজু তার ঠোঁট চুষতে থাকে আর তার স্তন টিপতে থাকে।
বিরজুর কঠিন হাতের স্পর্শ তাকে এখন উষ্ণ করে তুলছিল। এবার তার ঠোঁটও বিরজুর ঠোঁটের
সাথে মিশে যেতে লাগল। তার প্রতিবাদ এখন নিছক ভান। বিরজু ঘাড় থেকে অন্য হাত সরিয়ে
নিতম্বের ওপর রেখে কোমরের কাছে চেপে ধরল। শান্তা তার আরো কাছে চলে গেল। বিরজু ওর
পাছা টিপতে আর ঘষতে লাগলো।
বিরজুর ঠোঁট এখন ঘাড় আর বুকে ঘুরছে। শান্তার মুখ থেকে
একটা মিশ্র হিসি বের হতে লাগল। বিরজুর হাত তার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আঁকড়ে ধরতে
ব্যস্ত। শান্তার চোখ কখন বন্ধ হল টের পেল না। বিরজুর কারসাজিতে শুকনো পাতার মতো
উড়ে যাচ্ছিল শান্তা।
বিরজু এখন দেরি করা সঙ্গত মনে করল না। সে তার দুই হাত
শান্তার পাছার উপর রেখে তাকে উপরে তুলে দিল। হাতে নিয়ে ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল।
বিরজু তাকে ধরে মাটিতে লম্বা করে শুইয়ে দিতেই বিরজু একটি হাত তার উরুতে রাখল।
হঠাৎ! শান্তা ফিরে এসেছে! সে বিরজুকে একটা ধাক্কা দিয়ে
তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। বিরজু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
শান্তা তার শরীর আর নিঃশাষ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা
করছিল। নেশার উচ্ছ্বাসে তার চোখ লাল ও ভারী হয়ে উঠল।
“কি হয়েছে শান্তা?”বিরজু প্রফুল্ল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
“এম ... আমি এটা করতে পারবো না, বিরজু।” কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলল।
“কেন .....? সমস্যা
কি?” বিরজু অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আমি এই মুহুর্তে খোলা জায়গায়
এটি করতে পারি না .... দিবালোকে..আমি দুঃখিত।” শান্তা বলে বিরজুর উত্তরের অপেক্ষা না
করে নদীর দিকে ছুটে গেল।
বিরজু তার মুঠি মুঠো করে তাকে যেতে দেখছিল। সে চাইলেই
তাকে বাধ্য করতে পারত। কিন্তু তাকে শান্তাকে পেতে হবে শুধু ভালোবাসা দিয়ে। তাই
এবারের মত নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রাখে।
শান্তা নদীতে পৌঁছে গেছে। সে তাড়াতাড়ি কাপড় খুলে
নদীতে ঝাঁপ দিল। বুক ভরা জলে দাঁড়িয়ে নিজের জ্বলন্ত শরীরটাকে ঠান্ডা করার চেষ্টা
করল। সে শুধু পানির নিচে পেটিকোট পরে ছিল।
শরীরে আদর করতে করতে শান্তা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে
জ্বালাতন করতে থাকে। একটি হাত তার স্তন শক্ত করে টিপছিল, অন্যটি
তার যোনির দরজায় টোকা দিচ্ছিল।
শান্তার অস্থিরতা বাড়ছিল। সে হাতের আঙ্গুল দিয়ে যোনি
খোঁচাতে লাগল। বছরের তৃষ্ণা যোনি স্পর্শে গলে যায়। শান্তা রস ঝড়াতে চাইল। এই সময়
তার শরীরে যে আগুন জ্বলছিল... রস ঝড়ানো ছাড়া নিভবে না। দেরি না করে একটা আঙ্গুল
ঢুকিয়ে দিল যোনির ভিতর। আঙুলটা যোনিতে ঢোকার সাথে সাথেই ওর মুখ থেকে আনন্দের একটা
হাল্কা চিৎকার বেরিয়ে এল। সেই সাথে ওর চোখ দুটো মজায় বন্ধ হয়ে গেল।
চোখ বন্ধ করতেই বিরজুর ছবি ভেসে ওঠে মনে। শান্তার হাত
আরও দ্রুত চলতে থাকে। সে তার অন্য আঙুলটিও যোনির ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর আঙুলের
গতি বেড়ে গেল। ওর মনে হল যেন বিরজুর হাত ওর যোনির উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর
তার শরীর কেঁপে উঠল... তারপর প্রবল চিৎকারে তার যৌবনের রস যোনি দিয়ে প্রবাহিত
হয়ে জলে মিশে গেল। সেই রস নদীর জলে ভেসে যায়।
২৯
বেলা তিনটা বাজে। শান্তা তার ঘরে খাটে শুয়ে গভীর
দুশ্চিন্তায় মগ্ন। শান্তার ভাবনার ভিত্তি হলো নদীর পথে বিরজুর সাথে ঘটে যাওয়া
ঘটনা।
সে ভাবছিল আজ সে কেমন লাঞ্ছিত হল। সে কি করে এতটাই
অসহায় হয়ে গেল যে বিরজুর মতো একজন লম্পট তার অঙ্গ স্পর্শ করতে থাকল... ঘষতে থাকল
এবং সে তাকে প্রতিরোধ করতেও পারল না। সে আগে এতটা দুর্বল ছিল না...তাহলে আজ সে
এতটা দুর্বল হল কিভাবে যে একজন পরপুরুষ তার সাথে যথেচ্ছ কাজ করতে থাকে এবং সে তাকে
ইচ্ছামত সবকিছু করতে দেয়।
শান্তা খারাপ মহিলা ছিল না। সে ছিল উত্তম চরিত্রের
নারী। যৌবনেও এমন জঘন্য কাজ সে কখনো করেনি, যে কারণে
আজকের ঘটনা মনে পড়লে তার আত্মা রক্তাক্ত হচ্ছে। তবে এতে তার কোনো দোষ ছিল না। সর্বোপরি, সেও
রক্ত মাংসের তৈরি। আবেগও ছুটছিল তার মধ্যে। সেও কাউকে খুঁজতে চেয়েছিল। তার শরীরও পুরুষমানুষের
শরীরের নিচে পিষ্ট হতে চেয়েছিল। এটা একটা স্বাভাবিক প্রয়োজন... তার কোন নিয়ন্ত্রণ
ছিল না।
৮ বছর ধরে শারীরিক সুখ থেকে বঞ্চিত শান্তা। একটি যুবতী শরীর কতক্ষণ ক্ষুধার্ত
থাকতে পারে? কোনো না কোনো সময় তাকে ভেঙে পড়তে হয়।
যখন তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায় তখন তার বয়স ছিল ২৮
বছর। পাশের গ্রামে বসবাসকারী দিনেশ চৌধুরীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। তখন দীনেশের
আর্থিক অবস্থা খুব ভালো ছিল। শান্তার পাশাপাশি সুগনাও এই সম্পর্ক নিয়ে খুশি ছিল।
বিয়ের কিছুদিন পর একসঙ্গে কিছু বদভ্যাসের শিকার হন
দিনেশ। মদের পাশাপাশি তিনি বাইরের নারীদেরও স্বাদ নিতে শুরু করেন। একসময় এসবের
মধ্যে ডুবে গেলে কাজে তার মনোযোগ ছিল না। ফলে তার আর্থিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
তার ফলে দু’বছরের মধ্যে তার আর কিছুই বাকি
রইল না। বাড়ি নেই, ব্যবসা নেই। কিন্তু মদের অভ্যাস তখনও
টিকে ছিল। বাড়ির অবনতি ও স্বামীর অভ্যাস দেখে ক্লান্ত হয়ে শান্তা তার ভাইয়ের
বাড়িতে চলে যায়। শান্তার বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর দীনেশও তারপর শ্বশুরবাড়ির
লোকজনকে হুমকি দিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করে। কিন্তু শ্বশুর বাড়িতে গিয়েও তার
অভ্যাসের উন্নতি হয়নি। এখানেও তিনি মদ ও নারীদের পিছনে দৌড়াতে থাকেন। সুগনা তার
অভ্যাসের সাথে পরিচিত ছিল, তবে সেও বোনের
কথা চিন্তা করে খুব বেশি কিছু বলে না। কিন্তু একদিন তার সঙ্গে দীনেশের প্রচণ্ড
ঝগড়া হয়। ফলে সুগনা তাকে মারধর করে। মারধরে আহত হয়ে দীনেশ শান্তাকে ছেড়ে চলে
যায়। যাবার আগে শান্তার কাছে গিয়ে বলে সে আর ফিরে আসবে না। কিন্তু সে সময়
শান্তা তার কথাকে সিরিয়াসলি নেয়নি। তার মনে হয় সন্ধ্যার মধ্যেই দীনেশের রাগ ও
নেশা কমে গেলে সে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু তা হয়নি। সেদিনের পর দীনেশ আজ পর্যন্ত ফিরে
আসেনি। সে কোথায় গেছেন কেউ জানত না। সে বেঁচে আছেন কি না তাও ছিল রহস্য। গত ৮ বছর
ধরে বিধবার মতো জীবন কাটাচ্ছিল শান্তা।
দীনেশ যখন শান্তাকে ছেড়ে চলে যায় তখন চিন্টুর বয়স ছিল ২ বছর এবং শান্তার বয়স ২৮
বছর।
২৮ বছর বয়সে, শুধুমাত্র
শান্তাই জানত যে স্বামী ছাড়া বেঁচে থাকা কেমন। কিভাবে এতদিন বিছানায়
কাটিয়েছেন...এটা তার মত একজন মহিলাই বুঝতে পারবে। সে একজন প্রবল ইচ্ছাশক্তি
সম্পন্ন মহিলা। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে সে নিজেকে খুবই দুর্বল ভাবতে শুরু করেছে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার নিঃসঙ্গতা এখন তাকে আরো বেশি কষ্ট দিচ্ছিল।
শান্তা তার ভাবনায় এতটাই হারিয়ে গিয়েছিল যে হঠাৎ কারো
ডাকে সে চমকে উঠল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল কাঞ্চন দাঁড়িয়ে আছে। ওর
চেহারায় বিভ্রান্তির ছাপ। চোখে মুখে একটা প্রশ্ন আর কিছু বলার জন্য ওর ঠোঁট ছলছল
করছে। “কি হয়েছে কাঞ্চন? কোনো
সমস্যা? কিছু চাই? এদিকে আয়।” শান্তা একসাথে প্রশ্ন করে।
কাঞ্চন এলো। তারপর বুয়াকে দেখে মৃদু হেসে বললো-
"বুয়া, এখন কোথাও যাবে?"
“না, জিজ্ঞেস
করছিস কেন? কোনো কাজ ছিল?” খাটের
উপর উঠে বসে শান্তা বলল।
“তুমি বলতে না বুয়া .... আমি
কখনো বাসায় থাকি না তাই তুমিও কোথাও যেতে পার না। এখন আমি বাসায় আছি... কোথাও
যেতে চাইলে যেতে পার।” নিষ্পাপ হয়ে বলল কাঞ্চন।
ওর কথায় শান্তার ঠোঁটে হাসি ফুটল। কাঞ্চনের দিকে আদর
করে তাকিয়ে বলল- "না মা, আমি কোথাও
যাচ্ছি না। আমি খুব ক্লান্ত তাই বিশ্রাম নিতে চাই। তুই গিয়ে তোর ঘরে বিশ্রাম কর।
আমি এখন কোথাও যেতে চাই না।"
শান্তার কথায় কাঞ্চনের মুখে বিষাদ ভেসে উঠল। কাঞ্চনের
মুখের দিকে শান্তা তাকিয়ে ছিল কিন্তু এবার শান্তা অন্য চিন্তায় ডুবে আছে তাই সে
কাঞ্চনের মুখে বিষাদ দেখতে পেল না। সে আবার খাটের উপর ফিরে শুয়ে পড়ে।
কাঞ্চন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে, তারপর
শান্তার দিকে তাকিয়ে বাইরে চলে যায়। বারান্দায় এসে অস্থিরভাবে হাঁটতে লাগল।
সেখানে থাকতে থাকতেই চোখ যায় মাটির দেয়ালে ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা বুকে ঠকঠক
করে হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
তাকে রবির সাথে দেখা করতে যেতে হবে ৫টায়। সে আজ রবিকে
নিজের হাতের বানানো ক্ষীর খাওয়াতে চেয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হল শান্তা বাড়ীতে
থাকাতে সে ক্ষীর বানাতে পারছে না। শান্তা তাকে ক্ষীর বানাতে দেখলে নানা ধরনের
প্রশ্ন করতে শুরু করবে। কিন্তু ক্ষীর তো তাকে তৈরি করতেই হবে। ক্ষীর ছাড়া সে রবির
সাথে দেখা করতে যেতে পারে না।
সে বারান্দায় ঘুরতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার শান্তার ঘরের দরজা পর্যন্ত গেল।
ভেতরে তাকাল সে। শান্তা খাটের উপর চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছিল। শান্তাকে ঘুমোতে দেখে
কাঞ্চনের মনে ভাবনা ভেসে উঠল। সে আস্তে আস্তে শান্তার ঘরের দরজা ঠেলে দিল, তারপর
ক্ষীর বানানোর সব উপকরণ বের করে উঠানে এল। অল্প সময়ের মধ্যে চুলা জ্বালিয়ে দেয়।
চুলার আগুন ধরে যাওয়ার সময় সে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সে ঠিক করে ফেলেছিল শান্তা
ঘুম থেকে ওঠার আগেই ক্ষীর বানাবে। সে দ্রুত হাত নাড়ছিল। সেই সাথে সে মনে মনে
প্রার্থনা করছিল যেন আজ তার বুয়া কুম্ভকর্ণের মত ঘুমায়। ৫ টার আগে যেন চোখ না খুলে।
প্রায় ১ ঘন্টা পরিশ্রমের পর কাঞ্চন ক্ষীর বানায়। তারপর
একটা ছোট পাত্রে ক্ষীর রেখে অন্য সব পাত্র ধুতে বসল। যাতে বুয়া জানতে না পারে যে
সে ক্ষীর বানিয়েছে।
সব কাজ শেষ করে ঘড়িতে সময় দেখলেন, ৪টা
১৫ মিনিট। শান্তা তখনও
নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিল। উঠানে এসে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশের দিকে তাকাতেই তার
হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল। সূর্য আকাশ থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। আর তার জায়গায় কালো
মেঘ তাদের চাদর বিছিয়ে দিতে শুরু করেছে।
কাঞ্চনের মন খারাপ হয়ে যায়। রবির সাথে দেখা করতে যেতে
তখনো ৪৫ মিনিট বাকি। তার আগে যদি বৃষ্টি শুরু হয়, তাহলে
বড় সমস্যা হয়ে যাবে। অসহ্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ক্ষীর বানানোর পর
ওর মুখে যে সুখ ছিল তা এখন কেটে গেছে, এখন তার
জায়গায় দুঃখের মেঘ ঢালতে শুরু করেছে। কাঞ্চন বিষন্ন মনে বারান্দায় এসে অস্থির
হয়ে হাঁটতে থাকে। বারবার চোখ গেল ঘড়ির দিকে। আজ ঘড়ির কাঁটাও যেন আজ থেমে গিয়েছে।
কাঞ্চন আবার উঠানে গেল আবহাওয়ার অবস্থা দেখতে। আকাশের
দিকে তাকালে তার মুখ পাতলা হয়ে গেল। আকাশে ঢেউ খেলানো কালো মেঘ আরও ঘন হয়ে উঠেছে।
সে ভাবতে থাকে ”এখনই আমার স্যারের সাথে দেখা
করতে যাওয়া উচিত....এমন না হয় যে বৃষ্টি শুরু হয়...আর বৃষ্টির শব্দে বুয়া জেগে
ওঠে। তখন আমার আর বের হওয়া হবে না। হ্যাঁ এটাই ঠিক হবে।
কাঞ্চন তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে এসে প্রথমে ক্ষীরের
বাক্সটা তুলে নিজের উড়নার ভিতর লুকিয়ে রাখল। তারপর শান্তার ঘরের ভিতর তাকাল।
শান্তা তখনও ঘুমাচ্ছিল। কাঞ্চন ধীরে ধীরে যেমন ছিল তেমনি দরজা বন্ধ করে উঠোনে
প্রবেশ করল। চিন্টু খেলতে বেরিয়েছে। কাঞ্চন আস্তে আস্তে উঠোনের দরজা ঠেলে দ্রুত
উপত্যকার দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাঞ্চন সেখানে পৌঁছে গেল যেখানে সে
প্রতিদিন রবির সাথে দেখা করত। সে ঝর্নার তীরে অবস্থিত একই পাথরের উপর বসে, যে
পাথরের উপর বসে সে প্রতিদিন ঝরে পড়া ঝর্না দেখত। এ সময় তার শরীরে ছিল একই রঙের
একটি গোলাপি কুর্তি ও পাইজামা। তার হাতে ক্ষীরের বাক্স।
পাথরের ওপর বসে কাঞ্চন বারবার ফিরে তাকাচ্ছে। সে অধীর
আগ্রহে রবির জন্য অপেক্ষা করছিল। বারবার সে ক্ষীরের বাক্সের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে।
ভাবছিল রবি তার তৈরি করা ক্ষীর পছন্দ করবে কিনা। ক্ষীর বানানোর পর কাঞ্চন স্বাদ নিয়েছিল।
রাতের বেলা বুয়ার নির্দেশে তৈরি করা ক্ষীরের মতো সুস্বাদু হয় নি। তাড়াহুড়ো করে
কাঞ্চন ক্ষীর রাতের মতো ভালো বানাতে পারেনি।
ক্ষীরের সাথে সাথে কাঞ্চনকে হয়রান করছিল আরেকটি
উদ্বেগ। দ্বিতীয় উদ্বেগটি ছিল আকাশে ঘোরাফেরা করা কালো মেঘ, যা
দ্রুত বায়ুমণ্ডলকে গ্রাস করছে, এটিকে একটি
ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছে। প্রবল বাতাস আর আবহাওয়ার পরিবর্তনে কাঞ্চনের ছোট্ট মনটা অস্থির
হচ্ছিল।
ঘাড় তুলে আকাশে মেঘের উড্ডয়ন দেখছিল, তখন
তার মুখে বৃষ্টির ঘন ফোঁটা পড়ল। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি
শুরু হয়।
কাঞ্চন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান
থেকে একটু দূরে ফাঁপার মতো একটা বিশাল পাথর। পাথরটি এত বড় ছিল যে এর নীচে কয়েক
ডজন লোক বৃষ্টি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারত। কাঞ্চনের মনে হল সেই পাথরের আড়ালে
চলে যাবার, কিন্তু পরের মুহুর্তের চিন্তায় তার পা
থেমে গেল যে, স্যার যদি এই সময়ে এসে তাকে দেখতে না
পান, পাছে স্যার হতাশ হয়ে ফিরে যান। হয়ত বুঝবে বৃষ্টির
কারণে কাঞ্চন আসতে পারেনি। এমতাবস্থায় স্যারের সাথে দেখা হবে না। এই ভেবে কাঞ্চন
ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। পাথরের আশ্রয় নেওয়ার ধারণা ছেড়ে দেয়।
বৃষ্টির ফোঁটা এখন তীব্র হতে শুরু করেছে। কাঞ্চন
ক্ষীরের জন্য চিন্তিত ছিল, পাছে
বৃষ্টিতে ভিজে তার ক্ষীর ঠান্ডা হয়ে যায়। সে ঘাড় থেকে উড়না খুলে ফেলল এবং
ক্ষীরের বাক্সটা শক্ত করে মুড়ে দিতে লাগল। তারপর রাস্তার দিকে একদৃষ্টি রেখে
পাথরের উপর বসে পড়ল। সে তার গর্ভে ক্ষীরের বাক্স লুকিয়ে রাখছিল। নিজের ভিজে
যাওয়া নিয়ে সে চিন্তিত ছিল না.... সে ক্ষীরের জন্য চিন্তিত। এভাবে ভিজে যাওয়ার
কারণে সে যে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে সে চিন্তাও তার ছিল না…..
সে চিন্তিত ছিল যে ক্ষীর ভিজে ঠান্ডা হয়ে না যায়…… স্বাদ
না নষ্ট হয়ে যায়। স্যার না বলে যে তুমি ক্ষীর বানাতে জান না, কাঞ্চন।
এ সময় নিজের চেয়ে ক্ষীর নিয়ে বেশি চিন্তিত। একইভাবে বসে সে বৃষ্টিতে ভিজতে
থাকল।
বৃষ্টি এখন পূর্ণ গতিতে পৌঁছেছে। মুষলধারে বৃষ্টি আর
সাঁই সাঁই দমকা হাওয়ায় পরিবেশ সঙ্গীতে ভরে ওঠে। কিন্তু বৃষ্টির এই মিউজিক এ
সময়ে কাঞ্চনকে মোটেও পছন্দ হচ্ছিল না। বৃষ্টির ঠান্ডা এবং প্রবল বাতাসের কারণে সে
মারা যাচ্ছিল। বাতাসের সাথে পানির ছিটা তার শরীরে পড়লে তার মনে হয় কেউ তার শরীরে
শত শত সূঁচ দিয়ে বিদ্ধ করেছে। ঠান্ডায় তার শরীর কুঁচকে যাচ্ছিল। সারা শরীরে
প্রবল কাঁপুনি। দাঁতগুলো এমনভাবে বাজছিল যেন চোয়াল থেকে বেরিয়ে আসবে।
ঘণ্টাখানেক একই পাথরের ওপর বসে থাকা কাঞ্চন বৃষ্টির
প্রহারে ভুগতে থাকে। এক ঘণ্টা পৃথিবী ডুবিয়ে রেখে বৃষ্টি চলে গেল। বৃষ্টি থামতেই
কাঞ্চন কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর স্যারকে তার চোখে দেখার আশায় সে পথের দিকে
তাকাল যেখান থেকে রবি আসবে। কিন্তু দূরে কোথাও রবিকে দেখা যাচ্ছিল না। ব্যথায় তার
চোখ ভিজে ওঠে। তার স্যার তখনও আসেননি।
প্রবল বৃষ্টিতে কাক ভেজা, তার
ওপর রবির অনুপস্থিতি। যন্ত্রণা
কাঞ্চনের গভীরে পৌঁছতে থাকে। সে অনেকক্ষণ ধরে পথ চেয়ে খুঁজতে থাকে। হতাশায় তার মন
ভরে উঠছিল। তার মনে হলো তার স্যার আর আসবেন না। এত বৃষ্টিতে এখানে আসার বোকামি সে
দেখাবে না। স্যার তার মত পাগল নন যে এমন আবহাওয়ায় তার সাথে দেখা করতে আসবে।
কিন্তু অন্য মন বলছিল স্যার অবশ্যই আসবেন। সে আমাকে ভালোবাসে, সে
আমাকে এভাবে যন্ত্রণা দিতে পারে না, একটু অপেক্ষা
করি সে অবশ্যই আসবে।
ভেজা কাপড়ে আটকে কাঞ্চন আবার সেই একই পাথরের ওপর বসল।
হাঁটুতে মাথা রেখে কাঁদে। এই মুহুর্তে তার মনে হলো কেউ যেন তার সব কিছু কেড়ে
নিয়েছে…যেন সে পুরোপুরি ছিনতাই হয়ে গেছে… তার
মনে হলো সে যেন সমুদ্রের মাঝখানে একা নৌকায় বসে ডুবে যাচ্ছে কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে
আসছে না। কাঞ্চন ঠান্ডায় কাঁপতে থাকে।
৩০
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। এবার বৃষ্টির আওয়াজ শেষ হয়ে
গেল। পাখিরা বাসা থেকে বের হয়ে এদিক ওদিক আনন্দে কিচিরমিচির করতে লাগল। বৃষ্টির
পরে, প্রতিটি বস্তু নরম-বিন্দু এবং ধুলোময় দেখা গেছে।
বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে পড়ল। পরিবেশ এতটাই মনোরম হয়ে উঠেছিল যে, এখানে
যে কোনো ক্লান্ত মানুষ এলে এখানকার অপরূপ দৃশ্য দেখে তার সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে
যায়।
কিন্তু এসব বিন্দুমাত্র ভাল লাগছে না কাঞ্চনের।
প্রকৃতিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরো সৌন্দর্যটাই এ সময় তার কাছে বিবর্ণ হয়ে
গেছে। পাখির কিচিরমিচির তার কানে বিষ ঢেলে দিচ্ছিল। এখানে সবকিছুই তার ইচ্ছার
বিপরীত মনে হয়।
কাঞ্চন হঠাৎ তার পেছনে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেল।
সে হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। পিছন ফিরে দেখে রবি আসছে।
রবি তার ট্রাউজার উঁচিয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে, ভেজা
মাটিতে সাবধানে পা বাড়াচ্ছে। তাকে দেখে কাঞ্চনের কান্নার তীব্রতা আরো বেড়ে গেল।
তবে এবার আনন্দে।
কাঞ্চন রবিকে দেখে তার দিকে তাকাল যেন সে একটি ছোট
মেয়ে। আর কেউ হয়ত তাকে একা ফেলে চলে গেছে ঘন জঙ্গলে। যেখানে সে ভয়ে ঘণ্টার পর
ঘণ্টা একা একা ভেসে বেড়াচ্ছে। আর এখন রবিকে দেখে ছুটে এসেছে তার আশ্রয়ে।
রবি যখন তাকে তার দিকে আসতে দেখে, সেও
হাত ছড়িয়ে দেয়। কাঞ্চনকে বাহুতে আটকে নেয়। সে খেয়ালও করেনি যে তার জামাকাপড়
ভিজে গেছে। এই সময়ে রবির জামাকাপড়ও ভিজে যাচ্ছে।
কিন্তু রবি একটু পরেই বুঝতে পারে সে ভিজে গেছে। সে অবাক
হয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকাল। বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল। রবি তার কান্না দেখে
ভয় পেয়ে গেল। কাঞ্চনকে কাঁদতে সে সহ্য করতে পারে না। সে কাঞ্চনকে দুহাতে শক্ত
করে জড়িয়ে ধরল। ওকে আতঙ্কিত লাগছিল। রবি কিছুক্ষণ কাঁদতে দিল। আর ভাবতে থাকলো
কাঞ্চন কাঁদছে কেন? কেমন করে সে ভিজে গেল?
এক হাতে কাঞ্চনকে বুকের কাছে ধরে অন্য হাতে মুখ তুলল।
তারপর গালে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলো - "কি হয়েছে কাঞ্চন? কাঁদছো
কেন? ভিজে গেলে কেমন করে?"
“আমি আপনার জন্য অপেক্ষা
করছিলাম স্যার... কিন্তু আপনি যখন সময়মতো আসেননি, তখন
আমি খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।” কাঞ্চন কান্না মাখা গলায় বলল।
“আমি মাত্রই প্রাসাদ থেকে বের হচ্ছিলাম, কাঞ্চন...
তখনই বৃষ্টি শুরু হলো। আর আমি সেখানেই থেমে গেলাম।” রবি ওর চোখের জল মুছাতে মুছাতে বলল-
"কিন্তু ভিজলে কেমনে? বৃষ্টিতে
ভিজতে ভালো লাগে?"
কাঞ্চন অস্বীকারে মাথা নাড়ল, ভেজা
চোখে রবির দিকে তাকিয়ে আছে।
“তাহলে ভিজে গেলে কেন? গাছের
নিচে গেলে না কেন?” রবি আবার জিজ্ঞেস করল।
“তোমার জন্য..."
“আমার জন্য...? মানে?” অবাক
দৃষ্টিতে কাঞ্চনের দিকে তাকাল রবি।
“আমি এখানে অনেক আগেই এসেছি।
আমার আসার কিছুক্ষণ পরই বৃষ্টি শুরু হলো। মনে হচ্ছিলো পাথরের নিচে চলে যাই। কিন্তু
তুমি এলে, পাছে আমাকে না পেয়ে ফিরে যাও। তাই
আমি ওই উঁচু পাথরের উপর বসেছিলাম। তারপর আমি ভিজে....” এই বলে কাঞ্চন রবির দিকে তাকাতে
লাগলো।
কাঞ্চনের কথা শুনে রবির মন ভরে গেল। সে
অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঞ্চনের প্রেমে পড়ে যায়। জোড়ে কাঞ্চনকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে
কপালে চুমু দিয়ে বললো - “কেন ভাবছো
আমি তোমার সাথে দেখা না করে চলে যাবো? তোমার কি মনে
হয় আমি তোমাকে ভালোবাসি না? আমি তোমাকে
খুব ভালোবাসি। তাই এখন একটা জিনিস খেয়াল করো। আমার জন্য কখনো নিজেকে কষ্ট দিও না।
এখন তোমার জীবন শুধু তোমার নয়। তুমি নিজেকে কষ্ট দিলে আমি তোমার উপর রাগ করব।” রবি কথা বলে আলগা হাতে ওর একটা গাল
আঁচড়ালো।
কাঞ্চন হাসল।
“স্যার...” হাতের বাক্সটা খুলতে খুলতে কাঞ্চন
বলল- "আপনার জন্য ক্ষীর এনেছি। নিজের হাতে বানিয়েছি। এখনো গরম আছে স্যার।
আমি বাক্সটা ভিজতে দেইনি। "
ক্ষীরের বাক্সটা খুলে রবিকে দেখাল সে।
রবি অবাক হয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে থাকে, মাঝে
মাঝে ক্ষীরের বাক্সের দিকে তাকায়।
ঠাট্টা করে বলা কথাটা কাঞ্চন কতটা মনে রেখেছে সে অবাক হল। এবং তিনি তার জন্য ক্ষীর
তৈরি করে প্রবল বৃষ্টিতে ভিজেছে কিন্তু ক্ষীর ভিজতে দেয়নি। সে ভাবতে লাগলো -
"কাঞ্চন আমাকে এতটা ভালোবাসে। সে আমার ছোট্ট সুখকে কতটা মনেপ্রাণে সম্মান
করে। সে কষ্ট নিজে নেয় যাতে আমার কোনো কষ্ট না হয়।"
এই উপলব্ধি রবির হৃদয়কে ওর প্রতি শ্রদ্ধায় ভরিয়ে
দিয়েছিল। কাঞ্চনের মতো কোমল হৃদয়ের অপ্রতিরোধ্য প্রেমময়ী মেয়েকে পেয়ে সে
নিজেকে গর্বিত মনে করলো।
“কি হয়েছে স্যার?” রবিকে
চুপ করে দেখে কাঞ্চন বলল। কোন এক অজানা আশংকা থেকে তার হৃৎপিণ্ড অনিচ্ছাকৃতভাবে
স্পন্দিত হচ্ছিল। “খেয়ে দেখেন
স্যার....আমি নিজেই বানিয়েছি।"
রবি হাসল। তারপর কাঞ্চনের হাত থেকে বাক্সটা নিয়ে বলল-
"আমি অবশ্যই খাব। ক্ষীর আমার খুব প্রিয়। আর তুমি বানিয়ে দিলে স্বাদ আরোও
ভালো হবেই।"
কাঞ্চন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে
চিন্তায় নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিল যে, রবি তার ক্ষীর
কেমন পছন্দ করে? সে কৌতহল ভরা রবির দিকে তাকিয়ে ছিল।
রবি ক্ষীরের বাক্সে আঙুল ঢুকিয়ে ক্ষীরটা মুখে ভরে দিল। কাঞ্চনের কৌতূহল বেড়ে
গেল। সে টাক-টকি দেখতে থাকল। তার হৃৎপিণ্ড এমনভাবে স্পন্দিত হচ্ছিল যে এটি তার
পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে।
“উমমম... ওয়াও...!” হেসে উঠল রবি। “আমার
ভাগ্য খুলেছে কাঞ্চন, তুমি এত সুস্বাদু ক্ষীর বানাও।
আহা..... এখন বিয়ের পর তোর হাতের তৈরি ক্ষীর রোজ খাব।"
কাঞ্চনের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার শুকনো মুখের
তেজ ফিরে এল। স্যারের মুখ থেকে প্রশংসা পেয়ে গর্বে বুকটা ভরে গেল।
তবে ক্ষীর তেমন সুস্বাদু ছিল না। রবি কাঞ্চনের প্রশংসা
করলো শুধু তাকে খুশি করার জন্য। সে চায়নি কাঞ্চনের হৃদয়ে বিন্দুমাত্র আঘাত হোক।
না চাইলেও রবি সব ক্ষীর চাটতে থাকে। ক্ষীর খেতে খেতে কাঞ্চন আগ্রহের দৃষ্টিতে তার
দিকে তাকিয়ে রইল। যে মন কিছুক্ষণ আগে নানা রকম সন্দেহে ভুগছিল, সেই
মন এখন সুখের দোলায় চড়ে আকাশের উচ্চতায় ভ্রমণ করছে। এখন আর কিছু নিয়ে চিন্তিত
ছিল না। পরিবেশটা আবার মনোরম হল। পাখিদের টুইট এখন পছন্দ করতে শুরু করেছে।
প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য এখন তার চোখেও ভালো লাগছিল।
“জল.. জল কোথায়?” হঠাৎ
রবির কণ্ঠে চমকে উঠল কাঞ্চন। সে তাড়াহুড়ায় হুট করে পানি আনতে ভুলে গেছে। কাঞ্চন
ডানে-বাঁয়ে দেখতে লাগল। তার মুখ আবার বিষণ্ণ হয়ে উঠল। রবির বুঝতে বেশি সময়
লাগেনা। সে তাড়াতাড়ি বললো “সমস্যা
নেই, জল আনো নি ভালো হয়েছে। জল খাওয়ার পর আমার মুখ
থেকে ক্ষীরের স্বাদ চলে যেত। যা আমার ভালো লাগে না।” এই বলে রবি একটা গর্তে জমে থাকা
বৃষ্টির জলে হাত ধুতে লাগল।
“স্যার, আমি
আগামীকাল আবার জলের সাথে আপনার জন্য ক্ষীর বানাবো।” কাঞ্চন বলল।
“না ... মোটেও না।” রবি উঠে দাঁড়িয়ে রুমাল দিয়ে মুখটা
মুছে দিয়ে বললো- "এখন তোমার ক্ষীর আনতে হবে না। আজকের পর তোমার আমার জন্য
কষ্ট করতে হবে না। এখন যা খাওয়াতে চাও, বিয়ের পর
আমার বাড়িতে এসে খাইয়ে দিও। এখন তুমি শুধু একটা কাজ করো, আমাকে
ভালোবাসো, আমার কাছে এসো, আমার
সাথে বসে গল্প করো।” এই বলে রবি দুই হাতে মুখ ভরে নেয়। আর
তার চোখের দিকে তাকায়।
কাঞ্চনের চোখও থমকে যায় রবির দিকে। সেও লজ্জায় চোখ
বুজে রবির দিকে তাকাতে থাকে। তখন কোথাও একটা প্রবল বজ্রপাত হয় আর কাঞ্চন রবিকে
জড়িয়ে ধরে। রবিও তাকে তার শক্ত বাহুতে নেয়।
আবহাওয়া আবারও ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু এবার প্রচণ্ড
গর্জন। আকাশে আবার মেঘ জমতে শুরু করে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার গুঁড়ি গুঁড়ি
বৃষ্টি শুরু হয়।
রবি দ্রুত কাঞ্চনের সাথে পাথরের দিকে এগিয়ে গেল, যেটি
ঝর্নার খুব কাছে এবং বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য একটি ফাঁপা জায়গা ছিল। সেখানে
পৌঁছাতে তাদের প্রায় দুই মিনিট লাগে। কিন্তু ততক্ষনের মধ্যেই বৃষ্টির প্রবল ফোঁটা
তাদের ভিজিয়ে দিল। কাঞ্চন এমনিতেই ভিজে গিয়েছিল, কিন্তু
এখন রবিও প্রায় ভিজে গিয়েছিল।
কাল্লুর চোখ ভেজা। বৃষ্টির ফোঁটার কারণে না। এই
মুহূর্তে তার হৃদয় যে ব্যথা অনুভব করছিল তাতে তার চোখ ভিজে গেছে।
কাল্লু অনেকক্ষণ ধরে গোপনে কাঞ্চন আর রবিকে দেখছিল।
কাঞ্চন যখন একা দাঁড়িয়ে রবির জন্য অপেক্ষা করছিল তখন থেকেই সে সেখানে।
কাঞ্চনকে সেখানে একা অস্থিরভাবে দেখে কাল্লু বুঝল
কাঞ্চন ওখানে কারো সাথে দেখা করতে এসেছে। কিন্তু সে কার সাথে দেখা করতে এসেছে তা
জানার আগ্রহ তাকে সেখানে দাড় করিয়ে রাখে। গোপনে সব দেখছিল। কাঞ্চন একা বৃষ্টিতে
ভিজেনি। সেও ভিজে গেছে। কাঞ্চনের সাথে সাথে তার চোখ থেকেও অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল
এই ভেবে যে সে ছোটবেলা থেকে যাকে ভালোবেসেছে। যাকে দেখে এখন পর্যন্ত সে বেঁচে আছে, সে
অন্য কারো কাছে অকেজো। ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে, বৃষ্টিতে
ভিজে কাঞ্চনের কান্না, তারপর রবির আগমন, কাঞ্চনকে
জড়িয়ে ধরে, তাকে ক্ষীর খাওয়ানো এবং তারপর গুহার
ভিতরে যাওয়া। সে নিজের চোখে সব দেখেছে। আর এসব দেখে তার মন ভেঙ্গে কেঁদে উঠল।
কিন্তু আজ সে একা কাঁদতে চায়নি। আজ সে এমন একটা কাঁধ খুঁজছিল যার উপর মাথা রেখে
কাঁদতে পারে।
সেখান থেকে ভারী পদক্ষেপে ঘুরে দাঁড়াল। সে যখন উপরে
উঠল, দেখল নিক্কি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে
মুখে অসংখ্য প্রশ্ন। কাল্লু তাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর চোখ নামিয়ে দ্রুত
পথে চলে গেল। নিক্কি তাকে চলে যেতে দেখল।
৩১
পাথরের আশ্রয়ে আসতেই রবি ও কাঞ্চন কাপড় থেকে জল মুছতে
থাকে। দুজনেই কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ রবির চোখ গেল কাঞ্চনের দিকে। তাকে
দেখার সাথে সাথে তার শরীর মৃদু কাঁপতে থাকে। কাঞ্চনের ভেজা কাপড়ের ভিতর থেকে উঁকি
দিতেই তার নরম পেট দেখা যাচ্ছিল।
কাঞ্চনের মনোযোগ ওর দিকে ছিল না, সে
ঘাড় বেঁকিয়ে চুল থেকে জল ঝাড়তে ব্যস্ত। চুল থেকে জল বের করার জন্য সে বারবার
মাথা নাড়ছিল। এতে করে তার উঁচু বুক দোলা খাচ্ছে। রবি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার
সুন্দর পাহাড়ের দিকে। তার শরীরে প্রবল শিহরণ দেখা দিল। কাঞ্চনের উপর থেকে চোখ
সরিয়ে বৃষ্টির ফোঁটায় মনোযোগ দেয়। তারপর পাথরের উপর হেলান দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল।
কাঞ্চনও কিছুক্ষণের মধ্যে তার কাছে এসে তার পাশে বসল।
কাঞ্চনের খুব ঠান্ডা লাগছিল। ঠান্ডায় বারবার কুঁচকে যাচ্ছিল সে।
রবি মনোযোগ দিয়ে ওর দিকে তাকাল, ওকে
এই সময় খুব সুন্দর লাগছে। কয়েকটা ভেজা চুল তার মুখে লেগে ছিল, যা
তার মুখের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অপলক কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে রইল।
“কি দেখছেন স্যার?” কাঞ্চন
রবিকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেয়ে জিজ্ঞেস করলো।
“কাঞ্চন।” রবি ওর সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে
বলল। “কেউ বলেছে তুমি কত সুন্দর?"
রবির এই প্রশ্নে কাঞ্চন বিব্রত হয়। যাইহোক, সবাই
তার সৌন্দর্যের প্রশংসা করত। কিন্তু রবির মুখ থেকে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে
কাঞ্চনের মন লাফিয়ে উঠল। সে রবির মুখ থেকে আরও প্রশংসা শুনতে চাইল। “স্যার, আপনি
খুব ভালো, আপনি খুব ভালো কথা বলেন। আমি আপনার
মুখ থেকে নিজের সম্পর্কে শুনতে ভালোবাসি। আমার মন চায় আপনি শুধু কথা বলতে থাকুন
এবং আমি বসে বসে শুনি।"
“তুমি খুব সুন্দর, কাঞ্চন।” মুখের ওপরে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো
সরিয়ে রবি বলল। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আরও বলে- "মাঝে মাঝে মনে হয়
কাঞ্চন, তোমার সাথে দেখা না হলে আমার কি হতো? কোথায়
যেতাম? কেমন হতো আমার জীবন? তোমার
দেওয়া ভালোবাসা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। তোমার কাছে ঋণী আমি... যে তুমি আমাকে
তোমার যোগ্য মনে করেছিলে।"
“আপনি কি বলছেন, স্যার? আমি
আপনার কোন উপকার করার যোগ্য নই। আপনার মত একজন সঙ্গী পেয়ে আমি ধন্য।"
“তুমি জানো না কাঞ্চন, তোমায়
পেয়ে আমি কী পেলাম। তোমার আগমনে আমার প্রাণ ভরে গেছে, কাঞ্চন।
তোমার আগে আমার জীবন ছিল নির্জন মরুভূমির মতো।” আবেগে ভরা কথা বলল রবি।
“স্যার...!” রবির কাঁধে মাথা রেখে কাঞ্চন বললো- “ভালোবাসা, ভালোবাসা, স্নেহ
সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না, আমি শুধু
জানি তুমি আমার পৃথিবী, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, যদি
আমি কখনও ভুল করি, তুমি যা চাও শাস্তি দিও। কিন্তু আমার
উপর কখনো রাগ করো না, নইলে মরে যাবো।"
কাঞ্চনকে কোলে জড়িয়ে নিল রবি। কাঞ্চনও বিনা লজ্জায়
কোলে পড়ে গেল। রবির কোলে এসে কাঞ্চন সবদিক থেকে নিরাপদ বোধ করত। তার শক্তিশালী
অস্ত্রের বৃত্তে এসে সে কিছুতেই ভয় পেল না। সব ভয় থেকে মুক্ত।
কাঞ্চন তার উষ্ণ কোলে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। তাদের
উভয়ের জন্য, সেই মুহূর্তটি স্থবির হয়ে এসেছিল।
তারা নীরব কিন্তু তাদের হৃদস্পন্দন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। চোখ বন্ধ করে দুজনে
একে অপরের গায়ে শুয়ে পড়ল। তারা আর কোন কিছুতেই অবগত ছিল না। সময়ের জ্ঞানও ছিল
না তাদেরর। আবহাওয়াও নয়।
প্রায় ১ ঘন্টা কেটে গেল। বৃষ্টির শব্দও থেমে গেছে।
অন্ধকার গ্রাস করছিল আলোকে।
কিছুক্ষণ পর রবির চোখ খুলল। সে বাইরে তাকাল। আবহাওয়া
পরিষ্কার দেখে আস্তে আস্তে ডাকে কাঞ্চনকে। “কাঞ্চন
ওঠো, বাইরে দেখো বৃষ্টি থেমে গেছে। আর সন্ধ্যাও হয়ে
গেছে। তুমি বাড়ি যাবে না?"
রবির কন্ঠে কাঞ্চন সতর্ক হল। রবির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে
বাইরে তাকাল। “হাই রাম! কতক্ষন হলো। বুয়া আমাকে
মেরে ফেলবে।” এই বলে কাঞ্চন ক্ষীরের বাক্সটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
তারপর রবিকে দেখে বলল। “স্যার, এখন
আমাকে যেতে হবে। নইলে বাবা আর বুয়া সত্যিই মন খারাপ করবে।"
“ঠিক আছে। চল চল যাই।” রবি বলে কাঞ্চনের হাত ধরে বেরিয়ে
গেল।
রাস্তায় পৌঁছে কাঞ্চন রবির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে
বাড়ির পথে রওনা দিল। রবিও বাইকে বসে প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল।
কাল্লু তার বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটছিল। তার হৃৎপিণ্ড
বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ সময় তাকে খুব একা মনে হচ্ছিল। আজকের আগে কখনো এত একা
লাগেনি তার। কারণ তখন তার সাথে কাঞ্চন থাকতো, স্বপ্ন
থাকতো। কিন্তু আজ তার কাছ থেকে সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন না তার সেই ইচ্ছা ছিল,
না সেই স্বপ্ন।
সে প্রথম থেকেই জানত কাঞ্চনের সাথে তার কোন মিল নেই। সে
কখনই তার হতে পারেনি... কিন্তু তবুও তার মনে একটা আশা ছিল, যেটা
তার জীবনের ভরসা ছিল। কাঞ্চনকে নিজের মনে করে সব ধরনের কল্পনা করত। প্রতিদিন নতুন
স্বপ্ন বুনত। নিজের স্বপ্ন আর কল্পনার জোরে দিন কাটাত। কিন্তু এখন কাল্লু আর এমন
কিছু ভাবতে পারেনা। কারণ এখন সে জানে কাঞ্চনের হৃদস্পন্দন শোনার অধিকার অন্য কারো।
অন্য কারো শক্ত বাহু তার সুন্দর শরীরকে ঘিরে রেখেছে। কে তার ফুলের চেয়ে নরম ঠোঁটে
চুমু দিতে পারে, সে ঠোঁট অন্য কারো।
এইসব ভাবনায় হাহাকার করতে করতে কখন যে তার ভাঙা
কুঁড়েঘরে পৌঁছে গেল সে নিজেও জানে না। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে।
তার মা ভাঙ্গা খাটের উপর শুয়ে ছিলেন। বাড়ির সব
জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে গেছে। জমে থাকা বৃষ্টির জল তখনও তার টালির ছাদ থেকে
ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে।
কাল্লুর আসার শব্দে তার মা ঘুম থেকে উঠে খাটের উপর
বসলেন। কাল্লু ভারী পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মায়ের কাছে গেল। তারপর মায়ের পায়ের
কাছে ভেজা মাটিতে বসে মায়ের হাঁটুতে মাথা রাখল। তার মা তার বুড়ো এবং দুর্বল
আঙ্গুলগুলো তার চুলে নাড়াতে লাগল।
ধাত্রীর চোখ থেকে যেমন পেট লুকিয়ে থাকে না, তেমনি
মায়ের সামনে সন্তানের দুঃখও লুকিয়ে থাকে না। কাল্লুর মা এক নজরে জেনে গেল
কাল্লুর আজ মন খারাপ। যাইহোক, তিনি কাল্লুর
ব্যথা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে কাঞ্চনের জন্য যে আকুল আকুতি
তা তার অজান্তেই।
“কি হয়েছে কাল্লু? তোর
এত মন খারাপ কেন?” মাথার ভেজা চুলে আদর করতে করতে মা
জিজ্ঞেস করলেন।
“আমার মন খারাপ না মা। আজ আমি
খুব ক্লান্ত। আজ মনে হচ্ছে তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাই। আমাকে তোমার কোলে নাও না মা।” কাল্লু শত চেষ্টাতেও নিজের মনে দুঃখ
গোপন করতে পারল না।
ওর মা বুঝতে পেরেছে। আজ আবার কেউ তার কলিজার টুকরোর
হৃদয়ে আঘাত করেছে। আজ আবার কেউ এর দারিদ্র্য নিয়ে মজা করেছে। সে মাথা নিচু করে
তার কপালে চুমু দিল। “আমার
লাল.....আমি জানি আজ আবার কেউ তোমাকে হয়রানি করেছে। আমার কোলে মাথা রাখো।"
কাল্লু উঠে খাটের উপর শুয়ে পড়ল। তারপর মায়ের কোলে
মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করতেই কাঞ্চন আর রবির প্রেমে ভরা মিলন তার সামনে
নেচে উঠল.. বুকের মধ্যে একটা ব্যাথা জেগে উঠে চোখ ধাঁধিয়ে গেল, গলা
শুকিয়ে গেল যেন সে কয়েক মাস ধরে পিপাসার্ত ছিল। তার শত চেষ্টার পরও চোখ থেকে
অশ্রু ঝরতে শুরু করে। তার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে তার মায়ের বাহু ভিজিয়ে
দিতে থাকে।
ছেলের চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহ দেখে তার মাও কেঁদে
ফেললেন। কিন্তু তাকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া সে আর কিছু করতে পারেনি।
কিছুক্ষণ মায়ের কোলে মাথা রেখে চোখের জল ফেলার পর
কাল্লুর মনটা একটু ধুকপুক করে উঠল। সে একইভাবে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে।
পরবর্তী দিন ১১ টা হবে। নিক্কি তার জিপে বসে প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেল। তার দিক
ছিল সরপঞ্চের মাঠ। গতকাল থেকে তার হৃদয়-মনে একজনই। ওটা ছিল কাল্লু।
গত সন্ধ্যায় যখন সে কাল্লুর মুখোমুখি হয়, তখন
সে তার চোখে এমন ব্যথার প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়, যা
তাকে অস্থির করে তুলছিল। যখনই সে চোখ বন্ধ করত, তখনই
সে দেখতে পেত কাল্লুর বিষণ্ণ মুখ আর ক্ষতবিক্ষত চোখ।
গতকাল থেকে সে রবি আর কাঞ্চনের কথা ভাবছিল না। যেহেতু দিওয়ান
জি তাদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করেছেন। সে শুধু দিওয়ান জির ফিরে
আসার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আজ তার কাল্লুর সাথে দেখা করার ইচ্ছা হচ্ছিল। কাল্লুর
দুর্দশা সম্পর্কে সে কিছুটা ধারণা করতে পেরেছে। এবং এখন সে তার দুঃখের সাথে নিজের
চেহারা মেলাচ্ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জীপ এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে
সরপঞ্চের ক্ষেত পেরিয়ে সেখানে পৌঁছে গেল।
কাল্লুকে দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। প্রখর রোদে সে খালি
শরীরে ভেজা মাঠের মাটি কাটতে ব্যস্ত। আশেপাশের মাঠে একটা লোকও দেখা যাচ্ছিল না।
সরপঞ্চ জি সবসময় কাল্লুকে দিয়ে কিছু না কিছু কাজ করিয়ে নিতেন। কাল্লুও কখনো
অস্বীকার করেনি। কারন ক্ষেতে কাজ করার পরই তার ঘরের চুলা জ্বলতো। যদিও সরপঞ্চ জির
কাছ থেকে খুব কম টাকাই পেত। কিন্তু তা ছাড়া কাল্লুর কাছে আর কোনো উপায়ও ছিল না।
অন্য কেউ তাকে কাজ দিত না। গ্রামের অন্যান্য লোকেরা নিজেরাই নিজ নিজ মাঠে কাজ করত।
কেবল একজনই আছে সর্দার যার কিছু কাজা করার ছিল। সে অন্য কোন কাজ করতে পারত না, কারণ
সে ছিল বোকা। মাকে ছেড়ে গ্রামের বাইরে কাজে যাওয়ার সাহসও তার ছিল না। এ কারণেই
বিকেলে মুখিয়া যখনই কোনো কাজের কথা বলত, কোনো প্রশ্ন
না করেই সে কাজে লেগে যেত। এ সময়ও তার নির্দেশে কাজে ব্যস্ত। সে ঘামে ঢেকে গেছে। ঘামে ভেজা তার কালো শরীর সূর্যের
আলোয় চকচক করছিল।
নিক্কি জীপ থেকে নেমে মাঠের অর্ধেক আঁকাবাঁকা পাহাড়ের
ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাল্লুর কাছে পৌঁছে গেল। কাল্লু তার কাজে এতটাই হারিয়ে
গিয়েছিল যে সে নিক্কির আগমনের খবরও টের পায়নি।
নিক্কি তাকে নড়াচড়া করে দেখতে থাকে। কাল্লুর হাত
বেলচা দিয়ে তুললে তার শরীর থেকে সমস্ত নেশা দূর হয়ে যেত, বাহু
ফুলে চওড়া হয়ে যেত। নিক্কি ছোটবেলা থেকেই মানুষকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখতে পছন্দ
করে। কিন্তু এই সময়ে সে খুব অবাক হল যে সে এসেছে ১০ মিনিট হয়ে গেছে, কিন্তু
কাল্লু তাকে দেখতে ফিরেও তাকায়নি।
৩২
কাল্লু ঘামে ভিজে বেলচা চালাচ্ছিল। বেলচা দিয়ে দুহাত
উপরের দিকে তুলে মাটিতে জোরে মারে। সে মাটিকে এমনভাবে কোপাচ্ছিল যেন সে তার জন্মের
জন্য এই মাটিকে ঘৃণা করে।
কিছুক্ষণ নিক্কি ওকে বেলচা চালাতে দেখে তারপর আস্তে
আস্তে ডাকল। “কেমন আছো কাল্লু?"
কাল্লু নিক্কির কণ্ঠে চমকে ফিরে তাকায়। নিক্কির দিকে
তাকালেই তার চোখ বিস্ময়ে ভরে ওঠে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- "আপনি?"
নিক্কির চেহারা তার মুখের দিকে স্থির। সে কাল্লুর দিকে
মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। তার চোখ ফুলে গেছে এবং লাল হয়ে গেছে। যেন সারারাত
ঘুমায়নি, নাকি গভীর রাত পর্যন্ত কেদেছে। সেই
একই যন্ত্রণা এখনো তার চোখে মুখে। যা ছিল গতকাল সন্ধ্যায়। নিক্কি জিজ্ঞেস করলো -
"এত রোদে কাজ করছিলে কেন?"
নিক্কির কথায় মৃদু হাসল কাল্লু। তার হাসিতে বিরক্তি
ছিল। নিজের অসহায়ত্বে ব্যঙ্গ করে হাসে। “গরীব
শ্রমিক যদি রোদ-বৃষ্টির খেয়াল রাখা শুরু করে, তবে
তার ঘরের চুলা কখনো জ্বলবে না, নিক্কি জি।” তার কণ্ঠে কাঁপুনি। আরও বলে- "আপনি
বলুন? এখানে কিসের জন্য এসেছেন?"
“আমি তোমার সাথে দেখা করতে
এসেছি, তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।” নিক্কি উত্তর দিল - "তুমি কি
আমার সাথে ওই গাছের নিচে বসতে পারবে? এখানে খুব
রোদ, আমি এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারব না।"
“চলুন।” কাল্লু বলল ও বেলচাটা ওখানে মেধের উপর
রেখে পাত্রটা হাতে নিয়ে গাছের ছায়ায় চলে এল। তারপর নিক্কিকে জিজ্ঞেস করলো -
"বলুন কি বলতে চান?"
“গতকাল ঝর্নার ধারে যখন তোমাকে
দেখেছিলাম, তুমি খুব দুঃখ পেয়েছ। তোমার চোখে
গভীর যন্ত্রণা দেখেছি। কিন্তু কারণটা জানতে পারিনি। বল তো গতকাল কিসের জন্য মন
খারাপ ছিল?” নিক্কি কাল্লুর মুখে চোখ রাখল।
“এটা জেনে আপনি কি করবেন ...?” কাল্লু একটা মৃদু হাসি ছেড়ে
বললো “দুঃখ
আর কষ্ট দরিদ্রের গহনা, নিক্কি জি। এগুলো ছাড়া তাকে বিধবার
মতো লাগে।"
“কাল্লু ..... আমি তোমার কষ্ট
বুঝতে পারছি। কারণ আজ আমিও একই কষ্ট পাচ্ছি।” কাল্লুর কথায় আবেগে আপ্লুত হয়ে
নিক্কি বললো- "তুমি কাঞ্চনকে ভালোবাসো, তাই না?"
কাল্লু হতভম্ব! সে অবাক হয়ে নিক্কির দিকে তাকাল। সে
নিক্কির মুখে গভীর দুঃখের মেঘ দেখতে পেল। সেও তার চোখে একই ব্যথা অনুভব করে। যে
যন্ত্রণায় সে সারারাত হাহাকার করছিল।
“হ্যাঁ কাল্লু, আমি
রবিকে ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু সে আমাকে নয় কাঞ্চনকে ভালোবাসে।” কাল্লুর বিভ্রান্তি দূর করে নিক্কি
বললো - "আমি গতকালই বুঝতে পরেছি তুমি কাঞ্চনকে ভালোবাসো। কিন্তু আমি তোমার
মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম। বলো, তুমি কি
কাঞ্চনকে ভালোবাসো?"
কাঞ্চনের স্মৃতিতে তার চোখ ভিজে যায়, সকাল
থেকেই সে কাঞ্চনের চিন্তায় মগ্ন। কিন্তু এখন নিক্কির আদর পেয়ে তার কষ্ট বেরিয়ে
এসেছে। কিছু বলার আগেই তার চোখ থেকে দু ফোঁটা জল বেরিয়ে গালে ছড়িয়ে পড়ল। সে
অসহায়ভাবে ঠোঁট কামড়াতে লাগল। নিক্কির দিকে তাকাল সে। নিক্কি তার দিকে তাকিয়ে।
কাল্লু নিক্কিকে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু মন তাকে সমর্থন করেনি।
“কিছু বলো না কাল্লু, আমি
সব বুঝি। তোমার চোখ থেকে অশ্রু বয়ে যাওয়া আমাকে সব বলেছে যা আমি জানতে চাইছি।“ কাল্লুর যন্ত্রণায় নিক্কির নারী
হৃদয় গলে গেল। কাল্লুর দুঃখ টের পেয়ে তার চোখও বর্ষিত হলো।
“নিক্কি জি। আমি খুব হতভাগ্য
মানুষ, ছোটবেলা থেকে দুঃখ ছাড়া কিছুই পাইনি। যেই আমার
সাথে দেখা করেছে, সবাই আমাকে তুচ্ছ করেছে, কেউ
আমাকে জড়িয়ে ধরেনি।” কাল্লু স্তব্ধ কন্ঠে বললো- "আজ
আমি কাঁদছি শুধু এই জন্য যে আমি ছোটবেলা থেকে যাকে চেয়েছি সে অন্য কাউকে চায়।
কিন্তু আজ আমার চোখ কাঁদছে কারণ আজ কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেছে কেন আমি দুঃখিত। কেউ
জানতে চেষ্টা করেছে আমি কি চাই।
আমি তখনই আবেগি হই যখন কেউ আমাকে সহানুভূতি দেখায়। আমার সাথে স্নেহপূর্ণভাবে কথা
বলে। কারণ আমি এতে অভ্যস্ত নই নিক্কি জি। আমি ছোটবেলা থেকে মানুষের গালাগালি খেয়ে
বড় হয়েছি। আমি কারো সহানুভূতি পছন্দ করি না। মানুষের ভালোবাসার কথা আমাকে
কাঁদায়। তাই হাত জোড় করে অনুরোধ করছি আমার সাথে এমন কথা বলবেন না যাতে আমার কষ্ট
বাড়বে। কাঞ্চনকে ভালোবাসাটা আমার ভুল ছিল। আমি
এখন তাকে ভুলে যেতে চাই। আপনিও ভুলে
যান কি দেখেছেন, কি দেখেননি। এই গরীবের প্রতি দয়া করুন এবং আপনার
সহানুভূতি থেকে আমাকে দূরে রাখুন। আমি এটা সহ্য করতে পারি না.. আমি মারা যাব।” কথাটা বলে থেমে গেল কাল্লু।
একটা ছুরি ঢুকে গেল নিক্কির বুকে। সে যন্ত্রণায়
কাতরাচ্ছিল। তার মনে হলো কেউ যেন তার বুকে ছুরি দিয়ে তার
হৃদয় বিদ্ধ করছে। "আমার সাথে কি হচ্ছে?” সে
বিড়বিড় করে বললো- "এটা কেমন ব্যথা আমার বুকে উঠছে? এটা
কাল্লুর ব্যথা নাকি অন্য কিছু?” নিক্কি
হাসছে। সে তার বুকে ঘষতে লাগল। নিজের ভেতরে
কিছু পরিবর্তন অনুভব করে। সে জানত না তার সাথে কি ঘটছে তবে সে যন্ত্রণার
মধ্যে ছিল।
কাল্লুর কান্না থামলে সে নিক্কির দিকে তাকাল। নিক্কির মুখের দিকে তাকিয়ে তার চোখে বিস্ময়। নিক্কির চোখে জল ছিল। “নিক্কি
জি আপনি... কাঁদছেন কেন?"
“না কাদছি না, কান্নার মত মনে
হলো।” নিক্কি চোখের জল মুছতে মুছতে বললো -
"কিন্তু আজকের পর থেকে আর কখনো নিজেকে একা ভাববে না। আজ থেকে আমি
রোজ তোমার সাথে দেখা করবো, তোমার সাথে
এভাবে কথা বলবো। পরে যত খুশি কাঁদো।” বলে নিক্কি চলে যেতে লাগলো।
কাল্লু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে নিক্কির চলে যাওয়া দেখে। হঠাৎ নিক্কি ঘুরে তারপর দ্রুত
হাঁটতে হাঁটতে কাল্লু পর্যন্ত এসে বলল। - "আমাকে চুমু দাও।"
“হ্যাঁ ...!” কাল্লু
বলে উঠল।
“তুমি বুঝতে পারছ না নাকি?” নিক্কি
চোখ বুলিয়ে নিল। "আমি চুমু খাওয়ার কথা বলছি। আমাকে চুমু দাও।”
কাল্লুর মাথা কেঁপে উঠল। সে বুঝে উঠতে
পারল না নিক্কির কি হয়েছে? কাঁপা কাঁপা
গলায় বললো- "নিক্কি জি, বেচারা আমাকে
নিয়ে মজা করছেন কেন?"
“দেখো, আমি
জোকস পছন্দ করি না। আমি যাই বলছি আমি খুব সিরিয়াসলি বলছি।” নিক্কি গম্ভীর হয়ে বলল।
কাল্লু বোকার মত নিক্কির দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বুঝতে পারছিল না কেন নিক্কি তার প্রতি এত
দয়া দেখাচ্ছে। সে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“দেখ, আমি
তোমার প্রতি কোন মায়া করছি না, আমিও বুঝতে
পারছি না যে আমি তোমাকে ভালবাসতে শুরু করেছি। শুধু এখন আমার
তোমাকে চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।
তাই বলছি। আমাকে চুমু
দাও।” নিক্কি চোখ রাঙ্গালো।
কাল্লু তখনও বিভ্রান্ত। নিক্কি এগিয়ে গিয়ে ওর ঘাড় ধরে ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখল।
তার ঠোঁটে দীর্ঘ চুম্বনের পর সে তার থেকে আলাদা হয়ে
গেল। তারপর মুচকি হেসে বলল -
"এখন কেমন লাগছে?"
কাল্লু কিছু বলল না। সে পাগলের মত নিক্কির দিকে তাকিয়ে ছিল। নিক্কি একটা হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে
গেল।
৩৩
নিক্কি চলে যাওয়ার পর ১০ মিনিট কেটে গেছে, কিন্তু
কাল্লু তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে, গভীর
চিন্তায়। কিছুক্ষণ
আগের ঘটনাটা তার কাছে সিনেমার মত লাগছিল। সে
তখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। তার
কাছে মনে হলো এখানে যা কিছু ঘটেছে তা স্বপ্ন। নিক্কি এখানে এছেসে, তার সাথে আবেগে ভরপুর কথা বলা, তারপর
ধনী-গরিব, সাদা-কালো ভেদাভেদ মুছে তার ঠোঁটে
চুমু খাওয়া। এই সব তার
কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।
হ্যাঁ, এটা তার জন্য
সত্যিই একটা স্বপ্ন। যে মানুষটা
ছোটবেলা থেকেই মানুষের স্নেহ-ভালোবাসার জন্য আকুল। যাকে মানুষ সর্বদা হাসির পাত্র হিসেবে বিবেচনা করেছে। যাকে বারবার তুচ্ছ তাচ্ছিল্ল করেছে। সে কিভাবে এটাকে বাস্তব হিসেবে মেনে নিতে পারে? তার
জন্য এটা কেবল একটি স্বপ্ন।
কাল্লু অবাক হয়ে ভাবল যে আজ পর্যন্ত গ্রামে কাঞ্চন
ছাড়া আর কোন মেয়ে তার সাথে এমনভাবে কথা বলে নি। কেন আজ এমন হতভাগ্য ব্যক্তির উপর নিক্কি এত ভালবাসা
বর্ষণ করল? তার কালো কুৎসিত চেহারা দেখে গ্রামের
সব মেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিত, আজ কেন
নিক্কি তাকে চুমু দিল?
কাল্লুর কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না। কিন্তু এই ভেবে তার চোখ আবার জলে ভরে
গেল যে সে সবার বিদ্বেষী নয়। সেও
একজন মানুষ, তারও অধিকার আছে কাউকে চাওয়ার, কাউকে
ভালোবাসা, কারো স্বপ্ন দেখার। অন্যরা যা করে তা সেও চায় উপভোগ করতে।
কাল্লু ভেজা চোখে নিক্কি যে পথ দিয়ে গিয়েছিল সেই পথেই
তাকিয়ে ছিল। আজ তার হৃদয়
নিক্কির প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে গেল। তার
কাছে সে দেবীর চেয়ে কম ছিল না। যার
মধ্যে ছিল না সম্পদের অহংকার, না ছিল
সৌন্দর্যের অহংকার। কিছুক্ষণ
পথের দিকে তাকিয়ে থেকে কাল্লু আবার
মাঠে নামে ঘাম ঝরাতে।
যখন থেকে নিক্কি কাল্লুর সাথে দেখা করতে এসেছে, তখন
থেকেই সে তার কথা ভাবছিল। তার জীবনের
কথা জেনে গভীরভাবে মর্মাহত। সে
ভাবছিল- এত কষ্ট করেও মানুষ বাঁচে কী করে? ছোটবেলা
থেকেই সে একাকিত্বের শিকার। একাকীত্বের
যন্ত্রণা কী তা আমি ভালো করেই জানি। শুধু
মা বাবার কাছ থেকে দূরে থাকতেই কত দুঃখ পেতাম। নিস্তেজ লাগত জীবন। আর কাল্লু সারা জীবন একাই কাটিয়েছে। বন্ধু নেই, বান্ধবী
নেই। তার জীবন কতটা দুঃখজনক। মানুষ
কেন তাকে হীনমন্যতা নিয়ে তাকায়? কুৎসিত বলে? সে
কি মানুষ নয়? আমি অন্যদের মত তার হৃদয়ে আঘাত করব
না। কিন্তু আজ আমার কি হল? ওর
কথা শুনে আমার অদ্ভুত লাগতে লাগল। মনে
হচ্ছিল কেউ যেন আমার শরীরে ঢুকে মনের তারে জ্বালাতন করছে। আমার কি হয়েছিল কে জানে। কি যে বেদনা জাগে মনে মনে। কেমন যেন একটা অনুভুতি হচ্ছিল, যে
স্রোতে বয়ে আমি ওর ঠোটে চুমু খেয়ে বসে আছি। সে কতটা নোংরা ছিল তাও আমি পরোয়া করিনি।
দরজায় হঠাৎ মঙ্গলুর আওয়াজ শুনতে পেলে
"বিবিজি"।
নিক্কি চমকে উঠে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে মঙ্গলুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
“মঙ্গলু কি হয়েছে?” নিক্কি
জিজ্ঞেস করল।
“বিবিজি .... খাবারটা এখানে আনবো
নাকি নিচে।” মঙ্গলু নিচু
গলায় জিজ্ঞেস করল।
“এখানে নিয়ে এসো।” নিক্কি মঙ্গলুর বলে উঠে বিছানায় বসল।
কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার দিয়ে মঙ্গল্লু চলে গেল। নিক্কি খুব ক্ষুধার্ত ছিল। সে মন থেকে কাল্লুর সাথে সম্পর্কিত
সমস্ত বিষয় সরিয়ে খেতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
শান্তার পা এগোচ্ছিল সুন্দরীর বাড়ির দিকে। আজ সুন্দরীর সাথে কথা বলার মুডে ছিল। কিছুক্ষণ পর শান্তা সুন্দরীর দরজায় পৌছে
তার পা থেমে গেল। সাধারণত
গ্রামের মানুষ ঘরের দরজা খোলা রাখলেও সুন্দরী তার ঘরের দরজা সবসময় বন্ধই রাখে।
শান্তা দরজার কড়া নাড়ে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে দিল সুন্দরী নিজেই।
“আসো দিদি, আজকে
আমাদের বাড়ির পথে কিভাবে?” সুন্দরী
তাকে দেখা মাত্রই হেসে বলল।
“বাড়িতে একা থাকতে ভালো লাগছিল
না ভাবী। তোমার সাথে
একটু দেখা করতে আসলাম। ভেতরে আসবো?” শান্তা
দরজায় দাঁড়িয়ে বলল।
“আরে দিদি, কেমন
কথা বলছ? ভিতরে আনো... কিসের এতো জিজ্ঞাসা করো? এটা
তো তোমারই বাড়ি।” এই বলে
সুন্দরী শান্তার হাত ধরে ভিতরে নিয়ে গেল।
শান্তা যেয়ে সোফায় বসল। সে আগেও এ বাড়িতে এসেছে। কিন্তু সেই সময় সুন্দরী মাত্র বউ হয়ে এসেছে এ বাড়িতে। এরপর থেকে সে আর এ বাড়িতে আসেনি।
বাড়ির সাজসজ্জার সমস্ত জিনিসপত্র রেখেছে প্রধানজি। এ বাড়িতে কোনো কিছুর অভাব নেই। শান্তা কিছুক্ষণ ঘরের জাঁকজমকের দিকে
তাকিয়ে রইল।
“দিদি
তোমার কি হয়েছে?” সুন্দরী
তাকে বাধা দেয়।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে শান্তা বলল - "কিছু
না ভাবী। অযথা বিচলিত
হয়ো না। আমি শুধু তোমার সাথে দেখা করতে
এসেছি।”
“তাহলে তোমার কষ্টের কথা বলো
দিদি। আমি ওর চিকিৎসা করিয়ে দেব।” রহস্যময় হাসি ছেড়ে বলল সুন্দরী।
“আমার কোন কষ্ট নেই, ভাবী। তোমরা থাকতে আমার কোন সমস্যা হতে পারে।” শান্তা একটা মৃদু হেসে বলল।
“তুমি যদি বলতে না চাও, ঠিক
আছে।” সুন্দরী মুচকি হেসে বললো-
"কিন্তু আমি তোমাকেও জানি আর তোমার কষ্টগুলোও।”
শান্তা কিছু বলল না। সে শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। তিনি সত্যিই সমস্যায় পড়েছে। সে এখনে শুধু শুধু দেখা করতে আসেনি। তার একাকীত্ব তাকে সুন্দরীর কাছে নিয়ে
এসেছে। সে কারো সঙ্গ চেয়েছিল। সে সুন্দরী হোক বা বিরজু। কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছিল। নির্লজ্জভাবে নিজের কষ্ট সুন্দরীর
সামনে তুলে ধরতে পারেনা। এটা তো লজ্জার
কথা।
“কি ভাবছ দিদি?” তাকে
হারিয়ে যেতে দেখে সুন্দরী জিজ্ঞেস করলো- "কিছু একটা কথা বল। তুমি তোমার মনের মধ্যে চলছে বলো দিদি। হয়তো হেল্প করতে পারি” সুন্দরী তার উরুতে হাত রেখে বললো।
শান্তা ভাবতে থাকলো!
“যদি অন্য কারো সমর্থন চাও, আমি
তাও করতে পারি। এখনই।” সুন্দরী তার উরুতে চাপ দিয়ে বলে।
শান্তা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। সুন্দরীর ঠোঁট দুষ্টুমি করে হাসে। সুন্দরীর কথা আর কাজ দুটোই শান্তার শরীর গরম করতে থাকে।
“আমি সত্যি বলছি। বিরজু এসেছে। রুমের ভিতরে।” সুন্দরী তার
কানে ফিসফিস করে বলল। শান্তার সারা
শরীরে একটা স্ফুলিঙ্গ বয়ে গেল। বিরজু
রুমের ভিতরে আছে বুঝতে পেরে, তার আসার আগে
সুন্দরী একটা বন্ধ ঘরে বিরজুর সাথে সেক্স করছিল…..তার
শরীরে ধোঁয়া উঠে। নিঃশ্বাস গরম
হয়ে দ্রুত চলতে থাকে। চুল্লির মত
শরীর গরম হতে লাগল এবং কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হতে লাগল।
“চলো.....” মেজাজ আন্দাজ করে ওর হাত ধরে বললো -
"ভিতরে কি হচ্ছে কেউ জানবে না। যতক্ষন
চাও, তোমার ইচ্ছা পূরণ করতে থাকো। আমি বাইরে পাহারা দিচ্ছি।”
“না ভাবী ... আমি এটা করতে
পারবো না।” শান্তা
আতঙ্কিত হয়ে তার কব্জি ছাড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। অসহায়ভাবে শান্তা বললো- "সত্যি
বলছি, আমি এটা পারব না। কপালে টিকা দিতে পারবো না, কিন্তু
আমি কষ্টে আছি ঠিকই।”
শান্তা বলল কিন্তু
তার কথায় সেই দৃঢ়তা ছিল না যা একজন ধার্মিক নারীর মধ্যে থাকে। তার শরীর পুরুষ মিলনের জন্য আকুল হয়ে
উঠছিল। সে এখন ছুটে গিয়ে বিরজুর কাছ
থেকে তার যন্ত্রণাদায়ক শরীরের তৃষ্ণা মেটাতে চাইছিল। মানুষ কি বলবে এবং কি ভাববে তা ভুলে যেতে থাকে। যে আগুন কয়েকদিন ধরে তার শরীরে ধীরে
ধীরে জ্বলছিল, সেই আগুন বিরজুর দেহে আবৃত হয়ে
নিভিয়ে দেয়ার বাসনা জাগে।
সুন্দরী শান্তার মুড সম্বন্ধে পুরোপুরি অবগত। শান্তার প্রত্যাখ্যান যে একটা ভান সে
বুঝতে পারে। শান্তাকে আর
বোঝানোর দরকার মনে হলো না। সে
তাকে টেনে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।
বিরজু ভেতরে বিছানায় শুয়ে ছিল। শান্তাকে ভিতরে আসতে দেখে তার কামুক চোখ আনন্দে জ্বলে
উঠল। সেই সাথে শান্তার হৃদপিন্ড
জোরে জোরে স্পন্দিত হল। আতঙ্ক আর
উত্তেজনায় তার সারা শরীর কাঁপছিল।
“শান্তা, এখন
লোকেদের লজ্জা ছাড়তে হবে। এখন
দেখা করার পালা। দেখ তোমার
রসিয়া কেমন রেডি হয়ে বসে আছে।” সুন্দরী
বিরজুকে দেখে ঠোঁটে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল। “বিরজু
খেয়াল রেখো। খুব দুঃখী
বেচারা। আজ তার সব দুঃখ দূর করে দাও। কোনো অভিযোগ যেন না পাই।”
এই বলে সুন্দরী বেরিয়ে গেল। দরজাটা ভিরিয়ে দিল।
শান্তাকে দেখে বিরজু নেশায় ভরে গেল। সে মাতালের মত লাফিয়ে উঠে শান্তার
দিকে এগিয়ে গেল।
বিরজুকে তার দিকে এগোতে দেখে শান্তার মনটা কেঁপে উঠল। পা কাঁপতে লাগল। তার মনে হয়েছিল যেন সে তার পায়ের শক্তি হারিয়ে
ফেলেছে এবং সে শুধু দোলা দিয়ে নিচে পড়ে যাবে।
বিরজু এগিয়ে গিয়ে শান্তাকে কোমরে জড়িয়ে ধরল। তারপর এক নিমিষেই নিজের কাছে নিয়ে
নিল... শান্তার পক্ষে আর পিছিয়ে যাওয়া সম্ভব হল না। তার যৌবনের চেতনা তার মন ত্যাগ করেছিল। শান্তা বিরজুর শরীরে মিশে যেতে থাকে।
বিরজু শান্তাকে শক্ত হাতে তুলে বিছানায় ফেলে দিল। তারপর নিজেই বিছানায় উঠে শান্তার দিকে
ঝুকে মুহুর্তে শান্তার ঠোঁট নিজের ঠোটের ভিতরে নিয়ে নেয়। শান্তার গরম নিঃশ্বাস বিরজুর মুখে আঘাত করছিল। আর বিরজু দিওয়ানার মত ঠোঁট চুষতে
থাকে। সেই সাথে কোমর ও উরুতে হাত
দিয়ে আদর করছিল।
শান্তা প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। বিরজুর অবস্থাও তাই। শান্তার ঠোঁট চুষতে চুষতে ঘাড়ের কাছে
এসে জ্বলন্ত ঠোঁটে ওর গলায় চুমু খেতে লাগলো।
“আজ পেয়েছি কাঞ্চন, তুমি
জানো না তোমার এই শরীর আমাকে কত নির্ঘুম রাত দিয়েছে। আজ আমি তোমার সমস্ত সুধা পান করব।” এই বলে বিরজু তার ব্লাউজের বোতাম খুলতে লাগল।
শান্তার মনে একটা তীব্র ধাক্কা লাগল। স্তব্ধ হয়ে যে কথাগুলো সে শুনেছে তার
কানে এখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বিরজু
তাকে কাঞ্চন বলে সম্বোধন করেছে।
একজন মানুষ যখন কাউকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবতে শুরু করে, তখন
সে অন্য কারো নামের জায়গায় তার নাম নেয়। বিরজুও
একই ভুল করেছে। শান্তার
নামের বদলে কাঞ্চনের নাম নিয়েছে। কথাটা
শুনে শান্তার হুঁশ উড়ে গেল।
কিন্তু বিরজু বোধহয় নিজের ভুল বুঝতে পারেনি। ওর আঙ্গুলগুলো দ্রুত শান্তার ব্লাউজের
বোতাম খুলছিল। তখন শান্তা
হাত দিয়ে বিরজুকে একটা জোরে ধাক্কা দিল। বিরজু
সামলাতে না পেরে বিছানা থেকে পড়ে গেল। শান্তা
তাড়াহুড়ো করে দাঁড়ালো এবং স্ফুলিঙ্গ বৃষ্টির চোখে মেঝেতে পড়ে থাকা বিরজুর দিকে
তাকাতে লাগলো।
বিরজু তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। শান্তার জ্বলন্ত চোখ দেখে ঘাম ঝরছে। কিন্তু হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণ তখনো
বুঝতে পারেনি সের। অস্থির
ভাষায় বললো- "কে... কি হয়েছে শান্তা?"
“কি চলছে তোমার মনে?” শান্তা
রেগে বিরজুর দিকে তাকাল। “তোমার
ঠোটে কাঞ্চনের নাম এলো কি করে? কাঞ্চনকে
নিয়ে কি কোন খারাপ কিছু ভাবছো?"
“কি বলছ শান্তা?” বিরজু
আতঙ্কে থুথু গিলে ফেলল। “কাঞ্চনকে
নিয়ে খারাপ ভাববো কেন। ভুল করে
কাঞ্চনের নামটা নিশ্চয়ই আমার জিভে চলে এসেছে। কিন্তু সত্যি বলছি, ওর
জন্য আমার কোনো খারাপ চিন্তা নেই।”
“এটাই তোমার জন্য উপযুক্ত হবে, বিরজু। কাঞ্চনের কথা ভুলেও ভাববে করবে না।” শান্তা হুমকির সুরে বললো - "এখন
আমি চলে যাচ্ছি.. তবে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো তোমাকে সতর্ক করে দিই। তুমি কাঞ্চনকে স্পর্শ করারও চেষ্টা
করেছ তো তোমার খুব খারাপ মৃত্যু হবে।”
এই বলে শান্তা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। সুন্দরী তাকে হলের মধ্যে বাধা দেয়। কিন্তু শান্তা কোন উত্তর না দিয়ে
সোজা তার বাসায় চলে গেল।
সারাটা পথ সে একই কথা ভাবতে থাকে। তার মন বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল না যে কাঞ্চনের নামটি
বিরজুর মুখ থেকে দুর্ঘটনাক্রমে বের হয়েছে। নিশ্চয়ই
কাঞ্চনের প্রতি তার খারাপ চিন্তা আছে, তাই তার মনের
কথা ঠোঁটে চলে এসেছে। শান্তা
মনে মনে বলল- এখন আমাকে সতর্ক হতে হবে। পাপীষ্ট
কাঞ্চনের সাথে যেন খারাপ কিছু করতে না পারে। কাঞ্চন
আমার মেয়ে না হলে কি হবে? চিন্টুর
থেকেও বেশি ভালোবেসেছি ওকে। আমি
থাকতে কেউ তার দিকে খারাপ দৃষ্টিপাত করার আগেই আমি তার চোখ উপড়ে ফেলব।
এইসব ভাবনায় হাঁটতে হাঁটতে শান্তা পৌঁছে গেল তার
দোরগোড়ায়। তারপর বাইরের
দরজা দিয়ে ঢুকল উঠানে। কিন্তু উঠোনে
আসতেই তার চোখ ছানাবড়া। সে বিশ্বাসই
করতে পারছিল না তার চোখ কী দেখছে। অশ্রুসিক্ত
চোখে স্বামী দীনেশের দিকে তাকিয়ে ছিল শান্তা। বারান্দায় থাকা বিছানায় কে যেন শুয়ে ছিল। চোখ ছাদের দিকে। শান্তার আগমনের শব্দে তার মনোযোগ ভেঙ্গে গেল। ঘুরে তাকাল। শান্তাকে দেখা মাত্রই খাটের উপর উঠে পড়ল।
শান্তা কাঁপা কাঁপা পায়ে ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে তখনও বিস্ময়ে স্বামীর দিকে
তাকিয়ে আছে। চোখে দেখেও
সে তখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
তাকে দেখে দীনেশ হাসল। তার পর বলল “কেমন আছো শান্তা? কোথায়
গিয়েছিলে? কবে থেকে তোকে খুঁজছি। সারা বাড়ি ফাঁকা পড়ে আছে, সুগনা
দাদা কোথায়। কাঞ্চন আর
চিন্টুকেও দেখা যাচ্ছে না। এভাবে
চুপ করে আছো কেন? তুমি কিছু বলবে না, দাঁড়িয়েই থাকবে?” দীনেশ
একসাথে প্রশ্ন করে।
শান্তা কি বলবে? এমন সময়ে তার রাগ করা উচিত নাকি খুশি
প্রকাশ করা উচিত তাও সে বুঝতে পারছিল না।
“আমাকে দেখে খুশি হওনি যে এভাবে
চুপ করে আছ?” দীনেশ খাট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল -
"আমি জানি আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমার পাপ ক্ষমার যোগ্য নয়, তবুও
পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।” দীনেশ
শান্তার সামনে হাত গুটিয়ে বসে।
“এটা বলো না।” স্বামীর হাত দুটো ধরে শান্তা বললো-
"ভগবানের কৃপায় তুমি ফিরে এসেছো, এটাই আমার
জন্য যথেষ্ট। এখন আমার
সামনে হাত জোড় করে আমাকে অপরাধী করো না।” বলতে বলতে
কেঁদে ফেলে শান্তা।
শান্তা যে তার স্বামীর উপর রাগ করেনি তা নয়। সে ৮বছর একা একা কাটিয়েছে, দিনে
একশবার মারা গেছে এবং বেঁচেছে। কিন্তু
কিছুক্ষণ আগে বিরজুর কাছে যেয়ে সে যে ভুল করেছিল সেই অপরাধে তার দমবন্ধ হয়ে যায়। কিভাবে সে তার স্বামীকে দোষ দিতে পারে
যখন সে নিজেই অপরাধী।
বছরের পর বছর স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদের আগুনে তার
হৃদয় পুড়ছিল। সে গিয়ে
দীনেশের পায়ে প্রণাম করল। দীনেশ
ওটা তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। তখন
খোলা দরজা দিয়ে কাঞ্চন ঢুকল। দুজনে ওর আওয়াজ থেকে আলাদা হয়ে গেল।
“তুমি চিনতে পেরেছ?” শান্তা
মুচকি হেসে কাঞ্চনের দিকে ইশারা করে দীনেশকে বলল- এই কাঞ্চন।
“কি...? কত
বড় হয়ে গেছে।” কাঞ্চনকে
দেখে দীনেশ শান্তাকে বলল।
কাঞ্চন কাছে এসে অবাক হয়ে দীনেশকে দেখতে লাগল।
“কাঞ্চন, ওকে
চিনতে পারছিস? এ তোর ফুফা।” কাঞ্চনকে শান্তা বলল।
কাঞ্চন মনোযোগ দিয়ে দীনেশের দিকে তাকাল। দীনেশকে শেষ দেখেছে যখন তার বয়স ছিল ১২
বছর। দীনেশের বয়স তখন ত্রিশ বছর। এত বছর পরও তার মধ্যে তেমন কোনো
পরিবর্তন আসেনি। একই রঙ, একই
উচ্চতা। শুধু মাথার চুল কোথাও কোথাও
সাদা হয়ে গেছে।
কাঞ্চন এগিয়ে গিয়ে দীনেশের পা স্পর্শ করল। দীনেশ তাকে আশীর্বাদ করে। তারপর চিন্টুর কথা জিজ্ঞেস করল। তখনও সে স্কুল থেকে ফেরেনি।
“শান্তা, তুমি
আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ, এখন যদি সুগনা দাদা এসে ক্ষমা করে, তাহলে
আমার চিন্তা শেষ হয়ে যাবে।” দীনেশ শান্ত
গলায় বলল।
“সে এই সময়ে মাঠে থাকে। সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবে।” শান্তা তাকে বলল।
“আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা
করতে পারব না। আমিই তার
কাছে যাই এবং তার পা স্পর্শ করি।” দীনেশ বলে
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
পরেরদিন সন্ধ্যা ৭ টা বাজে।
কাঞ্চনের সাথে দেখা করে রবি প্রাসাদে পৌঁছে তার খুশির
সীমা রইল না। ভিতরে পা
ফেলতেই চোখ পড়ে মায়ের দিকে। সোফায়
বসে ঠাকুর সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন। দেওয়ান
জি এবং নিক্কিও পাশের অন্য সোফায় বসে ছিল। রবিকে
দেখে সেও খুশিতে উঠে দাঁড়ালো।
“মা...” বলে রবি এগিয়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে
ধরল। “কেমন
আছো মা? আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?"
“আমি ভালো আছি আমার বাচ্চা।” কমলাজী রবির কপালে চুমু দিয়ে বললেন ”
কেমন আছিস?"
“আমি ভালো আছি মা।” রবি মুচকি হেসে উত্তর দিল এবং সোফায়
তার পাশে বসল।
হলের মধ্যে কিছু আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলার পর রবি মাকে
নিয়ে গেল তার ঘরে।
“এখন বলো কেমন আছো?” সোফায়
বসে মাকে জিজ্ঞেস করল রবি।
“আমাকে নিয়ে আর কতদিন চিন্তা
করবি?” রবির মা আদর করে ওর মাথায় হাত রাখল। “আমার জন্য একটা
বউ নিয়ে আয় যে আমার দেখাশোনা করবে।”
“তুমি যেহেতু এসেই পড়েছ তাহলে
তোমার পুত্রবধূর সাথে পরিচয় করিয়ে দিব।” রবি লজ্জা
পেয়ে বলল। “তোমার
জন্য একটা বউ বেছে নিয়েছি, সে খুব ভালো, তুমি
অস্বীকার করতে পারবে না।”
“আমি আপনার ছেলের পছন্দ দেখেছি
এবং আমারও পছন্দ হয়েছে।” রবির মা
স্নেহভরে বলল, রবির দিকে ভারী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।
“কার কথা বলছো মা?” রবি
অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
“আমি ঠাকুর সাহেবের মেয়ে
নিক্কির কথা বলছি, তুই কি অন্য কারো কথা বলছিস?"
“হ্যাঁ মা।” রবি উত্তর দিল - "নিক্কি আমার পছন্দ নয়, আমার
পছন্দ অন্য কেউ।”
“ওটা কে?” মা
জিজ্ঞেস করে।
“তার নাম কাঞ্চন, সে
একটা বসতিতে থাকে, তার বাবা একজন কৃষক, মা
নেই, তার এক বুয়া আছে যে একই বাড়িতে থাকে এবং সে
কাঞ্চনকে মায়ের মতো লালনপালন করেছে।” রবি এক
নিঃশ্বাসে মাকে সব বলে দিল।
“রবি, তুই
ঠাকুর সাহেবের মতো পরিবারের লোককে ছেড়ে একজন সাধারণ লাঙলচাষীর সাথে সম্পর্ক করতে
চাস, তোর কি হয়েছে? তুই
আকাশের দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকাচ্ছিস কেন?” সোফা
থেকে উঠে বলল কমলা জি।
“মা, যাকে
তুমি সাধারণ লাঙল চাষী বলছো ..... রবিও সোফা থেকে উঠে মার কাছে যেতে যেতে বলল। “মা মানুষ কাজ
দিয়ে ছোট হয় না। ভাব দিয়ে
হয়। আমার চোখে সেই ছোট যার চিন্তা ছোট। আর তোমার ভাবনা বড়, মা। তাহলে আজ এত ছোট কাজ কেন করছো? তুমি
কি চাও? আমি কাঞ্চনকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা ভঙ্গ করে
তার চোখে ছোট হই? রবি মায়ের কাঁধ ধরে গম্ভীর গলায় বলল।
“কিন্তু ... বেটা!” কমলা জি কিছু বলতে চাইল। কিন্তু বলার আগেই থেমে গেল।
“মা, তুমি
ধনী-গরীব এইসব রাখো আর কাঞ্চনের সাথে একবার দেখা করো, যদি
ওকে তোমার পছন্দ না হয়, তবে তুমি যা বলবে তাই করবো।” হেসে বলল রবি।
“ঠিক আছে …
.আমি কাল ওর বাসায় যাব। কিন্তু তুই আমার
সাথে থাকবি না, ওকে বলবি না যে আমি ওর সাথে দেখা করতে
যাচ্ছি। আমি দেখতে চাই সে আমার সাথে
কেমন আচরণ করে।” কমলাজি কড়া
গলায় বললেন। সে তখনও রবির
সিদ্ধান্তে খুশি ছিল না।
“ধন্যবাদ মা।” রবি খুশি হয়ে বলল - "তুমি যা
বলবে তাই করবো। আমি জানি
কাঞ্চনকে তোমার খুব ভালো লাগবে।” রবি মাকে
জড়িয়ে ধরে।
“তাই, খুব
আনন্দ করার দরকার নেই। আমি যদি তাকে
পছন্দ না করি তবে আমি তাকে আমার পুত্রবধূ হিসাবে গ্রহণ করব না।” হাসিমুখে বললেন কমলাজী।
মায়ের কথা শুনে রবি হাসল।
কাঞ্চন আজ স্কুলে যায়নি। আজকাল পড়ালেখায় মন ছিল না তার। প্রায়শই স্কুলে না যাওয়ার জন্য কোনও না কোনও অজুহাত
তৈরি করেত। আজ তার একটা
ভালো অজুহাত ছিল। আজ সে তার বুয়াকে
বলেছে যে সে আজ স্কুলে যাবে না। কারণ
ফুফা জি এসেছে। তার সাথে গল্প
করব। শান্তাও ওকে জোরাজুরি করেনি। কাঞ্চনকে দেখে চিন্টু স্কুলেও যায়নি। খেলার জন্য তারও একটা অজুহাত দরকার
ছিল। সুগনাও এদিন বাড়িতেই। শুধু দীনেশজিই কোথাও গিয়েছে।
তখন বেলা ১১টা, শান্তা খাবার
রান্না করে নদীতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুগনা ভেতরে বিছানায় শুয়ে। আর কাঞ্চন সকাল থেকেই ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল। শান্তা ওকে ঘরের কাজকর্ম করতে দেখে
খুব খুশি হল, কিন্তু চিন্টু খুশি হল না। গত কয়েকদিন ধরেই সে অস্থির। আজ তার সাথে খেলা না করায় মন খারাপ
ছিল তার। আগে যখনই
কাঞ্চনকে খেলতে বলত, তখনই কাঞ্চন তার সঙ্গে খেলতে শুরু করত। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে কাঞ্চন তার
সঙ্গে খেলা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন
সে একা। সে বুঝতে পারে না কেন দিদি
আজকাল আমার সাথে খেলছে না, সে হয় ঘরের
কাজ করে বা একা একা নিজের মনে হারিয়ে যায়।
এ সময় কাঞ্চন বারান্দার খোসার ওপর তৈরি মাকড়সার জাল
ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছিল, কাঠের
স্টুলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, চিন্টু এসে
তার পাশে দাঁড়ায়। কাঞ্চন তার
দিকে তাকালো না।
চিন্টু কিছুক্ষন কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর সাহস
করে বললো - "আজকে দিদি চলো কাঞ্চা খেলি। কয়দিন তুমি আমার সাথে কাঞ্চা খেলোনি"
কাঞ্চন একবার চিন্টুর দিকে তাকিয়ে বললো- দেখছিস না আমি
ঘরের কাজ করছি, তাহলে আমাকে খেলতে বলছিস কেন?
“দিদি, তুমি
এখন আমার সাথে খেলো না কেন? আগে তুমি রোজ
খেলতে। কখনো ঘরের কাজ করতে না। এখন কেন ঘরের কাজ করো?” অভিযোগ
করে চিন্টু।
উত্তরে কাঞ্চন হেসে বললো - "আমি কি সারা জীবন
খেলতে থাকবো, ঘরের কাজ কবে শিখবো? এখন
তোর সাথে খেলতে পারবো না? অন্য কারো সাথে খেলগে।"
“তুমি এখন আমার সাথে খেলতে চাও
না কেন? আমি তোমার সাথে খেলতে পছন্দ করি দিদি, চলো
না দিদি।” চিন্টু
কাঞ্চনের পা ধরে জোরে কাঁপাতে কাঁপাতে বলল।
চিন্টুর ঝাকানোর কারণে সে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে থাকে।
“চিন্টু কি করছিস, আমাকে
এভাবে নাড়াস না, আমি পড়ে যাব।” কাঞ্চন ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
“আমার সাথে খেলো নইলে ফেলে দিবো।” কাঞ্চনের পা নাড়তে নাড়তে আবার বলল
চিন্টু
চিন্টুর ঝাকানোতে কাঞ্চন বিড়বিড় করে উঠল, ছটফট
করতে করতে পা একদিক থেকে উঠে গেল, পরের
মুহূর্তেই কাঞ্চন চিৎপটাং। সোজা মাটিতে।
তাকে পড়ে যেতে দেখে চিন্টুর হুঁশ উড়ে গেল। এটা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি যে
এখন তার মার খাওয়া নিশ্চিত। সে
দৌড়ে বাইরে গেল।
কাঞ্চনও পিঠ ঘষতে ঘষতে তাড়াতাড়ি উঠে ঝাড়ু নিয়ে
চিন্টুর পিছনে দৌড়ে গেল। চিন্টু
বাইরের দরজায় পৌঁছে গেছে। কাঞ্চনও
তার একটু পেছনে। চিন্টু দরজা
পেরিয়ে ফুড়ুৎ। কাঞ্চন ঝাড়ু দোলাতে দোলাতে আজ তোকে খাইছি বলে দরজায়। আর তখনই হঠাৎ দরজায় হাজির রবির মা। কাঞ্চনের চোখ পড়ল তার দিকে, কমলাজী
ঠিক কাঞ্চনের ঝাড়ুর নিশানায় ছিলেন। কাঞ্চন
তার হাত থামাতে চাইল... কিন্তু তার হাতের গতি এতটাই দ্রুত ছিল যে সে ঝাড়ু থামাতে
পারেনি। বিস্ময়ে কমলার চোখ বড় বড়
হয়ে গেল।
৩৫
সে দ্রুত পিছিয়ে গেল। কাঞ্চনের ঝাড়ু মুখে বাতাস দিতে দিতে বেরিয়ে গেল। এবং সোজা দরজার খোলা স্ল্যাটে আঘাত
করে। কমলা জী পড়তে থাকল। কাঞ্চনের
দিকে অবাক হয়ে তাকাল সে।
সেই অপরিচিত মহিলাকে দেখে কাঞ্চন কথা বলা বন্ধ করে। এই মহিলাকে ঝাড়ু দিয়ে ঝাড়ু দিয়েছে ভেবে
সে নিজেই লজ্জিত হল। তাৎক্ষণিকভাবে
বুঝতে পারল না যে এই মহিলাকে তার কী বলা উচিত।
“কি বোকা, মেয়ে।” কমলা জি কাঞ্চনের নোংরা চেহারা এবং
তার মূর্খের মতো কাজ দেখে ক্রুদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন। “নিজের বাসায় আসা অতিথিকে কি
এভাবে স্বাগত জানায়?"
“আমি দুঃখিত ম্যাম। আমি ভুল করেছি। আমি আপনাকে দেখতে পাইনি।” কাঞ্চন বিব্রত হয়ে বলল।
“তোমার নাম কি কাঞ্চন?” কমলাজি
পরের প্রশ্ন করলেন। আবার উপর
থেকে নিচ পর্যন্ত কাঞ্চনের দিকে তাকালো।
“জি... হ্যাঁ।” কাঞ্চন থুতু গিলে বলল। কমলার মুখ হইতে ওর নাম শুনে ওর চোখে
বিস্ময় ও বিহ্বল হয়ে উঠল।
“তোমার বাবা আর বুয়া বাসায় আছে? রবি
আমাকে এখানে পাঠিয়েছে। আমি ওর মা।” কমলা নিজের পরিচয় দিল।
“কে... কি...? আ……আপনি……স্যারের
মা?” তাকেই ঝাড়ু
দিয়ে আক্রমণ করেছি!!! ওর
মুখ থেকে সব সুখ উধাও হয়ে গেছে।
এই এক মূহুর্তে শত বাজে চিন্তা তার কোমল মনে প্রবেশ করে। জানার পর যে মহিলাটিকে ঝাড়ু দিতে গিয়েছিল
তিনি হলেন রবির মা... কাঞ্চনের হাত পা ফুলে গেছে।
সে তড়িঘড়ি করে দুহাত জুড়ে দিল তাকে প্রণাম করার জন্য। এতে করে তার হাতে থাকা ঝাড়ু আবার
কমলাজীর সামনে নেড়ে উঠে। কাঞ্চন আবার
ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাড়ুটা একপাশে ফেলে দিয়ে বুকের সাথে বাঁধা ওড়নাটা খুলে আবার ভাল
করে ওড়না মাথায় বেধে নিল।
কমলাজী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনের কাণ্ডকারখানা
দেখছিলেন।
ঘোমটা কাটার পর কাঞ্চন কাঁপা গলায় বলল- "আসুন... আপনি
ভেতরে আসুন।"
কমলাজী উঠানে প্রবেশ করে। একদৃষ্টিতে পুরো উঠানের দিকে তাকালেন, তারপর
চোখ দিলেন কাঁচা মাটির তৈরি খড়ের ঘরে।
কাঞ্চন তার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভয়ানক নার্ভাস। কি বলবে কি করবে বুঝতে পারছে না। তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতক্ষণে কমলাকে একটা খাট
বা একটা চেয়ার নিয়ে আসত। কিন্তু
কাঞ্চন তেমন জ্ঞানী ছিল না। এবং
যাই হোক না কেন, এই সময়ে তার মাথঅ কাজ করছিল না। সে চুপচাপ ভাবতে থাকে।
“তোমার বাবা ও বুয়াকে আমার
আগমনের খবর দাও।” কাঞ্চনের
দিকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন কমলাজী।
“হ্যাঁ ... এখনই ডাকছি।” কাঞ্চন তাড়াতাড়ি বলে, তারপর
দৌড়ে ভেতরে গেল।
“বুয়া...” কাঞ্চন বারান্দায় পৌঁছতেই শান্তাকে
উচ্চস্বরে ডাকল। ওর কণ্ঠে
প্রবল কাঁপুনি।
“কি হয়েছে কাঞ্চন?” বুয়া
হাতে কাপড়ের বান্ডিল নিয়ে বেরিয়ে এল।
“বুয়া স্যারের মা এসেছেন। তিনি তোমার আর বাবার সাথে দেখা করতে
চান।” কাঞ্চন ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
“কে স্যার? কার
কথা বলছিস?” শান্তা অবাক হয়ে কাঞ্চনের দিকে
তাকিয়ে বলল।
“বুয়া, আমি
প্রাসাদের ডাক্তার স্যারের কথা বলছি। ওনার
মা এসেছেন।” হড়ফড় করে বলে
কাঞ্চন।
“কিন্তু সে আমাদের বাসায় কেন
এসেছে?” বুয়া পরের প্রশ্নটা করে - "আর তুই
এত ঘাবড়ে যাচ্ছিস কেন?"
“বুয়া মাজি আমাকে দেখতে এসেছেন। স্যার আমাকে চেনেন, তিনি
আমাকে বিয়ে করতে চান। সেজন্যই
মাজিকে এখানে পাঠিয়েছেন।” কাঞ্চন থরথর
করে কথা বলল।
“কি...?” বুয়া
অবাক হয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকায় - "কিন্তু তুই আমাদের আগে বলিসনি কেন?
কাঞ্চনের চোখ লজ্জায় নত হয়ে গেল।
“ঠিক আছে ...তুই ভিতরে যা। আমি দেখছি।” শান্তা কাঞ্চনের অভিব্যক্তি অনুমান করে বলল।
কাঞ্চন সম্মতিতে মাথা নেড়ে তাড়াতাড়ি ভিতরে চলে গেল।
শান্তা ভিতর থেকে একটা পরিস্কার চাদর তুলে নিয়ে
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা খাটটা ফেলে দিয়ে তার উপর বিছিয়ে দিয়ে কমলাজীর কাছে
গেল।
“নমস্কার জি।” কমলা জির কাছে যেতে যেতে শান্তা বলল। তার কথায় শ্রদ্ধার চিহ্ন। চিনি মিছরির চেয়েও বেশি মিষ্টি ছিল কন্ঠ। আর কাঞ্চনের কন্ঠই বা কেন হবে না।
কমলা জি শান্তার দিকে ফিরলেন। শান্তার সাজের দিকে তাকাল, তারপর
জবাবে সেও হাত গুটিয়ে বললো- "নমস্কার।”
“ভেতরে আসুন, বোনজি।” সে কমলা জিকে ভিতরে বারান্দায় নিয়ে
এল তারপর তাকে খাটে বসতে বলল।
কমলা জি ইতস্তত করে খাটের উপর বসলেন।
শান্তা ভিতরে গিয়ে জল আর কিছু জলখাবার নিয়ে এল। কিছুক্ষণ পর সুগনাও গায়ে কুর্তা পরে
বেরিয়ে এলো।
ভেতরে কাঞ্চন। এবং
দরজার কাছে কান লাগিয়ে বাইরে কী হচ্ছে তা শোনার চেষ্টা করছিল। তার হৃৎপিণ্ড জোরে জোরে স্পন্দিত হতে
থাকে। মনে শত শত নানান চিন্তা আসছিল। নানা সন্দেহের দোলায় দুলছিল তার
ছোট্ট মন। বারবার মনে
মনে একই কথা ভাবছিল। “চিন্টুকে
মারতে ছুটলাম কেন, ভাই আমার ছিল, ওকে
মাফ করে দিলে কি ভালো হতো। ওকে
মারতেও যেতাম না, মাজির সামনে লজ্জাও পেতে হতো না। এখন জানি না। আমার সম্পর্কে সে কি ভাবছে? এখন
মা কখনোই আমাকে তার পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেবে না। আমি কত বড় ভুল করেছি।”
কাঞ্চন মনে মনে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল- ' হে
ভগবান, এইবারের মত আমাকে রক্ষা করুন, কিছু
অলৌকিক কাজ করুন, আমার জন্য তার হৃদয়কে ভালবাসায়
ভরিয়ে দিন, আমি শপথ করে বলছি, আজকের
পর আমি আমার ছোট ভাইয়ের উপর কখনও রাগ করব না, আমি
তাকে কখনও মারব না। আমি তার সব
জেদ সহ্য করব। আমি কিছুতেই
রাগ করব না। শুধু এইবারের
মত বাঁচান মহারাজ '
হঠাৎ কমলাজির কণ্ঠ কানে এল। তিনি বলছিলেন - "সুগনা জি আমার একমাত্র ছেলে, সে
বড় কষ্টে বড় হয়েছে। আমি তার জন্য
হাজার দুঃখ সহ্য করেছি। আমি তার সুখ
চাই, আর সেজন্যই আমি আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।”
“এটা আমাদের জন্য অনেক ভাগ্যের
ব্যাপার, বোন জি, আপনি
আমার গরীবের বাড়িতে এসেছেন। নইলে
এমন ভাগ্য কোথায় আমাদের যে আপনার মতো মানুষের ঘরে আমাদের মেয়ের সম্পর্ক করতে পারি।” কমলার কথার উত্তর দিল সুগনা। সে কমলাজীর কাছে আর একটি চৌকিতে
বসেছিলেন। শান্তা তার
পাশে দাঁড়িয়ে।
“আমি কখনো ধনী-গরিবকে গুরুত্ব
দেইনি। সত্যি বলতে আমরা খুব একটা ধনী
নই, গরিবি জীবনও দেখেছি। হ্যাঁ, এখন অবস্থা
আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। আমি
সবসময় ভেবেছি রবিকে এমন বাড়িতে বিয়ে দিব যেখানে ভদ্র ও সংস্কৃতিবান মানুষ বাস
করে। তা সে কৃষকের বাড়ি, লাঙ্গল
চালায় কিংবা রাজপ্রাসাদে বসবাসকারী রাজার বাড়ি। আমার কাছে উভয়ই সমান।” কমলা জি সরল স্বরে বললেন।
“ধন্য আপনি বোনজি, ভগবান
আপনাকে একটি খুব ভাল হৃদয় এবং উচ্চ মন মানষিকতা দিয়েছেন।” কন্ঠে নম্রতা আর শ্রদ্ধা নিয়ে বলল সুগনা। সে চাননি যে তাঁর কোনো কথায় কমলাজি
আঘাত পাক। আরও বলে-
"আমার কাঞ্চনের ভাগ্য খুলে গেছে, সে আপনার
বাড়ির পুত্রবধূ হতে যাচ্ছে। আপনার
মতো সংসার আমরা পেয়েছি, ভগবানের কাছে আর কিছু চাই না।”
“আমি এই বিষয়ে ২দিন পরে উত্তর
দেব। আমি কাল পন্ডিতজিকে ফোন করেছি, তার
সাথে দেখা করার পরেই আমি আপনাকে বলতে পারব। আপাতত
আমি আপনাদের সাথে দেখা করতে এসেছি। এবং
এখন আমি যাওয়ার অনুমতি চাই।” খাট থেকে উঠে বলল কমলাজী।
“হ্যাঁ, যা
আপনার ইচ্ছে। কিন্তু আমরা
যদি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করি...যদি খেয়ে যেতেন তাহলে আমাদের সম্মান বেড়ে
যেত...!” সুগনা ইতস্তত করে কমলাজিকে অনুরোধ করল।
“আমাকে
আজকে ক্ষমা করুন। আমি অন্য কোন
দিন আপনার বাড়িতে রাতের খাবার খেতে আসব। আজকে
আমি ঠাকুর সাহেবকে বলে এসেছি যে আমি প্রাসাদেই দুপুরের খাবার খাব।” কমলা জি বললেন এবং সুগনা ও শান্তাকে নমস্কার
বলে বেরিয়ে যেতে লাগলেন।
শান্তা আর সুগনা তার পিছু পিছু বাইরে এল। বাইরে চালক জিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কমলাজী জীপে বসার আগে সুগনা আর
শান্তাকে শেষবারের মত সালাম করলেন, তারপর জিপে
বসে প্রাসাদের দিকে রওনা দিলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কমলাজী প্রাসাদে প্রবেশ করে। সে দেখল নিক্কি হলঘরে বসে আছে। কমলাকে দেখে নিক্কি তাড়াতাড়ি সোফা
থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর ঠোঁটে
হাসি দিয়ে সালাম জানাল।
কমলা জি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে নিক্কির কাছে গেলেন। আর আদর করে মাথায় হাত রাখলো। এই মমতায় নিক্কির চোখ ভরে ওঠে।
কমলা জি কিছু না বলে মন খারাপ করে নিজের ঘরের দিকে চলে
গেল। নিক্কি ভেজা চোখের পাতায় ওকে
চলে যেতে দেখছিল।
“কি হয়েছে মা? কাঞ্চনকে
কেমন লাগলো? কিছু বল। যখন থেকে কাঞ্চনের সাথে দেখা করে এসেছ, তখন
থেকে চুপচাপ বসে আছ, কিছু বলবে মা?” রবি
বিরক্ত হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল।
রবি কমলাজির ঘরে সোফায় বসে ছিল। কমলাজি দুঃখিত ও নীরব। রবি তাকে কাঞ্চনের বিষয়ে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করলেও সে
কোনো উত্তর দেয়নি। ক্লান্ত হয়ে
রবিও চুপ করে বসে রইল।
“আমার কাঞ্চনকে পছন্দ হয়নি।” কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর নীরবতা ভঙ্গ
করে বললেন কমলাজী।
“কে... কি?” রবি
অবাক হয়ে মার দিকে তাকাল - "কিন্তু কেন মা? কি
হয়েছে?” অবাক হয়ে বলল রবি।
“বলে লাভ কি?” কমলাজী
রেগে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন- "বউ এর কিছুই নেই, সে
বোকার মতো পোশাক পরে, সে বোকার মতো কাজ করে, সে
কথা বলার ভঙ্গিও জানে না, বড়দের সন্মান করে না। কেমন করে তুই
সেই মেয়েটিকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে চাচ্ছিস? তুই কি এই মেয়েকেই বউ করতে প্রস্তুত?"
“মা, তুমি
কি কাঞ্চনের সাথে দেখা করেছ? নাকি অন্য
কোনো মেয়েকে?” রবি অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়
"আমার মনে হয় তুমি নিশ্চয়ই কোনো ভুল বাড়িতে গেছো। কাঞ্চনের এসব একটাও দোষ নেই যা তুমি বলছো।”
“তামাশা বন্ধ কর, রবি...!” কমলাজী ক্ষোভের সাথে বললেন -
"তোর চোখ প্রেমের নেশায় মত্ত। সেজন্য
তুই ভুল-শুদ্ধের পার্থক্য ভুলে গেছিস। আমি
এ বিষয়ে আর কিছু শুনতে চাই না। মন
থেকে কাঞ্চনের ভাবনাগুলো বের করে দিলে ভালো হবে। নিক্কির সাথে বিয়েতে হ্যাঁ বল।”
“না মা, কাঞ্চন
তোমার পছন্দের নয়। শুধু ঘরে নিয়ে এসো। সে
একজন জীবন্ত মেয়ে, সে নিষ্পাপ, সাদাসিধা, কম
শিক্ষিত, গরীব কিন্তু খারাপ নয়, সে
লাখে একজন। তার হৃদয়
হীরার মতো, আর সবচেয়ে বড় কথা হলো সে আমাকে
নিঃশর্ত ভালোবাসে, এমন মেয়েকে আমি কষ্ট দিতে পারি না।” রবি নিজের সংকল্পের কথা বলে। তার কথাগুলো পাথরের মত শক্ত অবিচল।
কমলা রবিকে কিছু বলার আগেই কে যেন দরজায় টোকা দিল।
রবি দরজার দিকে এগিয়ে গেল। রবি দরজা খুলল। দিওয়ান
জি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“আপনি...! ভিতরে আসুন।” অবাক হয়ে বলল রবি। “কোন জরুরী
কাজ থাকলে আমাকে ডাকতেন।”
“না রবি বাবু .... শুধু আপনাদের
অবস্থা জানতে এসেছি।” দেওয়ানজী
ভিতরে এসে বললেন - "এখানে সব ঠিক আছে? আপনাদের কোনো
সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় বলবেন। আমি
প্রাসাদের পুরোনো বিশ্বস্ত। আমি
আপনাদের সেবা করতে প্রস্তুত।”
“আপনার মত সত্যিকারের ভাল মানুষ
পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়। ভগবানের
রহমতে আমাদের কোন সমস্যা নেই, হ্যাঁ, যদি
আমাদের প্রয়োজন হয় তবে আমরা আপনাকে বলব।” কমলা জি দেওয়ানকে সম্মান জানিয়ে
বললেন।
কিন্তু কমলাজির কথা দেওয়ানজির কানে পৌঁছল না, তার
মনোযোগ অন্য দিকে। হঠাৎ সে এমন
কিছু দেখতে পেল যে তার মুখের রং বদলে গেল।
“এই ছবিটা কার?” দিওয়ান
জি বিছানার মাথায় স্টুলে রাখা একটি ছবির ফ্রেমের দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেন।
“তিনি আমার স্বামী” বলে কমলাজি গম্ভীর হয়ে গেলেন।
এ কথা শুনে দিওয়ান জি চমকে গেলেন। সৌভাগ্য যে রবি এবং কমলা জির চোখ ছবির দিকে ছিল, তাই
দুজনেই তার ধাক্কা দেখতে পারেননি।
“কিন্তু আপনার স্বামী কোথায়? আপনার
কাছ থেকে তার কথা শুনিনি।” দিওয়ান জি
তার নার্ভাসনেস লুকিয়ে বললেন।
“এখন জানি না আজ সে কোথায়
আছে.. যখন রবির বয়স ৬ বছর, তখন তাকে
কোনো কাজে বাড়ি থেকে চলে যেতে হয়েছিল। তখন
যারা গিয়েছিল তারা আজ পর্যন্ত ফিরে আসেনি।” কমলাজী
যন্ত্রণায় কুঁকড়ে বললেন। তার
চোখের কোণে অশ্রু। রবি এগিয়ে
গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিল।
“ওহ ...মাফ করবেন। আমি অসাবধানতাবশত আপনার দুঃখকে জাগিয়ে
দিয়েছি।” দিওয়ান জি বিব্রত স্বরে বললেন। “আচ্ছা এখন
আমি যাই। আর হ্যাঁ, আপনাদের
কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই বলবেন।”
“জি ধন্যবাদ।” কমলা উত্তর দিল।
“নমস্কার।” দিওয়ান জি বলল, তারপর রবিকে একবার
দেখে হুড়োহুড়ি করে বেরিয়ে গেল।
রবি তাকে চলে যেতে দেখে।
৩৬
নিক্কি তার বিছানায় চুপচাপ শুয়ে। তার চোখ স্থির ছিল শূন্যতায়। সে চিন্তিত ছিল না শুধু চিন্তায় হারিয়ে গেছে। আজ ওর চিন্তায় কোন গরীব কাল্লু ছিল
না যে গত ৩ দিন ধরে বাস করছিল। বরং
ছিল সুন্দর ব্যক্তিত্বের মালিক রবি।
রবির মা আসার পর থেকে নিক্কির মন বারবার রবির দিকেই
যাচ্ছিল। সে রবিকে
নিয়ে বেশি ভাবতে চায়নি। কিন্তু
হৃদয়ের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ আছে? সেটা এমনই
একটা লাগামহীন ঘোড়া যে তার খুশি মত ছুটে যায় এবং ইচ্ছামত ফিরে আসে।
নিক্কির মন আবারও রবির দিকে লাগামহীন ছুটছিল। কাল্লুর দুঃখের সাথে পরিচিত হওয়ার
পরে, রবির প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা ঘুমিয়ে পড়েছিল। এখন কমলাজী আসার সাথে সাথে সেটা আবার
জেগে উঠেছে। এখন ওর মন
আবার তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল।
নিক্কি এসব ভাবনায় হারিয়ে গেল কাঁচের তৈরি ভেতরের
ছাদের দিকে তাকিয়ে তখন দরজায় কেউ টোকা দিল।
“কে?” বিছানায়
বসতে বসতে নিক্কি বলল।
নিক্কির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বাইরের লোকটি ধীরে
ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। তাকে
দেখে নিক্কি বসে পড়ল। সে ছিল
দিওয়ান জি। কমলা জি এবং
রবির সাথে দেখা করার পরে, সে সরাসরি নিক্কির কাছে এসেছে।
দিওয়ান জি নিক্কির সাথে একই বিছানায় বসলেন। তারপর তার মাথায় ডান হাত ঘুরিয়ে আদর
করে বললো- "কেমন আছো নিক্কি মা?"
“ভালো আছি চাচা।” মৃদু হেসে বলল নিক্কি।
“তুমি চিন্তা করো না বেটি, এই
বৃদ্ধ যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তোমার অধিকার কেড়ে নিতে পারবে
না কেউ।”
“কি ব্যাপার চাচা? আপনার
একটু মন খারাপ লাগছে।” দেওয়ান জির
অবতরণ মুখ দেখে নিক্কি বলল।
“নিক্কি মা, তোমার
কাছে আসার আগে আমি রবি আর ওর মায়ের সাথে বসে ছিলাম।”
রবির নাম শুনে চোখ নামিয়ে নিল নিক্কি। রবির কথা শুনে মুখটা আবার বিষণ্ণ হয়ে
উঠল।
“সে কি বলল?” দেওয়ানের
মুখের দিকে তাকিয়ে বলল নিক্কি।
“বিশেষ কিছু হয়নি, আমি
শুধু ওদের সালাম করে বেরিয়ে এসেছি। কিন্তু
তুমি চিন্তা করো না... আমি সব ঠিক করে দেব।” দিওয়ান জি
তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন।
জবাবে নিক্কি নিঃশব্দে ঘাড় নিচু করে।
“ঠিক আছে এখন আমি যাই।” দিওয়ান উঠে বললো - "আমি শুধু
তোমাকে দেখতে এসেছি এবং বলছি তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। রবিকে তোমার থেকে কেউ আলাদা করতে পারবে না।”
নিক্কি এবারও কিছু বলল না। দিওয়ান জি উঠার সাথে সাথে তিনিও উঠে দাঁড়ালেন।
দিওয়ান জি ঘুরে দরজার বাইরে চলে গেলেন।
দিওয়ান জি চলে যাওয়ার সাথে সাথে নিক্কি আবার বিছানায়
ছড়িয়ে পড়ল এবং আবার সেই চিন্তায় হারিয়ে গেল।
ঝর্নার পাশে একই পাথরের ওপর বসে ছিল কাঞ্চন। যেখানে সে প্রায়ই বসে রবির জন্য
অপেক্ষা করত। মনের
মধ্যে একটা বিষাদ। আজকের সকালের
ঘটনার প্রভাব এখনও তার মনে রয়ে গেছে। যখন
থেকে কমলা জি তার বাড়িতে এসেছে, তখন থেকে সে
হাসতে ভুলে গিয়েছিল। আজ সকালে
কমলাজি চলে যাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ কাঁদছে। মনের
মধ্যে একটা অজানা ভয়। তার মনে
হচ্ছিল যেন সে আর কখনো রবির সাথে দেখা করতে পারবে না। তাকে যে এখন রবিকে ছাড়া বাঁচতে হবে এই উপলব্ধিতে তার
চোখের জল থামাতে পারেনি।
শান্তা বুয়া অনেকক্ষণ ধরে তাকে বোঝাচ্ছিল। প্রিয় কন্যাকে কাঁদতে দেখে সুগনার
মনটাও খারাপ হয়ে গেল। তার পৃথিবীতে
কাঞ্চনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু ছিল না। কাঞ্চনের
সুখের জন্য নিজের শরীরের মাংসও বিক্রি করতে পারত। কিন্তু কাঞ্চনের এই যন্ত্রণার প্রতিকার তার কাছেও ছিল
না। কিন্তু সে স্থির করেছিল যে
তাকে কমলার পায়ে পড়তে হলেও সে পড়বে, কিন্তু সে
তার মেয়ের সুখে আগুন লাগাতে দেবে না।
কাঞ্চনকে রবির ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করাটা সে জরুরি
মনে করল না। কাঞ্চনের
বিষণ্ণ মুখ এবং তার চোখ থেকে মুক্তোর মতো অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল তাতেই বুঝা গেছে সে
রবিকে কতটা ভালবাসত। সুগনা ও
শান্তা কাঞ্চনকে চুপ করে দিয়েছিল, কিন্তু তার
দুঃখ দূর করতে পারেনি।
সারাদিন মন খারাপ ছিল কাঞ্চন। চিন্টুর ঠাট্টাও তার ঠোঁটের হাসি ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
কাঞ্চনের রবির জন্য অপেক্ষা করতে করতে ৩০ মিনিটেরও বেশি
হয়ে গেছে। সে বারবার
চোখ তুলে রাস্তার দিকে তাকায়… কিন্তু রবিকে
না আসতে দেখে তার দুঃখ আরও বেড়ে গেল।
তুমি আমার সাথে দেখা করতে চাও না তাই না? যদি
মা জী স্যারকে বলে যে আমি তাকে ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করেছি –
মা জি যদি সত্যি স্যারকে এই কথা বলে, তবে স্যার
আমাকে কখনও ক্ষমা করবেন না। সে
আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু
ভগবান জানে আমি মা জির জন্য ঝাড়ু তুলিনি, চিন্টুকে
মারতে চেয়েছিলাম। তখন মা জি
হাজির। আর আমার ঝাড়ু মা জির গায়ে
লাগেনি তো। এমন কাজের
জন্য স্যার কি আমাকে ছেড়ে যাবে? তিনি আমাকে
সারাজীবন আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সে
কি তার প্রতিশ্রুতি ভুলে যাবে? আমি কি
সত্যিই তার সাথে আর দেখা করতে পারব না? যদি আমাকে
ছেড়ে চলে যায় তবে কি হবে? কাঞ্চনের
সন্দেহজনক চিন্তা তার পিছু ছাড়ছিল না।
কাঞ্চন তখনও আনমনে, মন খারাপ করে বসে ছিল। সে খুব একাকী এবং দুর্বল বোধ করছিল। শরীরটা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠছিল যেন
হালকা দমকা হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
“কাঞ্চন! “হঠাৎ
রবির গলা কানে এল।
রবির কণ্ঠে কাঞ্চন ঘুরে। তারপর রবিকে দেখামাত্রই হতভম্ব হয়ে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু যথারীতি দৌড়ে তার বুকে ঝাপিয়ে
পড়েনি। আজ যেখানে ছিল সেখানেই তার পা
আটকে আছে। সেই জায়গায়
দাঁড়িয়ে রবির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার
চোখে ভেজা ভাব। কাঞ্চন ভেজা
চোখের পাপড়ি দিয়ে রবির দিকে তাকিয়ে ছিল, যেভাবে একজন
মৃতপ্রায় ব্যক্তি জীবনের আকাঙ্খা নিয়ে তাকায়।
রবিকে পাশে দেখে তার মনটা আবেগে ভরে গেল। হঠাৎ তার ভেতরের ব্যথা কান্নার আকারে
বেরিয়ে এসে তার গোলাপী গালে ছড়িয়ে পড়ল।
“কি হয়েছে কাঞ্চন?” রবি
সাথে সাথে ওর কাছে গিয়ে বলল
“স্যার ..... আমাকে ক্ষমা করবেন, আমার
কারণে মাজি অপমানিত হয়েছে এবং সে আমার উপর রাগ করে আমার বাড়ি থেকে ফিরে এসেছে। এই ভুলটি অসাবধানতাবশত হয়েছে। আপনার যা মনে হয় আমাকে শাস্তি দিন, কিন্তু
মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। আমি তোমাকে
ছাড়া থাকতে পারবো না...” আর বলতে পারল না, ওর গলার ভিতর দম
বন্ধ হয়ে আসছে। রবি
তাড়াতাড়ি ওর মুখে হাত রাখল।
“কিছু বলো না কাঞ্চন...!” বলল রবি, ওকে
কাঁধে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এল। তারপর
তাকে সেইভাবে ধরে খাদের কাছে নিয়ে গেল।
“তুমি কি এটা দেখছ, কাঞ্চন?” পড়ন্ত
ঝর্নার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল রবি। “এটা
ঠিক তোমার মতো। আর আমি সেই
হ্রদের মতো। কার কোলে এই ঝর্নাটা
পড়ছে। যেমন এই ঝর্ণাটা ছাড়া সেই
লেকের অস্তিত্ব নেই, তেমনি তোমাকে ছাড়া আমারও অস্তিত্ব
নেই। আমি জানি তুমি কী? দুঃখের
কথা, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো যে মায়ের চাপে তোমার সাথে
আমার সম্পর্কটা যেন ভেঙে না যায়। নদী, পাহাড়, হ্রদ, ঝর্না, দূর-দূরান্তের
সমতল ভূমি এসবকে সাক্ষী রেখে বলছি যে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না। এর জন্য যত মুল্যই দিতে হোক না কেন। কিন্তু আমি তোমার প্রতি কোন অবিচার
করব না।
“স্যার...!” কাঞ্চন বাকরুদ্ধ কথা বলে রবিকে
জড়িয়ে ধরল। বুকের মধ্যে
লুকিয়ে রাখল রবি।
রবির শক্ত বাহুর বৃত্তে কাঞ্চন তার সমস্ত ব্যথা ভুলে
গিয়েছিল। যখনই সে রবির
কোলে থাকত, সে কিছুতেই ভয় পেত না। সে ঠিক একই ভাবে শিথিল হত যেমন দুধমুখী শিশুর মতো মায়ের কোলে গিয়ে
অস্থির হয়ে ওঠে।
কিছুক্ষণ জড়িয়ে থাকার পর রবি ওকে ডাকলো। “কাঞ্চন... মা
তোমার বাসায় আসার পর কি হয়ে ছিল? মা যখন বাড়ি
ফিরে এলো, তখন সে বেশ পালটে গেছে।”
রবির কথা শুনে মুখ তুলল কাঞ্চন। তারপর রবির দিকে তাকিয়ে বলল - "মা কি বলছে স্যার? সে
নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে খুব খারাপ বলেছে।”
“না ... তেমন কিছু না। কিন্তু অবশ্যই রেগে গিয়েছে। কি হয়েছে?"
কাঞ্চন প্রথমে আতঙ্কিত, তারপর
ইতস্তত করে রবির কাছে সকালের ঘটনা বর্ণনা করতে লাগল।
ওর পুরো কথা শুনে রবি হাসতে হাসতে কাঞ্চনকে বলল-
"তাহলে মাকে ঝাড়ু দিয়ে মারতে যাচ্ছিলে। তাহলে মা-র রাগ জায়েজ।”
“স্যার, আমি
মাজির কাছে ক্ষমা চাই। সে আমাকে
ক্ষমা করবে, তাই না?” কাঞ্চন
সংশয় মাখা গলায় বলল।
“হ্যাঁ কেন নয়।” রবি আদর করে কাঞ্চনের গালে হাত
বুলিয়ে বলল - "মা নিশ্চয়ই রাগ করেছে কিন্তু আমি জানি সে আমি যা চাই তাই
করবে। কারণ ছোটবেলা থেকে সে আমাকে
খুব ভালোবাসে। কিন্তু ওকে
বোঝাতে একটু সময় লাগবে। আর যতক্ষণ না
আমি মা কে রাজি না করি, আমরা আগের মতো দেখা করতে পারব না। এমন পরিবেশে দেখা ঠিক হবে না।”
“কিন্তু... আমি আপনার সাথে দেখা
না করে থাকতে পারব না, স্যার।” বিচ্ছেদ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে কাঞ্চন।
“আমাদের কিছু দিনের জন্য দূরত্ব
রাখতে হবে, কাঞ্চন।” রবি তাকে বুঝিয়ে বলল। - "আমি চাই না যে আমাদের অবাধ্যতা আমাদের জন্য
নতুন কোন ঝামেলা বয়ে আনুক।”
“ঠিক আছে স্যার।” কাঞ্চন হতাশ গলায় বললো- "আপনি
যা মনে করেন তাই ঠিক।”
“দুঃখ পেও না কাঞ্চন ... সব ঠিক
হয়ে যাবে।” রবি কাঞ্চনকে
জড়িয়ে ধরে বলল।
কাঞ্চন ওকে জড়িয়ে ধরে জেগে ওঠে। রবি তাকে আদর করতে থাকল।
৩৭
২ টা বাজে। সুগনা
তার খামারের কাজে ব্যস্ত। কিন্তু কাজে
মন নেই তার, কারণ কাঞ্চন....! কিছুক্ষণ আগে
চিন্টুর সাথে তাকে খাওয়াতে এসেছিল। যদিও
শান্তা তার জন্য প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসত। কিন্তু
আজ সে কাঞ্চন আর চিন্টুকে পাঠিয়েছিল। সম্ভবত...
দীনেশজির সঙ্গে কিছু মুহূর্ত কাটানোর জন্য এটা করেছে।
কাঞ্চন কিছুটা বিষণ্ণ। গত সন্ধ্যা থেকে ওর মধ্যে দুঃখ যখন রবি বলেছে যে এখন
তাদের দুজনের কয়েকদিন দেখা হবে না। সে
সুগনার সামনে জোর করে হাসতে চাইছিল। যাতে
সুগনা তার দুঃখের কথা জানতে না পারে।
কাঞ্চন আর চিন্টু চলে যেতেই সুগনা তার কাজ শুরু করে দিল। কিন্তু কাঞ্চনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর
থেকে কাজে মন বসছিল না। আজ তার মন
খারাপ। কাঞ্চনের দুঃখ তার কাছ থেকে
লুকিয়ে রাখতে পারেনি। সুগনার
চিন্তা কমলাজী যদি এই সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে কাঞ্চন বাঁচবে কী করে? সে
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছিল - "যাই হোক না কেন, কাঞ্চনকে
আমি দুঃখী দেখতে পারব না... তার জন্য যা করতে হবে তাই করব। কিন্তু আমি ওকে ওর সব সুখ এনে দেব।”
সুগনা এসব ভাবনায় হারিয়ে গেছে তখন হঠাৎ তার কানে
জীপের শব্দ হলো। সেদিকে
তাকাতেই দেখল দিওয়ান জির জিপ আসছে। দেওয়ান
জিকে দেখে সুগনার কপালে ভাঁজ পড়ে এবং মুখে উদ্বেগের রেখা ফুটে উঠে।
কিছু দূর এসে জীপটা থামলো। দিওয়ান জিপ থেকে নেমে সুগনার দিকে তাকায়। বেলচা মাটিতে
রেখে সুগনা দিওয়ান জির দিকে এগিয়ে গেল। সে
বুঝতে পেরেছে যে দিওয়ান জি তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছেন। তবে সে ছাড়াও আরও কিছু লোক ছিল যারা অল্প দূরত্বে
তাদের ক্ষেতে কাজ করছিল। কিন্তু
দিওয়ান জির সেই লোকদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না।
“নমস্কার দিওয়ান জি। সুগনা দেওয়ান জির কাছে গিয়ে বলল। দিওয়ান জির দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে
তার মুখে কষ্টের ছাপ দেখতে পায়।
“নমস্কার! “দেওয়ান
জি, সুগনার নমস্কার উত্তর দিয়ে বললেন “কেমন আছো সুগনা?"
“ভালো আছি, মালিকের
আশীর্বাদ। আপনি বলুন কেন
কষ্ট করে ২০ বছর পর আমার খবর নিতে আসলেন?” সুগনার
কথায় ব্যঙ্গের ছাপ ছিল।
“আমি তোমার সাথে কাঞ্চনের ব্যাপারে
কথা বলতে এসেছি।”
“কাঞ্চন?” তার
মুখ থেকে অবাক হওয়ার ভাব বেরিয়ে এল। দিওয়ান
জির ঠোঁট থেকে কাঞ্চনের নাম শুনে সে ভয়ঙ্করভাবে হতবাক হয়ে গেছে। অদ্ভুত আশংকা নিয়ে তার হৃৎপিণ্ড
দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। দেওয়ান জির
দিকে প্রশ্নাতীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে- "বুঝলাম না? কাঞ্চনকে
নিয়ে কী কথা বলতে চান?"
' সুগনা, আমার
কথা খারাপ ভাবে নিও না। ' কন্ঠে
ব্যাথা নিয়ে বললেন দিওয়ান জি।
“দেওয়ান জী, আপনি
যা বলতে চান, পরিষ্কার করে বলুন। আমি ধাঁধার ভাষা আগেও বুঝিনি এবং এখনও
বুঝছি না।” বিরক্তি
নিয়ে বলল সুগনা।
“ঠাকুর সাহেব চান নিক্কি রবিকে
বিয়ে করুক। রবির মাও এই
সম্পর্ক নিয়ে খুশি। কিন্তু তোমার
মেয়ে কাঞ্চন রবি আর নিক্কির পথের মাঝে আসছে। সুগনা আমি কাঞ্চনের খারাপ চাই না কিন্তু নিক্কির
কারণে.....!"
“এই
যে দিওয়ান।” রাগে গর্জন করে উঠল সুগনা। “আমি ভালো
করেই জানি আপনি কার জন্য এটা চান। এটা
কাঞ্চনের ব্যাপার... তাই আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। কাঞ্চন আমার অহংকার। ওর ওপর কোনো অপবাদ আমি সহ্য করব না। কাঞ্চন আর রবি একে অপরের প্রেমে পড়েছে। ওদের মাঝে নিক্কি আসছে। অথবা হতে পারে আপনি আসার চেষ্টা করছেন।"
“তোমার সীমার মধ্যে কথা বলো, সুগনা।” দিওয়ান জি রাগে চিৎকার করে উঠলেন। “কাঞ্চন তোমার
মেয়ে আর নিক্কির বন্ধু, তাই এখানে এসেছি, না
হলে আমাকে এখানে আসতে হতো না। তুমি
বুদ্ধিমান। তুমি চাইলে
আমি তোমাকে কিছু টাকাও দিতে পারি। অন্য
কোথাও ভালো ছেলে দেখে কাঞ্চনকে বিয়ে দাও।”
“পৃথিবীতে আমার কাছে কাঞ্চনের
চেয়ে প্রিয় কেউ নেই। আমি ওর সুখের
জন্য নিজেকে বিক্রি করতে পারি।” সুগনার কণ্ঠ
ছিল পাথরের মত শক্ত। “একটা
কথা ভালো করে মাথায় রাখুন দিওয়ান জি। কাঞ্চন
যদি সামান্য আঁচড়ও পায়, তবে প্রাসাদের দেয়াল ভেঙে পড়বে। আমি গরিব, দুর্বল কিন্তু এতটা নয় যে আমি আমার মেয়েকে
রক্ষা করতে পারব না।
সুগনার রাগান্বিত চেহারা দেখে দিওয়ান জি উপর থেকে নিচ
পর্যন্ত কেঁপে উঠল। সে সুগনার
রাগের কথা জানে। সে পরিস্থিতির
গুরুত্ব বুঝতে পেরে মৃদু স্বরে বললো
"তুমি অকারণে রেগে যাচ্ছ, সুগনা। আমি সবসময় তোমার মঙ্গল কামনা করেছি। কাঞ্চন আর নিক্কির মধ্যে কোন পার্থক্য
করিনি। কিন্তু তুমি হয়তো আমাকে বুঝতে
পারোনি। ঠিক আছে, এখন আমি যাব। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।” এই বলে দিওয়ান জি চলে যেতে লাগলেন।
“দিওয়ান জি সৃষ্টিকর্তার প্রতি
আমার পূর্ণ আস্থা আছে।” উত্তরে সুগনা
বলল - "তিনিই বড় বিচারক। যার
গন্তব্য যেখানে সেখানে তিনি অবশ্যই পৌঁছাবেন। নমস্কার!"
দিওয়ান জি এক মুহূর্ত থেমে সুগনার দিকে তাকাল। তারপর তড়িঘড়ি করে জীপে উঠে। তিনি বসার সাথে সাথে জিপটি আবার ঘুরে গেল
এবং দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেল। সুগনা চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
দেখে।
বিকাল ৪ টা বাজে।
কাঞ্চন গায়ের মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। তার হাতে পূজার প্লেট। সাদা সালোয়ার কামিজে অপ্সরার মতো
সুন্দর লাগছে তাকে। এবং ঠিক তার
জামাকাপড়ের মতোই তাকে পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে।
আজ তার মনে হল মন্দিরে গিয়ে পূজা করা উচিত নিজের আর
তার ভালবাসার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা। সে
মন্দিরে পৌঁছে গেল। ভিতরে আরতি
করে, প্রার্থনা করে তারপর পূজারিজির আশীর্বাদ নিয়ে
বেরিয়ে পড়ে।
মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নামার সাথে সাথে সে রবির মা কে
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে দেখে। কাঞ্চন তাকে
দেখেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সে এখন কি
করবে বুঝতে পারছিল না। ভাবতে লাগলো-
পাছে মাজি আমাকে দেখে সেদিনের প্রতিশোধ নেবে। আর আমাকে কথা শুনাতে শুরু করবে।
কাঞ্চন এদিক ওদিক লুকানোর জায়গা খুঁজতে থাকে। তখন কাঞ্চনের সঙ্গে কমলাজির চোখা চোখি
হয়। কাঞ্চন তাকে তার দিকে তাকিয়ে
থাকতে দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকে। তার
হাত কাঁপতে লাগল যেন প্লেটটা হাত থেকে পড়ে যাবে। সে নিশ্চল দাঁড়িয়ে তাকে কাছে আসতে
দেখে।
কমলা জি ওর কাছে এলেন। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাকিয়ে আছে কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চনের দম আটকে গেছে। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে।
“কি করতে এসেছ?” কমলাজী
কাঞ্চনের অবস্থা দেখে ব্যঙ্গ করে কথা বললেন।
“জে …… জি…আম…।” ওর জিভ নড়বড়ে হয়ে গেল। সে হতবাক দৃষ্টিতে কমলাজির দিকে তাকাল।
“তুমি এত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন? আমি
সিংহ নই যে তোমাকে খেয়ে ফেলব।”
কমলাজীর কথা শুনে কাঞ্চনের অবস্থা আরও পাতলা হয়ে গেল। এই মুহুর্তে সে সত্যিই নিজেকে খোলা
বনে সিংহীর মাঝে অনুভব করছিল। ভয়ে
তার মুখ কাঁদো কাঁদো।
“আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে
চাই। আমার সাথে কিছুক্ষণ বসো।” কমলা জি সিঁড়ির পাশে তৈরি
প্ল্যাটফর্মের দিকে ইশারা করে নিজেই প্ল্যাটফর্মের দিকে চলে গেলেন। কাঞ্চন যান্ত্রিক যন্ত্রের মতো তার
পেছনে হেঁটে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“বসো।” কমলাজী কাঞ্চনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বসার ইঙ্গিত করে।
কাঞ্চন দ্বিধা আর ভয় নিয়ে প্ল্যাটফর্মে বসল।
“রবিকে কতটা ভালোবাসো? কাঞ্চনের
ভয়ে ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে কমলাজী বললেন।
কমলাজির প্রশ্নে কাঞ্চন চমকে উঠল। সাথে সাথে কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে বলবেও বা কি? ভালবাসা
কি ওজন করা যায়? যারা প্রেমের খবর রাখে তারা করতে পারে...প্রেমিক
প্রেমিকা নয়। আর কাঞ্চনের
ভালোবাসা ছিল ভক্তির মতো যার কোনো সীমা ছিল না। সে চুপ করে রইল। কমলার
প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে ছিল না।
“বল ... চুপ করে আছ কেন?” কাঞ্চনকে
চুপ করে দেখে কমলাআবার জিজ্ঞেস করল। “তুমি
জানো না তুমি রবিকে কতটা ভালোবাসো?"
কাঞ্চন বাধ্য হয়ে ঠোঁট চিবানো শুরু করলো। সে অনুভব করে যে মা জি সেদিন ঝাড়ুর জন্য
বিরক্ত হয়েছিলেন এবং সম্ভবত সে কারণেই তিনি আমাকে পছন্দ করেন না। সে সেদিনের ভুলের জন্য ক্ষমা চায় -
"মা... আমি সেদিনের জন্য ক্ষমা চাইছি।”
“সেদিনের কথা বলছি না, আমি
শুধু জিজ্ঞেস করছি তুমি রবিকে কতটা ভালোবাসো, আর
তার জন্য কি করতে পারো? একই সুরে বললেন কমলাজী।
“আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আর স্যারও আমাকে সমান ভালোবাসেন। মা জি, আমি
আর কোনো ভুল করব না... এবারের মত আমাকে মাফ করে দিবেন।” কাঞ্চন ভেজা চোখের পাতায় হাত জোড়ে কমলা জিকে বলল।
“তুমি যদি সত্যিই রবিকে
ভালোবাসো এবং তাকে সুখী দেখতে চাও, তাহলে তুমি
আমার কথা মানবে?"
“যদি আপনি ঠিক বলেন আমি রবির
এবং আপনার সুখের জন্য সবকিছু করতে পারি।” কাঞ্চন কিছু
না ভেবেই কমলাজিকে খুশি করতে রাজি হয়ে গেল। সে
ভাবে, হয়তো কমলাজি তাকে সুযোগ দিতে চেয়েছে।
“তাহলে শোন! তুমি যদি সত্যিই
রবিকে ভালোবাসো এবং তার সুখ চাও, তাহলে তোমাকে
রবির জীবন থেকে দূরে সরে যেতে হবে। শোনা
যায়, হাল ছেড়ে দিলে প্রেয়সী আরও পবিত্র হয়।” শুকনো কণ্ঠে বললেন কমলাজী।
কাঞ্চনের মনে হল যেন কমলা জি তার বুকের গভীরে ছুরিকাঘাত
করেছে। যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছে। সে দমবন্ধ চোখে কমলাজির দিকে তাকাল। কিছু বলার জন্য তার ঠোঁট কাঁপছে...
কিন্তু মুখ থেকে শব্দ বের হলো না। তাই
বুকে ব্যথা অনুভূত হয়। তার মন চাইল
এখন বুক চাপড়ে কাঁদতে। আর মাকে বলতে
কেন সে তার সাথে এমন অত্যাচার করছে, সে কি অপরাধ
করেছে, যার জন্য সে এত বড় শাস্তি দিতে চায়।
“মা, আমি
স্যারকে ছাড়া থাকতে পারব না, আমাকে তার
কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিবেন না। স্যারও
আমাকে খুব ভালোবাসেন।” কাঞ্চন তার
সামনে হাত জোড় করে অনুরোধ করে।
“তার চোখ তোমার সৌন্দর্যে আবৃত, তাই
সে সঠিক আর ভুলের পার্থক্য দেখতে পায় না। কিন্তু
আমি তার মা, আমি জানি তার জন্য কোনটা সঠিক আর
কোনটা ভুল।” কাঞ্চনের
অবস্থার পরোয়া না করে কমলা জি বলতে থাকলো - "আমি তোমাকে শুধু বলতে চাই এখন
থেকে তুমি রবির সাথে আর কখনো দেখা করবে না। তুমি
যদি সত্যিই রবিকে ভালোবাসো। নাহলে
বুঝবো তোমার ভালোবাসাটা একটা ছলনা... তুমি শুধু ভান করছো। উঁচু বাড়িতে সম্পর্ক করতে।”
“এম... মা।” কাঞ্চন কুঁচকে বলল।
“কাঞ্চন, আমি
তোমার সাথে কোন শত্রুতা করছি না… একটি সত্য আছে
যা আমি তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। রবিকে
যে সমাজে থাকতে হবে তুমি সেই সমাজের যোগ্য নও। রবিকে বিয়ে করলে তুমি বিদ্রুপের কারণ হবে। সেই সাথে রবিও। দুই দিনের মধ্যে তার ভেতরের ভালোবাসা নিভে যাবে এবং সে
তোমাকে ঘৃণা করতে শুরু করবে। হ্যাঁ, নিক্কি
তোমার জায়গায় থাকলে রবি কখনো লজ্জা পাবে না। সে একই সমাজের। সমাজ, তুমি
জানো না সেই সমাজে কিভাবে থাকতে হয়। আর
তুমি কেন ভাববে না যে ঠাকুর সাহেব তোমাকে মেয়ের মতো ভালোবাসা দিয়েছেন, তুমি
কি তাদের সুখ কেড়ে নিয়ে ঠিক করবে? এই বলে কমলা
জী থমকে কাঞ্চনের উত্তরের অপেক্ষা করে।
“নিক্কি আর স্যারের বিয়ে?” কমলার
কথায় বিস্ময়ে বিড়বিড় করে কাঞ্চন। “কিছু
বুঝলাম না মা জি?"
“তুমি কি জানো না নিক্কি রবিকে
ভালোবাসে?” কমলা জি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে কাঞ্চনের
দিকে তাকাল। “এই
সম্পর্ক নিয়ে আমরা সবাই খুশি। সবারই
ইচ্ছা রবির বিয়ে হোক নিক্কির সঙ্গে। এই
সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছ শুধু তুমিই। রবির জেদ যে সে তোমাকেই বিয়ে করবে। তুমি তাকে বিগড়ে দিয়েছ জানো।"
কাঞ্চন হতভম্ব!
“শুনেছি তুমি নিক্কির বন্ধু?” কমলাজী
আরও বলে - "তুমি কি তোমার বন্ধুর সুখ ছিনিয়ে নিতে চাও?"
কাঞ্চনের সামনে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। কমলার কথায় সে হতবাক হয়ে গিয়েছে যে
নিক্কি রবির প্রেমে পড়েছে এবং ঠাকুর সাহেব তাদের বিয়ে দিতে চাচ্ছেন।
কমলাজী কাঞ্চনের মুখ পরীক্ষা করলেন। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। কমলাজি তাকে শিথিল করা উপযুক্ত মনে
করলেন না, তিনি তার ফাঁস শক্ত করলেন। তিনি আরও বলেন - "একটু ভেবে দেখ
কাঞ্চন, ঠাকুর সাহেব ২০ বছর ধরে দীর্ঘ বেদনাদায়ক জীবন
কাটাচ্ছেন। বহু বছর পরে
তাঁর মেয়ের বিয়ের কথা শুনে তাঁর মুখে হাসি ফিরে এসেছে..... যখন তিনি জানতে
পারবেন তুমিই কারণ নিক্কির সাথে রবির বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার, কি
হবে তার? নিক্কি তার জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে জীবন
দিলে তার হৃদয়ে কেমন প্রভাব পড়বে? সে কি বাঁচতে
পারবে? না কাঞ্চন..... ..ঠাকুর সাহেব এই যন্ত্রণা সহ্য
করতে পারবেন না। তুমি এটা করতে পারবেন? তার
বুক ফেটে যাবে। এতটুকু জেনে
রেখো কাঞ্চন, এখন প্রাসাদে যা কিছু ভালো-মন্দ ঘটবে
তার জন্য তুমিই দায়ী থাকবে...!”
“চুপ করুন মা। আর কিছু বলবেন না।” কাঞ্চন যন্ত্রণার সুরে বললো- "আপনি
যদি মনে কর যে আমার চলে যাওয়ায় সুখী হতে পারবে, তবে
যান...আজকের পর আর কোনোদিন স্যারের সাথে দেখা হবে না। আজকের পর আমি তার জন্য মরে গেছি। এখন কাঞ্চন কখনো আপনার মাঝে আসবে না। যান।” একথা বলে চমকে ওঠে কাঞ্চন। দুই হাতে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে।
কমলা জি ওর কান্নায় মূলে কেঁপে উঠল। কিন্তু তার ভেতরের নারীকে তিনি বাইরে
আসতে দেননি। সে কিছুক্ষন
ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো, তারপর আস্তে করে ওর কাঁধ চেপে ধরে
বললো ”কাঞ্চন.....আমাকে মাফ করে দাও। আমার জন্য তোমার মন খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু আমিও তাই বললাম যা সত্যি। এখন তুমি তোমার বাসায় যাও। "... এবং আমার প্রতি কোন রাগ
রাখবে না।”
কাঞ্চন কিছু বলল না। চোখের জল মুছতে মুছতে সে উঠে দাঁড়াল এবং কাঁপতে কাঁপতে
সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সে খুব দুঃখিত ছিল! কমলার মুখ থেকে
বের হওয়া প্রতিটি শব্দই তার কানে বিষ ঢেলে দিচ্ছিল।
ভারী পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে বাড়ির পথে এগোচ্ছিল। তার মন একেবারে অস্থির হয়ে গেল। টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একটাই কথা
ভাবছিল। “কি
হচ্ছে আমার সাথে? কেন স্যারের মা আমার উপর রেগে গেলেন? ছোট
একটা ভুলের জন্য কেন মা আমাকে এত বড় শাস্তি দিচ্ছেন? আমি
কি এত খারাপ? নাকি আমার চেহারা খারাপ হয়ে গেছে? হ্যাঁ
তাই হবে? .....মাজি আমাকে তার সমাজের যোগ্য মনে
করেন না। আমি যদি
নিক্কির মতো ধনী হতাম,তাহলে মাজি আমাকে তার পুত্রবধূ হিসেবে
মেনে নিতেন। নিক্কিকে ভালো
লেগেছে কারণ ঠাকুর সাহেবের অনেক টাকা আছে।
নিক্কির কথা মনে পড়তেই কাঞ্চনের মনটা আরও খারাপ হয়ে
গেল। যে বন্ধুকে সে তার জীবনের
চেয়েও বেশি ভালবাসত, সে আজ তার জীবনের শত্রু হয়ে উঠেছে।
হ্যাঁ ! নিক্কির কারণেই সে রবির থেকে আলাদা হয়ে
যাচ্ছিল। জেনে হোক বা
অজান্তে নিক্কি কিন্তু আজ কাঞ্চনের মনে আঘাত দিয়েছে। আজ কাঞ্চন নিক্কির সাথে নিজের পার্থক্য বুঝতে পেরেছিল। আজ সে জেনেছে গরীবের সাথে ধনীর
সম্পর্ক শুধু খেলার জন্য, তাদের কোন বন্ধনে বাঁধার নয়।
সে নিক্কির উপর রাগ করেনি, কিন্তু
মনে মনে রাগ ছিল। আপনার কাছে
কেউ যতই প্রিয় হোক না কেন - কিন্তু তারা যখন আপনার ভাঙা হৃদয়ের কারণ হয়ে ওঠে, তখন
আপনি তার উপর রাগ করেন। কাঞ্চনের
রাগও ছিল একই রকম।
এ সময় কাঞ্চনের অবস্থা হুবহু ব্যবসায়ীর মতো। যে সারাদিন রাস্তার বাজারে ঘুরে
বেচাকেনা করে বাড়ি ফেরার সময় তার সব টাকা কেড়ে নেয়। তখন ওই বণিকের মানসিক অবস্থা কাঞ্চনের মতোই হয়। এবং তার উপরে এখানে এটি একদিনের
উপার্জনের কথা নয় - এটি কাঞ্চনের পুরো জীবনের ব্যাপার। তার সেই স্বপ্ন সে এখন পর্যন্ত দেখে আসছিল নিমিষেই তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া
হচ্ছিল। তার রাগ
হওয়াটাই স্বাভাবিক।
কাঞ্চন কাঁদছিল। সে
আর কখনো রবির সাথে দেখা করতে পারবে না এই উপলব্ধি নিয়ে, তার
আত্মা রক্তাক্ত হয়েছিল। সে বুঝতে
পারছিল না কি করবে যাতে সে আবার রবিকে পায়। তার
স্যার কি আবার তার হতে পারে? কিন্তু এগুলো
ছিল অভিনব ক্যাসারোল। রবিকে
ফিরিয়ে আনার কোনো পথ সে দেখতে পাচ্ছে না।
এসব প্রশ্নের ঘূর্ণিঝড়ে ঘেরা ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে
যায় কাঞ্চন। উঠোনর পা
দিতেই বুয়া কিছু জিজ্ঞেস করলেন…কিন্তু শান্তার
কথা কানে পৌছাল না। সে এখন অন্য জগতে।
একই অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরে পৌঁছল কাঞ্চন। পূজার প্লেটটি রাখে তারপর সে তার ঘরে প্রবেশ করল। রুমে পৌঁছে খাটের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
শান্তর কাঞ্চনকে এ অবস্থায় দেখে সে হতবাক হয়ে গেল। তার
কিছু একটা হয়েছে। শান্তা
কাঞ্চনকে এতটা চুপচাপ আর মন মড়া আগে কখনো দেখেনি। রুমের ভিতরে এসে কাঞ্চনের দিকে তাকাল। কাঞ্চনের কপাল থেকে ঘাম ঝরছিল, কিন্তু
তার শরীর থরথর করে কাঁপছিল যেন সে শীতল অঞ্চলে এসেছে।
কাঞ্চনের এমন অবস্থা দেখে শান্তার হুঁশ উড়ে গেল। সে ঝুকে কাঞ্চনের কপালে হাত রাখল। শান্তার হাত পৌছাতেই কাঞ্চনের হুশ হয়। সে অশ্রুসজল চোখে বুয়ার দিকে তাকাতে
লাগল।
“কি হয়েছে কাঞ্চন?” বুয়া
চিন্তিত গলায় বলল।
বুয়ার আদর পেয়ে কাঞ্চনের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গালে
ছড়িয়ে পড়ল। কাঞ্চন কিছু
বলার জন্য ঠোঁট নাড়ল কিন্তু আওয়াজ বেরোল না। তার ঠোঁট শুধু ছলছল করছিল। সে সাহায্যের জন্য তার বুয়ার দিকে তাকাল। একটি ছোট শিশুর মত।
কাঞ্চনকে কাঁদতে দেখে শান্তার বুক ফেটে যায়। কোন এক অজানা আশঙ্কায় তিনি আতঙ্কিত
হয়ে পড়েন। ওর গলা শুনে
কাঞ্চনের ফুপা আর চিন্টুও অন্য ঘর থেকে এলো। বোনকে
কাঁদতে দেখে চিন্টুর মন খারাপ হয়ে গেল।
“কাঞ্চন, খারাপ
কিছু হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?” শান্তা
আবার জিজ্ঞেস করল।
কাঞ্চন কেঁদে কেঁদে শান্তাকে কমলাজীর সব কথা বলতে লাগল। কাঞ্চনের কথা শুনে শান্তাও আঁতকে উঠল। কাঞ্চনকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল
মুছতে লাগল। কাঞ্চনের
ভাঙা হৃদয়ের বেদনা এখন তার হৃদয়ে পৌঁছেছে। কাঞ্চনকে
বললেও কি বলবে বুঝতে পারছে না? সে তাকে
সান্ত্বনা দিতে লাগল। তা ছাড়া
শান্তা কী করতে পারে? চিন্টু আর ফুফাও তাকে ঘিরে বসলো। চিন্টু কাঞ্চনকে জড়িয়ে ধরল। দিদি কেন কাঁদছে তাও সে বুঝতে পারছে
না। কিন্তু কাঞ্চনকে কাঁদতে দেখে
সেও কাঁদছিল। তারও চোখ ভরে
গেল।
তারপর সুগনা রুমে ঢুকল। দিওয়ান জির সঙ্গে দেখা করার পর কাজ করতে ভালো লাগেনি। কিছুক্ষণ পর বাসার দিকে মোড় নিল।
“কি হয়েছে?” ভিতরে
আসতেই সুগনা কাঞ্চনকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করল।
শান্তা ওকে সব বলতে লাগলো।
কথাটা শুনে সুগনার চোয়াল চেপে গেল। রাগে তার চোখ লাল হয়ে গেল। রাগ কন্ট্রোল করে কাঞ্চনের পাশে বসে
মাথায় হাত বুলাতে লাগল। তার পর সে
কাঞ্চনকে বলল- "না কাঞ্চন....না! এখন তোর কান্নার দরকার নেই। এখন তোর দুঃখের দিন চলে গেছে কাঞ্চন। এখন তোর প্রতি কেউ অবিচার করতে পারবে
না। অন্তত আমার জীবন থাকতে তো নয়। তোর সব অধিকার তুই পাবি। আমি এখন প্রাসাদে গিয়ে ঠাকুর সাহেবের
সঙ্গে কথা বলব। তুমি চুপ কর, রবি
তোর, তোরই থাকবে। কেউ
তাকে তোর থেকে আলাদা করতে পারবে না।”
“বাবা...! মাজি আমাকে পছন্দ করে
না। সে আমাকে কখনোই স্যারের সাথে
বিয়ে করতে দেবে না।” কাঞ্চনের
কান্না তখনও চলছিল।
“তুই চিন্তা করিস না বেটি। আমি ঠিক বলছি। আমি এখন রাজবাড়িতে যাচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“ভাই, ঠাকুর
সাহেবের সাথে কথা বলবেন?” শান্তা অবাক হয়ে বলল।
“হ্যাঁ শান্তা, এখন
সেই দিন এসেছে যার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম। কাঞ্চনকে যত্ন নেও... আমি আসছি।” সুগনা কথা বলে তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
কাঞ্চনের সাথে দীনেশ জিও সুগনাকে চলে যেতে দেখছিল। দুজনেই শান্তা আর সুগনার কথা বুঝতে
পারলো না। কিন্তু সুগনার
কথায় কাঞ্চনের কান্না নিশ্চয়ই থেমে গেল। বুয়ার
দিকে প্রশ্নাতীত চোখে তাকাতে লাগল।
৩৮
ঠাকুর সাহেব ও দেওয়ান জি হলের মধ্যে বসে কথা বলছিলেন। নিক্কি ছিল তার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ঠাকুর সাহেব তখনও রবি ও কাঞ্চনের
প্রেমের সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তিনি
দেওয়ান জিকে জিজ্ঞাসা করলেন - "দিওয়ান জি আপনি কি মনে করেন, কমলা
জি আমাদের নিক্কিকে বউ করতে রাজি হবেন?"
“আমাদের নিক্কির কি অভাব মালিক, যা
কমলাজী অস্বীকার করবেন?” দিওয়ান জি তাকে সান্ত্বনা দিলেন। - "আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি
তার সাথে কথা বলব... তবে আমি আপনার কাছ থেকে অনুমতি চাই। যদি আপনি অনুমোদন করেন?"
“বলুন দেওয়ান জি... অনুমতি
লাগবে কেন?” তার দিকে প্রশ্নাতীত চোখে তাকিয়ে
বললেন ঠাকুর।
“মালিক, আমি
এই বিষয়ে কমলাজির সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।”
“একা?” ঠাকুর
সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন - "কিন্তু তা কেন দেওয়ান জী?"
“কারো মনের অবস্থা কে জানে। কমলা জি কি চায় জানি না। তার প্রত্যাখ্যান যেন আপনাকে দুঃখ না
দেয়। তাই আমি তার সাথে একান্তে কথা
বলতে চাই।” দিওয়ান জি
তার সন্দেহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু এটা
ছিল তার ভান। দেওয়ান জি
কমলার মুখ থেকে রবি ও কাঞ্চনের প্রেমের সম্পর্কে জানতে চান।
“আপনি যা ঠিক মনে করেন তাই করুন, দেওয়ান
জি। আমার চিন্তা সীমিত রয়ে গেছে। কিন্তু চেষ্টা করুন যাতে তারা রাজি
হয়। আমি রবিকে খুব পছন্দ করি। তার মতো ছেলে খুঁজলেও আমরা পাব না।”
“আপনি চিন্তা করবেন না মালিক, সব
ঠিক হয়ে যাবে। আমিও রবিকে
খুব পছন্দ করি।” দিওয়ান জি
তাকে উৎসাহিত করেন।
যে মুহুর্তে তাদের কথাবার্তার ক্রম চলছিল যখন কমলাজী
হাভেলীর প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেন। তার
মুখে এক বিশেষ ধরনের আনন্দ ছড়িয়ে আছে। যেন
সে কোন কাঙ্খিত বর পেয়েছে।
কমলা জি ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের কাছে এসে নমস্কার
ভঙ্গিতে হাত গুটিয়ে নিলেন। ঠাকুর
সাহেব ও দিওয়ানজীও উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাঁর নমস্কারের জবাব দিলেন। ঠাকুর সাহেব কমলাজীকে বসতে ইশারা করে
নিজেও বসলেন।
“বোনজি, কোথা
থেকে আসছেন? এত খুশি আগে কখনো দেখিনি... আজকে কি
বিশেষ কিছু আছে?” দেওয়ানজি প্রশ্ন করেছিলেন, কিন্তু
উত্তরের আশায় ঠাকুর সাহেবও কমলাজীর মুখ দেখতে লাগলেন।
“আমি মন্দির দিয়ে আসছি, দিওয়ান
জি, আর কিছু না।” কমলা উত্তর
দিল।
“আপনি মার কাছে কি চাইলেন?” এবার
ঠাকুর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
“এই প্রাসাদে সুখ। আর নিজের জন্য সুন্দরী পুত্রবধূ।” কমলাজী হেসে বললেন।
“আসলে এই প্রাসাদে আপনার মতো
দেবীর আশীর্বাদ দরকার। ভগবানের সাখে
আমাদের জন্ম-বিদ্বেষ। তিনি কখনো
আমাদের কথা শোনেন না। হয়তো আপনার
কথা শুনবে।” ঠাকুর সাহেব
বিষণ্ণ স্বরে বললেন।
“হতাশ হবেন না, ঠাকুর
সাহেব। আপনার যা আছে সবই ভগবান আপনাকে
দিয়েছেন। আর কি দরকার?” কমলাজী
ঠাকুর সাহেবকে বললেন - "চিন্তা ছেড়ে দিন ঠাকুর সাহেব, ভগবানের
ঘরে অন্ধকার নেই। আপনি নিক্কির
কথা ভাবুন..... ওর বিয়ের কথা ভাবুন। ওর
জন্য ছেলে দেখেছেন নাকি?"
“আমরা ছেলে দেখেছি, কিন্তু...
এই সম্পর্ক সম্ভব হবে কি না ভগবানই জানেন।”
“তাহলে তার দায় আমার উপর ছেড়ে
দিন। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে
আজ থেকে আপনার মেয়ে আমার।” কমলা জি আসল
কথাটা বললেন।
কমলাজির কথা শুনে ঠাকুর সাহেব ও দিওয়ান জির মুখ খুশিতে
ভরে উঠল। তাদের চকচকে
চোখ একে অপরের মুখ দেখতে লাগল।
“বেহন জি, রবিবাবুর
সাথে এই ব্যাপারে কথা হয়েছে? এটা কি তার
ইচ্ছা........?” দিওয়ান জি ভয়ে নড়েচড়ে বসলেন।
“রবিকে নিয়ে চিন্তা করবেন না, দিওয়ান
জি। আমি যা বলব রবি তাই করবে।” কমলা জি দিওয়ান জির সাথে ইতস্তত
কণ্ঠে কথা বললেন। তারপর ঠাকুর
সাহেবের দিকে ফিরে - "ঠাকুর সাহেব, আমি আপনাকে
কথা দিচ্ছি। আপনার নিজের
মেয়ে আমার বাড়ির পুত্রবধূ হবে। আপনি
নিক্কির চিন্তা ছেড়ে দিন। আমি
আজ এই বিষয়ে রবির সাথে পরিষ্কার কথা বলব।”
“বেহন জি, আপনি
আমাদের সমস্ত বোঝা হালকা করে দিয়েছেন। রবি
যেদিন প্রাসাদে পা দিয়েছে সেদিনই আমরা তাকে পছন্দ করেছি। আজ আপনার অনুমোদনও পেয়েছি। এখন ভগবানের কাছে আমাদের কোন অভিযোগ নেই।” ঠাকুর সাহেব আবেগে বললেন। কমলার কথা শুনে তার চোখ আনন্দে জ্বলে
উঠল।
“সত্যিই আজকের দিনটা খুব ভালো।” দিওয়ান জি বললেন- আজ বহু বছর পর
রাজবাড়িতে খুশি ফিরেছে।
দিওয়ানজির কথা পূর্ণ হওয়ার আগেই সুগনা প্রাসাদের প্রধান
ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল.. তার দিকে তাকাতেই দিওয়ান জির মুখ থেকে সমস্ত সুখ
উধাও হয়ে গেল।
কমলা জিকেও খুশি দেখাচ্ছিল না। এমন সময়ে সুগনার এখানে আসাটা তার কাছে বিরক্তিকর ছিল।
কিন্তু ঠাকুরের মুখে তেমন কোনো ভাব ছিল না। শুধু অবাক হয়ে ঘর্মাক্ত, নোংরা
জামাকাপড় পরে দাঁড়ান সুগনার দিকে তাকিয়ে ছিল।
সুগনা কাছে এসে হাত জোড় করে সবাইকে প্রণাম করল।
“কি ব্যাপার সুগনা? এভাবে
হন্তদন্ত হয়ে এসেছ কেন? সবাই ভালো আছে? “ঠাকুর সাহেব
তার অবস্থার আন্দাজ করে বললেন।
“ঠাকুর সাহেব আমি আপনার সাথে
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে এসেছি। কিন্তু
সেই জিনিসটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে সবার সামনে বলতে পারি না। আমি আপনার সাথে একান্তে কথা বলার অনুমতি চাই” ভদ্র
কণ্ঠে বলল সুগনা।
“এখানে সবাই আমার আপন সুগনা, যা
বলতে চাও এখানেই বল।” ঠাকুর সাহেব বললেন।
কমলা জি আর দিওয়ান জির দিকে একবার কটাক্ষ করে সুগনা বলল,
“দুঃখের বিষয় যে ঠাকুর সাহেব
এখানে কেউই আপনার নিজের নন।”
“সুগনা! “ঠাকুর
সাহেব রাগে চিৎকার করলেন। তার গর্জন
এমন ছিল যে তার আওয়াজ রবি এবং নিক্কির কানে পৌঁছে গেল বন্ধ ঘরের ভিতরে। ওরা দুজনেই যে যার রুম থেকে বেরিয়ে
এলো। আর সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে
হলের দিকে তাকাতে লাগল। বাড়ির বাকি
চাকররাও জড়ো হয়েছিল।
ঠাকুর সাহেবের ক্রোধে সুগনাও ক্ষণিকের জন্য কেঁপে উঠিল। ঠাকুর সাহেবকে এত রাগান্বিত হতে সে
আগে কখনো দেখেনি। সে বিনীত
হয়ে ঠাকুর সাহেবকে বললেন- "দুঃখিত ঠাকুর সাহেব। আমি জানি একটা বড় কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু আপনার অনুভূতি নিয়ে খেলা করতে আমি বাড়ি থেকে
এখানে আসিনি। বরং এটা আমার
বুকে রয়ে গেছে। বছরের পর বছর। এখানে একটা সত্যিকারের কবর আছে যেটা
আমি খুলতে এসেছি। মালিক...
একবার ঠাণ্ডা চিত্তে আমার কথা শুনুন। তারপর
আপনি চাইলে আমাকে ফাঁসি দেবেন। আমি
প্রতিবাদ করব না।”
সুগনার আত্মবিশ্বাসে ভরা কথা শুনে ঠাকুর সাহেব একটু নরম
হলেন। “সুগনা...তুমি
জানো তুমি কি বলছো? এই কথা বলে তুমি শুধু দেওয়ানজিকে
অপমান করনি, আমাদের বাড়িতে আসা অতিথি কমলাজিকেও
অপমান করেছ। তোমার কথায়
যদি সামান্যতম মিথ্যাও থাকে। তাহলে
এই ঔদ্ধত্যের জন্য আমরা তোমাকে ক্ষমা করব না, আমরা
ভুলে যাব যে তুমি কাঞ্চনের বাবা।”
“আমি এখানে সেই কারণেই এসেছি।” ঠাকুর সাহেবের হুমকিকে পাত্তা না
দিয়ে সুগনা আরও বলল - "ঠাকুর সাহেব....আমি নই- আপনি কাঞ্চনের বাবাও। আমি শুধু কাঞ্চনকে লালন-পালন করেছি। কাঞ্চন আপনার মেয়ে। ঠাকুরাইনের গর্ভে জন্মেছেন। তার কন্যা।”
“কি .....????”
ঠাকুর সাহেবের সাথে কমলাজী এবং দিওয়ানজীও এক ধাক্কায় নিজ স্থান থেকে লাফিয়ে
পড়লেন… যেন তাদের তিনজনকেই বিষাক্ত বিচ্ছু
দংশন করেছে।
দিওয়ানজির কপালে ঘাম জমেছে। কমলা জি তাকে দেখে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠাকুর সাহেবের অবস্থা সবচেয়ে
খারাপ। সে পাগলের মত তাকিয়ে ছিল
সুগনার দিকে।
“কি করছ সুগনা? পথে
দাতুরার গন্ধ পায়নি?” দিওয়ান বলল, সুগনার
দিকে দ্রুত এগিয়ে গেল।
“দিওয়ান জী, এই
কথাটা অন্য কেউ বললে বুঝতাম। কিন্তু
আপনি এই ষড়যন্ত্রের কর্তা। আপনিও
কি ভুলে গেছেন? নাকি ঠাকুর সাহেবের সামনে সত্য বলতে
ভয় পাচ্ছেন? আপনি? ”সুগনা দেওয়ান জির দিকে ব্যঙ্গাত্মক
দৃষ্টি রেখে বলল।
“কে ... কি করছ তুমি? কি
বলতে চাও?” দিওয়ান জি বললো। তার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ ছিল।
ঠাকুর সাহেব পাগলের কায়দায় কখনো সুগনা আবার কখনো
দেওয়ান জিকে দেখছিলেন। এখন পর্যন্ত
কিছুই বুঝতে পারেনি। কমলাজিও বোকার মতো কথা শুনতে শুনতে
হারিয়ে গেলেন।
“সরকার, এই
লোকটা পাগল হয়ে গেছে।” দিওয়ান জি ঠাকুর
সাহেবের দিকে ঘুরে বললেন - "কাঞ্চন আপনার মেয়ে কিভাবে হতে পারে। মালকিন হাসপাতালে একটি মাত্র মেয়ে
সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, যে নিক্কি রূপে আপনার কাছে রয়েছে। আপনি যদি চান তবে আপনি এটি নিশ্চিত
করতে পারেন। হাসপাতাল, ডাক্তার এবং অন্যান্য কর্মীরা এর
সাক্ষ্য দিবে। এটা হতে দেব
না। আমি বছরের পর বছর আপনার নুন
খেয়েছি... আমি এই লোকটিকে আপনার মেয়ে নিক্কির অধিকার কেড়ে নিতে দেব না।”
“চুপ করুন, দেওয়ান
জি।” সুগনা রাগে চিৎকার করে উঠল। “মিথ্যে বলে
আর পাপ বাড়াবেন না। নিক্কি আপনার
মেয়ে। ঠাকুর সাহেবের সামনে এই সত্যটা
ফাঁস করুন।”
ঠাকুর সাহেব বিস্ময়ে সুগনার দিকে তাকালেন।
“সুগনা ..... নিমক হারাম, বছরের
পর বছর আমার টুকরো খেয়ে আর এখন সেই নুনের বিনিময়ে প্রাসাদের সুখ কেড়ে নিতে চাও?”দে ওয়ান জি আহত সিংহের মতো গর্জন
করলেন।
“নিমক হারামি, আমি
আপনাকে করিনি, দিওয়ান জি।” দেওয়ান জির জবাবে সুগনা চিৎকার করে উঠল। তারপর ঠাকুর সাহেবের দিকে ফিরে বললেন-
"ঠাকুর সাহেব, আমার মনে কোনো স্বার্থপরতা নেই। হ্যাঁ! স্বার্থপরতা ছিল... যে
কাঞ্চনকে এত দিন বুকে আগলে রেখেছিলাম। কেড়ে
নিতে দেইনি, তাই। আমি আজ পর্যন্ত আপনাকে এই সত্যটি বলিনি। কিন্তু এখন প্রশ্নটা ওর সারাজীবনের। এটা ওর জীবনের সুখের কথা। এখনও যদি চুপ থাকি তাহলে আমি কাঞ্চনের
সাথে বড় অন্যায় করতাম। ওকে আজ ছেড়ে
দিতেই হবে তাই আপনাকে সত্য বলতে এসেছি। ঠাকুর সাহেব তারপরও যদি বিশ্বাস না
করেন তবে দেওয়ান জিকে জিজ্ঞাসা করুন...”
ঠাকুর সাহেবের চোখ দিওয়ান জির দিকে ফিরল। ঠাকুর সাহেবকে দেখে দিওয়ান জি শুকনো
পাতার মতো কেঁপে উঠলেন। গলায় আটকে
থাকা থুথু গিলে বললো- "মালিক..... সুগনা মাতাল হয়ে আছে।
“দিওয়ান জি।” দিওয়ান জিকে বাধা দিয়ে ঠাকুর সাহেব
বললেন। “সত্য
কথা বলুন দেওয়ান জী। ভগবান জানেন
আমি আপনাকে কখনই আমাদের দাস মনে করিনি। আমি
আপনাকে সর্বদা আমার বন্ধু মনে করেছি। আমি
আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনি যদি আমার কাছে সত্য বলেন তবে আমি
আপনাকে এই অপরাধের জন্য ক্ষমা করে দেব। কিন্তু
আজ... মিথ্যা বলবেন
না।“
ঠাকুর সাহেবের যন্ত্রণা দেখে দিওয়ান জি স্তব্ধ হয়ে
গেলেন। তার উদ্ধারের সব পথ বন্ধ দেখে সে
সত্য কথা বলাই ভালো মনে করলেন। হাঁটতে
হাঁটতে ঠাকুর সাহেবের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে বললেন- "মালিক ভুল
করেছি, আমাকে ক্ষমা করে দিন। তখন আমি আমার মেয়ের প্রেমে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক-বেঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। একটা কথা ভেবে। সোনালী ভবিষ্যৎ, আই এই অপরাধ
করেছি। যেদিন মালকিন সিঁড়ি থেকে
পড়েছিল এবং তাকে
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার
দুদিন আগে আমার স্ত্রীও একই হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আমি আপনাকে এটা বলেছিলাম। যখন মালকিন আপনি কাঞ্চনের জন্মের সময় হাসপাতালে ছিলেন
না এর কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রীও
নিক্কির জন্ম দেন। ঠিক সেই
মুহূর্তে এই পাপ চিন্তা আমার মাথায় আসে। এবং
আমি এই অপরাধ করেছিলাম। আমি নিক্কির
জায়গায় কাঞ্চনকে বদলে দিয়েছিলাম এবং
কাঞ্চনকে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম।”
“দিওয়ান জি, আপনি
আমার সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, আমি স্বপ্নেও
এমনটি ভাবিনি” ঠাকুর দেওয়ান জির দিকে ঘৃনাভাবে দৃষ্টি দিয়ে বললেন। “কিন্তু
বুঝলাম না মেয়ে দুটো বদলানোর পর নিক্কি আমাদের সাথে আর কাঞ্চন আপনার সাথে থাকল, তাহলে
সে সুগনার কাছে গেলো কিভাবে?"
ঠাকুর সাহেবের এই প্রশ্নে দেওয়ান স্যারের মাথা লজ্জায়
নত হয়ে গেল। মুখ দিয়ে
কোনো কথা বের হলো না।
“দেওয়ান জি, নীরবতা ভেঙে
আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।“ ঠাকুর সাহেব অধৈর্য হয়ে কথা বললেন।
“আমি এর উত্তর দেব ঠাকুর সাহেব।” দেওয়ান জিকে চুপ থাকতে দেখে সুগনা ঠাকুর
সাহেবকে বললেন - "তিনি কাঞ্চনকে তার কাছে রাখতে চাননি। তিনি চাননি কাঞ্চন বেঁচে থাকুক এবং পরবর্তীতে নিক্বীর
অধিকার কেড়ে নিক। তাই তিনি
ইচ্ছাকৃতভাবে তার স্ত্রীকে চুপ করিয়ে দিলেন। তারপর
তিনি তার একজনকে পাঠালেন আমাকে ডাকতে আমার বাড়িতে।
আমি তখন দিওয়ান জির সবচেয়ে বিশেষ ব্যক্তি ছিলাম। তার নির্দেশে যে কোনো কাজ করতাম। কারো হাত-পা ভাঙ্গা আমার কাছে
জিলিপি-ডান্ডা খেলার মতো ছিল। তার
নির্দেশে আমি কিছু বড় অপরাধও করেছি। অনেককে
ঘুমও পড়িয়েছি।
রাতে দিওয়ানজির পাঠানো লোকটি আমার বাড়িতে এল। আমি তখন অনেক কষ্টে ছিলাম। আমার স্ত্রী গর্ভবতী ছিল এবং সে সন্তান প্রশব বেদনায়
কাতড়াচ্ছিল। আমি আমার বাসার অন্য ঘরে অস্থির হয়ে বসে আছি, কোন
সুখবরের অপেক্ষায়। তখন আমার
বাড়িতে আমার বোন শান্তা ও পাশের গ্রামের মাহারি (বাচ্চা প্রশব করান যিনি) । কিছুক্ষণ পর মাহারি আমাকে এমন একটি
সংবাদ শোনাল যা শুনে আমি পাথর হয়ে গেলাম। তিনি
বলেন, আমার স্ত্রী মারা গেছে এবং পেটে বাচ্চাও নষ্ট হয়ে
গেছে। এই খবরে আমি গভীরভাবে মর্মাহত।
দরজায় কড়া নাড়লে আমি এই শোকে ডুবে ছিলাম। দরজা খুললে দিওয়ানজির পাঠানো লোকটিকে
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তিনি
আমাকে বলে এই মুহুর্তে দেওয়ানজি আমাকে তাঁর বাড়িতে ডেকেছেন। এই সময়ে আমার মন কোথাও যেতে চাচ্ছিল না, কিন্তু
দিওয়ানজি যদি রাতে ডাকে তাহলে নিশ্চয়ই বিশেষ কোন কাজ হবে। এই ভেবে আমি তার পিছু নিলাম।
দিওয়ান জির বাড়িতে পৌঁছালে দেওয়ান জি আমাকে অনেক
টাকা দিয়ে প্রলোভন দেন। তারপর কাঞ্চনকে
আমার হাতে রেখে বললো- "এই মেয়েটিকে কোথাও ফেলে দাও। কিন্তু এমন জায়গায় ফেলে দাও যাতে সে বাঁচতে না পারে
এবং কেউ দেখতেও না পারে। শুনে আমি
স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
আমি আমার জীবনে অনেক বড় অপরাধ করেছিলাম কিন্তু ছোট্ট
একটি নিষ্পাপ শিশু হত্যার কথা শুনে আমি হতবাক। আমি দিওয়ান জিকে জিজ্ঞেস করলাম- "দিওয়ান জি, এটা
কার সন্তান?"
আমার কথা শুনে দিওয়ান জি রেগে গেলেন এবং বললেন -
"এটা কার বাচ্চা তোমার জেনে কাজ নেই? এই কাজের
জন্য আমি তোমাকে লক্ষাধিক টাকা দেব। শুধু
আজ থেকে এই প্রশ্ন করবে না। আর
কখনোই এই বিষয়ে কথা বলবে না। কারো
সাথে কথা বলবে না। "
গভীর ভাবনায় চলে গেলাম। তখন
স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতে আমি শোকে ছিলাম। মেয়েটার
জন্য আমার খুব খারাপ লাগলো। আমি
ভাবছিলাম- ' এটা কার সন্তান? এর
বাবা-মা কারা? তারা কি জানে তার মেয়েটি এখন কোথায়? তারা
কি জানে এই সময়ে তাদের মেয়ের মৃত্যু নিয়ে কারবার করা হচ্ছে?
সেই সন্তানের বাবা-মা সম্পর্কে জানার আকাঙ্ক্ষা আমার
মনে তীব্রতর হল। হঠাৎ আমার
মাথায় একটা চিন্তা এলো। আমি দেওয়ান
জিকে বললাম - "দিওয়ান জি, আপনি যদি
আমাকে তার পিতামাতার নাম বলেন, তাহলে আমি এই
কাজটি বিনা পয়সায় করব।”
আমার প্রস্তাব শুনে দিওয়ান জি বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বলল। “তুমি এর
বাবা-মায়ের কথা জানতে চাও কেন?"
“ঠিক এমনিই...কৌতুহল। আপনি আমাকে বিশ্বাস করুন। আমি এই গোপন কথা কারো কাছে প্রকাশ করব
না।” আমি দিওয়ান জিকে আমার ফাঁদে ফেললাম।
আমি তখন তার প্রতি খুব অনুগত ছিলাম। দেওয়ানজি আমাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস
করতেন। সন্দেহের সুইও তাকে স্পর্শ
করেনি। কিন্তু তারপরও সে রহস্য উদঘাটন
করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। “বুঝলাম
না।
“আমি যেকোন সময় এই লাখ টাকা
উপার্জন করতে পারি, দেওয়ান জি। কিন্তু এই সময়ে আমার মধ্যে যে প্রশ্নটি জেগেছে তার
উত্তর যদি না পাই, তাহলে আমি সারা জীবন কষ্টে থাকব। শুধু আমাকে বলুন। এই মেয়ের বাবা-মা কে। আর আমি জিজ্ঞেস করব না কেন আপনি
এমন করছেন। কিসের জন্য
করছেন। আমি সব ধরনের প্রতিশ্রুতি
দিচ্ছি। তারপর আপনি যা বলবেন তাই করব।”
“সুগনা তোমার উপর আমার পূর্ণ
বিশ্বাস আছে, কিন্তু এই গোপন কথাটা খুব স্পেশাল। আমি দুঃখিত, আমি
আমার ছায়াকেও এই গোপন কথাটা বলতে পারব না।”
দিওয়ানজীর অস্বীকৃতির কারণে আমি কোন বড় ষড়যন্ত্রের
গন্ধ পাচ্ছিলাম। এখন পর্যন্ত
আমি তার প্রতিটি গোপন সম্পর্কে অবগত ছিলাম। বুঝলাম
সে কোন বড় অপরাধের জন্ম দিতে যাচ্ছে। এমন
কাজ করতে যাচ্ছেন যার ব্যাপারে আমার কাছ থেকেও গোপন রাখা হচ্ছে।
কিন্তু এখন আমার মধ্যে সত্য জানার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে
উঠেছে। আমি দেওয়ানজিকে হুমকির স্বরে
বললাম- "দিওয়ান জি, আপনি যদি আমাকে সত্য না বলেন, আমি
এই মেয়েটিকে পুলিশের কাছে নিয়ে যাব এবং তাদের পুরো সত্য বলব। আপনি যখন আমাকে বিশ্বাস করবেন না, তখন
না করার ফল। আমার উপর
ভরসা না করার।”
আমার কথার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছিল, পুলিশের
নামে সে কাঁপতে থাকে। সে জানত আমি
কতটা জেদি এবং রাগী মানুষ ছিলাম। মনে
মনে যা স্থির করি, তাই করতাম।
দিওয়ান জি, পরাজয়
স্বীকার করে, আমাকে সব বলে গেল। পুরো সত্যটা জানার পর তার প্রতি আমার
খুব বিরক্তি আর ঘৃনা লাগছিল। একজন
মানুষ যে এত নিচে নেমে যেতে পারে তা ভাবতেও পারিনি। যে ব্যক্তি তার প্রভুর অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় সে মানুষ
বলার যোগ্য নয়। আমার দু:খিত
বোধ বাকি ছিল।
দিওয়ান জি আমাকে চুপ থাকার জন্য অনেক প্রলোভন
দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি
তাকে পরিষ্কার করে দিয়েছি। আমি
বলেছিলাম - "আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে আমি সত্য গোপন করার জন্য
আপনার কাছ থেকে একটি পয়সাও নেব না। তাই
এখন আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমার প্রতিশ্রুতি অমান্য করতে পারব না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এই
গোপনীয়তা সীমাবদ্ধ থাকবে শুধু
কাছে।
সেই সময় আমি দিওয়ান জিকে যা বলেছিলাম তা সত্য। কিন্তু আমি যখন কাঞ্চনকে নিয়ে
দিওয়ান জির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে তাকে ফেলে দেওয়ার জন্য উপত্যকার দিকে চলে যাই। তারপরে আমার সাথে এমন কিছু ঘটেছিল যা
আমার পুরো জীবনকে বদলে দেয়।
৩৯
শীতের রাত ছিল। কাঞ্চন
অঘোরে ঘুমাচ্ছিল, একটা সাদা কাপড় জড়িয়ে। হঠাৎ প্রবল ঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঞ্চন
কুনমুনাই করে উঠে- বোধহয় তার ঠাণ্ডা লাগছে। ওকে
বুকে জড়িয়ে ধরলাম। তখনই আমার
ভিতরে কিছু একটা বিদ্যুত চমকালো, আমার বুকে
লাগানোর সাথে সাথে আমি কিছুটা অদ্ভুত অনুভব করলাম। এমন কিছু যা আমি সেদিনের আগে কখনও অনুভব করিনি। যেন কেউ আমার ভিতর থেকে আওয়াজ
দিয়েছে। কেউ যেন
আমাকে জিজ্ঞেস করছে- ' এই ছোট্ট নিষ্পাপ মেয়েটার কি করেছে
যে ওকে মেরে ফেলতে যাচ্ছিস? তুই কি এতটাই
অসহায় হয়ে গেছিস যে পেটের দায়ে এত ছোট নিষ্পাপ শিশুকে মেরে ফেলতে হবে? যে
জানে না বেঁচে থাকা মানে কি বা মরে যাওয়া। যে
এখন মুখ দিয়ে কথাও বলতে পারে না। যে
তার সাহায্যের জন্য কাউকে আওয়াজও দিতে পারে না। এমন অসহায় মেয়েকে মেরে কি শান্তিতে থাকতে পারবি?'
এটি আমার আত্মার কণ্ঠস্বর ছিল - এটি আমাকে অভিশাপ
দিচ্ছিল। আমার মন
খারাপ হয়ে গেল। আমি অনুভব
করলাম আমার ভিতরে কিছু একটা গলে যাচ্ছে। হয়তো
এটা ছিল আমার পাথরের হৃদয় যা মোমে পরিণত হচ্ছিল। সেই মুহুর্তে আমি অনুভব করলাম যেন কোন শক্তি আমার ভিতরে
ঢুকে আমাকে খারাপভাবে চেপে ধরছে। আর
আমি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি। আমি
কাঁদছি সেই যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি কিন্তু বের
হতে পারছি না।
সেই কষ্ট আর সহ্য করতে পারলাম না। আমার পায়ের শক্তি ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে এবং মাঝপথে
আমি দম নিয়ে মাটিতে বসে ভাবতে লাগলাম। আমি
কি সত্যিই এতটাই প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষ যে দু'বেলা
রুটির জন্য একটা মেয়েকে মেরে ফেলতে চাই। আমার
এই দেহের কি এতটুকুও মূল্য নেই যে আমি কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জন্য দুবেলা রুটি রোজগার
করতে পারি না? আমার জন্য লজ্জা ... এবং আমার এই
শরীরের জন্য। পৃথিবীতে কি আমার চেয়ে নিকৃষ্ট কেউ থাকবে? আমার
চেয়ে ভালো সেই ভিখারিরা যারা অন্যের সামনে হাত পাতে।
এই চিন্তা আসার সাথে সাথে আমি আমার অতীতের সমস্ত পাপ
মনে করতে শুরু করি। নিজেকে ঘৃণা
করতে লাগলাম। আমি ঠিক সেই
মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম যে এখন থেকে আর কোন পাপ করব না। আমি কাঞ্চনের কপালে চুমু দিয়ে আবার বুকে রাখলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে দেওয়ান জিকে
দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে, এই মেয়েটি
এখন তার জন্য এবং তার পিতামাতার জন্য মারা গেছে। এখন থেকে সে আমার মেয়ে হয়েই থাকবে। এখন থেকে আমি তার বাবা। আমি এর জন্য কঠোর পরিশ্রম করব। অন্যের বাড়িতে-ক্ষেতে-খামারে কাজ করব, কিন্তু
কোনো ঝামেলায় জড়াব না।
এই ভেবে আমি যখন আবার ওকে আমার বুকের সাথে মিশিয়ে দিলাম
তখন আমার ভেতরের সব কষ্ট শেষ হয়ে গেল। আমার
প্রাণহীন শরীরে প্রাণ ফিরে এলো। আমি
খুশিতে উঠে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।
বাড়িতে পৌঁছে শান্তা আমার মুখে খুশি আর হাতে সন্তান
দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি তাকে এবং
মেহরিকে পুরো ঘটনাটি বললাম যে পাশের গ্রাম থেকে আমার স্ত্রীকে দেখতে এসেছিল। সেই সঙ্গে এ কথা কাউকে না বলার শপথও
নেন তিনি।
তারা দুজনেই রাজি হল। আমি সকালে প্রচার করেছি যে আমার স্ত্রী আমার মেয়ের
জন্ম দেওয়ার পরে মারা গেছে। তেমনি
কাঞ্চনও আমার ঘরে বড় হতে থাকে।
“ঠাকুর সাহেব, যেদিন
থেকে কাঞ্চন আমার কোলে এলো সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি কোন খারাপ কাজ করিনি। আমি পরিশ্রম করেছি, অন্যের
ক্ষেতে ষাঁড়ের মত কাজ করেছি, কিন্তু
কাঞ্চনের মুখে এক টুকরোও হারাম খায়নি। সে
যা খেয়েছে সব আমার সমস্ত পরিশ্রম এবং রক্ত-ঘামের অর্জিত অর্থ দিয়ে।
আমি নিজে ক্ষুধার্ত ছিলাম কিন্তু তাকে পেট ভরে খাওয়াতাম। আমি তাকে সবসময় আমার চোখের পাতায়
বসিয়ে রাখতাম। ভুল করেও
কোনদিন কোন কষ্ট দেননি। বলতে গেলে, আমি
তার কেউ নই, কিন্তু আমি তার সাথে এমনভাবে সংযুক্ত
হয়েছি যে আমি তার জন্য একশবার মরতে পারি এবং একশবার বাঁচতে পারি।
“সেটা বলো না, সুগনা। ওটা বলো না।” ঠাকুর সাহেব যন্ত্রণার সুরে বললেন - "কাঞ্চনের
সাথে তোমার খুব গভীর সম্পর্ক। তাহলে
বলো না তুমি তার কিছু হও না।
“আমাকে বিব্রত করবেন না ঠাকুর
সাহেব, আপনি একজন ভগবানের মতো মানুষ। আপনার মেয়েকে এতদিন আপনার থেকে দূরে রাখাতে আমাকে
ক্ষমা করবেন।” হাত জোড় করে
বলল সুগনা।
“সুগনা, যে
লালন-পালন করে সে জন্ম দেয় তার থেকে বড়। কাঞ্চনের
ওপর আমাদের থেকে তোমার অধিকার বেশি। আমি
শুধু তোমাকে একটা অনুরোধ করতে চাই, তুমি কিছু
মনে না করলে কাঞ্চনকে প্রাসাদে থাকতে দাও। আমরা
বলছি না যে তোমার বাড়িতে তার কোনো সমস্যা আছে। তাকে কিছু দিতে পার না। বলছি একদিন
তার বাবা হওয়ার গৌরব... আমিও যেন অর্জন করি।” এই কথা বলে ঠাকুর সাহেব হাত জোড় করে সুগনার দিকে আশার
দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন।
“ঠাকুর সাহেব, আমাকে
আর বিব্রত করবেন না। এখন আসুন এবং
আপনার মেয়েকে আপনার বাড়িতে নিয়ে আসুন।” সুগনা খুশিতে
কান্না ছড়িয়ে বলল।
“ধন্য সুগনা তুমি, আমার
কান তোমার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনতে আকুল হয়ে ছিল, চলো
চল যাই” এই বলে ঠাকুর সাহেব এগিয়ে গেলেন, দিওয়ান
জিকে দেখেই তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দিওয়ান
জির দিকে ক্রোধ মিশৃত দৃষ্টি রেখে তিনি বললেন - "দিওয়ান জি, আপনি
যে স্বার্থপরতা থেকে আমার মেয়েকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন তার জন্য আমি
আপনাকে ক্ষমা করেছি। কিন্তু এই
অপরাধের জন্য আমি আপনাকে কখনই ক্ষমা করব না যে আপনি আমার দুধে দরিদ্র শিশুকন্যাকে মেরে ফেলতে
চেয়েছিলেন সেটা আমি এটি কখনই ভুলব না, দেওয়ান জি। আপনি বেড়িয়ে যান আমার সামনে থেকে।
দিওয়ান জির চোখ মাটিতে শক্ত হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল
এবং তারপর কাঁপা কাঁপা পায়ে প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেল।
ঠাকুর সাহেব আর সুগনার কদমও বাইরে যেতে থাকে। তারপর দুজনে জীপে বসে বসতির দিকে
এগিয়ে গেল।
কমলাজী তখনও পাথরের মুর্তির মত প্রধান ফটকের দিকে
তাকিয়ে ছিলেন। সুগনার কথায়
সে তখনও হতবাক। হঠাৎ সে ঘুরে
তার রুমের দিকে চলে গেল। সিঁড়ির দিকে
পা বাড়াতেই সে দেখতে পেল নিক্কি দাঁড়িয়ে আছে। বিস্ময়ে মগ্ন রবিও ওপাশে দাঁড়িয়ে।
কমলা জি সিঁড়ি বেয়ে নিক্কি এবং রবির কাছে আসেন। তিনি নিক্কির দিকে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে
তাকান। কমলা জিকে দেখে নিক্কির চোখ
লজ্জায় নত হয়ে গেল।
“রবি, তোমার
রুমে আয়। তোর সাথে
আমার কিছু কথা আছে।” কমলা জি রবিকে
বলে এগিয়ে গেলেন। রবির পদক্ষেপ
আপনাআপনিই মাকে অনুসরণ করে। কিন্তু
দরজার ভিতরে আসার সাথে সাথেই তার চোখ না ইচ্ছে করেও নিক্কির দিকে চলে গেল। নিক্কির দিকে চোখ পড়তেই সে কেঁপে উঠল। নিক্কি তার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু
চোখে যে ব্যথা ছিল তা সরাসরি রবির হৃদয়ে চলে আসছিল। নিক্কিকে এতটা দুঃখী সে কখনো দেখেনি। রবির হৃদয় গলে গেল। সে বেশিক্ষণ নিক্কির বেদনাদায়ক চোখের
মুখোমুখি হতে পারেনি। সে দ্রুত
রুমে প্রবেশ করল।
ভিতরে যেতেই নিক্কি ভারী পায়ে সিঁড়ি বেয়ে প্রাসাদ
থেকে বেরিয়ে এল।
এই সময় দেওয়ান জি তার স্ত্রী রুকমণির সাথে বিবাদে
জড়িয়ে পড়েন। রাগে রুকমণি
জি সরাসরি দেওয়ান জিকে উল্টো পাল্টা কথা বলছিলেন।
তারপর নিক্কিকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুজনেই
ছুটে এল ওর দিকে।
দিওয়ান জি তাকে দেখে বেদনায় ভরে গেল। কিন্তু রুকমণিজী আনন্দে কাঁদছিলেন। আজ বহু বছর পর রুকমণি জি নিক্কিকে
বুকে জড়িয়ে ধরে আছে। কিন্তু
নিক্কি যে ছোটবেলা থেকেই মায়ের ভালোবাসার জন্য আকুল ছিল, আজ
তার মায়ের ভালোবাসা পছন্দ হচ্ছিল না। এমনকি
মমতার মলমও তার বাবার কারণে তার বুকে যে ক্ষত হয়েছিল তা সারাতে পারেনি। তার যন্ত্রণা বাড়তে থাকে।
নিক্কি আহত চোখে দেওয়ান জির দিকে তাকাতে লাগল। "কেন করলে বাবা?"
“শুধু তোমার আনন্দের জন্য
নিক্কি।” দিওয়ানজী করুণ কণ্ঠে বললেন-
"সত্যি জানার পর তোমার হৃদয়ে অনেক কষ্ট হয়েছে জানি, কিন্তু
সেই নিমক-হারাম সুগনার কারণেই এসব হয়েছে। আমি
তাকে বাচতে দিব না...।”
“তোমার দোষ অন্য কারো কাধে দিও
না।” দেওয়ান জি কথা থামিয়ে নিক্কি বললেন। “সুগনা কাকা
অন্যের মেয়েকে জীবন দিয়েছেন, কিন্তু তুমি নিজের
মেয়েকে জীবন্ত মেরে ফেলেছ।”
“এটা বলো না নিক্কি।” দেওয়ান জী ক্ষোভের সাথে বললেন -
"সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন কিছুই
ভুল হয়নি। হ্যাঁ তোমার
কাছ থেকে প্রাসাদ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কেউ
রবিকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। কমলাজি নিজেই ঠাকুর সাহেবের সামনে শপথ নিয়েছেন। তোমার সাথে রবিকে বিয়ে দিবেন।”
“কিন্তু এখন আমি রবিকে বিয়ে
করতে পারবো না বাবা।” নিক্কি একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো- "আমি তাকে বিয়ে করে সারাজীবন তার বিদ্রুপের পাত্র হতে
পারবো না।”
“কি বলছ নিক্কি?” দিওয়ানজি
অবাক হয়ে বললেন - "চিন্তা করবে না, আমি বলেছি সব
ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বিশ্রাম
নাও, আমি এখন একটা কাজে বাইরে যাচ্ছি, ফিরে
আসার পর এ বিষয়ে কথা বলব।” দিওয়ান জি
বলে দরজা ছেড়ে চলে গেল।
দেওয়ান জি চলে যাওয়ার পর রুকমণি নিক্কিকে বসিয়ে আদর
করে। মায়ের মমতায় তার দুঃখ একটু
কমলেও সে স্বস্তি পায়নি।
“আমি ঘুমাতে চাই, মা।” রুকমণিকে বলে নিক্কি।
রুকমণি তার জন্য ঘর প্রস্তুত করে ওকে খাটে রাখল। নিক্কি বিছানায় পড়ে চোখ বন্ধ করল। ঘুম ছিল শুধু একটা অজুহাত... সে
সত্যিই একাকীত্ব চেয়েছিল। যাতে
সে তার অতীত ও বর্তমানের হিসাব-নিকাশ করতে পারে।
নিক্কি এই মুহুর্তে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছিল। কেন হবে না? শৈশব
থেকেই ঠাকুরের কন্যা বলে গর্বের সাথে জীবনযাপন করেছিল, কিন্তু
আজ এই সত্য প্রকাশে সে গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছে। যদিও সে জানত যে তার বাবা যাই করুক না কেন, সে
তার ভালোর কথা চিন্তা করেই করেছে। কিন্তু
বিশ্ব বুঝবে না। এখন সে সমাজ মুখ
কিভাবে দেখাবে? এখন লোকে কি বলবে, এখন
সবাই জানে সে ঠাকুরের নয়, তার ভৃত্য
দেওয়ানের মেয়ে। সে এখন
কিভাবে মাথা তুলে রাখতে পারবে? দেওয়ান জির
কর্ম কেবল তার স্বপ্নই নয়, তার সমগ্র
অস্তিত্বকে ভেঙে দিয়েছে। সে এই
বাড়িতে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি অনুভব করে। সে বুঝতে পারছিল না কি করবে যাতে
সে এই দমবন্ধ থেকে মুক্তি পায়। কোন
জায়গায় যেতে হবে যেখানে তার মন একটু শান্তি পাবে?
হঠাৎ! কাল্লুর ছবি ফুটে উঠল তার মানসিকতায়। এক ঝটকায় বিছানায় উঠে পড়ল। তারপর খানিকটা ভাবতে ভাবতে উঠে
দাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
হলের মধ্যে এসে চোখ বুলাল রুকমণির খোঁজে। সে রান্নাঘর থেকে কিছু আওয়াজ শুনতে
পেল। রুকমণি সম্ভবত রান্নাঘরে ছিল। নিক্কি কয়েক মুহূর্ত ভাবতে থাকে
তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে আসে। কাল্লুর বাড়ির দিকে পা বাড়াল।
৪০
শান্তা তখনও কাঞ্চনের মাথার কাছে বসে মাথায় হাত
বোলাচ্ছে। কাঞ্চনের
কান্না থেমেছে কিন্তু দুঃখ তখনও তার হৃদয়ে রয়ে গেছে। চিন্টু কোলে শুয়ে ছিল। দীনেশ জি বারান্দায় বসে বিড়ি খাচ্ছিলেন।
তখন বাড়ির বাইরে জীপ থামার শব্দে সবার ধ্যান ভেঙে যায়। শান্তার সাথে কাঞ্চন আর চিন্টুও উঠে
রুম থেকে বেরিয়ে এলো। এই লোকেরা
বারান্দায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই সুগনাকে নিয়ে ঠাকুর সাহেবকে উঠানে প্রবেশ করতে
দেখা যায়।
এই প্রথম ঠাকুর সাহেব রাজবাড়ি ছেড়ে বস্তিতে কারও
বাড়িতে এসেছিলেন। কাঞ্চনের
বিস্ময়ের সীমা রইল না। কাঞ্চনের দিকে তাকালেই ঠাকুর সাহেবের
মন স্নেহে ভরে উঠল। তার পা
কাঞ্চনের কাছে আসতে থাকে। শান্তা কিছু
বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু দীনেশজি এবং কাঞ্চনের জন্য ঠাকুর
সাহেবের আগমন তখনও একটি ধাঁধা।
শান্তা আর দীনেশজীর হাত একসাথে ঠাকুর সাহেবকে অভ্যর্থনা
জানাতে উঠে দাঁড়ালো।
ঠাকুর সাহেব নমস্কার উত্তর দিয়ে কাঞ্চনের কাছে গিয়ে
দাঁড়ালেন। তারপর সজল
তার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকাতে থাকে। নমস্কার ভঙ্গিতে কাঞ্চনের হাতও যোগ
হয়।
“বেটি, তার
পা ছুঁয়ে প্রনাম কর, সে তোমার বাবা।” হতবাক ও বিচলিত কাঞ্চনকে বলল সুগনা।
“কে...কি......বা...... বাবা?” হঠাৎ
কাঞ্চনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
সুগনার কথা শুনে দীনেশ জিও গভীরভাবে মর্মাহত হলেন।
“হ্যাঁ বেটি। তোমাকে আমি কুড়িয়ে এনেছি, আসলে
তুমি তাদের সন্তান। ঠাকুর সাহেব
তোমার প্রকৃত পিতা।” কাঞ্চনের
মাথায় হাত রেখে বলল সুগনা।
কাঞ্চন অবাক চোখে ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকাতে লাগল।
ঠাকুর সাহেবের চোখ ভিজে গেল। মেয়েকে আলিঙ্গন করার জন্য তার মুখে গভীর আকুতি ছিল। তিনি তার বাহু খুলে কাঞ্চনকে এগিয়ে গিয়ে কোলে ভরে নিলেন। তার বাহুতে বিভ্রান্ত, কাঞ্চন
সেই মুহূর্তটির কথা মনে করে যখন সে ছোট ছিল এবং প্রাসাদে নিক্কির সাথে খেলত। ঠাকুর সাহেবকে দেখে নিক্কি লাফিয়ে
উঠে কোলে বসল। কাঞ্চনও
ঠাকুর সাহেবের কোলে যেতে চাইল, কিন্তু
লজ্জায় তা করতে পারল না। হ্যাঁ, ঠাকুর
সাহেব কখনো আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আবার কখনো কপালে চুমু দিতেন। কিন্তু সে কখনো কাঞ্চনকে নিক্কির মতো
বুকে চেপে ধরেনি। সে কখনো তাকে
কোলে করেনি। তার কোলে
ওঠার বাসনা কাঞ্চনের অন্তরে ছিল সবসময়। তারপর
যত বড় হতে থাকে এই দূরত্ব ততই বাড়তে থাকে। যদিও
ঠাকুর সাহেব কাঞ্চনের এই শিশুসুলভ অনুভূতির কথা জানতেন না, যদি
তিনি জানতেন, তবে নিঃসন্দেহে কাঞ্চনকে কোলে নিতে
দ্বিধা করতেন না। সে কাঞ্চনকে
নিক্কির মতোই ভালোবাসতো।
কিন্তু আজ ঠাকুর সাহেবের বুকে জড়িয়ে ধরে এক অপার
আনন্দ অনুভব করছিল কাঞ্চন। ঠাকুর
সাহেবেরও এই অবস্থা। বাবা মেয়ের
এই মিলনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শান্তা, সুগনা ও
দীনেশ জি।
কিছুক্ষণ পর ঠাকুর সাহেব কাঞ্চনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে শান্তাকে বললেন- "শান্তা, তুমি আমার
মেয়েকে মায়ের মতো ভালোবাসা দিয়েছ। সে
ভালোবাসা প্রাসাদেও কেউ পায় না, এই বাড়ি
থেকে সে সুখ পেয়েছে তোমার কাছ থেকে। আমি তোমার কাছে ঋণী, এখন
আমাকে কাঞ্চনকে প্রাসাদে নিয়ে যেতে দাও।” এই বলে ঠাকুর
সাহেব শান্তার সামনে হাত জোড় করলেন।
উত্তরে শান্তাও হাত জোড় করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তারপর কাঞ্চনকে বললো- "যাও মেয়ে, এখন
তোমার আসল বাড়িতে যাও, কিন্তু কয়েকদিন এখানে আসতে থাকো। তোমার সাথে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে গেছে।”
এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবে কাঞ্চনের মন খারাপ
হয়ে গেল। তার মনে এলো
যে তার এখন প্রত্যাখ্যান করা উচিত। কিন্তু
করতে পারেনি।
“দিদি কোথায় যাচ্ছেন মা?” এতক্ষণ
চুপ করে থাকা চিন্টু কিছু বুঝতে না পেরে চুপচাপ বসে রইল।
ওর কথা শুনে কাঞ্চন ওর কাছে এসে বুকে রাখল। তখন ঠাকুর সাহেবকে বললেন - "বাবা, আমি
কি চিন্টুকেও সঙ্গে নিতে পারি? সে আমাকে
ছাড়া বাঁচতে পারবে না।”
“বেটি, এখন
থেকে ওই বাড়িটা তোমার, তুমি অবশ্যই তোমার ভাইকে তোমার কাছে
রাখবে, আমি চেয়েছিলাম এই বাড়ির সবাই তোমার সাথে আমাদের
পাশে থাকুক। কিন্তু এই
কথা বলে সুগনার আত্মসম্মানে আঘাত করতে চাই না।"
“এই বাড়িতে আমরা সুখী, ঠাকুর
সাহেব। আপনি আমাদের জন্য অনেক ভেবেছেন, এটাই
যথেষ্ট।” সুগনা হেসে বলল।
ঠাকুর সাহেব সুগনার দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকিয়ে
কাঞ্চনকে নিয়ে বাইরে যেতে লাগলেন। কাঞ্চনের
সঙ্গে চিন্টুও ছিল।
সুগনা শান্তা এবং দীনেশ জিও বাইরে ফিরে এলেন।
কাঞ্চন একবার সবাইকে জড়িয়ে ধরে জিপে বসল। জীপ এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তার মনে
হল সে কোন অজানা জগতে চলে যাচ্ছে। তার
চোখ স্থির ছিল সুগনার দিকে। সত্যটা
জানার পর নিক্কির মন যেভাবে কেঁদেছিল কাঞ্চনের মনটাও ঠিক সেভাবে কেঁদেছিল।
দুজনের কষ্টই ছিল একই। ওরা দুজনে যাদের বাবা জানত তারা তাদের বাবা ছিল না। কিন্তু তারপরও তাদের দুঃখে বিশেষ
পার্থক্য ছিল। নিক্কির দুঃখ
ছিল যে দিওয়ান জির মেয়ে হওয়ার কারণে সে এখন সারাজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচতে
পারবে না। এখন তাকে অন্য
রকম চোখের মুখোমুখি হতে হবে যাতে
সে অভ্যস্ত ছিল না। কিন্তু
কাঞ্চন কার কোলে ছোটবেলা থেকে খেলছে এই ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল। বুকে জড়িয়ে ধরে শান্তিতে ঘুমাতেন। যার কাঁধে বসে সে সুখে ভাসিয়ে দিত। যার হাতের মুঠোয় খেয়ে সে বড়
হয়েছে... সে তার বাবা নয়। কাঞ্চন
এই ভেবে দুঃখ পেয়েছিল যে এতদিন যাঁর কাছ থেকে স্নেহ পেয়েছে তিনি তাঁর বাবা নন।
কাঞ্চন এতটা খুশি ছিল না যে তাকে এখন ঠাকুর সাহেবের
মেয়ে বলা হবে, প্রাসাদে সুখে থাকবে এবং চাকররা
সারাদিন তার সামনে ঘুরে বেড়াবে। আর
এখন সে কোনো বাধা ছাড়াই রবিকে বিয়ে করতে পারবে। সে যতটা দুঃখ পেল সুগনা তার বাবা নয় এটা জেনে।
নিক্কির পায়ের আওয়াজ কাল্লুর বাড়ির বাইরে থেমে গেল। কি তার ঘর, শুধু
একটা ভাঙা কুঁড়েঘর যার দেয়াল মাটি আর ছত্রাকে বিধ্বস্ত... যার ওপর প্লাস্টিকের
টুকরো ব্যান্ডেজের মতো জায়গায় সাঁটানো ছিল।
নিক্কি কিছুক্ষণ কাল্লুর কুঁড়েঘরের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর
এগিয়ে গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছে গেল। দরজা
খোলা ছিল। নিক্কি ভিতরে
তাকাল। সে দেখল কাল্লু একটা মারিয়াল
খাটের উপর শুয়ে আছে। মাঠ থেকে এসে
খাটে শুয়ে ক্লান্তি মিটাচ্ছিল। মনে
হলো সে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। হঠাৎ
সে অনুভব করল দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড়
ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। দেখল
নিক্কি দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। নিক্কিকে
দেখামাত্রই হুট করে উঠে পড়ল।
“নিক্কি, তুমি?” তার
মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে এলো।
“আমি কি ভিতরে আসতে পারি?” নিক্কি
কাল্লুকে জিজ্ঞেস করল।
“কাল্লু কে? কার
সাথে কথা বলছিস?” কাল্লু নিক্কির সাথে কিছু বলার আগেই
তার মায়ের গলা ভেসে এলো। তার মায়ের নাম ঝুমকি। ঝুমকি খাটের উপর শুয়ে ছিল। কাল্লু আর নিক্কির আওয়াজ কানে এলেই সে বলল।
“মা, ঠাকুর
সাহেবের মেয়ে নিক্কি জি এসেছেন।” কাল্লু যখন
মাকে উত্তর দিল ততক্ষণে নিক্কি ঢুকে গেছে।
ঠাকুর সাহেবের মেয়ে তার বাড়িতে এসেছে জেনে ঝুমকি
বিস্ময়ে ভরে গেল। সে ধীরে ধীরে
হাঁটতে হাঁটতে তার কাছে এসে আদর করে তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল। নিক্কি একটা আনন্দদায়ক অনুভূতিতে ভরে
গেল। কিছুক্ষণ আগে ওর ভেতরে যে
দমবন্ধ ছিল তা ঝুমকির মমতায় এক মুহূর্তে কেটে গেল। যে শান্তির খোঁজে সে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, ঝুমকির
স্নেহ থেকে সে একই স্বস্তি পাচ্ছিল।
ঝুমকি তার বুড়ো চোখে নিক্কির দিকে তাকাচ্ছিল। সে ভাবছিল, যে
বাড়িতে তিজ-উৎসবেও মানুষ কখনও দেখা করতে আসত না, সেই
বাড়িতে ঠাকুর সাহেবের মেয়ে আজ এলো কী করে? বৃষ্টিতে
ভিজে কাল্লুর বাড়ি আসার মুহূর্তটা তার মনে পড়ে। সেই রাতে তার হালকা জ্বরও হয়েছিল। অজ্ঞান অবস্থায় সে বারবার কাঞ্চনের নাম নিয়ে বিড়বিড়
করছিল। ঝুমকি, ওর
মুখ থেকে কাঞ্চনের নাম শুনে বুঝতে পারল কাল্লু কাঞ্চনের প্রেমে পড়তে শুরু করেছে। সেই রাতে সে নিজেই কাল্লুর ভাগ্য
নিয়ে কাঁদছিল। কিন্তু সে
রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঠিক
করেছিল যে দু-এক দিনের মধ্যে সে সুগনার সাথে দেখা করবে এবং কাল্লু ও কাঞ্চনের
সম্পর্কের কথা বলবে।
ঠিক তৃতীয় দিন কাল্লুর খামারে যাওয়ার পর দুপুরের আগেই
সে সুগনার বাড়ির দিকে রওনা দিল। সুগনার
সাথে তার খুব একটা পরিচয় ছিল না। শুধু
এক গ্রামে থাকার কারণে যতটা হওয়া উচিত ছিল। বিশেষ
সম্পর্ক ছিল না।
হাঁটতে হাঁটতে তার মনে নানা সংশয় ছিল। সে আশা করেনি যে সুগনা তার ফুলের মতো
মেয়ের হাত তার কাল্লুর হাতে দেবে। কিন্তু
মা তো মা। ছেলের খাতিরে
একবার সুগনার সামনে হাত বিছিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন। মনে একটা আশা ছিল–হয়তো
সুগনা তার জন্য করুণা বোধ করবে এবং এই সম্পর্ককে হ্যাঁ বলবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আশা-নিরাশার ঝুমকি দুলতে দুলতে
সুগনার দরজার চৌকাঠে পৌঁছে গেল। সে
ভিতরে যাওয়ার কথা ভাবছিল যে উঠোনের খোলা দরজা থেকে সে ভিতরের দৃশ্য দেখতে পায়। একজন শহুরে মহিলা বারান্দায় বসেছিলেন
সুগনার পুরো পরিবার নিয়ে। ভেতরে
যাওয়ার সাহস তার ছিল না। তিনি চাননি
যে একজন বিদেশী মহিলার সামনে তাকে লজ্জিত হতে হবে। কারো মনের অবস্থা কে জানে... তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা
মহিলার বাইরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কান দিয়ে ভেতর থেকে আওয়াজ
শোনার চেষ্টা করতে লাগল। সুগনা আর
শান্তার কন্ঠও কানে আসছিল না। কিন্তু
কমলাজীর উচ্চস্বর তার কান পর্যন্ত মৃদুভাবে আসছিল। কাঞ্চন ও রবির কথা শুনে সে বুঝতে পেরেছিল যে এই মহিলা
ডাক্তারবাবুর মা, যিনি ঠাকুরাইনের চিকিৎসা করতে
এসেছিলেন। আর এই সময়ে
তিনি তার ছেলের সম্পর্কের কথা বলছেন।
পুরো ব্যাপারটা জানার পর তার মন কেঁপে ওঠে। ঝুমকি যেই মেজাজে গিয়েছিল ঠিক সেই
মেজাজেই ফিরেছিল। সেদিন সে
কাল্লুর ভাগ্যের জন্য অনেক কেঁদেছিল। কাল্লুর
বিয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু আজ নিক্কিকে তার বাড়িতে দেখে তার মনে আবার একই
কথা ভাবতে শুরু করেছে। যদিও সে মাটি
ও আকাশের পার্থক্য বুঝতে পারছিল। কিন্তু
মনের জোরে সে তাই ভাবতে বাধ্য হল।
“মেয়ে, সত্যি
করে বলো। তুমি আমার
বাড়িতে কেন এসেছো? আজ পর্যন্ত তিজ উৎসবেও এ বাড়িতে
মানুষ আসেনি। তাহলে তুমি
এত বড় বাবার মেয়ে।” ঝুমকি
জিগ্যেস করলেন।
“মা জি, প্রথমেই
বলে রাখি আমি ঠাকুর সাহেবের মেয়ে নই। আমার
বাবা দিওয়ান জি। তিনিই আমাকে
বদলে দিয়েছিলেন যখন আমি জন্মেছিলাম... ঠাকুর সাহেবের মেয়ের সাথে। কিন্তু এখন এই রহস্য প্রকাশ পেয়েছে যে আমার আসল বাবা
দিওয়ান জি।”
কাল্লু আর ঝুমকির মুখ হা।
“তুমি যদি দিওয়ানজির কন্যা হও, তবে
ঠাকুর সাহেবের আসল কন্যা কে?” পরের
প্রশ্নটা করল ঝুমকি।
“কাঞ্চন!” নিক্কির মুখ থেকে
মৃদুস্বরে বেরিয়ে এল।
“কি...?”
চমকে বলল কাল্লু।
“হ্যাঁ কাল্লু, কাঞ্চন
ঠাকুর সাহেবের আসল মেয়ে, যাকে সুগনা চাচা বড় করেছেন।” এই কথা বলার পর নিক্কি কিছুক্ষণ
কাল্লুর দিকে তাকাল। এবং তার
মেজাজ পড়ার চেষ্টা করতে থাকে।
এই সত্যটা জানার পর কাঞ্চন ঠাকুর সাহেবের মেয়ে বলে
কাল্লু যখন খুশি, তখন কাঞ্চনকে পাওয়ার যে সত্যিকারের
আশা তার মনে ছিল তাও ভেঙে গেল। এখন
সে কাঞ্চনের কথা কল্পনাও করতে পারেনি। ব্যথায়
মাথা নিচু হয়ে গেল।
মেয়ে, তোমার সাথে
এমন হয়েছে জেনে খুব খারাপ লাগছে। নিক্কির
দুঃখ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ঝুমকি।
মার কথার কারণে কাল্লুর মনোযোগও নিক্কির দুঃখের দিকে
চলে গেল। সত্যিই... সে
নিক্কির দুঃখও অনুভব করেনি। “নিক্কি, আমি
এর জন্য দুঃখিত। তোমার যা
হয়েছে, ভালো হয়নি।”
“ছাড়ো এইসব।” নিক্কি মাথা নেড়ে বলল - "আমি
এখানে অন্য কাজে এসেছি। তুমি যদি
হ্যাঁ বলো?"
“আমরা কিভাবে তোমার কোন কাজে
আসতে পারি, নিক্কি?” কাল্লু
প্রশ্নবিদ্ধ চোখে নিক্কির দিকে তাকাল।
“মা।” ঝুমকির দিকে ঘুরে বলল নিক্কি। “আমি তোমার ছেলেকে বিয়ে করতে
চাই। তুমি কি অনুমতি দেবে?"
নিক্কির কথা শুনে ঝুমকির পাষাণ বুড়ো চোখ চমকে উঠল। তার মনে হলো সে স্বপ্ন দেখছে। সে কানে শোনে কিন্তু এখনো অনুভব করতে
পারেনি।
“কি বলছো নিক্কি জি। কোথায় আমরা, কোথায়
তুমি? মাটি-আকাশ কখনো দেখা মেলে না।” ঝুমকি কথা বলার আগেই কাল্লু কথা বলল।
“কাল্লু তুমি যেখানে আছো সেখানে
আমিও আছি।” নিক্কি
কাল্লুর দিকে ফিরে বললো - "ভালো করে দেখো... আমিও সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি
যে মাটিতে তুমি দাঁড়িয়ে আছো। আমাদের
মাঝের পৃথিবী আকাশ থেকে এক কদম দূরত্ব নয়। আমি
আমার বাড়ি থেকে এখানে পর্যন্ত হেঁটে চলেছি। আমি
এসেছি, এখন তুমিও একধাপ এগিয়ে যাও।
“পি... কিন্তু ...” কাল্লুর কথায় তার ভেতরে দম বন্ধ হয়ে
আসে। তারপর খানিকটা চিন্তা করে
বললো- "কিন্তু নিক্কি জি, তোমার বাবা
কখনোই এই সম্পর্কের জন্য হ্যাঁ বলবে না। দেওয়ানজি
তোমাকে নিয়ে কেমন করে স্বপ্ন দেখেছিল। আচ্ছা
তুমি আমার বাড়িতে কি পাবে?"
“আমি বড় বাড়ি, গাড়ি, টাকা, চাই
না কাল্লু। আমি এখন এই
জিনিসগুলিকে ঘৃণা করি। আমি শুধু এমন
একজন সঙ্গী চাই যে আমাকে সত্যিই ভালবাসে। আমি
ভালবাসার জন্য ক্ষুধার্ত। কাল্লু...
কেউ প্রত্যাখ্যান করেছে, দয়া করে অস্বীকার করবে না। আমাকে। আমাকে তোমার মত করে নাও। তোমার মত করে আমি বাঁচব।” নিক্কি ভারী গলায় কথা বলল। সে খুব দুঃখিত ছিল।
কাল্লু অশ্রুসজল চোখে নিক্কির দিকে তাকিয়ে ছিল। সারাজীবন সে কারো ভালোবাসার জন্য আকুল
ছিল। সে কাঞ্চনের প্রেমে পড়েছিল
ঠিকই। কিন্তু কাঞ্চন কখনো তাকে এই
ভালোবাসা দিয়ে দেখেনি। কিন্তু আজ
নিক্কির মনে নিজের প্রতি ভালোবাসা দেখে তার খুশির সীমা রইল না। সে কখনো ভাবতে পারেনি যে কোন মেয়ে
তার জন্য কামনা করবে। তার সামনেও
কেউ ভালোবাসা ভিক্ষা করবে। কিন্তু
এটা তাই ছিল। আজ নিক্কি তার সামনে তার ভালবাসা প্রকাশ করছিল। কাল্লু এই সুখ সহ্য করতে পারছিল না। তার চোখ দুটো কেঁপে উঠল, কিছু
বলার জন্য তার ঠোঁট খোলা ছিল, কিন্তু কেবল
কাঁপছিল।
“বেটি ..... এসব কি জিজ্ঞেস করছ? তোমাকে আমার পুত্রবধূ হিসেবে মেনে
নিলাম। ভগবান তোমাকে শুধু আমার ছেলের
জন্যই বানিয়েছেন। তুমি
থাকো.....!” ঝুমকি বলল। এবং
কোণে পড়ে থাকা একটি পুরানো বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল এবং তারপর বাক্সে কিছু খুঁজতে
লাগলো। ফিরে আসার সময় তার হাতে একটি
মঙ্গলসূত্র ছিল।
“এটা নাও এবং কাল্লুর হাতে দাও। এটা আমার মঙ্গলসূত্র। এটা আমার বাবা পরিয়েছিলেন। আমি অনেক বছর ধরে রেখেছিলাম।” নিক্কিকে মঙ্গলসূত্রটা দিতে গিয়ে বলল
ঝুমকি।
নিক্কি ঝুমকির হাত থেকে মঙ্গলসূত্রটা নিয়ে কাল্লুর
সামনে বাড়িয়ে দিল। “আমাকে
তোমার বউ হওয়ার মর্যাদা দাও, কাল্লু। তোমার কৃতজ্ঞতা আমি সারাজীবন ভুলব না।”
“কাল্লু মনে করো .....
সৃষ্টিকর্তা তোমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। এই
সুযোগ ফিরিয়ে দিও না। তোমার গলায়
মগলসূত্র পরো, ছেলে।” কাল্লুকে বলল ঝুমকি।
কাল্লুর হাত সামনে বাড়িয়ে নিক্কির হাত থেকে
মঙ্গলসূত্রটা নিল। তারপর
নিক্কিকে নিয়ে বাড়ির এক কোণে তৈরি ছোট্ট মন্দিরে গেল। সেখান থেকে এক চিমটি সিঁদুর নিয়ে নিক্কির চাওয়া পূরণ
করল। তার পর… সেও
নিক্কির গলায় মঙ্গলসূত্র পরিয়েছিল।
খুশিতে ঝুমকির চোখ ভিজে উঠল। নিক্কি আর কাল্লু মাথা নিচু করে ঝুমকির আশীর্বাদ নিল।
এটি যখন! তখন বাহিরে জীপ থামার আওয়াজ এলো। কাল্লু বাইরে এলে দেওয়ান জিকে জীপ
থেকে নামতে দেখে। নিক্কি আর ঝুমকিও বেরিয়ে এল। দিওয়ান জি আসতে দেখে একটু চিন্তিত হলেন ঝুমকি। কিন্তু নিক্কি শান্ত ছিল।
“নমস্কার দিওয়ান জি। দেওয়ান জি কাছে আসতেই কাল্লু হাত জোড়
করে বলল।
কিন্তু, যেন দিওয়ান
জি তার কথা শোনেননি। সে সোজা
নিক্কির কাছে এসে বললো- "নিক্কি.... তুমি এখানে কি করছো, বেটি। তোমাকে কোথায় না খুঁজছি। তুমি তো তোমার মাকেও বলোনি যে তুমি
বসতিতে আসছো। চল বাসায়
যাই। ... তোমার মায়ের মন খারাপ।”
“এখন এটা আমার বাড়ি, বাবা। আমি কাল্লুকে বিয়ে করেছি। এখন আমার বাড়ি এবং আমার পরিবার সব
বদলে গেছে।” নিক্কি শান্ত
কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলল।
“কি বলছ তুমি?” দিওয়ান
জি পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন। তারপর
তার চোখ পড়ল নিক্কির সিথিতে সাজানো সিঁদুর আর গলায় পড়ে থাকা মঙ্গলসূত্রের দিকে। “কি করেছো
মেয়ে। তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করোনি। আমার উপর রেগে তোমার জীবন নরক
বানিয়েছো। কি অপরাধে
আমাকে শাস্তি দিচ্ছ?"
“তুমি অসংখ্য অপরাধ করেছ বাবা। কিন্তু সত্যি বলতে কি এই সম্পর্ক
নিয়ে আমি খুশি। এখন তুমি
এসেছ, তাহলে তোমার আশির্বাদ দিয়ে যাও।”
“মোটেই না।” দিওয়ান জী নাক ফুলিয়ে বললেন - "তোমার সর্বনাশের
জন্য আমি তোমাকে আশীর্বাদ করি এটা
আমার দ্বারা কিছুতেই হবে না। আমি
এই সব মোটেও বিশ্বাস করি না।”
দেওয়ান জির কথা শুনে নিক্কির পাশাপাশি কাল্লু ও ঝুমকিও
হতবাক হয়ে গেল।
“কাল্লু...!”দিওয়ান
জি আরও বলেন। “আমার
কাছ থেকে যত টাকা চাও নাও, কিন্তু
নিক্কিকে এই সম্পর্ক থেকে মুক্ত করো।”
“কি বলছেন দিওয়ান জি?” কাল্লু
বিরক্ত হয়ে কথা বলল। দিওয়ান জির
কথা তার পছন্দ হয়নি। “আমি
নিক্কিজিকে বিয়ে করতে বাধ্য করিনি। সে
নিজেই আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল।”
“যাই হোক, কিন্তু
আমি এই বিয়েতে বিশ্বাস করি না। তুমি
আমার মেয়েকে ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে এত টাকা দেব যে তোমার সারা
জীবন আরামে কেটে যাবে।”
“চুপ কর বাবা। আমার স্বামীকে আর অপমান করো না। আশীর্বাদ দিতে না পারলে তুমি এখান
থেকে চলে যাও, শান্তিতে থাকতে দাও।”
“কি বলছ নিক্কি?” দেওয়ানজি
অবাক হয়ে নিক্কির দিকে তাকিয়ে বললেন।
উত্তরে মুখ গুটিয়ে নিল নিক্কি।
“ঠিক আছে, আমি
চলে যাচ্ছি। কিন্তু একদিন
তুমি তোমার সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং তারপর তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে।” দিওয়ান জি বলল এবং রাগ করে জিপের
দিকে এগিয়ে গেল।
তারা বসার সাথে সাথেই জীপটি ক্ষিপ্ত হয়ে চলে গেল।
দিওয়ান জি তাঁর বাড়িতে পৌঁছে গেলেন। তাকে দেখে রুকমণিজী বললেন -
"নিক্কি কোথায় জি? তুমি তাকে খুঁজতে গিয়েছিল।”
“সে সেই ভিখারি কাল্লুকে বিয়ে
করেছে।” দিওয়ান জি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন। “বলে...এখন এই
কুঁড়েঘর তার বাড়ি আর এই মানুষ তার পরিবার। এখন
আমাদের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।”
“কি বলছ জি?” স্বামীর
কথায় রুকমণি ভয় পেয়ে গেল।
“ওই বেঈমান সুগনার জন্যই এসব
হয়েছে। আমি তাকে ছেড়ে দেব না। আমার মেয়ের জীবন নষ্ট করে সে তার
মেয়ের জন্য সুখ কিনতে চায়। কিন্তু
আমি তা হতে দেব না।” দিওয়ান জি
দাঁত কিড়মিড় করে কিছু একটা ভাবতে লাগলেন। হঠাৎ
তার ঠোঁটে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটে উঠল। তারপর
ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের হাসি গভীর থেকে গভীর হতে থাকে এবং তার মুখ থেকে হাসি বের হতে
থাকে। সে পাগলের মত জোরে জোরে হাসতে
লাগল।
কাছে দাঁড়িয়ে রুকমণি তাকে এভাবে হাসতে দেখে হতবাক
হয়ে গেলেন, দিওয়ান জির দিকে এভাবে তাকাতে লাগলেন যেন সে পাগল হয়ে গেছে।
“কি হয়েছে তোমার? এভাবে
হাসছো কেন?” ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল রুকমণি।
“রুকমণি, আমি
কাঞ্চনের ভবিষ্যৎ দেখে হাসছি। সুগনা
মনে করেছে সে যুদ্ধে জিতেছে, সে বোকা। সে নিশ্চয়ই ভেবেছিল, এখন
সে রবি আর কাঞ্চনের বিয়েটা সহজে দিতে পারবে। না, মোটেও না। ওরা
কাঞ্চনকে কোনদিন রবির সাথে বিয়ে দিতে পারবে না। তার কারনে আমার মেয়ের জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমি কাঞ্চনকে এমনভাবে কষ্ট দেবো
যার ব্যাথা সুগনার বুকে লাগবে। সে
খুব ভালোবাসে কাঞ্চনকে। আমি সেই কাঞ্চনকে এমন একটা দাগ দেব যা
সারা জীবনে সারবে না।” দিওয়ান জি
দাঁত চিবিয়ে বললেন।
৪১
ঠাকুর সাহেব কাঞ্চন আর চিন্টুকে নিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ
করলেন।
ঠাকুর সাহেবের সাথে কাঞ্চন আর চিন্টুও খুশি। কাঞ্চনের কাছে এটা স্বপ্নের চেয়ে কম
ছিল না। সুগনার কাছ থেকে বিদায়
নেওয়ার সময় যে হৃদয় বেদনায় ভরা ছিল, সে প্রাসাদে
তার পা পড়তেই আনন্দে ভরে ওঠে, এই উপলব্ধিতে
যে সে এখন এই প্রাসাদের মালিক। সে
ছোটবেলা থেকে বহুবার এই প্রাসাদে এসেছে, কিন্তু আজ
তার বুক ফুলে উঠেছে। কারো ভয় নেই, কারো
ভয় নেই। আজ সে
প্রাসাদে নির্ভয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। তার
কাছে দাঁড়িয়ে চিন্টু জীবনে একবারে একটা নতুন জিনিস দেখছিল। এটা তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা, আজ
সে প্রথমবারের মতো প্রাসাদটি দেখার সুযোগ পেয়েছে।
ঠাকুর সাহেব সোফায় বসিয়াছিলেন, কিন্তু
কাঞ্চন তখনও দাঁড়িয়ে ছিল। কাঞ্চনকে
আসতে দেখে প্রাসাদের সব চাকরেরা হলঘরে জড়ো হয়ে গেল।
ঠাকুর সাহেব সোফায় বসে কাঞ্চনকে দেখছিলেন। তখন রাজবাড়ির এক চাকর ট্রেতে এক
গ্লাস দুধ নিয়ে এল। দুধে কত
রকমের ড্রাই ফ্রুটস মেশানো ছিল। কাঞ্চন
আর চিন্টু গাটগাট দুধের গ্লাস খালি করে দিল।
হঠাৎ কাঞ্চনের মনে পড়ল তার মা এই প্রাসাদের কোন ঘরে
তালাবদ্ধ। কাঞ্চনের মনে
মাকে দেখার ইচ্ছা জেগে ওঠে।
তিনি ঠাকুর সাহেবকে বললেন - "বাবা..... আমি কি
মায়ের সাথে দেখা করতে পারি?"
তার কথা শুনে ঠাকুর সাহেবের মন ব্যাথায় ভরে গেল। কাঞ্চনকে কী উত্তর দেবে সে বুঝতে পারল
না। “না...মেয়ে!
এখন তোর মায়ের সাথে দেখা না করলেই ভালো, ওর মানসিক
অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি, আর কয়েকদিন
অপেক্ষা কর, রবিবাবু যখন তোমাকে তোর মায়ের সাথে
দেখা করতে দেবেন তখনই। তোমাকে
চিনতেও পারবে না। নিক্কি তার চোখে তার মেয়ে।” একথা বলার সাথে সাথেই হঠাৎ নিক্কির কথা ঠাকুর সাহেবের মনে
পড়ে।
সুগনার প্রাসাদে আসার পর ঠাকুর সাহেব এমন জড়ালেন যে এক
মুহূর্তের জন্যও নিক্কির দিকে মনোযোগ দিলেন না। কিন্তু এখন তার মনোযোগ ক্রমাগত নিক্কির দিকে যাচ্ছিল, সে
ভাবছিল- "এতক্ষণে নিক্কি নিশ্চয়ই পুরো সত্যটা জেনে গেছে। আমি জানি না তার মনে কি চলছে?"
“মঙ্গলু .....” কাছে দাঁড়িয়ে
থাকা চাকরকে বললেন- " নিক্কি মাকে নিয়ে আয়।” তারপর কিছু একটা ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালেন-
"দাঁড়াও, চলো গিয়ে দেখে আসি।”
ঠাকুর সাহেব মাত্র দুই কদম হেঁটেছেন তখন মঙ্গলু তাকে
বাধা দিল - "মালিক... নিক্কি মেমসাব প্রাসাদে নেই।”
“বাড়িতে নেই ... তাহলে সে
কোথায় গেল?” ঠাকুর সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন। “দিওয়ানজির
বাড়িতে যায় নি তো? হয়তো মন খারাপ করেই ওখানে গেছে...
যাও ওকে ডেকে আনো। বলো আমি দেখা
করতে চাই।”
মঙ্গলু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। কিন্তু সে যত দ্রুত গিয়েছিল তত দ্রুত ফিরে এসেছে।
“নিক্কি মেমসাব ওখানেও নেই
....মাস্টার, সে কাল্লুর বাসায়।” মঙ্গলু ইতস্তত করে বললেন ঠাকুর সাহেবকে।
“কাল্লুর বাড়িতে .....?”
ঠাকুর সাহেব প্রশ্নবিদ্ধ চোখে মঙ্গলুর দিকে তাকালেন।
“মালিক .... নিক্কি মেমসাব
কাল্লুকে বিয়ে করেছে। দিওয়ান জি
বসে আছে আর তার স্ত্রী কাঁদছে।” মঙ্গলু এক
নিঃশ্বাসে ঠাকুর সাহেবের সামনে পুরো ঘটনা খুলে বলল।
“কে ... কি?” ঠাকুর
সাহেব… অবাক হয়ে মঙ্গলুর দিকে তাকিয়ে
বললেন।
মঙ্গলু ঘাড় নিচু করে।
“চালককে জিপ আনতে বল, আমরা
এখন নিক্কির সাথে দেখা করতে যাব।” ঠাকুর সাহেব
রেগে বললেন।
“জি মালিক।” মঙ্গলু কথা বলে দৌড়ে বাইরে গেল।
ঠাকুর সাহেব অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগলেন। তার মুখে উদ্বেগের রেখা ফুটে উঠেছে।
নিক্কির এই পদক্ষেপে কাঞ্চনও হতবাক। সে জানতো কাল্লু ভালো ছেলে, কিন্তু
সে কোনো মূল্যেই নিক্কির যোগ্য নয়। “তাহলে
কি নিক্কি কাল্লুকে বিয়ে করেছে রাগ করে যে ওর জায়গায় আমি এসেছি?” কাঞ্চনের
মনে প্রশ্ন জাগলো। তার হৃৎপিণ্ড
জোরে ধাক্কা খেল।
জীপ রেডি ছিল। ঠাকুর
সাহেব বের হতেই কাঞ্চন পিছন থেকে ডাকল - "বাবা... আমিও তোমার সাথে নিক্কির
কাছে যেতে চাই, আমার মনে হয় নিক্কি আমার উপর রাগ
করবে না।”
“আচ্ছা, মেয়ে, তোমার
প্রতি তার রাগ কেন হবে? আচ্ছা, যদি
যেতে চাও তাহলে আসো।” ঠাকুর
সাহেব বলে বাইরের প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে গেলেন।
কাঞ্চন চিন্টুর হাত ধরে ঠাকুর সাহেবের পিছু নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জীপটি প্রাসাদ
ছেড়ে চলে গেল।
আবার জিপ থামার শব্দে কাল্লু, নিক্কি
আর ঝুমকির নজর কেড়ে নিল বাইরে। তিনজনই
দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
কাঞ্চন আর চিন্টুকে ঠাকুর সাহেবের সাথে জিপ থেকে নামতে
দেখা গেল।
ঠাকুর সাহেবকে দেখেই তিনজনের হুঁশ উড়ে গেল। তাদের রাগান্বিত চেহারা দেখে কাল্লু ও
ঝুমকির শরীরে ভয়ের ঢেউ বয়ে গেল। ঠাকুর
সাহেব তড়িঘড়ি করে কুঁড়েঘরে এলেন। ঝুমকি
আর কাল্লুর হাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিত হলো তাদের নমস্কার বলতে।
ঠাকুর সাহেব রেগে ছিলেন, তবুও
হাত জোড় করে নমস্কারের উত্তর দিলেন। তারপর
নিক্কির দিকে তাকাতে লাগলো।
নিক্কি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার গলায় সিঁদুর ও মঙ্গলসূত্র ভর্তি
মাং তার বিবাহিত হওয়ার প্রমাণ দিচ্ছিল। ঠাকুর
সাহেব কিছুক্ষণ নিক্কির অবস্থা দেখছিলেন।
নিক্কির চোখ নিচু ছিল কিন্তু তবুও সে ঠাকুর সাহেবের রাগান্নিত
চোখ অনুভব করতে পারল। ঘাড় তুলে ঠাকুর
সাহেবের দিকে পলকহীন চোখে তাকাল।
“আমি দুঃখিত চাচা ..... “ হাত জোড় করে বলল নিক্কি।
“কে ..... কি.....?” ঠাকুর
সাহেব দুই কদম পিছিয়ে গেলেন এবং বললেন - "কি...... কি বললে...... চাচ......?"
নিক্কি বাধ্য হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়াতে
লাগলো।
“নিক্কি... তোমার মুখ থেকে
"চাচা” শব্দটি শুনে যে দুঃখ পেলাম আজকে দেওয়ানজির ছলনায়ও
এতটা দুঃখি পাইনি।” ঠাকুর সাহেব
যন্ত্রণার সুরে বললেন- "আমার বিশ বছরের ভালোবাসায় তুমি একটা ভালো মুল্য
দিয়েছো, নিক্কি। কাঞ্চনকে আমি কখনো তোমার থেকে আলাদা মনে করিনি, তাহলে
তোমাকে আমি কিভাবে আলাদা বুঝব, যখন তুমি
আমার কোলে খেলেছ।”
নিক্কির কথায় ঠাকুর সাহেবের হৃদয় রক্তাক্ত হয়ে গেল..
নিক্কির কাছ থেকে এমন উদাসীনতা তিনি আশা করেননি। সে কখনো ভাবেনি যে নিক্কিকে সে বুকে আগলে রেখেছিল, যার
হাসি দেখে সে আজ অবধি বেঁচে ছিল, সেই নিক্কি
তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, মুহূর্তের
মধ্যে তার সাথে এভাবে বিচ্ছেদ ঘটবে। নিক্কির
এই আচরণে তার আত্মা কেঁপে ওঠে।
ঠাকুর সাহেবের কথায় নিক্কির মন ভরে গেল। দিওয়ানজির ভুলের কারণে সে এখন আর ঠাকুর
সাহেবকে দেখতে পাবে না এই উপলব্ধিতে সে মারা যাচ্ছিল। তার ভালবাসা তার স্নেহ পেতে সক্ষম হবে না। কিন্তু ঠাকুর
সাহেবের কথা শুনে তার সমস্ত সন্দেহ অমূলক প্রমাণিত হল। তার হৃদয় আবেগে ভরে গেল। তাকে বাবা বলে ডাকতে তার ঠোঁট জ্বলে উঠল, তার
বাহু তাকে জড়িয়ে ধরতে চলে গেল। সে
এগিয়ে গেল - "বা...বাবা। আমাকে
মাফ করে দাও। আমি ভুল
করেছি, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি বাবা। প্লিজ আমাকে জড়িয়ে ধর।”
ঠাকুর সাহেব ভেজা চোখে নিক্কির দিকে তাকাতে লাগলেন। সে কাঁদছিল। তার চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু ঝরছিল। ঠাকুর সাহেব এগিয়ে এসে নিক্কিকে কোলে তুলে নিলেন। নিক্কি ভ্রুকুটি করে, তার
বুকে মুখ লুকালো।
সেখানে উপস্থিত সবার চোখে জল।
যতক্ষণ না নিক্কির কান্না পুরোপুরি থামে... ঠাকুর সাহেব
তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ
পর নিক্কি তার মাথাটা তার বুক থেকে আলাদা করে দিল। ঠাকুর সাহেব চোখের জল মুছতে লাগলেন।
কাঞ্চন তার কাছে গেলে নিক্কি ঠাকুর সাহেবের কাছ থেকে
আলাদা হয়ে কাঞ্চনকে জড়িয়ে ধরে। “দিদি, আমাকেও
ক্ষমা করে দিও, জেনে বা অজান্তে তোমার মনে আঘাত
দিয়েছি।”
“কে... কি?” রাগ
করে বলল কাঞ্চন। কি বললে? দেখ
বাবা নিক্কি কি বলছে?” কাঞ্চন নাক ফুঁকিয়ে ঠাকুর সাহেবের কাছে নালিশ করে বলল
কাঞ্চনের কথায় ঠাকুর সাহেব উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। তার সাথে সাথে সেখানে উপস্থিত সবার
ঠোঁট জ্বলে ওঠে।
“ঠিক আছে বাবা, মাফ
করে দাও, আর বলবো না দিদি।” কাঞ্চনের হাত ধরে বলল নিক্কি। তার কথার মধ্যে একটা বিব্রতবোধ ছিল।
“নিক্কি....কিন্তু কি বেটি... তুমি
বিয়ে করেছো। কাউকেও বলোনি। তোমার বিয়ের জন্য আমরা আমাদের মনে কত
বাসনা বেঁধে রেখেছিলাম। সবই ফেলে
রেখেছি। কেন এমন করলে মেয়ে।” ঠাকুর সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন।
আত্মোপলব্ধিতে নিক্কির মাথা নত হয়ে গেল। তারপর ঠাকুর সাহেবের দিকে ক্ষমা
চাওয়ার জন্য তাকিয়ে বললেন - "আমাকে ক্ষমা কর বাবা। প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ার পর আমি খুব হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। সব উলটপালট হয়ে গেল। প্লিজ... আমাকে ক্ষমা করুন।”
ঠাকুর সাহেব আদর করে মাথায় হাত রেখে বললেন -
"তোমার সুখই আমাদের সুখ নিক্কি। তুমি
যদি কাল্লুকে পছন্দ করে থাকো, আমরাও
কাল্লুকে পছন্দ করি। এখন আমরা চাই
তোমরা সবাই আমাদের সাথে প্রাসাদে যাও এবং সেখানে থাকো।”
“না বাবা। এখন আমি এই বাড়ি ছেড়ে যেতে পারব না। তবে মেয়ের মতো বাড়িতে আসতে থাকব। তোমাদের সবার সাথে দেখা করতে থাকব।” নিক্কি ঠাকুর সাহেবকে প্রত্যাখ্যান
করে বললো - "আমাকে আশীর্বাদ কর বাবা যাতে আমি আমার স্বামীর বাড়িতে সুখে আমার
নতুন জীবন কাটাতে পারি।” এই বলে
নিক্কি ঠাকুর সাহেবের পায়ের কাছে প্রণাম করল।
“আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার
সাথে আছে, বেটি।” নিক্কির মাথায় হাত রেখে ঠাকুর সাহেব বললেন। - "সদা হাসিখুশি থেকো। তোমার জীবন সবসময় ফুলের মতো গন্ধে
থাকুক।”
নিক্কির পর কাল্লুও ঠাকুরের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নেন। দেওয়ান জির কাছ থেকে যে আশীর্বাদ
পাওয়া যায়নি। ঠাকুর
সাহেবের থেকে আশীর্বাদ পেল।
ঠাকুর সাহেব কাঞ্চন আর চিন্টুকে নিয়ে প্রাসাদতে ফিরলেন।
৪২
পরবর্তী দিন
সকালে ঘুম থেকে উঠেই কমলাজি গোসল সেরে মন্দিরে চলে
গেলেন। পায়ে হেঁটে মন্দিরে যেতেন। প্রাসাদ থেকে মন্দিরের যাত্রা ছিল ৩০
মিনিট।
আজ সে খুব খুশি ছিল। হবে না কেন? সে যা
চেয়েছিল তাই পেয়েছ। তার একটাই
স্বপ্ন ছিল, রবিকে পড়ালেখা করে একজন যোগ্য মানুষ
বানিয়ে বড় বাড়িতে বিয়ে করাবে।
২ দিন আগে সে রবি ও নিক্কির বিয়ের স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু তার হৃদয়ে একটা ফাঁক ছিল। আর এটাই ছিল রবি আর কাঞ্চনের
প্রেম....! সে রবিকে নিক্কির সাথে বিয়ে দিতে চেয়েছিল... কিন্তু সে তার ছেলের
আকাঙ্খাকে নিজের হাতে মেরে ফেলতেও চায়নি। কিন্তু
আজ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আজ
তার মূল্যবোধ অনুযায়ী সবকিছু ঘটছিল। আজ
ঠাকুর সাহেবের মত একজন ধনী ব্যক্তির সাথে তার সম্পর্কও হবে এবং রবির হৃদয়ও তার
জন্য কষ্ট পাচ্ছিল না। ভগবান তার মত
করেই সবকিছু তৈরি করেছিলেন। তাই
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই গোসল সেরে মন্দিরের দিকে রওনা দিল।
পূজা সেরে কমলা ফিরে আসেন প্রাসাদে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার পদক্ষেপ প্রাসাদের সীমার মধ্যে। সে খুব আপন খেয়ালে প্রাসাদের দিকে
যাচ্ছিল যখন দিওয়ান জির কন্ঠ তার কানে পড়ল - "বোনজি, একটু
অপেক্ষা করুন..."
দিওয়ানজি তার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে হাত তুলে
কমলাজিকে থামতে ইঙ্গিত করছিলেন।
কমলাজি অবাক হয়ে দেওয়ানজির দিকে তাকাতে লাগলেন, তিনি
দ্রুত কমলাজির দিকে ছুটে আসছেন।
“বেহেন জি। দেওয়ান কাছে আসতেই বললেন- "আপনার সাথে একটা জরুরী
কথা বলার ছিল। আপনি একটু
আমাদের বাসায় আসবেন।”
“আমি দুঃখিত, দিওয়ান
জি, এই সময়ে আপনার বাড়িতে আসা সম্ভব হবে না।” কমলাজী বিব্রত স্বরে বললেন। ”আপনি
ভালো করেই জানেন.....ঠাকুর সাহেব এসব পছন্দ করবেন না। আফটার অল আমি ওনার অতিথি।”
“তাহলে ... আপনি কি আমাদের
অতিথি নন?” দেওয়ান জি রাগান্বিত কন্ঠে বললেন -
"আসলে আমরা আত্মীয় হতে যাচ্ছি, কমলাজী, আমাদের
বাড়িতে আসতে রাজি নন কেন?"
দিওয়ান জিকে দেখে চমকে গেলেন কমলাজি। তার মুখের কথা শুনে অবাক হয়ে বললো-
"বুঝলাম না দেওয়ান জি... কি কথা বলছেন?"
“বুঝছেন না কমলা জি।” দেওয়ান জী বিভ্রান্ত হয়ে বললেন -
"এইতো গতকাল আপনি আমার নিক্কিকে আপনার পুত্রবধূ বানানোর কথা বলেছিলেন
প্রাসাদে বসে। ঠাকুর সাহেব
নিজেও এর সাক্ষী। এভাবে জিভ
চেপে রাখবেন না।”
“দিওয়ান, আপনি
বোধহয় আমার কথা ঠিকমতো শোনেননি।” কমলাজী রাগান্নিত
কণ্ঠে বললেন - "আমি বলিনি যে আমি নিক্কিকে আমার পুত্রবধূ করব। আমি বলেছিলাম..... শুধু ঠাকুর সাহেবের
মেয়েই হবে আমার বাড়ির পুত্রবধূ। আপনি
ইতিমধ্যে জানেন যে ঠাকুর সাহেব নিক্কির মেয়ে নন... কাঞ্চন।”
“বোনজি ..... কথার অর্থ
পরিবর্তন করে আপনার প্রতিশ্রুতি থেকে ফিরে যাবেন না। আপনার কথা যাই হোক না কেন, আপনার
উদ্দেশ্য ছিল নিক্কিকে আপনার পুত্রবধূ বানানো।” দিওয়ান জি তিক্ত স্বরে বললেন। তার মুখে রাগ ছড়িয়ে পড়ে।
“আপনি যা বুঝতে চান... বুঝুন !
কিন্তু কাঞ্চন হবে আমার বাড়ির পুত্রবধূ।” দেওয়ান জিকে
দুই টুকরো উত্তর দিয়ে কমলা জিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল।
“দাঁড়ান... কমলা জি।” দিওয়ান জি কড়া গলায় বললেন -
"যাওয়ার আগে... আমার মুখ থেকেও একটা সত্য শুনুন। তার পরে হয়তো আপনার মন বদলে যাবে।”
“কি রকম সত্য
...?” কমলাজির প্রশ্নবিদ্ধ চোখ দিওয়ান জির মুখে আটকে
গেল।
“একটি সত্য যা আপনার স্বামীর ব্যাপারে।” দিওয়ান জি ঠোঁটে বিষাক্ত হাসি দিয়ে
বললেন।
“কি ... আপনি আমার স্বামীকে
কিভাবে জানেন?”কমলা
জি ছটফট করতে করতে বললেন - "সে কোথায়? দেওয়ান জি
বলুন..... আমি আপনার সামনে হাত গুটিয়ে দেব।”
কমলাজির ছটফটানি দেখে দিওয়ানজির ঠোঁটের হাসি আরও গভীর
হল।
“আপনি আমার সাথে আমার বাসায় আসুন
... আমি আপনাকে আপনার স্বামীর ব্যাপারে সব বলবো।” দিওয়ান জি বাড়ির দিকে ফিরতে গিয়ে বললেন।
কমলাজী তাকে অনুসরণ করে তাকে অনুসরণ করলেন। দেওয়ানজি কমলাজিকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
“বসুন, বোনজি
.....!” হলের মধ্যে পড়ে থাকা সোফার দিকে ইশারা করে বললেন দেওয়ান জি।
কমলাজি ইতস্তত করে বসে রইলেন।
“বলুন কি নেবেন?” সোফায়
বসতেই দিওয়ান জি বললেন।
“এই সময়ে আমি কিছু খেতে বা পান
করতে চাই না, দিওয়ান জি। দয়া করে আমাকে বলুন আপনি আমার স্বামীকে কীভাবে চেনেন? এবং
তিনি এই সময়ে কোথায়? আমি তার সাথে কথা বলতে চাই। আপনি জানেন না এক নজর দেখতে কতটা
উদ্বিগ্ন?"
“আমি আপনার কষ্ট বুঝতে পারি। কিন্তু আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে... আজ আপনার
সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।” দিওয়ান জী
বললেন - "আপনার মনে আছে যেদিন আপনি প্রাসাদে এসেছেন। সুসংবাদ নিতে আপনার ঘরে গিয়েছিলাম।”
“হ্যাঁ, মনে
আছে, কিন্তু আমার স্বামীর সাথে এর কি সম্পর্ক?"
“সেদিন আমি আপনার ঘরে একটা ফটো
ফ্রেম দেখলাম, তারপর ফটোটার দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস
করলাম এটা কার ছবি। আর আপনি
বলেছিলেন সে আপনার স্বামী।”
“হ্যাঁ ... মনে আছে...” কমলাজী বললেন।
“এটা জিজ্ঞাসা করার কারণ হল আমি
আপনার স্বামীর ছবি চিনতে পেরেছি। আপনার
নিশ্চিতকরণের জন্য, আমি আপনাকে বলি তার নাম মোহন কুমার।”
“হ্যাঁ...ঠিকই বলেছেন, ওর
নাম মোহন কুমার। কিন্তু কবে ও
কোথায় ওর সাথে দেখা হল? আর আগে থেকেই চিনলেন তো এতদিন আমার
কাছে লুকিয়ে রাখলেন কেন?” একই সঙ্গে কমলাজির মনে অনেক প্রশ্ন
জেগেছে।
“বোনজি সঠিক সময়ের জন্য
অপেক্ষা করছিলাম এবং এখন সেই সময় এসেছে” দিওয়ান জি তার কথায় বিরক্তির সাথে
বললেন - "মোহন বাবুর সাথে আমার প্রথম দেখা দিল্লিতে হয়েছিল। আমি তাকে রায়গড়ে আসার আমন্ত্রণ
জানিয়েছিলাম।”
“রায়গড়...? কিন্তু
কিসের জন্য?” প্রশ্ন চোখে দেওয়ান জির দিকে তাকিয়ে
বলল কমলা জি।
“বোনজি .....! আজকে দেখতে
পাচ্ছেন এই চকচকে সুন্দর কাঁচের প্রাসাদটি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আপনার স্বামী তৈরি করেছেন।”
বিস্ময়ে কমলার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে আপনার
স্বামী একজন দক্ষ কাঁচের কারিগর ছিলেন।” দেওয়ানজী
বলতে শুরু করলেন। “ঠাকুর
সাহেব যখন আমাকে প্রাসাদ নির্মাণের কথা বললেন, তখন
আমি কাঁচের কারিগরের খোঁজে দিল্লি গিয়েছিলাম। সেখানে আপনার স্বামীর সঙ্গে দেখা করে কিছু অগ্রিম নিয়ে
রায়গড়ে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম।”
কমলা জি বিনা দ্বিধায় দিওয়ান জির কথা শুনতে থাকলেন।
দেওয়ান জি আরও বলেন - "আমার ফেরার পর তৃতীয় দিনে, মোহন
বাবু রায়গড়ে পৌঁছান। আমি তাকে প্রাসাদ
নির্মাণের কথা বলি। পরের দিন
তিনি দিল্লিতে ফিরে যান। তার সাথে কাজ
করার জন্য তার কয়েকজন এবং সহকারী কারিগরের প্রয়োজন ছিল। যখন একদিন পর সে এলো, তার
সাথে আরো ২০ জন কারিগর ছিল।
তিনি আসার সাথে সাথে নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রায় ২০ মাস পর প্রাসাদের নির্মাণ
কাজ শেষ হয়। তখন ঠাকুর
সাহেব তাঁর স্ত্রী রাধাজীকে নিয়ে বেনারসে থাকতেন। অট্টালিকা নির্মাণের সময়, তিনি
মাসে একবার বা দুবার আসতেন, কাজের খবর
নিয়ে তারপর চলে যেতেন।
অট্টালিকাটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে সেদিন ঠাকুর সাহেব
তাঁর স্ত্রী রাধা দেবীকে নিয়ে এলেন। রাধাজীর
গৃহপ্রবেশের আনন্দে সেদিন প্রাসাদ সাজানো হয়েছিল কনের মতো। কর্মরত সব কারিগর চলে গেছে। মোহন বাবু ছাড়া কেউ নেই। যাবার আগে ঠাকুর সাহেবের সাথে
গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন।
সারাদিন প্রাসাদে ছিলাম। বাড়িতে ঢোকার পর.....মানুষের ভিড় কমে গেলে...ঠাকুর
সাহেব রাধাজীকে প্রাসাদ দেখাতে লাগলেন। ঠাকুর
সাহেব সেদিন খুব খুশি হয়েছিলেন। সেও
খুশি হতে বাধ্য। কাচের প্রাসাদ
ছিল তার স্বপ্ন…..যা তিনি রাধাজির মুখ হিসেবে গড়ে
তোলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
তখন সন্ধ্যার সময়। ঠাকুর সাহেব রাধাজীকে নিয়ে হলঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কাঁচের দেয়াল দেখিয়ে রাধাজিকে
বলছিলেন। - "রাধা, এই
দেয়ালের দিকে তাকাও। তুমি কি এদের
মধ্যে বিশেষ কিছু দেখতে পাচ্ছ?"
রাধাজী কাঁচের দেয়ালের দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারল না। রাধাজী ঠাকুর সাহেবের দিকে তাকালেন।
রাধাজীকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে দেখে ঠাকুর সাহেব জানতে
পারলেন রাধাজী কিছুই বোঝেননি। “রাধা...এর
কাঁচের টুকরোগুলো দেখো। কোথাও তোমার
ছবি দেখতে পাবে না। এটা এমনভাবে
বানানো যে তাতে কোনো কিছুরই প্রতিফলন দেখা যায় না।”
রাধাজী এবার ভালো করে তাকালেন। এবার বিস্ময়ে চোখ মেলে উঠল তার। ঠাকুর সাহেব হাসলেন। সেই সঙ্গে তিনি এও বিস্মিত হলেন যে, এমন
অনন্য জিনিস দেখেও রাধা তাঁর প্রশংসা করেননি।
“আসো ..... আমি তোমাকে অন্য
কিছু দেখাই।” ওখান থেকে
ঘুরে ঠাকুর সাহেব বললেন। তারপর
রাধাজীকে নিয়ে প্রাসাদের প্রশস্ত ঘরের দিকে চলে গেলেন। আমি তাদের পিছনে ছিলাম।
“ওদের দেখ রাধা। এর কারিগর দেখ। তুমি জান যে আমি এই কাঁচ ফ্রান্স থেকে অর্ডার করে এনেছি।” ঠাকুর সাহেব তখন তাঁর শোবার ঘরে। এই বলে ঠাকুর সাহেব রাধাজীর দিকে
তাকাতে লাগলেন। কাঁচের
অপূর্ব কারুকার্য দেখে রাধাজী আনন্দিত হলেন।
ঠিক একইভাবে ঠাকুর সাহেব প্রাসাদের প্রতিটি কোণে ঘুরে
রাধাজীকে প্রাসাদ দেখাতে থাকেন এবং প্রতিটি কাঁচের বিশেষত্ব বলতে থাকেন। পুরো প্রাসাদে ঘোরাঘুরি করে ঠাকুর
সাহেব রাধাজীকে নিয়ে তাঁর ঘরে ফিরে এলেন। রাধাজী
গর্ভবতী হওয়ার কারণে প্রাসাদে ঘোরাঘুরি করতে করতে খুব ক্লান্ত ছিলেন।
“এখন বলো রাধা, তোমার
এই প্রাসাদ কেমন লাগলো?” ঠাকুর সাহেব হাসিমুখে রাধাজীর দিকে
তাকিয়ে বললেন।
“খুব সুন্দর .....!” রাধাজী হেসে বললেন -
"কিন্তু তোমার হৃদয়ে আমার জন্য যে ভালোবাসা আছে তার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই
নেই। যে ভালোবাসা দিয়ে তুমি আমার
জন্য এই প্রাসাদটি তৈরি করেছ, আমার জন্য
কেউ যদি কুঁড়েঘরটি তৈরি করত আমি আজকে যেমন খুশি তেমনই খুশি হতাম। “
রাধাজীর উত্তরে ঠাকুর সাহেব হতাশ হলেন। তার সব সুখ, সব
আশা জলে ভেসে গেল। রাধাজি যখন
এমন একটি বিশাল অট্টালিকাকে একটি সাধারণ কুঁড়েঘরের সাথে তুলনা করেছিলেন, তখন
তাঁর হৃদয় গভীরভাবে আহত হয়েছিল। “রাধা, মনে
হয় ক্লান্তির কারণে তুমি প্রাসাদের দরজা-প্রাচীর ঠিকমতো দেখতে পারোনি, তাই
তুমি একে সাধারণ কুঁড়েঘরের সাথে তুলনা করছো। কিন্তু যখন তুমি এর অপূর্ব কারুকার্য মনোযোগ দিয়ে দেখবে
তখন প্রশংসা না করে থাকতে পারবে
না।”
ঠাকুরের মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। রাধাজী তার ভুল বুঝতে পারলেন। সে তার ভুল শুধরে দিয়ে বললো- "আমি এটা বলতে
চাচ্ছিলাম না। আমি বলতে
চেয়েছিলাম যে তুমি যদি আমার জন্য একটা কুঁড়েঘরও ভালোবেসে তৈরি করতে, তাহলেও
আমি খুশি হতাম। সত্যিই, আমি এত বড় ভবন কল্পনাও করেনি। “
ঠাকুর সাহেব রাধাজীকে কোন উত্তর দিতে পারার আগেই দরজায়
ভৃত্যের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হল।
“মালিক ..... মোহন বাবু আপনার
সাথে দেখা করতে চান।” সরজু বলে
মাথা নিচু করে উত্তরের অপেক্ষায় রইল।
“ওকে এখানে পাঠাও।” ঠাকুর সাহেব সরজুকে বললেন।
উত্তর পেয়ে সরজু ফিরে গেল। কিছুক্ষণের
মধ্যেই মোহনবাবু ঘরে ঢুকলেন। ভেতরে
আসতেই সবাইকে হাত জোড় করে নমষ্কার জানালেন।
“রাধা .....! “ঠাকুর
সাহেব রাধাজীকে বললেন। “এর
সাথে পরিচিত হও...ইনিই মোহন। এই
চমৎকার প্রাসাদটি তৈরি করেছেন। কাঁচের
কারুকার্য তুমি দেখতে পাচ্ছ... সবই তার হাতের অলৌকিক কারিশমা।”
ঠাকুর সাহেবের কথা শুনে রাধাজী বিছানা থেকে উঠে
দাঁড়ালেন। তারপর মোহন
বাবুর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন - "মোহন জী, আপনার
কারুকার্যের যত প্রশংসা করা যায় ততই কম, আপনার
অসাধারন চিত্রকর্ম আমাকে মুগ্ধ করেছে। কাঁচের
মধ্যে এত সুন্দর কারুকার্য আমি কখনো দেখিনি। আপনার
কারুকার্য অনির্বচনীয়। আমি এটাকে
আমার সৌভাগ্য মনে করব যে আজ আপনার মতো একজন মহান শিল্পীর দেখা পেয়েছি।”
রাধাজী বলতে দেরি হল আর ঠাকুর সাহেবের বুকে একটা বিকট
শব্দ হল। রাধাজীর মুখ
থেকে প্রশংসা শুনতে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রাসাদের কোণে ঘুরেছিলেন। প্রশংসা পেতে প্রাসাদ নির্মাণে পানির
মতো টাকা খরচ করেছেন। যে প্রশংসার
জন্য সে বছরের পর বছর ধরে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল, সেই প্রশংসা... মোহন বাবু রাধাজীর
মুখ থেকে পেয়েছিলেন এবং সে তা সহ্য করতে পারছিলেন না। সে ভিতরে ভিতরে শোকাহত। সে নিজেকে অপমানিত বোধ করতে লাগল।
“এটা আমার জন্য খুব আনন্দের
বিষয় যে রাধাজি, আপনি আমার কাজ পছন্দ করেছেন।” মোহনজি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেছিল -
"আমি একজন কারিগর, যখন আমি কারও কাছ থেকে আমার কাজের
প্রশংসা শুনি, তখন আমার মন একটি আনন্দদায়ক
অনুভূতিতে ভরে যায়। আপনারা আমার
কাজ পছন্দ করেছেন। এখন আমি খুশি
মনে এখান থেকে চলে যেতে পারি। "
“তুমি কি জন্য আমার সাথে দেখা
করতে চেয়েছিলে?” ঠাকুর সাহেব শুকনো কণ্ঠে মোহনবাবুকে
জিজ্ঞেস করলেন।
“ঠাকুর সাহেব, এখন
আমার কাজ শেষ হয়েছে, তবে বাড়ি যাওয়ার আগে আপনার সাথে
কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলার ছিল। আপনি
যদি আমাকে আপনার কিছুটা সময় দিতে পারেন তবে এটি একটি বড় আশীর্বাদ হবে।” মোহন বলল।
“এই মুহুর্তে আমরা খুব ক্লান্ত, মোহন। তুমি বাকি দিন থাকো। যাই হোক না কেন... আমরা রাতের খাবারের
পরে কথা বলব। তুমি কাল
সকালে যাও।”
“ঠিক আছে ঠাকুর সাহেব, আপনি
যদি বলেন, আমি আজকে থাকব। নমস্কার!” উত্তর দিয়ে মোহনবাবু নমস্কার বলে
সেখান থেকে চলে গেলেন।
আমিও ঠাকুর সাহেব এবং রাধাজীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে
হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আমার
স্ত্রী গত দুদিন ধরে প্রসবের জন্য হাসপাতাল ভর্তি করত। আমাকে তাকে দেখতে যেতে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ফিরে আমি আমার বাড়িতে প্রাসাদের নির্মাণ
ব্যয়ের হিসাব শুরু করি। আজ ঠাকুর
সাহেবকে পুরো হিসাব দেখাতে হলো।
৪৩
দুঘণ্টা পর সাতটার দিকে আবার প্রাসাদে পৌঁছলাম। কিন্তু হল থেকে মোহন বাবু ও রাধাজীর
কথা বলার সময়ই আমি দরজায় পৌঁছে গেছি। কেন
জানি না... কিন্তু আমার পা সেখানে আটকে গেল। আর
গোপনে তাদের কথা শোনার চেষ্টা করতে লাগলাম। যদিও
রাধাজীর দিক থেকে আমি সন্দিহান ছিলাম না, কিন্তু আজকের
দিনের ঘটনা দেখে আমার মনে তাঁর কথা শোনার আকুলতা জেগে উঠল।
আমি দরজার আড়ালে তাদের মধ্যে ঘটে যাওয়া কথা শুনতে
লাগলাম।
রাধাজী বলছিলেন - "মোহনজী, আপনি
আপনার পরিবার সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন। আপনার
বাড়িতে আর কে কে আছে?"
মোহন বাবু - "মাত্র দুই জন, একজন
আমার স্ত্রী এবং অন্যজন আমার ৬ বছরের ছেলে।”
রাধাজী - "আপনি বলেছিলেন, কাজের
সূত্রে আপনাকে প্রায়ই ঘরের বাইরে থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সেই মানুষগুলো খুব একা হয়ে যায়। বিশেষ করে আপনার স্ত্রী। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন?"
মোহন বাবু - "এটা আমিও জানি, রাধাজী। কিন্তু কী করব বাধ্যতা, এমনই
বাধ্যতা, না চাইলেও আমাকে ওদের থেকে দূরে থাকতে
হয়।”
রাধাজী - "তাহলে টাকাই কি আপনার কাছে এত
গুরুত্বপূর্ণ?"
মোহন বাবু - "না রাধাজী, টাকা
আমার কাছে আমার পরিবারের চেয়ে বেশি নয়। আমি
চাইলে ৬ মাস আগেই প্রাসাদ তৈরির কাজ শেষ করে ফেলতাম। কিন্তু তখন হয়তো এখন যতটা দেখা যাচ্ছে ততটা সুন্দর হতো
না। কাজের সাথে আপস করি না। আমি যদি আমার কাজে সন্তুষ্ট না হই তবে
আমি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কাজ করতে থাকি। এর জন্য যদি আমাকে এখানে আরও কয়েক বছর কাটাতে হয় কাটাব। ....লোকেরা এটার প্রশংসা করবে, এটা
পছন্দ করবে। এবং আমার
কাজের প্রশংসা করবে এটাই আমি চাই।”
রাধাজি - "আপনি একজন সত্যিকারের কারিগর মোহন জি, আপনার
মতো একজন শিল্প প্রেমিকের সাথে দেখা করে আমি খুব খুশি। আমি আপনার শিল্প-দক্ষতাকে হৃদয় থেকে সম্মান করি। এবং এই প্রাসাদের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার মূল্যবান সময় দিয়েছেন।”
মোহন বাবু - "এই ধন্যবাদের প্রকৃত যোগ্য হলেন
আপনার স্বামী ঠাকুর সাহেব। যিনি
আন্তরিকভাবে আপনার জন্য এত বড় অট্টালিকা তৈরি করেছেন। আপনি সত্যিই খুব ভাগ্যবতী রাধাজী, আপনি
ঠাকুর সাহেবের মতো একজন ভগবান স্বামী পেয়েছেন। এই যুগে এমন তার স্ত্রীর জন্য নিঃশর্ত ভালবাসা একজন
পুরুষের হৃদয়ে খুব কমই থাকে। তিনি
সত্যিই একজন দেবতা।”
রাধাজি - "আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মোহন জি। এটা সত্য যে ঠাকুর সাহেবকে আমার
স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। আমাদের দুজনের অন্তরে একে অপরের প্রতি অপরিসীম ভালবাসা
রয়েছে।”
মোহন বাবু - "থাকতেই হবে। এই সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা আর বিশ্বাসের অনেক বড়
জায়গা আছে।”
রাধাজী - "হুমমম...ঠিক বলেছেন। আচ্ছা আপনি অনেক বছর পর বাড়ি যাচ্ছেন, আপনা
বউ ছেলের সাথে দেখা করতে খুব কৌতূহলী তাই না?"
মোহন বাবু - "আমি একটাই কথা ভাবছি, জানি
না ওরা কেমন হবে? কি অবস্থায় ওরা বেঁচে আছে। এত দিন ওদের কোনো খবরও নিতে পারিনি।”
রাধাজী - "মন খারাপ করবেন না, মোহন
জি। ভগবানের কৃপায় তারা ভালো
থাকবে। আপনি যখন বাড়ি যাবেন, আপনি
অবশ্যই তাদের জন্য একটি উপহার নিয়ে যাবেন। এবং
যদি সম্ভব হয়, বাড়িতে পৌঁছানোর পরে, আমি
অবশ্যই সেখানে সুসংবাদ পাঠাব। আমি
আপনার সৌভাগ্য কামনা করছি। বাড়িতে
পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষা করব।”
রাধাজীর এই কথাগুলো শুনে আমার মন তার প্রতি শ্রদ্ধায়
ভরে গেল। আমি দরজা
থেকে বেরিয়ে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করলাম। হলে
পৌঁছে রাধাজী ও মোহন বাবুকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ঠাকুর সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে
গেলাম।
আমি কিছুক্ষণ ঠাকুর সাহেবের পাশে বসে তাঁকে খরচের হিসাব
ব্যাখ্যা করতে থাকি। এ কাজে ২
ঘণ্টারও বেশি সময় কেটে গেছে। কাজ
শেষ করতে করতে রাতের খাবারের সময় হয়ে গেছে। ঠাকুর সাহেবের নির্দেশে আমিও নৈশভোজে যোগ দিলাম।
প্রায় এক ঘন্টা পর আমাদের খাবার শেষ হল। রাধাজী তার ঘরে ঘুমাতে গেলেন।
প্রাসাদের একমাত্র চাকর সারজুও... সারাদিনের ক্লান্তিতে
ঠাকুর সাহেবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজের বাসস্থানে ঘুমাতে গেল।
মোহন বাবুর ঠাকুর সাহেবের সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা
বলার ছিল, তাই আমরা তিনজনই হলের সোফায় বসে
রইলাম।
“বলো কি বলতে চেয়েছিলে?” ঠাকুর
সাহেব মোহন বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন।
ঠাকুর সাহেব, ব্যাপারটা হল
কলকাতায় কাঁচের মন্দির বানানোর চাকরি পেয়েছি। আমি এই বিষয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
“খুব খুশির ব্যাপার, কিন্তু
তুমি আমাদের এসব বলছ কেন?"
“ঠাকুর সাহেব ঘটনা হল যে ১৫ দিন
আগে কলকাতা থেকে সেই মন্দিরের ট্রাস্টিরা এখানে এসেছিল। তারা এই কাঁচের প্রাসাদ দেখেছিল এবং এখন তারা চায় আমি
কলকাতায় এই রূপের একটি বিশাল মন্দির তৈরি করি।”
“মোটেই না।” ঠাকুর সাহেব তড়িঘড়ি করে বললেন - "কলকাতা কি...
এমন দালান সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা হবে না।”
“কিন্তু তাতে ক্ষতি কি ঠাকুর
সাহেব?” মোহন বাবু অবাক হয়ে ঠাকুর সাহেবের
দিকে তাকিয়ে বললেন।
“এর কারণ যদি এরকম আরেকটি
বিল্ডিং তৈরি করা হয়, তাহলে এর মূল্য কমে যাবে। এবং আমরা এটি অনুমোদন করি না।”
“কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব, ঠাকুর
সাহেব? আমি একজন কারিগর। যখনই আমি কিছু তৈরি করার কাজ পাব, তখনই
করব। কারণ এটি আমার ব্যবসা, এটি
আমার শিল্প। আমি আমার হাত
ধরে রাখতে পারি না।” প্রতিবাদে
মোহন বাবু বললেন।
“বিষয়টি বোঝার চেষ্টা কর, মোহন, এই
প্রাসাদটি আমার এবং আমার স্ত্রী রাধার স্মৃতি। আমি এর আর একটি উদাহরণ মোটেই চাই না।”
“এই অট্টালিকাটি আপনার স্বপ্ন, ঠাকুর
সাহেব, আমার নয়, আমার স্বপ্ন
অন্য কিছু, আমি একজন কারিগর এবং যদি সুযোগ পাই, আমি
এর চেয়ে উপরে উঠে আমার দক্ষতা দেখাতে চাই। এবং
আপনি আমাকে থামাতে পারবেন না।"
“মোহন........!” ঠাকুর সাহেব স্তম্ভিত হয়ে চিৎকার করে
উঠলেন। “আমার
নাম ঠাকুর জগৎ সিং, আমি কি করতে পারি, না
পারি, সে সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই। অযথা জেদ করবে না। ভুলে যাবে না যে তুমি আমার ছাদের নিচে
বসে আছ। তুমি চাইলে আমি তোমাকে এত
সম্পদ দিতে পারি তোমার অনেক প্রজন্ম কাজ করার প্রয়োজন অনুভব করবে না।
“আপনি বৃথা জোর দিয়ে বলছেন, ঠাকুর
সাহেব, আমি আমার জীবনে শিল্পকে কয়েক টুকরো কাগজের জন্য
ব্যবসা করতে পারি না।” মোহন বাবুও বলে
উঠলেন।
“তাহলে আমি অন্য উপায় নিব যাতে
তোমার মত লোকেকে থামানোর জন্য।”
“আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?"
“না ....দুর্বল লোকেরা হুমকি
দেয়। আমি সতর্ক করছি। তুমি যদি আমার কথা না শোন, তাহলে
আমি যেকোনো কিছু করতে পারি।”
“আপনি যা খুশি করতে পারিন। কিন্তু এখন আমি এখানে এক মুহূর্তও
থাকতে পারবো না। আমি চলে
যাচ্ছি।” মোহন বাবু দৃঢ়তায় বলে নিজের ঘরের
দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঠাকুর সাহেব ও মোহন বাবুর প্রচন্ড বাকবিতন্ডায় আমার
মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি
কেবল নীরব দর্শক হয়ে তাদের মধ্যে মারামারি দেখছিলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহনবাবু নিজের জিনিসপত্র হাতে নিয়ে
ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাকে দেখে ঠাকুর
সাহেবের চোখ জ্বলে উঠল।
মোহন বাবু হলঘরে এসে জিনিসপত্র নামিয়ে ঠাকুর সাহেব ও
আমাকে অভিবাদন জানালেন। তারপর লাগেজ
নিয়ে এবং চলে যাওয়ার জন্য রওনা দেয়।
“তুমি এভাবে যেতে পারো না মোহন?” বিষাক্ত
সাপের মতো হিস হিস করতে করতে ঠাকুর সাহেব বললেন।
“আমি চলে যাচ্ছি, ঠাকুর
সাহেব। আর এটাই আমার চূড়ান্ত
সিদ্ধান্ত।”
“তাহলে আমার চূড়ান্ত রায়টাও
শোন, মোহন, তুমি যদি
প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার চেষ্টাও করো, আমি তোমাকে
গুলি করব।” এই বলে ঠাকুর
সাহেব দেয়ালে টাঙানো বন্দুকের দিকে এগিয়ে গেলেন। সে বন্দুকটা বের করে মোহন বাবুর দিকে তাক করলো।
“ঠাকুর সাহেব, বন্দুকের
শক্তি দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে পারবেন না। আমার
সিদ্ধান্ত অটল।” ঠাকুর
সাহেবের হুমকির তোয়াক্কা না করে মোহন বাবু বললেন। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
“থামো, মোহন...!
“ঠাকুর সাহেব জোরে গর্জন করলেন।
কিন্তু মোহন বাবু তার কথা উপেক্ষা করে দরজার দিকে এগোতে
থাকলেন।
ঠাকুরের চোখে রক্ত। সে বন্দুকটা নিয়ে গেল। আমার হার্টবিট বেড়ে গেল। ব্যাপারটা এই পর্যন্ত যাবে, ভাবিনি। কিন্তু আমি কিছু করার আগেই ঠাকুর
সাহেবের বন্দুক থেকে ‘ধাইয়ান’ আওয়াজে
একটা গুলি চলে গেল। লক্ষ্য ছিল মোহন
বাবুর পিঠ। গুলিটি তার পিঠের
গভীরে ঢুকে যায়। মোহন বাবু চিৎকার
দিয়ে হাত নেড়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন। তার
হাতে থাকা স্যুটকেসটি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
ভয়ার্ত চোখে মোহন বাবুকে মাটিতে যন্ত্রণায় দেখতে
লাগলাম। আমি সেই ধাক্কা থেকে বেরোতেও
পারিনি যে একটা বিকট চিৎকার আমার মনোযোগ ভেঙে গেল। আমি কণ্ঠের দিকে তাকালাম। রাধাজী সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে
রক্তাক্ত মোহন বাবুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
“রা.......রাধা .....! “ঠাকুরের
মুখ থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল।
রাধাজী দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে মোহন বাবুর কাছে এলেন।
“আমি.......মোহন জি!” রাধাজী
মোহন বাবুর ক্ষতবিক্ষত শরীরের দিকে তাকিয়ে বললেন- "এ সব কিভাবে হল মোহন জি?"
মোহন বাবু বেদনার্ত দৃষ্টিতে রাধাজীর দিকে তাকাতে
লাগলেন। রাধাকে দেখেই তার চোখ থেকে জল
গড়িয়ে পড়ল। তিনি ভাঙ্গা
ভঙ্গিতে রাধাজির সাথে কথা বললেন - "আমি দুঃখিত..... দুঃখিত..... রাধাজী, আমার
আছে... কোথায়..... ছিল... ওটা, আপনার.....স্বামী......দেবতা......সে......দেবতা
হল.......না...... .."
“মোহন জি, আপনার
কোন ক্ষতি হবে না, মোহন জি, আমি
এখন ডাক্তারকে ডাকব।” মোহনজীর
অবস্থা দেখে কাঁদতে কাঁদতে বললেন রাধাজী।
“এম.. .. .. .. .. .. .. রাধা
জী …… ... এর ...... তথ্য ....... দেব
...... দেব।” এই শেষ কথাগুলো
বলে মোহনজী চিরকালের জন্য চুপ হয়ে গেলেন।
পাথরের মূর্তি হয়ে ওঠা রাধাজী মোহনবাবুর দেহের দিকে
তাকিয়ে রইলেন। মোহনবাবুর
মৃতদেহের পাশে রাধাজী বসে থাকতে দেখে ঠাকুর সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি রাধাজীর কাছে গেলেন। তারপর ওকে কাঁধে নাড়িয়ে বলল-
"রাধা, কি হয়েছে তোমার রাধা? তোমার
এই অবস্থায় এখানে আসা উচিত হয়নি। চল
তোমাকে রুম পর্যন্ত পৌছে দেই।”
রাধাজী এক নিমিষেই উঠলেন। তারপর ঠাকুর সাহেবের দিকে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে
বললেন - "শুনেছ... মোহনজী কি বলছিলেন?... আমার স্বামী
দেবতা নন।”
“রাধা...! কি হয়েছে রাধা তোমার?”ঠাকুর সাহেব রাধাজীর অবস্থা দেখে
আতঙ্কিত হয়ে বললেন - "রাধা আমাকে বিশ্বাস কর, আমি
তার জীবন নিতে চাইনি।”
প্রত্যুত্তরে রাধাজী ঠাকুর সাহেবের দিকে ব্যথিত চোখে
তাকাতে লাগলেন, তখন তাঁর চোখে এমন ক্ষোভ ছিল যে ঠাকুর
সাহেব দেখা মাত্রই ভিতর থেকে ভয় পেয়ে গেলেন।
“রাধা.......হুশে এসো রাধা।” ঠাকুর সাহেব কেঁপে কেঁপে বললেন।
“আমার স্বামী দেবতা নন। তিনি নির্দোষ মোহনকে হত্যা করেছেন।” রাধা বিড়বিড় করল।
রাধাজির মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল। একই শব্দ বারবার রিপিট করছিল। "আমার স্বামী দেবতা নন।”
এই কথাটি বারবার বলতে গিয়ে রাধাজী হঠাৎ হাসতে লাগলেন। ঠাকুর সাহেব রাধাজীর দিকে পাগলের মত
তাকাতে লাগলেন। রাধাজীর হাসি
ক্রমশ উচ্চতর হতে থাকে। এবং তারপর
এটি অট্টহাসিতে পরিণত হয়।
আমি বিস্মিত ও বিহব্বল হয়ে কখনো মোহন বাবুর মৃতদেহের
দিকে কখনো পাগলের মত হাসতে থাকা রাধাজীর দিকে তাকাতে থাকি।
মোহন বাবুর মর্মান্তিক মৃত্যু রাধাজীকে পাগল করে
দিয়েছিল। ঠাকুর
সাহেবের দ্বারা পাপ হয়েছিল... কিন্তু গত ২০ বছর ধরে রাধাজিকে দেবীর মতো কষ্ট পেতে
হয়েছে।
সেই দুর্ঘটনায় আমি এতটাই অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম যে
আমার একটুও হুশ ছিল না। পাথরের
মূর্তি হয়ে পুরো ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কখনো রাধাজির কথা ভাবতাম আবার কখনো মোহন বাবুর কথা। মনে মনে মোহন বাবু আর রাধাজির মধ্যে
সন্ধ্যাবেলা সেই সব কথা মনে পড়ছিল, বেঁচে থাকার সময়ের
কথা।
সন্ধ্যায় তারা কত খুশি ছিল এই ভেবে যে দুদিন পর সে তার
বাড়িতে ফিরে যাবে এবং আপনাদের সাথে দেখা করতে পারবে। রাতের খাবারের সময়ও তার মুখে একই রকম আনন্দ ছিল। আজ রাতটা যে তার জীবনের শেষ রাত হতে
পারে তার কোন ধারণাই ছিল না। তার
পরিবারকে দেখতে পাওয়ার আনন্দে চোখ জ্বলে উঠল। কে জানত সেই একই চোখ কিছুক্ষণের মধ্যেই চিরতরে বন্ধ
হয়ে যাচ্ছে।
এক নিমিষেই যে সব নষ্ট হয়ে যাবে তা ভাবিনি। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। একটু আগে জেগে থাকা মোহন বাবু এখন
আমার সামনে একটা লাশ পড়ে আছে।
ঠাকুর সাহেব রাধাজীকে সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। রাধাজি একটু শান্ত হলে ঠাকুর সাহেব
তাকে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর
হলের সেই জায়গায় এসে পড়ল যেখানে পড়ে ছিল মোহনবাবুর প্রাণহীন দেহ।
“এই লাশটা ফেলতে হবে, দিওয়ান
জি, সেটাও রাতারাতি।
“হ্যাঁ মালিক...”আমার
মুখ থেকে বেরিয়ে এল। আদেশের জন্য ঠাকুর
সাহেবের মুখের দিকে তাকাতে লাগলাম।
“স্টোররুমে নিয়ে যাই। মেঝেটা এখনো কাঁচা আছে। সেখানে একটা গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দেব।” ঠাকুর সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
আমার ঘাড় আপনা থেকেই কাঁপতে লাগলো।
“দেওয়ান জী, এই
কথাটা নিজের কাছেই রাখ। নইলে তুমিও
আমার সাথে জড়িয়ে পড়বে।” ঠাকুর সাহেব
আমাকে সাবধান করলেন।
আমার ঘাড় আবার নাড়ল হ্যাঁ।
আমার সম্মতি পাওয়ার সাথে সাথে ঠাকুর সাহেব মোহন বাবুর
লাশ মাথার পাশে তুলে নিলেন..... তারপর আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় ইঙ্গিত
করলেন লাশ তুলতে। আমি অ্যাকশনে
ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমি মোহন
বাবুর পায়ের কাছে এসে ওর পা ধরে ওকে তুলে নিলাম। মোহন বাবুর লাশ তুলে আমরা ধীরে ধীরে স্টোর রুমের দিকে
এগোলাম।
স্টোর রুমে পৌঁছে লাশ নামিয়ে দিলাম। তারপর গর্ত খননের জন্য হাতিয়ার
খুঁজতে লাগলেন। পাশের এক
কোণে পড়ে ছিল শ্রমিকদের মালামাল। মাটি
খুঁড়তে আমি পিক তুলে নিলাম আর ঠাকুর সাহেব কোদাল তুলে নিলেন।
আমি কাঁচের তৈরি মেঝেটা একবার দেখে নিলাম, তারপর
আমার পুরো শক্তি ব্যবহার করে মেঝেতে গাঁটি মারতে লাগলাম।
“ঠক্ ... ঠক্ ...।” ঢাকঢোলের আওয়াজ... সারা প্রাসাদে
প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, রাতের নীরবতা ছিঁড়ে। আওয়াজ যাতে বাইরে না যায় সেজন্য
আমরা প্রাসাদের সব জানালা-দরজা বন্ধ করে রেখেছিলাম।
আমি ঘামে ভিজে একটা গন্টলেট চালাচ্ছিলাম। গন্টলেটের শব্দের পাশাপাশি, কখনও
কখনও রাধাজীর চিৎকার এবং অট্ট হাসিতে প্রাসাদ প্রতিধ্বনিত হত।
যখনই তার চিৎকার বা হাসি আমাদের কানে পড়ত, আমাদের
লোম দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু আমরা
তা বিবেচনা না করে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি মাটি খুঁড়তে থাকি আর ঠাকুর সাহেব মাটি তুলতে থাকেন। প্রায় ৩ ঘন্টার অক্লান্ত পরিশ্রমের
পর আমরা এমন একটি গর্ত খনন করি যাতে আমরা মোহন বাবুর লাশ দাফন করতে পারি।
মোহন বাবুর মরদেহ দাফন শেষে আমরা আবার হলে এসে মোহন
বাবুর রক্ত হলের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলাম। আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই সেই কাজ শেষ করি। এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমি যে অবস্থায়
ছিলাম তা শুধু আমি জানতাম।
মোহন বাবুর খুনের সমস্ত প্রমাণ মুছে দিয়ে আমি আমার
বাড়িতে ফিরে আসি।
মোহন বাবুর মৃতদেহের পাশাপাশি তাঁর মৃত্যু রহস্যও
চিরদিনের জন্য প্রাসাদের নীচে চাপা পড়ে রইল। রাতে প্রাসাদে কী ঘটেছিল তা কারোরই ধারণা ছিল না। কতজন কারিগর কাজ করতে এসেছিলেন আর
কতজন ফিরে গেছেন তা গ্রামের কেউই জানতে পারেনি। কারিগরদের কাজের সঙ্গে গ্রামবাসীদের কোনো সম্পর্ক ছিল
না, নাম-ঠিকানাও ছিল না। হ্যাঁ... কিন্তু একটি নতুন খবর যা গ্রামবাসীদের কানে
পৌঁছেছিল তা হল রাধা দেবী পাগল হয়ে যাচ্ছেন। যে রাধাজি একদিন আগে প্রাসাদে এসেছিলেন, হঠাৎ
রাতারাতি পাগল হয়ে গেলেন তার কী হল তা কেউ জানতেই পারেনি?
মানুষ হতবাক এবং বিচলিত ছিল। ঠাকুর সাহেবের দুঃখে ব্যথিত বোধ করে, কেউ
জানতে পারল না এই সব কিভাবে হল? হয় আমি
লোকেদের উত্তর দিতে পারতাম না হয় ঠাকুর সাহেব।”
কথা শেষ করে দেওয়ান জি কমলাজির দিকে তাকাল। কমলার চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা বয়ে
গেল। যা থামার নামই নিচ্ছিল না। কমলা জিকে কাঁদতে দেখে দেওয়ান জি তার
সাফল্যে মনে মনে হাসলেন।
“বোনজি ..... সম্ভব হলে ক্ষমা
করবেন।” দেওয়ান জি শোক করে বললেন- "তখন
আমি অসহায় ছিলাম। ঠাকুর সাহেবকে
সাহায্য করা আমার বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমার স্ত্রী হাসপাতালে ছিলেন। আমার অর্থের ভীষণ প্রয়োজন ছিল। তাকে সাহায্য করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। আমি আমার অবস্থান ভুলে তার বিরোধিতা
করেছিলাম, আমি তার ক্ষতি করার মতো কিছুই পেতাম
না। আমি বেশি কিছু না ভেবে সে যা
বলে তাই করতে চলে যাই।
“আপনার প্রতি আমার কোন অভিযোগ
নেই, দিওয়ান জি, উল্টো, আমি
আপনাকে ধন্যবাদ জানাই আমার সামনে এই গোপন কথাটি খোলার জন্য। নাহলে আমি সারাজীবন ভাবতাম যে আমার স্বামী কাজে গেছে
এবং অবশ্যই ফিরে আসবে এক দিন।” কমলা জী কাঁদছিলেন।
কমলা জিকে কাঁদতে দেখে দিওয়ান জির ঠোঁটে হাসি ভেসে উঠল। তার কৌশল কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে।
“কিন্তু আমি ঠাকুর সাহেবকে
ক্ষমা করব না, দিওয়ান জি।” কমলা জী তার চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন - "সে
বুঝতে পেরেছে যে এত বড় অপরাধ করার পরেও সে রক্ষা পাবে, তাহলে
এটা তার ভুল। আমি তাকে
জেলের বাতাস খাওয়াব।”
“না, বোনজি, আপনি
আইনত তাদের ক্ষতি করতে পারবেন না।” দিওয়ানজি
তাকে বাধা দিয়ে বললেন - "ব্যাপারটা অনেক পুরনো, এখন
তো মোহন বাবুর দেহাবশেষও মাটিতে পাওয়া যাবে না। আমরা তাকে দোষী প্রমাণ করতে পারব না।”
“তাহলে আপনি কি চান আমি তাকে
আমার স্বামীর খুনের জন্য মাফ করে দিব?” দেওয়ান
জির দিকে প্রশ্নাতীত চোখে তাকিয়ে বললেন কমলাজি।
“মোটেই না....”দিওয়ান
জি ক্ষোভের সাথে বললেন - "তার অপরাধ ক্ষমার যোগ্য নয়। তাকে শাস্তি দি... তবে এমন শাস্তি যা মৃত্যুর চেয়েও
জঘন্য।”
“তাহলে আপনি দেওয়ান জি বলুন, আপনি
যা বলবেন আমি তাই করব। কিন্তু আমি
তাকে ক্ষমা করব না।” কমলা জি তার
চোয়াল নাড়তে নাড়তে বলল।
“তার সবচেয়ে বড় শাস্তি হবে আপনি
কাঞ্চনকে তোমার পুত্রবধূ বানাতে রাজি নন। জীবনের
অর্ধেকটা কেটেছে রাধাজীর দুঃখে কেঁদে, বাকি অর্ধেক
জীবন এখন কাটবে সেই রাধাজীর কন্যা দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে।” দিওয়ান জি মুচকি হেসে বললেন।
“এখন কাঞ্চনকে আমার পুত্রবধূ
বানানোর কথা ভাবতেও পারি না। যার
বাপ আমার মাংয়ের সিঁদুর নষ্ট করে দিয়েছে, আমি কিভাবে
তার মাং আমার ছেলের হাতে ভরিয়ে দেব। এখন
সে কখনো পুত্রবধূ হতে পারবে না। কখনই না...” কমলাজি দৃঢ় ভাষায় বললেন।
কমলাজীর শেষ কথা শুনে দিওয়ান জি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার বাম তীরটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত
করেছিল।
“কমলা জি, যদিও
আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ, তবুও, যখনই
আপনার আমার সাহায্যের প্রয়োজন হবে, আপনি অবশ্যই
আমাকে স্মরণ করবেন। আমার ঘরের
দরজা সবসময় আপনার জন্য খোলা থাকবে।” দিওয়ান জি
কমলাজিকে তার বাড়িতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।
“আপনি আমাদের পক্ষে থাকবেন, দিওয়ান
জি। যাই হোক, এই
গায়ে আপনি ছাড়া আমাদের কেউ নেই।”
“আপনি যাও, বোনজি
আর রবিবাবুকে নিয়ে আসুন। আজ থেকে এই
বাড়িটা আপনার নিজের বাড়ি।”
দেওয়ান জিকে ধন্যবাদ জানিয়ে কমলা জি উঠে গেলেন এবং
দেওয়ানজির ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
তিনি চলে যাওয়ার সাথে সাথে দেওয়ান জি তার স্ত্রী
রুকমণির সাথে কথা বললেন। “এখন
আমার প্রতিশোধ শেষ, রুকমণি। নিশ্চয়ই শুনেছে যে মানুষও এক তীর দিয়ে দুটি নিশানা
ছুঁড়ে, কিন্তু আজ আমি একটি তীর দিয়ে তিনটি গুলি করেছি। তিনটি..."
রুকমণি দিওয়ান জির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু
তার কথার অর্থ বুঝতে পারল না।
“বুঝলাম না... “
দেওয়ানজি অবাক হয়ে রুকমণির দিকে তাকিয়ে বললেন “আজ কমলাজীকে তার স্বামীর মৃত্যুর
রহস্য জানিয়ে আমার তিনটি উপকার হয়েছে। প্রথমত, আমি
কমলার বিশ্বাস অর্জন করেছি। দ্বিতীয়ত, বিচ্ছেদ। চিরকাল রবির কাছ থেকে কাঞ্চন। আর তৃতীয় সুবিধা...” দিওয়ান জি মৃদু হাসলেন ”তৃতীয়
সুবিধা হল সেই নিমক হারাম সুগনা দিয়ে নিক্কির ধ্বংসের প্রতিশোধ নিলাম। ঠাকুর সাহেব যতটা পেয়েছেন কাঞ্চনের
কাছ থেকে। আরও কত গুণ
সুগনা। এখন সে জানবে তার নিজের হৃদয়ে
কি যায় যখন তার জীবনের প্রিয় কিছু কষ্ট দেয়। সে কান্না, কান্না ছাড়া
কিছুই করতে পারবে না।”
৪৪
কমলাজী প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। হলঘরে বসে ঠাকুর সাহেব, কাঞ্চন
আর রবি চা পান করছিলেন। ঠাকুর
সাহেবের দিকে তাকালেই কমলাজীর মুখ শক্ত হয়ে উঠল। তার সারা শরীরে ঘৃণার স্ফুলিঙ্গ বয়ে গেল।
ঠাকুর সাহেব কমলাজীকে হলের দিকে আসতে দেখতেই সোফা থেকে
উঠে নমস্কার করলেন। কিন্তু ঠাকুর
সাহেবের নমস্কার উত্তর না দিয়ে কমলা মুখ ফিরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ঠাকুর সাহেব বিস্ময়ে কমলাজীর চলে যাওয়া দেখতে থাকলেন। কমলাজীর এই আচরণে তিনি খুব অবাক হলেন। হঠাৎ কমলাজির কী হল সে বুঝতে পারল না।
কাঞ্চন আর রবির অবস্থাও একই। কাঞ্চন আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। সে কমলা জিকে সবসময় ভয় পেত। কিন্তু মায়ের এই অসভ্য আচরণের কারণ
জানতে রবি তাকে অনুসরণ করে তার ঘরে চলে গেল।
“কি ব্যাপার মা?” রবি
ঘরে ঢুকতেই কমলাজিকে জিজ্ঞেস করলেন - "তুমি ঠাকুর সাহেবের নমস্কারের উত্তর না
দিয়ে উঠে এসেছ। আপনি তাকে
এভাবে অপমান করেছ কেন? বলো তিনি কোনো ভুল করেছেন?"
“যে ঠাকুর, রবি, যার
পাশে তুমি বসেছিলে, তার জন্য অপমান-অপমান শব্দ নেই। এই সেই ব্যক্তি যে নিজের মিথ্যা
অহংকার বজায় রাখতে তার স্ত্রী-কন্যাকেও বলি দিতে হবে।”
“কি বলছো মা?” রবি
আস্তে আস্তে বললো কিন্তু অবাক হয়ে কমলা জির দিকে তাকিয়ে আছে।
“রবি, তুমি
ছোটবেলা থেকে তোমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করতে, কোথায় গেছে
না? কেন সে আমাদের সাথে দেখা করতে আসে না? আর
আমি তোমাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতাম। আমি
নিজেও অনেক বছর ধরে মিথ্যা আশা নিয়ে বেঁচে ছিলাম। মন বলছিল তোমার বাবার সাথে অপ্রীতিকর কিছু হয়েছে। কিন্তু আমি কখনো নিরাশ হইনি, তার
জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু আজ ২০
বছর পর দেখা গেল কেন তিনি ফিরে আসেননি।
“কি ..... তাহলে পিতাজি মাকে
চিনতে পারলেন? পিতাজি কোথায় আর এত বছর ফিরে আসেননি
কেন?” রবি উদ্বিগ্নভাবে মায়ের মুখের দিকে
তাকিয়ে বলল। ছোটবেলা
থেকেই তার বাবার সম্পর্কে জানার আকাঙ্ক্ষা ছিল এবং এই সময়ে সে পাগল হয়ে যাচ্ছিল।
রবির হতাশা দেখে কমলা জি হাহাকার করে উঠলেন। সে ভেজা চোখের পাতায় রবির দিকে
তাকাতে লাগল।
“উত্তর দাও মা .... কিছু বল।” রবি মাকে চুপ করে দেখে আবার জিজ্ঞেস
করল।
“সে ফিরে আসতে পারেনি কারণ
রবি... ২০ বছর আগে ঠাকুর সাহেব তাকে মেরে ফেলেছিলেন।”
“কে ... কি?” রবি
অশ্রুসজল চোখে মায়ের দিকে তাকাতে লাগল। যা
শুনে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তার - "কি বলছো মা? পিতাজীর
খুন হয়েছে... তাও ঠাকুর সাহেবের হাতে...?"
“হ্যাঁ রবি, এটাই
সত্যি।” জবাবে, কমলাজি
দেওয়ান জির মুখ থেকে শোনা সমস্ত কথা রবির সামনে পুনরাবৃত্তি করলেন।
বাবার ভাগ্য জেনে রবির রক্ত ফুটে ওঠে। রাগ এমনভাবে বেড়ে গেল যে তার মন
চাইছিল এখন গিয়ে ঠাকুর সাহেবের গলায় দম বন্ধ করে। কিন্তু কমলাজির প্ররোচনায় তিনি থামলেন।
কমলা জি তার স্বামীকে হারিয়েছিলেন কিন্তু ছেলেকে
হারাতে চাননি। বাড়ি থেকে
এত দূরে একা ঠাকুর সাহেবের মুখোমুখি হওয়া তাঁর পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে।
“এখন আমরা এই বাড়িতে থাকব না, রবি। যে ঘরের দেয়ালে আমার স্বামীর রক্তের
ছিটা পড়েছে সেই বাড়ির বাতাসও আমার জন্য বিষ। আমরা আজ আমাদের বাড়িতে ফিরে যাব।”
রবি কিছু বলল না। সে
কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে ছিল না, কমলাজির কথা
কাটার সাহসও তাঁর ছিল না।
কমলা জি তাড়াহুড়ো করে তার মালপত্র গোছাতে লাগলেন। তাদের লাগেজ গোছাতে দেখে রবিও তার
জামাকাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র তার স্যুটকেসে ভরতে শুরু করে।
প্রায় ২০ মিনিট পর দুজনেই তাদের জিনিসপত্র তুলে ঘর
থেকে বেরিয়ে এলো। কাঞ্চন আর ঠাকুর
সাহেব তখনও হলঘরে বসে আছেন। দুজনেই
তখনও ভাবছিলেন কমলাজির কী হয়েছিল। হঠাৎ
তার আচরণ কেন বদলে গেল?
কাঞ্চন চিন্তায় শুকিয়ে গেল। সে সবসময় কমলাজিকে ভয় পেত। জানেনা কি নিয়ে সে রেগে যায়। সর্বদা চেষ্টা করে যে তার কাছ থেকে এমন কোনও ভুল না করা
যা কমলাজিকে রাগান্বিত করবে। কিন্তু
আজ যখন কমলাজির অভদ্র আচরণ দেখল, তখন ভাবনায়
পড়ে গেল। কমলাজির
সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা হয়েছিল রাতে। তারপর
থেকে এখন পর্যন্ত, সে সব কথা মনে করতে শুরু করে এবং কখন
কোথায় ভুল করেছে তা জানার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু লক্ষ চিন্তা করেও নিজের ভুল দেখেনি।
কাঞ্চন তখনো তার চিন্তায় ছিল সেসময় কমলাজি এবং রবিকে
সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে। হাতে থাকা
স্যুটকেসের দিকে তাকাতে তার হুঁশ উড়ে গেল। অপ্রীতিকর
কিছু ভাবতেই তার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল।
ঠাকুর সাহেবের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। কমলাজী ও রবিকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে
দেখে তার মুখের রংও উড়ে গেল। সে
অবাক চোখে তাদের দুজনকেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখছিলেন।
সিঁড়ি দিয়ে হলের মধ্যে নামার সাথে সাথে ঠাকুর সাহেব
ছুটে গেলেন তাদের কাছে। “বেহান
জী এই সব....? এই সময়ে কোথায় যাচ্ছেন?"
ঠাকুর সাহেবের অনুরোধে কমলাজীর মনে এলো যে, তার
ভিতরে যা কিছু বিষ আছে, তার সবটুকু তার গায়েই ছিটিয়ে দেওয়া
উচিত। কিন্তু তাকে শুধু এক চুমুক
রক্ত পান করান হয়েছিল। রাগের বশে
তাকে বেশি কিছু বলা হয়নি। দুই
কথায় তিনি উত্তর দিলেন- "আমরা প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এখন আমরা এখানে থাকতে পারব না।”
“কে ... কি? কিন্তু
কেন? আমরা কি কোনো ভুল করেছি?"
“আপনি কি সত্যিই জানেন না আপনি
কি ভুল করেছেন?” তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললেন কমলাজী। - "আপনি যা করেছেন তা ভুলে
যাওয়াটা অপমান হবে, ঠাকুর সাহেব, আপনি
পাপ করেছেন... পাপ।”
ঠাকুর সাহেবের মাথা খারাপ হয়ে গেল। কমলাজি কী পাপের কথা বলছেন তা তিনি
বুঝতে পারলেন না। রাতারাতি তার
কী পাপ হয়েছে, যার জন্য কমলাজী রাজবাড়ি ছেড়ে
যাচ্ছেন। কিছু না বুঝতে
পেরে সে জিজ্ঞেস করলো - "আমি আসলেই বুঝতে পারছি না, বোনজি, কি
বলছেন?"
মোহন কুমারের কথা মনে আছে?
“এম ... মোহন কুমার...?” ঠাকুর
সাহেব গভীরভাবে মর্মাহত হলেন। সে
স্তব্ধ হয়ে বললো - "আ... কোন মোহন কুমারের কথা বলছেন?"
“আমি সেই মোহন কুমার কারিগরের
কথা বলছি যাকে আপনি প্রাসাদে কাঁচের কাজ করার জন্য ডেকেছিলেন। এটি তৈরি করতে।
যাকে আপনি খুন করেছেন।”
“আআ... আপনি...”ঠাকুর
সাহেবের জিভ থমকে গেল। মুখের সামনে
একটা কথাও শোনা যাচ্ছিল না। তার
মনে হল যেন প্রাসাদের পুরো ছাদ তার মাথায় পড়ে গেছে।
“হ্যাঁ, আমি
সেই মোহন কুমারের বিধবা।”
ঠাকুর সাহেব কমলা জির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কাঞ্চনও বাকরুদ্ধ। কমলাজির কথা শুনে সে গভীরভাবে মর্মাহত হলেন। সে স্বপ্নেও ভাবেনি তার বাবা ঠাকুর
জগৎ সিং, যাকে গোটা গ্রাম দেবতা বলে মনে করে, কারো
রক্তে তার হাত রাঙা হতে পারে।
কাঞ্চন এই সত্য প্রকাশে হতবাক। ঠাকুর সাহেবের উপরে যে পর্বত ভাঙা হয়েছিল তার চেয়েও
বড় পাহাড় কাঞ্চনে ভেঙ্গে গেল। সোজা
কথায়, তার পুরো পৃথিবী লুট হয়ে গিয়েছিল।
ভাবতে থাকে এখন সে রবিকে চিরতরে হারিয়েছে। কমলাজী তাকে আর কোনো মূল্যে পুত্রবধূ
হিসেবে গ্রহণ করবেন না, সে শুকনো পাতার মতো কেঁপে উঠন। এই সময় তার অবস্থা এমন ছিল যে সে
রবির কাছে মিনতি করা থেকে দূর তার দিকে তাকাতেও পারে না। সে কেবল ভিতরে তার ভাগ্যের জন্য কাঁদছিল।
তবুও সাহস নিয়ে রবির দিকে তাকাল। রবির চোখও স্থির ছিল কাঞ্চনের দিকে। কিন্তু কাঞ্চনের সঙ্গে দেখা হতেই মুখ
ফিরিয়ে নেয়। কাঞ্চনের চোখ
জলে ভরে গেল।
ঠাকুর সাহেবের কিছু বলার ছিল না। আর কিছু ভুল হলেও কমলাজিকে বলার সাহস পেত না। তিনি একটি পাথরের মূর্তি পরিণত
হয়েছিল।
যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন, কমলাজি
এবং রবি প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেছেন। ঠাকুর
সাহেব ঘুরে কাঞ্চনের দিকে তাকাতে লাগলেন। কাঞ্চনের
চোখে জল। কাঞ্চনকে
কাঁদতে দেখে তার হৃদয়ে একটা করাত গেল। কিন্তু
কাঞ্চনের সামনে দুটো কথা বলার আগেই... কাঞ্চন মন খারাপ করে নিজের রুমের দিকে চলে
গেল। ঠাকুর সাহেবের মাথা নত হয়ে
গেল অপরাধবোধে। সে ধপাশ করে
সোফায় ছড়িয়ে পড়ল।
৪৫
কমলা জি এবং রবি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসতেই দিওয়ান জি
তাদের কাছে ছুটে এলেন।
“আমাকে দিন, বোনজি। আমি যাবো। আপনার উপস্থিতিতে আমার ঘর পবিত্র হবে।” দিওয়ান জি জ্বলজ্বল চোখে বললেন এবং
কমলা জির কাছ থেকে স্যুটকেস নিতে শুরু করলেন।
“আমরা আমাদের বাড়িতে যেতে চাই, দিওয়ান
জি। এখন আমরা এই গ্রামে থামক না।”
কমলা জির কথা শুনে দিওয়ান জির হুঁশ উড়ে গেল। সে তার প্ল্যান ব্যর্থ হতে দেখে সাথে
সাথে একটা কথা বলল - "এভাবে বলবেন না বোনজি, কয়েকদিন
আমাদের বাড়িতে থাকুন। আমাদের আপনার
সেবা করার সুযোগ দিন। আমিই মোহন
বাবুকে নিয়ে এসেছি। দিন। অন্তত ২ দিনের জন্য কিন্তু মানা করবেন
না।”
কমলা জী রবির দিকে তাকাতে লাগলেন।
দিওয়ান জি রবির কাছে এখন ঠাকুর সাহেবের মতো ছিলেন। সে ঠাকুর সাহেবের চেহারাও এখন পছন্দ
করত না, দেওয়ান জিরও না। কিন্তু কেন জানিনা তার মনও চাইছিল যে সে যেন এখন গ্রাম
ছেড়ে না যায়। কিছু বন্ধন
ছিল যা তাকে বাধা দিচ্ছিল। সে
সম্মতিতে মাথা নেড়ে বলল - "দিওয়ান জি ঠিক বলেছেন, মা। আমাদের কয়েকদিন অপেক্ষা করা উচিত।”
কমলার মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু না না বলেও সে দিনের জন্য থাকতে রাজি হল।
তার হ্যাঁ দেখে দেওয়ান জির মুখ খুশিতে ভরে উঠল। তিনি কমলাজির জিনিসপত্র তুলে নিয়ে
বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। রবি
ও কমলাজীও তাঁকে অনুসরণ করল।
দিওয়ান জি তাদেরকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। রবি অনেকক্ষণ কমলাজির সঙ্গে বসেছিল, তাকে
সান্ত্বনা দেয়। কমলাজি
দুপুরের খাবারও খাননি। কিছুক্ষণ পর
ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরে এবং বিশ্রামের প্রয়োজনে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তাকে বিশ্রাম নিতে দেখে রবিও তার ঘরে
চলে গেল।
রবি বিছানায় শুয়ে কাঞ্চনের কথা ভাবছিল। প্রাসাদ ত্যাগ করার সময় বারবার চোখের
সামনে ভেসে উঠছে তার বিবর্ণ রূপ। সে
ভাবল- "এতে কাঞ্চনের কি দোষ.... সে তো কিছু করেনি। সে সুগনার ঘরে বড় হয়েছে। সে প্রাসাদের প্রতিটি পাপ আর ছলনা থেকে দূরে থেকেছে। তাহলে তাকে কেন শাস্তি দেব? কেন? তার
অপরাধ যদি এটাই হয় যে সে ঠাকুরের মতো একজন হত্যাকারীর কন্যা, তবে
আমার ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে তাকে জন্ম দিয়েছে রাধার মতো দেবী।”
রাধাজির কথা স্মরণ করার সাথে সাথে তার চিন্তার বৃত্ত
ঘুরতে থাকে। "রাধাজী, তার
চিকিৎসাও অসম্পূর্ণ, কী ভরসা দিয়ে তাকে ছেড়ে যাবো? ডাক্তার
হওয়ার দায়িত্ব কি এটাই? না... এই মুহূর্তে তার চিকিৎসার
প্রয়োজন, এমন অবস্থায় আমি যেতে পারব না। এ ব্যাপারে আমাকে মায়ের সাথে কথা
বলতে হবে।”
রবি উঠে মায়ের ঘরে ঢুকলো। কমলাজী ঘুমিয়ে ছিলেন। রবি তার পায়ের কাছে বসে তার জেগে ওঠার জন্য অপেক্ষা
করতে লাগল।
অনেকদিন পর কমলাজীর চোখ খুলল।
“কেমন আছো মা?” তাকে
জেগে উঠতে দেখে রবি বলল - "মা আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।”
“হ্যাঁ বল...।” কমলা উঠে বসে বলল।
“মা, আমি
আরও কয়েকদিন এখানে থাকার কথা বলছিলাম।”
“কেন .... কাঞ্চনের ভূত কি এখনো
তোর মন থেকে নেমে যায়নি?"
“এতে ওর কি দোষ, মা? সে
তো কিছু করেনি। গ্রামে বেড়ে
ওঠা একটা গরীব মেয়ে। প্রাসাদের
লোকেদের সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে
ওকে এই শাস্তি দেব কেন?"
“রবি
চুপ কর।” কমলাজী চোখে
জল নিয়ে বললেন - "আর কখনো সেই মেয়ের নাম তোর জিহ্বায় আনবি না, যদি
আমি তাকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি, সেই মেয়েটি
সারা জীবন আমার বুকের শূলের মতো কাঁটতে থাকবে। সে খুনির মেয়ে। খুনি
যে আমার মাং এর সিঁদুর নষ্ট মুছে দিয়েছে। আমি
তার ছায়াকেও ঘৃণা করি।”
“আর রাধাজি? তাকেও কি একইভাবে ঘৃণা কর। বাবার মৃত্যু তাকে এতটাই ব্যথিত
করেছিল যে সে তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। যিনি বেঁচে নেই, মারাও
যাচ্ছেন না, গত ২০ বছর ধরে বন্ধ প্রকোষ্ঠে শুয়ে
আছেন। তোমার কি একই রকম চিন্তাভাবনা তার
সম্পর্কে?"
কমলাজি চুপ করে রইলেন। রাধাজির কথা মনে পড়তেই তার রাগ এক মুহূর্তে মিলিয়ে
গেল। “ওই
দেবীর প্রতি আমার সহানুভূতি আছে...কিন্তু বেটা...!"
“মা ... রাধাজী'র
কথা ভাবো। তার সারা
জীবন কেটেছে একটি বদ্ধ ঘরে কোনো অপরাধ না করেই। তুমি কি চাও যে সে নির্দোষ হয়েও একদিন এভাবে মরুক? মা
যখনই তার ঘরে থাকি। আমি ওর চোখে একটা অদ্ভুত ব্যাথা দেখি। কিন্তু আমার দিকে চোখ পড়তেই ওর শুকনো
মুখে খুশির রেশ নেমে আসে। ব্যাপার কি
জানি, কিন্তু ওকে দেখে তোমার কথা মনে পড়তো। তাকে ভাল করতে পারে সে আর কেউ নয় আমি। হ্যাঁ, অন্তত
একজন ডাক্তার হয়েও আমি তাকে মরার জন্য ছেড়ে যেতে পারি না।”
“ঠিক আছে রবি, সে
সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তুই তার চিকিৎসা কর। আমরা
এই গ্রামেই থাকব।” কমলাজী আবেগে
বললেন।
“ধন্যবাদ মা।” রবি তাকে বুকে লাগিয়ে বলল।
“কিন্তু কাঞ্চন সম্পর্কে আমার
সিদ্ধান্ত এখনও একই। আমি তাকে
কখনই আমার বাড়ির পুত্রবধূ বানাবো না।”
রবি কমলাজীর এই বিষয়ে নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করল।
৪৬
তখন সন্ধ্যা ৫ টা। কাঞ্চন তার ঘরে বসে ছিল উদ্বিগ্ন হয়ে। টিভির আওয়াজ তুলে টিভি দেখতে ব্যস্ত
চিন্টু।
আজকের ঘটনার দৃশ্য কাঞ্চনের মনে বাজছিল। কমলার মুখ থেকে শোনার পর যে তার বাবা ২০
বছর আগে রবির বাবাকে খুন করেছে তাতে তার
কোমল হৃদয়ে আঘাত লেগেছিল। তার
বাবা একজন খুনি, এমন একটি প্রাসাদ যেন আর তৈরি না হয়
সেজন্য রবির নিরীহ বাবাকে খুন করে। এই
অনুভূতিগুলো তার ভেতর থেকে তাড়িত হচ্ছিল। প্রচণ্ড
দমবন্ধ হতে শুরু করল সে।
“আমি আর এখানে থাকব না।” সে মনে মনে বললো- "জানি না স্যারের
মনের কি অবস্থা। তিনি আমাকে
নিয়ে কি ভাববেন..... আমি কতটা হৃদয়হীন নই, যে প্রাসাদে
তার বাবার রক্ত ঝরেছে, আমি সেখানে থাকি। একই বাড়িতে আমি
সুখে বসবাস করছি। না..... আমি
এখন এখানে থাকতে পারব না।
কাঞ্চন ভাবনা থামিয়ে চিন্টুর দিকে তাকাল। চিন্টু বসে বসে টিভি দেখছিল।
“চিন্টু...” কাঞ্চন তাকে ডাকল। কিন্তু চিন্টুর কানে কিছুই এখন ঢুকবে
না। কাঞ্চন আবার ডাকল। কিন্তু এবারও চিন্টুর মনোযোগ ভাঙেনি। কাঞ্চন রেগে উঠে ওর হাত থেকে রিমোটটা
কেড়ে নিয়ে টিভির সুইচ অফ করে দিল।
চিন্টু ফুরফুরে মেজাজে বললো- "দিদি টিভি দেখতে দাও
না। কি ভালো ছবি চলছিল।”
“না, এখন
এখান থেকে যাওয়া যাক। আমরা বসতিতে
যাচ্ছি। এখন আমরা এখানে থাকব না।“ কাঞ্চন রাগের পরোয়া না করে চিন্টুর
হাত ধরে রুম থেকে বের করে দিল।
মন্টু হলের মধ্যে হাজির। মন্টুকে বলে সে বসতিতে যাচ্ছে বলে কাঞ্চন প্রাসাদ ছেড়ে
চলে গেল।
প্রাসাদ ছেড়ে বসতির দিকে যাওয়ার সময় চিন্টুর চোখ
বারবার প্রাসাদের দিকে ঘুরছিল। প্রাসাদ
ছেড়ে চলে যেতে তার খুব খারাপ লাগছিল। এখানে
সে সবকিছুর সাথে মজায় ছিল। প্রতিদিনই
পেট ভরে ভালো ও সুস্বাদু খাবার হচ্ছিল, তাজা ফল, গ্লাস
ভর্তি দুধও সকাল-সন্ধ্যা পান করা যেত। গ্রামে
টিভি ছিল না, দিনভর এখানে টিভি দেখতে উপভোগ করছিল।
কিন্তু কাঞ্চন চিন্টুর মনের অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিল
না। সে বসতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, জোর
করে তাকে টেনে নিয়ে গেল হাত ধরে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ কাঞ্চনের মাথায় এল “স্যার আর
মাজি, প্রাসাদ ছেড়ে কোথায় গেলেন? স্যার কি গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন?"
কাঞ্চনের পা থেমে গেল। চিন্টু অধীর আগ্রহে তার দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল বোধহয় দিদি রাজবাড়িতে
ফিরবে।
“আমি এখন কি করব?” নিজেকে
প্রশ্ন করল কাঞ্চন।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবল। প্রথমে সে বাড়ি গিয়ে বাবাকে সব খুলে বলতে চেয়েছিল
এবং বাবাকে স্টেশনে পাঠাতে চেয়েছিল রবি ও মাজিকে বোঝাতে। হয়তো সেই মানুষগুলো এখনো আছে। কিন্তু পরের মুহুর্তে সে ধারণা পেল যতক্ষণ না সে বাড়ি
গিয়ে বাবাকে বলবে এবং যতক্ষণ না তার বাবা স্টেশনে আসবে। ততক্ষণ স্যার আর মাজি ট্রেনে বসে বাড়ি চলে যাবেন।
সে নিজেই স্টেশনে যাওয়ার কথা ভাবল। সে দ্রুত চিন্টুর দিকে ফিরল। এবং স্টেশনের পথে এগিয়ে চলল। কাঞ্চন স্টেশনে পৌঁছল। তার তৃষ্ণার্ত চোখ এদিক ওদিক ছুটতে
থাকে রবির খোঁজে।
স্টেশন প্রায় ফাঁকা। প্ল্যাটফর্মে কোনো ট্রেন ছিল না। অনেকক্ষণ এখানে-সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও রবিকে কোথাও
দেখতে পায়নি।
রবিকে না দেখে তার মুখে বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে। মনটা কেঁদে উঠল। স্তব্ধ চোখে আবারও চোখ ফেরাল পুরো স্টেশনের দিকে। কিন্তু রবিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
লোহার তৈরি বার্থে বসে সে কাদতে থাকে। চিন্টুর বোঝার কিছু ছিল না। কিন্তু কাঞ্চনকে কাঁদতে দেখে সেও
কাঁদছিল। তখন ট্রেনের
আওয়াজ তার কানে এল। ঘাড় তুলে
সামনের ট্রেনের দিকে তাকাল।
প্ল্যাটফর্মে থমকে দাঁড়াল ট্রেনটি। থামার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের নামিয়ে
ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিছুক্ষণ
আগে যে স্টেশনটি ফাঁকা দেখাচ্ছিল তা এখন মানুষের ভিড়ে ভরে গেছে।
কাঞ্চন কিছু একটা ভেবে উঠে গেল। চিন্টুকে বার্থে বসতে বলে সে নিজেই ট্রেনের কাছে গিয়ে
জানালা দিয়ে ট্রেনের ভেতরে বসে থাকা যাত্রীদের দেখতে থাকে। তার চোখ রবিকে খুঁজছিল।
কয়েক মুহূর্ত কেটেছে যে পিছন থেকে কে যেন ডাক দিল। নাম শুনে কাঞ্চন দ্রুত ঘুরে গেল। কিন্তু বিরজুকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে
দেখে তার সব গতি হারিয়ে গেল।
“কাঞ্চন জি কে খুঁজছ?” বিরজু
তার কালো দাঁত দেখিয়ে একটা ধূর্ত হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আমি স্যারতে খুঁজছি।” কাঞ্চন থেমে বলল।
“স্যার...?” বিরজু
একটা অদ্ভুত স্বরে বলল ”ওহহহ... তাই
বল ডক্টর বাবুর কথা বলছ। আমি তাকে
ট্রেনের ভেতরে বসে থাকতে দেখেছি।”
“সত্যিই কি ভাই...?” কাঞ্চন
খুশিতে কিচিরমিচির করে বললো- "ওর মাও কি সাথে ছিল?"
“হ্যাঁ মাজিও তার সাথে ছিল। তুমি কি তার সাথে দেখা করতে চাও?"
“হ্যাঁ...!” মাথা নেড়ে বলল কাঞ্চন।
“তাহলে আমার সাথে এসো ..... আমি
তোমাকে ডক্টর বাবু ও তার মায়ের সাথে দেখা করিয়ে দেব।”
কাঞ্চন বিরজুকে নিয়ে ট্রেনে ওঠে। রবির সাথে সাক্ষাতের আনন্দে সে বিভোর ছিল। আনন্দে তার চোখ ছলছল করছে। রবির সাথে দেখা করার জন্য সে বুঝতেও
পারেনি যে বিরজু তাকে ধোঁকায় নিচ্ছে এবং সে কোন ঝামেলায় আটক হতে চলেছে।
এটা ছিল বিরজুর এক অযাচিত ইচ্ছা। এর থেকে ভালো সুযোগ হয়তো সে আর কখনোই পেত না। প্রায় গোটা গ্রাম জানত যে বিরজু
দুদিনের জন্য শহরে গেছে। এখন এমন
পরিস্থিতিতে কাঞ্চনকে নিয়ে যে কোনো জায়গায় যেতে পারে। কেউ তাকে সন্দেহ করবে না।
সেও তাই ভেবেছিল। কাঞ্চনকে
দেখে মনে মনে ভাবল সে কাঞ্চনকে নিয়ে শহরে যাবে। কোন দিন তার সাথে শোবে, তারপর
তাকে কোথাও বিক্রি করে গ্রামে ফিরে যাবে।
তার ধারণা প্রায় ঠিক ছিল। শুধু ট্রেন একটু দেরিতে ছাড়ছিল।
৫ মিনিট ট্রেন থামে। আর এখন ৫ মিনিট পূর্ণ হতে চলেছে। ট্রেন যে কোন সময় ছেড়ে যেতে পারে।
কিন্তু কাঞ্চন এ বিষয়ে অবগত ছিল না। সে যে কোনো মূল্যে রবিকে শহরে যাওয়া
থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিল। ট্রেনে
বসা যাত্রীদের মুখের দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকাল সে। সামনে এগুতে থাকে। বিরজু তাকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
সাধারণ ট্রেনের হুইসেল। কাঞ্চন কিছু বোঝার আগেই ট্রেনটা একটা ঝাঁকুনি নিয়ে
ছুটতে শুরু করল। ট্রেন চলতে
দেখে কাঞ্চন হুশ হল। বিরজুকে ডাকে। বিরজু একটু এগিয়ে গেল।
“দেখ, রবিবাবু
এখানে বসে আছেন।” বিরজু
কাঞ্চনকে কাছে ডেকে বলল।
বিদ্যুতের গতিতে কাঞ্চন তার কাছে গেল। সেখানে গিয়ে দেখি রবি আর মা নেই। তাকে দেখে বিরজু মৃদু হাসল।
কাঞ্চন ঘামছিল। কিন্তু
পরের মুহূর্তেই একই গতিতে দরজার দিকে ছুটল কাঞ্চন। বিরজু তার পিছনে দৌড়ে গেল। ততক্ষণে কাঞ্চন দরজায় পৌঁছেছে। ট্রেনের গতি কিছুটা বেড়েছে।
বিরজুও পেছন পেছন দরজায় পৌঁছে গেল। সে আজ যে কোনো মূল্যে কাঞ্চনকে যেতে
দিতে চায়ন। এমন সুযোগ সে
আর কখনো পাবে না।
ট্রেন ছাড়তেই চিন্টু আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে কাঞ্চনকে বিরজুর সাথে ট্রেনে উঠতে
দেখেছিল। কাঞ্চনের
অনুপস্থিতিতে চিন্টুর হেঁচকি শুরু হয়। দাঁড়িয়ে
কান্না শুরু করে।
তখন তার চোখ পড়ে কাঞ্চনের দিকে। বোনকে চলন্ত ট্রেনে যেতে দেখে চিন্টুর ছোট্ট মন কেঁপে
ওঠে। তার বোন তাকে ছেড়ে কোথায়
যাবে? সে কি এখন তার সাথে দেখা করতে পারবে না? দিদি
বলে সিট থেকে লাফ দিয়ে কাঞ্চনকে স্পর্শ করতে, তার
সাথে দেখা করতে, তাকে থামাতে দৌড়ে যায়।
কাঞ্চনের চোখও পড়েছিল চিন্টুর দিকে। প্ল্যাটফর্মে চিন্টুকে এভাবে দৌড়াতে
দেখে কাঞ্চন ঘাবড়ে গেল। সে ঘুরে ফিরে
তাকাল। বিরজু তার পিছনে দাঁড়িয়ে
হাসছিল।
কাঞ্চন আর কিছু দেখতে পেল না... জোরে লাফ দিয়ে ট্রেন
থেকে নেমে পড়ল।
বিরজু হতভম্ব হয়ে গেল।
কাঞ্চন যে এভাবে ট্রেন থেকে লাফ দিতে পারে সে স্বপ্নেও
ভাবেনি। কিন্তু সেও বদ্ধপরিকর যে যাই
ঘটুক না কেন, আজ কাঞ্চনকে তার হাত থেকে ছাড়বে না।
ট্রেনটি এখন স্টেশন ছেড়েছে এবং তার গতিও বেড়েছে। বিরজু দরজা থেকে দুই কদম পিছিয়ে
তারপর প্রবল বেগে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ল।
কিন্তু ভাগ্য আজ তার সাথে ছিল না।
ট্রেন থেকে লাফ দেওয়ার আগে দেখতে পায়নি যে বৈদ্যুতিক
খুঁটি সামনে আসছে। ট্রেন থেকে
ঝাঁপ দিতেই তার মাথা বিদ্যুতের খুঁটিতে আঘাত করে। পিলারে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যায় বিরজু। পড়ে যেতেই সে কিছুক্ষণ তড়পাতে তড়পাতে
চুপ হয়ে গেল। তাকে পড়ে
যেতে দেখে প্ল্যাটফর্মের লোকজন দ্রুত তার দিকে ছুটে আসে।
কাঞ্চনও খোলা চোখে দেখেছিল সেই দৃশ্য। কিন্তু সে এবার চিন্টুকে নিয়ে
চিন্তিত।
ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পর তার হাঁটু ও হাত
মারাত্মকভাবে থেঁতলে গেছে। যেখান
থেকে রক্তের স্রোত বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু
সে তার ব্যথার কথা পাত্তা না দিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তারপর চোখ ফেরাল চিন্টুর খোঁজে।
দেখল চিন্টু তার দিকে ছুটে আসছে। কাঞ্চন এগিয়ে গিয়ে চিন্টুকে কোলে তুলে নিল। চিন্টু তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে
ফেলল। কাঞ্চনও কাঁদতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওর কান্না থামল, তারপর
কাঞ্চন চিন্টুকে নিয়ে ওই দিকে গেল। যেখানে
বিরজু পড়েছিল।
সেখানে মানুষের ভিড় জমে যায়। চিন্টুকে নিয়ে ভিড়ের কাছে পৌঁছে গেল কাঞ্চন। সে এগিয়ে গিয়ে ভিতরে দেখতে লাগল। ভেতরের দৃশ্য দেখা মাত্রই তার হৃদয়
মুখে এসে গেল।
বিরজু মারা গেছে। তার
ভয়ার্ত চোখ খোলা অবস্থায় ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। মাথায় আঘাতের কারণে মাটিতে প্রচুর রক্ত গড়িয়ে পড়েছে। সেই দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখতে পারেননি
কাঞ্চন। ভিড় থেকে বেরিয়ে চিন্টুর হাত
ধরে বাড়ি চলে গেল।
বিরজুর ভয়ঙ্কর মৃত্যু তার নারী মনকে আবেগাপ্লুত করে
তুলেছিল।
৪৬
সন্ধ্যা হয়ে গেল। উঠানে বিছানো খাটে শুয়েছিলেন সুগনা আর দীনেশজী। শান্তা রান্নাঘরে দীনেশজির জন্য খাবার
পরিবেশন করছিল।
সুগনার তখনো খিদে পায়নি। কাঞ্চন প্রাসাদে যাওয়ার পর থেকেই সুগনার ক্ষুধা মিটে
গিয়েছিল। শান্তার
ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। দুই সন্তান
একসঙ্গে চলে যাওয়ায় ঘর জনশূন্য হয়ে পড়ে। কারোরই
কোন কিছুতেই মন ছিল না।
তবুও শান্তার মন দীনেশজির থেকে একটু একটু করে শান্ত হতো। কিন্তু কাঞ্চনের জন্য সুগনার মন
সবসময় উদ্বেগে ভরে উঠত। সে জানতো
কাঞ্চনের প্রাসাদে কোনো কষ্ট হবে না। তবু
তার মন কাঞ্চনের দুশ্চিন্তায় ঘেরা।
মাত্র দুদিন হলো কাঞ্চন প্রাসাদে গেছে আর এই বাড়িটা
মরা বাড়ির মত হয়ে গেছে। দুদিন আগেও
এই বাড়িতে কাঞ্চন আর চিন্টুর কোলাহল, মারামারি, ঝগড়ার
মতো গন্ধ আসত। এখন সব সময়
জনশূন্যতায় ঢেকে থাকত।
আগে কোনো বিষয় ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত সুগনা
ও শান্তা। এখন বিষয়
হওয়ার পরও চারটি কথাও বলে না। তার
বিষণ্ণ মন কোনো কথা বলতে প্রস্তুত ছিল না। এখন
শুধু হ্যাঁ-হুমতেই তার কথা পূর্ণ হতো।
এ সময়ও সুগনা শুধু কাঞ্চনের কথাই ভাবছিল। মুখে বিড়ির মোহর চেপে কাঞ্চনের
শৈশবের দিনগুলোতে হারিয়ে গেছে সে।
তখন দরজায় তোলপাড়।
সুগনা ঘাড় তুলে তাকাল। চিন্টুকে নিয়ে উঠোনে ঢুকতে দেখা গেল কাঞ্চনকে।
“কাঞ্চা...!” ওর দিকে তাকাতেই সুগনা বলে উঠে।
শান্তাও সুগনার গলায় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।
“বাবা...” সুগনাকে জড়িয়ে ধরে বলল কাঞ্চন।
“বেটি, তুই
এই সময়ে এখানে এসেছিস, আর তোর এ কি অবস্থা? ওখানে
সব ঠিক আছে?” সুগনা কাঞ্চনের চেহারা আর বিবর্ণ
মুখের দিকে তাকিয়ে বলল।
কাঞ্চন উত্তর দেবার আগেই শান্তাও রান্নাঘর থেকে উঠানে
চলে এসেছে।
“সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। সেখানে কিছুই নেই।” কাঞ্চন ফুপিয়ে বলল।
“কি বলছিস ...?” সুগনা
হতভম্ব হয়ে বলল “কেমন
আছেন ঠাকুর সাহেব? কেমন আছেন রবিবাবু আর তার মা?"
“বাবা ভালো আছেন, স্যার
ও মা জিও ভালো আছেন ... কিন্তু সেখানে...।”
“ওখানে সবাই ভালো আছে, তাহলে
গোলমাল কি...?"
জবাবে কাঞ্চন রাজবাড়ি থেকে বিরজুকে মৃত্যু পর্যন্ত সব
খুলে বলে।
শুনে সুগনার পাশাপাশি শান্তা আর দীনেশ জির মুখেও কথা
সরে না।
যেখানে বিরজুর মৃত্যুতে শান্তা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, অন্যদিকে
রবির বাবার মৃত্যুর রহস্য জেনে চিন্তিত হয়ে পড়ল সুগনা। সে কাঞ্চনকে নিয়ে চিন্তিত ছিল। তার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। এই রহস্য জানার পর কমলাজী কাঞ্চনকে তার বাড়ির পুত্রবধূ
হিসেবে মেনে নেবেন কি না, এই প্রশ্ন তার মনে অশান্তির সৃষ্টি
করছিল।
“চিন্তা করিস না বেটি ..... যা
খাবার খেয়ে নে, সব ঠিক হয়ে যাবে।” শান্তা ওকে
জড়িয়ে ধরে বলল।
“কিছু ঠিক হবে না, বুয়া।” কাঞ্চন নাক ফুঁপিয়ে বলল। “মা কখনো
আমাকে তার পুত্রবধূ বানাবে না। সে
আমাকে পছন্দ করে না।”
“দুঃখ পাসনা বেটি, তুই
লাখে একজন। তোকে চিন্তা
করতে হবে না। আমি সব ঠিক
করে দেব।” সুগনা
কাঞ্চনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল।
শান্তা কাঞ্চনকে ভিতরে নিয়ে তার ক্ষতস্থানে মলম লাগাতে
লাগল। কিন্তু শান্তা বা সুগনা কারোরই
হৃদয়ে লেগে থাকা ক্ষতের মলম ছিল না।
সুগনার খাটে বসে দুশ্চিন্তায় মগ্ন। এটাই সে ভাবছিল। কমলাজি কি সত্যিই তার স্বামীর মৃত্যু ভুলে কাঞ্চনকে
পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন? নইলে
কাঞ্চনকে সারাজীবন রবিবাবুর জন্য কষ্ট পেতে হবে। তার চিন্তা আরও গভীর হতে থাকে। কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পায়নি।
আসলে এবার বাদী এমন একটি তীর ছুড়েছে যার উত্তর তার সাথে
ছিল না। সে শুধু কাঁদতে পারল। যন্ত্রণায়।
৪৭
রাত কেটে গেল। বাড়ির
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু
কাঞ্চনের চোখ থেকে ঘুম অনেক দূরে। সে
কিভাবে ঘুমাতে পারে? তার জীবনে যে ঝড় এসেছিল তা শুধু
কাঞ্চনের সুখ, স্বপ্ন নয়, তার
চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
এ সময় কাঞ্চনের অবস্থা ছিল পানিবিহীন মাছের মতো। রবির থেকে আলাদা থাকার চিন্তাই তাকে
হত্যা করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
রবির সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে করে বিছানায় শুয়ে
পড়ে কাঞ্চন। তার কথা, তার
নীরবতা, তার রাগ, তার প্ররোচনা, তার
বাহুতে বন্দী হয়ে সবকিছু ভুলে যাওয়া। তার
সবকিছু খুব ভালো লেগেছে। সেই সব
মুহূর্ত একে একে সিনেমার মতো চোখের সামনে ভেসে আসছিল।
“সেই মুহূর্তগুলো কি আবার ফিরে
আসবে? আমি কি আবার তার সাথে ভালোবাসার সেই মুহূর্তগুলো
কাটাতে পারবো? আবার কি পাবো স্যারের সেই শক্ত হাতের ছোয়া?” কাঞ্চন
নিজের সাথে কথা বলতে থাকে।
“না... এখন আর কখনোই দেখা হবে
না স্যার।” তার হৃদয়ের
কোন কোণ থেকে একটা আওয়াজ ভেসে এলো- "তোমার বাবা তার বাবাকে মেরেছে। স্যার, তোমাকে
ক্ষমা করতে পারে, কিন্তু মা কখনোই ক্ষমা করবে না। সে তোমাকে আগেও পছন্দ করত না এবং এখন তো
একেবারেই নয়..."
কাঞ্চনের মন খারাপ হয়ে গেল। “কি করে বাঁচবো? স্যারের
সাথে দেখা না হলে মরে যাবো।” তার মুখ থেকে
একটি আর্তনাদ বেরিয়ে এল এবং তার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
তার হৃদয় তখন অন্ধকার কোষে পরিণত হয়েছিল। দূর-দূরান্তে কোনো আশার আলো দেখতে
পাচ্ছে না। সে বুঝতে
পারছিল না, তার কি করা উচিত? কোথায়
যাবে যাতে তার মনের মেঘ দূর করা যায়। এই
সমস্ত সময় তার মনে হয় আর কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁদছে। তার অবস্থা ছিল একটা ছোট্ট মেয়ের মতো, যে
দোকান থেকে কিছু পছন্দের খেলনা কিনেছিল, কিন্তু বাড়ি
ফেরার পথে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেছে। সেই
মেয়ের দুঃখ যেমন অনুমান করা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি
কাঞ্চনের দুঃখ-কষ্ট অনুমান করাও সম্ভব হয়নি এই সময়ে।
কাঞ্চন কিছুক্ষণ কাঁদতে থাকল, তারপর
কিছুক্ষণ ভেবে বিছানা থেকে উঠে কোণে দাঁড়িয়ে ঝোলার দিকে তাকাতে লাগল।
তার চোখ স্থির হয়ে গেল খড়ের উপর আটকে থাকা একটি ঝোলায়। হাত তুলে খুলে ফেলল। সেই ব্যাগে রবির জুতো ছিল যা কাঞ্চন
উপত্যকা থেকে তুলেছিল।
জুতোটা বের করে বুকের সাথে লাগিয়ে কাঁদতে লাগল। জুতাটা বুকে রাখলেই তার অস্থির মন
একটা স্বস্তি পেল। বিছানায়
শুয়ে জুতা বুকে রেখে মনে মনে বলল - "স্যার, আপনি
যেখানেই থাকুন, খুশি থাকুন, আমি
এখন আপনার স্মৃতির আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকব.. আপনার জুতাই আমার বিনোদনের জন্য
যথেষ্ট। আমি রোজ আমার কপালে এটা লাগাই, একই
ভাবনায় তোমার পূজা করতে থাকব। আর
তোমার সুখের জন্য প্রার্থনা করতে থাকব।
কাঞ্চন বারবার রবির জুতা বুকে রাখে, কখনো
গালে ঘোরাঘুরি করে আবার কখনো কপালে রাখে। অনেকক্ষণ
সে এভাবেই কাঁদতে থাকে রবির জুতো নিয়ে। তারপর
কখন যে চোখ লেগে গেল, সে জানে না।
ভোর না হওয়া পর্যন্ত কাঞ্চন ঘুমিয়েছিল। চোখ খুলতেই শান্তা ওকে বলল যে
রাজবাড়ি থেকে একজন চাকর এসেছে তাকে নিতে।
কাঞ্চন প্রাসাদে যেতে রাজি নয়। শান্তা জেদ করাটা ঠিক মনে করল না। সে নিজেও চায়নি কাঞ্চন আর চিন্টু তার দৃষ্টি থেকে দূরে
থাকুক।
প্রাসাদ থেকে আসা ভৃত্যের কাছ থেকে আরও জানা গেল যে রবি
এবং তার মা দিওয়ান জির বাড়িতে থাকেন। আর
সুগনা গেছে ওর সাথে কথা বলতে।
রবি দিওয়ানের বাড়িতে আছে শুনে কাঞ্চনের শুষ্ক মুখ
ফুলে উঠল। সে খুশি হল
যে সে তার স্যারকে আবার দেখতে পাবে। তার
মধ্যে আশার আলো জেগে ওঠে। হয়তো স্যার
ও মা জি তাকে ক্ষমা করে কবুল করবেন।
সুগনাও সেই আশা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। সে ভাবতে থাকে যে কমলা জির পা ধরতে হলেও
সে কাঞ্চনকে মেনে নিতে রাজি করাবে।
বসতীর সীমার বাইরে এসে সুগনা মন্দিরে পৌঁছেছে, কমলাজি
মন্দিরের সিঁড়ি নামতে দেখে। সুগনা
সেখানে দাঁড়িয়ে তার নামার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
কমলাজির চোখও পড়েছিল সুগনার দিকে। কমলা জি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে তার স্যান্ডেল পরতে
লাগলেন। তখন সুগনা তার কাছে এসে হাত
জোড় করে অভিবাদন জানায়।
সুগনার আসার কারণ কমলাজী খুব ভালো করেই জানতেন। সে জানত কাঞ্চনের মোহ সুগনাকে তার
কাছে পাঠিয়েছে। কমলাজি
অনিচ্ছায় সুগনার নমস্কার উত্তর দিয়ে এগিয়ে গেলেন।
“বোনজি, আমি
আপনার সাথেই দেখা করতে যাচ্ছিলাম। এখানে
আপনার সাথে দেখা হয়েছে এটাই ভালো।” তাকে চলে
যেতে দেখে সুগনা বিনীত কণ্ঠে বলল।
“আমার সাথে...? কিসের
জন্য...?” কমলা জী বললেন না বুঝের ভান করে।
“বোনজি, ভাববেন
না যে আমি আপনার দুঃখ অনুভব করি না। কাঞ্চন
আমাকে সব বলেছে। আপনার
স্বামীর কথা জেনে আমার মনটাও কেঁপে উঠল। আমি
আপনাকে অনুরোধ করছি, বোনজি, ঠাকুর
সাহেবের কারণে আমাদের উপর রাগ করবেন না।”
“আমি কেন আপনার উপর রাগ করব, সুগনা
জি। আপনি একজন ভালো মানুষ। আপনার প্রতি আমাদের কোনো অনুযোগ নেই।”
“সৃষ্টিকর্তা আপনাকে সত্যিই
একটি বিশাল হৃদয় দিয়েছেন। এই
কথা বলে আপনি আমার দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছেন। আমি জানতে পেরেছি যে সেই সত্য প্রকাশের পরে, কাঞ্চন
এবং রবিবাবুর সম্পর্কের মধ্যে কোনও সমস্যা হবে না।”
“দাঁড়ান ...আপনি হয়তো আমার
কথার ভুল ব্যাখ্যা করছেন।” কমলাজী সুগনাকে
বাধা দিয়ে বললেন - "সুগনা জী, আপনি যদি
ভাবছেন যে আমি কাঞ্চনকে আমার পুত্রবধূ হিসাবে গ্রহণ করব, তবে
আমি আপনাকে স্পষ্টভাবে বলে রাখি যে কাঞ্চন কখনই আমার বাড়ির পুত্রবধূ হতে পারবে না।”
“এমন বলবেন না, বোনজি, আমার
নিষ্পাপ মেয়েকে দয়া করুন।” সুগনা আরজ
করল। “ও
আমার মেয়ে। আমি ওকে
লালন-পালন করেছি। সব পাপ থেকে
সে নির্দোষ। ঠাকুর
সাহেবের ভুলের জন্য আমার কাঞ্চনকে শাস্তি দিবেন না। তার জীবন নরকে পরিণত হবে। কাঞ্চনকে আমার মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করুন।”
“আপনি বৃথা পীড়াপীড়ি করছেন, সুগনা
জি। যা করা যায় না তার কথা বলছেন
কেন? কাঞ্চন আপনার মেয়ে নয়। আপনি শুধু লালন-পালন করেছেন। আপনি চান আমি সেই মেয়েটিকে আমার পুত্রবধূ বানাই যার
বাবা আমার সিঁদুর মুছে দিয়েছেন। এটা
কি সম্ভব?” কমলাজী বললেন, "আমি
অতটা বোকা নই। কাঞ্চনকে
আমার ঘরে নিয়ে আসলে সে সারা জীবন কাঁটার মতো আমার চোখ বিধতে থাকবে, আমার
বুকে শূলের মতো ছিঁড়ে আমার আত্মাকে রক্তাক্ত করবে। ...না। ..আমি
তাকে কখনই গ্রহণ করব না।”
কমলাজির কথার কোনো উত্তর ছিল না সুগনার কাছে। সে উত্তরহীন হয়ে গেল।
“সুগনা জি, আপনার
বা কাঞ্চনের সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। কিন্তু
আপনার সুখের জন্য আমি দুঃখ পেতে পারব না। কাঞ্চন
আমার ঘরের পুত্রবধূ হতে পারবে না। এখন
আমাকে যেতে দিন।” এই বলে
এগিয়ে গেলেন কমলাজী।
সুগনা তাকে চলে যেতে দেখতে থাকে। তার কোনো কৌশলই কাজ করেনি। তাঁর আবেদন কমলাজির অন্তরের ঘৃণাকে পরাস্ত করতে পারেনি। চোখের জলে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে পথে
চলে গেল সুগনা।
৪৮
কাঞ্চন উপত্যকার ঝর্নার কাছে সেই পাথরের উপর বসে ছিল
যেটির উপর সে প্রতিদিন বসে রবির জন্য অপেক্ষা করত। সে প্রতিদিন এই সময়ে রবির সাথে থাকত। তার কোলে হাত রেখে সে প্রকৃতির
সৌন্দর্যে হারিয়ে যেত। একে অপরের
হৃদস্পন্দন শুনে, ভালবাসার কথা বলত। সে রবির কথা শুনতে এতটাই পছন্দ করত যে
তার মন চাইত, রবি বলতেই থাকুক এবং সে চুপ করে শুনে। কিন্তু আজ সেরকম কিছু ছিল না। আজ না সে রবির সেসব মিষ্টি কথা শুনতে
পাচ্ছিল, না তার শরীরে ও শরীরে সুবাস দেওয়া
রবির সমর্থন। আজ সে একা
ছিল। একেবারে একা।
কাঞ্চনের আগে থেকেই এই সন্দেহ ছিল যে আজ রবি আসবে না। কিন্তু তারপরও এখানে আসা থেকে নিজেকে
আটকাতে পারেনি। সে এই
উপত্যকা, এই পরিবেশ খুব ভালবাসত। দুপুর থেকেই এখানে আসার জন্য তার মন আকুল
হয়ে গেল। ৪টা বাজে সে এখানে পৌঁছে। এবং গত এক ঘন্টা ধরে রবি যে পথ থেকে
আসার কথা সে দিকে চাতক পাখির মত তাকিয়ে ছিল। কিন্তু যখনই তার চোখ রাস্তার দিকে যায়, ফাঁকা
নির্জন পথ দেখে হতাশায় মাথা নিচু করে। যতই
সময় গড়াচ্ছে ততই তার মনের বেদনা বাড়ছে।
কিছুক্ষণ আরো পার হয়ে গেল। রবি এখনো আসেনি। রবিকে
না আসতে দেখে তার মন গভীর বেদনায় ভরে গেল। তার
চোখের কোণে ফোঁটা ফোঁটা জল।
“মনে হচ্ছে স্যার এখন আসবেন না। আমার উপর চিরকালের জন্য রাগ করেছেন। এখন সারাজীবন এভাবেই অপেক্ষা করতে হবে।” কাঞ্চন মনে মনে বলল। তার চোখ দিয়ে আবার বৃষ্টি শুরু হলো। “এটা কেন হয়? আমরা
যেটা ভালো লাগে সেটা কেন পাই না? কত ভালো হতো
স্যার আর আমি বিয়ে করে ফেলতাম। কনে
হয়ে ওর বাসায় যেতাম। সুখে-দুঃখে
থাকতাম। তার সাথে। কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে গেছে। সব দোষ পিতাজির।
কাঞ্চনের চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হল। কিছুক্ষণ পর যখন তার কান্না থামল, সে
ঘাড় তুলে পথের দিকে তৃষ্ণার্ত চোখ রাখল। পরের
মুহুর্তে তার চোখ বিস্ময়ে ভরে ওঠে। সে
দেখল রবি আসছে।
রবিকে আসতে দেখে তার মন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। তার মনে হলো যেন সে পুরো পৃথিবী
পেয়েছে। এবার আনন্দে
চোখ ছলছল করছে তার।
কাঞ্চন খুশিতে রবিকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল তখন তার মন
বলে - "থামো কাঞ্চন! তোমার এত খুশি হওয়ার দরকার নেই। তোমার খুশিতে স্যার রাগ করে এমনটা যেন না হয়। তার বাবার মৃত্যুর জন্য একটা দুঃখ আছে
তার। এভাবে খুশি দেখলে তার হৃদয়
থেকে তোমার ভালবাসা মুছে যাবে। আগে
তার কথা শুনো। আগে জানো কেন
সে এসেছে। এমনও তো হতে
পারে সে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে এসেছেন?
কাঞ্চন থামল। তার
মুখের দীপ্তি নিমেষে মিলিয়ে গেল। বিষণ্ণতা
আবার তার মুখের আবরণ হয়ে গেল।
কাছে এল রবি।
কাঞ্চন আশাভরা দৃষ্টিতে রবির দিকে তাকাল।
রবি কাছে এসে কাঞ্চনের মুখের দিকে তাকাল।
কাঞ্চনের মুখ শুকিয়ে গেলেও তার হৃদয়ে হাজারো সুখের
ফুল ফুটেছিল। রবির কথা
শুনে সে যতটা ব্যাকুল হয়ে উঠল যেন আজ রবি তার জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। হৃৎপিণ্ড এমনভাবে ধড়ফড় করছিল যেন
মাইলের পর মাইল ছুটে এসেছে।
“কাঞ্চন! তুমি কি আমার উপর রাগ
করেছ?” রবি মুখ খুলল।
কাঞ্চন নির্দোষভাবে ঘাড় নাড়ল।
“তাহলে এত দূরে দাঁড়িয়ে আছো
কেন? আজ আমাকে জড়িয়ে ধরবে না?"
রবি বলতে দেরি, তার চোখের কোণে জল গড়িয়ে পড়ল। খুশিতে কিছু বলার জন্য তার ঠোঁট ছলছল
করছে কিন্তু শব্দ বের হতে পারছে না।
সে দ্রুত সরে গিয়ে রবির কোলে পড়ে গেল। রবির বুকে আঘাত করার সাথে সাথে ভিতরের
ব্যথা কান্নার আকারে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। রবি ওর কান্না দেখে অস্থির হয়ে গেল।
“কি হয়েছে কাঞ্চন? কাঁদছো
কেন? তোমাকে কিছু না বলেই আমি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে
এসেছি এজন্য?” রবি ওর মুখটা হাতে নিয়ে বলল।
“স্যার, আপনি
কি আমার উপর রাগ করেছেন?” সে ভেজা চোখে রবির দিকে তাকাল।
“রাগ..? আমি
তোমার উপর রাগ করব কেন? তুমি কি করেছ?” চোখের
জল মুছতে মুছতে বলল রবি।
“স্যার, আপনি
আর মা জি যখন প্রাসাদ ছেড়েছিলেন, আমি খুব
ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। সন্ধ্যা
পর্যন্ত আমি কাঁদছিলাম তারপর আমিও চিন্টুর সাথে প্রাসাদ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।” তার প্রাসাদ ছেড়ে স্টেশনে পৌঁছানো
পর্যন্ত কাঞ্চন বিড়বিড় করে উঠল। তারপর
সেখানে রবিকে বিরজুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এবং তার পর বাড়ি ফেরার সব ঘটনা বিস্তারিত
বলে।
রবির বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে কাঞ্চনের জন্য অনেক চিন্তিত হয়ে পড়ে। কাঞ্চন তার জন্য অনেক ঝামেলায় পড়তে
যাচ্ছিল। সে মনে মনে ভগবানকে
ধন্যবাদ জানিয়ে কাঞ্চনের কপালে চুমু দিয়ে তাকে বুক থেকে চেপে ধরল। কাঞ্চন ছোট মেয়ের মত কোলে পড়ে গেল।
বেশ কিছুক্ষণ পরস্পর জড়িয়ে থাকার পর রবি কাঞ্চনকে
নিয়ে খাদের কাছে একটা বড় পাথরের ওপর বসল।
কথা দাও কাঞ্চন, আর এমন
বোকামি করবে না। পাথরের উপর
বসার পর রবি কাঞ্চনকে বললো - "আমার জন্য কখনো ভাববে না, বাবা
আর বুয়াকে জিজ্ঞেস না করে কোথাও যাবে না। কোথাও
গেলে সাথে সাথে ফিরে আসবে।”
কাঞ্চন সব বুঝতে পেরে শিশুর মতো ' হ্যাঁ
'
তে মাথা নাড়ল।
রবি তার সরলতা দেখে হাসল।
“কেন ভাবছো আমি তোমাকে ছেড়ে
যাব?” রবি জিজ্ঞেস করল।
“স্যার, আমি
ভেবেছিলাম বাবার ভুলের কারণে আপনি আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন। অনেক কেঁদেছি এই ভেবে যে আপনার সাথে আর কখনো দেখা হবে
না...!” ওর কথা শেষ হবার আগেই রবি ওর মুখে হাত রাখলো।
“সাবধান! তুমি আর বলবে না এমন
কথা। তুমি আমাকে যতটা ভালোবাসো আমিও
তোমাকে ততটা ভালোবাসি।“ রবি
আদর করে বকা দিল। তারপর দুঃখের
সুরে বলল “ঠাকুর
সাহেব যা করেছেন ভুল করেছেন। আর
এর জন্য আমি তাকে কখনোই ক্ষমা করব না। তবে
এতে তোমার কি দোষ? তুমি নিষ্কলঙ্ক, তোমার
মন গঙ্গার মতো পবিত্র। তোমার চেয়ে
ভালো, তোমার চেয়ে প্রিয়, পৃথিবীতে
আর কেউ নেই আমার কাছে। তোমাকে আমি কষ্ট দেবো না। কাঞ্চন তুমি আমার প্রয়োজন। পৃথিবী এখানে-ওখানে যাক না কেন, তবু
তোমায় আমি ছাড়ব না। যে যা খুশি
তাই করুক।”
কাঞ্চনের মন ঠান্ডা হয়ে গেল। নিজের জন্য রবির হৃদয়ে অদম্য ভালবাসা দেখে সে পুরোপুরি
নিশ্চিত হয়ে গেল যে রবি তাকে আর ছেড়ে যাবে না। এখন একটাই চিন্তা ছিল। কোনোভাবে মা জির হৃদয়ের ময়লাও দূর হয়ে যায়। তারও উচিত তাদের ক্ষমা করা এবং তাদের
গ্রহণ করা।”
“কি ভাবছো তুমি? এখনো
কি আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?” রবি
কাঞ্চনকে হারিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করল।
“না স্যার, আমি
মাজির কথা ভাবছিলাম। মাজিও কি
আমাকে ক্ষমা করবেন?"
“মা'র
মন এখন রেগে আছে। তার রাগ
কাটতে একটু সময় লাগবে। কিন্তু
চিন্তা করবে না। সব ঠিক হয়ে
যাবে। খুব শীঘ্রই আমি তোমার বাড়িতে
মিছিল নিয়ে আসব এবং তোমাকে বউ করে নিয়ে যাব।”
কাঞ্চন তার মিছিল এবং নববধূর কথা শুনে লজ্জা পেয়ে গেল। সে হাসিমুখে সেই আসন্ন মুহূর্তগুলোতে
হারিয়ে যেতে থাকে।
কাঞ্চনকে ভাবনায় হারিয়ে যেতে দেখে রবি দুষ্টুমি করে
বললো - "কোথায় হারিয়ে গেলে? রাতে কি হবে
তা এখন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছো?"
“হাঁস...!” কাঞ্চন লজ্জা পেয়ে কোলে পড়ে গেল।
৪৯
রাত তখন ১১ টা। কাঁচের
প্রাসাদটি আপন মহিমায় দাড়িয়ে গৌরব ছড়াচ্ছিল। প্রাসাদের সমস্ত চাকররা সেবক কোয়ার্টারে ঘুমাতে
গিয়েছিল। কাঁধে বন্দুক
নিয়ে মাত্র দুইজন নিরাপত্তাকর্মী প্রাসাদের পাহারায় জেগে ছিলেন।
ঠাকুর সাহেব এ সময় হলের সোফায় বসে নিজের জীবনের হিসেব
নিকেশ করছিলেন। সারাজীবনে সে
কী পেয়েছে আর কী হারিয়েছে তা নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত। তার সামনের সেন্টার টেবিলে রাখা ছিল দামি মদের বোতল ও
গ্লাস।
ঠাকুর সাহেব বোতলটা খুলে গ্লাসে মদ ঢালতে লাগলেন। তারপর গ্লাসটা ঠোঁটে রেখে এক
নিঃশ্বাসে খালি করে দিল। এটা তার জন্য
নতুন কিছু ছিল না। রাত জেগে মদ
খাওয়া তার ভাগ্যে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে আজ সে বেশি অসুখী ছিল। আজ তার চোখে জল। যে চোখ ২০ বছর হাজার দুঃখ সহ্য করেও কখনো কাঁদেনি, আজ
কাঁদছে। কারণটা ছিল কাঞ্চন....!
আজ সন্ধ্যায় সুগনার বাড়ি থেকে ফেরার পর চাকর তাকে
বললো কাঞ্চন আর প্রাসাদে ফিরতে চায় না, তখন থেকেই
তার মন খারাপ হয়ে গেছে।
আজ এত একাকীত্ব সে কখনো অনুভব করেনি। আজ তার সব আত্মীয় একে একে তার কাছ
থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। প্রথমে
দেওয়ান জি, তারপর নিক্কি এবং আজ কাঞ্চনও তার সাথে
সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
ঠাকুর সাহেব কাঞ্চনের কাছ থেকে এমন উদাসীনতা আশা করেননি। দেওয়ান জি এবং নিক্কি তার আত্মীয়
ছিলেন না। তাদের চলে
যাওয়া ঠাকুর সাহেবের জন্য তেমন খারাপ লাগেনি। কিন্তু কাঞ্চন ছিল তার মেয়ে। শিরায় শিরায় রক্ত বইছিল। নিজের স্বার্থের জন্যই হোক বা ঘৃণার জন্য, এমন
এক দুঃসময়ে কাঞ্চনের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। তার নিজের মেয়ে তাকে পছন্দ করে না এই
উপলব্ধিতে সে খুবই যন্ত্রণা পেয়েছিলেন।
আজ তার নিজের সম্পর্কে বলার কিছু বাকি ছিল না। যদি তার কিছু অবশিষ্ট থাকে তবে এই
প্রাসাদটি যে এই সময়ে তার অসহায়ত্ব নিয়ে মজা করছিল। এর দেয়ালগুলি তার একাকীত্বে তাকে হাসছিল এবং উত্যক্ত
করছিল।
ঠাকুর সাহেব আবার গ্লাসটি ভরে দিলেন এবং আগের মতই এক
নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাসটি খালি করলেন। এখন তার চোখে জলের বদলে নেশা ভেসে উঠল।
হাত নেড়ে উঠে হলের মাঝখানে দাঁড়াল। তারপর ঘুরে ঘুরে হলের চারপাশ দেখতে
লাগলেন। যতই তার চোখ পড়ল, কাঁচের
দেয়ালগুলো তাকে উপহাস করছে বলে মনে হলো।
এই চক্র বেশ কিছুক্ষন চলতে থাকে। তারপর হঠাৎ ঠাকুর সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সেন্টার টেবিলের কাছে চলে গেল। সেন্টার টেবিলে রাখা বোতলটা তুলে রাগ
করে দেয়ালে ছুড়ে মারে। দেয়ালে
ধাক্কা খেয়ে বোতলটি ভেঙে যায়।
কিন্তু তাতেও তার রাগ কমেনি। পাশে পড়ে থাকা কাঠের চেয়ারটা তুলে পুরো জোরে দেয়ালে
মারতে লাগলো।
ছন্না…..ছছনা….ছছক…..
আওয়াজে দেয়ালে জমা কাঁচ ভেঙ্গে মেঝেতে পড়তে লাগল।
কাঁচ ভাঙার আওয়াজ শুনে বাইরে অবস্থানরত একজন প্রহরী
ছুটে আসে ভেতরে। ঠাকুর সাহেবকে
পাগলের মতো কাঁচের দেয়াল ধ্বংস করতে দেখে তাকে থামাতে এগিয়ে গেল।
কিন্তু! সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর সাহেবের চোখ পড়ল তার ওপর। সিংহের মতো গর্জন করে উঠেন-
"এখান থেকে বেরিয়ে যাও, সাবধান কে
ভিতরে ঢুকতে বলেছে।”
যে গতিতে প্রহরী এসেছিল। একই গতিতে ফিরে গেল।
প্রহরী চলে যেতেই ঠাকুর সাহেব আবার দেয়ালে চেয়ার
ছুড়তে লাগলেন। এই
প্রক্রিয়া কিছুক্ষণ চলতে থাকে তখন পর্যন্ত সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
“আমার কি হয়েছে?”ঠাকুর সাহেব মাথা ধরে কাঁদলেন। “এই প্রাসাদের
মোহ আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমার
রাধা কেড়ে নিয়েছে আমার থেকে। আমার
মেয়ে কাঞ্চনকে আমার থেকে আলাদা করেছে। আমি
এই প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দেব।” ঠাকুর সাহেব
পাগলের মত বিড়বিড় করলেন। “হ্যাঁ
ঠিক হবে। তবেই আমার
রাধা ঠিক হবে, তবেই আমার মেয়ে আমার কাছে ফিরে আসবে।”
তার মধ্যে প্রতিহিংসা বোধ জেগে ওঠে। সে তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাঘরের দিকে
গেল। রান্নাঘরে কেরোসিনের গ্যালন
পড়ে ছিল। সে সব গ্যালন
তুলে হলের সামনে নিয়ে এল।
তারপর তিনি একটি গ্যালন খুলে দেয়ালে কেরোসিন ছুড়তে
শুরু করলেন - "এই প্রাসাদটি আমার সুখে হরন করেছেন। এটি আমার জীবনের সুখ কেড়ে নিয়েছে। আজ আমি এই গ্রহন মুছে দেব।”
ঠাকুর সাহেব ঘুরে ঘুরে কেরোসিন ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। এর সাথে নিজের সাথে কথাও বলে
যাচ্ছিলেন। এই মুহুর্তে
তাকে দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে সে পাগল হয়ে গেছে। গোটা প্রাসাদের দেয়াল কেরোসিন দিয়ে গোসল করিয়ে আবার
রান্নাঘরের দিকে ছুটল।
“ম্যাচবাক্স কোথায়?” সে
বিড়বিড় করে চোখ চালাতে থাকে ম্যাচের খোঁজে। “হ্যা পেয়েছি...” তিনি
ঝাঁপিয়ে পড়ে ম্যাচটি তুলে নেন। তারপর
দ্রুত হলের দিকে এলেন।
“এখন মজা হতে যাচ্ছে।” সে ম্যাচ জালিয়ে আলোকিত করে। তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে
ম্যাচের কাঠি দেওয়ালে ছুড়ে মারে।
কাঠিটি প্রাচীরের সাথে আঘাত করতেই আগুনের শিখা ছড়িয়ে
পড়ল।
ঠাকুর সাহেব হাসলেন।
দু’মিনিটের মধ্যেই
প্রাসাদের দেয়ালগুলো আগুনে ফাটল ধরতে শুরু করে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাসাদে আগুন যতই ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠাকুর
সাহেব আনন্দে ভরে উঠছিলেন। অট্টালিকা
পুড়তে দেখে তার আনন্দের সীমা ছিল না।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীরা প্রাসাদে আগুন জ্বলতে
দেখে ভিতরে আসতে চাইল। কিন্তু সাহস
করতে পারেনি।
“এখন আমার হৃদয় শান্তিতে আছে।” ঠাকুর সাহেব পাগলের মত হেসে বললেন। “এখন এই
প্রাসাদ ধ্বংস হবে।”
তার হাসির তীব্রতা বেড়ে গেল। প্রাসাদে আগুন যত দ্রুত বাড়ছিল, ততই
জোরে তার হাসি। তার মানসিক
অবস্থার অবনতি ঘটানোর জন্য কোনো কসরত বাকি রাখেনি। তার চোখে ভয় বা করুণা ছিল না। যেন সে নিজেই প্রাসাদের সাথে ধ্বংস হয়ে যেতে চায়।
প্রাসাদ পুরোপুরি আগুনে পুড়ে যায়। ঠাকুর সাহেবের হাসি তখনও প্রতিধ্বনিত
হচ্ছিল।
এটি যখন!
একটা বিকট চিৎকার তাদের হাসির অবসান ঘটিয়ে দিল। এই চিৎকার রাধাজীর ঘর থেকে এলো।
ঠাকুর সাহেবের মনে একটা তীব্র ধাক্কা লাগল। হঠাৎ তার মনে হল রাধা ঘরের মধ্যে
তালাবদ্ধ। সে চিৎকার
করে রাধাজীর ঘরের দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু দরজায় পৌঁছতেই তার হুঁশ উড়ে গেল। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। যার চাবি এ সময় তার কাছে ছিল না।
“আমি কি করেছি?” ঠাকুর
সাহেব মনে মনে বিড়বিড় করলেন - "না না রাধা। আমি তোমার কিছু হতে দেব না। আমাকে বিশ্বাস কর। আমি নিজেকে ধ্বংস করব কিন্তু তোমাকে কষ্ট পেতে দেব না।”
রাধাজীর চিৎকার শুনে ঠাকুর সাহেবের সমস্ত নেশা কেটে গেল। তিনি একজন আবেগপ্রবণ ব্যক্তির মত
সর্বশক্তি দিয়ে দরজায় লাথি মারতে লাগলেন। দরজা
গরম ছিল. ভিতরে থেকে দরজায় আগুন লেগেছে তা স্পষ্ট।
এক মুহুর্তের প্রচেষ্টা এবং শিখা দরজাটি দুর্বল করে দিল। শেষ একটা লাথি মারতেই দরজার ফ্রেমসহ
দরজা উপড়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল।
ভিতরের দৃশ্য দেখে ঠাকুর সাহেবের চোখ ছিঁড়ে গেল। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
রাধাজীর শাড়ির কোলে আগুন জ্বলছিল আর রাধাজী ভয়ে
চিৎকার করে ঘরে দৌড়াচ্ছেন।
ঠাকুর সাহেব বিদ্যুৎ গতিতে লাফিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। তড়িঘড়ি করে তিনি রাধাজীর শাড়ি তার
শরীর থেকে আলাদা করলেন। খুলতেই
মেঝেতে পড়ে গেলেন রাধাজী। মেঝেতে
পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে সে অজ্ঞান হয়ে যায়।
ঠাকুর সাহেব ঘরের খোঁজ নিলেন। ঘরের দেয়াল ভেদ করে আগুন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে। তার চোখ পড়ল বিছানায় পরে থাকা
কম্বলের ওপর। তিনি কম্বলটি
ধরে রাধাজিকে তুললেন, সাথে সাথে তিনি তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে
দিলেন। তারপর তাকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে
বেরিয়ে এলো।
রুম থেকে বের হতেই সিঁড়িতে উঠে এল। সেখানে দৃশ্য দেখে তার ঘাম ছুটে গেল। সিঁড়িতে আগুনের শিখা উঠছিল। পা রাখার জায়গাও ছিল না।
আগুনের তাপে তার মুখ পুড়ছিল। যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখান থেকে মূল ফটক পর্যন্ত শুধু আগুন।
ঠাকুর সাহেব রাধাজীকে কম্বলে জড়িয়ে দিলেন। অতঃপর তার হৃদয়কে শক্তিশালী করে
আগুনে ঝাঁপ দিল। সিঁড়িতে পা
দিতেই তার সারা শরীর জ্বলে উঠল। কিন্তু
তার পোড়ার কথা সে পাত্তা দেয়নি। তার
লক্ষ্য ছিল মূল দরজা...! সেখানে পৌঁছানোর আগে নিঃশ্বাস ধরে রাখতে চান তিনি। তার পা বাড়তে থাকে। ক্ষণিকের জন্যও থেমে যাওয়া মানে
দুজনের মৃত্যু। ঠাকুর সাহেব
মৃত্যুকে পাত্তা দেননি। কিন্তু তিনি
কোনো মূল্যেই নিষ্পাপ রাধাজীকে আগুনে ছাড়তে পারেননি।
সে দৌড়াতে থাকে। আগুনের
লেলিহান শিখা তার শরীরকে পুড়ছিল। আগুনের
কারণে তার পা দ্রুত এগোচ্ছিল না। তারপরও
কোনোমতে সে মূল ফটক পার হয়। রাধাকে
মাটিতে বসানোর সাথে সাথে সেও ধম্ম করে পড়ে গেল।
তিনি যখন বেরিয়ে আসেন ততক্ষণে ভিড় জমে গেছে। রক্ষীরা প্রাসাদে আগুনের শিখা উঠতে
দেখে প্রথমে দিওয়ান জির কাছে ছুটে যান। রবি
এবং কমলা জি জেগে ছিলেন। তারা
কাঞ্চনের বিষয় নিয়ে আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। যখন
রক্ষীরা দরজায় টোকা দিল।
প্রাসাদে আগুনের কথা শুনে রবি আর কমলা হতভম্ব হয়ে গেল। রবি পৌছানোর আগেই প্রাসাদটি আগুনে পুড়ে যায়। সে রাধাজীকে বাঁচাতে ভিতরে যেতে চাইল, কিন্তু
কমলাজী তাকে যেতে দেননি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের লোকজনও প্রাসাদের দিকে ছুটে
গেল। কাঞ্চন, সুগনা, কাল্লু
এবং নিক্কিও তাদের মধ্যে ছিল।
যতক্ষণ না ঠাকুর সাহেব রাধাজীকে নিয়ে বের হলেন। প্রাসাদের বাইরে ছিল মানুষের সমাগম।
ঠাকুর সাহেব মাটিতে পড়ে যেতেই রবি তার দিকে ছুটে এল। প্রথমে রাধার শরীর থেকে কম্বল আলাদা
করে। তার কম্বলও আগুনে পুড়ে গেছে। রবি কম্বলের আগুন নিভিয়ে তারপর সেই
কম্বল দিয়ে ঠাকুরের শরীরে আগুন নিভিয়ে দিতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যে ঠাকুরের গায়ের আগুনও নিভে গেল। কিন্তু সে ভীষণভাবে কষ্ট পেতে থাকে। নিজের কষ্টের তোয়াক্কা না করেই রবিকে
জিজ্ঞেস করল- "কেমন আছে রাধা, রবি? সে
কি ব্যাথা পেয়েছে?"
“রাধাজী অজ্ঞান। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। ওকে নিয়ে চিন্তা করবেন না।”
“ভগবান তোমাকে লাখ লাখ
শুকরিয়া...।” তার মুখে
বেদনা আর সুখের মিশ্র অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। “রবি
বেটা, তোমার মা কোথায়। আমাকে দেখতে দাও।”
রবি মায়ের দিকে তাকাল। কমলাজীর পদধ্বনি আপনাআপনি ঠাকুর সাহেবের কাছে চলে গেল। ঠাকুর সাহেবের মুখ দেখে তাহার মন
ব্যাথিত হল। তার মুখ কালো
হয়ে গিয়েছিল। কমলাজীর চোখ
থেকে অশ্রু ঝরে পড়ল।
“বোনজি। আমার পাপ ক্ষমার যোগ্য নয়, তবুও
জীবনের শেষ নিঃশ্বাসে হাত জোড় করে আপনার কাছে আমার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাই। আপনার কাছে প্রার্থনা করি আমার মেয়ে
কাঞ্চন যেন আমার পাপের শাস্তি না পায়। নিষ্পাপ। নিষ্পাপ। তাকে সুগনার মেয়ে হিসেবে দত্তক নিন। আপনি যদি তাকে দত্তক নেন, আমি
শান্তিতে মরতে পারব।” ঠাকুর
সাহেবের মুখ থেকে হাহাকারের শব্দ বেরিয়ে এল।
ঠাকুর সাহেবের এমন অবস্থা দেখে এবং তাঁকে কাঁদতে দেখে
কমলাজীর মন গলে গেল। সে বলল-
"কাঞ্চনের বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই, ঠাকুর
সাহেব। রবি তাকে পছন্দ করেছে। সে আমার নিজের ঘরের পুত্রবধূ হবে। আমি কথা দিচ্ছি।”
ঠাকুর সাহেব বেদনায়ও হাসলেন। চারদিকে তাকিয়ে কাঞ্চন আর নিক্কিকে দেখতে পেল। দুজনেই কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল। ঠাকুর সাহেব ইশারায় কাছে ডাকলেন। দুজনেই কাছে বসে কাঁদতে লাগলো। ঠাকুর সাহেব হাত তুলে আশীর্বাদ করার
চেষ্টা করলেন কিন্তু আত্মা তার শরীর ছেড়ে দিল। নিষ্প্রাণ হাত মাটিতে ফিরে এল।
সেখানে উপস্থিত সকলের চোখ ভিজে ছিল। কেউ বুঝতেই পারছে না কিভাবে এবং কেন
এই সব হলো?
এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সবাই অবাক। কিন্তু নিক্কির কণ্ঠ ছিল অন্যরকম। ঠাকুর সাহেবের মৃত্যুতে এর চেয়ে বেশি শোক আর কারো ছিল
না। ২০ বছর ধরে ঠাকুর সাহেবকে
বাবার মতো দেখেছে। শৈশব থেকে
এখন পর্যন্ত ঠাকুর সাহেব তার প্রতিটি জেদ ও ইচ্ছা পূরণ করেছে। যেদিন সে জানল যে সে ঠাকুর সাহেবের মেয়ে নয় তার চেয়ে
আজ তার দুঃখ বেশি। আজ তার চোখ
থামার নামই নিচ্ছিল না। আজ সে নিজেকে
এতিম মনে হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির। দিওয়ান জির বাড়ি থেকে রবি হাসপাতালে
ফোন করেছিল। ঠাকুর
সাহেবের মৃতদেহের সাথে রাধাজীকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
তাদের পিছনে তাদের জিপে, দিওয়ান
জি, সুগনা এবং কাল্লু সহ নিক্কি, কাঞ্চন, রবি
এবং কমলা জিও হাসপাতালে গিয়েছিল।
রাধাজীর ক্ষত ছিল সামান্য। কিন্তু এই দুর্ঘটনা তার ঘুমন্ত বছরের স্মৃতি ফিরিয়ে
দিয়েছিল। তিনি যখন
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন, দিওয়ান জি
তাকে পুরো পরিস্থিতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। স্বামীর মৃত্যুর শোক তাকে কয়েকদিন শোকে রাখল।
তারপর কয়েকদিন পর রাধাজীর উপস্থিতিতে রবি ও কাঞ্চনের
বিয়ে হয়।
যেদিন ঠাকুর সাহেব জানতে পারলেন কাঞ্চন তার মেয়ে। পরের দিন তিনি তার নতুন উইল করেন। যেখানে তিনি তার সমস্ত সম্পত্তির
অর্ধেক নিক্কি ও অর্ধেক কাঞ্চনের নামে করেছিলেন।
কিন্তু কাচের প্রাসাদ যেখানে ছিল। কাঞ্চন বা নিক্কি কেউই সেখানে থাকতে রাজি হয়নি। সেই কাঁচের প্রাসাদ, যা
২০ বছর ধরে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল, তার দীপ্তি
ছড়িয়েছিল। এখন তা
ছাইয়ে পরিণত হয়েছিল।
শেষ
